৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৮২০১৬
 
 ১৮/১২/২০১৬  Posted by
ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ -এর ২৫টি কবিতা টানাগদ্যে


বৃষ্টি এবং মেঘলাগাছ

তোমার সাথে দেখা হলে একলা একটি গাছের ভেতর মর্মরিত দুঃখভেদে পরস্পর বৃক্ষ হয়ে যাই। আর যাই বলো, মাছের কানকোয় চড়ে দুঃখদের জলভ্রমণের দিনে তোমার কাছে যাবো না বলে ভাবতেই পারি না। তোমাকে একজন বৃষ্টির কথা বলি : একজন শরৎকালের নাম রাখা আছে বৃষ্টি। প্রজন্মান্তরের এই ধারণার ওপর আমাদের কোনোই হাত ছিল না। আমাদের এই শিশু-বিদ্যায়তন ফি বছর শরৎ এলেই খুলে দেয়া হয়। আর শরতের বৃষ্টিতে কাশফুলের ভিজে ওঠা দেখে পাড়ার শিশুরা সকল একজন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার নাম দেয় বৃষ্টি। এবারেও আমাদের কোনোই হাত থাকে না। আর এই শিশু-সন্তানেরা মা মা করে ডেকে উঠলেই, সকলের প্রিয় বৃষ্টি হতে বৃষ্টি ঝড়ে পড়ে। ওরা বলে : এই পৃথিবীর দৈত্য-দানোর গল্প বলো মা! তখন আমি আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়ি, মেঘলাগাছ। শিশুরা সব নানান পাতায় ঝুলে গেলে, মা-র মনে পড়ে তেঁতুলগাছে ঝুলে থাকা বাদুড়ের ঝাঁক। প্রিয় শিশুদের শিশ্নের ডগায় চুমু খায় আর বলে : এবার আমি আর মেঘলাগাছ তোমাদের জন্য একটি স্বশিক্ষিত বিদ্যায়তন নিয়ে ভাবতে বসে যাবো। শরৎ ফুরিয়ে এলো; বৃষ্টিকে তারা নির্জনে গেঁথে প্রত্যেকে ঘরে ফিরে যায়
 


জনপ্রিয় হতে থাকি

কদাচিৎ ভাল থেকে দেখি, ভালদের জন্য একটি-দুটি বাড়ি… সাধ্যাতীত নারী… আর প্রথম প্রথম কাব্যগ্রন্থ মুদ্রণে পাঠিয়েছি।… চাঁদ উঠছে।… এবার আমি জোছনাদের জন্য জন্ম কিংবা বিবাহ উৎসবে ভালদের নেমন্তন্ন নিয়ে যাবো।… এই শহরের জোছনাদের জন্য কিছু একটা রফাদফা এখনো হলো না। পতিতালয় হলো; নীল ছবি, পর্নো পত্রিকা থেকে নগ্নতার চিত্রমূল্যও খুব সস্তা এক সাবানের মূল্য!
এটা তো ভিক্ষুকের শহর!… আজকাল ভিক্ষুকবেশে ঘুরিফিরি বলে বাড়িওয়ালার মেয়ে দুটো নিয়মিত ঘুমের পিল খেয়ে বাঁচে।… আমি এত যে বলি, ‘তুই আমার কন্যা হও না মেয়ে?’ উরুর কাপড় তুলে যে মেয়েটি উনিশে এবার ছবি আর বইয়ের স্তূপে ওয়াক ওয়াক বমি করে দেয়।… আমি তবু বলি, ‘আমার চিকিৎসক বাবা মাঝেমধ্যে বেড়াতে এসে প্রেমিক পুত্রের দেহে ফি সালের জ্ঞান ঢেলে যান।… ধর্ম ও ঈশ্বরীকে রেখে যান কাছে।’ হো হো হো… ব্যাপক মেঘের রাজ্যে কন্যাদ্বয় চশমা ও সুচাগ্র স্তন কাঁপিয়ে বলে, ‘আপনার ঈশ্বরী সে তো বিবাহিত মেয়ে! আর এই কন্যারা?’… আজকাল বিকেলের রিক্সায় আমি নিশ্চিন্তে ভিক্ষুকবেশে ভালদের বিরুদ্ধে বসবাস করি। রাত্রি হলে বাঁকাতেড়া পঙ্ক্তি রচিত হয়। ক্রমাগত জনপ্রিয় হতে থাকি…   
 


বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো

আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।… তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিল সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিল না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।… তুমি করো দোয়েলের চাষ।… ভাল ছাইরঙ বোঝো।… মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযতেœ রাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে


প্রাক-বৈবাহিক

একবার আমাকে একটি বিবাহ-উপযুক্ত মেয়ের হস্তাক্ষর পাঠিয়ে বলা হলো, এই মেয়ে এতদিন জলেই বসবাস করেছেন; আর তার সাম্প্রতিক স্যাঁতসেঁতে প্রকাণ্ড শরীর রৌদ্রে শুকোতে দেয়া আছে। তার হস্তাক্ষরে এই যে কোথাও মাত্রা পড়েছে বা পড়েনি, আর এই যে যতিচিহ্নের কোথাও ভুল বা কোথাও সঠিক ব্যবহার- এসব কিছুই নাকি মেয়েটির যথার্থ যোগ্যতা বা দোষগুণ যেটাই ধারণা করা হোক। মেয়েটির উচ্চতা আমাদের মাঠভর্তি জলের সমান, অর্থাৎ এটা আমার আন্দাজ করে নেয়ার কথা। যা হোক, আমি মায়ের কাছ থেকে পত্রমারফত এ সংবাদ জেনেই কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি। আর ভাবছি, মীন রাজ্যের অধ্যয়ন পর্বে মেয়েটির দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসব প্রশ্ন খুব একটা কমন পড়ার কথা নয়। আর তাহলে এভাবে হস্তাক্ষর পাঠিয়ে এক জননীর কোনো অনাথ যুবকের এ-মতো মন ভোলানোর কোনো মানেই হয় না। ভেবে দেখছি, আমার অপেক্ষার দিনগুলো কী উৎকণ্ঠার! শীত কিংবা বর্ষাই আমার প্রিয় ঋতু হলেও ভাবছি, তাকে ভেজা জবুথবু নাকি শীতে কোঁকড়ানো দেখতেই বেশি আনন্দদায়ক হবে। আজ এই মুখর বর্ষণে ছাতা হাতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে এমনতর ভাবনাগুলোই পোস্টাপিস অবধি পৌঁছে দিয়ে এলাম। আর তখনই আমার হঠাৎ মনে এলোÑ তাকে শেষ প্রশ্নটি করাই হয়নি যে, অবশিষ্ট জীবনে তিনি মীন ধর্মেই ফিরে যেতে আগ্রহী কিনা
 


পাথরসংক্রান্ত  আঞ্চলিক কথাগুলো

কিছু কথা গ্রামেগঞ্জে ফলে। পাথর নিয়ে অতিরিক্ত কথাগুলো থেকে গেল আঞ্চলিক ভাষায়। ভেবে দেখি পাথর শানানো গাঁয়ে তা ধিন তা কৈশোরিক বিচরণশীলা পা মুছে গেল কিনা।… এবার মেঘবৃষ্টির ঋতু বরাদ্দ হলে গাঁয়ের হাটে ইলিশের মৌসুম ধরে তোমাদের বেড়াবার প্রসঙ্গে যথার্থ ভেবেছি। তখন তো মুখরিত স্রোতে ভোরের বর্ণনা এলে ব্রিজের তলায় নেমে পাথরের জটিলতা কিছু নিরীক্ষণ করি। প্রচণ্ড খরতাময় স্রোতে মাছেদের ঠোঁটে পাথরসংক্রান্ত কথা জরুরি হয়ে ওঠে।… ঝাঁপিয়ে-পড়া মৃত্যু অথবা সমুদ্রের শুক্রাণু থেকেও পাথর বিষয়ে প্রচলিত নেই কিছু। অথচ পাহাড় কিংবা প্রস্তরের প্রক্ষেপণ নিয়ে জলেস্থলে শ্লোকগুলো কেন যে প্রবীণতম বৃক্ষদের দুঃখনির্মিত!… বোঝা গেল, পাথর বিষয়ে অজ্ঞানতাহেতু এ বছর যাচ্ছো না গাঁয়ে- জানিয়ে দিয়েছ।… সুতরাং বাঁওড়ের বিস্তৃত ডানায় শিলালিপি বাড়ি, সুড়ঙ্গ-স্নানঘাটে নুড়িদের আভিজাত্যে অভিলাষে কাঁচা হবে বলে জুড়ে বসে আছ প্রস্তর নির্মিত বাড়ি।… সকল উজ্জ্বল সিঁড়ি, ফোয়ারার অভিমানে মৃত রূপসীর চিৎকারগুলো থামেনি আজও।… অন্দরের বীভৎস ওমে সাপের সন্দিগ্ধ চোখ অথবা ঘ্রাণময় জলের চাতুর্যে পাথর গড়িয়ে কুমারীত্ব- যে ভাষায় আঞ্চলিক হলো- তুমি ভাবছ না, এ সকলই নুড়িদের প্রকৃত ভাষা
 


রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস… এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল- এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।… রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে   


নির্বাসন

নির্বাসনে দেখা হয়েছিল ভ্রমণের মেঘ।… নির্বাসনপ্রিয়তাগুলো অদম্য রয়ে গেল আজও।… যারা সঙ্গীত ভালবাসে, এ সকল অজ্ঞাত পরবাসী জলে তাহাদের বড়শিগুলো নুয়ে পড়ে স্বাস্থ্যবান মাছে।… যদি উঠে আসো জলহস্তিনী- ডানার ওজনে এই শূন্যতা দেবো পাখিদের।… এইখানে, আমাদের দীনতাগুলো স্রোতের শরীরে ভেঙে গুনে নিতে পারি।… যদি নির্বাসন ভাল, জলে- নগ্নতায় ডুবে থাকা যায়।… যদি উৎসব ভাল- রাজকুমারীর বিয়ে বিয়ে ঢেউ গুনে ফেলা যায়।… মাছের সাম্রাজ্য দেখো। মাছেরা জন্মেছে শুধু চিলের ঔরসে বেড়ে।… আজও পৃথিবীতে মাছ হলো মেয়ে। কেননা কচুরিপানায় মানুষের জমাট মাংসে মাছেরা তো সাবলীল থাকে। অথবা প্রসঙ্গ মেঘে যদি যুদ্ধের কথা আসে- সকল বর্ষণ শুধু জলের উপমা, জলের প্রতিমামেয়ে।… প্রতিদিন সিংহ দরজায় আমাদের কথা হয়; ব্যথা পাই প্রজাদের রাজস্ব শোষণে।… তবু প্রজাপতি তোমার ডানার শিল্পে এইসব নির্বাসন লিখে রাখো; ছুঁয়ে দেখো আমাদের উত্তপ্ত হাত, কষময় সকল গোড়ালির ফাটা দাগ।… সমুদ্রের উজ্জ্বল কাঁধে এ সকল সুখের ভেতর অনেক অনেক বছর কেটে গেল জোনাকির ওমে। লিখে নাও সমুদ্রসেনানী- পৃথিবীর সকল জোনাকি আমার গর্ভধারিণী   


সুপুরিবাগান

সুপুরিবাগানে বসে দাঁত ব্রাশ করে ঘরে ফিরে আসি। আজ এই সুপুরিবাগান আমাদের প্রচ্ছন্ন আশ্র্র্রয়; কেননা তার প্রচণ্ড ধৈর্যক্ষমতা সুপুরি খাবার দীর্ঘক্ষণ পরও আমাদের দাঁত সাফ করবার শক্তি যোগায়। এ রকম দীর্ঘক্ষণ ধৈর্যধারণকে আমাদের ঠুনকো সব সংসারের টিকে থাকবার আশ্রয় না বলে উপায় আছে! কেউ কেউ সুপুরিবাগানে গেলে উত্থিত শিকড়গুচ্ছে হাত দেয়; আমি বলি : এই যে যারা বাগানে হাঁটো, তোমাদের বিগত দিনের মেদবহুল শরীরের কথা মাঝেমধ্যে ভেবে দেখো তো?


কথা যদি ওঠে

টিটি-মাস্টার হাটে আমাদের নতুন বোনজামাই থাকে; বারো মাস সবজির হাইয়ের ডগায় উঠে দেখে রাখে পানাপুকুরের হাট। তোমার মন ভাল নেই, ও বোন-ভাশুর, এই হাট সুনাম কিনেছে কাল ব্রয়লার মোরগের ঝোলে। এবার ঝাপের পোস্টার বেচে মাসীমাকে বুঝে দাও পদ্মার ইলিশের দেনা। জলকচু, বরবটি এ গাঁয়ে ফলে না আর। পানপাতা, তেলাকুচো ঝরে নাকি ফিরিঙ্গি বাতাসে! আর ঝাপ খুলে উড়ে যায় দেশী মাগুরের তেজ। এ তোমার অবশ্য জানা, ডাঙর মেয়েরা বলে, ও মশাই টকটকে লাল দুলাভাই, এই হাটে ওঠে নাতো চিনেজোঁক, শেয়ালের পরম মালিশ; তোমার ধ্রুপদী দোকান- শ্যাওলায় ডুবে গেলে, ব্যাঙের মাশরুম হতে তুলে রেখো শর্করা-আমিষ। একদিন বসন্ত-শাপ উড়েছিল সকাশে তোমার : লাউয়ের খোঁড়লে শুয়ে ভুলে গেলে ও সাঁই লালন ফকির! আমি বলি আমাদের নব বোনপতি, এই নিয়ে একদিন কথা তোলে যদি!

১০
বাঁদরবিষয়ক

মাকে দেখলাম, এই প্রথম একটি বাঁদরের গলায় বড়শি গেঁথে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন দ্রুত। মা আমার বললেন শুধু, এতদিন পর…! আমি ভাবলাম, এই ভরসন্ধ্যার সুদর্শনগুলো চেয়ে আছে, মাকে আমি একজীবনে এমন উৎফুল্ল কখনো দেখিনি। এমন বিদগ্ধ করে হাসতে দেখিনি আজও। আর অম্নি দেখি ট্রাকভর্তি পুলিশ এসে হাতকড়া দিয়ে ধরে নিয়ে গেল মাকে। তারা বলল, সহস্র বছরে এই একজন মাত্র, যাকে সত্যিকার বাঁদর-নিধনকারী বলে চিহ্নিত করা গেল। সুতরাং একটি রক্তাক্ত কামরায় পুরে মাকে আমার পুরস্কৃত করা হলো। আর এই ফাঁকে, পোশাকধারী লোকগুলো যে যার বুটের তলা থেকে মানুষজন্মের ইতিহাসগুলো মুখস্থ করে বলে, শালী বাঁদরের বাচ্চা! বাঁদরের রক্ত খেতে চাও! লোকগুলো প্রত্যেকের পোশাক খুলে হুড়মুড়িয়ে ট্রাকে উঠে গেল
 

১১
ভেঙে পড়ছে আমার সম্ভাব্য নগরী

এবার আমার সেলাই-সুতো পড়ে থাকছে। ঝড় দেখে উঠে পড়ছি বেগুন গাছে। আমাকে দেখতে এসেছেন প্রযুক্তিবিদ। ভাল গান করে তার সুনাম রটেছে গাঁয়ে। আর আমার মনোযোগ ভেঙে বলবেন কিছু কথা। আমি তাকে দাঁড়াতে বলি। হাতের কাজ ফেলে ডেকে আনি আমার সদ্য প্রণয়িনী। সে তার পা ধুয়ে দেয়। ছিপি খুলে এগিয়ে দেয় জলভর্তি সালশার বোতল। পূর্বপুরুষের ব্যামো। একবার ফুঁ দিয়ে দেন যদি

