৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ৩০২০১৬
 
 ৩০/১০/২০১৬  Posted by
কবি কামরুল ইসলাম


কবি কামরুল ইসলাম

কবি কামরুল ইসলামের ১০টি কবিতা


লাল মাটির কবিতা

লাল মাটির কবিতা তোমার পছন্দ ছিল-
তুমি জানতে আলোর ভেতরে কী রকম যন্ত্রণা
ঢেউ খেলে লাল ইস্পাতের বল হযে যায় আর
বুড়ো কচ্ছপের সাঁতার নিযে কীভাবে জলজ কেতাবের
পৃষ্ঠাগুলো নিজেদের গুঁটিয়ে নিতে থাকে-

তুমি বৃষ্টিতে ধুয়ে দিতে চেয়েছিলে মৃত্যু ও কফিনের
যৌথ সংসার, আর পাড়ার কিন্নরতলায় গান কুড়োতে কুড়োতে
জেনে গেলে বিরামহীন দৃশ্য লঙ্ঘনের ইতিহাস-
লাল মাটির কবিতা তোমার পছন্দ ছিল-
লাল ভাতের গদ্যের ভেতরে সাঁতার কেটে কেটে
একদিন তুমি জেনে গেলে লালপেড়ে শাড়ির আঁচলে
আলোরা কীভাবে অন্ধকারে ডুবে ডুবে জল খায, আর
পাশের বাড়ির অন্ধ লোকটি আধখানা মেঘ কাঁধে
ভেঙে যায় সবগুলো পুরনো দেয়াল-


পথিকবৃত্তির নাকানি-চোবানি

বীজবপনের ছন্দ ও মুদ্রা কিংবা ঘেমে-ওঠা মনের
গুচ্ছ গুচ্ছ মেটাফর, মোষবাথানের লোকজ আঁধার
জাল ও জলের গল্প নিয়ে নেমে পড়ি সাকিনের খোঁজে-

এই বেলা ফুরালো কিছু গান বাঁশবনের দুষ্ট হাওয়ায়
হারানো ধুলোপথ ধরে আছে  কিশোরীর বেণী
বরফ মাখানো উষ্ণতায় পথচিহ্নের বারোয়ারী
সেই পথে দাঁড়িয়ে আছে নির্জন দুপুর মহতী উৎসবে —

ধানক্ষেতের আল ধরে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত ছেলেবেলা
ঘুমিয়ে আছে বটের পাতায়,
রহস্যময় ঝোপের আড়ালে প্যাগান চাঁদের উন্মাতাল
অভিসার — । প্রকৃতির ভেষজ চিঠিগুলো
যেটুকু বাড়তি হাওয়ায় সেটুকুই  ছায়ার দুলুনি
পথিকবৃত্তির নাকানি-চোবানি —

চেতনার শিশিরে-তন্দ্রায়  ঢেউ-আঁকা স্বপ্ননদীর বেহালা
কাশফুলে ছাওয়া,
বাজে গো বাজে আমার কাঠের যৌবন নিয়তির পাড়ে
শাদা-কালো ছন্দে
যেখানে পূর্ণিমা পুরনো ঢেউ-এ,  জলে ও পুরাণে –


আমাদের কিছু ঘাস ছিল

আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল
আমাদের নি:শ্বাসে ছিল নির্ভার নদীর কলতান ;
ঘরে ঘরে ঘোড়াদের কাল শেষে ফিরে আসে আস্তাবল
তাদের স্মরণে আসে অন্ধকার- স্মৃতির ঘাসে নূপুর বাজে শোন:
আমাদের কিছু ঘাস ছিল – ঘোড়ারা ঘাস খেত
ঘোড়ারা ঘাসহীন দলে দলে
ঘাসের পরানে বাজে শূন্যতা
ও ঘাস, ও শূন্যতা, তোমরা আমাদের উঠোনে আজো
বিবিধ তৈজস-

র‍্যাশনাল গরুকাবেলায় কালেভদ্রে আমরা ঘুমোই
অত:পর পান্থজনে বিড়ি টানে
নুনে-ভাতে নিকোটিনে কাটে দিন
আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল
সতেজ সবুজ ঘাসে ফড়িংয়ের গল্পগুলো ঘুমের স্রোতে-


