৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ০৭২০১৭
 
 ০৭/০৬/২০১৭  Posted by

মাজহার সরকার-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

মাজহার সরকার:

 মাজহার সরকার

মাজহার সরকার

কিছু ফুল আছে লতা-গুল্ম বা ছোট গাছে জন্মায়, আবার কিছু ফুল আছে বড় গাছে জন্মায়। কবিতাও তেমন আকৃতি অর্থে ছোট বা বড় হতে পারে। কিন্তু সেটা ফুলই তো!
আমাদের এই ভূখণ্ডের কবিদের অনুভূতির চাবির সংখ্যা বেশি। কারণ এটা ঘটনাপ্রবণ ঐতিহাসিক ভূমি। এখন হয়তো ছোট কবিতা বেশি লেখা হচ্ছে, দীর্ঘ কবিতাও আবার লেখা হবে হয়তো। আকৃতি কোন শৈল্পিক দুশ্চিন্তা নয়। হাতির পেটটা বড়, পিঁপড়ার পেটটা ছোট। কিন্তু ক্ষুধার যন্ত্রণা, ভালোবাসা বা বস্তুর সৌন্দর্য এগুলো আসে বেঁচে থাকার আনন্দ থেকে।

এখন মানুষের কাজ অনেক বেড়ে গেছে। জীবনের বহুরৈখিকতায় মানুষের অবসর কম। আগে কয়েক মাইল হেঁটে বাজারে গিয়ে বহু অপেক্ষার সাহিত্য সাময়িকী কিনে নিয়ে বা সদর থানার সরকারি পাঠাগারে বসে সেগুলো পড়ে তবে বাড়ি ফিরতো পাঠক। ছুটির দিনে ছাপা হওয়া সাময়িকীগুলো একটু একটু করে পুরো সপ্তাহ জুড়ে পড়া হতো। এখন কবিতা ছুটির দিনে পড়ার মধ্যে নেই। বাসে, রিকশায়, অফিস, বাজারে যেতে যেতে পাঠক মুঠোফোনে কবিতা পড়ে ফেলে। আঙুল চেপে মতামতও জানায়। লেখক, প্রকাশক ও পাঠক এখন অনেক কাছাকাছি থাকেন। এতে হয়েছে কি, অল্প কথায় কীভাবে জীবনের মহার্ঘতম অনুররণ প্রকাশ করা যায় তার একটা মেধাবী কৌশল চর্চা হচ্ছে। এই পরিবর্তনটা দারুণ।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

মাজহার সরকার:
না, আকার-অবয়ব-সংখ্যা এগুলো গাণিতিক ধারণা কেবল, এতে কবিতার কিচ্ছু যায় আসে না। ছাপা বা না-ছাপা কবিতায় তো কবিতা থাকে না, কবিতা একটা মুহূর্ত কেবল। যে মুহূর্তে কবিতা ও পাঠক খুব অল্প সময়ের জন্য এক অলৌকিক বোধে পৌঁছেন। এটা অভিজ্ঞতার ব্যাপার। কবিতা পড়া বা লেখার পর যে নীরবতাটুকু থাকে তা-ই কবিতা।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন? খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি? গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

মাজহার সরকার:
যেমন একটি ক্ষুদ্র চাউলের গায়ে অসংখ্য শ্লোক লিখতে বা পড়তে পারার যে আনন্দ, ছোট কবিতা তা-ই দেয়। ব্যাপারটাকে কষ্ট-সহিঞ্চু করে তুলছি মনে হয়। তবে তাই। কবিতার আনন্দ পাওয়া এতো সোজা নয়। কবি ও কবিতা-পাঠক উভয়কেই অনেক পড়াশুনা আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, একটা প্রস্তুতি লাগে।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

মাজহার সরকার:
আমি ছোট কবিতাই লিখি। কিন্তু যখন দীর্ঘ কিছু লিখতে চাই, তখন গল্প বা উপন্যাস লিখি।

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

মাজহার সরকার:
একগুচ্ছ ছোট কবিতা


ভূগোলের জনক ইরাতেস্থিনিস

একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ পুরনো কঙ্কাল শুঁকে শুঁকে আদিম মানুষের জীবন যাপনের কথা বলেছিলো। একজন জ্যোতিষী হাত দেখে বলেছিলো আগামী বছরের খবর।  কিন্তু ভূগোলের জনক ইরাতেস্থিনিস বলেন বাড়ি মানেই ঘর নয়। তাই বাড়ি থেকে দূরে কোন উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো ক্লান্তি নেই তাড়াহুড়ো নেই,এই মানচিত্রে  শরীর বিছিয়ে দিয়ে আজ বেহালা বাজানো যাক।