আজ আমার ঘুম হচ্ছে ভাল। আজ কোনো মসলার বায়না নেই। ঢোলকলমি, জলকচু- এ সবই বাজারে উঠেছে। তবে কি যাবো! এ সবই অগ্নিনাশক। মা বলেন, অতটা ঘুষখোর হলে রেহাই কি আর পাবি! চল্ এবার শীতে- শিলং কিংবা জলপাইগুড়ি- কত রকম চাষবাস হলো… মেঘ-রৌদ্রের আর্দ্রকথা… হায় তোর মরমে পাওয়া সখি- তার জন্যে ঘর-কবরেজ… এসব কোনো কথা হয়রে বাপ!
দিন যাচ্ছে। আমরা ক’জন ময়মুরব্বি স্নেহত্রাতা কারো মুখে তাকাবার আগে, প্রবল তোড়ে ঝড় বয়ে যায় সুখে। হায়রে দক্ষিণা হাওয়া… নরম-ডাঁটা ফসলের ঘ্রাণ… মগভর্তি দুধ। আজ হাটবার। ধামাভর্তি ফল… হাটভর্তি পদ্মার ইলিশের চাঁই- এ আমার মনোযোগ ভেঙে পড়ে আছে যমুনার ব্রিজের পাড়ে।… কেউ কি জানো, ঝড় উঠছে- কপোতাক্ষের পাড়ে যে কবির ভেসে গেছে বিপন্ন নগরের এত অভিবাস-স্মৃতি, সে নদে উঠেছে ঝড়; ঢেউয়ে ঝড়ে উগড়ে উঠছে স্মৃতি, মৃতের ক্রন্দনধ্বনি ঈশানে শ্মশানে… কেউ কি জানো, এবার আরাধ্য শীতে ভেঙে পড়ছে পৃথিবীর অব্যক্ত নগর, অনাগত তাজমহলের কাঁচ; আর আমার সম্ভাব্য সুরম্য প্রাসাদ পৃথিবীর অন্ধকার গহ্বর ধরে ডুবে যাচ্ছে প্রাচীন প্রহরে। একদিন চাঁদের মুখশ্রী ভেঙে ঝড় এলে- আমি চড়ে বসি মর্মরিত বেগুন শাখায়। একদিন আরোগ্য এলো দেশে। হায় আমার সদ্য প্রণয়িনী…

১২
গেটলক : একটি সংবর্ধনা স্মারক

আমরা এই সমাজপতির সংবর্ধনায় আর কোনো ভুঁইফোঁড় কিংবা গাঁজাখুরি শব্দ ব্যবহার করতে যাবো না। কেননা জীবন কিংবা ভাষার বিবিধ ব্যবহারে আজ, এই সব গাঁজাখুরি শব্দের সম্বন্ধ ভেঙে আমরা বহুদূর এগিয়ে এসেছি। যা দিনকাল, আমরা একটি বরেণ্য বিদ্যালয়ের দিকে গুঁজে দেবো আমাদের ধ্বনিযন্ত্রের তির্যক শব্দরশ্মি। ক্রিকেট খেলার মধ্যাহ্ন বিরতিতে আমাদের এই সংবর্ধনাসভার যতি টানা হবে, ঠিক আপেক্ষিক। শেষপর্বের বক্তাদের কণ্ঠে তার তাবৎকালের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হবে বরণীয় বাক্যবন্দনায়। এই ফাঁকে আমরা উত্থাপন করবো- আমাদের পুরনো রেলগাড়ির জন্য একটি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। আমাদের একমাত্র ছাদের ওপর একটি প্রাযুক্তিক পুলিশ স্টেশন চাই। ভোঁতা হয়ে গেছে আমাদের ধান মাড়াইয়ের কল। এটাকে অন্তত আমাদের মগজ কিংবা ঘিলু মাড়াইয়ের জন্য যথার্থ করা হোক। আমরা আর কোনো গাঁজাখুরি শব্দমঞ্জরি অন্তত আপনার জন্য প্রযোজ্য রাখিনি। এবার নিশ্চিত আপনার বিবাহের বরযাত্রী হয়ে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের জন্যে গড়ে তুলবো দুর্বার আন্দোলন। আমাদের আস্থা করুন, আমাদের প্রকাশিতব্য সদ্যজাত কবিতার পাণ্ডুলিপি থেকে সমস্ত বৈবাহিক চিত্রকল্পগুলো আপনার বিয়েতে সৌজন্য পাঠাবো। আমরা প্রত্যেকে অসংখ্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সুযোগ্য দালাল। আমাদের কোনো চাকরির প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রেমিকাদের একটা হিল্লে করে দিন। দেখুন আমরা প্রাক-বৈবাহিক সন্তান উৎপাদন, জন্মকল্প কিংবা এ্যাবরশনে একদম বিশ্বাসী নই। আমরা মিছিলে যাই না; তবু মিছিল এসে ঘিলু খুলে দেখে আমাদের। তারা গোলটেবিল করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্ল্যান নিয়ে। আর দেখুন আমাদের আমলা বন্ধুদের বাড় বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। এমনকি সংখ্যাও হা হা। আমাদের আড্ডায় তো চলতে পারত ফরেন হুইস্কি থেকে আদিমতর যা কিছু। গলিঘুপচির মাগির দালালদের সঙ্গে আমাদের সখ্য যে সেই আদ্যিকালের! অযথা অধ্যয়ন থেকে সেই কবেই তো আমরা আমাদের সাংসারিক আড্ডাগুলোয় শেষরাত অবধি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আমাদের একটা রফা না হয় করুন; আমাদের মাইনের সিংহভাগ চলে যায় বাড়ি ভাড়া, চটি পুস্তিকা, পর্নো ডিস্কেট, ক্ল্যাসিক, রাগ কিংবা ভরত নাট্যমের টিকেট সংগ্রহে। মান্যবর সমাজপতি, এসবই পুরনো প্রযুক্তি, আর সব ক্লিশে ধ্রুপদী। দেখুন, আর চাইনে এসব, আমাদের মাস্টারবেশনের চমৎকার এক অভিনব পদ্ধতি বাৎলে দিন। বিশ্বজুড়ে তেলের দামের পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে কাগজ আর সাবানের মূল্য- একবারও উঠেছি গর্জে এসবের প্রতিবাদে-প্রতিরোধে, কখনো কি মনে পড়ে কারো? প্রিয় সমাজপতি, পুরনো চা-পাতা, সিগারেটের দগ্ধ ফিল্টার, কফি আর ব্যবহৃত কনডমের খোসায় তড়পাচ্ছে আমাদের ঘরভর্তি প্লাস্টিকের ঝুড়ি; আজকাল যত্রতত্র ডাস্টবিন থেকেও শোনা যায় ভাগ্যাহত নবাগতের আর্তচিৎকার। এই সব নবজাতকের মিছিলে একবার আমিও ছিলাম। ওদের মায়েদের সঙ্গে, ওদের অধিকারের ধারায় আমিও তুলেছিলাম ভয়ার্ত স্লোগান। আমাদের গন্তব্য বলতে দেখুন, কখনোই কোনো জিরো পয়েন্টের অস্তিত্ব ছিল না। আমাদের আর্তকণ্ঠ সেদিন গর্জে উঠেছিল আপনার সুরক্ষিত বাড়ির লোহার দরজায়। আমাদের নিষ্পাপ নরম তুলতুলে পা সেদিন বৃষ্টির মতো বর্ষিত হলো আপনার সুরাসিক্ত তলপেট জুড়ে। প্রিয়বর সমাজপতি, আমার প্রিয়তমা বোনের জন্য আজ একটি গিটার, অর্গান কিংবা হারমোনিয়মের বিশেষ প্রয়োজন; চাই একটি নাচের পোশাক, হীরের নূপুর, আরো চাই পারফিউমের সর্বোচ্চ ব্রান্ড, ত্বকের প্রসাদ মানে রূপব্যবসার আরো যত আনুষঙ্গিকী। আর চাই অবাধ রাত্রিযাপনের এক সুরম্য প্রাসাদ; ঘ্রাণময় কেবল জলের ফোয়ারা- যা এই পৃথিবীর তাবত অন্ধকার নিয়ে ছুটে আসে প্রিয়তম আমার বোনের টানটান দুটি গোল চোখ থেকে। আমাদের আস্থা করুন সমাজপতি, আমরা জল থেকে জলস্তরে, ঘুম থেকে ঘুমান্তরে অগাধ সমুদ্র থেকে ব্যাপক চরায় এসে দাঁড়িয়েছি। মান্যবরেষু হে, আমার নধর সন্তান, পিতার বার্ধক্যের ত্বকে ভরে দিন অজস্র জীবাণুশূন্য রক্তের ইনজেকশন; আমি জানি, আজ কিংবা কাল, যে কোনো আততায়ীর ক্ষুধার্ত লালায়, তাদেরই প্রস্রবিত রক্তের ধারায় আঁকা হবে উৎসবের শত রঙ। আপনার দুটি অত্যুজ্জ্বল নাক্ষত্রিক চোখেই আমাদের নিবদ্ধিত দৃষ্টি হে মহান পতি। আমরা হরিজন, অচ্ছুৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাতকূলহীনা, লঘু…; সামান্য বিদ্যুচ্চমকে দেখুন, কেঁপে ওঠে আমাদের পাঁজরের হাড়; এক আঁজলা কেরোসিনের বরাদ্দ দিন; জ্বেলে দিন আমাদের শনবাতার ঘর, ছেঁড়া বস্ত্র, ছালাচটি- আমাদের অযত্ন অভুক্ত সন্তানের খসখসে বিশুষ্ক ফাটা ত্বক। নিজেকে একটু সেঁকুন মান্যজন; জল থেকে জলে হ্যালোট্যাব দিয়ে শুদ্ধ করুন, ধুয়ে দিন ছাইভস্মের চিহ্ন অপার। আর আমার দু’হাত ভরে দিন, ভরে দিন আগ্নেয় ধাতব কিংবা লৌহজাত ভালবাসার অথৈ বৈদ্যুতিক পাওয়ার দিয়ে; দেখুন অজস্র বিস্ফোরণে কেমন মাতাল উল্লাসে নেচে ওঠে বাংলাদেশ; মান্যজন সমাজপতি, আজকের এই অবিরল ঘ্রাণবতী ফুলের বন্যায়, আপনার এই নগণ্য সংবর্ধনায় এটুকু বিশ্বাস না হয় করেই দেখুন!

