৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ২১২০১৭
 
 ২১/০১/২০১৭  Posted by

গৌরাঙ্গ মোহান্ত’র কবিতাকুশল
– ওবায়েদ আকাশ

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

পাঠক-নন্দিত টেক্সবিন্যাসে সমসাময়িক সাহিত্য, চিত্রকলা এমনকি সঙ্গীতে অলঙ্কার এক ধরনের আয়েশী রাজত্ব করে চলেছে। এই আয়েশ নিরপরাধ কিংবা নিরীহ কাকতাড়ুয়ার মতো কখনো যেমন আতঙ্ক তৈরি করে ফসলের সমূহ ক্ষতির হাত থেকে কৃষককে এবং নিজেকে রক্ষা করছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক চলার স্বাচ্ছন্দ্য। যেমন কাকতাড়ুয়ার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত পাখি তার অধিকারবঞ্চিত হচ্ছে, সে ফসলের ক্ষেতে ঢুকে তার অধিকারের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

কিন্তু শিল্পের বেলায় ব্যাপারটা কতটা গ্রহণযোগ্য বা বর্জনীয় তা অবশ্য শেষ কথায় বলে বোঝানো সম্ভব হয় না। অন্তত শিল্প রচনার নিকট-সময়ে তো নয়ই। তবে শিল্পের যে চিরকালীন বা শাশ্বত ভাষা কিংবা ধারাবাহিক ইতিহাস তা আমাদের নিকট প্রাচীন বৃক্ষসম শিক্ষাগুরুর মতো। আমরা তার ন্যুব্জ হয়ে বসে থাকা আনত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি অন্তত আপাত শেষ কথাটি শোনার জন্য। আর সেভাবেই রচিত হয় সাহিত্য-সংস্কৃতির নির্মোহ ইতিহাস। গৌরাঙ্গ মোহান্ত’র কবিতাপাঠ আমার নিজের অজান্তে আমাকে দিয়ে এই কথাগুলো বলিয়ে নিয়েছে। এখানে কোনো পূর্বকল্পনা বা পরকল্পনা কাজ করেনি।

সমসাময়িক এই সৃষ্টিপ্রবণতা থেকে গৌরাঙ্গ মোহান্ত হয়তো বেরুতে চাননি, নিজেকে একা ভাববার আশঙ্কায় অথবা নিজেকে পিছিয়ে ফেলবার আশঙ্কায়। তবু লেখকমাত্র স্বতন্ত্র, কবিমাত্র আবির্ভূত স্রষ্টা। গৌরাঙ্গ মোহান্ত তার কবিতার বৃত্ত রচনা করেছেন তার নিজের মতো করে, এতে সন্দেহ নেই। একবার সমকালীন স্বতঃস্ফূর্ততায় আর একবার তার স্বভাব-প্রচেষ্টায়।

গৌরাঙ্গের কবিতার প্রধান প্রবণতা যদি বলি তিনি আসলে মারাত্মক ধ্বনিকাতর কবি। তিনি শব্দ দিয়ে ধ্বনি নির্মাণে ও পরবর্তী জিজ্ঞাসা দিয়ে তার কবিতাকে পরিণতির দিকে বহতা করতে চান। সেক্ষেত্রে তিনি শব্দের আগে-পিছে কখনো বিশেষণ কখনো প্রত্যয় কখনো শব্দাংশ জুড়ে দিয়ে নিজস্ব খেলায় মেতে থাকতে চান। তাতে কখনো বাহুল্য যেমন আসে, অপ্রচল শব্দের, আবার কখনো যুক্তবর্ণপ্রধান শব্দের ভারে ভারি হয়ে ওঠে কাব্যের শরীর। সেক্ষেত্রে বিষয় অনেকটা ঢাকা পড়ে গেলেও কবির চেতনায় তা নতুন এক কাব্যরূপ বলে স্বীকৃতি পায়। আর একারণেই কবি তার পরবর্তী কবিতাটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হন।

“সময়-ধিষণা রোদ-নির্লিপ্ততা প্রভাবিত। কোন প্রকর্ষগুণে সময়কে উপশোভিত করা যায়? গণিতচেতনাশূন্য সময় ক্ষণিকতা ও ধ্রুবতার প্রভেদ যুগপৎ স্বীকার ও অস্বীকার  করে।” [সময়, অধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর, পৃঃ ১৪]

আমার উপর্যুক্ত কথাগুলোর সাথে সাযুজ্য রেখে গৌরাঙ্গের টানা গদ্যের এই কবিতাংশ তুলে দিলাম। এখানে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি কীভাবে কবিতাকে শব্দের ভারিক্কি কিংবা যুক্তবর্ণ দিয়ে সাবলীল রাখতে চেয়েছেন। এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন। গ্রন্থের নামকরণেও সেধারাই অটুট রেখেছেন।
আবার তিনি যখন রচনা করেন, “হিমার্ত তরঙ্গে সূর্য ধুয়ে নিক সমাবৃত্ত সপ্তক।” তখন বর্ণনার সত্যতা ও তার স্বাতন্ত্র্য আরো গভীরভাবে প্রকাশিত হয়।
একইভাবে গৌরাঙ্গ মোহান্ত তার কবিতায় নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার কথা, ব্যক্তিক থেকে সামষ্টিক সঙ্কট, প্রেম-বিরহ, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতার ইশতেহার লিখেছেন তার কবিতায়। তিনি যেমন আধুনিক, তেমনি সমসাময়িক হতেও নিজের কসরতের ত্রুটি করেন নি। লিখেছেন বেশ কটি কাব্যগ্রন্থ।
তার ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’ চীনা কবিতার একটি অবুবাদ গ্রন্থ। এ  গ্রন্থে তার অনুবাদগুলো কিছুটা ভিন্ন উপস্থাপনে ধরা পড়ে। প্রাচীন চীনা কবি লি বাই (৭০১-৭৬২)-এর কবিতার অনুবাদ :

“পুষ্পরাজির মাঝখানে এক জগ মদ;
একা করছি পান, সন্নিকটে নেই কোনো বন্ধু।”

এখানে সহজ সাবলীলপথে পাঠককে অনুপ্রবেশের সুযোগ দিতে দেখা যায়। এখানে ফুলের রাজ্যে কবি লি বাইয়ের মধুর নিঃসঙ্গতা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়।
এ ধরনের কাজ গৌরাঙ্গ তার নিজের কবিতাতেও করেছেন। সরল উপস্থাপনে গভীর বোধ জাগিয়ে তুলেছেন।

“নিস্তব্ধ হয়ে থাকি মাটির কবর।
বাতাসেই ভেসে থাক অনন্ত খবর।”

অনুপস্থিতি জুড়ে নিজের উপস্থিতির নির্মেদ ভাষ্যকার এখানে তিনি। যেমন শব্দের পরিমিতি, তেমনি বোধের গভীরতা, তার কবিতার প্রতি এখানে আকৃষ্ট করে।

শুরুতেই যে প্রবণতা উল্লেখ করেছি, সেই সমকালীন ঝড়, তার বাইরে গৌরাঙ্গের যে উপস্থিতি তাতে সমকালীন কবিতার শনাক্তচিহ্নগুলো ঠিক কতটা স্বাধীন, তা হয়তো তার আগামি গ্রন্থগুলোর দিকে আরো তাকিয়ে থাকতে নির্দেশনা দেবে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E