৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ০২২০১৭
 
 ০২/০৫/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

মোস্তফা মঈন

মোস্তফা মঈন

মোস্তফা মঈন। জন্ম ৩ মে ১৯৬২ নেত্রকোণায় আটপাড়া উপজেলার গ্রিদান টেংগা গ্রামে। পিতা মরহুম আলহাজ্ব মঈন উদ্দিন তালুকদার। মাতা মোসাম্মৎ বিহুসবানু।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
কালের সেঁওতি মাপে জল (২০০১)
শ্বাস পতনের শব্দ (২০০৩)
রক্ত মাংসের শ্লোক (২০০৮)
হাড়ের পিয়ানো (২০১৫)
গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন (২০১৭)

সম্পাদনা : ছোট কাগজ “ডুমুর”

বর্তমান ঠিকানা : সহকারী শিক্ষক
                   শরীফাবাদ দাখিল মাদ্রাসা।
                   গ্রাম : শরীফাবাদ, ডাকঘর : শরীফাবাদ
                   জেলা : হবিগঞ্জ।
মোবাইল : ০১৭১৫-০০৯০৭৩, ০১৫২১-৩২১১৩৫

মোস্তফা মঈন-এর কবিতাভাবনা
আসলে প্রেমের গর্ভেই কবিতার ভ্রুণ

এক

ভাষা ও কবিতা ভাবনা :
জীবনের চৌকাঠে আমার কান পাতা। যেন খুলে যাচ্ছে সমস্ত অর্গল। আমার জানালা কপাট ঠাস ঠাস খুলে যাচ্ছে। ঝোড়ো শব্দের বাতাস বইছে। ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার হাড় পাঁজর। আমার খাঁজ কুলুঙ্গিতে যা ছিল … যেন তুলো ধুনোর মতো, তৃণ খড়ের মতো উড়ছে, উড়ছি আমি। আর এভাবেই একদিন সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে আমার ভেতরে শুরু হয়ে গিয়েছিল কোনো ঝোড়ো কবিতা।
কবিতা কী ? আক্তাভিও পাসের মতে, ‘ কবিতা হলো পাথরের ভেতর সূর্যের অনুসন্ধান।’ কিন্তু জীবন এতো রহস্যময়! তাই বুঝি কবিতার ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে রহস্যময়তা। শব্দে শব্দে ঠিকরে পড়ে আলো। জীবনের সত্য ওঠে আসে সুন্দর। ভাষার এই সুন্দর রহস্যময়তাই সম্ভবত অজর কবিতা।  

মাত্র একটি শব্দ। বিন্দুর ভেতর সিন্ধুর ভাবনা যেন। মুহূর্তে সীমাহীন শূন্যতার ভেতর এক সুতীব্র আলো। কবিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। পাক খেতে খেতে জীবনের গভীর থেকে ওঠে আসে কোনো দার্শনিক কবিতা। কবিকণ্ঠে জন্ম নেয় কোনো অখ- হীরক। সময়ের ফুল পাপড়ি ও পরাগ।

কবিতা আমাদের কী দেয় ? জীবন ও সময়ে ভাষার পরিচ্ছন্ন শুদ্ধ উচ্চারণ।

আর এরকম নয়, এভাবে আর চলতে পারে না। এ অস্থির সময়ে আমাদের জীবন ও সমাজকে বদলাতেই হবে। এই রুক্ষ কঠিণতর জীবন আমরা চাই না। আমাদের এই নগর জীবনে চাই ভালোবাসার কোনো সহজ মানুষ। আর সহজ মানুষ বলতেই আমাদের মনে পড়ে যায় সেইসব সাধক, কবি লালন ফকির, হাছন রাজা, হাফেজ সিরাজী, ওমর খৈয়ামসহ পৃথিবীর নানা ভাষার কবি ও তাঁদের কবিতা। আমরা আসলে কবিতার ভেতরেই পেয়ে যাই শুদ্ধ সহজ প্রাকৃতিক মানুষ। আমরা কবিতার কাছেই ফিরে যাই। কারণ কবিতা আমাদের পরস্পরকে ভালবাসতে শেখায়। কবিতা বদলে দিতে পারে আমাদের জীবন ও সমাজ। কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াই। আমরা চিনে নিতে পারি নিজেদের। ঠিক এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে সেই গ্রন্থটি: কহলীল জিব্রানের  ‘প্রফেট’।

সব ঝেড়ে খোলস ছেড়ে একেবারেই বদলে যাওয়া। যেন এক অন্যরকম জীবন জিজ্ঞাসা। নতুন কোনো কাব্যভাষা। প্রচলিত জীবনধারা ও কাব্যভাষার নিয়ম নীতি ভেঙ্গে দিয়ে একেবারেই নতুন। চিন্তা ও ভাবের নিরীক্ষায় ভাষার পরিশুদ্ধ উচ্চারণ। আমাদের নতুন কবিতা।

আমাকে আরো সংক্ষিপ্ত করো হে কবি তোমার শব্দ চাবুক চালাও…
[ অনুকাব্য ৩২, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন/ মোস্তফা মঈন ]

অপ্রয়োজনীয় যা কিছু আছে সব ঝেড়ে কবিতার জন্য যা প্রয়োজন। একজন কবির কাছে কবিতা তা-ই দাবি করে। যখন কবি নিজেই হয়ে ওঠেন কোনো দিব্যকান্তি কবিতা। তাঁর ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন ভাব ও ভাষার কবিতা।