 
১৩
পত্রিকায় বসে সাহিত্য সম্পাদনা করছি

একদিন বিষ্যুদবার আমার পাতা বের হলে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। আমার প্রাণান্ত শ্রম আর জিনিয়াস এডিটিং নিয়ে জনে জনে কথা হতে থাকে বেশ। বিশেষত আমি যে কবিতাবলি নির্বাচন করে থাকি, দেখি তার হেয়ার-স্টাইল থেকে জুতার কালার অবধি কে কত আপডেট হতে পেরেছে। অতঃপর তাদের অগ্রজ কবিতার প্রভাব কিংবা সান্ধ্যকালীন পরকীয়া বিষয়ে দীর্ঘায়ু খোঁজখবর করে মুদ্রণে পাঠিয়ে থাকি। আর যারা যারা আমাকে চুতিয়া বানচোত কিংবা মাগিখোর বলে যে কোনো আড্ডায় বসে গালাগাল করে থাকে, খুঁজে দেখি তারাও তো পাঠিয়েছে কিছু সুন্দর কবিতা। আর দেখি করুণ আকুতি কিছু : তাদের সদ্য মুদ্রিত বইয়ের পাঠসূত্রাবলি অথবা ব্যাপকই পরিচিতি যেন তুলে ধরি এই বয়সী পাতায়। তবে ভেবে দেখি, এইসব অজ্ঞাতে গালাগাল আর তাদের মনের ভাষাটা কিংবা কবিতাই ধরো- কখনোই একাত্ম নয় মোটে। কেউ আবার জিনিয়াস বলে আমাকে যে গালিই দিয়ে থাকে- তা-ও আমার অজানা নয় আর। তাদের কবিতাবলি আরও কিছু বুঝেসুঝে ছাপি এই প্রবীণ কাগজে। আর ভাবি, চুতিয়া বানচোত কিংবা জিনিয়াস কিছু হওয়ার গভীরে যে মাহাত্ম্য থাকে, কবি হওয়ার গভীরে সেই মাহাত্ম্য খুব বেশি থাকে কিনা
 

১৪
কৃষককন্যার কাব্যচর্চা

এক কৃষকের মেয়ে- কিশোরী সে- স্কুলে যায়- লোকজন বলে- প্রতিটি সকালে- না যদি সূর্য ওঠে- একমুঠো কাঠের আগুনে- পৃথিবী কি আলোকিত হয়?

প্রতিবেশী আমি- এমনই কিশোরী সে- রাত করে ছড়া-পদ্য লেখে- কেবলই আমাকে চেনে- আর ভাবে মনে মনে- একদিন তুমিও কিশোর- প্রেমপদ্য লিখে লিখে- ছুড়েছো আগুনে- আমি তার পদ্য ঘেঁটে পাই- রূপের আগুনে তার- পতঙ্গেরা পুড়ে পুড়ে- কত হলো ছাই- আরো লেখে মেয়ে- অন্যত্র তুষের আগুন- কৃষক পিতাকে তার- আজন্ম জ্বালিয়েছে- তারো চে’ দ্বিগুণ- আমি তাকে বলি- রূপের সীমানা যদি- খেয়ে যায় ঘুণে- ছড়া-পদ্য লিখে মেয়ে- তুমিও ছুড়বে আগুনে-

আমার রচনাবলি- চারিদিকে বারুদের ঘ্রাণে- একদিন জেনো তারা- গড়াবে ধুলায়- আর তুমি কৃষককন্যা- একমুঠো কাঠের আগুন- প্রতিদিন দেখা হবে- তারায় তারায়

১৫
বৃষ্টি নামুক প্রতি হাটবারে

পাকা আমে বাতাস লেগে পড়ে যাচ্ছে আর বৃষ্টি এসে তলার গর্তগুলো ভরে দিচ্ছে- যেন নরম তোষকের ওপর ক্লান্ত শরীর পড়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সারাদিন। আজ হাটবার। বটতলায় কবরেজের দোকান-জুড়ে নপুংশক-মলম বিক্রির বেজায় পড়েছে ধুম। তবু বৃষ্টি পড়ছে নদীপাড় ধরে। কৈবর্ত-ভেসালের তলে ইলশেমাছ লাফাচ্ছে ভীষণ। কামার্ত পুরুষের মতো নপুংশক প্রজাতি-সকল ভাঙা সাঁকো পেরুবার কালে বোতলের ছিপি খুলে মলমের ঝাঁঝ শুঁকে হয়ে উঠছে সুঠাম পুরুষ। অথবা মেঘের গর্জন শুনে কারো কারো মলমের শিশি ভেসে যাচ্ছে স্রোতবতী জলে।… আজকাল বৃষ্টির দিনে পেলব মৃত্তিকার মতো উর্বরতর সম্ভাবনায় হেসে ওঠে ঘরমুখো বিষণ্ণ সাহস।… আজকাল আদি-জৈব ভূতগ্রস্ত হয়ে কেউ কেউ তাকিয়ে থাকেন- মেঘের ঔরস ছিঁড়ে বৃষ্টি নামুক, বৃষ্টি নামুক প্রতি হাটবারে, সাদা সাদা কাশফুল বনে-
 

