৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৩২০১৭
 
 ২৩/১০/২০১৭  Posted by

ভাষা-বাস্তবতার বিশ্ব

১.
ভাষা সর্বদা বাস্তবতা থেকে এগিয়ে থাকে। যদিও সত্য বা বাস্তবতা বা রিয়ালিটি বা ঘটনাবিশ্ব বা চোখের সামনে ভেসে থাকা সকল দৃশ্য ভাষা থেকে অধিক সত্য, রিয়াল। ভাষা বাহকনির্ভর, বক্তাই মেশিন, উৎপাদক, সে চিন্তার মতো নিস্তরঙ্গ। আর আমি যা দেখতে চাই, যা আমার অসহায় ইচ্ছা, তার অধিক সম্ভাবনা নিয়ে সে খুলে দেয় অবারিত দ্বার, ঘটনা তারও অধিক প্রকাশিত হয় ভাষায়। সে ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন। আমরা যা দেখতে চাই তাই নির্মিত হয় ভাষায়, দেশকালের রংহীন আদি শূন্যতায় তৈরি হয় ভাষা-দৃশ্যের পিরামিড, বিগব্যাং, জগৎ, জীবন। যা তোমার জ্ঞান, যা বিশ্বাস, তাই বিজ্ঞান, তাই অদৃষ্ট, ভাষা দিয়েই তোমার বোঝ। ভাষাই অস্তিত্ব। ব্যক্তির কাক্সিক্ষত দৃশ্যই লিখিত হয় ভাষায়, কেননা এটাই আমি দেখতে চাই আজ এখানে এখন, তৈরি হয় ভাষা-বাস্তবতার বিশ্ব, গড়ে ওঠে এ মর-জগৎ।

ধরুন, ‘আপনি’ আর ‘তুমি’ দাঁড়ায়ে আছো একটা মিরপুর, যেন-বা তোমরা কসমোপলিটন, ওপেন মাইন্ডেড, মিরপুর পৃথিবীর এক শহর, রাষ্ট্রহীন। একটা গাছের নিচে দাঁড়ানো আপনি আর তুমি। সেই গাছ, তার পাতা, সেখানে আড়াল, ধরে আছে মেটালিক মেহগনি ফল, নিষিদ্ধ জনযুদ্ধের কোনো সর্বহারা যেন, হাতে বোমা, যেন তার শরীর ক্লাস্টার হয়ে ফুটে ছড়াবে অগণন হাতবোমা। অথচ তখন থাকার কথা নাগরিক কোকিলের দিন; এখন বসন্তরাগ বাতাসে, নাগরিক স্প্রিং, মে বি অটাম বা উইন্টার বা যেকোনো ঋতু, সিক্স অর ফোর, কোনো মানে নাই; সো, কুহুহীন, হর্নময়, আগুন আগুন, উঁচু মেহগনির ছায়ায় আজ বসন্ত আনলাম মাত্র ভাষা দিয়ে, কথা দিয়ে বা ভাবনা দিয়ে। আর এখানে হাইরাইজ ভবনের ছায়ার ভেতর আরেক খাপখোলা ভবনের ছায়া ঢুকে যায়, দৃশ্য ইনপুট হয়, ডগি ইন দ্য টাইম অব স্প্রিং, শহরের দেয়ালে দেয়ালে, ছায়ায় ছায়ায়, আধুনিক স্থাপত্যের আয়নায় ঘেরা শীতাতপ প্রলেপে ভেসে ওঠে ডগি ইন দ্য টাইম ইন স্প্র্র্র্র্র্রিং। আর তার তালাআঁটা চাবি-মারা সাবলেট ঘর, তোমার পিগন্ধ তালা, রিং, করাতকল, কাঠচেরাইয়ের মফস্বলী মিহি শব্দের মেটাফরে তোমাকে আপনি চাইছে। শব্দে ভাঙো সখা হে, সহে না যাতনা আমার আর আর আর, ডিস্কো-ফেরতা রাতে আজি এ বসন্তে মহাকাশ থেকে হাবল পাঠাচ্ছে মোর মোর বিট, বেজ, ফুর্তি, ড্রাগন নিশ্বাস নেমেছে বাতাসে।

হঠাৎ এই দিনের আলোয় নামালাম রাত, ল্যাম্পপোস্টে ঝুলে আছে নিয়নের সাই-ফি ফল, উজ্জ্বলতা-রং চকচক শহর ভালো লাগে, তোমাকে দিল আপনার সাথে এই জ্যান্ত মহানগরী, নাম না জানা তনুশ্রী-শরীরের ঘ্রাণ, পিগন্ধ বন্ধ কপাট, তালা, চাবিহীন, এমন বসন্ত আজি ডিস্কো-ফেরতা রাত, কুহুহীন, লোকাল বাসের চামড়াছোলা হর্নবাদক বসন্ত, ডগি ইন দ্য টাইম অব স্প্রিং, প্রেম, হাউ টু মেক লাভ, ইট’স মাই ফার্স্ট টাইম বেব, আপনি আর তুমি দাঁড়িয়েই আছেন আমার টেক্সটে, আমার ভাষায়, এখানে আজ কসমোপলিটন পৃথিবী, মিরপুর; মানে শিল্প শিল্প করে তোলার ইচ্ছায়, তোমার রুচির পিচ্ছিল সুড়ঙ্গে হাউ কাম, ওরাল ওরাল জীবাণুনাশক স্বাদ, মানে সর্বোচ্চ তিন সহজ উপায়ে, মাত্র তিন পথে, হাজার পদ্ধতিসূত্রে, মেকিং ইউ লাভ বেব অথচ কিছুই নয় নতুন, পুরাতন, আবহমান বা সকল পদ্ধতি হয়তো তোমার জন্যও না সুইট্যাবল, আরামদায়ক, দেহ-মজা-জাগানিয়া। ইথারগুরুর টেলিস্ক্রিনে আমি শিখে নিচ্ছি সব।