প্রত্যেক কবি তার মাতৃভাষাকে নতুনত্ব দান করেন। কিন্তু পাঠক সহজেই প্রচলিত কবিতার ছন্দ ও ভাষা ছেড়ে নতুন কাব্যভাষার সাথে নিজেকে মেলাতে পারেন না।
“কবিতার যারা নিয়মিত পাঠক নন, তাদের মধ্যে এখনও এরকম একটি ধারণা প্রচলিত আছে, ছন্দ মিলের সাহায্যে যা রচিত হয়, তা-ই কবিতা। ‘আমি কিরকমভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’- এই লাইন রচনার তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর পরেও কবিতা বিষয়ে অজ্ঞতা অনেকের মন থেকেই পুরোপুরি অপসৃত হয়নি। ‘ছন্দ মিল নেই, এ আবার কবিতা নাকি! এ তো সবাই লিখতে পারে!’-এরকম একটি শিশুসুলভ ধারনা মনে মনে পোষন করে তারা শিশুসুলভ আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। তাঁরা জানেন না যে ছন্দ মিলের সাহায্যে যা-ই রচিত হয়, তা-ই কবিতা নয় কিংবা অন্যভাবে বলা যেতে পারে: ছন্দ মিলের সাহায্য ছাড়াও কবিতা রচিত হতে পারে। কবিতায় থাকে গভীরভাব, আক্ষরিক অর্থ ছাড়াও আরো অর্থ- অন্তর্নিহিত অর্থ। [”-কবিতা কেন কবিতা, সুজিত সরকার।/পৃষ্ঠা ১৯২,  “পোয়েট ট্রি”  ভলিউম ১, সংখ্যা ২, জুলাই ২০০৮, সম্পাদক- রহমান হেনরী।]

কবিতা আমাদের জীবনকে সহজ ও সরলীকরণ করে। জীবনে হুচট খেতে খেতে আমরা কবিতার কাছেই ফিরে যাই। চাই উষ্ণ ভালোবাসা। আমার একজন বন্ধু রনজু রাইম লিখলেন:

– শুধু কবিতার জন্য বার বার জন্মাবার সাধ।

কবিতা যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রকৃতি নদী পাখি ফুল সমৃদ্ধ ঝর্ণাধারা। আমরা সেই ধ্বনিময় ঝর্ণাধারার সামনে দাঁড়াই। যেন থরে থরে সাজানো কোনো জীবন দর্শন। শব্দময় ফুলে ফুলে সাজানো ফোটে থাকা সুন্দর। আমরা এসব ফুলে ফুলে সুবাসিত ঘ্রাণে স্নাত হই, চাই পরস্পর আলিঙ্গন। ভালোবাসা।

পৃথিবীর যে কোনো মঞ্চে আমরা কবিতা চাই। পৃথিবীর সকল ভাষার সেই শান্ত স্নিগ্ধ কবিতার কাছেই আমরা ফিরে যাই। পৃথিবীর প্রতিটি কবিতার ভেতরে পাঠ করি আমাদের জীবন।  

“আমি আলোর চাতালে এসে দাঁড়াই। পান করি আলো। পাঠ করি জীবন।
এই পানশালয় পানরত সবাই প্রতি মুহূর্তে হয়ে ওঠে এক একটি তেজী ঘোড়া।
চারদিকে দৃপ্ত দাপট। ছড়িয়ে পড়ে আলোক হ্রেষা খুর। জন্ম নেয় অখণ্ড হীরক।
কুণ্ডলী পাকায় হীরক জোছনা।
আমার ঢুলুঢুলু ঘোর। ঘোর একটা শাদা ঘোড়ার দৌড়। দ্যোতিমান ঘোড়ার
লেজে ঝুলে যায় আমার চোখ। ওর রেশমি লেজ ছড়িয়ে দেয় সবুজ শস্য ভরা
দারুচিনি গ্রাম। মসলা ঘ্রাণ সচিত্র পাতা বৃক্ষ সবুজ ডাল।
ডালের দিকে ওড়ে যায় পাখি বনঘুঘু।
গ্রাম বালিকা হাসে। আলোর উৎসমুখে লাল শাড়ি বউ কলসী ডুবায়।
আমরা পান করি আলোর মধু।”  
[- “শাদা ঘোড়ার দৌড়”, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন/ মোস্তফা মঈন ]

একটি কবিতার ভেতর দিয়ে যেন আমি নতুন করে জন্মাই, ফিরে পাই আমাদের ইতিহাস, আমার বোধ চৈতন্য, যেন টলমল অথচ স্বচ্ছ জলের ওপর কবিতা কীরকম যেন ভালোবাসায় বিবৃত করে আমাদের প্রকৃতি, ব্যক্তি ও বৈশি^ক জীবন।

দুই

পৃথিবীর মাটিতে প্রথম মানুষ পা ফেলার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সেই কাব্যিক ভাষা। মানুষের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছিল সেই ভাষার নিখুঁত স্বর, তার কণ্ঠস্বর। মানুষের কণ্ঠে ভাষার প্রথম স্বর কী ? ‘ কান্না ’ , ‘ হাসি ’। আমাদের কান্না ও হাসির নিজস্ব শিল্প ভাব ভাষা ও ছন্দ রয়েছে। কবিতার মতোই আমরা চিনে নিতে পারি পৃথিবীর যে কোনো ভাষার যে কোনো মানুষের হৃদয় ছেঁড়া কান্না। আর যে কোনো মানুষের বুক ভরা ভালোবাসা আমরা বুঝে নিতে পারি তার ছন্দময় হাসিতে। পৃথিবীতে এ ভাষার কোনো বিকৃতি বা বিলুপ্তি নেই। মানুষ জন্মগত ভাবেই মাতৃগর্ভ থেকে নিয়ে এসেছিল এই ভাষার প্রাকৃতিক স্বর, আমাদের ভাষাসূত্র। কোটি কোটি বছর ধরে কলকল ছন্দে মানুষের কণ্ঠে বেঁচে আছে সেই স্বরের ভাষা।

“আমি ও আমার ভাষা একসাথেই ভূমিষ্ঠ হই। কবিতা আমার জন্মভাষা।”
[অনুকাব্য ৫৮, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন, মোস্তফা মঈন ]

