৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০২২০১৭
 
 ০২/০১/২০১৭  Posted by

মায়ামৃত্যু : অন্ধকার ও ট্রোগনের গান
– মাসুদ পারভেজ

আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত -এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারংবার। চঞ্চল বাতাসের রংধনুগতি কে চিরকাল দেখে থাকে? কৃষ্ণচূড়ার হলুদ পাতার বিষণ্ণ বৃষ্টি যখন অতিথিভবনের প্রাঙ্গনে নেমে আসে, ট্রোগন হয়ে ওঠে মেঘরং শূন্যতার গান। স্মৃতির শূন্য আধার একদিন বাতাসে থাকবে ভেসে। কোনো নিভৃত গৃহে নয়, গৃহহীন অনন্ত শূন্যতার মাঝে শোনা যাবে ক্রন্দন ধ্বনি, দৃশ্যমান হবে অশ্রুজল! পৃথিবী কি বৈপরীত্যের আধার। জীবন-সূর্য ও মৃত্যু-তুষার নির্বিরোধ কি? আনন্দ আছে বলে কি অশ্রুপাত? নির্লিপ্ত যিনি তাকে কেনো কাঁদতে হয়? মৃত্যুপ্রবণ মানুষের সংরাগী হওয়া সাজে না; আত্মায় জাগিয়ে রাখতে হয় বিনাশ ও আর্তনাদের আইলাস্ফীতি। জীবিতদের জন্য জীবন এবং মৃত্যু- দুই-ই মনোভারের কারণ। আমার জানালার পাশে সবুজ কাঁঠালপাতা একদিন ভুলে যাবে নৃত্যের সরল মুদ্রা; দুপুরে ঘুঘুর মায়াময় সরবতা মিশে যাবে দেয়ালের শেওলা নির্জনতায়, ধূসর আকাশের নিশ্বাস ছুঁয়ে ক্লান্ত বলাকা ফিরে আসবে না বৎসলা বাঁশবনে। সেদিন কোনো সুদীপ্ত শকট ফিরে আসে যদি, নিভৃত গৃহের বিবর্ণ অঙ্গন হতে নিয়ে যাবে এক বুক তুষারগ্রস্ত রিক্ত বাতাস! পরিপক্কতার কাল স্বল্পায়ু ও অবর্ধিষ্ণু। প্রস্থানবিন্দু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবার আগে পথরেখা চিনে নেওয়া জরুরি। আমি জেনেছি, পাথের ধুলো দুর্মূল্য জাফরান-রেণু। জয়নুলের চশমা হতে আজও ঝরে পড়ে অদৃশ্য ঝরার হাহাকার। যমুনাবক্ষের ভেজাবালুর মূল্যহীন সরসতা নিয়ে তরঙ্গিত হই; কালজ্ঞ ভাটির চিমনি কখনো হরিদ্রাভ খামে ভস্মগন্ধি বার্তা পাঠায়- আমি কালের অন্তস্থ সঙ্গীতে নিমগ্ন হতে থাকি। সোনালু পাতায় মোড়ানো পিঁপড়ের পেলব আবাসে করি বাস। দিগন্তচারী ধুসর ঈগল একদিন ঠুকরে খাবে আমার স্বাদু শরীর; আমি সে দৃশ্য দেখবো শুধু, ব্যাখ্যার পাবো না সময়। কালের দিকে করি করুণ নেত্রপাত। পাথুরে মূর্তির নিস্পন্দ চোখ, বাক্যহীন ওষ্ঠাধর, হৃৎপি-হীন শীতল অবস্থা হতে পারে অনুভবময়। স্পর্শানুভূতিহীন জীবন কি মৃত্যুর সমান? উৎস ও অনিবার্যতার মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। প্রাপ্তি চেতনাবাউলকে পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতার দিকেই নিয়ত করে চালনা। শূন্যতা ত্বরান্বিত করে মহাশূন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি। অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে; আলোয় জাগে তার প্রতিধ্বনি।  

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত-র ট্রোগনের গান কাব্যজুড়ে রয়েছে গদ্যকবিতার পরত। কবিতাগুলো গদ্যকবিতা হলেও একটা চিত্রকল্প পাওয়া যায়। এই চিত্রকল্পময়তার ভেতর একটা ব্যঞ্জনা আছে। এই ব্যঞ্জনাটা পাঠের। চিত্রকল্পময় কাব্য পাঠ করার কালে মাথার ভেতর কিংবা মনের গহীনে একটা জগত নির্মাণের খেলা চলে। এই জগতের বয়ান বস্তুজগতের সঙ্গে মিলে না; কিংবা মিলে না খালি চোখে দেখা রংয়ের সঙ্গে যেখানে যাপিত জীবন বড়োই ফ্যাকাশে ঠেকে। আর তখন লেখকসত্তায় অপর এক জগতের সন্ধান চলে। যে-জগতে মৃত্যুর মধ্যেও চলে সৌন্দর্যচেতনার খোঁজ। কিংবা মৃত্যু হয়ে ওঠে রঙিন। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত এমনই এক জগত নির্মাণ করেছেন অন্ধকার ও ট্রোগনের গান কবিতায়।

