৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ১৬২০১৭
 
 ১৬/০৯/২০১৭  Posted by

মাসুদ খানের বাছাই বিশ


ছক

দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেইখানটায় গিয়ে বসে থাকেন আমার মা। পথের ধারে বসে মা আমার মানুষ দ্যাখেন, মানুষের আসা-যাওয়া দ্যাখেন। কোনো পথ দিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা। কোনো পথ দিয়ে আসে গ্রহণ-লাগা, ক্ষয়ে-যাওয়া, নিভু-নিভু সব বনি-আদমের দল। আবার মেঘ ও মিথুন রাশির ছায়ায় তুমুলভাবে বাঁচতে থাকা মানব-মানবীদের যাতায়াত কোনো কোনো পথে।

একদিন আসা-যাওয়ার পথের ধারে মা কুড়িয়ে পেলেন আমার ভাইকে (আমি তখনো আসিনি আমার এই মায়ের কাছে)। কিন্তু কিছুকাল পর আমার সেই ভাই হঠাৎ গেল হারিয়ে। তারপর থেকে মা আমার ওই পথমোহনায় বসে তীব্র পুত্রশোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন।

একবার, গোধূলিরঙের লম্বা-লম্বা চুলদাড়িঅলা এক বুড়ো পথিক ক্ষণিকের জন্যে থামালেন তার পথচলা। মা-র কাছে সব শুনে বললেন, ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দ্যাখো।’ তারপর থেকে মা আমার উড়ে উড়ে বিশ্বসংসার তোলপাড় করে খুঁজে ফিরেছেন তার সন্তানকে। শেষে সপ্ত-আকাশের পরপারে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে, এবং তার সন্তানকেই পেয়েছেন মনে করে, উড়িয়ে নিয়ে এলেন এই মর্ত্যের ধুলায়। আমি তখন সাত আসমানের ওপারে অনন্ত নক্ষত্রকুঞ্জের ঝাড়জঙ্গলের ধারে সোনালি খড়ের গাদায় বসে অনাথ শিশুর মতো কাঁদছিলাম একা একা, মাকে হারিয়ে।
দিন যাবে, মাস যাবে, ঘুরে আসবে বছর…
একদিন হয়তো আবার হারিয়ে যাব আমি এই নতুন পাওয়া মায়ের কাছ থেকে আর আমাকে খুঁজে পাবেন অন্য এক মা। তারও হারিয়েছে সন্তান। আমাকে পেয়ে ভাববেন, খুঁজে পেয়েছেন তারই হারানো ছেলেকে।

এইসব অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন
এই যে নিখিল ভুলবোঝাবুঝি
লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা আর হারানো-পাওয়া খেলা
এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…
সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,

কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,
তা-ই মেলে ধরে অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।

নকশাটাতে একপাশে লেখা– স্বাক্ষর/- অস্পষ্ট
নিচে তার চেয়েও অস্পষ্ট একটা সিল…


কৌতুকবিলাস

ঈশ্বর ছুড়েছে ঢিল ঈশ্বরীর দিকে, কৌতুকবিলাসে।

গ্রহটিকে মাটির ঢেলা বানিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে
ক্ষেপণ করেছে ভগবান, অন্য প্রান্তে থাকা ভগবতীর প্রতি।

মহাকাশ জুড়ে প্রসারিত মহাহিম শূন্যতা, লক্ষ-ডিগ্রি নিস্তব্ধতা–
তারই মধ্য দিয়ে একপিণ্ড ছোট্ট শ্যামল কোলাহল হয়ে
ধেয়ে যাচ্ছে এই ঢিল।

ঢিল নয়, মহামিসাইল–
মহাকাশের জোনাক-জ্বলা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে
একের পর এক যমজাঙাল পেরিয়ে মিথ্যা-ইথারে অস্থির
ঢেউ তুলে ছুটছে ঢিল অযথা আহ্লাদে
গোঁয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একদিকে টাল হয়ে চক্কর খেতে খেতে
ঘোর-লাগা লাটিমঘূর্ণনে
আহ্নিকে বার্ষিকে ধোঁয়াজটিল বেগব্যঞ্জনায়–
যে বেগ উদ্ভ্রান্ত, যেই গতি একইসঙ্গে ঋজুরেখ বক্র চক্রাকার
ঘূর্ণ্যমান নাটকীয় একরোখা দুর্ধর্ষ ও ওলটপালট…