অথবা

“এই জন্মে আমি যখন পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করছি।
আমার জন্ম নেওয়ার আনন্দে মায়ের পার্শ্ববর্তিনীরা মুখ টিপে টিপে হাসছিল।
শুকনো খড়-বিচালির ওপর  রক্ত পিচ্ছিল মুখ, আমার হাত, আঙুলের নখ,
সেইসাথে এতটুকুন হাসি, গলা ছেড়ে চিৎকারটাও উপভোগ করছিল।
এই-ই ছিল আমার জন্ম কবিতার প্রথম স্বর, আমার প্রাকৃতিক স্বভাব
ঠোঁট মেলে ধরা হাসি, জীবনের অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রথম অভিপ্সা।
…পৃথিবীর প্রতিটি কবিতার ভেতর দিয়ে জন্মাচ্ছি আমি… আমার বিচূর্ণ ভ্রমণ। ”
[ -প্রথম অভিপ্সা, কাব্যগ্রন্থ: গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন – মোস্তফা মঈন ]

কোটি কোটি বছরের পথ পরিক্রমায় পৃথিবীর জনপদে জনপদে মানুষের মুখে মুখে ফুটে উঠেছিল ভাষা। নিজেদের কণ্ঠকে কাজে লাগিয়ে মানুষ কিভাবে শুরু করে দিয়েছিল তাদের ভাষা বিনিময়? কিভাবে শুরু হয়েছিল সেই ভাষার বিকাশ? ভাষার লিখিত রূপ আনতে গিয়ে কতো চর্চা ও গবেষণা করতে হয়েছিল মানুষের? কারা সেই ভাষা সংগ্রামী মানুষেরা? নিশ্চয়ই কোনো রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, ধার্মিক ও ব্যবসায়ী কেউ নয়।

রাজনীতিক ও ধর্মপ্রাণ দু’জন বন্ধু ছিল আমার। তারা আমার কবিতা লেখাকে মোটেও পছন্দ করতো না। তিরস্কার করে তারা একদিন বলেই ফেলল, “ কবিতা লিখে তোমার ভাত জুটবে না। তুমি ওসব কবিতাটবিতা ছাড়।” আমি ভাবি, হ্যাঁ বেঁচে থাকার জন্যে খাদ্য তো চাই-ই। আমরা রোজ রোজ তিনবেলা করে খাবার খাই, কিন্তু এই খাদ্য আসে কোথা থেকে?
আমরা জানি, আমাদের কৃষক পিতা মাটি চষে তুলে আনেন খাদ্য। ( অবশ্য কৃষক ছাড়া অন্য কেউ মাটি চষে ফসল ফলায় না। খাদ্য জোগায় না মানুষের। যদিও সবাই ভোগ করে।) আমার খুব মনে পড়ে, একদিন দুপুরবেলা ভাদ্রের ভরা রোদের ভেতর আমাদের চাষের জমি থেকে হঠাৎ কীসব চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল। আমার ভেতরে এসে বিঁধে যাচ্ছিল সেই শব্দময় তীর!
“ আমরা গরুরাই কেবল চষে যাই মাটি। সারাদিন রোদে পুড়ে লাঙল চালাই। মাটির তলা থেকে তুলে আনি মানুষের খাদ্য। কিন্তু আমাদের গলায় ধরা থাকে চকচকা ছুরি! আমাদের বুকে পিঠে লেপ্টে থাকে দলাদলা রক্ত! আমাদের ঘাড় গলা কাটা।”  আমি শিউরে উঠি। আমার পা যেন চলে না। এ কার রক্তাক্ত গলা শুনতে পাচ্ছি আমি?

তিন

হ্যাঁ, আমি ভাষা ও কবিতার কথাই বলছিলাম। আমরা প্রতিদিন কতোসব কথা বলি? কথা বলার জন্যে নির্দিষ্ট কোনো সময় আমাদের হাতে আছে কী? আমরা তো কথা বলতে বলতেই ঘুম যাই। আমরা স্বপ্নেও কথা বলি, কিন্তু আমাদের কথাগুলো কেবল বাতাসেই উড়ে।

পৃথিবীতে এমন অনেক ভাষা আছে, কথা বলার অনেক মানুষও রয়েছে, যাদের ভাষা মৃত। সেসব ভাষার কোনো লিখিত রূপ নেই। যেসব ভাষায় কোনো গ্রন্থাদি নেই। সুস্থ সমাজ গঠনে যাদের কোনো লিখিত ভূমিকা নেই। যারা কেউই লেখালেখি করে না। যারা নিজেদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসে না। যারা নিজেদের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে না। শিল্প সাহিত্য বলতে যাদের কিছু নেই। যাদের চিন্তাগুলো কেবল বাতাসেই ঠাঁই পায়। তাদের ভাষা মৃত।

আমাদের চোখের সামনেই তো সিলেটের নাগরি ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে।  

আমরা জানি, এক ভাষা অন্য ভাষাকে খেয়ে ফেলে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয় ভাষা। ১৯৫২ সালে আমাদের বাংলা ভাষাও পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল। তথকালিন শাসকেরা আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের উর্দু ভাষা। এতদিনে এই ৬৫ বছরে কবেই মরে পচে যেত আমাদের মাতৃভাষা। ’৫২- এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো নাম না জানা ছাত্রদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই আমাদের মাতৃভাষা। আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা। কিন্তু এখনো সেই পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। আমাদের চোখের সামনেই তো বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার নামে এখনো শেখানো হচ্ছে সেই উর্দু ভাষা।   

 
চার

আমরা আসলে স্বপ্নেও কথা বলি! আর এই কথাই আমাদের নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সূক্ষ্ণ চিন্তা ও আবেগের বিস্ময়কর দার্শনিক ফসল কবিতা। আমাদের কথায় আনন্দ থাকে, আমাদের কথায় চোখ ফাটা জল জড়িয়ে থাকে। তাই কবিতায় আমাদের জীবনের নানা অনুষঙ্গ এমন ভাবে ওঠে আসে- যা আমাদের জীবনকে নতুন ভাবে ভাবতে শেখায়। আমাদের চৈতন্যে আশাবাদ জাগায় কবিতা। কিন্তু কারা জীবন চষে সেই আমাদের কৃষক পিতার মতোই তাদের চিন্তার ফসল কাব্যময় সংসার রচনা করেন ? বাঁচিয়ে রাখেন আমাদের শিল্প সাহিত্য, বৈচিত্রময় এই প্রকৃতিবিশ্ব চষে রচনা করেন কবিতা।
কবিতা যেন একটি মুহূর্তিক ঘটনা। কিন্তু কবি অনুভব করেন তাঁর একাকিত্ব। সৃষ্টির জন্যে নিবিড় একাকিত্বে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন। আর সহসা জন্ম নেয় তাঁরই আত্মজা কোনো হাস্নাহেনা ফুল। কবিতা। বিস্ময়ে কবি তাকিয়ে থাকেন তাঁরই গ্রন্থি ছেঁড়া গর্ভফুল, নবজাতকের দিকে। এ আনন্দের শেষ নেই।  আসলে প্রেমের গর্ভেই কবিতার ভ্রুণ। কবি ভাবেন,  

