৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২৬২০১৬
 
 ২৬/১১/২০১৬  Posted by

কবিতা : রূপ, রীতি ও আধুনিকতা এবং আজকের কবিদের প্রসঙ্গে
– নাসির ওয়াদেন

নাসির ওয়াদেন

নাসির ওয়াদেন

কবিতা প্রসঙ্গে আলোচনা কিংবা বিতর্ক করা যেতেই পারে। একথা অতীব সত্য যে, আজকাল আকছার কবিতা লেখা হচ্ছে। এগুলির মধ্যে কোনটা কবিতা আর কোনটা নয়, তা পাঠকের দৃষ্টিতে যেমন ধরা পড়ে, তেমনি সামাজিক ও প্রাত্যহিক জীবনচর্চার ক্ষেত্রে কতখানি গ্রহণযোগ্য তারও  মূল্যায়ন হচ্ছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ভাষার হাজার হাজার কবিতা প্রতিদিনই মাতৃ জঠর থেকে খালাস হচ্ছে, এর মধ্যে বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগতে থাকার জন্য অকাল নিধন ঘটছে। তবে এর মধ্যে একটা দুটো যে কবিতা হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। কিছু বোধের কবিতা তড়পাচ্ছে। জনৈক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, এক আলাপচারিতার সময় আমাকে বলছিলেন যে, হাজার কবিতার চেয়ে একটিমাত্র কবিতাও কবিকে চিরস্মরণীয় করে। নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী”, সুকান্তের “আঠারো বছর”, দীনেশ দাসের “কাস্তে”, জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” শঙ্খঘোষের “বাবরের প্রার্থনা” বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর “যদি নির্বাসন দাও” ইত্যাদি কবির কবিতাগুলো আমাদের দৃষ্টিতে চির ভাস্বর।

কবিতা কেন লিখি? কি ধরণের কবিতা পাঠক গ্রহণ করবে –এসব ভাবনার মধ্যে কবিগণ কষ্টের জলে সাঁতার কাটার মতো আবেগী লিপ্সাতে ছায়ার মতো হাঁটতে থাকে। ফেবুর দৌলতে দুনিয়া মুষ্টিতে চলে এসেছে। ফলে প্রতিদিন ওয়ালে হাজার হাজার কবিতা ভেসে ওঠে, নানান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন লেখক বন্ধুদের সম্মাননা প্রদান করে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার মধ্যে বেশির ভাগ কবিতাই ঝোলে অম্বলে ছড়াছড়ি, পাতে দেওয়ার অযোগ্য। ‘চুল’ এর সাথে ‘ভুল’ বা ‘বাড়ি’র সাথে ‘হাঁড়ি’ মিলিয়ে কবিতা বানানোর অপচেষ্টা যে চলছে তা অস্বীকার করার জো নেই। পরামর্শ বলতে পারেন, ওয়ালে পোস্ট করার আগে আবেগের জলাশয়ে না ভেসে হৃদয়ের তাড়িত ব্যথা, বেদনা, যন্ত্রণা, কষ্টের স্বরূপকে স্থান দিলে কবিতা সর্বজনগ্রাহ্য হবে বলে আমার ধারণা।

এবারে কবিতার কলা-রীতি নিয়ে কিছু বলার তাগিদে বলতেই হচ্ছে যে, গদ্য কবিতাতে নাকি ছন্দ লাগে না। আজকাল গদ্য কবিতা আকছার লেখা হচ্ছে, এতে ভাবনার চেয়ে ভাবের দিকে বেশি ঝুঁকছে আর ছন্দ, কলা রীতি কৌশল মানা হচ্ছে না। ফলে কবিতার মান নিম্নমুখী হচ্ছে, ও কবিতা তার কৌলীন্য হারাচ্ছে।

সাহিত্যের বিচরণ ক্ষেত্রে, সাহিত্যিকদের দিব্যদৃষ্টি ভঙ্গিতে ধ্রুপদী সাহিত্যের বা চিরায়ত সাহিত্যের স্থান অনেক উর্ধ্বে। গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষা, ঐতিহ্যের অনুবর্তন, চিন্তা চেতনা ও পরিচ্ছন্ন ভাবের প্রকাশে অমর হয়ে আছে ক্লাসিকাল সাহিত্য। বর্তমানে রোমান্টিকতা কবিতাতে থাকছে না, তা কিন্তু নয়। রোমান্টিকতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক হারফোর্ড বলেছেন –“an extraordinary development of imaginative sensibility.” কল্পনা প্রবণতার বিকাশ – এককথায় উদারপন্থা । বাস্তববাদের জন্ম কল্পনার মিশ্রিত জলরং,  জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে জনজীবনের চলমান রীতি, প্রথাকে সম্মুখ উপস্থাপিত করার মধ্যেই। বাস্তবের সৃষ্টিতে কল্যাণ, প্রেম, সৌন্দর্যকে জীবনের চালিকাশক্তির বিন্যাসে বিমিশ্রিত ভাবনার সূত্রে গ্রথিত করে উপস্থাপন। “ছায়াগুলো অপসৃত হতে হতেই /মিলে মিশে আঁকে ঈশ্বরের পদচিহ্ন”– এই পংক্তিতে পরাবাস্তববাদের চিন্তাসমূহ বাস্তববাদের আলোকে উজ্জ্বলিত করার প্রচেষ্টা বলা যায়। যুক্তি, নিষ্ঠা, বুদ্ধিবাদী চিন্তা, জীবনের ভয়ংকর কুৎসিত দিকসমূহের মাঝে চুড়ান্ত রূপের পরিণতিতে যথাস্থিতবাদ বা প্রাকৃতবাদের উৎপত্তি। জীবন সম্পর্কে এক নতুন চিন্তা, চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান সময়ে স্যুররিয়ালিজমের ছড়াছড়ি। কল্পনার বিহারে ভ্রমণরত আকাশ পক্ষী, নারদের ঢেঁকি সহযোগে নভোশ্চরে বিচরণ করার ভেতর সচেতন স্তরে হোক কিংবা অবচেতন মনে হোক, নতুন কল্পলোকের জীবনযাত্রাকে যুক্তি তর্কের উর্দ্ধে ঠেলে কবিতা বয়ন, তন্তু সমবায়ের গ্রথিত সূত্রে তুলিত করার মহোদ্যোগ নিয়ত চলছে। এ প্রসঙ্গে হার্বাট রীড বলেছেন -‘Sur-realism in the form expounded by the animator of the movement, Andre Breton, has been profoundly influenced by the dialectical materialism of Marx.’ ফ্রয়েডের ভাষায় ইদ  (id) বা মগ্নচৈতন্য বা অবচেতনমনের মধ্যে যে অনন্ত রহস্য ও অপার বিস্ময় লুক্কায়িত আছে, সাহিত্যে তাকে রূপ দেওয়ার রীতি -ই পরাবাস্তববাদ । এ প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের কাব্য সৃষ্টির মন্তব্য গ্রহণ করা যায়।