আসল ঘটনা, রিয়ালিটির প্রসঙ্গ কাঠামোয় দুজন মানুষ দাঁড়ায়া ছিল মাত্র। হয়তো সেইটা না-মিরপুর, সঘন মহানগরের বা ঢাকার যেকোনো মহল্লা বা সাব-ওয়ে, লোকাল বাস এই লেনে গভীর রাতে রেস্ট নেয় আদিকালের ঘোড়াদের মতো, যেন এরই নাম রোড টু আস্তাবল বা হর্স-পাওয়ার স্টেশন মোড়। মানে হেড টু হেড, টেল টু টেল একই রকম বাস্তবদৃশ্য এই জগতে উৎপন্ন হয়, আমরা উৎপাদন করি। একই রকম হাজার বাস্তবতার রাস্তায় একই রকম আপনি আর তুমি, সেমেট্রিক, বেলকার্ভ, হাজারে হাজার লাখে লাখ নিযুত প্রাণ, ভিন্নতাহীন, একই অর্গানে জন্মানো অস্তিত্ব, টুইন, একই চেহারার সাতশো কোটি মানুষ এই গলিতে ঢুকে খুঁজছে শান্তি-মাদক-বার। এই অগণন সাদৃশ্যময় বাস্তবতা যখন লিখিত হয়, তখন দৃশ্য আর বাস্তব একে অপরের মধ্যে ঢুকে যায় ছায়ার মতো। আপনি আর তুমি, তোমার রিয়ালিটি বা এনটিটি, অ্যাজ আ পারসন তুমি আর বাস্তবে থাকো না, অদৃশ্য; তোমার মতো কেউ ডিস্কো-ফেরতা আজি বসন্তে, রাত্রি নিয়া করে সমাচার, ‘আপনা’র মতো সস্তা মানুষ ‘তুমি’রা ঘরে ফেরেন আর ফেরো, পৌঁছায় না কোথাও।

ধরুন, আপনি আর তুমি দাঁড়ায়ে আছো একটা মিরপুর। একটা গাছের নিচে। এখানে একটা কুহু ডাক লিখে দিলাম যেকোনো ভাষায়, বসন্ত নামল—শব্দ এমনই জাদুবাজ। আপনি আর তুমি যেন থাকো বসন্তে, নিয়ন দৃশ্যমান আলো হাওয়ায় অনন্ত দিন—নামছে ভোর, নামছে আনন্দ জীবনের।


যা তুমি দেখো এবং যা তুমি দেখো না এবং যা তোমাকে জ্ঞান হিসেবে বলা হয়, তাই তুমি বিশ্বাস করো, উপলব্ধি করো, নিজেকে উৎসর্গ করো। বাস্তবতা মাপার জন্য কোনো অঙ্গ মানবদেহে বিকশিত হয় নাই, এত যে মাপ মনোদেহের ভেতর, কাবজাব, অথচ দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কান থাকলেও মাপার জন্য কোনো স্কেল নাই দেহের সাথে। পরিমিতিবোধের অর্গান থাকলে সবুজকে আমরা যেমন সবুজ দেখি, তেমনি লাল বা নীল রঙের ডেপথ আর ঘনত্ব মেপে আমি তোমাদের উদ্দেশে পাঠাতাম কাগজের সত্যফুল, সুগন্ধময়, কীটহীন। দেহের বাইরে ভাষাই তোমার দেহের অংশ, একটা অদৃশ্য প্রত্যঙ্গ, সপ্তম ইন্দ্রিয় পরিমিতি-অঙ্গ; ভাষা নয় দেহাতীত—দেহের ভেতর-বাইরে। ভাষাই এখন আপনার নতুন ঈশ্বর, বিশ্বাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান। ভাষায় উদ্ভাসিত রিয়ালিটি, সত্যাসত্য। সত্য বা মিথ্যা উভয়ই ন্যারেটিভের অধিক কিছু না। নীতির চাপে সত্যবোধ জাগে, মিথ্যার ঘৃণা জাগে দফতরে, প্রতিষ্ঠার হাওয়ায় লাগে দোলা। তুমি রুচির চারপায়া ফেক-উডেন টেবিলে ধর্মগ্রন্থ হাতে সত্যের পেয়ালায় মিথ্যের গ্রিন-টি খাচ্ছ আর ভাবো এইবার ওজন কমবে, প্রচুর অক্সিডেন্ট এই পানীয়ে, বয়স কমবে, চক্ষুজ্যোতি আমাদের তো কম ছিল না।

এই তো পার হই, যাতায়াত করি, এদিক-ওদিক যাই লোকাল বাসে, রাত বারোটায় বা আরও গভীর গভীর রাতে জানোয়ারযানের চলন্ত পিঠে কই কই যাই, ফিরে আসি; এত রাতে কত লোক ফিরতে চায় ঘরে জানোয়ারযানে, হাত-পা-আঙুল কাটা ঠ্যাংহীন ছেমড়া উঠে পড়ে ট্রেনে ভরদুপুর, টাকা চায়, ভঙ্গি করে, ভান করে, ক্রাই করে বয়, ফোক-ফেলো, সিউডো-রিয়াল বয়, তোমার বাকি দেহ কই, কেটে পড়া হাত-পা-আঙুল কই, কোথায় ফেলেছ কাটা হাত, পা, আঙুল, কোথায় আছে সেই কাটা হাত পা আঙুলের কঙ্কাল, কালশিটে শ্যাওলাধরা হাড় কোন ডোবার জলে, থকথকে কাদার গভীরে, ক্ষয়হীন শুয়ে আছে আমাদেরই পোশাকে আঁকা ফুল, পাতার ছায়ার আড়ালে মেরুদণ্ডের ’পরে। আর তোমার মনে হয়, তুমি তাড়নায় পড়ে যাও এই চ্যাটচ্যাটে লোকাল বাসে, আমাদের এই ঘামাচি-মার্কা বাতাসে, দমবন্ধ তাপসেদ্ধ কর্মজীবন, জীবিকাবিহীন, তিনবেলা নিরাপদ সুখাদ্যময় চিকিৎসাবিহীন দিন, সঞ্চয়-অক্ষম সুদ-আসলের কারবারহীন ভবিষ্যৎ, ঘুষ খেতে চাওয়া অথচ লোকলজ্জায় বা সুযোগে না পাওয়া ঘুষহীন মানুষজন বা এর বাইরে যারা বা একটু ওপরে বা নিচে তাদেরকে আর ফাঁপর দিও না সিউডো-রিয়াল বয়, হাত-পা কাটা বাস্তব বা অবাস্তব দৃশ্যের দাম নাই কিছুই।

