৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ৩১২০১৭
 
 ৩১/০১/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

মুক্তি মণ্ডল

মুক্তি মণ্ডল

মুক্তি মণ্ডল। জন্ম: ১৯৭৬, চুয়াডাঙ্গা। বাবা ও মায়ের ছায়া সৈকত নিজের আদলে নিয়েই ঘুরিফিরি। স্থায়ি ঠিকানা সুবদিয়া, চুয়াডাঙ্গা সদর। বর্তমান ঠিকানা মিরপুর, ঢাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কাজ করি অসরকারি গবেষণা ও এডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞায়। কবিতা লেখার প্রেরণা চর্চা করতে করতেই তৈরি হয়েছে। কোন গুরু নাই।
 
প্রকাশিত বই: ঘড়ির কাঁটায় ম্যাটিনি শো ( কৌরব, ২০০৮), পুষ্পপটে ব্রাত্যমিনতি ( জোনাকরোড, ২০০৯), উন্মাদ খুলির পৃষ্ঠাগুলি (আবহমান, ২০১১), ২০১৫ এর বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে ভেল্কিবাজের আনন্দধাম, প্রকাশ করেছে এন্টিভাইরাস পাবলিকেশন।  

মুক্তি মণ্ডলের কবিতা-ভাবনা

কবিতা – মানব সমাজের মনুষ্যশৈলীর প্রবর্তনা-ভাষ্য, অন্যভাবে বলা যায় ইহা অনুভবের ইশারাশাস্ত্রও। প্রতীক ও উপমায় লুকিয়ে থাকা ব্যক্তির অফুরন্ত অন্তর নিরীক্ষণও উদ্ভাসিত হয় কবিতায়। এই উদ্ভাসিত অন্তরমন্থনের গহনতলের শব্দ সমন্বিত বাকভঙ্গির মোহনায় গড়ে ওঠে ব্যক্তির অদম্য চৈতন্যগত বোধ – যা সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল অমানবিক বোধকে অস্বীকার করে, করতে চায়। কবিতা ব্যক্তির মধ্যে হাজির করে এসবেরই সামষ্টিক চেতনালোক। মনুষ্যমিনার। যে কোন সমাজে শিল্পসাহিত্যে এই সামষ্টিক চেতনালোকের অগ্রগতি রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং অর্থ-ব্যবস্থাপনার পরিসরে নীরবে ঘটে না সেখানে শিল্পসাহিত্যের চর্চায় যে নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে তার ভিত্তিতেই সংঘটিত হয়। দানা বাঁধে। ঢেউয়ের বাঁকের মত ক্ষণেক্ষণে দিক বদলায়, তবে চিন্তাকাঠামো পুরো আদল বদলায় না। পুরাতন দেওয়ালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের সময়াভাসের মুখ বা স্পষ্ট করে তুলতে হয় মানুষের আসল মুখ, ছহি আমলনামা, মুখোশও বাদ যায় না। এসব ঘটে কবিতা বা শিল্প চর্চাকারীদের একনিষ্টতায়, সব কালেই এরকম ঘটে। শিল্পের ধর্মই তাই। সে এক জায়গায় স্থির ও অচঞ্চল নয়। তবে তার চাঞ্চল্য প্রবাহের গতি সহজে আসে না। এর জন্য তারুণ্য ও একাগ্রচিত্র জরুরি। সমাজের বৃহত্তর আঙ্গিনায় রাজনৈতিক ও অর্থব্যবস্থাপনার পরিবর্তন ঘটলে ক্ষমতা ও সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন খুব সহজেই ঘটে কিন্তু শিল্পসাহিত্যের চর্চায় বা শিল্পচেতনায় পরিবর্তন সহজে ঘটে না এবং তা সহজে সাদাসিধেভাবে ঠাহরও করা যায় না। তবে শিল্পসাহিত্য – কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা এবং সঙ্গীতের সার্বিক অগ্রগতির চর্চায় যদি প্রবর্তনার ধারা নিষ্টার সঙ্গে অব্যাহতভাবে যুক্ত থাকে তাহলে তার দ্যুতির ঝলক দীর্ঘপথের রেখায় ছায়াচিহ্নের মত ঝুলে থাকে, যা সামাজিক পরিসরে একটি নিগূঢ় সম্পর্কের সেতু তৈরিতে সহায়ক হয়ে ওঠে এবং সমাজের নানাবিধ জনউৎসব বা জনপরিসরে শিল্পচৈতন্যর একটা নতুন দশার সাথে শিল্পবোধের একটা নিগূঢ় সম্পর্কও স্থাপন করে দেয়। যা সাংস্কৃতিক প্রবাহের বাঁকে পরিবর্তিত রূপে যুক্ত থাকে, তবে এ পরিবর্তিত রূপ রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও অর্থব্যবস্থাপনার বদলে যাওয়া টোপ খাওয়া রূপের মত নয়, এর শ্রী মানুষের শুভবোধের তরঙ্গে ঢেউয়ের মত জলের নিজস্ব স্বভাবের মতো। কবিতা চর্চায় এই স্বভাবজাত বৈশিষ্টমণ্ডিত সময় একটা ফ্যাক্টর। যে সময়ের ভেতর সে জীবনযাপন করে সেই সময়ের সার্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চৌহদ্দীর ক্ষমতার বলয়ে তাকে প্রথমেই কিছু সমস্যাকে চিহ্নিতকরণ এবং তা থেকে উত্তরণে বিশেষ করে আঙ্গিক, বোধ ও বুদ্ধি এবং চিন্তা-কল্পের ক্ষেত্রে অভিনব পদ্ধতির প্রয়োগ করতে হয়, একধারা থেকে অন্যধারায় গমন, সর্বক্ষণের মূর্তিকে ক্রমাগত ভাবনায় এবং শব্দের তরঙ্গে নাচিয়ে নিতে হয়। যা কবিতার স্বভাবে সমুদ্রঘ্রাণের মতো উথলিয়ে ওঠে অনুভবতলে, তার কোন অবসর নেই, তার থেমে থাকার দরকার পড়ে না, তার নেই কোন স্তব্ধ বালুভূম। কবিতা যে সময়ে নির্মিত হয় তাতে লেগে থাকে সেই সময়ের সত্য যা সে ধারণা তৈরি করে, মানুষের সাংস্কৃতিক বোধের প্রাণধর্মকে উচ্ছ্বলতাকে উসকে দেয়, সেই সময়কার নানাবিধ ঘটনাকে ইঙ্গিতের নরম আলোয় উদ্ভাসিত করে। প্রথা ভাবনার চিতল পেটি ঝলসিয়ে দিতে থাকে, পোড়া গন্ধের মিহি সুবাসে তৃষ্ণা বাড়তে থাকে। মানুষের অর্ন্তগূঢ় চৈতন্য সামাজিক সম্পর্কের চেতনায় প্রতিবিম্বের মত জড়িয়ে থাকে কবি তাকে প্রত্যক্ষ করেন এবং মানবিক বোধের সত্যরূপকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে তুলে আনে অনুভব লতায় – সেখানে সামাজিক বিশ্বাস অবিশ্বাস থেকে ভিন্ন চিন্তার ভঙ্গির মধ্যে অনন্য হয়ে উঠতে চাওয়াকে বিশিষ্ট করে তোলে।