“একাকিত্বের আনন্দ অসীম। যখন আমাকেই নিজের গর্ভে ধারণ করি।”
[অনুকাব্য ৮৬, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন, মোস্তফা মঈন]

কবি কান পেতে থাকেন তাঁর চিন্তা ভাব ভাষা ও প্রেমের জগতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় : “ আমি কান পেতে রই…।”

“ভর সন্ধ্যায় প্রেমিকার হাত ধরে গোপন অভিসারে ছিলাম।
ঘোরের ভেতর একফালি নতুন চাঁদ জন্ম দিতে দিতে আমার যা দশা হয়েছিল!”
[ -অনুকাব্য ৫৭, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন – মোন্তফা মঈন।]

“লাল মোরগ ডাকার সাথে সাথেই প্রত্যুষের জানালায় সহেলি।
ঘাসে শিশির এবং সহেলির ঠোঁটে দোয়েলের শিস।
বনের রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে যাব নতুন দিনের উদ্দেশে।”
[ “সহেলি” হাড়ের পিয়ানো/ মোস্তফা মঈন ]

প্রত্যেক মহৎ কবির ধ্যান দর্শনের একটা নিজস্ব জগৎ রয়েছে। কবিতা পাঠেই আমরা চিনে নিতে পারি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ দাশ, শঙ্খঘোষ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশ প্রমুখ কবিবৃন্দ।

“একজন কবি নিজেই এক অনবদ্য কবিতা। মুঠো ভরা সবুজ স্বর্ণধুলি নিয়ে কাব্যতীর্থে
 তিনিই প্রতি মুহূর্তে হয়ে উঠেন এক একটি দিব্যকান্তি কবিতা। আমরা তাঁকে কবি বলে ডাকি।”
[অনুকাব্য ১০০, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন – মোস্তফা মঈন।]

আমি অবাক হই, যখন দেখি কেউ নিজেকে একজন কবিতা কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। কবিতা কী কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠনের নাম ? যে তিনি সেই সংগঠনের নেতা বা কর্মী হয়ে দৌড়ঝাঁপ করবেন, অন্যদের ওপর তার প্রভাব খাটাবেন! কবিতা কোনো সংগঠনের নাম নয়। কবি কোনো দল বা সংগঠনের মুখপাত্রও নন।
আবার দেখি, কবিতার নামে কোনো কোনো ব্যক্তি যেন বাতাসে ধুলা উড়াচ্ছে। চোখে মুখে সেসব ধুলি ছড়িয়ে দিয়ে ধোঁয়াটে করে দিতে চাইছে আমাদের সামনের দৃষ্টি। কিন্তু তারা জানে না, কতো সুক্ষ্ম হতে পারে কবিতা পাঠকের শ্যেনদৃষ্টি। তারা ঠিক ঠিক চিনে নিতে পারে আসল নকল। কিছু শব্দ এনে গায়ে গায়ে জড়াজড়ি করলেই কবিতা হয় না।
আমি তাদের জন্য বলতে চাই:

“কবিতায় যারা কৃত্রিম ধুলিঝড় তুলতে সচেষ্ট আছেন/ মনে রাখবেন, যে কোনো ঝড় সময়ের শতাংশ মাত্র।
কিন্তু আমি চোখ বোজে এইসব ধুলিঝড়ে বিশ্বাস বাখতে চাই এই জন্য যে, / কবিতার আকাশে তো মেঘ জমবে। বৃষ্টি এসে জীবনের ছাঁট ভিজিয়ে দেবে।/ পৃথিবীর মাটি ঘাস সবুজ পাতারা আনন্দে আন্দোলিত হবে। আমাদের প্রকৃতি/ আরো গাঢ় হয়ে উঠবে ফুল ও ফলময় সবুজ। শস্য ভরা মাঠে সোনা রং ধানখেতগুলো/ নিজের দেহভারে নত হবে। কাস্তে হাতে ধান কাটতে নামবে কিষানেরা।/ ধান ভরা নৌকাগুলো হাওর বেয়ে ঘাটে ভিড়বে। কিষানীরা কুলা হাতে/ উড়াবে কাড়ি কাড়ি ধান।
সেদিন আকাশে উড়ে বেড়ানো ধুলিকণাগুলো ফের মাটির সাথেই সম্পর্কিত হবে।/ কেননা মাটিই তো যে কোনো ফুল ও ফলের প্রকৃত মাতা।” [“ধুলিঝড়”/ মোস্তফা মঈন ]
কিন্তু তীরন্দাজ জানে তীরের গতি ও প্রকৃতি। কোথায় তার লক্ষ্য ও শিকার। ছুড়ে দেবার কৌশল।
কবি জানেন, তাঁর বোধের জগতে জমে ওঠা সেই শর শব্দ। কবি অনুভব করেন তাঁর ভূগোলের প্রতিটি প্রাণের হৃৎস্পন্দন। তাই কবিতা হয়ে ওঠে জীবন ও জগতের জাগৃতি ভাষ্য। কবিতা নিজেই তার দেহ গঠন করে, প্রাণ পায় কবিতা। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, জীবনের জাগৃতি নিয়ে বেরিয়ে আসে কবিতা। আমরা শুনতে পাই জয় হার্জোর কবিতা :
“বাইরে একটি হরিণ, তাকে আমি শুনতে পাই ; দৃশ্যাতীত তার কাচের কণ্ঠস্বর/ আমাকে ডাকে,
জাগ্রত করে আমার হৃদয়, এবং আমাকে কাঁদায় এই ভঙ্গুর শহরে।”
(“ডীয়ার ঘোস্ট”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যা- ওয়ার )