কংক্রিটের ভেঙেপড়া চিড়িয়াখানায় আটকাপড়া পশুদের নিয়ে কথা হয়, দুঃখ হয়, আবার কোনো কোনো চিড়িয়াখানায় আগুনের বৃষ্টি হয়, তোমরা ভিডিও করো দোজখের দৃশ্য, লাইভ মৃত্যুর মহড়া বা ধর্মগ্রন্থ থেকে নেমে এসেছে দোজখের সেট, ওম, তাপ, ফায়ার বিগ্রেডের হুইসেল, মধু কৃষ্ণের বাঁশিতে গনগনে আগুন আর মানুষ পোড়ার গন্ধ থেকে লাফ দিচ্ছি দুনিয়ার দিকে, তারা আর পৌঁছায় না আদম-হাওয়ার মতো আমাদের মর্ত্যরে ভুবনে, কর্পূরের মতো তাদের দেহ আর আত্মা উদ্বায়ী, পুরাণের মতো সত্য নয় জীবন তাদের। অর্থনীতির ঈশ্বর লেখে নতুন গ্রন্থ, নতুন বোধ্যগল্প: তাহাদের স্বর্গপতন, দুই লক্ষ বছর ধরিয়া দ্ইু হাজার বারো কি তেরো সাল থেকে তারা পড়তেই আছে পৃথিবীর দিকে, সো আগুন লাগা স্বর্গ থেকে অ্যাডাম-ইভ পড়তেই থাকবে দুই লক্ষ বছর, ডানাওয়ালা দৈব মানুষের মতো তারা উড়ছে লক্ষ বছর। অর্থনীতির ঈশ্বর লেখে নতুন গ্রন্থ, আরেক বোধ্যগল্প, নয়া-গল্প আমাদের জন্য ‘ল অব এভরিথিং’।

ভাষা কেরিক্যাচারময়। এইখানে নাই সত্য-ভাষণ বা মিথ্যা-কথন, ইনডিফারেন্ট। ভাষায় বলা ঘটনা অধিক বাস্তব, সত্যেরও অধিক সত্য, বাস্তবতার অধিক থাকে ভাষায়। ভাষায় আছে ইউটিলিটি, ভোগ, ভাষায় কিনছি দেহ, মাংস, রুটি, দ্রোহ, চেতনার আরাম, নিরাপত্তা, অস্ত্র, ধস্ত কামান, ঝুলন্ত চাঁদ, জ্ঞান। ভাষায় নিচ্ছি স্বাদ। ভাষাই আপনার নতুন ঈশ্বর, বিশ্বাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান।

ভাষায় বর্ণিত সত্যে ভরসা রাখুন, চোখ রাখুন পর্দায় বা কাগজে।


ভাষা হলো ভঙ্গিমা। ভাষা হলো যোগাযোগ-মাধ্যমের সবচেয়ে নমনীয় ইলাস্টিক। ভাষা ছোট হয় বড় হয়, প্রয়োজন সে বোঝে, কোথায় কখন কেমন, কতটুকু নিজেকে তুলে ধরতে হয়। ভাষা দেহের বাইরে মনোদেহের একটা অদৃশ্য অঙ্গ, হাওয়ায় ভাসানো অদৃশ্য নিউরন, সংযোগজাল, নেটওয়ার্ক, সুপারন্যাচারাল স্প্রিট, রেইনবো।

তোমার ভাষার সুগন্ধ, স্মার্ট টেকনিক্যাল নিরলা ভেজা রস, গুপ্তময়তা, তোমার উৎক্ষেপণযন্ত্রের পিংক’স লিপ, দমের মেশিন, ভারতীয় তাজ, ঘাসেছাওয়া নিয়ন প্যান্টি, ফায়ার বিগ্রেডের লাল রক্তময়তা, সুরক্ষিত ফোমের গম্বুজে ললিপপ নিয়ে বসে থাকা হ্যালো কিটি, নখে আঁকা লোহিত সাগর, ঘাড়ে ট্যাটুর আদিমতা, রেয়ন কোমল ত্বক, তোমার ভাষায় নামে নীরবতা, সন্ধ্যায় একা পাবার মজা, যেন সূর্যটাকে ডুবিয়ে দিয়ে এখানে নামালে সন্ধ্যা দুপুরের রোদে, আমার ভালো লাগে, তোমার ভাষার সুগন্ধ নেটওয়ার্কে জড়ায়া গিয়াছ আমার দুর্বল মফস্বলী সংকর পূর্ববঙ্গীয় ভাষা।

তোমার কী ভালো লাগে আর কী লাগে না, তোমার ইন্দ্রিয় সুখানুভূতি, বসার ভঙ্গিমা, ওপেন এন্ড, ক্লোজ এন্ড, ক্ষুধায় কত গ্রাম খাচ্ছ বা খাবে না, ওজন-সচেতনতা, কতটা লাভ করো, হেট করো বাবু জানুটাকে, মেক করো কতক্ষণ, কোন আলোর রেস্তোরাঁয় তোমার ভালো লাগে সন্ধ্যা, মধ্যরাতের ওয়ার্ম শাওয়ার, ওয়েট ক্যাট ফিলিং, স্বপ্নে তোমার আশাঘোড়ার কেশরে লেগেছে আগুন, মধ্যরাতের বৃষ্টিতে কোন গান তুমি শুনিয়েছিলে বিদেশি ভাষায়, আইস অন ফায়ার জানু, শীত শীত শহরে ব্ল্যাকআউট। তোমার ঐ দেহখানি তুলে ধরো ভাষার দেবালয়ে, মফস্বলী মুখের কাছে, অসমাপ্ত অঙ্গের পাশে, সুষমায়।