ছুটতে ছুটতে হয়রান ঢিলখানি।
ওদিকে ঈশ্বরী, ওই রাঘবরহস্যে-ঘেরা উত্তুঙ্গ রহস্যরাজ্ঞী,
সর্বনাশা এক ভাব-আলেয়ার ভাব ধ’রে অজ্ঞাত স্থানকালাঙ্কে ব’সে
থেকে-থেকে ছিনালি-হাতছানি একটু দিয়েই সরে যাচ্ছে দূরে।

মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে মহাকাশ।
বেঁকে-যাওয়া, বাঁকতে-থাকা, ক্রমপ্রসারিত
এক দেশকালের ভেতর দিয়ে ঘটতে থাকে
ঢেলাটির উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ ছুটে-চলা। আর
ছিটকে পড়ার ভয়ে ভয়ার্ত শিশুর মতো ঢেলাটির গা আঁকড়ে ধ’রে
চাম-উকুনের মতো চিমসা দিয়ে পড়ে থাকে প্রাণপণ
তটস্থ ও অসহায় প্রাণিকুল।

খেলা করে ভগবান ভগবতী– বিপদজনক ঢিল-ক্ষেপণের খেলা।
আর রোমাঞ্চে ও ত্রাসে শিউরে-শিউরে কেঁপে ওঠে তাদের শিশুরা।


জ্বরের ঋতুতে

তখন আমাদের ঋতুবদলের দিন। খোলসত্যাগের কাল। সুস্পষ্ট কোনো সর্বনাশের ভেতর ঢুকে পড়তে চেয়েছিলাম আমরা দুজন। তার আগেই তোমার জ্বর এল। ধস-নামানো জ্বর। তুমি থার্মোমিটারের পারদস্তম্ভ খিমচে ধরে ধরে উঠে যাচ্ছ সরসর করে একশো পাঁচ ছয় সাত আট…ডিগ্রির পর ডিগ্রি পেরিয়ে…সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তাপের সহগ হয়ে উতরে উঠছ তরতরিয়ে সেইখানে, যেখানে আর কোনো ডিগ্রি নাই, তাপাঙ্ক নাই…তাপের চূড়ান্ত লাস্যমাত্রায় উঠে ঠাস করে ফারেনহাইট ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে থার্মোমিটারের ফুটন্তঘন বহ্নিতরল…

তীব্র, ধস-নামানো জ্বরেও নারীরা ধসে না। হয়তো কিছুটা কদাকার দেখায়…এবং কিছুটা করালীর মতো…যত রূপসী তত করালিনী, জ্বরে…

একসময় মাথা-ফেটে-যাওয়া থার্মোমিটারকে ব্রুমস্টিক বানিয়ে তাতে চড়ে উধাও উড়ালে অস্পষ্ট অঘটনের দিকে হারিয়ে যাচ্ছ হে তুমি, প্রিয়তরা পিশাচী আমার।

জীবনে প্রথম মুখোমুখি এরকম সরাসরি স্পষ্ট বিপর্যাস
মিটারের জ্বালাখোঁড়ল থেকে ঝরছে তখনো টগবগ-করে-ফোটা ফোঁটা-ফোঁটা লাভানির্যাস।


প্রলাপবচন

নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর
দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি
মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত
এলোমেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে
পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে…

মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ
করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ
কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন
ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর
হুদহুদ পাখির অস্থিরতা, অসমাপিকার লঘু তঞ্চকতা
একরোখা অশ্বের অস্মিতা, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা…
আলগোছে সবকিছু পাশ কেটে গিয়ে
ওইদিকে বর থাকবে কনের বশে
খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থী কাঁকর
চার্জ করা হবে পশ্চিমের ব্লাস্ট ফার্নেসে
আর ঝাপটা এসে লাগবে পূর্বেরটা থেকে
খামাখা দিওয়ানা হবে রঙিলা বিড়ালিনী
ঘনঘন গণ-হাইপ উঠবে মামুলি ঘটনা ঘিরে এমনি-এমনি
হিস্টিরিয়ায় কাঁপতে থাকবে দেশকাল
সাত সাধু এক হবে, এক শয়তান সাত
দোষযুক্ত আলু নামবে হিমাগারের শ্রোণিচক্র থেকে…