ঘুঘুজন্মের চিঠি

লক্ষ্যবিন্দুর ঠিক কাছাকাছি এসে আমি সাতটি ঘুঘুর
সম্মিলিত ছায়ার মধ্যে আটকে যাই, অত:পর
মানবজন্মের অদূরে দেখি- নদী নেই, পড়ে আছে
বালকদের হৈচৈ স্নান-

প্রতিবেশিনী ভোরমাফিক জার্সির তলে হ্রেঁটে যায়
আর বরফকলের পাশে ভিটামিন-সি-এর মতো কুয়াশা
এই ক্যানভাস ধরে রান্নাবাজ শালিকটি এসে বসুক—

বর্ষা নিযে গাভী-মার্কা পোস্টার,
দূর থেকে বাইকে চড়ে বৃষ্টি আসে ঝমঝম
মনতলের সব ঘাস ভিজে যায়–
ঘুঘুজন্মের চিঠিটি আসে ‘ আমারে ঢাকি দাও’-এর মধ্যে
মানপাতার ২য় পত্রের পরীক্ষা শুরু হয়, আমাদের এই অলিখিত
ছাতাবন্ধু বেঁচে থাক সমস্ত বর্ষার আঙিনায়-


গোল চাঁদের প্যারাস্যুট

এই মরণবিম্বিত সন্ধ্যা যেন ভাসমান একটি অচেনা জাহাজ
যার নাবিকেরা সবাই অন্ধ…

বনসাই পাকুড়তলে টানাটানির দিন
খেত ও জলের দিকে বদ্ধ আড়তের ছায়া—

যারা সন্ধ্যা নামালো গোলাপের ঠোঁটে
তারা এখন গোল চাঁদের প্যারাস্যুট নিয়ে নেমে পড়বে
ওঝাদের জলের স্মৃতিতে–


সাঁতার না-শেখা হাতগুলো নিভে নিভে নকটার্ন

ভাঙা পাড়ে খেলা করে উচ্ছ্বাস-ভরা সওদাগরী ছায়া, যখন
জলের দারিদ্র বুঝে কতিপয় জল-পাখি উঠে আসে ডাঙায়
আর বৈকালিক মাঝিরা চলে যায় প্রাণায়ামে জীবনের ভারে-
শ্রেণী আর শত্রু নিয়ে শেষ হলো অভিনব শাস্ত্র ঘাঁটাঘাঁটি
গণিতের মর্মকথা ভুলে যায় বর্ষাবৃত্ত মন ;
মাত্রা-ভাঙা সময় থেকে আবারো উড্ডীন হারানো সাকিনে
পাতা ঝরলেই বুদ্ধের চোখে আটকে যায় বায়োডাইভার্সিটি

২)
পুরনো আকাশ  কিংবা কোনো অশীতিপর মেঘ  আজো
দাঁড়িয়ে থাকে লটকনের ডালে, ভিটামিন সি-এর জন্য
বুনো বাতাসের আহাজারি, চৌকাঠে সার্কাস ও ডামি কিছু
ঘাস, ভেঙে যাওয়া প্রার্থনা উড়ে স্বৈরতন্ত্রের গুহায় আর
অধরা সংবেদে ভিজে যায় প্রতিমার স্বধর্ম প্রগতি দ্বৈরথে-
মর্মার্থে বোঝা যায় কবির জানাযায় থাকে না শব, কফিনের
শেকড়ে-বাকলে উলঙ্গ ডানায় উড়ে অর্ধমৃত কাপালিক বক

৩)
বারান্দায় মোষের হুঙ্কার, সৃষ্টিজনিত উড়াল, ছদ্মনামের বৃষ্টি
বিভ্রমে উড়ে কত মদ্যপ ঘুড়ি লাল নীল সুতোর থাবায়
চোখের রেটিনায় নবকুমার কিংবা জাদুবাস্তবতা
হাত ঘুরে ঘুরে ভীমসেন যোশি … অমরত্বে যাও হে শ্রাবণ-
অন্ধকারে বসে আছেন কনফুসিয়াস জলের কিনারে আর
সাঁতার না-শেখা হাতগুলো নিভে নিভে নকটার্ন
একটি আনন্দ-রাত ডেকে আনে ফুল্লরার সাদাকালো শৈশব