পরিশেষে, ছন্দের আলোচনা দরকার বলেই বিতর্কের খাতিরে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, ছন্দহীন কবিতা মানেই গদ্য কবিতা -এটা ঠিক না, কিন্তু কবিতার মধ্যেও ছন্দ থাকতে হবে। ছন্দ কবিতার ভাষাকে অধিকতর সুন্দর, শ্রুতিমধুর, চমকপ্রদ, আকর্ষণীয় ও ভাব-ভাবনাকে পাঠকের হৃদয়গ্রাহী করে তুলবার জন্য পরিকল্পিত রূপে, সুনির্দিষ্ট নিয়ম বজায় রেখে নির্দিষ্ট সংখ্যক মাত্রার পর উচ্চারণের বিরতির মধ্য দিয়ে ছন্দের উৎকর্ষতা রক্ষিত হয়ে ধ্বনি তরঙ্গের সৃষ্টি করে। ধ্বনি ভাষার ক্ষুদ্রতম একক, আর দল শব্দ গঠনকারী শ্রুতিগ্রাহ্য একক। মুক্তদল কিংবা রুদ্ধদল নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে। কলা, মাত্রা, যতি, ছেদ বা বিরাম যে কবিতার আত্মা তা বলাই বাহুল্য। কথায় আছে, “রীতিরাত্মা কাব্যস্য” অথবা “কাব্যং গ্রাহ্য মলংকারাৎ” —শব্দগুচ্ছের মধ্যে কবিতার জীবন, জগৎ, ও রসের সদর্থক অলৌকিক মায়ার জগতের সংমিশ্রণ প্রবল। কাব্যের আত্মা হচ্ছে রস -মানসিক ও বাহ্যিক উপাদানের সমন্বয়।

আদি কবির মুখ নিঃসৃত ধ্বনি শ্লোক -”মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং তমোগম শাশ্বতীস্বমা / যৎ ক্রৌঞ্চ মিথুনাদেকমবধিকাম মোহিতম।” বিতর্কের অবসান কল্পে একথা বলা প্রযোজ্য বলেই আমার মনে হচ্ছে যে, কবিতা নির্মাণ, গঠন শৈলিকরণের ক্ষেত্রে ভাব, ভাবনা, কলা, রীতি, ছন্দ ও আলংকারিক রূপকে প্রাধ্যান্য দিয়ে কি গদ্য, কি পদ্য কবিতা রচনা করা না হলে কবিতা হবে কি? ভাবের ঘরে চুরি না করে ভাবকে ভাবনার রসে সম্পৃক্ত করে আপ্লুত হয়ে ঐশীকরণ মন্ত্রের দ্বারা আচ্ছন্ন থেকে জনজীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হর্ষবিমর্ষ, অবক্ষয় -কে তুলে ধরে নির্মম সত্যের বাস্তবমুখীনকরণে অভিমুখ -কে হাওয়া নিশানের মতো মানবিক রূপে চিত্রায়িত করে কবিতার সর্বকালীন আবেদন কে উন্নততর করে তুলতে পারলে কবিতার উন্নয়ন ঘটবে বলে আমার ধারণা ও বিশ্বাস।  “কে কখন এগিয়ে যায়, কেউ বা পিছনে / সময়ের মোমবাতি ভালবাসে স্মৃতি —-” স্মৃতি অম্লান ও পবিত্র হয়ে কবিতা-বয়ন শিল্পে তন্তু সমবায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক।

*************
লেখক পরিচিতি
নাসির ওয়াদেন। জন্ম – ২৩শে জুলাই, ১৯৫৯। জন্মস্থান – রঘুনাথপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। পেশা – শিক্ষকতা।

প্রকাশিত গ্রন্থ – ১। বুক ছুঁয়েছি নগ্ন রাতে  (কবিতা); ২। প্রিয় ফুল ও অভিমানী ইচ্ছেরা  (কবিতা); ৩। অথবা অন্য পৃথিবী  (গল্পগ্রন্থ)।
সম্পাদনা – সৃজন সংগ্রাম পত্রিকা /চমচম শিশুদের পত্রিকা।
যোগাযোগ : প্রযত্নে- সৌম্য জেরক্স স্টেশন রোড, পোস্ট – মুরারই  (731219), জেলা – বীরভূম। ইমেইল -mdnasiruddin1959@gmail.com. মোবাইল – 8926625921

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E