কবিতার শুরুটা হচ্ছে একটা শর্ত দিয়ে যেখানে আবির্ভাব আর প্রস্থানের উল্লেখ জন্ম আর মৃত্যুর একটা প্রতিশব্দ হিসেবে হাজির হয়েছে। তারপর একটি প্রশ্ন-  ‘চঞ্চল বাতাসের রংধনুগতি কে চিরকাল দেখে থাকে?’ জন্ম-মৃত্যু তখন আরও খোলাসা হয়ে যায় এই প্রশ্নের জেরে। বিবর্ণ হয়ে ওঠে পাতার রং, ঘিরে ধরে শূন্যতা। এসবই মৃত্যুর চিত্রায়ণ। আর গৃহহীনতার কথা যখন আসে তখন এটা নিজের মৃত্যুকেই যেন তুলে ধরা হয়। ক্রন্দনধ্বনি একটা মৃত্যু যাত্রার আয়োজন হিসেবে পাওয়া যায় দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে। তারপর আরও কিছু প্রশ্ন এবং একধরনের নিষ্ক্রিয়তার উন্মীলন টের পাওয়া যায়। কিংবা পাওয়া যায় নির্বাণ লাভের সেই ইঙ্গিত যখন জন্ম কিংবা মৃত্যু সমানতালে চলে তখন আলাদা চিহ্নিত করে বাঁধাল দেয়া অকারণ। মৃত্যুর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে কবি বরং প্রকৃতির কাছে অন্য একরূপে আবির্ভাব ঘটাতে চেয়েছেন স্বীয় সত্তার। আর তখন জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে যায়। কিংবা ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’ তেমন একটা নেশা জাগে। কবি নিজের মৃত্যুচ্ছবি কল্পনা করেছেন কিংবা স্বীয় মৃত্যু পরবর্তী একটা জগতের হাহাকার চিত্রকল্পের ভেতর নীরব বয়ানে নির্মাণ করেছেন। এই নীরব বয়ানের অনুষঙ্গগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যায় : দেয়ালের শেওলা, মায়াময় ঘুঘু, ধূসর আকাশ, রিক্ত বাতাস। এই অনুষঙ্গগুলো এক একটা মৃত্যুমুখী চেতনা। এই মৃত্যুমুখীনতার পরপরই কবি একধরনের বোধিসত্ত্বের খোঁজ দিচ্ছেন। ‘প্রস্থানবিন্দু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবার আগে কালকরবীর অনন্য আভায় পথরেখা চিনে নেয়া জরুরি।’ এই পথরেখা আসলে কি? কিংবা পথরেখার খোঁজ কিভাবে পাওয়া যায়? এটার খোঁজে তখন আবার লালন ফকিরের কাছে হাজির হতে হয়। লালন পথরেখা পেয়েছেন মানুষের ভেতর। মানুষ যখন মানুষকে স্বীকার করে তখন পাওয়া যায় তার সংবেদনশীল মনের খবর। আর এই  সংবেদনশীলতার ‘প্রাকৃত রূপায়ন’ হচ্ছে মানুষের প্রকৃত অস্তিত্ব। প্রাকৃত যে-চেতনা মানুষ নির্মাণ করে তার ভেতরের জগত যেন এক অসীূম শূন্যতায় ভরা। এই শূন্যতা তো আপেক্ষিক। ব্যক্তির মৃত্যুর পর এই শূন্যতার বিস্তার নেই। এটা দৈহিক মৃত্যুর আগে মোক্ষ লাভ করতে পারলে কেবল পাওয়া যায়। কিংবা বলা যায় আত্মার সাধনা এটারই একটা রূপ।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত এইসব বিষয়-আশয় ঘিরে মৃত্যুকেন্দ্রিক এক মায়াময় জগত নির্মাণ করেছেন অন্ধকার ও ট্রোগনের গান কবিতায়। এটা কখনও প্রশ্নোচ্ছলে এসেছে আবার কখনও আ্যখানের ভাষায় ধরা দিয়েছে।

…………………………

আলোচক-কবিঃ

মাসুদ পারভেজ। সহকারি অধ্যাপক। বাংলা বিভাগ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
ই-মেইল : parvajm@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E