মুক্তি মণ্ডলের কবিতা


কল্পনায় নদীও চায় সবটুকু
দেহ উচ্ছ্বাস
 
ধ্বস্ত তটরেখা মুছে দিয়ে
খুলে নেয় দ্বিধার বৈভব
 
বেজে ওঠে
হাড়ের গভীরে জলের অন্তরা


সহজ মুগ্ধতার আড়ালে
যতবার কাছে যাই
ততবারই নতুন করে
বেঁচে উঠি
 
সহসাই লুপ্ত হয়
সম্ভোগের পুরনো কৌশল
 
বিশুদ্ধ কাঠামোর ভেতর
ঠুনকো শব্দের মতো
অপরূপ হয়ে ওঠে
শরীরের সমস্ত আকার
 


রাত জাগা এক একটা মানুষ
একা বারান্দায়
এক একটা সার্কেল
এক একটা উজ্জ্বল
ডুবোপাহাড়ের চূড়া
 
গভীর স্পর্শ থেকে
সে
মুছে যাওয়া জলের দাগে
ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক
 
সত্যিকার অর্থে
মানুষের কাছে ওটাই তার
সিক্রেট রিস্টওয়াচ
 
রাত জাগা মানুষ
সন্তকে
দন্ত-জিভায় জাগাও
 


কিভাবে সহজে
তার দেখা পাবে
ভাবো
ভাবনার সাধন ভঙ্গি
নিজে বানাও
দেখ
নিজস্ব দেহতরঙ্গের
বিজলি
 
তুমি বেঁচে থাকার আনন্দ
জোড়া দাও
অচেনা রুপে
খুলুক
সম্পর্ক সেলাই
 


আমার দুদিকেই
নাম না জানা নদী
মধ্যখানে
পড়ে আছে ছোট্ট তরিখানি  
 
দুদিকেতেই
আছড়ে পড়ছে ঢেউ
এসবি রোদ ভর্তি মনের দহন!
 


প্রতিদিন ঠাট্টায়-উপহাসে
নিজেকে দেখি আর
মনে হয় ঠুনকো
একটা শুকনো পাতার মচমচ
এ বেঢপ জীবন থেকেও
অনেক রহস্যময়, দরকারি
 
তবু আনমনে মহুয়ার কাছে যাই
এমনি এমনি ক্ষমা চেয়ে
ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই ফিরে আসি
নিজের ডেরায়
 
ভাবি কখন মনের ভেতর
তুমি ভেসে উঠবে
কখন পৌঁছাবে
আমার বেঢপ আঙিনায়?
 


