৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ০৮২০১৭
 
 ০৮/০৩/২০১৭  Posted by

লিটিল ম্যাগ : অতীতের ঐতিহ্য হারিয়ে মুলত লেখকই পাঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই
– নাসির ওয়াদেন

নাসির ওয়াদেন

নাসির ওয়াদেন

লিটল ম্যাগ আঙ্গিকে ছোট হলেও, এর অন্তর্নিহিত রূপ ও দর্শন সুতীব্র গভীরে প্রোথিত ।বাঙালি কবি, সাহিত্যিকদের আঁতুড় ঘর এই লিটিল ম্যাগ। বিশ্ব সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বড় বড় কবি, প্রথিতযশা সাহিত্যিক বা প্রাবন্ধিকগণ এই আঁতুড় ঘরে জন্মলাভ করে লালিত পালিত হয়ে আসছেন লিটল ম্যাগের মাধ্যমে। এ বিষয়ে অনেকের মনে এই ধারণা পোষণ হয়ে থাকে যে, লিটল ম্যাগ ব্রাত্য থেকে গেল, এর বিশেষ উন্নতি ঘটল না। অবশ্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, লিটল ম্যাগ সাহিত্যের মূল্যায়নে অস্পৃশ্য-মূল্যহীন প্রয়াস। তথাপি এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে, লিটল ম্যাগই কবির উন্মোচনের প্রকৃত ক্ষেত্রভূমি , যেখানে ভাব ও ভাবনার সংমিশ্রণে ব্যঞ্জিত ধ্বনি-শব্দের মাধ্যমে বিকীর্ণ পথে অসংখ্য নবীন লেখক হাত মসৃণ এবং কারুকার্যশীল করে তোলে,  বাংলা সাহিত্যের আঙিনাতে যে সকল কবিকুলের লেখনী, মেধাশক্তির স্ফুরণ তা এরই হাত ধরে। অনেকে মতামত এইভাবে প্রকাশ করে যে, লিটল ম্যাগের মূল্য বলতে শূন্য –কেবলমাত্র প্রলাপ কথন, পাগলামি ব্যতীত অন্য কিছু নহে। কতকগুলো পাগল একসাথে মিলিত হয়ে মতামত বিনিময়ে সরলীকরণ চিন্তা ভাবনার সংমিশ্রণে ছায়া বৃক্ষ রোপনের  মাধ্যমে বৃক্ষ ডালে নকল পুষ্প গেঁথে সৌন্দর্যায়ন করার প্রচেষ্টা করে। ফলে, মানব হিতার্থের পরিবর্তে বাতুলতা, বাচ্যার্থে উন্মত্ততার সাথে সাথে দাম্ভিকতার প্রকাশ পায়। এ হচ্ছে নিছক কল্পিত বাতাসে ভর করে স্বর্গের বাগানে দোলা খাওয়া আর অবাঞ্ছিত শব্দ তর্ক গেঁথে সময়ের বিনাশ ঘটানো।

