৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৩২০১৬
 
 ১৩/১২/২০১৬  Posted by
চন্দন চৌধুরী

চন্দন চৌধুরী

চন্দন চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা


জন্ম

শব্দ আমার কাছে শৈশবের লাটিম, হাতের তালুতে রেখে অবাক বোলাতে পারি।

দেখো ঐ যে হিজলবন, যার গোপন করোটি খুলে যারা উপভোগ করেছিল বালিকার সমগ্র বেদনা; গ্রামাঞ্চলে একদিন এইসব জিরাফের মুখে কাফি পরিয়ে দিতেও আমি ব্যবহার করেছি লাটিমের রশি।

এরকম প্রতিটি ভাবনা এক-একটি আলোর চিরুনি।

নিরীহ উরুর কাছে প্রতিভা প্রার্থনা ক’রে যারা নেয় গলিত করুণা, তাদের কাছে শব্দ কপট পিপাসা। আর আমি জানি নারীর শান্ত বুকে প্রার্থিত শব্দ নাড়াচাড়া করলে জেগে ওঠে পৃথিবীর প্রাণপুঞ্জ; শ্যাম্পেনের ফেনার মতোই অলৌকিক চুম্বনচিত্র।

শোনো, প্রতিটি বাক্যই বাসন্তির গায়ে প্রথম স্পর্শ।

হরিণীর সমস্ত পেয়েও আমি সম্ভোগ শিখিনি; অথচ তার গর্ভেই জন্ম নিয়েছে আমার সমস্ত কবিতা।


সর্বাংশ

তোমরা যাকে সূর্য বলো চাঁদ বলো—আমিই তাদের জন্মদাতা; এবং তোমাদের এই পৃথিবীকে আমিই জন্ম দিয়েছি।

আমার হাতের মুঠোয় সহস্র মহাকাশ খেলা করে, একেকটা মাছের মতো শূন্যে ঘোরে ছায়াপথ।

এইসব সবকিছুর মধ্যেই আমি আছি; আমার অংশই বিস্তার করে আছে পরম পর্যন্ত।

তোমরা ভাবছো আমার জন্ম হলো কিভাবে? মৃত্যুর জন্যই জন্ম হয়েছে আমার। আর মৃত্যুর জন্ম হয়েছে আমার মধ্য দিয়ে।

তুমি কি জানো, তোমার মধ্যেও যে আমি আছি! এবং তোমাদের ভেতর ঢুকে আছি অজস্র অজস্র আমি।

তুমি আমি মিলে যে অজস্র এক আমি, সেই আমিটাই জন্মদাতা। সেই আমিটাই সূর্যকে জন্ম দিয়েছি, পৃথিবীকে জন্ম দিয়েছি; সমস্ত কিছু আমারই মধ্যে অন্তর্লীন।


দূর অসম্পর্ক

ছুটন্ত ঘোড়ায় বসে যারা স্থিরতার কথা বলে, যারা বলে দূর বলে কিছু নেই, আমি হয়তো তাদেরই কেউ; কেননা আমার কাছে যা দূর, তোমার কাছে হয়তো ততই নিকট।

যারা সূর্যকেও দেখে নিতে জানে পুড়িয়ে আঁধারে—আমি হয়তো তাদেরও কেউ; কেননা আমিই অনেক গ্রীষ্মে পুড়েও জল হতে পারি, ঠোঁটে তুলতে জানি বরফের গান।

আমি জানি কিভাবে নিজের ভেতর নিজেকে ঢুকিয়ে বেলুন সাজতে হয়, কিভাবে ভাবনার বিস্ফোরণে ধমনীর ভেতর চালিয়ে দিতে হয় বোধের নৌকো।

দূর বলে কিছু নেই, তোমার ভেতর বসে ধ্যান করছি যখন।


কারণ

আমিই সেই রাক্ষস, যে নিজেকে খেয়ে খেয়ে বেঁচে থাকি, নিজের কবরে বসে করি গোরখোদকের গান আর হেসে ওঠি পৃথিবীর মানুষের মতো, কখনো কাঁদি ইচ্ছে করেই।

