৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ০৭২০১৭
 
 ০৭/০৭/২০১৭  Posted by

পরিতোষ হালদার-এর ১০টি কবিতা


শিকারী

তীরবিদ্ধ পাখিটি মাটিতে পরে হরিণ হয়ে যায়।
হরিণটি দৌড়াতে দৌড়াতে তীরবিদ্ধ হয়।

কাছে আসতেই সে একটি মেয়ে হয়ে যায়। শিকারী দেখে ময়েটা
মায়ের মতো।
মা দৌড়াতে থাকে, পিছনে শিকারী।
যেতে যেতে মা হরিণ হয়ে যায়, আবার কিছুদূর পর হরিণটি পাখি।

পাখি উড়ে যায়…..

ক্লান্ত শিকারী আকাশের দিকে তাক করে থাকে-
তার চোখে শৈশবের বর্ষা।


ডালিম

অমরত্ব পাবে বলে লোকটি ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমের ভেতর পাহাড়-বৃক্ষ আর গতির শব্দ।
সে আবিস্কার করে মৃত্যু একটা লাল ডালিম।

ঘুম থেকে জেগে দেখে সঙ্গী নদীটি দাঁড়িয়ে আছে।
নদী তাকে সংসারে নিয়ে যায়- কেউ চিনতে পারেনা।
এতোদিন পর সংসার তাকে ফিরিয়ে দেয়।

সে অরণ্যে আসে এবং ঘুমিয়ে পড়ে,
সে আবার গতির শব্দ শোনে।
স্বপ্ন দেখে- অমরত্ব একটা লাল ডালিম,
যার ভেতর অজস্র মৃত্যুর দানা।


স্নাতক

স্নানে আসে তারা, শরীরে মাতৃত্ব আর অজস্র নদীর নক্সা।
পাহাড়ের গায়ে নিজস্ব পুরুষের চিহ্ন এঁকে তারা জলে নামে।
জলও পেয়ে যায় জলের ছোঁয়া।

তারা ইহকাল চেনেনা, লজ্জা ও প্রেম চেনেনা, শুধু শরীরের
জল্লাদ চেনে।

ঝর্ণার পাশে এসে দাঁড়ায় আরও কিছু পাখি, কিছু লৌকিক পুরুষ ও
একজন ব্রহ্মপুত্র।
এদের দৃষ্টি সীমায় নারীগণ স্নান সেরে নেয়-
তারা দক্ষিণে যাবে, যেদিকে তাঁতঘর, শিমুলগাছ
আর আছে সূতা সভ্যতার বাঘ।


ডাক

মৃতের ভেতর অজস্র মানুষ- দাদা, পরদাদা….
বাবার শরীর যেন কৌমের সানাই।

একটা বকুল গাছ ছিল- দাদি যাকে জড়িয়ে ধরলে দাদার বাগান
ভরে যেতো ফুলে।
শুভ্র কুড়াতে কুড়াতে দুজন ডাক দিতো-
দেখ, আমাদের ভেতর কতো বকুলবকুল ইহকাল।

বাবাকে নিয়ে যায় একদল মানুষ, কাঁধে কফিনভর্তি জ্যোৎস্না।
কফিন নামানো হয়, মৃতরাও নেমে যায় মাটির বাড়ি।
বাড়িভর্তি বকুলফুল, ফুলে ফুলে অজ নিঃশ্বাস।

পুত্র তাকিয়ে দেখে- দূরে হেঁটে যায়, বাবা… দাদা…. পরদাদা….


ভাস্কর্য

একটা নদী ছিল, তার পাশে বরফভাস্কর্য।

বরফজলে সূর্যের সাতরঙ। সকাল-বিকাল-রাত যেন কাটার মতো।
কাটায় সময় চলে…..
মানুষের কাছে এটা জলঘর- একটা জ্যোতিষস্তম্ভ।

একদা ঘড়ি আবিস্কার হলে ভাস্কর্যটি মরে যায়। ভেতরে যাকিছু প্রাণ
জল হয়ে যায়।
নদী তাকে গ্রহণ করে।

আজ সবার হাতে হাতে ঘড়ি, দেয়ালে ঘড়ি।
এখন কাটায় ঠিক ঠিক সময় চলে…….
কিন্তু কেউ ঘড়ির ভেতর ভাস্কর্যের যন্ত্রণা দেখে না।


পাথর

সমতলে ফিরে দেখে প্রেমিক মেয়েটি নেই…..