১৬
মহানগর

মহানগর-প্রেম সম্প্রতি আমার মধ্যে প্রবল বিস্তৃতি পেয়েছে। যখন একবার আমি পেট্রোল পোড়ার গন্ধকে একপ্রকার ঘাসের গন্ধ বলে চিৎকার করে উঠি, আর তখন চারপাশের বন্ধুরা আমাকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে যায় মানসিক শুশ্রুষালয়ে- তখন আমি মা মা করে চিৎকার করে বলি : দেখো মা, দিন দিন আমি কেমন হয়ে উঠছি মহানাগরিক সন্তান তোমার। আমাদের উঠোনজোড়া পাতাবাহার আর জবা বেলী লাল গোলাপের বংশধর ভেবে আমি প্রত্যহ ভোরবেলা এই মহানগরের পায়ে জল ঢেলে আসি। শেষরাতের ঘুমে অবোধ শিশুদের মতো রাখাল-বালকের সাথে খেলাচ্ছলে কেঁদে ফেলি- গোধূলির সূর্যাস্তকালে আমাদের লাল বাছুর, কালো বকরি হারিয়ে ফেলে। আমি এই মহানগরের ভিড়ে ইথারে-বেতারে বা পার্কের বেঞ্চিতে শুয়ে কারো মুখে জারি সারি পালাগান শুনে, চেয়ে দেখি প্রমত্ত বর্ষার গাঙে নায়ে ভেসে যায় নতুন নাইওর; অথবা ক্রন্দনরত বালিকা-বধূ সে- সব ছেড়ে ভিন্ গাঁয়ে যায়; আর পাছে বিষাদ-বিচ্ছেদী গেয়ে ঘরে ফেরে গাঁয়ের প্রেমিক।… সম্প্রতি আমার মধ্যে মহানাগরিক ভাবনাগুলোয় আরো যা যা ঘটে চলেছে- তা আমি নিমন্ত্রণ করে, আর কলাপাতায় শিন্নির আয়োজন করে- মহা ধুমধামে সকলকে একদিন জানিয়ে দেব ঠিক
 

১৭
বাদ্যযন্ত্র উপাখ্যান

আমার যা মনে হয়- এই বাদ্যযন্ত্রের পরিধিতে এতকাল তা স্ব-কৌশলে বিধৃত ছিল অবিকল। আর আমি তার জন্য প্রত্যহ রাতে একটি একটি এরোপ্লেন ভাড়া করে এনে চক্কর মারি আকাশে-বাতাসে। আমি ঘুমের মধ্যে মৃতদের হাড়ের ঝঙ্কার শুনে, বুঝি, ঐ আমার ভাষা; আর তাই এই আমি, নিজেকে তো মৃত বলেই ঘোষণা করেছি কতবার। আর ঝরাপাতাদের সুরের মর্মর শুনে বুঝি, মরে-যাওয়া পাতাদের করুণ কান্নার সুরে আমরা কী আহ্লাদিত হয়ে বনে যাই ভাবুক বা নিসর্গ-প্রেমিক! আমাদের ভাবনার বৃত্তগুলোর চারপাশ জুড়ে যে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সরব সক্রিয়তা আমি অনুভব করি প্রতিবার। যেহেতু একবার এক মৃত যন্ত্রের শরীরের সঙ্গে সুদীর্ঘ কথপোকথন শেষে আমি এই এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, পৃথিবীতে মানুষের সুখ দুঃখ হাসি কান্না বিষাদ বিগ্রহ বিপ্লব- সব কিছুই বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময়। আর যা কিছুই সিদ্ধান্তহীন নপুংশক- তারও এক সুরেলা সঙ্গীতময় অভিজ্ঞান আছে- যা কেবল কতিপয় বাদ্যযন্ত্রের সুরের ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যময়

 
১৮
এই হাসি

বিমানবন্দর থেকে যাত্রীরা সোজা একটি গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে দেখে, তাদের মায়েদের জন্য এইসব গ্রাম, কাঁচা পায়খানা, আর্সেনিক-জল, কিংবা প্রত্যহ ঘুম ভেঙে পোড়ামাটি বা কয়লার টুকরোয় দাঁত মাজার ব্যাপারটি কতটুকু স্বাস্থ্য বা অস্বাস্থ্যসম্মত- তা নিয়ে এক সেমিনার বসে গেছে। আর তাতে জড়ো হয়ে গেছেন- উকিল, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুইপার-ক্লিনারসহ আরো পেশাজীবী। আর আমি একমাত্র কবি তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছি আর যে যা জিগ্যেস করছে- আমি হাসি মুখে তার জবাব দিচ্ছি। আর তখন একজন বিমানযাত্রী যিনি দীর্ঘকাল পর এইমাত্র স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন এবং তার মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন আঞ্চলিক ভাষায়, আর তারপর আমার সঙ্গে কথা বললেন কখনো ইংরেজি কিংবা কখনো বিশুদ্ধ উচ্চারণে : তখন একজন উকিল উঠে বললেন, ‘আপনার ভাই আগে চিকিৎসার প্রয়োজন।’ আর চিকিৎসক যিনি ছিলেন শুরু করলেন মামলার প্রস্তুতি নিতে। আর সাংবাদিক যিনি এই সব দেখে দেখে একটু ঘুমিয়ে পড়েছেন, তাই দেখে বিস্মিত শিক্ষক ক’জন মূর্খদের সেমিনার ফেলে চলে গেলেন ধান কাটার কাজে। শেষতক ক’জন সুইপার-ক্লিনার আর সাধারণ মিলে আমি একমাত্র কবি সভাটাকে গোছগাছ করি ও যারপরনাই ভারসাম্য আনয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বলা ভালো যে, তখনো অব্দি আমার মুখের অনন্য হাসিটি একটুও ম্লান হয়নি মোটে-

 
১৯
সমুদ্রদর্শন

অর্ধেক বেলায় আমি সমুদ্রের যতটুকু দেখি, মৃত বন্ধুরা মিলে পাঠিয়েছে  তারও চেয়ে দীর্ঘ উপহার। সেইখানে সাঁতারের ছবি, কাঠ-কয়লায় অঙ্কিত অজগর-গাছ আর কিছু মৃতদের নমনীয় আচার স্বভাব

আর তাই পাল্টে নিচ্ছি প্রতিদিনের দাড়ি কামানোর শাশ্বত রীতি, ঘুড়ি ওড়ানোর সরল কৌশল, আর ঘষে দেখি বেঁচে থাকার আসল প্রতিভা

আর একদিন শাপলাফুল তুলতে গিয়ে জলে নেমে দেখি প্রতিবিম্বে কারো ছবি চোখেই পড়ে না। সুতরাং মৃত বলে স্বীকৃতি পাবার এ এক পদ্ধতি বটে

প্রিয় বন্ধুরা, অথৈ সমুদ্রের চেয়ে দীর্ঘ যে জলচ্ছবি পাঠিয়েছো আজ, তাতে ভারি রাগ-ক্ষোভ-বিবৃতি কিছু নেই

সুতরাং একা একা অনুভূতিগুলো কেবল সমুদ্র দেখতেই বুঝি শেষ হয়ে গেল
 

২০
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের আত্মার চারদিক ঘিরে
অসংখ্য সবুজ বৃক্ষের চারা রোপণ করেছিলেন
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