আমিই সেই ভয়াল, নিজের মধ্যেই বাস করে যার মৃত্যু, যার নিজের বিষের দংশনে নিজেই জর্জরিত হয় আর মৃত পালকের মতো উড়ে যায় অচীন এক অদৃশ্যের দিকে।

তবু আমাকেই আমি আমার সহস্র হাতে জাপটে ধরে রাখি, সময় যেভাবে নিজেই বেঁধে রাখে সময়কে।


তুমি দিয়ে তৈরি

ভাবতেই ভালো লাগে একটা ট্রেন পুরোটা আমার। সব বগি, সময়, পুরোটা আমার। ভাবতেই ভালো লাগে ট্রেনের সব বগিতে শুধু তুমি আর আমিতে ভরা।

একটা স্টেশন চাঁদরাতে পুরোটা আমার। আমি স্রেফ একটা স্টেশন, সেখানে শুধু তুমিতে তুমিতে ভরা।

কিংবা মনের উঠোন ভরা তোমার পায়ের ছাপ। ভাবতেই ভালো লাগে এই আল্পনা মানেই তুমি, মানেই আমার মনের শস্যক্ষেত। আজও সাজ মানে তুমি। একটা শিল্পের শস্য তোমার দিকে চেয়ে হাসলে আমার কী করার থাকে! কী থাকে বলো! আহা, এই যে আমি কত কত তুমি দিয়ে তৈরি!


পরিমাপ

জীবনের শেষ চুম্বনটুকু তুমি কার জন্য গচ্ছিত রেখেছ? কোন অধরের থোকা থোকা ঝুলন্ত আঙুরের পূর্ণ নীরবতা কেড়ে নিতে দৃষ্টি বাড়িয়েছ প্রকৃত উৎসের দিকে?

নীল পাথরের ফুল দিয়ে ভরে ওঠা নদী কোনো দিন চুম্বনের ভাষা বোঝে না; আবেগের দ্রাঘিমা মুছে এবার পৃথিবীর যথার্থ পরিধি মাপো।

দেখো, জীবন একজন মানুষেরই সমান; তথাপি একটি চুম্বনের মুহূর্ত থেকেও অসংখ্য জীবন কত ছোট!


শুধুমাত্র সাধারণ

শুধু সাধারণ হবার জন্য সময়কে তাড়িয়ে দিলাম নিজের ভেতর থেকে, এভাবেই তৈরি হলো গতির নিয়ম; ভেতরের অপার সৌন্দর্যকে দিলাম ছুঁড়ে ওই শূন্যতার দিকে, দৃশ্যে দৃশ্যে রচিত হলো জগত;

আহা, শুধু সাধারণ হবার জন্য অভ্যন্তরের সমস্ত সুধা ছড়িয়ে দিলাম বাতাসে, গন্ধে গন্ধে ভরে উঠল পৃথিবীর কূল; আর আমার ধ্বনিপুঞ্জ ভেঙে চুরমার করতেই সশব্দে ফেটে পড়ল দুনিয়াটা;

হুম, শুধুমাত্র সাধারণ হবার লোভে আত্মাকে বের করে ছুঁড়ে দিতেই জন্ম হলো অবারিত প্রাণ; এবং লাবণ্যকে ঝেড়ে ফেলতেই রঙে রঙে অপূর্ব হলো চারপাশ;

হয়তো আমার সাধারণ হবার জন্যই নিজের ভেতরটা উড়ে গেল বাইরে, এবং পৃথিবীতে তৈরি হলো যাবতীয় সম্পর্ক; আর এই সাধারণ হবার আশায়ই আমি মাথা গুঁজলাম ঘাসের ভেতর, আমার ওপরেই পড়ুক জগতের সব পায়ের বেদনা।


