৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ১৩২০১৭
 
 ১৩/০৬/২০১৭  Posted by

ওবায়েদ আকাশ-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

ওবায়েদ আকাশ : আমি তো কবিতাকে ছোট বড় দিয়ে মূল্যায়ন করি না। অনেক সময় ছোট কবিতায় ক্ষুধা মেটে। আবার অনেক সময় বড় কবিতা পড়েও তৃষ্ণা থেকে যায়। তাছাড়া এখন শুধু ছোট কবিতা লেখা হচ্ছে বা বড় কবিতা লেখা কমে যাচ্ছে– এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ২০১৩ সালে আমার একটি দীর্ঘ কবিতার বই বের হয়েছে। নাম ‘বিবিধ জন্মের মাছরাঙা’ চার ফর্মার এই বইটিতে মাত্র একটি কবিতা ঠ‍াঁই পেয়েছে। আবার ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বইটিও দীর্ঘ কবিতার সংকলন। এই বইতে মোট ছয়টি দীর্ঘ কবিতা স্থান পেয়েছে। আমার বন্ধুরাও কেউ কেউ দীর্ঘ কবিতা লিখছেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, দীর্ঘ কবিতায় ডিটেইল কাজ করতে সুবিধা। ছোট কবিতায় এটা সম্ভব নয়। আমি দীর্ঘ কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার যখন অনেক কথা বলতে ইচ্ছ করে, তখন আমি দীর্ঘ কবিতা লিখি। আর দীর্ঘ কবিতা লেখার জন্য তো অবশ্যই বেশি দম দরকার। আর সব কবিতা লিখতেই অনুভূতির গভীরে যেতে হয়। কম দম নিয়ে অনুভূতির গভীরে যাওয়া যায় না। যিনি ভাল ছোট কবিতা লিখতে পারেন, তিনি চেষ্টা করলে বড় কবিতাও লিতে পারবেন। ইতিহাস ঐতিহ্য অনুভূতি মিথ অভিজ্ঞতা কবিতার মূল শক্তি। এগুলোর সমন্বয়ে ভাল কবিতা লেখা সম্ভব। সেটা দীর্ঘ কিংবা হ্রস্ব– সবই হতে পারে।

 

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

ওবায়েদ আকাশ : অবশ্যই আকারে অবয়বে ছোট হলেই সেটা ছোট কবিতা। পাঁচশ’ লাইনের একটি কবিতাকে আপনি কী করে ছোট কবিতা বলবেন? আর দুই লাইনের একটি কবিতাকে কি দীর্ঘ কবিতা বলতে পারবেন? তবে ছোট কবিতার ব্যাপ্তি হতে পারে গভীরতর। একটি সফল ছোট কবিতাও অনেক স্পেস ধারণ করতে পারে। আবার বড় কবিতাও পারে। মোট কথা হলো কবিতাটি তার সমস্ত চাহিদা পূরণ করেছে কিনা।

 

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

ওবায়েদ আকাশ : কবিতার গঠন কাঠামো আমার কাছে খুবই গৌণ বিষয়। কবিতা লেখার সময় গঠন কাঠামো মাথায় থাকা উচিত নয়। একটি বিষয় বা মনোভাব কবিতায় প্রকাশের জন্য কবিতাই তার গঠন কাঠামো তৈরি করে নিতে পারে। আমার দৃষ্টিতে কোনো ব্যাকরণ না মানাই কবিতার কাজ।

 

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

ওবায়েদ আকাশ : নিশ্চয় পাওয়া যায়। তবে আমি তৃপ্তি পেলে আপনি পাবেন বা আপনি তৃপ্তি পেলে আমি পাবো, এ কথাটা ছোট বড় কোনো কবিতার বেলায় সত্য নয়।

 

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?
ওবায়েদ আকাশ : হয়তো।

 

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

ওবায়েদ আকাশ : আমি প্রচুর ছোট কবিতা লিখেছি।

 

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

ওবায়দে আকাশ : দশটি ছোট কবতিা


কর্পোরেট

কর্পোরেট বিশ্বাসগুলোয় থরে থরে সাজানো রয়েছে রেলগাড়ি
বহুমাত্রিক যাত্রাবিরতি শেষে পরিবর্তিত হয় ইঞ্জিনের চলা

তোমার আমার কর্পোরেট হানিমুনের বর্ণনায় যে
সমুদ্রের চোখ খলবলিয়ে হাসে
তাতে এখন হামলে পড়েছে বহুজাতিক কুড়াল