“আছে স্বর্গেও চিতাভাগ যে পৃথিবীর প্রান্ত ছড়িয়ে, তার পরিধি অতিক্রম কওে উঁকি মারছে এই ভোরে। সে শুনতে পায় সূর্যেও সাথে নক্ষত্রের আলাপ এবং দেখে চাঁদ তার ক্ষীন অন্ধকার ধুয়ে নিচ্ছে প্রার্থনায় উজ্জীবিত পৃথিবীর এই জলে। তাবৎ পৃথিবী জুওে আছে সেই প্রাণ, যারা ঘুমাতে পাওে না,আর যারা কখনোই উঠেনি জেগে। (“ইন্সমানিয়া অ্যা- দ্য সেভেন স্টেন্স টু গ্রেস”/ দ্য উম্যান হু ফেল ফ্রম দ্য স্কাই )
[ যে ভাষা বজ্রের, যে ভাষা সরীসৃপের : নেটিভ আমেরিকান কবি জয় হার্জো’র কবিতায় আমেরিকার আত্মা দর্শন-তাপস গায়েন / পৃষ্ঠা ১৮৬- “অগ্রবীজ” প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা- ডিসেম্বর ২০০৭ ]

প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষই সেই জাতি ও ভাষার নিজস্ব সম্পদ। কেননা শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি একটা জাতির অনন্য পরিচয়। কিন্তু মাঝে মাঝেই প্রশ্ন আসে, এই মিডিয়ার যুগে কবিতার ভবিষ্যৎ কী? আমি বলব, কবিতার শেষ বলে কিছু নেই। মানুষের কণ্ঠে ভাষা ও বোধ শক্তি যতদিন থাকবে, মানুষে মানুষে থাকবে ভালোবাসা- পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় জন্ম নেবে কবি, সৃষ্টি হবে সেই মহামায়া কবিতা।
কবি নিজেই যখন হতবাক হয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, তখন আমরাও বিস্ময় মানি :

“জীবন একটা লিরিক। কতো মশা মাছি আরশোলা মারশোলা ইরিক্কি বিরিক্কি
তিড়িংবিড়িং কইরা সব হেতাল বেতাল হইয়া মাইনষের ভিতরে ঢুইক্কা
পড়তাছে! এইতানরে কবিতা ছাড়া আর কিতা কইবাইন।
কবিতা তো মাত্র গঙ্গা না- কবিতা একটা সমুদ্দুর। পাখনা ছড়াইয়া মৈথুনরত
একজোড়া মাছির আকাশও কবিতা।” 

[-অনুকাব্য ২৪, গন্ধকুমারী ও পাপচিহ্ন -মোস্তফা মঈন। ]  

প্রত্যেক কবিই তাঁর প্রেমে অনুভব করেন শব্দময় এই প্রকৃতিবিশ্ব। তাই একজন কবির কাছে শব্দই কবিতা। কবিতার ভেতর দিয়ে কবি পৌঁছে দেন তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা। মুগ্ধ হন পাঠক তাঁর মাতৃভাষা ও প্রিয় পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। কবিতার নৈসর্গিক প্রেমে সিক্ত হন।
কবিতা যেন স্বপ্নের ভেতর কোনো আলাপচারিতা। সেই স্বপ্ন হতে পারে দীর্ঘ, হতে পারে কোনো মুহূর্তিক ঘটনা। স্বপ্ন হতে পারে আত্মদর্শন। একটা পিঁপড়েনীর সাথেও হতে পারে তাঁর স্বপ্ন-সন্ধি। পিঁপড়ের স্বরলিপি পাঠে কবি তুলে আনতে পারেন কোনো পিঁপড়েবিদ্যা।
একজন কবি নিজেকে নিংড়ে কতটুকু দিতে পারেন ? কবি যা চান তার সমস্তটাই দিতে পারেন না। সমুদ্রও তার সবটুকু দিতে পারে না আমাদের ; কিন্তু সমুদ্র, তার জলরাশির গভীর গর্জন, উচ্ছাস, তার সবকিছু নিয়ে তটে এসে ঢেউয়ে ঢেউয়ে আছড়ে পড়া। কবিও উপলব্ধির জগৎ থেকে তার সমস্ত চিত্রকল্প, তার ভেতরের সবটুকু, উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, রূপে, গন্ধে, শালীন-অশালীন, জীবনের ভাষায়, শব্দে শব্দে নিজেকে ভেঙ্গে-ছুড়ে আছড়ে পড়েন কবিতায়।

“প্রার্থনার মোড়ক খুললে ভৈরবী রাগে একটা / গজল পাবে।/ ভোরে আঙিনায় পাবে এক আঁজলা মেঘ /বেলফুল তুলসী ঘন শ্যাম দুর্বাঘাস। /জলে একুশটা শাদা শাপলা / জন্ম বাতাস।/ বাড়ির উঠানে কুমড়ো ও ঝিঙে মাচানে ফিঙে পাখি/ আর তাতেই ভরপুর জীবিকা।/ জন্মগন্ধা” [ “জন্মগন্ধা” -হাড়ের পিয়ানো/ মোস্তফা মঈন ]

আমরা কবিতার মর্মে প্রবেশ করে তার রূপ, সৌন্দর্য, স্বাদ, গন্ধ,সব নিতে পারি। কবিতা বিশ্লেষণ করে এ নিয়ে মাষ্টারিও করতে পারি। কিন্তু কবির সেই উপলব্ধির জগৎ ? যে গর্ভাশয়ে বেড়ে ওঠে কবিতার ভ্রুণ- আমরা তাকে বিশ্লেষণ করতে পারি না।