কোয়ান্টাম সিঁড়ি

এ পুরনো দেহ ধুয়ে-মুছে তোমার দিকে এগোচ্ছি_
সন্দেহ পিছনে পিছনে হাঁটছে, আর তুমি দোযখের
কোয়ান্টাম সিঁড়ি ভেঙে অলৌকিক মথের ডানায়
এঁকে দিচ্ছ শালবনের হারানো ছায়ার মৃদু সংগীত…
ঐ যে উজ্জ্বল ব্যাকটেরিয়া
সাঁতার ও দৌড়,
ওদের মতো দাঁড়িযে দ্যাখো ঝিনুকের প্রাণখোলা রাত
পরিমিত আকাশ নিয়ে স্যাকরারা পুরনো খেলায়-


ফলিত রসায়ন

ডিঙি নাও রূপগঞ্জে যায়— সরোজিনী দুপুর কাঁপে জলে
পূর্ণিমায় সরল বৈঠায় ছলকে ওঠে জল,
জেগে ওঠে রাতজাগা মাছের প্রতিভা
পাশাপাশি দুলে ওঠে-
‘ভাসিও চোখের জলে বাগানের একলা ছায়ায়-’

ওগো রূপের মাইয়া, আকাশের ভঙ্গিমা না বুঝে
মেঘ হতে চেয়ে তুমি বিনিদ্র লণ্ঠন
হযে সাতরঙ অন্ধকারে
খুঁজে বেড়াও গোপন খেতের শাকপাতা, স্মৃতি-
রূপশালি ধানের শোকে পাগলাগারদের নৈ:শব্দ্য বাড়ে,
আমড়াগাছের ছায়ায় দাঁড়ানো পুরোহিত জানে-
মাড়ভাতে ডুবে আছে শালদুধ, ফলিত রসায়ন


হেমন্তের গোপন ডেরায়

হাত বাড়িয়ে দিই কিছু বাউলা পাখিদের দিকে
ওরা আসে না, শুধু ওদের বিপন্ন কোলাহল কিংবা
পালকবিম্বিত রেকোয়েম গড়িয়ে গড়িয়ে
স্যাড মেলোডি হয়ে জেগে থাকে আকাশের কোণে
ওরা কাশফুল মেখে বাতাসে তন্দ্রা ছড়ায়
হেমন্তের সঞ্চারী হযে ফিরে আসে পাতার আড়ালে-
পালক উড়ে, ক্ষত চিহ্ন বুঝে যায পথের রঁদেভু
জীবন থেকে খসে যায় আশ্বিনের গান
গাছেদের পদায়ন, পাতার উপমা–
দুপুরের গাঙেয় বিষাদে কোথাও মিশে আছে আহত
পাখিদের কলতান; আমরা আজো সূর্যের অদৃশ্য
ব্যাকরণ নিয়ে বিহঙ্গ-চেতনার কোল ঘেঁসে হেঁটে যাই
মেলোডিক অন্ধকার, ঝরাপাতার কনসার্ট
সব পেরিয়ে এবার ঠিক ঠিক চলে যাবো হেমন্তের গোপন ডেরায়-

১০
রাতের সমস্ত ফিসফাস

গোধূলি রঙের পিরান পরে নামছে আঁধার
ভাসমান পল্টুনে রসিক জোনাকিরা কিছুটা
একে অপরের স্বাস্থ্যগত ত্রাণ নিযে ব্যস্ত-

জ্বরের গোরলাগা নারকেল পাতারা
বনের আড়ালে কিশোরী জোয়ান বায়েজের
শীতের গীটার, কিংবা মেধার করতলে
আয়ুরেখা বরাবর মটরশুঁটির লতানো সাঁতার-

চায়ের আড্ডায় মধ্যরাত ঘুরে যায়-
রাতের সমস্ত ফিসফাস একা হয়ে গেলে
তোমার সিঁদূর নিযে অনন্ত ভোর কেঁপে ওঠে,
ওদিকে রোদ ব্যাকরণমতেই ডুবে যাচ্ছে
ডাবগাছের রূপসী মেজাজে–

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E