উঠে আসছে ধোঁয়ায় আকীর্ণ মুখ, বিদগ্ধ মাতৃত্বের নাভি


চা ও চিনির বনিবনা

ঘরভর্তি বিদ্যুতের ফেনায় তোমার পোষা বিড়ালগুলো নাইছে

দেয়ালের রঙ থেকে নামিয়ে রাখছে বৈকালিক পরকীয়া রোদ

চা ও চিনিতে ঠিক বনিবনা হয়নি বলে
ছাদের ওপর বড়শি ফেলে এই দৃশ্য দেখে ফেলছে কেউ
আর জানালার বিশ্বস্ত পাপড়িগুলো পুনর্বার বিশ্বাসী হয়ে দুলছে

পচাডোবা নর্দমার বাইপাস থেকে ভেসে আসছে দুর্গন্ধ হাওয়া
সংসারের নাভি ও হৃৎপি- পচনের গন্ধ যতটুকু অসহিষ্ণু হয়


এ এক আজব ফল

বিস্মৃতপ্রায় গন্দমের মতো এ এক আজব ফল
দাতব্য চিকিৎসালয়ে সবটুকু নির্জনতা ভেঙে তুমি আমি কুড়িয়ে পেয়েছি

সুড়ঙ্গের অতলান্ত ব্যেপে নির্জনতা
উদ্ভিদের শরীরে-শেকড়ে ছড়িয়ে পড়েছে-

আরণ্যক শূন্যতা, আজ এই
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্রী


হৃৎপিণ্ডের ঘুম

সুখী মানুষের হৃৎপিণ্ডের ভেতর বড় হচ্ছে হৃৎপিণ্ডের ঘুম

জানালায়, প্রলম্বিত নির্জনতায় ক্লান্ত স্নায়ু এলিয়ে পড়েছে
মাইনে শোধ করে দেয়া ভৃত্যেরা এই দৃশ্যের সৎকার করে গেল

তাদের দাঁতের ভেতর দিয়ে লুকিয়ে থাকা স্মৃতি
এক্ষুণি খুলতে পারছে না
তারা ঘুমিয়ে পড়া হৃৎপিণ্ডের অভিলাষ হতে
নিজেকে লুকাতে পারছে না

সুখের সম্বন্ধগুলো ফুলেফেঁপে আয়ুষ্মতি হলো
নদী ও নাব্যের ভেতর বড় হচ্ছে ঢোলকলমির ঝাঁক


বুদ্বুদ

নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী বলে, বুদ্বুদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা
কখনো অর্থহীন নয়। জ্বালাময়ী কথার বুদ্বুদের ভেতর
চিরকালের সংবেদনার কথা পাথরে খোদিত

গাছের গুনগুন থেকে জন্ম নেয়া বুদ্বুদ কিংবা
মাছের গুঞ্জরণ ভেঙে শাশ্বত বুদ্বুদের উৎসারণ
যেমন নক্ষত্রে প্রমাণিত সত্য

সুতরাং দেখা অদেখা বিবিধ বুদ্বুদের প্রাচুর্যে
স্বভাব অস্বীকৃতিকে আলোছায়ায় ঝুলিয়ে দিতে পারো না আর

সম্পর্কের সাতনরিহার অগুনতি বুদ্বুদের সমাহার

হঠাৎ মিলিয়ে যাওয়া বুদ্বুদ দৃশ্যে লুক্কায়িত পৃথিবীতে অস্থির সংসার


শেষতম উৎকণ্ঠা জুড়ে

প্রদীপের সলতের গলায় চড়িয়ে দিয়েছি ধারালো ছুরি
কাঁপছে যা কিছু দৃশ্যমানতার পূর্বাপর

তোমার অবতরণের কাল
কৃষ্ণপক্ষের সংরক্ষিত আশ্রয়ের ভেতর ভাসমান

রাতের উরুর নিচে তড়পাচ্ছে কবন্ধ প্রদীপ
আর অহর্নিশ ছুরির চিৎকারের নিচে তোমার আসা যাওয়া

শেষতম উৎকণ্ঠা জুড়ে অবশিষ্ট ছিল মুমুর্ষূ আলোর বিভাজন


অবশিষ্ট

তুমি চিৎকার করে যৌনতার গন্ধ থেকে পরিষ্কার মুক্তি চাইছ

কফ নিবারক ড্রাগের চেয়ে- প্রত্যাশাগুলো অতিরঞ্জিত নয়, জানি

তোমার প্রতিদিনের পৃষ্ঠা থেকে কে বা কারা
নাম কেটে গেছে আশশ্যাওড়া, বেতসের-
আর দূরের খঞ্জনা পাখি রঙ করা দুঃখের তাঁবু
বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছে-

আজকাল, যৌনতার ভাঁজ খুললেই চোখে পড়ে
পানকৌড়ির রক্তাক্ত পালক

পৃথিবীর মুদ্রণযন্ত্রে ভাঁজ হচ্ছে তোমার অবশিষ্ট আয়ু


মাটির ঢেলার নিচে

তারা নাচতে নাচতে ভেঙে ফেলল অনাবশ্যক মাটির ঢেলা
গুটিকয় শীতের কঙ্কাল অনাবৃত রেখে
ঘুমের জন্য বিজ্ঞাপনের রং-মসলা ঘষে নিল ঘাসে