“তোমরা আমার কবিতাকে বিশ্লেষণ করতে পার।/ আমার আত্মা থেকে ওঠে আসা অমীমাংসিত চিৎকার / কিংবা শব্দের কপালে ফুটন্ত শব্দের ঘাম/ পৃথিবীর মুখোমুখি অশান্ত আওয়াজের ধুম্রজাল…/ একে বিশ্লেষণ করতে এসো না- কবিকে নয়।” [ “কবি ও কবিতা”-কালের সেঁওতি মাপে জল/ মোস্তফা মঈন]
“ চেয়ার টেবিল কলম কাগজ অ্যাসট্রে চিরুনি/ যেন এক একটা পরি নাচ।/ শার্সি ভেঙ্গে উদারা মুদার তারা দোল তোলে স্বপ্ন/ এই ঘরটাতে বুনো ভালুকের মতো আমি পড়ে থাকি।” [ “নাচ”-হাড়ের পিয়ানো/ মোস্তফা মঈন]

একজন মহৎ কবি অনুভব করেন বিপুল বিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রাণ স্পন্দন। তাই তাঁর কবিতায় ওঠে আসে প্রাণের স্পন্দিত রূপ সত্য ও সুন্দর। চিল, রাজহংসী, ঘুঙুর, বালিকা, ঘুঘু, সে কী আনন্দ! কিন্তু রাজহংসীর গলায় মাংসাশীদের ছুরি! সে কী রক্ত!
মানুষ কেন এতো দুর্বোধ্য প্রাণী! সে এতো বিনয়ী ও প্রতারক! এতো হিংস্র ও সৌখিন মানুষ! সে তার স্বজাতিকেই হত্যা করতে বেশি পছন্দ করে। আমরা ঠাহর করতে পারি না, আমাদের গায়ে গায়ে লেগে থাকা মানুষেরা কে খুনি আর কে মহাপুরুষ!
আমি এই চারণ ভূমিতে হাঁটতে এসে এসব আশ্চর্য সুন্দর প্রাণীদের দেখি। এখানে কেউ মাংসাশী আর কেউ নিরামিষাশী। কিন্তু মানুষেরাই, ঘাস মাংস দুটোই খেয়ে…।
আমি নিজের চোখের জল পান করে নিজেকেই বলি,

“মৎসেরা আমাদের দুধভাই
ওরা জলে নেমে যায় ,আমরা স্থলে থেকে যাই
আমরা তাদের হত্যার সপক্ষে নই।”      
[“দুধভাই”  -রক্ত মাংসের শ্লোক/ মোস্তফা মঈন ]

——————————————————-

মোস্তফা মঈন-এর কবিতা


 শিকারি

“অতঃপর তোমরা প্রভুর কোন সৃষ্টিকে অস্বীকার করবে বলো?”
                                            – আল কোরআন

সৃষ্টিতো সেই মহা জাগরণ। নভঃ ও ভূমণ্ডলের বোধ আঁকড়ে আছে। মুহূর্তে মুহূর্তে
বোধের জগত থেকে, থেকে থেকে পরাক্রম-

রাংচিতা বনে বিতংসি
পৃষতী নিজের ছায়া মৃত্যুর সাথে ডিগবাজি খেলা করে। দৌড়–তে দৌড়–তে এসে জীবন
বাথানে ধরা পড়ে। মৃত্যুর হাতে ঝলসানো ছুরি!

শিকারি! এই দুর্বোধ্য জঙ্গলে কী অস্বীকার করবে তুমি ? চোখের মণি থেকে মুদ্রাশঙ্খ
ওড়ে যায়। তোর অংকুশের ঘায়ে পিঠ গলে। অবশেষে অপর্ণা কোন অবন্তির পথে-


 লাল পদ্ম

আমাদের প্রশ্ন ছিল এক। আমাদের প্রত্যেকের হাত লাল পদ্মটার কাছাকাছি
ছিল। কিন্তু আমরা কেউ-ই একমত হতে পারছিলাম না। সত্য আমাদের হাতে
নাকানি-চুবানি খেয়ে মরতে মরতে আকাশে গিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আমরা এই জলে চাঁদ ধরতে এসে শুধু শুধুই জল ঘোলা করে যাচ্ছিলাম।

আমরা আসলে পদ্মার জলে ডুবো চাঁদকেই চুবিয়ে মারতে চেয়েছিলাম।


প্রথম অভীপ্সা                        

এই জন্মে আমি যখন পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করছি।
আমার জন্ম নেওয়ার আনন্দে মায়ের পার্শ্ববর্তিনীরা মুখ টিপে টিপে হাসছিল।
শুকনো খড়-বিচালির ওপর রক্ত পিচ্ছিল মুখ, আমার হাত, আঙুলের
নখ,  সেইসাথে এতটুকুন হাসি, গলা ছেড়ে চিৎকারটাও উপভোগ করছিল।

এই-ই ছিল আমার জন্ম কবিতার প্রথম স্বর, আমার প্রাকৃতিক স্বভাব
ঠোঁট মেলে ধরা হাসি, জীবনের অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রথম অভীপ্সা।

পৃথিবীর প্রতিটি কবিতার ভেতর দিয়ে জন্মাচ্ছি আমি
আমার দেশ, নতুন আনন্দে, দুঃখের উৎসারণে আমি আমার জাতি
পৃথিবীর রক্তউঠা চোখ, আমার বিচূর্ণ ভ্রমণ।  


স্বপ্নফল

যেদিন জেনে গেছি, একটা স্বপ্নেরই পিণ্ডিফল এই আমি
সবুজ পাতায় মোড়া ঝুলে রয়েছি গাছের শাখায়, বাতাসে দোলছি গাঢ় লাল
পাখিরা পাকা ফলে ঠোঁট গলাচ্ছে, ঠোকরে ঠোকরে খাচ্ছে আমারই হৃৎপিণ্ড ফল।

আমি সেদিনই জেনেছি, পাখিজন্মে যারা নেচে উঠেছিল আমারই মাতৃজঠরে
আমি তাদেরই ঠোঁটে জীবনরস চুইয়ে পড়েছি অনন্তের ফোঁটা।