মানুষ পারে না ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে, সো দেহের বাইরে বেড়ে ওঠা নিউরন, অদৃশ্য অঙ্গ বলে দিচ্ছে সব, কী হবে কোথায় কখন। তুমি ভাষার অধীন, ভাষাকারাগারে, ভাষায় গড়া ভুবনে বাইরের আলো চোখে পড়ে না।


ভাষা হলো অসম্ভবের দেশ, সকলই সৃষ্টি হয় ভাষার কেমিক্যালে। আপনার ভাষাই আপনার চিন্তার পরিচয়, আপনার চিন্তা আপনার ভাষার পরিচয় না।

এক ঝাঁক সাদা রাজহাঁস বসে আছে অসীম জলের আলোকিত প্রান্তে; নৃত্য মানে মহাকাশ ঘুরে ঘুরে মুদ্রা শেখা, মহাসমুদ্রে নীলাভ শৈবাল এই রহস্যের কিছু না বুঝেই তলিয়ে যাচ্ছে জলের অতলান্তেÑমূলত আমার মাথার ভেতর ঘটে যায় এই সব। বহু জাহাজের সচল কম্পাস-কাঁটা, মানচিত্র ফেলে চলে যায় অক্টোপাস, নীল তিমি, হাঙর। আর শিশুরা সমুদ্রলবণ থেকে হাড় হয়ে ফুটে ওঠে প্রসূতির দেহের ভেতর, অন্ধকারে ঝরছে জন্ম-পুষ্প জলের ঢেউয়ে, চক্রে চক্রে ফিরে আসে আত্মার গাঢ় নীল ইমেজ—সাতশ কোটি সমরূপী মানুষ ফিরে ফিরে আসে হর্স-পাওয়ার স্টেশন রোডে, একই রাস্তায়, তারা আজ ত্বক শুকায় সমুদ্রতীরে, উলঙ্গ; স্থান, কাল, আধার আর আলো হেঁটে যাচ্ছে একই রাস্তায়, একই রোডে। আর আপনি আর তোমার মাথায় বসে আছে সমুদ্র-ইতিহাসের জলদস্যু, তাদের ভুল ম্যাপ ফয়েল-মোড়ানো, দিকনির্দেশনাহীন, অপ্রয়োজনীয়। সমুদ্রের কোনো দিক নেই, তার ব্যাপ্তি ছাড়া কিছু নেই; মাত্র ভেসে থাকা, সার্ভাইবাল এই মহাসমুদ্রে, মহাকালে, মহাস্থানে। আর আমি সমুদ্রজলের বিপুল ওজন নিয়ে এসেছি ড্রয়িংরুমে, কথা বলছি; ঘুম না হওয়া মাতাল রাতের হাওয়া উল্টে দিচ্ছে ব্যাম্বু-ফাইবারে তৈরি হালকা পোশাক, তার স্তনে ময়ূরের ট্যাটু, তুমি সমুদ্রজলের বিপুল ওজন নিয়ে বসে আছো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে, আর আপনি হেঁটে যাচ্ছেন আর্ট গ্যালারির ঘষামাজা ব্রিটিশ-তাড়ানো এক প্রবীণ ল্যাম্পপোস্টের নির্জনতার ভারতবর্ষে, ওয়াশরুমে বসে শুনছি বেসুরো জ্যাজ, আর দেখছি নিজের পা গিলতে গিলতে এই দেহ এক বৃত্ত হয়ে যায়, বিষাক্ত সাপের তেলতেলে লেজ-কামড়ানো লোকটি দেখতে পায় পায়ুপথ দিয়ে বের হচ্ছে হাঁটুর কঙ্কাল, নৈর্ব্যক্তিক মনোরোগ। প্রতিদিন চিরুনির দাঁতে উঠে আসে দু-একটি মগজের শিরা। নিত্যতার বহু পাঠ বাকি। বাতাসের ব্ল্যাকবোর্ডে শীতকাল মুছে দিচ্ছে পাতার ডাস্টার। আর আলোরশ্মিতলে বিরল চাকার জুতো পায়ে এক দেবশিশুর রুমাল আকাশের ঘাম মুছে দিল, কৃষ্ণগহ্বরের দেয়ালে অদৃশ্য দার্শনিক চকে লিখে যাচ্ছি অলৌকিকতার সহজ শিশুপাঠ। সূর্য থেকে লাফিয়ে নেমেছি মাটিবর্তী নিসর্গ-ভূগোলে, অঙ্গার শরীর ছিল আলোহীন, রক্তশূন্য।

তোমাদের বাড়ি আর কত দূরেই-বা! ঠিক পৌঁছে যাব ডিনারের আগে। সূর্যাস্ত সন্ধ্যায়, মাথার ভেতর তোমাকেই পৌঁছে দেই অর্গাজমের বিষমোহে, আমি বসে আছি ইনভার্স পৃথিবীর অনুকল্পে, বসে আছি মস্তিষ্কের এক দীর্ঘ রাজপথে। পথ হেঁটে যাচ্ছে, পথ ক্লান্তির নিশ্বাস ফেলে কানের শরীরে, আরও আঁধার পথ হেঁটে আসছে আমার দিকে—ধীরে ধীরে আমি হয়ে যাই সহস্র রাস্তার মোড়, হর্স-পাওয়ার স্টেশন মহাস্থান-কাল-পাত্রে ভাসমান। এমনই এক মোড় তোমার ড্রয়িংরুম, বসে আছি আমি, নির্জনতার মোম পুড়িয়ে আজ ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার, জীবন এখানে এখন সহজ, আনন্দঘন।


One morning, when Gregor Samsa woke from troubled dreams, he did not found himself transformed in his bed into a horrible vermin.’ We found a massive error in his highly coded communication program.