প্রিয়তমো, সুন্দর সময় চলিয়া যায়

কে তবে হনন করে আকাঙ্খার গোপন থেকে!
প্রিয়তমো,ধূসর অপেক্ষা থেকে নেমে আসো এই ক্ষমা
মাটির বর্ণের মতো এই মুখ
আগুনের ঋণ থেকে আলাদা করা খড়ের ভেতর
স্রোত,প্রসবে একাকী তোমার গাভী।
অনাদ্র পাথর থেকে মাছের প্রতিভা হয়ে একা
মৃত্যুচিহ্ন থেকে ফিরে গেছো বীজে।
কখনও সংকেত কখনও বিস্তার থেকে এসে,
ছাই থেকে ফেরাও তুষের মগ্নতা,
চাদর থেকে ফেরাও শীতের রক্ত
আজ আমাদের রোপিত ছায়া উড়ে যায় আলোর কৃষিতে
প্রিয়তমো, সুন্দর সময় চলিয়া যায়
কাঁচ ছুঁয়ে শুধু হাত কেটে যায়,ঠোঁটের কিরিচে ঝরে যায়
প্রজ্বলিত সেঁজুতি। প্রিয়তমো, রাত তো যায় না
মিষ্টি যা লাগছে, এমন রোজ কেনো হয় না!
হেসে হেসে হাওয়া ভরে খেলাও তোমার খেলনা।


আর দুঃখ নিও না

মাটির গর্ভ থেকে ফিরিয়ে দিলে আলিঙ্গন
কেন উৎসব শরীরে অভিসারের নীল মাছি
উড়ে এসে খুঁজে পায়নি প্রার্থিত বিষ্ঠা?
কেন জ্যোৎস্নার বীজ ছুঁয়ে জন্ম দিলে পিপাসা
আকাঙ্খার সর্বশেষ চুমুতে আজ কেন ব্যর্থতা
শরীর থেকে ঝরে পড়ে কেন ব্যাপক ক্রদন!
আজ কেউ আগের মতো হাসতে পারে না,
বন্ধু আমার লক্ষ্মীটি,বন্ধু আমার সন্ধ্যাবেলার সাথীটি
আর দুঃখ নিও না। একটা সম্পন্ন জীবন খুঁজে কেন কাতর
প্রথম অভিনীত মানুষ সমুদ্রের চরিত্র নিয়ে সামনে দাঁড়ায়
বলে- সারা রাত কার আলিঙ্গনে পাখি ওড়ে?


আমার ভীষণ ভালো লাগে

গান আসে ভেসে হিরণ্ময় পৃথিবীর ইঙ্গিত রেখে চারদিকে থই থই নীল জলোচ্ছ্বাসে। কোন অলৌকিক মহিমার,কোন জলবন্দী মানুষ মাছের উদর থেকে ভেসে এসে এখানে পথ কাটে। ভালো লাগে,সব পাথরেই থাকে এমন কিছু কবরীর আগুন। গান ভেসে আসে মাটির জঠরে,দপ্তরে,অফিসে,মটরশুটির নীল ফুলে এক সাদা বেলেহাঁস প্রেমিকের আয়ুতে। স্মৃতি থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠে আসে এক সিংহ শবমেহের। ভাদরের ঘন নীল ঢলের মতো গান ভেসে আসে সূর্যের তোরণে। ভালো লাগে,তাই ধূলোতে গড়াগড়ি খাই। ঠোঁট থেকে চুপের পাখিরা প্রেমিকার বুকের অরণ্যে যায় উড়ে,যেন ওখানে কখনও ছিল না কোন ফাটল। চোখ এক সাদা পালতোলা নৌকা যায় হয়ে,হৃদয় কখন তাই বিদ্যুৎছেঁড়া সোনার শিকল হয়ে ওঠে। কী ভীষণ টানে,সেই গৃহের ডাকে বেশি বেশি যাই। গান ভেসে আসে আজ এই আয়োজনে,এই দেহ আজ শায়িত শব এক সজ্জিত অপরূপ ঢল ঢল লাবনী অঙ্গের আগে। আমার ভীষণ ভালো লাগে।


আঠারো সিঁড়ি

আজ তার মৃদু দেহ মৌসুমির মতো
আকাশের নীল যেন পৃথিবীতে ঝড়ে
যে পাখি নরোম ডানায় তার উড়ে যায় প্রভাতী বাতাস
দিনরাত প্রস্তুতির গান
দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে
মুছে দিতে প্রতীক্ষার অশ্রুময় লেখা
সেখানে আজ তাকে অস্তিত্বের মতো ঘনিষ্ঠ জেনে
দ্রুত পায়ে চলে যেতে দেখি হৃদয়ের ভার বয়ে
আজ তার মৃদু দেহ উদয়ের মতো
মুগ্ধ শিশিরে রোদের হীরক,অস্তমান সূর্যের সোনায়
হেনেছে শুধু বেদনার রাত উতল নির্জনে।
জীবনকে মনে হয় নিরব সঙ্গীত
পৃথিবীর চিত্রশালা শূন্য হয়ে যায়
এসবে আছি রমণীর রক্তের মতো নিজ সন্ধ্যায়
আজ তার মৃদু দেহ সোনার শরীর
রূপালি মাছের মতো সহজ ইচ্ছায় শুয়ে সেই একজন।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E