লিটল ম্যাগের গুরুত্ব কতখানি এ বিষয়ে নানা জনের নানা বিতর্ক, মতামত,অনুসন্ধানী চিন্তা, কল্পনার মৃতসায়রে অবগাহন কিংবা নৈরাশ্যের ধ্বনিব্যঞ্জনার রূপতীর্থে গাত্র অবলেহন মনে হতে পারে। তর্ক বিতর্কের মধ্যেও তো প্রকৃত সত্ত্বার, বাস্তবোচিত ধারণার, স্বতন্ত্রের সংকেতধর্মী চিত্রময়তা, যন্ত্রণার কৈবল্য রূপ, পরিত্রাণের সহজ সরল পথের দিকও নির্দেশ করে আসছে। তবে, একথা সুনির্দিষ্ট তথ্য সাজিয়ে বলা যায় যে, অন্যান্য সাহিত্যের চেয়ে বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য লিটল ম্যাগ প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। হয়ত পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ লিটল ম্যাগের আয়ু ৩-৫ বছর মাত্র। কিছু কিছু লিটল ম্যাগের সাহচর্য লাভের ফলে অনধিক ২০ বছর টিকে থাকে। অকালমৃত্যু লিটল ম্যাগের অপর চরিত্র। তবে এরই মাধ্যমে অসংখ্য লেখক কবির উদ্ভব ঘটে চলেছে। এরই মধ্যে কিছু প্রতিভাবান, যশস্বী কবি ও সাহিত্যিকের উন্মেষ ঘটেছে ।হাজার হাজার কবিতার মধ্যে দুচারটে কবিতা যখন সামাজিক দায়বদ্ধতা ঘাড়ে নিয়ে সমাজের বিকৃত চিন্তা, বিকলাঙ্গ মতবাদকে বিখণ্ডিত করে পাঠকের দরবারে সুস্থ চিন্তা চেতনার, সূক্ষ্মানুভূতি ভাবনার স্রোত উপস্থাপন করে তখন অনেকেরই মনে গভীরে নাড়া দেয়। সেই সুপ্ত, অবসন্ন নির্মোহ চিন্তাকে উৎসারিত করে, জীবন পুষ্পে পল্লবীত রপে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। হতাশা, বেদনা, যন্ত্রণা, পার্থিব জরা, ব্যাধি, হিংসা অহিংসা, জ্ঞাতিদণ্ড ইত্যাদির মতো মারাত্মক অসুখের উপশম ঘটে। আজকাল লিটল ম্যাগ ও ওয়েব ম্যাগে প্রতিনিয়ত অজস্র কবিতার, গল্পের প্রসব হচ্ছে এবং তার ভেতর কোনটা কবিতা আর কোনটা নয়, তার ব্যাখ্যা সমালোচকরা যেমন করবেন, তেমনি পাঠকের দায়িত্ব বেছে নেওয়া।

আধুনিক কবিতার বিবর্তন কালে কালে ঘটছে, চলছে নিরন্তর নানান পরীক্ষণ, নিরীক্ষণের ভেতর দিয়ে। ক্লাসিকধর্মী কবিতার নিগূঢ় তত্ত্ব ও তথ্য আজও বাঙালির জীবনে ছায়া হয়ে লেপ্টে আছে। উদার অর্থনীতির সাথে উদারীকরণের ফলে বিশ্ব জুড়ে ধনতন্ত্রের অসম ক্ষেত্রে বিলগ্নীকৃত পুঁজির অনুপ্রবেশ, লগ্নি পুঁজির দাপটে বিশ্ব অর্থনীতি বিভাজিত হছে। শোষক শ্রেণির হাতে বিপুল অর্থের আমদানি, অপরদিকে শোষণের শরাঘাতে আহত হাজার হাজার মানুষ নিরন্ন বস্ত্রহীন হচ্ছে, উলঙ্গ অর্থনীতির প্রকোপে পড়ে দিশেহারা হচ্ছে, সেই সাথে ধর্মীয় মেরুকরণে দ্বিজাতিতত্বের অশনি সুর বেজে ওঠছে। যে কথা বলতে চাইছি যে, নয়া উদারনীতির ফলে বিশ্বে যে হারে দিশাহীনতা বাড়ছে তাতে সমাজের ভালমন্দ ধরে একটা সুস্থরূপ দেওয়ার প্রয়াসে কবিদের আশ্বাসবাণীও লিটল ম্যাগে প্রকাশ ঘটছে ও প্রতিভাসিত হয়ে তরুণ লেখকদের অনুপ্রাণিত করছে। আধুনিক কবিতার গঠন, শৈলিকরণের, আঙ্গিকের বর্ণচ্ছটায় যে, শূন্যতার মধ্যে সূচিত হয়েছে তাতে নৈরাশ্যের থেকে মুক্তির পথও নির্দেশিত হচ্ছে। কবিতা যে nothingness বা emptiness থেকে জাত মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে এক জাগতিক সৌন্দর্যের নিয়ে বি-নির্মিত হচ্ছে তার মধ্যে সমাজচেতনার রূপ লাভ করছে প্রতিনিয়ত। কবির রচনাতে যে শূন্যতা থাকছে তার পূরণের দায়িত্ব পাঠকারীর, সেই সাথে সমালোচকের। এই ধারণা কিংবা চিন্তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নামী দামী কাগজের পৌঁছানো সাধারণ কবি লেখকের কাছে মহাসমুদ্রে ডিঙি বা তালগাছের ভেলা নিয়ে সন্তরণ যাত্রা ভিন্ন অন্যকিছু নয়। এক্ষেত্রে লিটল ম্যাগের গুরুত্ব আজও চির ভাস্বর।