এবং হয়তো আমি একদিন ঠিকই
পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব
গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন
নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা
বিশেষকে কোনো ভ্রান্তিকর নির্বিশেষের আভাস
বেদিশাকে দিশার বিভ্রম…

আর দুম করে লিখে ফেলব এমন এক কবিতা একদিন,
যা পড়ে ভৌতিক সুর তুলবে একসঙ্গে সাধু ও শয়তান
সাপ-আর-অভিশাপে-গড়া মতানৈক্যে-ভরা গামারিকাঠের গিটারে
আর ‘চলে আয়’ বলে খোদ খোদাতালা টুইট পাঠাবেন দিব্য টুইটারে।


চারুশিল্প

তোমার সহিংসতাটুকু আমিই তোমার হয়ে
সেরে আসি বাইরে গিয়ে। তবেই-না তুমি
সম্পূর্ণ অহিংসরূপে দিবানিদ্রা যাও।

সন্ধ্যাবেলা জেগে উঠে বলো– বাহ্! করেছ কী কাণ্ড!
বাইরে কী অপরূপ রক্তবিকিরণ!
স্প্রাং রিদমের তালে-তালে জম্বি ছন্দে চলছে যজ্ঞ মনুমেধ–
ওই যে থ্যাঁতলানো দেহ– প্রতীকপ্রতিম, ছিটকে-পড়া ঘিলু– রূপকসমান,
পোড়ানো হাত-পা মুখ-মাথা– উপমেয়হারা উপমান,
কাটা মুণ্ডু, ফাটা জিভ, বিমূর্ত চিত্রের মতো নাড়িভুঁড়ি, অনুপ্রাস,
থকথকে কূটাভাস, চকচকে চিৎকার, সত্রশিখা, উগ্র আগ্নেয় তুফান…
থেকে-থেকে যজ্ঞপটে জেগে ওঠে ভৌতিক জবান।
যোজনগন্ধার গন্ধকাহিনির মতো চমৎকার রক্তের সুবাস
ভেসে আসছে জানালায়।

সেইসঙ্গে এও বলো–
জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলো সব আর্ট, তাড়াতাড়ি।
বিমূর্ত চিত্রের রূপ– মূর্ত তো থাকে না বেশিক্ষণ।
পচে। গলতে থাকে। চণ্ড গন্ধ হয়। জীবাণু ছড়ায়…


ডালিম

যুগের যুগের বহু বিষণ্ন বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাসের সাথে
নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড–
তা-ই থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে
জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে
তবে ওই সারি-সারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ।

বৃক্ষের যতটা সাধ্য, তারও বাইরে গিয়ে
তবেই-না ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ,
মায়াতরু…রূপাঙ্কুর…রূপসনাতন…
পাতার আড়ালে ফাঁকে-ফাঁকে ফলোদয়
থোকা-থোকা গুপ্ত রক্তকুপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ
রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে
ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালে-ডালে লালাভ ডালিম।

বসে আছি ম্রিয়মাণ…বেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়।
সামনে খুলে মেলে-রাখা একটি ডালিমফল, তাতে
প্রভূত বেদানা-দানা, নিবিড় বেদনাকোষ…আর,
বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি–
টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুক-চাহনি…

ভাবি,
এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত
আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ন পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!
ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলে-তিলে, অনেক বছর ধ’রে…


মৌসুম

গাছগাছালিরা আবার প্রকাশ করবে পত্রপত্রিকা।
কীটাক্ষরে ছাপা হবে তাতে কথা ও কথিকা, কবিতাও…
মহোৎসব লেগে যাবে বানানভুলের, কাটাকুটি,
নিরক্ষর পাতায় পাতায়।

“আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা, ভালো না হাতের লেখা…”
গাইতে গাইতে এই তো এখনই ছুটে যাচ্ছে কাঠবিড়ালির শিশুকন্যা।
তার ফোকলা দাঁতের খিলখিল হাসির হিল্লোলে
আগাম চেয়ার উল্টে পড়ে যাচ্ছে ওই
দ্যাখো সাপ্তাহিক কলাকাণ্ডের ঘোড়েল সম্পাদক।
রসিক পাঁকের মধ্যে খাবি খাচ্ছে সম্পাদনা, মৌসুমি আহ্লাদে।

