২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২৭২০১৭
 
 ২৭/১১/২০১৭  Posted by

স্বয়মাগতা
– মৃদুল দাশগুপ্ত

মৃদুল দাশগুপ্ত

মৃদুল দাশগুপ্ত

জন্মায়। তৈরি হয় না। কবিতা স্বয়মাগতা। আমার এরকমই বিশ্বাস। আমি তত্ত্ব, জ্ঞান—এসব থেকে অনেক দূরের এক সাধারণ কবিতা প্রয়াসী। কবিতার নির্মাণ বিষয়টিতে আমার মন সায় দেয় না। কবিতা আকাশ থেকে পড়ে, ধারণা আমার, ওই যে আগেই বলেছি, বিশ্বাসেই দাঁড়িয়ে গেছে।

এই কলমটি যেরকম, কবিতা রচনাকালে আমি, আমার দেহ, মন, সেরকমই। তবে জড় নয়। প্রাপ্তির আশায় ব্যাকুল, আকাঙ্ক্ষায় শিরশির।

শরীর, মনকে ব্যবহার করতে হয় বলেই, এ এক আত্মঘাতি খেলা। কলমে কালি যেমন ফুরোয়ে, শরীরেও দহন চলে, ক্ষরণ হয়। কত রক্তশিরা ফেটে যায়, স্নায়ুরজ্জু জট পাকায়। তবু ওই আকাঙ্ক্ষা আনন্দময়, রামধনু রং ওই দূরাশা।

কাকে বলে কবিতা? কীভাবে হয়ে ওঠে একটি কবিতা? আমি জানি না। শুধু বিশ্বাসটুকু ধরে থাকি, প্রয়াসীরা কেউ কেউ প্রাপ্ত হন। বিশাল এই বঙ্গদেশে তাঁদের কাউকে কাউকে আমি দেখেছি। দেখেছি তাঁরা উড়ন্ত, আলো বের হচ্ছে তাঁদের গা থেকে।

শান্ত এই শ্রাবণ অপরাহ্ণে গৃহকোণে বসে পিছনের দিনগুলির কথা ভেবে, সামনের দিকে তাকিয়ে একথা নির্দ্বিধায় জানাচ্ছি, আমি নিজে ভাসমান গোছের মানুষ, কিন্তু এই দেবদূতদের আঙুল ধরে কত না ওড়ার সাধ আমার। কিন্তু সাধ যত, তত কি সাধনা? সাধ্য কি তত? দর্পণে আত্মসমীক্ষায় ক্ষতবিক্ষতই হচ্ছি কেবল।
এসব যতই বলছি, ততই বোঝাতে চাইছি কবিতার নির্মাণ বিষয়ে কিছু লিখতে আমি সক্ষম নই। নির্মিত যা কিছু, তার একটি মীমাংসা আছে। গল্প, উপন্যাস, নাটক আমাদের মুগ্ধ করে ওই একটি নিষ্পত্তিতে পৌঁছে। রচনা সমাপ্ত করে পূরণতার একটা বোধ নিশ্চয় জাগে লেখক, নাট্যকারের। আরও কী, ইঞ্জিনিয়ার সেতু নির্মাণের সাফল্য অনুভব করেন, ভাস্কর পাথর কুঁদে কুঁদে রূপসৃষ্টির সিদ্ধি টের পান, নচেৎ ভেঙে ফেলেন, কাঠের কারিগর নকশি পালঙ্ক গড়ে বিভোর হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু কবি সংশয়ে দোলেন। এক অনিশ্চয়তার সাধনাই তাঁর।

আপন সৃষ্টি বিষয়ে তাঁর জীবনযাপনেও হস্তক্ষেপ করে। শালপাতার সংসার দুলতে থাকে জীবনভর। আসলে, এ হল সফলতার উল্টোদিকের এক খেলা। দুনিয়া জুড়ে কতিপয় মানুষের। এই অর্থে তাঁরাই প্রকৃত সমাজবিরোধী, স্বেচ্ছাচারী ও স্বাধীন। আপন সাধনা ব্যতীত অন্য কোনওরূপ দায়-দায়িত্ব গ্রহণে অপারগ। তবে তাদের সাধনার সীমায় এ পৃথিবী, এ মহাজগৎ। পাহাড় পর্বত, নদীগুলি, অরণ্য, মরু তাদের। মহাদেশ, দ্বীপপুঞ্জ,, সবে ফোটা তারাটি, সবে আবিষ্কৃত গ্লিজ ৫৮১সি গ্রহ—সবই তাঁদের। গোপনে তাঁরা সকল কিছুরই নিয়ন্ত্রক। আমি নাস্তিক বলেই, তাঁদের, কবিদের ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী বলছি না। নচেৎ খোদার ওপর খোদকারির ক্ষমতা তাঁদেরই।
তাহলে কত স্ফূর্তির এই খেলা! হয়তো ভিমভেটকার প্রস্তর লিখনে, আল তামিরার গুহাচিত্রে, মিশরে হায়ারোগ্লিফিকে চিত্রভাষায় হেঁয়ালি সংকেতে এই স্ফূর্তির শুরু। কিংবা দস্যু রত্নাকরের ‘মা নিষাদ’-এর মন্ত্রধ্বনিতে। একেবারে নিখাদ মৌলিক এই উৎসার। সব অর্থে কবিতা সম্পূর্ণভাবে মৌলিক এক উচ্চারণ। যে কোনও ভাষার ভিতরের ভাষা। এ কারণে বিশুদ্ধ কবিতা বলে আলাদা কিছু হতে পারে না। বামপন্থী কবিতা, অ্যান্টি পোয়েট্রি এসব একেবারেই তামাশা। কবিতা পবিত্র, আগেই বলেছি স্বয়মাগতা, কবিরা তাকে অন্য পোশাক, বা অলংকার পরাতে পারেন না। চেষ্টা করে কেউ কেউ কেবল সে কুহকিনীর ছায়া দেখতে পারেন। আঙুলে গোনা দু’চারজন ছাড়া, অধিকাংশ জীবনভর পদধ্বনিটুকুও শুনতে পায় না।

