৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ২৭২০১৭
 
 ২৭/০১/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিত

পাপড়ি গুহ নিয়োগী

পাপড়ি গুহ নিয়োগী

পাপড়ি গুহ নিয়োগী। জন্ম ২১ শে সেপ্টেম্বর। ঠিকানা- ২১৩ কালিকা দাস রোড, নতুন বাজার, কোচবিহার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বাঘছাল গন্ধের মেয়ে (ধানসিড়ি – জানুয়ারি, ২০১৬)।

সম্পাদনা :  তোর্সা

পাপড়ি গুহ নিয়োগী’র কবিতা-ভাবনা

জীবনের সব দুর্গন্ধ আর আতর আমার একান্ত ব্যক্তিগত। কবিতা আমার কাছে কখনোই সন্তানের মতো ছিল না। কারণ, তার জন্য অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়। কবিতা আমার কাছে এক স্নানঘর, যেখানে আমি সম্পূর্ণ নগ্ন হতে পারি; যে স্নানঘরে আমি মন খুলে সাঁতার কাটতে পারি, কাঁদতে পারি চিৎকার করে; এবং শরীরের প্রত্যেকটা ভাঁজে ভাঁজে মাখতে পারি অন্তরঙ্গ সাবান।

পাপড়ি গুহ নিয়োগী’র কবিতা


তুমি রবে নীরবে

নিজস্ব গন্ধ থাকে প্রত্যেকটা সম্পর্কের। কিন্তু কোন এক সম্পর্কের গন্ধ কীভাবে যেন মাথার ভেতর ঘুণপোকার মতো খেয়ে যায়। স্নান, অফিস, সারাদিন কাজের ভেতর টুকটুক করে খেয়েই যায়। তীব্র যন্ত্রণায় অনেক সময় ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করে উঠি। রাত হলে ঘুমের গায়ে ক্ষত। ব্যক্তিগত জানালার কাছে এসে বসি। পর্দার আড়ালে একটা মুখ উঁকি দিয়ে লুকিয়ে পড়ে। পুরোনো হারমনিয়ামটায় ধুলো পড়ে আছে। বুক ভর্তি জল। সুর তোলে না আর। কান পাতলেই গর্জন, কলকল শব্দ। তখন মেরুদণ্ডের ভেতর বরফ জমে ওঠে। শব্দ থেকে শব্দের শরীরে আজকাল পোড়া মাংসের গন্ধ পাই।

খুব মনে পড়ছে দুজনেই খুব জলকেলি খেলতে ভালোবাসতাম। একবার রাতদিন এক করে জল আর জল। তখন তুমি বারবার গেয়ে উঠতে, “আমার পরানো যাহা চায়, তুমি তাই গো…”। তখন আমার হাতে জমে উঠতো তোমার উষ্ণতা। কেমন যেন স্নান স্নান লাগতো। এখন প্রতিটা তুমির ভেতর আমি ডুকরে কাঁদি। জানো, যাবতীয় সঞ্চয় ভাঙ্গিয়েই কবিতার শরীর, গদ্যের শরীর, গল্পের শরীর আঁকি। আসলে কেউ জানেই না, সবকটিই তোমার শরীর। তোমার ছায়ারা আজও ঘুমের ভেতর আলিঙ্গন করে।

প্রতিদিন ভাবি গায়ে আগুন মাখবো। পুকুরের জলে বুদবুদ ওঠাবো। এখন এই আঙুলগুলো কেমন যেন বিকলাঙ্গ …..