কোনো কোনো দিন বোঝো না নিজেই নিজের ভাষা। ভাষার ব্রেকডাউন, ব্ল্যাকআউট। কোনো কোনো দিন উচ্চারিত শব্দ থেকে অক্ষরগুলো ছিন্ন হয়ে হাওয়ায় ভাসে অক্ষর-বুদ্বুদ হয়ে। প্রতিটা বাস্তবতা থেকে উৎপন্ন শব্দ অক্ষরে অনূদিত হয়ে তৎক্ষণাৎ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, ঠিক তখনই সূচিত হয় বাস্তবতার জারণ, ভাঙন, শুরু হয় অর্থহীনতা, রিয়ালিটি গড়ে ওঠে অসংখ্য বিমূর্তের খণ্ডাংশে, তখনই শুরু হয় অর্থহীনতা, না-বোঝা দৃশ্য। এখন বোঝা যায় ‘নীরবতা’র অনুবাদে বাতাসে উড়ছে রেডিয়াম তৈরি অক্ষর ন, ই, র, আ, ব, ন। কোনো কোনো দিন ভাষাকে আর বোঝা যায় না।

গ্রেগর সামসা এক মেশিন, সেলসম্যান, তার উন্নত নকশায় ভোরবেলা ঘুমঘোরে স্বপ্নের ভেতর ঝরে পড়ে তিনটা বিগলিত নীল কবুতর, ম্যালওয়ার, ভাইরাস, বিষণ্ণতা, আত্মবিচ্ছেদ, অনস্তিত্বের কোড, যতই গভীরে যায় রাত আকাশ তত দীর্ঘ, গভীর হতে থাকে, ভাষা-বাক্যহীন গ্রেগর সামসা, তার মেশিনের কান পৃথিবীর তাবৎ অর্থময় ভাষাকে কাচের বাসনপত্র ভাঙনের আতঙ্ক হিসেবে অনুবাদ করছে এখন। তার ছিল কুমিরের চামড়ার মানিব্যাগ, গুইসাপের ছালের বেল্ট, সুইস রিস্টওয়াচ কাঁটাহীন, নির্ভুল সময়নির্দেশক, আফ্রিকান হরিণী নিজেই খুলে দিয়েছে চামড়ার পেলবতা তার জুতার আদলে, থাই বাঘের স্কিনের ডিভানে সে ঘুমিয়ে ছিল নির্ভার, হঠাৎই নামে স্বপ্ন, আকাশ যখন দীর্ঘ ও গভীর, ভাষাসিংহের কেশরে ফসফরাস ঢেলে আগুন দিচ্ছে জোনাকির অর্গানিক মশাল, ঘুমটাই পুড়তে থাকে সমস্ত রাত, স্ট্রেস বার্নআউট ভ্যাকেশনে নেমে আসে বিগলিত নীল কবুতর, আজ স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ঘুমের ভেতর। গ্রেগর সামসা এক মেশিন, সেলসম্যান, সে হারিয়েছে কম্পাস, সেক্সট্যান্ট, টেলিস্কোপ, দৃষ্টি-যন্ত্র ভাষার সমুদ্রে, দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি, ওয়ার্ড ওয়ার্ড এভরি হোয়ার, নট আ সিঙ্গেল টু আন্ডারস্ট্যান্ড।

ভাষা বিকাশমান নিজস্ব ফর্মে, সর্বব্যাপী সে। বোঝা না-বোঝা বা দেখা না-দেখা ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। এই নিজস্বতায় মানুষগুলো একা দাঁড়িয়ে থাকে ভিড়ের ভেতর, আরও যেন হতেছে আলাদা।


ভাষা মাধ্যাকর্ষণ যেন।

যেন অদৃশ্য সুতো বেঁধে রাখে সব নগর দালান বৃক্ষশোভাগ্রাম মহাসড়ক সমুদ্র পাহাড় মানুষ। যেন পৃথিবী কেন্দ্রের আকর্ষণ ছিঁড়ে কোনো কিছুই ভেসে যেতে পারে না মহাশূন্যে, চিরশূন্যতায়। কেন্দ্রবিমুখী বল বস্তুর নিজস্ব ধর্ম, বস্তু যখন ঘোরে স্বয়ং ইহা উদ্ভূত হয়, যদিও নিশ্চল বস্তুতে কোনো যন্ত্র লাগিয়েই এর হদিস পাওয়া যায় না, এর আছে বিমূর্ত গাণিতিক মাপ। সেইরূপ ভাষা যখন বলা হয় তখন শ্রোতার দিকে সে যাত্রা করে বক্তাকে বোঝানোর দায় নিয়ে। একটা অদৃশ্য সজীব অর্গানিক সচল টানটান সেতু তৈরির আশায় সে যাত্রা করে শ্রোতার দিকে বাতাসের সমুদ্র সাঁতরে। মনের ভেতর ভাষা হলো নিশ্চল বস্তুর মতো, পালসহীন। মুখ থেকে নিঃসৃত হবার পরই, ব্যক্তির দিকে ছোড়া ভাষাবল্লমের নিচে জš§ হয় সবুজ জীবন্ত অদৃশ্য কথার বীজ। তরঙ্গায়িত ওয়েভের আঘাতে হলুদাভ মগজের ওপর জন্ম নিচ্ছে চিন্তার পুষ্পক গাছ। ভাষা সে এক মহাকর্ষ, চিন্তা আর সংযোগের এপার-ওপার ধরে রাখে।