কফিন

সকাল থেকে হাসির রেখাটা ঝুলে আছে দয়ারামের মুখে। অনেকদিন পর দেখা গেল এই ঝিলিক। তার হতকিচ্ছিরি মেজাজে এতদিন কেউ কথাটি পর্যন্ত বলতে চাইত না। দেহটা লিকলিকে, বর্ণটাও শ্যাম, এর ওপর মুখটা থাকত কুমড়োর মতো। কিন্তু ওস্তাদ লোক বলে কেউ ঘাটাত না। আজ এমন উচ্ছ্বল স্বভাব দেখে তার দিকে চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে বাকিরা। মানে সুবল, গণি আর বাসুদেব। বলা যায় সাহসও পাচ্ছে। সুবলই বাসুদেবের কানে ফিসফিস করে, ‘মনে হয় ঝামেলাডা মিডছে।’

বাসুদেবের এক সমস্যা, একটু পর পরই লুঙ্গির গিঁট আলগা হয়ে যায়। সামলাতে গিয়ে বারবার উঠে দাঁড়াতে হয়। বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর ঠেকে দয়ারামের। অন্যদিন হলে দু-একটা ধমক লাগিয়ে দিত, ‘লুঙ্গিটা কোমরে দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখতে পারছ না।’ আজ কিছু বলল না। সুবল ঠিকই বোঝে। এর মধ্যে লুঙ্গিটাকে শক্ত করে গিঁট দিয়েছে বাসুদেব। আবার হাত লাগায় কাজে। গণিটা বোকার হাড়। কে কী বলল, এসবে কিছু যায় আসে না। কোনো ভুল কাজের জন্য ওস্তাদ যখন তাকে ধমক দেয়, তখনও বোকার মতো হাসে। এতে আরো বেড়ে যায় দয়ারামের রাগ। মনে হতে থাকে তার চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেছে জ্বলন্ত চুল্লির আগুনের মতো। মাঝে মাঝে গাল বরাবর একটা কষে চড় দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু সে জানে, নির্বোধটাকে ধমক দিয়েও লাভ নেই।


জলের রাখাল   

বাবা আমার নামে রেখে গেছেন একটা কলমিলতার ঢল। বর্ষায় বাড়ে, বোশেখেও তিরতির।
নদী শান্ত হলে জলো-আয়নায় কলমিলতার ছায়া যেন ঈশ্বরের মুখ। ঠিক পাশে চোখ তুলে ঘন নীল আকাশের চিতা।

আমিও কেমন, ভর্তি হয়ে গেছি জলেদের ক্লাসে, আশেপাশে সন্ধ্যার হাহাকার, কোত্থেকে কেমনে যেন খুব বাজে যাত্রীহীন হাসি। লঞ্চগুলো চলে গেলে কলমিতে কচুরিতে চলে কানামাছি চুমো। কী নির্দোষ চমৎকার, এইসব ইতিহাস লিখে রাখি জলের রাখাল।

বাবা বলতেন, কচুরিপানার ফুলে অন্ধ হয়ো না ভুলে; ভেবো না এ শোভাপুর, জয়শ্রী রেশম। মনে রেখো, হিরণ্ময় পাত্রে রাখা এ-এক উচ্ছিষ্ট কষ্টের গান। বরং পান করো ক্ষণকাল মুগ্ধতার ফেনা।

বাবাকে বলিনি, এই ফুল দেখিনি কোনো নার্সের আত্মায়, এ শুধু ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ডিউটি ডাক্তার হয়ে যায়। জানো, তুমি আমার জন্য রেখে গেছ হৃদরোগ পানকরা এক সবুজ ডায়নামো!

প্রাণেতে মুগ্ধ আমি, কলমিলতার শেকড় খেয়ে বেঁচে আছি এক নাইলোটিকা মাছ।

১০
অহেতুক ব্রাত্যকথা: এক

শব্দচেতনার দিনে উদাসী সাম্পান ভরে কেউ ঠিক নিয়ে যায় আমাদের কেটে রাখা ধান। তবু তার বাক্যে শুনি উপদেশকথা ‘হাঁটু সোজা করে বসো, ঝরে যাবে ভ্রমমাল্য, নয়ত বা ঝরে যাবে যুবতী ফসল।
আমরা তো এমনিতে ঝরাফুল, বর্গাদার কিছু। শোনো জমিদার, আমরা ছেড়েছি সোহাস বহুদিন আগে। আমাদের সোহাগ এখন তোমাদের ঘরে।