ক্ষত

আজও রিংটোনে তোমার কাতর মুখ দেখতে পাই, ডাকনামে ডেকে ওঠো। হ্যাঁ, ভালো তো থাকতেই চাই। তবু সুঁচ ফোটে রোজ হাতে, ক্ষতবিক্ষত হয় তেলচিটে বাঁধানো ফ্রেম …

ক্রমাগত আটকে যাচ্ছি এক পেণ্ডুলামে। চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্তের দাগ; আমাদের ভীষণ চিত্‍কার থেকে বেরিয়ে আসছে ধুতুরা ফুলের বীর্যপাত। ঠোঁটের ভেতর, স্তনের ভাঁজে সমস্ত আঙুল জুড়ে অসমাপ্ত চুম্বন লেগে আছে।

জানো, এখন গভীর রাতে মাইক্রোওভেনে পুড়িয়ে দিই কবিতাদের। তারপর জিভের নিচে ওষুধ নিয়ে, ভাঙা পথ শুধু ঘুম আর ঘুম …


কে কাঁদে ?

এই অবেলায় এভাবে কতবার নিজেকে শাসন করা যায়। দীর্ঘ পথ, শরীরের ভার নিজেরই ভুলে যাওয়া কণ্ঠস্বর। সেই প্রাচীন সুরে নদীর ভেতর থেকে কে যেন ডাকে। ভেতরে দলা পাকানো কান্না। ফোঁপানোর শব্দ। বিলুপ্ত মাছের আঁশটে গন্ধ স্যাঁতস্যাঁতে শ্মশানঘাট ।

এতোদূরে তুমি স্পর্শগন্ধহীন ছায়ার পর ছায়া। দেখো তোমার প্রতি বাঁকে বাঁকে ক্ষতবিক্ষত আমারই আত্মা। আজ মন উত্তাল চোখের কোটর থেকে গড়িয়ে পড়ছে জলের গদ্য বর্ণহীন, অবয়বহীন! রোজ রাতে বালিশ চাপা দীর্ঘশ্বাস আঁচড় কাটে বুকের ভেতর।


রাস্তা  

সেইসব চেনা কাঁচা রাস্তাগুলো স্বপ্নে রাতভর কাঁদে। কেমন যেন আজকাল তন্নতন্ন করে বাস্তবের শহরে ফিরে যেতে চায়। চেনা অলিগলি জ্যোৎস্নায় ভেজা শরীরে শরীর চেপে আদুরে ঘুম অথবা গান গল্প কবিতার আড্ডায়। নতুন অর্থ নিয়ে বেজে উঠতে চায় চুপিসারে। কোনো এক দুপুরবেলা খুব শীত করে এলে নদীর তলপেট ছুঁয়ে অন্তর্বাস দাউ দাউ জ্বলে ওঠে।

হঠাৎ স্বপ্নঘুম ভেঙে দেখি পুরো রাস্তা একটি বিশাল ধ্বংসস্তূপ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র উনিশ বছর।


কম্পাসহীন

চলে যাওয়া শুধুই একটি ঘটনা মাত্র। আরো কত পেরেক পেরোতে হবে। আজ আমরা গভীর সমুদ্রে কম্পাসহীন। নাবিকহীন। উত্তাল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে আমাদের মানচিত্র। যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষয়ে যাছে পাথর সংসার। শুধু বিশাল ড্রয়িং রুমে সাজানো ভাসমান জাহাজ উদ্দেশ্যহীন। স্রোতের টানে জাহাজটা ভেসে চলেছে আর আমরা সময়ের বিশাল সমুদ্রে।

অতীতের ভুল, যন্ত্রণা ও ক্ষতগুলোকে কাটাছেঁড়া করছে ঋণগ্রস্ত আমাদের ক্যাপ্টেন।


প্রেমট্যাটু

যতবার আমি তোমায় ঘুমপোশাকে দেখতে চেয়েছি, তুমি শুধু মুচকি হেসেছ। ঘরময় অন্ধকারে একটু একটু করে আঙুল বুলিয়ে  আঁকতে থাকি দৃশ্যটা। শুধু শরীর নয়, শরীরের ভাষা, রং, নুনস্রোত এঁকে যায় প্রেমট্যাটু, তোমার উন্মুক্ত রঙের ক্যানভাসে। পেন্ডুলাম দোলে আর সুঠাম দেহে বৃষ্টির শব্দে উপচে পড়ে ঝলমলে এক অসীম নগ্নতা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E