এই যে আজ এসে গেল আমাদের বাদলদিন, মনখারাপের দিন, বৃষ্টিভেজার আশায় বারান্দায় কাটানো হাঁস-ফাঁস দিন; বৃষ্টি, বুলেট, প্যারেডের কুচকাওয়াজ, মেঘের কামান গর্জে ওঠে, স্যাটেলাইট মাঠে ইথারশূন্যতায় ওজনহীন ফেরেশতাদের লাশ কল্পকাহিনির মতো অদৃশ্য, তবু বাস্তব; এই শহরের মেয়র আজ যেন রবীন্দ্রনাথ, ভেসে যায় ড্রেন, ঝরনার স্রোত স্রোত বেগে, মুগ্ধ গুনগুন, দৃষ্টিনন্দন কন্ডম, ব্রা, পেন্টি, লিপস্টিক রেড বা পিংক বা স্ট্রবেরি ভায়োলেন্স, প্যাড, রাংতা, মুখোশ, নারীজাতীয় সব আজ ভেসে ওঠে পুরুষপাঠকের জন্য আপনা-আপনি এই বর্ষায় অতিরিক্ত, যেন শিলাবৃষ্টি সবুজ মাঠে, ছড়ায়ে আছে সাদা কফ, যেন মদের সবুজ গ্লাসে ড্রাইজিনে ভেসে আছে সময়-জমা আইস, এমনও ঘোর বর্ষায়, আর আমাদের অভাব-আক্রান্ত দুই রুমের শীতাতপহীন নামকাওয়াস্তে ফ্ল্যাটের বাইরে মহল্লার লোকেরা যারা ভেজে না, ভেজা-শৌখিনতাহীনদেরও আজ বিষণ্ণ হতে চায় মন, তারাও আজ ব্যাকুল। আর সরকারি হাসপাতালের ব্যান্ডেজ পায়ে ক্ষুধাহীন মানুষের মতো দেখতে শরীর, পথকুকুরের মতো দেখতে শরীর, জানোয়ারের মতো দেখতে শরীরে জ্বর; তার তাড়না, গুপ্ত-এষণা, মেয়ে শরীরহীন জীবনের ’পরে ঝরে পড়ছে যেন সভ্যতার ফায়ার অ্যান্ড আইস রেইন, সে জানে না কাটা-পায়ের ইনফেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক, বৃষ্টিনন্দন। শিলাবৃষ্টিতে তুমি আর আপনি দাঁড়ায়ে আছো মিরপুর। হোয়াইট ওয়াইন বৃষ্টি আজ, সুস্বাদু, দেহপাত্রে শিলাবৃষ্টিকুচিতে জমা হোয়াইট ওয়াইন কোথায় রেখেছ জানু, নেশা নেশা লাগে। লুক বয়, আই অ্যাম অলওয়েজ ওয়েট অ্যান্ড আ ওয়াইন হাউস, কান্ট ইউ স্মেল দ্য রোটেন ভাইন ইনসাইড মি বেব? অনন্ত পাত্রে ধরা আছে একটিমাত্র আঙুর, রোটেন ভাইন। কাঁচা ঝিনুকের উল্টানো পাত্রে মুখ রাখো, পাঁড়মাতাল হয়ে আজ বৃষ্টিতে অদৃশ্য ঘরে ফেরার পথ। এই ঘন বর্ষার পর্দায় জ্বলছে লেজার শো, দেখা যায় জলভেজা নরম শরীর। বৃষ্টিবুলেট, প্যারেড, কুচকাওয়াজ, মেঘের কামানগর্জন, বিদ্যুৎ, লেজার, রবীন্দ্রভাবাপন্ন মেয়রের নগরে মানুষের মতো দেখতে শরীর, পথকুকুরের মতো দেখতে শরীর, জানোয়ারের মতো দেখতে শরীর; ভিজে যাইছে প্রাণ আমার।

বৃষ্টির প্ররোচিত ভাষায় জেগেছে আজ গান, জেগেছে দেহ। যে ভাষা মরে যায় তা আর কোনো দিন জাগ্রত হয় না। জীবন্ত সচল ভাষা এপিকের দৈত্যে, যেন প্রটোজোয়া, তার সিকিউরিটি সিস্টেম স্বয়ম্ভু, সে বাফার, সর্বগ্রহণে সক্ষম, কাছিম-দীর্ঘ আয়ু তার। তাকে হত্যা করা যায় না। জীবনে ভাষায় চাই সহজতা। মানুষ ভ্রমণে সেই সমস্ত স্থানেই যায় যা কষ্টসাধ্য নয় অথচ আরামদায়ক, বর্ণনা করা যায় ব্যাপক ও ব্যাপ্ত ফেরার পর।


রিপাবলিক থেকে বিতাড়িত কবিরা আর ফিরতেই পারে নাই রাষ্ট্রে। তারা স্যাটির বেশে ঘুরছে, না-মানুষ না-ছাগল, ছাগতত্ত্বের পোশাকাবৃত মানুষ, মাথায় পরেছে আলোজ্বলা শিং, বিষণ্ণ মনে বসে আছে করুণ ট্র্যাজেডি খুলে, গভীর জঙ্গলে ডায়োনাইসিসের গুহায় নাচ গান হয়, আলো-অন্ধকার নিয়ে বাতচিত হয়। মূলত জনপদের ভাষা গড়ে ওঠে কবিহীন, আমজনতাই ভাষা গড়ে তোলে। পৃথিবীর তাবৎ ব্যবহারিক ও প্রোগ্রাম কোডের ভাষায় কবির অবদান স্বীকার্য পর্যায়েও পড়ে না। কবি আসলে জনপদের ভাষার মেরুদ-হীন পরজীবী, আর কবিতা জনজীবনের সত্যস্বরূপা রেপ্লিকা, ফ্যাক্টহীন শব্দবন্ধন।

কবিতা রাজনীতিতে তুখোড়, তিনিই প্রজাতন্ত্রে থাকবেন। ভাষাবিকাশের ব্যাকরণ তিনিই লিখবেন। আর হাঁদারা সব বিষণ্ণ মনে বসে আছে করুণ ট্র্যাজেডি খুলে, মহাকাল তাদের দিকে ছুড়ে মারবে নক্ষত্রের স্বর্ণ-আভা।


ভাষা জীবন্ত অশরীরী, চিরঞ্জীব। পাহাড় ক্ষয়ে যেভাবে নদী তৈরি হয় সেভাবেই ধীরে, অতি ধীরে তৈরি হয় ভাষা, রূপান্তরিত ও বাহিত হয় জীবচক্রের মতো, সে যেকোনো সজীব প্রাণের মতোই জীবন্ত, আগুয়ান, তারও আছে মাদারহুড। শান্ত স্রোতস্বিনীর বুকে জেগে ওঠে চাঁদ আর ভাষা- তার অনেক পরে নন্দন, ব্যাকরণ, ধ্বনিবিজ্ঞান। ভাষার পরিবর্তনে চিন্তা বদলে যায়। আর ভাষা সব চিন্তাকে ধারণ করতে পারে না। চিন্তার অনুবাদ অর্থহীন তাই। ভাষা সে অসমাপ্ত বিজ্ঞান।