১১
জলপাই রঙ-এর নঞর্থক দিক

২. অলীক বীক্ষণ

আমি দেখি জল থেকে উঠে আসে, মাটি ভেদে উঠে আসে; যেরকম আমার অনুজ শৈশবের শীতে একরাতে দেখেছিল পাঁচটি আঙুল শ্যাওলার মতো রঙে নখের তুমুল দাঁতে নিয়ে যাবে প্রাণের পলাশ।
আমি সেই আজগুবি শীতে কাঁপি, হয়ত আমার পেছনেই ঠিক লেজুড়ের ল্যাং মেরে হাসবে সেই অজগর, রাতের আকার। তাই ‘আমাকে পাবে না কেউ…’Ñএই ডানা খুঁজি কিংবা করি গতির সন্ধান।
ওরাও উড়তে জানে, নামতে জানে প্যারাট্রুপারে এবং অহেতুক যে কারো ঘাড়েই বসে খেলতেও জানে নাকি হাড়গোড় নিয়ে।
ওই দূরে গলিটার মোড়ে একখণ্ড ছায়াবিন্দু আমাকে ডাকছে বুঝি সিভিলের বেশে।

১২
যাবে হে মাঝি, দিকশূন্যপুর

আমাদের নদীঘেঁষা বাড়ি ছিল স্বর্ণলতাপ্রিয়
অযথা থাকত তবু গুহামানুষের জ্বরে

পূর্বপুরুষের দল জীবনভ্রমণকালে
ভুবনবাতাস থেকে এযাবত বারবার পেয়েছিল জানি
        অশ্বক্ষুরের আওয়াজ
তথাপি তাদের প্রাণে কেন যে জাগেনি হায়
        ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা
            জয়-ইতিহাসগাথা!
দেখেছি মেলেনি ডানা একটিও মন

এত যুগে কত কত
সন্ন্যাসীর মতো গৃহী হলো বংশকাহিনীর কথা
আর মর্মে মর্মে লীন হরো বেনিয়ার ভাষা

বেনিয়া (!) নাবিকজাত, ওদের সমুদ্র ছিল
মাপত সঠিক করে গভীরতা কত

নদীর নিয়মে আজ সমুদ্র পেয়েছি
যাবে হে মাঝি, দিকশূন্যপুর!

১৩
ধানবউ

কৃষিপুর গাঁয়ে ও আমার ধানবউ, গৃহদিনে আয়
রাতজাগা শিখি, চর্চা করি পরস্পর

চাষে যদি দক্ষ হই
আগামী বছর তোতে ফলাব দেখিস
সোনারঙা ছবি
নিড়ি বেড়া পানিদান রবে অথৈ অথৈ

দিন যায় বেড়া খায় অনাবাদী পাল
ছাগল পাগল
সুরধর্মী বাঁশিয়লা নাকি মেধাবী রাখাল!?

ও আমার ধানবউ
বল তোরে খেয়ে গেল কোন টিয়াপাখি!

১৪
লেগে থাকা পাখির চঞ্চুর দাগ

স্তন পরীক্ষা করেই বুঝতে পারবে আমার দাঁতের ঝিলিক

আমি যে পাখির মাংস খেয়েছি তার চঞ্চুর দাগও সম্ভবত সেখানে আছে

সেইসব পাখিরা এখন তোমার স্তনে ঘুমোচ্ছে; এটা অবশ্য বিজ্ঞাপনের বিষয় হতে পারে

একটা পাখির অর্থ আকাশ হতে পারে

এবং তুমি কিংবা তোমার স্তন হয়ে উঠতে পারে পাখির অদ্ভুত আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

১৫
জোঁক ও ছত্রাক

এই যে আমি বসে আছি-এটা একটা খেলা
বসে থেকেই মানুষ জীবনের শ্রেষ্ঠ খেলাটা খেলে
পৃথিবীর সবচে দ্রুতগতির বলটা ছোড়ে
সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানের স্ট্যাপটা ভেঙে
    শূন্যে তোলার আনন্দ পেয়ে যায়