তাদের পাশ দিয়ে একটি সিংহের হুঙ্কার থেকে
ঝরে পড়ল অকৃত্রিম আলো। আলোর ফুসফুসের ভেতর
তাদের ব্যয়িত ভবিষ্যৎ, আর তা থেকে বাঁচিয়ে রাখা কয়েকটি মাছি

তাদের শেষ দৃশ্যের নাচে বড় হচ্ছিল কৃষি সভ্যতার আস্ফালন

বাঁচিয়ে রাখা এক দঙ্গল মাছি পিষে যাচ্ছিল মাটির ঢেলায়


আজো ওড়ে প্রত্ন প্রজাপতি

ঘুমের চাতাল থেকে উড়ে গেছে খসে পড়া ঈগলের ডানা

রাতের বল্লমগুলো প্রাণান্ত উন্মাদনা নিয়ে
দাবদাহের আগুনের মতো কাঁপছে

নির্দিষ্ট বাতায়ন থেকে ভেসে আসছে বিদ্যালয়ের ভাষা
উরুর নিচে কলকে রেখে তুমি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি

মেঘের ওপর মেঘ থেকে শুরু হচ্ছে জাগরণের ব্যথা

চাতালের ধান খেয়ে উড়ে গেছে প্রত্ন প্রজাপতি

১০
নাবিক

নাবিক, তার মায়ের জন্য জাহাজটি উল্টে দিতে পারে
পোশাকের সৌন্দর্য ঘেঁষে তুলে ধরতে পারে অরণ্যের রাত

নোনা জলে অস্থি ভিজিয়ে দেখে
শৈশবের জলের গ্লাসে লুকিয়ে রয়েছে হৃৎপিণ্ডের ধকল
তারা হরিণের শিং, ভেঙে যাওয়া মার্বেল নিয়ে খেলছে

নাবিক, শিলাবৃষ্টির তুমুল বর্ষণে
সামুদ্রিক সনদের কথা ভাবে-

সহস্র বছরের ধুলোয় জাহাজের মাস্তুল তুলে দেয়

*******

 

ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ

জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ধ্যানজ্ঞানে সর্বক্ষণ কবিতা আর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার বয়স ২০ বছর। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (বর্তমান সময়, ২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), দুরারোগ্য বাড়ি (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (বিশাকা, ২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (আগামী, ২০০৬), তারপরে, তারকার হাসি (আগামী, ২০০৭), শীতের প্রকার (বৃক্ষ, ২০০৮), ঋতুভেদে, পালকের মনোবৃত্তিগুলি (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০০৯), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯), যা কিছু সবুজ, সঙ্কেতময় (ইত্যাদি, ২০১০), স্বতন্ত্র ৬০টি কবিতা (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (ইত্যাদি, ২০১১), ওবায়েদ আকাশের কবিতা ॥ আদি পর্ব (কাব্য সংকলন, জনান্তিক, ২০১১), শুশ্রূষার বিপরীতে (ধ্রুবপদ, ২০১১), রঙ করা দুঃখের তাঁবু (ইত্যাদি, ২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, ইত্যাদি, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, শুদ্ধস্বর, ২০১৩), উদ্ধারকৃত মুখম-ল (বাংলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (কলকাতা, উদার আকাশ, ২০১৪), ৯৯ নতুন কবিতা (ইত্যাদি, ২০১৪), বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল (বৃক্ষ, ২০১৪), পাতাগুলি আলো (ইত্যাদি, ২০১৬) এবং মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি (কাব্য সংকলন, ঐহিক, কলকাতা, ২০১৭)।

অনুবাদ :
‘ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্রুতি বহন করে না’ (ফরাসি কবিতার অনুবাদ, জনান্তিক, ২০০৯)
‘জাপানি প্রেমের কবিতা/ এমন কাউকে ভালবাস যে তোমাকে বাসে না’ (জাপানি প্রেমের কবিতা, জনান্তিক, ২০১৪)

গদ্যগ্রন্থ : ‘ঘাসের রেস্তরাঁ’ (বৃক্ষ, ২০০৮) ও ‘লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (ধ্রুবপদ, ২০১২)।

সম্পাদনা গ্রন্থ : ‘দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা’ (শিখা, ২০১২)।

সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : শালুক (১৯৯৯-)

পুরস্কার ও সম্মাননা:
‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’।
‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯’।
সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’।
কলকাতা থেকে সাহিত্যের ছোটকাগজ ঐহিক সম্মাননা পদক ২০১৬।
***

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E