৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১৬২০১৭
 
 ১৬/০৫/২০১৭  Posted by

পরিতোষ হালদার-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

আকারে ছোটকবিতা চিরদিন লেখা হয়েছে আবার বড়কবিতা এখনও লেখা হচ্ছে। কবিতার অনিবার্য শক্তিকে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় ধারণ, সুচারু বাক্যবিন্যাস, বহুমাত্রিক অর্থ ও বিস্তারকে সংরক্ষণ ও বিকাশের প্রয়োজনে কবিতার আকার কিছুটা ছোট হচ্ছে। সৌন্দর্য্য দীর্ঘ ভাষাবিন্যাসে অনেকসময় ব্যাহতও হয়। মনে করি আগের তুলনায় কবিদের মেধা- মননে ঘাটতি নেই। বর্তমান কবিতার শক্তি ও মেধাকে ধারণ করতে পারলে একজন পাঠক, কবি কবিতার দীর্ঘ বা লঘুতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না মনে করি। প্রশ্ন উঠতে পারে ভাল- মন্দ, দুর্বলতা-শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

কবিতা আকারে ছোট-বড় হতেই পারে। কবিতায় কাব্যিক ব্যঞ্জনা, শক্তি থাকলেই সেটি কবিতা। আমরা কবিতাকে বুঝতে চেষ্টা করি; আকারে ছোট বা দীর্ঘতা দিয়ে কী তার বিচার করি!

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

শর্টফিল্ম, লিটল ম্যাগাজিন -এসব কনসেপ্ট হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু ছোট কবিতার কোন কনসেপ্ট কি দাঁড়াবে!

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

কবিতা ভাল হলে, সে বড় বা ছোট হোক কিছুটা তৃপ্তি আসবেই। কবিতায় পূর্ণ তৃপ্তি না পাওয়াই উচিত।

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

কাব্যিক ব্যঞ্জনাই কবিতার জন্য চরম সত্য,  মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা একটি তথাকথিত অলীক ধারণা।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

আমি কবিতা লিখি, চর্চ্চা করি; আকারে তা ছোট হতে পারে, কিন্তু ছোটকবিতা কি আমি জানি না।

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।


ফটিক

সামান্য তমশা দাও, একবার প্রতিমর্ম বলে ডাকো।

স্ফটিকের কাছে দৃশ্যের ভ্রমণ- অপরাহ্নের রঙ; ঘুমের মন্দ্র খুলে উড়ে যায়।
তোমার তুকের কাছে শৈশবরেখা।

লক্ষ্যভেদের সাথে ধাবমান ভেদ; মাছের চোখে দেখে টলটলে ছায়া, যুদ্ধ আর পাঁচপাতার বাঁশি।
পাতানো খেলার মতো জাদু, পূনশ্চ বাস্তব।

পলাতক তুমি- কোলাহল শেষে একাও তুমি।
বরফকলের কাছে প্রথম তড়িৎ।
কে কারে চিনি, অথচ- লাল হলে আমাকেই রামধনু বলে ডাকো।

স্পর্শ কর, কিছু মৌন ঝুলে থাক কাচের বোতামে।


পূনশ্চ

পূনশ্চ তুমি। এসো- এইদিকে ধ্যানবিন্দু, যুগপৎ স্পর্শ হই।

প্রশ্নবিদ্ধ গাছেদের মন, পাতায় পাতায় তারই মর্মর।
ডাক দাও বলে গণিতগুলো ছুটে যায়- যোগচিহ্নর মতো রাজহাঁস পাখি।
হিংস্র নয়, সিংহজুড়ে তোমার নির্জন; বিকেলের ডানায় তুমুল ছায়া।

ডালিমের সাথে যেটুকু লাল ফাটে, তার সহজিয়া ভোররাতের বাঁশি।
ভৈরবী শেষে কী রাগে বাজো তুমি!