আমি অবশ্য এ মুহূর্তে ডুবুরিপোশাক পরে
    মাছ ধরার নিরবিচ্ছিন্ন কাজটি চালিয়ে যাচ্ছি
আহা! সোনালি রূপালি মাছ!
নিতম্বের বাঁকের মতো সমুদ্রতলের ঢালে
        পরিপূর্ণ মনোস্থির, পূর্ণমগ্নতায়;
তখনই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলি-
এবার বাস্তবে নিয়ে আসবো স্বপ্নের শরীর
খেলা শেষে ম্যাজিকের মতো যখন খুলে ফেলি হাত
    দেখি, মুঠোর সুড়ঙ্গমূলে জন্ম নিয়েছে
            জোঁক ও ছত্রাক

১৬
রবীন্দ্রনাথ

একটি অনঙ্গ চুম্বন আমাদের মর্মে বিঁধে আছে
মায়াভবনের পাশে চৈতপূর্ণিমায় যখন
    মেয়েমানুষের মুঠোয় শক্তি চলে আসে
বিদ্যুৎগর্ভ হয় তাদের চুল এবং তাদের ক্ষিদে
        রূপান্তরিত হয় শব্দে
তখন সমস্ত রাত্রির গন্ধ
আমাদের মধ্যে যার হাতে গিয়ে পড়ে
যিনি অনিবার্য শব্দের উঁনুনে ভেজে
আমাদের অন্তর্ঘাতে জমা করেন সমস্ত আড়াল
এবং আপ্রজন্মের জন্য তুলে রাখেন অবারিত
            নৈঃশব্দ্যের পরোচনা।

১৭
নস্টালজিয়ার অক্টোপাস

এক

কতটা অতীতাশ্রয়ী হলে ভিজি আবেগের রোদে!
বোঝো, গৃহকালে যতটা জমেছে স্থাবরের মেঘ
তারচে’ অধিক কিন্তু সূর্যদীর্ণ স্মৃতি
        সাবেকের হৃদ্যঋণ

বৃথাবাক্য নয়, আমাদের পাঁজরে পাঁজরে বাজে
ইতিহাসকণা অথৈ অথৈ

ঝংকারবিহিত রাত স্ত্রী-শয্যায় ছুটে
কালেভদ্রে কিনে নেয় অথবা শরীর

দুই

আজ চোখে চোখে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন জমা হলে
তুমি খুঁজে নাও বহু আগেকার ভাষা

এই নিরুত্তাপ চাষী
জানি উত্তাপের চূর্ণে গঠনের চাষ, যাই আদিকল্পে
আদ্যোপান্ত হয়ে যায় স্মৃতির পঠন

যেহেতু আকর এক এবং স্বপ্নচিহ্নিত দিনগুলো
ক্রমে ক্রমে পরাক্রান্ত হয়ে এলে
বিস্মরণ হতে থাকে বর্তমান-ভিত

আমরা যেতেই থাকি আমাদের সূত্রে…

১৮
ডাহুকমঙ্গল

রাত্রিতে ডাহুক ডাকে…অথচ আমরা ভাবি
             জৈবমুখরতা

নেমে পড়ি কচুরির জলে
ডানা ভেঙে ধরে আনি
        লঘুডাহুকের ছানা
ডাহুকদ্রৌপদী কেঁদে মরে তত
কয়েক কৌরবভাই হয়েছি উদ্যত

১৯
পাখিজন্ম

যে গেল হৃদয় ছিঁড়ে পাখিজন্ম দেখা পাব তার
অথচ পাখিরা নাকি জন্মবাদ নিয়ে মাথাই ঘামায় না!
            তুচ্ছ কামলীলা

আমাদের দেখা কিন্তু পাখিজন্ম হবে
            বুঝলে হৃদয়া!?