অভিকর্ষ এক অতিকল্পনার ভাষ্যরূপ, ধারণার সত্য-স্বীকৃতি। এই সত্য না জেনেই কত আপেল ঝরেছে বৃক্ষজšে§র পর। ষোড়শ শতকের পূর্বে কোনো কারণ ছাড়াই ঝরে গেছে ফল। এই সময়বিন্দুর আগের আর পরের ফলের পতন এক না আমাদের ভাবনায়। আপেল পতনের জন্য অভিকর্ষ ম্যানডেটরি। পতনের মৌলসূত্র জানি আমরা। আর এখন পর্যন্ত কেউ জানে না আপেলবৃক্ষের জন্ম কবে। এই সত্য না জেনেই কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তারাও তো লিখেছে পাথরে পাথর ঘষার সংকট, বন্যপ্রাণী, অক্ষর, প্যাপিরাস, গুটেনবার্গের মেশিন, বিশ্বাস, স্ট্যাটাস, টুইট আমাদের মতোই। হয়তো সমস্ত বৃক্ষের ধ্বংসের পর আলোকবর্ষ দূরে যেকোনো গ্রহান্তে বসে ক্লোনে জন্মানো নিউটন-২ আবিষ্কার করবে আপেলগাছের জন্মবৃত্তান্ত এবং এই নতুন ধারণা লিখিত হবে নতুন কোনো গ্রহের অভিযোজিত মানুষের ভাষায়। সেই ভাষার জন্যই বসে আছি আপেলগাছের নিচে আবার, এই জগতের মায়ায়। সো, ভাষা বদলালে সৃষ্টিরহস্য পরিবর্তন হয়, মানুষ আলোকবর্ষ অব্দি এগিয়ে যায়। সেই কারণে ভাষার নতুন নির্মাণ অস্তিত্বটাকে বদলানোর জন্য, গ্রহান্তরের জন্য, নবজন্মের জন্য; অথচ জীবন একই থাকে যেমন নিউটনের মহাকর্ষ আবিষ্কারের আগে আর পরে বা হাজার-লক্ষ বছর পরও সেইম। ভাষাটাই সব, সে-ই শুধু বাহিত। আমাদের কাচের বোতলের ফার্মিং পানি, সুপারন্যাচারাল ঘর, ন্যানো-আসবাব, ইন্টেলেকচুয়াল রোবট সব একদিন পরিত্যক্ত জাদুঘরে জমানো ইতিহাস হবে; সেই ঘরে দাঁড়ানো ছিন্ন, সমন্বয়হীন, এলানো, রক্তগন্ধে নোনা তার অর্ধ-ধাতব মহামাংস দেহ। সো, সোসাইটির মধ্যে লোনলি ডে, এভরিডে, লোনলিয়েস্ট ডে অব মাই লাইফ নিয়া বসে আছি প্রেক্ষাগৃহে আলো-অন্ধকারে বিদেশিনীর সাথে, তোমার ভাষা ইনফরমেটিভ, সংকেতনির্ভর, বার্তাবহ, শরীরী ঘ্রাণের মতো ঝাঁজালো, লেডিস রেস্টরুমের সংগোপন, মানুষ মানুষ অঙ্গ-গন্ধে আমি ভুলে যাচ্ছি কাকে বলে ভাষা, বিদেশিনীবেশে কে বসিলে আজি নেটিভ-ব্ল্যাক-ক্যাট-গার্ল হৃদয়-আকাশে, কেঞ্জোর নারী-গন্ধের নিচে চোখ ঢেকে গেছে, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি, আজ ভাষাহীন সম্পর্কহীন অনুভূতিশূন্য প্রেক্ষাগৃহের শীতাতপ ঘণ্টাগুলোতে প্রেম, মাংসল, মসলা, লাভস্টোরি, লিটল বিট ক্রাই, কিসপ্রুফ লিপ, তুলতুলে মেরিনো উলের বল, ভিস্কস পেলব দেহ, কার্লি গোল্ডেন হেয়ার আর দেহের সুস্বাদে এত ভালো লাগে ভালোবাসাহীনতা, আজ এই প্রেক্ষাগৃহে পিগন্ধ তালায় করাত চালানোর শব্দে লুট হচ্ছে দালান, দোকান, রেস্তোরাঁ, প্রেম। নিথর দেহের ওপর কাকের বিষ্ঠার মতো হঠাৎই আমি ভেঙে পড়ছি তোমার বেখেয়ালে, ইউ ফিল সিক, ন্যাস্টি টু সি দ্য বিস্ট ইনসাইড বেব, কাক, কাক-বিষ্ঠার মতো বৃথাজন্ম চুষে যাচ্ছে ফেসিয়াল টিস্যু, লাইফ ইজ বেড অব রোজেস, আই ফিল ইট হট অলওয়েজ, রিয়ালি ইউ রিলিজ মাই সেন্স ইন ডিড। বেথেলহেম মাই লাভ, আই লস্ট মাইসেলফ ইন দ্য লাভস্টোরি, বেথেলহেমের ঘোড়ার আস্তাবলের পেছনে আমি দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলাম এই গল্প থেকে আমাকে বাদ দেওয়ার জন্য। বেথেলহেম, মাই লাভ, মাই বেবি, প্লেবয়হীন বেথেলহেমের পবিত্রতা থেকে আমার দৌড়, দাঁড়াতে না দেওয়ার রাজনীতির রক্ত-মাংস নিয়ে, ধর্মীয় গল্পে স্থান না পাওয়া আমাকে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছি নিত্যনতুন প্রেক্ষাগৃহে। চক্রই সব, ফিরে ফিরে আসে। বেথেলহেমে কোনো প্লেবয়ের মূর্তি নেই, পুরুষত্বহীন, কাম কামনাহীন নিষ্পেষিত অপুরুষের ইতিহাস থেকে জেগে ওঠা কত না কঠিন।