লিটল ম্যাগাজিন প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রভূমিতে এর ভূমিকা অপরিমাপেয়। এ বিষয়ে বিতর্ক করে বলতে চাই যে, লেখকই পাঠক, পাঠকই লেখক যাই বলি না কেন, আমাদের সাহিত্যের বিচরণ ভূমিতে লিটল ম্যাগের দান অপরিসীম। প্রত্যেক নামী দামী লেখকদের প্রথম হাতে খড়ি লিটিমল ম্যাগের সংস্পর্শে তা অস্বীকার করলে সাহিত্যের অবমাননা করা হবে। তথাপি দেখি কিছু সম্পাদক নিজের গাঁটের কড়ি খরচ করে, কখনও বউয়ের গয়না বন্ধকী রেখে পাগল হয়ে পত্রিকার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। আমরা দেখেছি যে, বইয়ের স্টলে পাঠক প্রথমে “দেশ” জাতীয় প্রথম শ্রেণীর ম্যাগাজিন খোঁজেন, লিটল ম্যাগ হাতে তুলে দেখেন না। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘ব্যক্তিগত কলাম’ লেখনীতে বলেছেন যে, এক একটি লিটল ম্যাগাজিন বড় জোর চার বা পাঁচ বছর টিকে থেকে তারপর নিঃশব্দে মারা যায়। এদের নিয়ে কোন শোকসভা হয় না। সেই পত্রিকার লেখকরা ছড়িয়ে যায় অন্য পত্রিকায়। অনেকে লেখা থামিয়ে দেয়। লিটল ম্যাগাজিনের অনেক একনিষ্ঠ কর্মী বা লেখক থাকে -তার মধ্যে মাত্র দুজন বা একজনই হয় তো প্রতিষ্ঠা পায়–তাদের প্রয়াসও মূল্যহীন বা গৌরবান্বিত নয়••••।’

বিখ্যাত কবিদের মতো লিটিল ম্যাগ শাশ্বত সত্যের সন্ধান করে থাকে–প্রকৃতির মাঝে নিরন্তর যে সত্য লুকিয়ে আছে তাকে খুঁজে বের করে এনে চিত্রকল্প রূপ দেওয়া কবির কাজ। এ প্রসঙ্গে কেনেথ ক্লার্কের ভাষায়–‘A motion and a spirit, that impels/All thinking things, all objects of all thoughts /And rolls though all things.’ এই ধরনের ছন্দও লিটল ম্যাগ বহন করতে পারে। ১৯৬১ সালের পর থেকে বেশি বেশি করে লিটল ম্যাগের প্রকাশ ঘটে। লিটিল ম্যাগাজিনের ভূমিকা চিরকালীন ও চির সমাদৃত। ষাটের দশকের মধ্যভাগে গড়ে ওঠে ‘শ্রুতি ‘আন্দোলন–কবি মৃণাল বসু চৌধুরী, পরেশ মণ্ডল প্রমুখরা সেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং অনেক পত্র পত্রিকা যুক্ত হয়ে যায়। তবে তাদের কাণ্ডারী পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহমত না থাকলে যোগসূত্র ছিন্ন হয়নি। হাংরিদের সমস্যা যৌনতার, উচ্ছৃংশলতার যা আমেরিকার স্লাম এরিয়া থেকে উঠে আসে গিন্সবার্গ ও অর্লেভস্কি মস্তিষ্ক থেকে। আমাদের বঙ্গ সাহিত্যে তার প্রভাব পড়লেও আমাদের লিটল ম্যাগের আলাদা একটা জগত ছিল। সেই জগত থেকেই লিটিল ম্যাগগুলো ধ্বংসকালীন আন্দোলনের সূত্রপাতের মধ্যদিয়ে “সাম্প্রতিক “পত্রিকার মাধ্যমে বিরোধিতা ও স্বীকৃতির মধ্যে আন্দোলনের গতিধারা ব্যাখ্যাত হয়েছে। কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় “কবিপত্র”র পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময় বলেছেন –আমার লেখার শুরু স্কুলজীবন থেকে। আর স্কুল থেকে বেরিয়ে ঠিক করলাম কবিতার কাগজ বের করব, কারণ লেখা ছাপাবার জায়গা ছিল না তেমন।” তাঁর এই লিটল ম্যাগ ‘কবিপত্র’ ঘিরে Third Literature আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল।