২০
কইন্যা বুদ্ধিমান

কনেকে জিজ্ঞেস করে—ঘাসের গিঁটেরা কত?
কন্যা কয়: দু’বাড়ির দূরত্বের পদ হয় যত

মাশাল্লাহ্! মাশাল্লাহ্! কইন্যা বুদ্ধিমান

প্রশ্ন আসে: তোমার মাথার চুল কত সংখ্যামান?
কন্যা কয় : আমাদের জমিখাতে ধরে যত ধান

মাশাল্লাহ্! মাশাল্লাহ্! কইন্যা বুদ্ধিমান

২১
স্বাধীনতা

করিনি হাড়ের চাষ, মাটিতে মুণ্ডুর বীজ পুঁতেছে রাক্ষস।
গোপনে দিয়েছে জৈবসার। শস্যের বয়স অস্থি-মজ্জাভারে
কী বীভৎস উর্বর! সৌন্দর্য এখানে বরং উজ্জ্বল অহঙ্কারে
মরেছে শ্যামল রাজ্যে; মৃত্যুতন্ত্রে গর্ভঋতুতে নেমেছে ধস।

দীপান্বিতার গলার স্বর্ণচেইন, চলার ঘোষক ঘুঙুর,
মাটির ব্যাংকে জমানো কিছু মুদ্রা পড়ে আছে খনির খননে।
সংগ্রামী কোরাস জন্মে শজারুর কাঁটা হয়ে বিদ্রোহী মননে।
কান্নারুদ্ধ বুকের বলয়ে গাজলিক উৎরোলের সমুদ্দুর।

দীপান্বিতা, কোথায় কলঙ্ক তোর! জ্যোৎস্নাময় সুবর্ণের দানা
হীরাদামি ত্যাগে, ভস্মস্তূপে বস্ত্রহীন স্পৃহার দ্রৌপদী তুই,
স্তব্ধতার মেঘে চেতনামুক্তোয় চিরায়ত রঙধনুর ভুঁই,
লখিন্দরের ভাসন্ত ভেলার বেহুলা, বাংলাদেশ নামখানা।

জোতের জমিতে কঙ্কালের কবি, পাই প্রচণ্ড স্পৃহার বোধ;
আক্রোশী টঙ্কার ধমনীতে শিরায় শিরায়, চাই প্রতিশোধ।

২২
কবিসন্তরণ

জুতার তলাকে আগেই উৎসর্গ করেছি রাস্তার নামে
ফিতা ছিঁড়ে পা ঘষছে
নাকে এসে সুখ তুলে চিট-মিঠাইয়ের ঘ্রাণ
ডাকনামে কড়া নাড়ে শৈশবের দিন
আলখাল্লা খুলে ওড়ে প্রজাপতিমন
দুয়ারে মায়ের ডাক
বড় বেশি অন্তঃক্ষরা হিমশৈলপুর
সম্মুখে প্রবল প্রাণ, গেয়ে ওঠে ধূলিমাখা অক্ষরের গান

২৩
পাথরকুচি

একবার জলের দিকে চেয়ে
একবার নিজের দিকে চেয়ে দেখলাম
যেন এক প্রাচীর পাথর কতকাল
মুখের আভায় লুকিয়েছিল
আজ টুপ করে জলে পড়তেই
হয়ে গেল মায়াময় এক দৃশ্য
জলের আমিটাকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখে
আলতো পরশ বুলিয়ে
অনেক কাঁদলাম, আর ভাবলাম
আমার ভেতর যে অগোচরে এক পাথরকুচি জন্মেছে
আমিও কি জানি!

২৪
ভেতর

কখন যে নিজের ভেতর ঢুকে গেছি
কখন যে নিজের ভেতর ঢুকে
নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত আমিটা
হারিয়ে গিয়েছি বনহরিণের পায়ে
কখন যে নিজে ছুটতে ছুটতে নিজেকে পাইনি
সেই সব সময়
সময় যখন আমার আমার চেয়ে দ্রুতগামী ছিল
সময় যখন আমাকে ছাড়তে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল
সেই সময়—তুমি যখন তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে
আমার ভেতর ঢুকে পড়েছিলে