অধিক রেখার পাশে আরও একরার দেখা হয়।
মিশ্রণে তরল ছিলে, আজ বিলম্বিত কর্পুর; নিঃশ্বাস ফেল আর উড়ে যাও।
যেমন- সাইরেন শেষে প্রতিটি বিমানই মূল্যহীন।


ডাকনাম

ডাকনামও একা।
কী তুমুল বোধ, পাতার অক্ষর ছুঁয়ে মিথুনরাশি।
অপেক্ষা অব্দি যেতে যেতে ফুটে থাকা জুঁইফুল, কেবল আয়ত চোখ।

যেতেই পারি, তোমার দূরত্বে এককোটি শ্লেষ, অপরাহ্ন আর জাদুঘর।
প্রতিবেশী বেতারে ছায়ার সানাই- ত্রিভূজ রঙের শৈশব।

তুমি ফেরীওয়ালা, অথচ- অজস্র নাম তোমার।

আমারও মূদ্রাদোষ আছে, অকস্মাৎ বেজে উঠি সংসারের মতো।
অরণ্যে রোদ্দুরগাছ-
ক্রমশঃ খুনি হওয়া, মূদ্রা ও রাক্ষস।

তোমার আয়ুরেখায়, সূর্যাস্ত কিছুটা নদ; পৌঁছাবার আগে কেবল ডুবে যায়।


লাল

তুমিই লাল।
স্বরবর্ণের আড়ালে প্রাচীনরেখা; ম্লান অক্ষরে হেঁটে গেছ দূরে।
একা এক ছায়া, স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানো পারদবেলা।

অহেতুক সাঁতার শেষে ভেসে যাওয়া সোমবার। ফুটে থাকা জ্যোৎস্নাও কিছু ঋতুর কূজন।

ক্রম ও তল হয়ে ভোর অব্দি তোমার ত্রিভূজ। প্রচণ্ড শব্দে মৃত তুমি- শব দাও বলে প্রমিত ইহকাল।
হিংসার পাখিরা উড়ে যায় অপেক্ষার দেশে, ডানায় পরিবাহী রঙ।
তাকিয়ে দেখ, পাতার বৈঠকে নুয়ে পড়া গন্ধরাজ।

অথচ- তোমার লাল, বিস্ময় চিহ্নের মতো আজও অমিমাংসিত।


অহম

বদলে যায় ঘুম, অজস্র ভৌত আঁকা তল।
যতোটা ফোটে তার থেকে ম্লান কোন ফুল, ঝরে পড়া বসন্তে ক্রমাগত মোহ।

নিজের অংশ কুড়াতে কুড়াতে একোন অহমবেলা।
শত্রুর অস্ত্রে ধার দেয়ার মতো আত্মঘাতী তুমি, প্রতিটি মৃত্যুর পরে কী নির্মম ভায়োলিন বাজাও-
সমুদ্র ভাসিয়ে দেও স্রোতে।

প্রচ্ছদের আঁড়ালে লুকিয়ে থাকা রঙ, প্রশ্নবোধের কাছে সেও জমা রাখে বিস্ময়।
যা কিছু গতিশীল- তোমার আঙুলের মুঠোয় তাই উড়াল।

হাত পাতলে নীল, নীল আসে- আকাশ আসে না।


ঘোড়া

নিজের ছায়ার সাথে খেলে সে। শরীরে ইহ ও পরার অজস্র নদীর নক্সা।
রটে যায়, কোন এক জন্মে ঘোড়াটি আগুন ছিল।

সে আগে দৌড়াতো, পিঠে অগ্নিকন্যা।
কন্যার আবর্তন জানে বলে ঘোড়াটি আজও ঘাস খায়। ঘাসের সাথে ঘাসের সম্পর্ক খোঁজে।

কেউ বলে ও কিংবদন্তি থেকে পালিয়ে এসেছে, ওর ছায়ায় মৃত্যুর রং।
কেউ চিৎকার দেয় ও সার্কাসের প্রাণী, শোন- খুড়ে তক্ষশিলার শব্দ।
অনেকের সন্দেহ যুদ্ধ পরবর্তী এ এক মায়া।

সাহস করে এক কিশোর ঘোড়াটির পিঠে চড়ে বসে,
অমনি সে দৌড়ে পশ্চিমে যায়।

সেই থেকে গ্রামের মানুষ, অমরত্ব পাবে বলে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চায়।


জাদু

পরিবেশ তখন পরকালের মতো বিস্ময়।

দর্শক যে দিকে তাকায় সে দিকে মানুষ।
মানুষগুলো জাদুকরের মতো
জাদু ও বাস্তব।

হাততালির ভেতর থেকে দৃশ্য বদলায়….