ভাষাই সব, সেই শুধু বাহিত।


যেখানে ভাষা বোঝা যায় না, যেখানে মূর্তের বিমূর্তায়ন, যেখানে আভাস ছাড়া বাক্য নিরুপায়, সেখানে নেমে আসে নীরবতার বৃষ্টির আভরণ, না বোঝার আয়রনি; উপলব্ধির প্রগাঢ় শ্বেত বরফের পাহাড় গলে বের হয়ে আসে সত্য কালো পাথরের চূড়া। যেমন দূর আকাশে হঠাৎ দেখা দিলে কবুতর, আমাদের দৃষ্টিসীমানায় উড়ে এল ডানা ডায়নামোর শব্দ, আর এ দৃশ্য দেখে আমরা ভাবি অদৃশ্য থেকে জন্ম হলো উড়ন্ত প্রাণ, ডানা, রেসার কবুতর, পাখি; বহুদূরে পাখিদের উড়াল আমরা দেখি না, দৃষ্টি-সীমানায় উড়ে এলে মনে হয় অদৃশ্য হতে জন্ম এইসব পাখিদের, অথচ সে-ও ছিল প্রকাশিত দূরে, অ-অনুভূত, যেমন ভাষারা আছে, কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়, আর এই দৃশ্য যখন ভাষায় প্রকাশিত হয় তখন অ্যাবস্ট্রাকশন ভেঙে মিলায় সিমপ্লিসিটির জল-স্বচ্ছতায়, সুস্বাদু বিমূর্তরূপী গ্লুকোজ হারিয়ে যায় মূর্তের এক গ্লাস জলে। এই জীবনপাত্র নির্ধারণ করে বর্ণ, রূপ, রস, ভাষা, নীরবতা।

শুভ্র লোমহীন পায়ে, গোড়ালির ওপরে, নূপুর যেখানে পরা হয় সেখানে এঁকেছ সাপের ট্যাটু, সাপ, পায়ে পেঁচিয়েছ সর্পবংশ পরিচয়, আমার ভালো লাগে এই সমস্ত অর্থহীন দেহ সৌন্দর্য, ব্যাখ্যাতীত, ভয় ভয় লাগে এই পদচুম্বনে আজ গভীর ঘুমের আগে, ভাবি ঘুমের ভেতর স্বপ্নে আমি জাগাব এই সাপ, টিউনহীন নূপুর থেকে বরং এই ট্যাটু, এই সাপ অনেক বেশি সমকালীন, নারী স্বাধীনতাময়। সমস্ত সজীব ‘আমি নই অপর’ নামক সত্তাকে খুন না করে, হানাহানিহীন, আমার আমিকে শুধরে দেবার জ্বালাযন্ত্রণা উপেক্ষা করে, আমার বাহিরটাকে ডাস্টার দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের মতো না মুছে, রক্তপাতহীন চলে যাওয়া যাক লামাদের দেশে। হোক গান ধ্রুপদী, অবোধ্য ভাষায়, না-চেনা বাদ্যযন্ত্রের অনভ্যস্ততায় অসহ্যবোধ হোক, সে-ও কি ভালো না? ভালো। সম্পর্কের প্রচণ্ড একাকিত্ব, লিপ্ত হতে না পারা, তার থেকে ভালো বোধ হচ্ছে আজ এই না-জানা ভাষাবিশ্বে, তিব্বতে। এই পাহাড়ি পথে আত্মার গভীরে লুকানোর কোনো তাড়া নেই আর চৌদ্দজন নারীর ট্যাটু থেকে জীবন পাওয়া অগণন সাপ স্বপ্নের ভেতর, আমারই স্বপ্নে ভয় দেখিয়ে আমাকে শাসন করে, নিয়ে যায় সমুদ্রখাঁড়ির সন্নিকটে, যেখানে গলা-কাটা একাত্তর, মানুষ-পচা কালচে সবুজ ঘাসের ভেতর মিরপুর শুয়ে আছে, শুয়ে আছে আটতলা দুই হাজার স্কয়ার ফিট, আমায় না-বোঝা পুস্তকরশ্মি, যেন-বা পৃথিবী থেকে ছিন্ন রকেট জ্বালানিহীন শুয়ে আছে মহাশূন্যতায়, আটতলা অ্যাপার্টমেন্ট, স্পেস শাটলে শুয়ে থাকি পৃথিবীর টেলিভিশনের সাথে, এই হলো দেহ, কাঠামো; ক্লান্তিতে চাঁদে দেখি ফেক পাথরের সস্তা বুদ্ধমূর্তি, ধ্যানমগ্ন; আর আমি চলে যাই লামাদের দেশে, তিব্বতে। তিব্বতি উষ্ণ বৃষ্টির নিচে যন্ত্রণাহীন আগুন বরফের দেহ ও হাড়ের স্ট্রাকচার গলে ভেসে যায় পাহাড়ের গা বেয়ে, যেকোনো ঝরনা হয়ে আমি ভরে উঠতে চাই কোনো লামা কিশোরীর জলপাত্রে বিশুদ্ধতায়। আমার ভাষা বুঝনেওয়ালাদের দেশে মরে গিয়ে মৃত্যুর পর অধিক মানব থেকে যাওয়াটাকে অস্বীকার করলাম। ঘুমের ভেতর ফরম হার বডি আই স্মেল শার্প স্নেক স্মেল, ফরম হার স্নেক ট্যাটু। বোঝা যাইছে না সমকাল, ভাষা।

বহমান ভাষায় কাউকে কিছু বোঝাতে না পারার হতাশা মানুষকে আত্মকেন্দ্রের গভীরে ঠেলে দেয়, আর ভাষা বুঝতে না পারার বেদনায় তারা আজ বাচাল, লিখে যাচ্ছে অন্বয়হীন অগণন জাঙ্ক ই-মেইল, কার ঠিকানায়, কোথায়!


মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব। জন্ম: ৯ অক্টোবর ১৯৮৪, বেড়ে ওঠা ঝিনাইদহ ও ঢাকা।
প্রকাশিত কবিতার বই: ‘জলপ্রিজমরে গান’ ২০১০, ‘কাছিমের গ্রাম’ ২০১৬
যোগাযোগ: mridulmahbub@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E