২৫
তারকা

যে বিজয়ী হয়েছে, মঞ্চে দাঁড়ানো
তার মুখ উজ্জ্বল
চোখের তারাগুলো ঠিক নাচছে
পুরস্কারদাতার মুখেরও মিষ্ট হাসি
আর যে ভাষ্যকার কথা বলে ফাটিয়ে দিচ্ছেন
আমার চোখ কান এদের কারও দিকে গেল না
চোখ গেল পাশ্ববর্তিনীর দিকে
সেই সৌরাঙ্গী, যে কোনো লোভ ছাড়াই
পুরস্কারের ট্রফি আর মেডেল বহন করে।

২৬
খুনি

খুন করার পর নিজেকে বেশ পুণ্যবান মনে হচ্ছে

খুনেও এত আনন্দ!
তা-ও দিনদুপুরে আস্ত একটা খুন
                      প্রকাশ্যে ফুলরঙের উজ্জ্বলতায়!
 

কাল পত্রিকায় ছাপা হবে
একজন আদর্শ খুনির ছবি ও খুনের ঘটনা
সাংবাদিকরা অবশ্য রসটস দিয়ে ভালোই লিখবেন
পোজ দিয়ে দু’একটা ছবি তোলা থাকলে ভালো হতো

কিন্তু শালা থানাটাকেই মনে হচ্ছে ধর্মশালা
পুলিশ আমাকে দেখেই বলল—এখানে খুনির জায়গা নেই
                                    দয়া করে সংসদে যান

 

২৬
জীবনসূত্র

একটা চুমুর বয়স থেকে মোটেও বেশি নয় আমার বয়স
তোমরা যারা আমার বয়স হিসেব করে ভাবছো
                       জীবনটা স্রেফ ১০০ মিটার দৌড়
এবং একটা প্রজাপতি উড়াল
তাদের বলে রাখি শোনো—
জীবন সন্তানের মতো, তাকে জন্ম দিতে হয় বারবার

একটি জীবনে যার ষাটলক্ষ বসুন্ধরা থাকে
তাকে শুনতে হয় না জমিদারবাড়ির পাখিদের ঠাট্টা
সে এমনিতেই পেয়ে যায় আশ্চর্য এক গল্পের দোয়াত
যার ফোঁটায় ফোঁটায় জন্ম নেয় এক-একটি চুমু

চুমুর যুদ্ধে হেরে যাওয়া জীবন নিয়ে
যারা এখনো দেখে যাচ্ছ মুদ্রার অহেতু নাচ
শোনো—আমার দাদীমা এক রাক্ষুসীর গল্প বলতেন
                     একটিও দাঁত নেই, অন্ধও সে
অথচ তার চোখের জল থেকেই নাকি জন্ম নিয়েছিল
                                   পৃথিবীর প্রথম নদী

সেই নদীতে ডুব দিয়ে দেখ, তুমি শুধু অজস্র জীবনের গল্প

২৭
প্রকাশ

রাগিও না, নক্ষত্র ছেপে দেব।

সেই যে মিনুদি, কৈশোরের গল্পচ্ছলে
দেখিয়েছিলেন দুধাল কোমর
এর আগে বুঝিনি
মানুষের শরীরে যে নদী বাস করে
শোনা যায় ঢেউয়ের আওয়াজ।

রাগিও না, বলে দেব সেই কথা।

২৮
ছিনতাই

ব্যাপারটি ছড়িয়ে পড়ল একটি সংবাদ হয়ে, অর্থাৎ
সন্ধ্যাটি ভূমিষ্ট হলো মানুষের মুখে মুখে বহুবার
আর আমাকেও কত কত বার করতে হলো পবিত্র গ্রন্থের মতো পাঠ
কিভাবে কোথায় আমার ভালোবাসার সঙ্গিনীকে ওরা ধরে নিয়ে গেল এইসব…
অথচ আমি শুকনো মমতা বালির মতো বুকে লেপ্টে দেখছি-
বাতাস আমার সাথে আর কোনো গল্প জুড়ে না, প্রচণ্ড রাত
মায়ায় জড়িয়ে গ্রহণ করে না আর নতুন নিমেষ গানে
একটি পাতা ঝরে যাবার অর্থ একটি মৃত্যুর কথা জেনে যাওয়া
ভগবতী-
এইসব তনুকথা, সহস্র মুখ বাঁচিয়ে কে দেবে আমায় বলো?

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E