মঞ্চে মুখোশ পড়া একজন রাবন, যিনি পাপ ও প্রমের দশটি মূদ্রা দেখায়।
মূদ্রাগুলি কমলালেবুর মতো চাপা।

এভাবে রূপ খুলতে খুলতে একজন জাদুকর বিবস্ত্র হয় যায়।
দর্শকের চোখে তখন ঘোরলাগা মধ্যরাত।
তারা তাকিয়ে আছে ম্যাজিক ও নগ্নতার দিকে-
কি বেশি সুন্দর।

এবার জাদুকর মঞ্চ কাঁপিয়ে ঘোষণা করলেন-

সুধী দর্শক,
ক্রমাগত জাদুর থেকে নগ্নতাই লৌকিক।


ঋক্- ২

কোলাহল বড় হয়, প্রতিপলে ভেসে ওঠে ডয়নরেখা।

কিছু পরাবাস্তব পাখি, পালকে প্রাচীন নিয়ে উড়ে আসে; উড়ে আসে ঋতু।
ঋতুপর্ণ তুমি- তোমার আরশিতে সমুদ্রের পূর্নদীর্ঘ বোধ,
হিংসায় নূয়ে পড়ে আলো।
ছুঁয়ে দিলে আকাশও শব্দের মতো নীল।

কোথায়ও ঘণ্টা বাজে, শ্রেণীঘরে বিপন্ন জ্যামিতি। দুই সমকোণে তিনজন গৃহী চন্দ্রঘুমে পার করে ডুমুরবেলা।
রূপান্তরের পাশে অজস্র কার্পাস, অজস্র মীড়ের আগুন।
দশ আঙুলে সেলাই ও তাঁতের লজিক।

তবুও তোমার প্রাচ্যে লুকিয়ে থাকে অঞ্চ, আমার নির্জনতা।


রূপান্তর

কোন পাতা মুখস্ত নেই, তবু ঝরে যায় ঋতু।
যেটুকু দিগন্ত নিয়ে ফিরি তার গন্ধ চন্দ্রগ্রস্ত সোমবারের মতো।

তোমার স্নানের কাছে সমর্পিত আমি-
নানারকম নির্জনে মুখোমুখি হই- তুমি মোহের জনন ও বিকাশকারী। আমাকে প্রশান্ত করো, প্রয়োজনে তোমার আদলে রূপান্তর করো।

কী করুন সুরে পরিবাহী তুমি, জেগে থাকে রূপার মর্মর। যেন চারুকলায় আঁকা প্রাচীন পাখি।
উড়ালে বিশ্বাস ছিলো তাই ভুলে গেছি ডানার মহিমা।

মনে আছে, কোনদিন থির হলে ফিরে যাবে তোমার ছায়া।

১০
ধনুক

কোন কোন অক্ষর ধনুকের মতো নির্জন, কেবল লক্ষ্যভেদ। কখনো ক্লান্ত সব্যসাচী।
আমাদের ভুলগুলি প্রলম্বিত রাবার বাগান।

হেমন্ত বিদায় নিলে ঘুরে ফিরে আবার হেমন্ত আসে।

যখন ছায়ারা যুদ্ধবাজ হয়ে ওঠে, সবুজ শষ্যের পাশে মৃত পরে থাকে জোনাকির দল।
তখন তুমি আসো- তোমার আগমন ভায়োলিন বাজায়।

তুমি নদী ভালোবাসো, নদীর আকাঙ্খায় সমুদ্র প্রেমিক।
তুমি দীর্ঘ বকুলগাছ।

উড়াল বদলিয়ে পাখিরা যায়, ডানায় প্রত্নযুগের হাওয়া। ঘুমের প্রযত্নে রাতগুলি শৈশব।
নৈশভোজনের পর অন্ধকারও পবিত্র রাক্ষস।

————-

কবি পরিচিতি

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার। জন্ম বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার আন্ধারমানিক গ্রামে। পিতা মতিলাল হালদার, মা চারুবালা হালদার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর কলেজে অধ্যাপনারত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কবিতা: আগামী যুদ্ধের তারিখ (১৯৯৩); শব্দজলের ছবি (১৯৯৫); উত্তর বয়ান (১৯৯৬); তীব্র নৈর্ঋত (২০১৭); নৈ:শব্দ্যের জলতৃষ্ণা (২০১৭)।

উপন্যাসঃ গাঙপরান (২০১২); চুকনগর (২০১৭)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E