অনেকেরই ভ্রুকুটি লাঞ্ছিত হবে হয়তো, যেহেতু বলছি, কবিতা প্রয়াসীরাই প্রকৃত মৌলবাদী। আমার মতে, মৌলবাদী বা Fundamentalist শব্দটির ভুল প্রয়োগই করা হচ্ছে, বিশেষত দুনিয়া জুড়ে প্রচারমাধ্যম ও রাষ্ট্রনেতাদের ঢক্কানিনাদে। মৌল বিষয়ে যাঁরা দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল, মানা উচিৎ, তাঁরাই মৌলবাদী। যেমন, একজন পদার্থবিজ্ঞানী, বা গণিতজ্ঞ। ধর্মগুলির প্রতি আমার কোনও আনুগত্য নেই, তৎসত্ত্বেও বলি, যে কোনও ধর্ম ন্যায়নীতি আদর্শ, সমাজভাবনা, জীবনচর্যা, হিতোপদেশ ইত্যাদির মিশেল। কোনও মৌলিক বিষয় নয়। সুতরাং ধর্মাশ্রিত তাণ্ডব সৃষ্টিকারীরা মৌলবাদী হবেন কেন, তাঁরা দুর্বৃত্ত। কবিতা অতীব মৌলিক বলেই রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ মৌলবাদী। বাল ঠাকরে বা আকবরউদ্দিন কোরাইশি তা নন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রীমহল অবশ্য আল মাহমুদকে অপবাদের আখ্যায় ভুল করে হলেও মৌলবাদীর মর্যাদা দিয়ে দিয়েছে, গোলাম আযম তা হতে যাবেন কেন, তিনি ধর্মান্ধ। ওসামা বিন লাদেন সন্ত্রাসবাদী। কিন্তু মৌলবাদীর মর্যাদা তিনি কেন পাবেন।
এতক্ষণে এ লেখায় আমি খুইয়েই ফেলেছি কবিতার নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয় নির্ভরতা। বলা দরকার, বিষয়ে মন সম্মত না হওয়ায় লিখতে গিয়ে গোড়ায় সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম নিজের অবস্থান বোঝানোই হবে আমার কাজ। অবস্থান, যাতে ভঙ্গিও মিশে আছে। ওই অবস্থান, ভঙ্গি—এসবই তো আমাকে ঠেলে দেয় লেখার ইকে। আকুল তাকাই আকাশের দিকে, যদি সে নামে।

মনে পড়ে, সেই সদ্য তরুণ বয়স থেকে মুখ উঁচিয়ে তারার রাজ্যে চেয়ে থাকা। কবে যে সে এক দরজা খুলে গেল। নিষ্পত্তি নেই, ফলাফল নেই, পাওয়া না পাওয়ার বোধহীন কী এক আশ্চর্য দেশে এসে পড়লাম। ওই বয়সে বুঝিনি এখানে থাকতে হলে দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। দুদিকে শঙ্কা, তবু কী শিহরণ।
সকল নেশার চেয়েও টং, এই আসক্তিতে আমি আস্থা স্থাপন করেছি। তবু কি জীবনযাপনে শম্ভু রক্ষিতের মতো হতে পেরেছি আমি? পারিনি। আত্মসমীক্ষার ব্লেড আমাকে ফালাফালা করে দেয়। আমি ভেবে উঠতেই পারি না গৃহিণী কেন বিরক্ত হন না, কর্মস্থলেও কেন আমি গৃহীত হই? উপদ্রবের সাধগুলিকে সামাজিক ম্নুষ হিসেবে আমি কি সংগোপন রাখি?

বিদ্রোহ জন্ম নেই। আমার গায়ে কত কাটা ছেঁড়া দাগ। কত ক্ষত, কত কালশিটে। আয়নায় এসব দেখা যায় না। শুধু কি আমার। সকল কবিতা প্রয়াসীর। বিশ্বময় মনুষ্য সমাজে তারা উড্ডীন, এক অপরূপ সংখ্যালঘুর দল।

কী করে জন্ম নেয় কবিতা? এ লেখায় এত কাণ্ডের পর এ প্রশ্নও অবান্তর হয়ে গেছে। আকাশ থেকে নামে, তবু মনে হচ্ছে নিজেকেও খুব নিংড়োতে হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো কিছু একটা ঘটে হয়তো, মনোবিজ্ঞানীরা বলতে পারেন, আমি জানি না। আমি যা জানি, তা হচ্ছে, চমকে ওঠা। নিজের লেখায় ওইরকম চমকে ওঠা, দু-একবার, সংকোচেই বলছি, ঘটেনি যে, তা নয়। কী করে লিখলাম, আত্মপ্রশ্নে চেচিয়ে উঠেছি, ভূতে লিখেছে।

কোন ভূত!

 

আকাশে মেঘ ছেয়ে আছে শ্রাবণসন্ধ্যায়।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E