মানুষের চোখের বালি অপসারণে প্রেমিক বাঙালির নিভৃত ঘরে কোনো ডুবুরির খোঁজ মিলেছিল কিনা, তা যেমন বিবেচ্য আজো- তেমনি কালান্তর-এর মতো অনবদ্য গ্রন্থ রচনা করেও মানুষের ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত সুচেতনাগুলো কেন ওঠেনি জেগে- ভাবতে ভাবতে একদিন ক্যামেলিয়ার সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়ে মনে পড়ে গেল- আজ অবিনাশ ঘোষালের জন্মদিন। অবিনাশের বত্রিশতম জন্মদিনের নিমন্ত্রণে এসে কতিপয় উৎসুক পাঠক আজই প্রথম তার ভ্রুণের চিত্ররূপ চাক্ষুষ করবে বলে গভীর উৎকণ্ঠায় আছে। অথচ সন্ধ্যেবেলায় কার সম্মানে প্রদীপ জ্বলেছিল- তা আজও রহস্যই থেকে গেল। রবীন্দ্রনাথ একজন দক্ষ পরীক্ষক হিসেবে নিজের উপন্যাস পর্যালোচনায় যোগাযোগকে কত মার্কস দিয়েছিলেন- এ প্রশ্ন অনেকের মনের। যেমন কাদম্বরীর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনী পরিণয়ের কোনো সংযোগ ছিল কিনা- বংলা ভাষায় এমন অমীমাংস্য জিজ্ঞাসা খুব বেশি নেই। একবার সুরবালা ও হৈমন্তিকে পদ্মাপারের সমস্ত জমিদারিত্বের খেসারত দিতে দেখেছি, এইভাবে স্ত্রীর পত্র ও মধ্যবর্তিনী সম্পর্কে যা ধারণা করে বসে আছেন- তা নিয়ে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে তাঁর মতবিনিময় প্রকৃত সত্যের হেরফের ঘটাতে পারতো বৈকি। আজকাল আমাদের রক্তকরবীর রবীন্দ্রনাথ কখনো গীতবিতান কখনো সঞ্চয়িতা বুকে চেপে মাধ্যমিক পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, প্লেনে চড়ে সারা পৃথিবী ঘোরেন; অথচ, সপ্তম শ্রেণীর এক ক্ষুদে বালক একবার ইংল্যান্ড পৌঁছান প্রায় চব্বিশ দিন জাহাজ ভ্রমণের পর। ইংরেজদের ঘিরে তাঁর এই অদম্য আগ্রহ সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন ভ্রমণ প্রাক্কালে তাঁর হাতঘড়ি ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় টুকিটাকি ফেলে রেখেই দেশে ফিরে আসেন- যেন বারবার ভ্রমণের মতো অনিবার্যতা তৈরি হয় তাতে। জোড়াসাঁকোর উপাসনালয় থেকে যখন শ্রী নিকেতন ও শান্তি নিকেতন দৃষ্টিগোচর ছিল- তখন শাহজাদপুর ও শিলাইদহ বেড়াতে এসে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় ঋণ আদায় করতে না পারার এক চমৎকার নজির স্থাপন করেন। আর এই অনাদায়ের ব্যর্থতার কাঁটাতার ছিঁড়ে লালনের সমস্ত একতারা কিনে পদ্মায় নৈবেদ্য দিতে চান। ধারণা করি, সাঁইজির মতো জাতহীন সাধকই পারেন রবিদার মতো একজন কঠিনেরে ভালবাসা মানুষের শোকতাপব্যর্থতা সকল ভুলিয়ে দিতে। ইয়েটসের সঙ্গে তাঁর বনিবনা তেমন হতো না- যদি না তিনি নদীর কলধ্বনি, ঝরাপাতার গান গীতাঞ্জলির ভাষায় শোনাতেন তাঁকে। কিংবা তিনি সোনার তরীতে চড়ে নিরুদ্দেশ যাত্রায় সঙ্গে নেবার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন কিনা- তা অনেকের অজ্ঞাত। হঠাৎ দেখা গেল এমতো অনেক অনিবার্যতা অসমাপ্ত রেখেই বহুবছর আগে বিশ্বভারতীর দোতলার কামরায় শুয়ে দেয়ালের রঙগুলো মুছে দিতে বলে- আমাদের জীবনের জলছবি নির্মাণে চূড়ান্ত ইস্তফা দিলেন রবীন্দ্রনাথ    

২১
কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ট্রামের
লাইনে চমৎকার চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে মধ্যরাতে স্ত্রী লাবণ্য দাশের তৎকালীন নারী জীবনের স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় : বিদূষী লাবণ্য দাশ উনুনের পাশে শুয়েবসে কী করে শীতরাত্রির গল্প ফেঁদে কাঁচামাটির পাত্রের মতো আগুনে পুড়িয়ে নিতে পারতেন। আর পুরোটা জীবনের এ দীর্ঘ অবসরে জীবনানন্দ দাশ কতগুলো সোনার ডিম উনুনে তুলে কিছু তাঁর জীবদ্দশায় আর বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর আপামর পাঠকের জন্য পরিবেশন করে যান। আমরা তাঁর কাছে বনলতা সেনের অনেক গল্প শুনি। তবু, কোনো এক মানবীর মনে তাঁর ঠাঁই না হবার অপার বেদনার কথায় এতটুকু বিচলিত কেউ নই; কারণ, একবার সুরঞ্জনা অন্য যুবকের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে বনলতা বিষয়ে এক গভীর জটিলতা তৈরি করে বসেন। আর তাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, ভাবনার পূর্ব থেকেই তিনি কখনো বনলতাকে একক মানবীর মর্যাদা দিতে পারেননি। কলকে পাড় শাড়িতে জড়িয়ে যে কিশোরী সন্ধ্যে হলে ঘরে ধূপ দিতে যায় প্রতিদিন- বরং তাকে ঘিরেই তাঁর জীবনে নারীপ্রেম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়। এবং ধারণা করা যায় যে, এরই পরিণতিতে তিনি হায় চিল নামের কবিতাটি লিখে থাকতে পারেন, এবং আমার সকল গান তবু তোমারেই লক্ষ্য করে- বলে তাঁর ভালবাসার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটান। আশৈশব তিনি জলসিড়ি বিশালাক্ষীর তীরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন- আমার মতন আর নাই কেহ! আমার পায়ের শব্দ শোনো- নতুন এ- আর সব হারানো- পুরনো। যেহেতু তিনিই কেবল ঘাইহরিণীর প্রতি অপার মমতা হেতু একদিন ক্যাম্পে লিখে গভীর সমালোচিত হন; নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায় হেঁটে হেঁটে রচনা করেন বাঙালির পরিভাষা- রূপসী বাংলার কথামালা। সেই হেতু এই মহাপৃথিবীতে যার যেখানে সাধ চলে গেলেও তিনি এই বাংলার ’পরেই আমৃত্যু থেকে যেতে অভিলাষী হন। আবার বছর কুড়ি পরে- হারানো মানুষীর সাথে দেখা হয়ে গেলে- এই কাশ-হোগলার মাঠের ভেতরেই যেন দেখা যায় তারে- অথবা হাওয়ার রাতে- যেন দেখা হয় এশিরিয়ায়, মিশরে-বিদিশায় মরে যাওয়া রূপসীরা যখন এই বাংলার আকাশে কাতারে কাতারে নক্ষত্রের সমুজ্জ্বল সংসার রচনা করে- তেমনি তারার তিমিরে। আবার আট বছর আগের একদিন- কল্পনার নক্ষত্রচূড়ায় এক মৃতের গল্প রচনা করে বলেন- তবু জানি- নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ- নয় সবখানি;- অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়- আরো এক বিপন্ন বিস্ময়- আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে- খেলা করে;- আমাদের ক্লান্ত করে- ক্লান্ত- ক্লান্ত করে। জীবনানন্দ দাশ নিশিথের অন্ধকারে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে ঘুরে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ বিবেচনা করে বলেন- ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে… ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে… উপেক্ষা সে করেছে আমারে- অথবা জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা ও সম্পাদনা জীবনের প্রগাঢ় বেদনাময় মুহূর্তে নিতান্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট রচনার নামকরণ ধূসর পাণ্ডুলিপি করে অনায়াসে পাড়ি দেন বাংলা কবিতার ঊষর উদ্যান। একবার খুঁজতে খুঁজতে নক্ষত্রতিমিরে- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা- বলে যখন সরোজিনীর অবস্থান নির্ণয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশায় পতিত হন- আত্মাভিমানে নিজেও ঝরা পালকের মতো ঝরে যেতে চান শুকনো পাতা ছাওয়া ঘাসে- জামরুল হিজলের বনে- কিংবা নক্ষত্র সকাশে। যেহেতু তাঁর ট্রামের নিচের জীবন এমনই ইশতেহার রচনা করেছে যে, যে জীবন দোয়েলের শালিখের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা- ফলে, কার্তিকের নরম নরম রোদে- এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক- এই দৃশ্য দেখে ফেলে যে, আমাদের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ- এবার মানুষ নয়, ভোরের ফড়িং তারে দেখা যায়- উড়ে উড়ে খেলা করে বাংলার মুখর আঙিনায়-

 
২২
কবি উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন রেলগাড়ির জানালা
দিয়ে দেখা একের পর এক অভাবিত দৃশ্যে
বাংলা কবিতার পারম্পর্য খোঁজেন
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

