৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৭২০১৬
 
 ১৭/১১/২০১৬  Posted by
কবি পিয়াস মজিদ

কবি পিয়াস মজিদ

নাচপ্রতিমাগুচ্ছ
– পিয়াস মজিদ


শ্যামাপাখি ডাকছে প্রেতঝরনার দিকে। খরতম ঢেউ নিয়ে বসে আছ শান্ত সাগর। তোমার তলদেশে মৃত্যুমৃণাল, সেবাদাসির সাজঘর আর অনেক অনেক সবুজ পাথর। কারো ঘুমের কাছে আমার জাগরণবেলা, বোবা-বধির ফাল্গুনহাওয়া। ফণিমনসার ঝোঁপে মাতাল জিরাফের সিমেট্রি ঘিরে বেজেছিল যে রক্তবীণা তার দু’ফোঁটা একফোঁটায় ডুবে যাচ্ছে সমস্ত স্বর্গসরণি, নরকপ্রান্তর। ভোরের খাতা নিয়ে বসে আছি; পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় দীপালি ও অমারাতের অজস্র লীলাভাষ্য


গোলাপের লাল অন্ধকার থেকে তুমি দিকে দিকে পল্লবিত কবর। লক্ষ লক্ষ বিপন্ন নক্ষত্রের জানা আছে পিরানহা, প্রেমিকা ও মাতা মেরির ঠিকানা। যখন জন্মান্ধ যুবরাজকে ঘিরে নৃত্যপর ধানফুল, মধুমাছি, রূপালি রাক্ষস। মেয়েদের পায়ে পায়ে সোনা-হিরার শৃঙ্খল। সুকৃষ্ণ রাত খুলে ফেলেছে তার পোশাক-আষাক। কয়েকটা ন্যাড়া শিমুলগাছ দাঁড়িয়ে দেখছে দূর মাঠে মৃত হিমের সৎকার


গন্ধবণিকের মহল্লা ছেড়ে তুমি বারবার ঢুকে পড়ছ বাদাম বাগানে। খুলবে যেন রহস্যের রেশমি সব গিঁট। আর অতিকায় দেব এক সুরের পাহাড়টা মাথায় করে এনে রাখল অমারঙ পরির পায়ে। পুড়ছে বনকুসুম, বইছে হিমহাওয়া। খোলা থাকছে চব্বিশ ঘণ্টা আপেল এবং মৃত্যুবিতান। শিলাস্তর থেকে মেঘের মিনারে কারা বসিয়েছে এত এত খুলি ও হাড়ের পূজা! কাছে অন্ধকার নদী, দূরের পেভমেন্টে স্বর্ণটিপ পরা প্রেতিনীর দল। চিত্রল ছুরি হাতে তারা সব চলছে কোথায়? আমারও যে চাই রক্তিম সুরভির ভাগ


রক্তাভ সমুদ্র। ঝিনুক কুড়োতে গিয়ে সৈকতে খুঁজে পেলাম শত শত লিবিডোকঙ্কাল। কাছে কোনো বনে, রহস্যসবুজে লেপ্টে গেছে নিষ্ঠুর এপ্রিল, গত জনমের গ্লানিগাঁথা এবং তারাবিদ্ধ রাত। তীব্রগন্ধা কুরচি ফুল হাতে পাহাড় ডিঙিয়ে যাচ্ছিল কয়েকজন। যাদের আয়ু আটকে আছে চামেলির শুকনো পাপড়িতে। হাজারদুয়ারি মহল ছেড়ে চন্দ্রগ্রস্ত নর্তকীর দল ঢুকে পড়লে সাপের সভায়। আর এরকম ধ্বংসরেখার সামনে বিষণ্ণ শিল্পী; বাটিতে একফোঁটা রঙও নেই


অকূলে, যমুনায় লাল পালের পাঁচটি তরণী মরে যায়। প্রতি ডিসেম্বরে তাই আমার হত্যাকারীর শুভ জন্মদিন। আর গানওয়ালার বাজনাদার কঙ্কালে তোমার নাচেরা নিখোঁজ। গোলাপজোয়াল কাঁধে দাউ দাউ নীলিমা; পরি লুপ্ত সেই মন্দ্র ভূততায়। পৃথিবীর শেষ নর্তকীর ভ্রষ্টতম মুদ্রায় গেঁথে ওঠে কারো রক্তসবুজ শ্বাস। এভাবে রসাতলই শাশ্বত মঞ্জুশ্রী


