৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ১৫২০১৭
 
 ১৫/০৮/২০১৭  Posted by

পরিতোষ হালদার-এর “মা সিরিজ”


মা ও আপেলের ঘুম

মায়ের আঁচল থেকে টুপ-টাপ খসে পড়তো সংসার, দিদিরা তা কুড়িয়ে এক্কাদোক্কা খেলতো।
আমি ভাবতাম সংসার বুঝি খেলা।
বাবা বলতেন- সংসার একটি বিজ্ঞান।
মা বিজ্ঞান জানতো কিনা জানিনা,
তবে সে যখন সারা বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের মতো হেঁটে বেড়াতো তখন যাবতীয় গতির সূত্রগুলি তার পিছে পিছে দৌড়াতো।
আপেলগুলি মাধ্যকর্ষণের মতো ঘুমিয়ে থাকতো আলমারিতে।
একদিন মাও ঘুমিয়ে গেলো। কী দ্রুত উড়ে গেল একটি ডানাওয়ালা ঘড়ি।
আজ সমস্ত বোধ তার কবরের কাছে স্তব্দ হয়ে যায়।
আর সে বিজ্ঞানের সীমায় অদৃশ্যমান এক নদী।


সপ্তম

খুব কাছে ছায়া, দূরে দীর্ঘশ্বাস……
সেই থেকে তুমি জলতরঙ্গ, তুমি ব্রহ্মপুত্র; তৃষ্ণা দাও, কেবল ঐশ্বর্যে বাঁধ।
কিছু সন্ধ্যা ছিল, যেখানে চারুপাঠ শেষে স্বরগুলি ভরে যেত। তুমি তার প্রথম গতি,
ক্লাসভর্তি অজস্র রোলকল।
কোলাহল ফুরিয়ে গেলে ধ্যানমগ্ন নির্জন রাত।
তরলবৃত্ত ভেঙ্গে জেগে ওঠে প্রাণ, আমাদের উচ্ছ্বল শ্রাবণ।
পাঁচটি নদীর জলে তুমি সপ্তম সুর, আমার শেষ ছলাৎ-ছল।


মা ও সাদাফুল

তুমি ছিলে এক অদ্ভূত বর্ষাকাল।
দশ আঙুলে স্নেহের শব্দ, কেবল ঝমঝম নির্জনতা।
আমরা কাগজের নৌকা বানাতাম, আর উঠোনের শ্রাবণে তা ভাসিয়ে দিতাম নানা বাড়ির দিকে।
তুমি খেলা দেখে কেমন করে জানি হেসে উঠতে।
একটা কামিনী গাছ, যাকে তুমি বড় করেছিলে-
যে গাছের তলে দূপুরদানার মতো শৈশব হয়ে যেতে, বিকেলে ছড়িয়ে দিতে কন্যাকন্যা উৎসব।
সেই গাছে আজও ফুল ফোটে, সাদাসাদা পরীর মতো।
তুমি ওই গাছে চারুফুল হও, একবার মা হয়ে ফোটো।


মা ও দীর্ঘশ্বাসের বর্ণমালা

তুমি দীর্ঘরেখা, তোমার টানে আমিও ত্রিভূজ। সমকোণে লাল-নীল অমরত্ব, প্রাচীন স্নানের মতো অন্ধকার।
অবঘুমে রাত ছিল- তুমুল সোহাগ শেষে আমরাও একা, ঈর্ষা ভেঙ্গে করতলে জমা হতো রূপ।
প্রথম অক্ষর তুমি, স্বর ও ব্যঞ্জনে অজস্র রঙ। দিগন্তে আঁচল ওড়ে, অরণি অঞ্চে জাগে নতুন সকাল।
তোমার শরীর কিছু অবগুষ্ঠিত অণুপলবেলা।
মা, বর্ণমালা হও; একবার দীর্ঘশ্বাস বলে ডাকি।