অরণ্য টিলার উপরে মাছ বাজারে বসে কবি উৎপলকুমার বসু হেরিকেনের দরদাম করেন। দীর্ঘকাল সামুদ্রিক মফস্বলে থেকে পরার্থপর মৃত্তিকার দিগন্ত নির্দেশে আজ তাঁকে বাংলা কবিতার হাল ফ্যাশনের চিরনৈমিত্তিক গাউনে আবৃত দেখা যায়। আফিম বীজের চেয়ে পরিণতিহীন লক্ষ্যে ভ্রমণের এই অনিবার্য দিনগুলি তাঁর কখনো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অপার সিন্ধুর জলে তেরো বার স্নান করে ওঠে। আর সেই থেকে দৃশ্যত ধাতুর গলানো চাঁদ তরল ফোঁটায় ঝরে পর্বতচূড়ায়। উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন গরিয়াহাট পিছনে ফেলে শিয়ালদা হয়ে হাওড়া আবার হাওড়া থেকে শিয়ালদা অব্দি ঘুরতে ঘুরতে নতুন কোনো আততায়ীর খোঁজে উঠে বসেন ট্রেনের কামরায়, এবং জানালা গলিয়ে একের পর এক অভাবিত নতুন দৃশ্যে যারপরনাই হারিয়ে ফেলেন কবিতার গাণিতিক পারম্পর্য। এই এক ভাবনাবিচ্ছিন্ন কবি- বসন্তে- কেবল পাতার শব্দে জেগে উঠে আগুপিছু কিছু না ভেবেই চিরঅজ্ঞাত লোচনদাস কারিগরের হাতে ছেড়ে দেন তাঁর সমস্ত কবিতার ভার। এবং তৎক্ষণাৎ অবজ্ঞাত হন যে, একমাত্র টুসুই তাঁর চিন্তারাজ্যের ভবিষ্য সম্রাজ্ঞী। একদিন হাসপাতাল ঘেঁটে সমগ্র বাংলা কবিতা থেকে পশ্চিমবঙ্গীয় কঙ্কালগুলো খুলে নিলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে আবার কবিতায় ইংরেজের রাজত্ব ফিরে আসে- অগত্যা এই দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ড প্রবাসকালে কবিতার প্রতিটি শব্দের জন্য তিনি বাংলাকেই নিরাপদ আশ্রয় ভেবে নিলেন- যেমন মায়ের কোলে শিশু। একবার ভরদুপুরে ভাতঘুমের প্রস্তুতিকালে শেক্সপিয়র তাঁর হাত ধরে এই অবসরে কোনো বীমা কোম্পানির দালাল হবার পরামর্শ দিলে আত্মাপমানে প্রায় বছর কুড়ি কাল তিনি পঞ্চাশের কবিতার মধ্যবিত্ত বারান্দা থেকে আপাত অবসরে যান। তৎক্ষণাৎ কতিপয় অনাথ বালক তাদের কোনো অভিভাবকের নিখোঁজ হওয়া সন্দেহে গভীর অরণ্য চারণে আগ্রহী হলে- হঠাৎ লতার আড়াল থেকে ডাক আসে- কুহু। আর তাকে নির্ঘাৎ গুপ্তচর ভেবে বালকেরা সোল্লাসে ঘোষণা করে- স্নিগ্ধ তুমি, প্রথম রাত্রির চাঁদ- অস্তে ভ্রমাকুল। বকের পালকে লেখা আবার পুরী সিরিজ থেকে উদ্ধৃত করে উৎপলদা বলেন- এবার বসন্তে দেখো- পেয়ে যাবো সেলাই মেশিন। পৃথিবীর মহত্ত্বম অস্থিরতা সংকলনে পুরী সিরিজের কিছু হাড়মাংস পোড়াবার কালে জেগে ওঠে তাঁর হস্তচালিত প্রাণতাঁত, মেশিনলুম। মুখোমুখি, ঘাসের জঙ্গলে পড়ে থাকা নিরক্ষর বেশ্যাদের চিঠিগুলি থেকে এই সব পোড়াগন্ধ অনেকে আন্দাজ করে নাক চেপে কিছুক্ষণ বাগানে ঘোরেন। কিংবা অদূরে ঘুম আর বোঝাপড়ার মাঝখানে ধ্বনিবহুল ধানক্ষেতের আড়াল তুলে উড়ে যায় যুদ্ধক্লান্ত মানুষের খণ্ডবৈচিত্র্যের দিন। আজকাল সালমাজরির কাজ বুঝে নিয়ে যারা কিছু একটা করেকেটে খায়- হঠাৎ পরিদর্শনে আগত পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাধিকারিক বাথরুমে গেলে নাইটস্কুলের খোলা চত্বরে তাদের জন্য যথার্থই উপভোগ্য হয় কহবতীর নাচ। একা একা কিংবা অদৃশ্য শরীরচিহ্নে যে সকল সুখ দুঃখের সাথী ধূসর আতাগাছ ঘিরে একপ্রকার এক্সিবিশন পরিকল্পনা করে- আমাদের নিজস্ব সংবাদ প্রতিবেদক বর্ষার রূপমুগ্ধ হয়ে- বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে- জলে নেমে মীনযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ায়- পৃথিবীর কোনো সংবাদ মাধ্যমেই এ সংবাদ পরিবেশিত হতে দেখা যায় না। কতিপয় বিদুৎচালিত তাঁত এবং দরিদ্র জনপদ ঘিরে আভাঁগার্দ কবিদের শ্রবণ ও ঘ্রাণেন্দ্রিয় বিদ্যুতের তাপে মেপে নিতে গিয়ে সৌরলাতায় জ্বলে গেছে সমস্ত সংসার। তারো বহু আগে- নিয়মিত বিরতির পর কাঁপা হাতে সাহায্যের প্রতিশ্র“তি বয়ে এনেছিলেন পৃথিবীতে অহিংস মানবধার্মিক- অন্নদাতা জোসেফ    
 

২৩
জাতিসংঘের মরচে ধরা চাবির জন্য কবি আবুল
হাসানের কোনোই দুঃখ ছিল না
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

ভাল আছি, খুব ভাল আছি? আবুল হাসান। রাত্রিদিন পৃথক পালঙ্কে শুয়ে অচিকিৎস্য আরোগ্যের পাশে তোমাকে দেখাচ্ছে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। রাজা যায় রাজা আসে আর আমাদের মাঠভর্তি ধানক্ষেত দীর্ঘকাল অরক্ষিত থেকে এবার বানের জলে ভাসে। যে তুমি হরণ করো তার টিকিটি ধরে একবার পচাডোবা এঁদো পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলে- এইবার দীর্ঘদিন তোমার লক্ষ্মী বোনটিকে নিরুপদ্রবে লাল শাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে বৈকি। অথচ তার নগ্ন নিমিত্ত দেখো : একদিন তোমার নিজের চিবুকের কাছেও ভীষণ একা হয়ে গেলে। আর একদিন এইসব অসহ্য সুন্দর তোমাকে মানিয়ে গেলেও- জাতিসংঘ তোমাকে মেনে নিতে পারেনি কখনো। আর সেই থেকে ভাবতে বসে গেলে : দুঃখের কোনো মাতৃভাষা থাকতে নেই কেন। কেবলই লাবণ্য ধরে- এমন পাথর, তার হিতাহিত ধরে টান দিতে গিয়ে একদিন মৃত্যু এসে তোমাকে নিয়ে গেল আবুল হাসান। তোমার বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, ততদিন তোমার বাংলায় কোনো মৃত সুন্দরীকে গোর দিতে দেখেছিলে বলে মনে করতে পারছ না ভেবে- পুলিশ ও মানুষের মধ্যে যথার্থ বৈষম্যজ্ঞান তোমার আমৃত্যুই থেকে গিয়েছিল। তোমার উদিত দুঃখের দেশে পানপাতা হলুদ হতে হতে আমরা তো ভুলে গেছি নিসর্গের প্রকৃত বানান। তবু ভেবে দেখি, বেশ ভাল আছি (?), তুমি কেমন আছ আবুল হাসান!