যাই হোক,”লিটল ম্যাগ কোন একটি পত্রিকা নয়, এ এক বহমান স্রোত, অনির্বার আন্দোলন সাহিত্যের নাব্যতা বজায় রাখতে অপরিহার্য যার মহান ভূমিকা।•••এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় রক্ত ঘামের পরিশ্রমী গন্ধ পাবেন।” ”মোহাম্মদী” নামে প্রায় অখ্যাত অজ্ঞাত একটি লিটল ম্যাগ পত্রিকাতে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল “তিতাস একটি নদীর নাম “। অদ্বৈত বর্মন এর এই কালজয়ী সাহিত্য সাহিত্যের পাতায় ঠাঁই করে নেয়। ১৭৩১ সালে এডওয়ার্ড কেভ অক্সফোর্ড এসে “জেন্টলম্যানস্ ম্যাগাজিন “এ যোগ দেন এবংপরবর্তী জীবনে সাহিত্যিক হন। কবি অরুণ কুমার বসু বলেন -নামে বা শ্রেণি পরিচয়ে লিটল ম্যাগাজিন, কিন্তু চরিত্রে সামর্থে সংগঠনে বিষয় গৌরবে এবং আরো একাধিক কারণে বেশ কয়েকটি ম্যাগাজিন আমাদের সম্ভ্রম ও অভিনন্দন আদায় করে নিচ্ছে। অমর মিত্র “ইছামতী বিদ্যাধরী “লিটিল ম্যাগে প্রকাশিত ‘নিরালম্ব’স্মৃতিকথা দেশত্যাগের বিষাদ প্রতিমা বিম্বিত হয়ে আছে।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অতীত পর্য্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে, এর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য ছিল, আছে, থাকবে, কিন্তু বর্তমানে লিট্ল ম্যাগ কিছুটা হলেও অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ছে, সেই জৌলুস ধরে রাখা যাচ্ছে না। অতীতের সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে স্বল্প সংখ্যক ম্যাগাজিন বড় লেখকদের কাছে পৌঁছে যেত এবং পড়ার উৎসুক্য থেকে নবীন লেখককে চিহ্নিত করার সুযোগ ঘটত, কিন্তু ইদানিং সেই দিক আজ বন্ধ। অগণিত ম্যাগ হাতে আসার ফলে অন্যাভাসের পাঠ বাড়ছে, নবীন কবি প্রতিভার মূল্যায়ন ঘটছে না। এ প্রসঙ্গে অন্তর্জাল পত্রিকার বিষয়ে কিছু বলা দরকার, কেননা অন্তর্জাল সাহিত্য হিসেবে যত না স্থান দখল করতে পারে তার চেয়ে মুদ্রিত লিটল ম্যাগ বেশি স্থায়িত্ব দাবি করে। পরিশেষে বলি যে, বাণিজ্য বৃদ্ধির পরোয়া না করে, পুঁজির শাসনতন্ত্র উপেক্ষা করে, প্রতিবাদী চেতনাকে উসকে দেওয়ার সহজ মাধ্যম লিট্ল ম্যাগাজিন –যা নতুন নতুন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক বি-নির্মাণে এগিয়ে থাকে। এখানেই লিটল ম্যাগের ঐতিহ্য আজও চির জাজ্বল্যমান ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E