দীর্ঘশ্বাসের আয়না

তোমার তাকিয়ে থাকা কিছু পাখির উড়াল; টুপটুপ ঝরে যাওয়া শিশির-
টুপটুপ বকুলফুল।
মা, তুমি এক মূহুর্তে অনেকগুলি বসন্ত।
আয়নায় তোমার চোখে রোদ ফেলতাম, তুমি লাজকন্যার মতো হেসে উঠতে।
সামনে দাঁড়ালে অবতল কাঁচ-
আহা, তোমার ভেতর কী স্বচ্ছ আমি।
আমাদের চারপাশে অজস্র দিক, অজস্র দীগন্তরেখা।
যতোদূর চোখ যায়, পাখি যায়- যতোটা বকুল, ততটা শব্দ ফোটে।
মনে হয় এখনো সোহাগবেলা।
আয়নায় রোদ মাপি, আয়নায় দীর্ঘশ্বাস……।


মাতৃ

জুঁইফুলে যতোটা সাদা, তারও অধিক তুমি, ঋতু বদলানো উড়ালরেখা।
নাকফুল ছোঁয়া রাতে জোনাকীর উতালপাথাল।
প্রথম ঐশ্বর্য্য তুমি, তবু এতো কান্না কেন মা !
জানলায় দাঁড়ালে চোখে চোখে সেইসব উষ্ণ, সেই পুরানো স্রোত।
একবার পাণ্ডুলিপি, একবার সুবর্ণরেখা।
তোমার মা ছিল অশ্রু, অন্ধকারে হেলান দিলে পাতাঝরা শব্দের সই।
আর মেয়েরা- তারা মেঘ, আজো চাতকপাখি।
তোমাদের সমুদ্র কি সংসারের মতো- লম্বা আর থৈথৈ জল।


তৃতীয়মাত্রা

এরকম মৌন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, যেন মেঘ ফিরে গেলে তুমিই বৃষ্টির ছোঁয়া।
তোমার অশ্বত্থে আমরাও সবুজপাতা।
হাত খুলে দিলে পাঁচ-পাঁচটি আঙুল- আঙুলে জলরঙ; একটানে এঁকে ফেলো স্নেহ।
একটা ইজেলে আধার- একঅক্ষর তুমি মা।
তৃতীয়মাত্রায় ছবির জগৎ, জন্মান্তর খুলে দেয়া শষ্যের মাঠ।
তোমার বাগান ভর্তি অজস্র অহম, কুড়াতে কুড়াতে ছড়িয়ে যাব আমার শৈশব।


তারাখসা আলো

কোথায় আকাশ- দৃষ্টির সীমায় নীলনীল রঙ; তোমার চোখের মতো অজস্র স্নান।
তারাগুলি নারী, মা হয়ে ফুটে থাকে দূরে।
তুমি চাঁদ ডাকতে আর চাঁদের গায়ে লাগিয়ে দিতে আলো।
কপালে টিপ নিয়ে আমরাও একা।
অরণ্যে কতো পথ, কোন পথে গেলে মা।
তুমি আজ চারুলতা তারা, আহা তোমাদের নক্ষত্রববীথি।
তবু তারাখসা তীব্র নিয়ে এসো, জোনাকীরা তোমার প্রতীক্ষায়।
টুপটুপ শিউলীর বনে একবার মা হয়ে জ্বলো।


ছায়া

রোদ্দুর কুড়াতে গিয়ে দেখি অজস্র ছায়া। তুমি লালরঙে হেসে উঠতে, লাল আলো-ছায়া।
বিকেলগুলো উন্মাদের মতো আর সন্ধ্যায় চারুপাঠ খুলে যেতো।
পড়তে পড়তে জেনে নিতাম, যেকোন ইস্কুলে তুমিই প্রথম।
রোদ্দুর জমাতে পারিনি, তবু পুঁজি থেকে হারিয়ে গেলে তুমি।
বাদামের পাতায় পাতায় আজও স্মৃতির হাওয়া, আজও প্রতি ঘরে জন্মের উৎসব।
তোমার থেকে আমি, অথচ নিজের ছায়া তোমার মতো নয়।
এখন দ্বৈত আসুক, আমার ছায়ায় তুমি একজন হও মা।