২৪
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় শেষ জীবনে স্ত্রীদের মাইনের
ওপর নির্ভরতা কমাতে বলেছিলেন
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

কাছেপিঠে কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটি সোনার মাছি খুন করে পাড়াময় পুলিশের রামরাজ্য কায়েম করে বসেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের চেয়েও মহান কোনো অভিভাবক। একবার তাঁর ডান হাতে ধারালো ছুরি বসিয়ে বিভাজন করে দেখেছি- তিনি অনর্গল ইংরেজি বলে যেতে পারেন, ঘুমাতে পারেন কাটা হাত নিয়ে এবং ঘুমাতে যাবার আগে-পরে যখন নিয়ম করে কবিতা লিখতে যান- তাঁর বিভাজিত হাত মেঘমুক্ত আকাশের মতো অজস্র তারকায় ভরে ওঠে। তাঁর চোখ দুটো রিক্ত হ্রদের মতো কৃপণ করুণ বলে কেউ প্রশ্ন করলে আত্মাভিমানে বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে পড়ে অচেনা দরজায় কড়া নেড়ে বলেন- অবনি বাড়ি আছ? তারপর হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাথ বদল হলে পানশালার মানুষগুলো বমি-করা গা মুছে নিয়ে বহুদূর বাড়ির দিকে যায়। এমন প্রচ্ছন্ন স্বদেশ- কেবল পাতালে টেনেছে বলে যারা ভাববার শুধু ভাবে- ভাত নেই, পাথর রয়েছে কেবল- এই দেশে তবু কবিতার তুলো ওড়ে? আর যারা আনন্দের বিহ্বল ঘোড়ায় চড়ে বলে, সুখে আছি, ছিন্নবিচ্ছিন্ন আছি- তারা তো সেই- যারা ধর্মেও থাকেন জিরাফেও থাকেন। যাদের পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি একদিন ঝড় এসে শূন্যে মিলিয়ে নিয়ে যায়- পরক্ষণেই শোনা যায়- প্রভু নষ্ট হয়ে যাই। আর একদিন যখন ঈশ্বর থাকেন জলে, কক্সবাজারে সন্ধ্যা নেমে এলে আমরা ও কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ও চির প্রণম্য অগ্নি’ বলে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি গভীর ভাটায়; এবং পরস্পর হিতাহিত হারিয়ে ফেলে কেউ যখন শুনি- কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে- আর, চাঁদ ও চিতাকাঠ ডাকে আয় আয়- বলি, যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো? ঘরে যে চির প্রতীক্ষায় আছে সন্তানের মুখ
 

২৫
কবি সুব্রত সরকারের ছোটবেলার দুঃখ ঘেঁটে
চমৎকার পায়েসের গন্ধ পাওয়া যায়
(‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে)

বৃত্তাবদ্ধ মানুষের মুখস্থ পরিধি থেকে সমুদ্র ও নক্ষত্রের মধ্যাহ্ন জুড়ে কতগুলো সৌরচিল উড়ে যেতে দেখেন কবি সুব্রত সরকার। তাদের আকণ্ঠ সঙ্গীত ও দূরদর্শী অভিলাষ ঘিরে ঝরে পড়া পালকের ভাষা অনেকে বোঝে না। অথচ সুব্রত সরকার সমুদ্রের নোনা জল থেকে কতগুলো নরম ডিম নেড়েচেড়ে দেখেন- মানুষ ও এইসব সামুদ্রিক উদ্ভিদের জীবন কতদূর পরস্পরবিরোধী। আর তাঁর দেবদারু কলোনির শখের বাগান থেকে অকস্মাৎ কিছু ঝরাফুল ত্বকের স্পর্শ বুঝে নতুন জীবন পেলে যথার্থই প্রমাণ করেন যে, এই হলো কবি ও দৈবত্বের রহস্যময়তা। একবার বিস্তৃত চলনবিল থেকে তাঁর ভালবাসার মানুষগুলো যখন মাছের পালক, শাপলার সৌন্দর্যগুলো চুরি করে তুলে নিয়ে গেল- তার সমস্ত দায় একমাত্র বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকত্বে ছেড়ে দিয়ে বলেন সুব্রত সরকার- সহ্য করো, বাংলা ভাষা। তাঁর প্রিয় গত জন্মের ঋতু- যেখানে হাজার বছর প্রতীক্ষা করেও চাঁদের দেখা মেলেনি একবার- সেই অসহ্য প্রতীক্ষা ও সাম্প্রতিক বহুত আঁধিয়ার কালে- তাঁর জন্য সান্ত্বনা হেতু আমরা কিছু আঙুর ও কমলার সুগন্ধ প্রেরণ প্রাক্কালে বুঝে যাই যে, তিনি ঈশ্বর ও কল্পনার মাঝামাঝি একটি সুরম্য স্থাপত্য নির্মাণে আসামান্য পারদর্শিতা দেখিয়ে থাকতে পারেন। আর এই সৌন্দর্য তিনি ভাবী কালের কবিদের জন্য রেখে যেতে প্রয়াসী হলে- তাঁর অরক্ষিত নিরাপত্তা বলয় ছিঁড়ে কতিপয় মনুষ্য মুখে কা কা কমরেড বলে অদ্ভুত চিৎকার শোনা যায়। এবং অব্যবহিত পর, ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ানের পূর্বাভাষ বুঝে তাঁর হিতাহিত বোধ শূন্যে মিলিয়ে যায়। ফলে শুশ্রুষা শেষে আমি ও কবি শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমগ্র কাব্যগ্রন্থ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাই। এবং তিনি সুব্রত সরকার এই সব গ্রন্থের দিকে অঙ্গুলি তুলে বলেন- তোমাদের মিথ্যা বলেছি। শুনে, এক পরিচ্ছন্নতা ও বিষাদের দেবী জিহ্বায় কামড় কেটে বলেন- একাকী মানুষের কোনো সৌন্দর্য থাকতে নেই বলে কবি সুব্রত সরকারের প্রতি স্পর্ধা আজ তোমাদের মাথায় তুলেছে

*********************************   

ওবায়েদ আকাশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ধ্যানজ্ঞানে সর্বক্ষণ কবিতা আর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন গণমাধ্যমের চাকরি। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (বর্তমান সময়, ২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), দুরারোগ্য বাড়ি (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (বিশাকা, ২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (আগামী, ২০০৬), তারপরে, তারকার হাসি (আগামী, ২০০৭), শীতের প্রকার (বৃক্ষ, ২০০৮), ঋতুভেদে, পালকের মনোবৃত্তিগুলি (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০০৯), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯), যা কিছু সবুজ, সঙ্কেতময় (ইত্যাদি, ২০১০), স্বতন্ত্র ৬০টি কবিতা (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (ইত্যাদি, ২০১১), ওবায়েদ আকাশের কবিতা ॥ আদি পর্ব (কাব্য সংকলন, জনান্তিক, ২০১১), শুশ্রƒষার বিপরীতে (ধ্রুবপদ, ২০১১), রঙ করা দুঃখের তাঁবু (ইত্যাদি, ২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, ইত্যাদি, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, শুদ্ধস্বর, ২০১৩), উদ্ধারকৃত মুখম-ল (বাংলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (কলকাতা, উদার আকাশ, ২০১৪), ৯৯ নতুন কবিতা (ইত্যাদি, ২০১৪), বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল (বৃক্ষ, ২০১৪) এবং পাতাগুলি আলো (ইত্যাদি, ২০১৬)।
 
অনুবাদ :
‘ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্র“তি বহন করে না’ (ফরাসি কবিতার অনুবাদ, জনান্তিক, ২০০৯)
‘জাপানি প্রেমের কবিতা/ এমন কাউকে ভালবাস যে তোমাকে বাসে না’ (জাপানি প্রেমের কবিতা, জনান্তিক, ২০১৪)

গদ্যগ্রন্থ : ‘ঘাসের রেস্তরাঁ’ (বৃক্ষ, ২০০৮) ও ‘লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (ধ্রুবপদ, ২০১২), চারদিকে উদ্যানের সৌরভ (ধ্রুবপদ, গল্পগ্রন্থ, ২০১৪) ।
সম্পাদনা গ্রন্থ : ‘দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা’ (শিখা, ২০১২)।
সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : শালুক (১৯৯৯Ñ)
পুরস্কার ও সম্মাননা:
‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’।
‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯’।
সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’।
কলকাতা থেকে সাহিত্যের ছোটকাগজ ঐহিক সম্মাননা পদক ২০১৬।
 
 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E