জীবন-বৃক্ষ থেকে কারো স্বপ্নফল গলে গলে এই আমি, আমারই জন্ম করেছি সার্থক
তাঁর চাওয়া, তাঁর তৃপ্ত অহং গলে গলে পাখিদের ঠোঁটে।


সাকার                    

জন্মসূত্রে এই দেহঘরে আমি আমার সাকার পেয়েছিলাম।
এই ঘরে ঠাঁই-ঠিকানা হয়েছিল আমার।
যখন সেই পরম সত্তার প্রদীপ্ত আলো থেকে সহসা ভ্রমণে
বেরিয়ে এসেছিলাম আমি।

ইতোমধ্যেই আমি জেনে গেছি, পৃথিবীর ছায়া-সবুজ আলো-ঝলমল
এই মনোমুগ্ধকর বাড়িতে আমার আর বেশিদিন থাকা চলবে না।

রহস্যঘেরা এই গ্রহের বাসিন্দাদের প্রতিটি মুখে আমি তাকিয়ে দেখেছি
কারো দেহকোঠাতেই আমার দ্বিতীয় ঠিকানা নেই।

 


পাপচিহ্ন

আমি আর কিছু জানি না।

তার ঘুঙুর ভিজে গিয়েছিল। তার পুষ্প পা-জোড়া ডুবে গিয়েছিল।
তার চারু পায়ের ছাপ লেগে গিয়েছিল আমার বুকে।

এইটুকু পাপচিহ্ন ছাড়া আমি আর কিছু জানি না।


পিঠাপিঠি জন্মেছিল ঘাতকের হাত                         

আমার পিঠাপিঠি জন্মেছিল ঘাতকের হাত। একটা উগ্রপন্থী দলে নাম লিখিয়ে
সে শিখে এসেছিল, কিভাবে ছিন্ন করতে হয় মাতৃজঠর, অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে হয়
পেছন থেকে গমনেচ্ছু পিতার পিঠে।

সে শিখে এসেছিল, কিভাবে আত্মঘাতী বোমা ফাটাতে হয়
বন্দুকের নল তাক করতে হয় স্কুলঘরে মসজিদে নাচঘরে বাজার স্টেশন
রস্তোরাঁ পশুরহাট হাসপাতালে। এমনকি সহোদর আর স্বজাতির বুকে।

আমার পিঠাপিঠি জন্মেছিল ঘাতকের হাত।
 


বিচূর্ণ ভ্রমণ

কারণ আমারই সহোদর যেদিন তার কোমর পকেটে লুকানো ছুরিটা
সহসা আমার বুকে আমূল বসিয়ে দিল। ঠিক সেদিনই সত্যটা জানতে পারি,
পৃথিবীতে আমারও একটা পৃথক অস্তিত্ব ছিল।

আমিও পাকিস্তান ফিরতি পাগড়িওয়ালাকে শুদ্ধাচারী মানুষ ভেবে ভুল করতে পারি।
শূন্য হয়ে যেতে পারি নেকড়েটার কামড়ে।
অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মাটি ভিটে ছেড়ে একেবারেই অস্তিত্বহীন গৃহত্যাগী।

ধর্মের জবর দখলে গেছে আমার সবকিছুই স্থাবর-অস্থাবর।
আর পতিত আমিই গৃহহীন- আমার নিজস্ব আয়নায় ভ্রমণক্লান্ত ব্রহ্মচারী।
 
 


ভড়ং

তিনি নিজের সাথে দূরত্ব মেপেই হাঁটেন।
তিনি কথা বলেন, ভ্রুকুটি করেন, তাঁর হাত নেড়ে নেড়ে
ভাবে ভঙ্গিতে যেন তিনি অন্য কেউ, অন্য কোনো মানুষ।

তাঁর অবয়বে উঠে আসে দাম্ভিক। তিনি চালিয়ে যান যখন যেমন
যাত্রাপালায় যত রকমের করণ কৌশল আছে ভড়ং ভারিক্কি আছে।

আমি এইসব মানুষের মুখ দেখতে দেখতে …

 

১০
একটা পিঁপড়ে ও ফুলের আত্মা

মুখোশ আর মিথ্যের ভেতরেই যাদের কাজ কারবার, আমি সোল্লাসে তাদের ত্যাগ
করেছি। নিজের সাথে বন্ধুত্ব ঠাওরে হাঁটছি উলঙ্গ বাতাসে।

আমার কিশোরবেলাতেই জেনে গেছি, একটা পিঁপড়েনীর সাথেও হতে পারে প্রকাশ্য সন্ধি।
চলতে পারে জীবনের রহস্যময়তা ভেদ করা প্রেমার্থ মধুর আলাপন।

আমি তো কবেই জেনে গেছি, আঙুল উঁচিয়ে কথা বলা পৃথিবীর পণ্ডিতদের।
ধর্মব্যবসা খুব ভালো বোঝে এমন গর্বিত সব আলেম-উলামাদের। ভড়ং করা
মুখগুলোতে তাকিয়ে দেখেছি এরা কেউ-ই একটা পিঁপড়ে বা ফুলের আত্মা জানে না।

মিথ্যেবাদী ও মুনাফাখোরদের আমি ঠিকই চিনেছি। আমি সজ্ঞানেই ত্যাগ করেছি ভণ্ডদের।

১১
আঁশশ্যাওড়ার  জঙ্গলে একশ একটা শেয়াল

চাঁদনিতলা পেরিয়েই জীবন উল্টে গেল।
আঁশশ্যাওড়ার জঙ্গলে আমাদের পথ রুখল
একশ একটা শেয়াল।

একদিন শেয়ালেরাই আমাদের বন্ধু বনে গেল।

আমরা তখন শেয়ালেদের দুধ খেয়েই বাঁচি।
আর শেয়ালেরা আমাদের পিঠ কামড়ে বাঁচে।

১২
শাদা ঘোড়ার দৌড়

রাত্রির শিকড়ে আমার ঢুলুঢুলু ঘোর। ঘোর একটা আকর গ্রন্থ। তার চিরল পাতা পৃষ্ঠায়
ছাই। জীবনের কয়লাখনিতে জমা হয় ছাইয়ের স্তুপ। স্তুপে শোয়ে থাকে চকচকে নক্ষত্র।
আমার নক্ষত্র ধোয়া রাত একনিষ্ঠ হই আকর গ্রন্থে।