তিনটি ঝরনা শোষণ শেষেও আমি জলহীন। আর ঐ সাপের তনুময় বিষের মাদল; ফণা তোলা সাপ বীথিতে নিভে যায়। পাহাড় আজ ঠুম্রির সোনালি হাড়। পিউকাঁহা ছাওয়া পথে রাক্ষসী শ্বাস ফেলে। তখন ফুলে নিশ্চিহ্ন সমস্ত শর। বোবা ছুঁড়ে দেয় মুখর শ্রীভাষা, গ্রহের উপর শুধু দরবারি কানাড়া। নটীমূলে নীলিমার তরঙ্গ উছলায়


বাদামি পাতার পাহাড়; চূড়ায় সোনালি মারবেলের স্যানাটোরিয়াম। আমার শুশ্রুষা নেই আর খিলানে, কার্নিশে। আমাকে পান করে সূর্যকুচি, দ্রাক্ষারস। লাল আগুনে পুড়ছে যখন ঝিঁঝিট, তারানা। হেজেমজে লুপ্ত হয় সবুজ জলের লেক। ফিরে ফিরে আসছে যাচ্ছে নিষ্ঠুর এপ্রিল। আমার পাশে পাশে ধ্বংসধূমল হাওয়া তবু আমি যাব না। মেঘমেঘালি ছিন্ন করে শীতভারাতুর স্যানাটোরিয়ামই আসবে আমার কাছে। স্যানাটোরিয়াম, আমিই তোমার সেই গোপন অসুখ
 

সোনালি পাতাল ফুঁড়ে মৃত্যুছায়াবীথি। পুরনো জামবাটিতে নামস্বাক্ষরহারা বেদনারা ঘুমোতে গেলে ফুটে ওঠো তুমি; গোপন আলো। পরিত্যক্ত কোঠাবাড়ির দিকে ছুটতে দেখি মেয়েদের। তাদের কপালে সীতাভাগ্য, পায়ে মরচে পড়া ঘুঙুর। গা ঠিকরে বের হয় হিংস্র মাধুরী। বিষাদের পর পৃথিবীতে অজস্র হর্ষসিন্ধু কিন্তু তার জল শুষে নিয়েছে কিছু ব্যথাবীণা। আর বীণা ভেঙে সুরবাহার, কান্নাবাহার। আজ পুবের হাওয়া আছে, পশ্চিমে পাহাড়ে আছে, ধুলোয় ডুবে আছে রক্তাভ মৃণাল


চলো চলো বিষডুমুরের বাগিচায়। পথেপ্রান্তে ছিটানো যত তিলক কামোদ। সুর মাড়িয়ে আসতে কষ্ট হবে? ঘুরপথে যে মধুপাতার তাঁবু তোমার জন্যে তাও খোলা। রাতের পর দিন, দিনের পর রাত। হিংস্রতাভরা বক্সগুলো পেলে জমে ওঠবে সন্ধ্যাভোজ। সদ্গতি হতো প্রায় পচতে থাকা কাজুবাদামগুলোর। কিন্তু হিম ডিসেম্বরেও নীল ঘাস নাশকতা ছড়ায়। তোমার পা আটকে যায়, পিছলে যায়। তুমি নিজেই হতে থাক থোকা থোকা বিষের ডুমুর

১০
আমিই আনন্দম, ক্রুশের মিনার। আকাশেরও মগডালে থেকে দেখি কোথায় তুমি – চোরাগোপ্তা ফুল। তুমি তো কাননে নও। কবরখানায় নৃত্যরত লাবণ্যপ্রেত। তোমাতে প্রেম ঢালি। তুমি আজ হাড়ে গলা মোম। আর এমতে কৃষ্ণনিখিল চুরমার। আয় ধ্বংস, আয় সবুজ। চাঁদ ডুবে যায় করুণ রসধারায়। আবার তুমি মা মেরিতে ছেয়ে গেছে; জেরুজালেমে, খড়ের গাদায়। রাত গাঢ় হলে তুমি সোনালি রক্তের জতু। যখন বনভূমি দগ্ধ শৈত্যে – জল ডুবন্ত ঘৃণায়। এই পথ কাঁটাশোভা, এই পথ যিশু। আজ ঝরে পড়ে সব সিডারের গাছ। তুমি তবে নবরূপে রোপিত বিষাদ। তার ছায়ামূলে আমি সংগীতের রিমঝিম জলশা বসাই। সেথা দ্যাখো কেমনে অসুর ঘনায়

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E