নিষেধসীমা-লঙ্ঘন করে
হেসে উঠছে দেয়ালে
আমাদের কাঠের হরিণ
 
ওখানে বাঘের কোন ছাপ নাই
আছে নিয়মের তাঁরকাটা
বক্ষচূর্ণ মনুষ্য বিলাপ
 
ওহে সক্রিয় আঙুল
দৃশ্যের ঘোর ছেড়ে হয়ে ওঠো
উচ্ছৃঙ্খল—
কাঠকয়লার স্তুপে যুধিষ্ঠির ঘুমাক
 
আমরা হাওয়াবন্দুকে কার্তুজ ভরব
 


দেখার সীমানা খুলে ছড়িয়ে দেওয়া দেহ সলকের আভাতেই জানায় প্রণতি, গোধূলির চিরচেনা রঙের ভঙিমা মুছে নিজেরই প্রতিবিম্বে ভাসায় মুখশ্রী। বোবা রোদ প্রহরে ফেলে আসা মৃদু হাওয়া হয়ত চিনেছিল তার সহজ আভরণ—দূরের জলে মিলিয়ে যাওয়া মুখের জ্যোতি, তাতেই ফিরেছে, যে এখন দেহের আড়াল। প্রতিদিন বধির মুখোশে গড়ে তোলে নতুন বিন্যাস।
 


আজ যদি দেহতরঙ্গে
ফুলকি ফোটে
সাবধানে জল মুছে দিও
বোবা পাহাড়চূড়ায়
মুক্ত অঙ্গধ্বনি
উসকে দিবে বাঞ্ছাপ্রদেশ।
 
ঝামটে উঠবে শস্য বীজে
উৎফুল্ল আভা
মনোবীণা ঢেকে যাবে।
 
দিগন্তে শিউরে উঠা স্তব্ধ
বক্ষ—ডাক-হরকরা—
টগবগে মনোভূমে
তুলে আনবে ঘুমন্ত লাভা।
 
অনুনয়ে তুমি
ভেঙ্গে পড়বে প্রফুল্ল উৎপলে।
 

১০
অধিকার ছেড়ে মুক্ত করে দেখি
সম্পর্কের পুরনো সেলাই
 
ভাল লাগে
বাঁধনের ক্ষত দাগে
আঙুলের রহস্য প্রলাপ
 
সূচাগ্রের অন্ধ বিনয়ে
মনে পড়ছে
হাওয়ার দস্যুতা
কাজলের অনন্য মুখোশ
 

১১
ব্রাত্য মিনতির ভঙিমায় চুপচাপ
স্নিগ্ধ অনুভব
জলের শব্দে ঢেউয়ে
খুঁজে ফেরে
সাদা অখণ্ড মেঘ—ক্রন্দন;
নির্জনে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর মুখ।
 
মেঘের ছায়া পড়ে যে পাতার অন্তর
কাছে টানে রোদ উপমার আঁখি
তাকে
দেখবে বলে বসে আছে সত্য ফকির।
 
সময়ের বক্র সিনায় ডুবন্ত দেহ
কাঠের ঘ্রাণেও
টের পায় অফুরন্ত
হৃদস্পন্দন
সে আমার বন্ধু—স্বজন
স্মৃতিচিহ্নে বক্ষভেদি আলোর কাঁপন।
 
 

১২
প্রতীক্ষার আভায় ডুবে যাওয়া মেঘ
যদি ভেসে ওঠে একা
জানালার পাশে
নিভৃতে
তাকে মনে মনে জড়িয়ে ধরো
মনের দোয়ার খুলে
উড়াও বিদ্বেষ
 
রক্তমাখা পোশাকের তলে
চুপ থাকা
গুটানো বিভ্রমে হয়ত ফুটে উঠবে মৌননদ —পুষ্পিত শূন্য
মনান্তারাল
 
মুছে যাবে তুচ্ছতা, এই জঙ্গী সার্কাস
 

১৩
অনেক বাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে সাঙ্গাত এলো মনে, ভাষার কাছে নতজানু হয়ে হাওয়ার সন্ত্রাস, পুষ্পসুবাস ছড়িয়ে দিল দেহের সকল কোণে। আর কিছু বলার নেই ভেঙে গেল নথের বাজার, কুলহারা পাতার সাথেই মুছে গেল মায়া সম্ভ্রম। এখন খুলে দেখছি বালকবেলার হারানো জঙ্গল, বিজলিচমকে একাই নেচে উঠছে সম্পর্কের খোল।
 
 
১৪
নদীলগ্ন হাওয়ায় কাছের মানুষ নাই, বন্দরে ভিড়ছে একা সত্য কথকের তরি, সন্ধ্যার মোহনীয় আভার শুদ্ধ ঝুঁটি থেকে উড়ে এসে একটু বসো পাতার নকশায়, দৃশ্য থেকে উঠে আসা ছিন্ন অবসর সরে যাক দূরে ঝলকানো মন মহুয়ায়। ধরা দিতে চেয়ে যদি দগ্ধ হয়, ওকে ধরতে যেওনা, নির্জনে অহিংস ছত্রাকে ছড়িয়ে যাক মুগ্ধ ধারণা। হৃদালয় ভরে উঠুক সহস্র উপহাসে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E