প্রতিটি আকরিক নক্ষত্র আমার ছেলেবেলার কুড়ানো পাথর। পাথর দিয়ে আমি আকাশ
ছোঁয়া ইমারত বানাই। আকাশচুম্বী ইমারতটা নৈশ আলোক।

আমি আলোর চাতালে এসে দাঁড়াই। পান করি আলো। পাঠ করি জীবন। এই
পানশালায় পানরত সবাই প্রতি মুহূর্তে হয়ে ওঠে এক একটি তেজী ঘোড়া। চারদিকে
দৃপ্ত দাপট। ছড়িয়ে পড়ে আলোক হ্রেষা, খুর। জন্ম নেয় অখ- হীরক। কুণ্ডলী পাকায়
হীরক জোছনা।

আমার ঢুলুঢুলু ঘোর। ঘোর একটা শাদা ঘোড়ার দৌড়। দ্যোতিমান ঘোড়ার
লেজে ঝুলে যায় আমার চোখ। ওর রেশমি লেজ ছড়িয়ে দেয় সবুজ শস্য ভরা ধান নদী
দারুচিনি গ্রাম। মসলা ঘ্রাণ সচিত্র পাতা বৃক্ষ সবুজ ডাল। ডালের দিকে ওড়ে যায়
পাখি বনঘুঘু।

গ্রাম বালিকা হাসে। আলোর উৎস মুখে লাল শাড়ি বউ কলসী ডুবায়। আমরা পান
করি আলোর মধু।

১৩
আমি রাখালিয়া গ্রিদান গ্রামের একজন কৃষক

এই শীত-বসন্তে ধান চাষেই মন। গেল বছরের চেয়ে এই বৈশাখে  
বেশি ধান চাই। এ সময় ঘুঘুর ডাক ও একজন পড়শির গার্হস্থ্যকালও
নজর কাড়বে না আমার।

এ বছর উপরওয়ালা ঠিকমতো রৌদ্র আর রৃষ্টি না দিলে, খেতের কোণায়
দাঁড়িয়ে চৈতের আকাশকে বকাঝকা করব আমি।
 
কেননা সন্তানের পেটে ক্ষুধা, পিঠে আগুন পোড়া জ¦র। গনেশ হাওরে একখ-
জমিতে কাজ করতে করতে আজ আমার মন উড়ছে, পুড়ছে সৌরজ¦লা পিঠ।
ধানশিশু হাতে আমি রাখালিয়া গ্রিদান গ্রামের একজন কৃষক।

১৪
রক্তফুল

মন্দিরবাড়ির উঠোনের বকুলতলায় আমার প্রথম কিশোরবেলা। যেদিন আমি
ছত্রখান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছি রূপা তোর পায়ের তলায়, নিজের হাতে
গুটিকয় ভাঙ্গা টুকরো কুড়িয়ে পাওয়া মোস্তফা মঈন।

আমি পতিত-ব্রাত্য মঈনকে তুলতে তুলতে কাঁদি। এই জন্মে আমার আর
তোলা শেষ হয় না। যত্রতত্র এলোমেলো ভাঙা টুকরোগুলো এখনো পড়ে
থাকতে দেখি-

সেই-ই শুরু। আমি মঈনকে কুড়াই। ফুল ফোটতে দেখি তোর পায়ের তলায়
রক্তফুল। আমার ধ্যানে দাঁড়িয়ে আছিস রক্ত-মঙ্গল কবিতা ফুল।

১৫
সে আঁকতে চায় আমার রক্তের রং
 
ছুরিটা সবেগে প্রবেশ করল আমার পাঁজরে।
বলা যেতে পারে একটা নিখুঁত আর তীক্ষ্ণ সফল দৃষ্টিনন্দন
দৃশ্য। রক্তের সাথে যার সম্পর্ক থাকতে পারে
এমন একটা বৈষয়িক উপহার -সে আমার রক্তের জমজ ভ্রুণ।

এটা একটা শিল্পকলাও হতে পারে -নান্দনিক আত্মঘাতী শিল্পকলা।
সে আঁকতে চায় আমার রক্তের রং
আমার বুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ার লাল রঞ্জক দৃশ্য।

১৬
তাপসী গোলাপ

“গোলাপ ফুলের সঙ্গ সখি ইচ্ছে হলেই কেউ কী পেত?
একটি গোলাপ কিনতে তখন সবই আমার বিকিয়ে যেত।”
– ওমর খৈয়াম

হাত ছোঁয়া দূরত্ব- আমার নিঃশ্বাসের এতো কাছাকাছি যে
তোমার গ্রীবা ও চুলের সরল স্পর্শ ও ঘ্রাণ
আমি পেতেই পারি।

অসাধারণ তোমার গোলাপ ফোটা হাসিটি আমার নাকের ডগায়
রাশি রাশি ফুল!
তাতে কী।

প্রকৃতি এমনই এক আশ্চর্য উপস্থাপক
সমুদ্রের ধারেকাছে উড়ন্ত চিলের বদলে সে এনে দিতে পারে ফুল!

আর আমি তো প্রেমের দেউলে জীবন বদল করতে এসে
একটা তাপসী গোলাপের সঙ্গ নিতেই পারি।

১৭
মানস রাহী

এই পথে হেঁটে গেছে আমাদের পিতা-প্রপিতামহরা।
এই পথ পবিত্র এবং ধূসর ধূলিময়।

কারণ মৃত্যুকে আমরা না বলতে পারি না।
কারণ আমরা মুহূর্তেই কেঁদে উঠতে পারি।
মুহূর্তেই হেসে উঠতে পারি।

আমরা ভুলেও যেতে পারি প্রিয় বন্ধুদের
কারণ স্রোতের মুখে এইসব ফুল হারিয়ে যাবার।
হায়! এইসব মুখ…

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E