সে নদী ও গাছের কাছে জানতে চায়, নিজস্ব ফসলের কাছে; কিছু বলেনা।
শেষে এক দোয়েল তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
ছেলেটির মনে টুকটুকে আশা
মেয়েটিকে পেলে সে ঘুমঘুম জীবন দেবে……

তারা একটি রক্তাক্ত পাথরের কাছে আসে, পাথরটি যেন এইমাত্র পাথর।
যার গায়ে নিজস্ব অক্ষরে লেখা মেয়েটির পাথরনামা।
ছেলেটি তাকে বুকে চেপে চিৎকার দেয়-
মেয়েগো…….

সেই থেকে কোন কোন পাথর আজও লাল হয়ে ফোটে।


পালাকার

পুতুলগুলো নাচতে নাচতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে….

কোন এক পলকে তারা টান দেয়- সূতা ছিঁড়ে যায়, ছিঁড়ে যায়
দৃশ্য ও আড়ালের সন্ধি।
পালাকার এসে পড়ে মঞ্চে।

তার আঙুলে আঙুলে সূতা, অজস্র চরিত্রের মূদ্রা।
নির্বাক তিনি-
নিজের তৈরী পালায় নিজেই জোকার।

দর্শকের হাতে হাতে তালি…….

মঞ্চে বাজনা বাজে, সংলাপ হয়, কাহিনী অনুসারে পালাকারের
আঙুলও নাচে;
শুধু প্লাস্টিকের পুতুল নাচেনা।


পথ

সয়ম্বরের পর সে অনেকগুলি রাস্তা পেয়ে যায়- রাস্তাগুলি পুরুষ।

গোলবৃত্তে দাঁড়িয়ে দেখে-
একদিকে জংলি নদী, জলে অজস্র রূপান্তরের পাখি।
অন্যদিকে চারটি অশোকগাছ, যার পাতায় পাতায় প্রাগ্জন্মের জ্যামিতিরেখা।
আর একদিকে নৃত্যরত কিছু পরী, ঋতুচক্র নিয়ে বেড়াতে এসে
যারা এখন ডানাওয়ালা ঘড়ি।

এরকম পাঁচ পুরুষের পরও সে আরও রাস্তা খোঁজে-
দেখে, অদূরে দাঁড়িয় আছে একজন
হাতে অভিকর্ষিয় আপেল।

মেয়েটি লম্বা রাস্তার মতো এই ষষ্ঠ পুরুষকেও ভালবেসে ফেলে।


ওইজাবোর্ড

ধ্যানস্থ রবীন্দ্রনাথ….

প্লানচেটে ডাকা হয়েছে পুত্র শমীন্দ্রকে। কাল এসেছিল কন্যা মাধুরীলতা, তারও আগে দাদা সত্যেন্দ্রনাথ।

বোর্ডের ওপর আরও তিনজনার হাত- স্ত্রী মৃণালিনী, ভ্রাতুষ্কন্যা ইন্দিরা ও পুত্র রথীন্দ্রনাথ।

উল্টো করে রাখা বোলের নীচে আগরবাতি জ্বলছে।
একসময় বোর্ডের চাকতি ঘুরতে শুরু করে…..

উমাকে মাধ্যম করে শমীন্দ্র এসে যায়, আত্মা কথা বলে-
বাবা….
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের মতো নির্বাক।

প্লানচেট শেষ হয়- পরে থাকে একটি নিষ্প্রাণ ওইজাবোর্ড।

১০
জুম

মোনঘর থেকে আসে তারা, আসে সংসার থেকে।
মাঠজুড়ে কাস্তের গান, সমন্বিত ভোরবেলা,
জুম ফসলের বেলা।

মাঝে মাঝে বেজে ওঠে পাতার খ্রেখ্রং।
আড়চোখে খুঁজে নেয় পরস্পর কাঙ্খিত পুরুষ, কাঙ্খিত নারী।
পরস্পর জনন অক্ষর।

এতটা ভীড়ের মাঝে জুম কাটে আরো কিছু নারী,
আরো কিছু বিধবাধারা।
যাদের শরীর পাহাড়ি ঢাল,
লাল ম্যাজিকের মতো অজস্র ফাঁদ।

(মোনঘর- মাচাং / খ্রেখ্রং- বাঁশি)

 

 

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার
যোগাযোগ : ০১৭১২-৮৯৯১৪৭
paritosh.a.halder@gmail.com

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E