১০
সোহম

কোন উদভ্রান্তি নাই, চন্দ্রমল্লিকার পাশে সাদাসাদা ঘুম। সেতারের কোন তারে বাঁধা, না কি তিন তারে তুমিই মল্লার।
কতোটা বিজ্ঞান শেষে তোমার বাড়ী-
আমারও অরণ্য ছিল অথচ, কোন টানে উড়ে গেলে দুধভাত পাখি; এলাচ গন্ধের মা।
অজস্র বর্ণে ছিল মহুয়ার হাওয়া, দীর্ঘশ্বাসের মতো অপার ভ্রমণ।
প্রতিটি মূহুর্ত তুমি- ঘড়িতে মায়া-মোহ আর মমতার কাটা হয়ে ঘোর।
প্রতিঘণ্টায় বেজে ওঠুক তোমার সোহম।

১১
জুঁইফুল

আমার অঞ্জলি ভরে যেত ফুলে, ফুলগুলি জুঁই।
হাতের রেখায় রেখায় কী তুমুল তোলপাড়, ভাগ্য আর হৃদয়ের ঘরবসত।
এভাবে শৈশবের সাদারঙ উড়ে যায়…. উড়ে যায়….
জীবনের জল ভাসে- জলের দুইপারে আমাদের সংসার। কোন কোন নদী একা যায়, একা ফিরে আসে,
মায়ের নামের মতো গঙ্গাধারা।
অথচ তোমার মুখে মাতামহীর ছায়া- তিনি জুঁইফুল।
মেয়েরাও মায়ের আদল- তুমি নৈরঞ্জনা নারী।
কে জানে, কতকত জুঁই আলো হয়ে ফুটে থাকে সময়ের গাছে।

১২
জিরো দীর্ঘশ্বাস

তোমার সেলাই করা দুঃখগুলি আজো দরজায় দোলে। পর্দায় বাতাস এলে দেখি কী বিমগ্ন
উড়িয়ে গেছ একা।
নদীতে ভাসিয়ে দিতে জল, কিছুটা পশ্চিমে চুমু খেতো হহাকার।
কি জানি তোমার কৌশোর কেমন ছিল; কেমন মাচিয়ে বেড়াতে দোতালা বাড়ি,
না কি কলেরগানে সাথে গোটা দূপুরবেলা।
শানবাঁধা ঘাটে কতোবার আছাড় খেতে বালিকা !
আমাদের ভ্রমণ ছিল- জোড়াসাঁকো পার হলে কী বেপরোয়া গতি- ওই তো বাপের বাড়ি- বাড়ির সামনে মা।
আহা- মায়ের কাছে কেমন চারুশিশু তুমি।
অথচ, আজ তুমি একাই একটি বর্ষাকাল, আকাশ-পাতাল জিরো দীর্ঘশ্বাস।
একবার জন্মান্তরে এসো- আরো একবার কান্না হও, আমার কন্যা হও।

 


পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার। জন্ম বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার আন্ধারমানিক গ্রামে। পিতা মতিলাল হালদার, মা চারুবালা হালদার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর কলেজে অধ্যাপনারত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কবিতা: আগামী যুদ্ধের তারিখ (১৯৯৩); শব্দজলের ছবি (১৯৯৫); উত্তর বয়ান (১৯৯৬); নৈ:শব্দ্যের জলতৃষ্ণা (২০১৭); তীব্র নৈর্ঋত (২০১৭)।

উপন্যাসঃ গাঙপরান (২০১২); চুকনগর (২০১৭)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E