অপরের ভাব ভাষা চুরি করে পাইকারি চালান দিতে গিয়ে
ধরা খেয়ে জব্দ বসে আছে বর্ণচোরা দুই চতুর চড়ুই।
শরমে স্থগিত করে দিচ্ছে পত্রপ্রকাশনা আপাতত
শতশত ধোঁকা-খাওয়া মাটি-ঝোঁকা রাংচিতা-ঝোপ,
আলাভোলা আশশেওড়ার ঝাড়।

আর ক-টা দিন পর
উড়াল কটাক্ষ ছুড়তে ছুড়তে গাছ থেকে গাছে
উড়ে যাবে উড়ুক্কু শিয়াল, গিরগিটি বহুরূপী…
আর প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বলে
দুড়দাড় গাছে উঠে পড়বে
আরোহসক্ষম বেশ কিছু বন্য বেল্লিক ছাগল।

তারা খুদে পত্রগুলি খাবে আগে।


ব্লিজার্ড

আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।
অজস্র কার্পাস ঝরছে
লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।
আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।


নদীমাতৃক

নদী দিয়ে কত কী যে ভেসে আসে! আমাদের নদী দিয়ে।
নানান দেশের ওপর দিয়ে বয়ে আসা আমাদের নদী।
একবার উজান দেশের এক ভূমিকম্পে ভেসে এসেছিল শয়ে শয়ে শালগাছ…
সেগুলি ধরে ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দমাদম বানিয়ে নিয়েছে
বাস্তুঘরের খুঁটি। এখনো টিকে আছে।
একবার ভেসে যাওয়া এক শালপ্রাংশু মরদেহ ধরে এনে
পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। কিছুই গজায়নি।

অরো আসে ভেসে জলজ্যান্ত মানুষ-মানুষী–
সাপে-কাটা, অজ্ঞান, মাকড়ে-কাটা, গুম-হওয়া, ঘুম-পাওয়া, আর
মাঝে মাঝে ঘুমন্ত মানুষ।

ওই যে আমাদের ছোটকাকি, হলদে পাখি হয়ে উড়ছে এঘর-ওঘর,
একদিন সে-ও এসেছিল ভেসে ভেলায় ঘুমন্ত শিশু, আমাদের নদী দিয়ে।
ওই যে রাজপুরুষের মতো উপচানো ঢেউ-জাগানো মেজফুফা,
সে-ও নদী-ভাসা, তাকেও তো পাই এই নদীটি থেকেই…
নদীতে মানুষ পাই আর তুলে এনে জুড়ে দিয়ে সংসারে লাগাই।

আর ভেসে আসে বিচিত্র সব ফল ও বীজ।
একবার এক অচেনা বীজ এনে পুঁতে দিলেন আমার বাবা।
ভেবেছিলেন, হবে হয়তো কোনো সুমিষ্ট ফল, বিরল জাতের।
বীজ ফুটে গজায় গাছ। গাছ বাড়ে দিনে দিনে।
ফল হয়। পাকে। পাকা ফল থেকে
এ কী! সাবানের ফেনার মতো শুধু ফেনা!
কোথায় সুমিষ্ট ফল, কোথায় কী!
বৃক্ষ, তোমার নাম?-ফল-এ পরিচয়।
ফলে, গাছটির নাম হলো সাবানগাছ।

কাক যখন দ্যাখে যে, কী! তারই বাসার ডিম থেকে ফোটা বাচ্চারা
দিনে দিনে হয়ে উঠছে কেমন ভিন্ন আদলের! কণ্ঠে ফলছে ভিন্নরকম স্বর!
তখন যে বিরক্তি, বিস্ময়, ও অসহায়ত্ব নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাদের দিকে–
বাবাও সেরকম তাকিয়ে থাকতেন ওই সাবানতরু আর সাবানফলের দিকে
বহু দিন, বহু বছর। আবার গুনগুন করে গাইতেনও–
বাঞ্ছা করি সুমিষ্ট ফল পুঁতলাম সাধের গাছ
ফাঁকি দিয়া সে গাছ আমায় ঝরায় দীর্ঘশ্বাস
মনে দুঃখ বারো মাস…

তারপর একদিন তো তিনি নিজেই গত হলেন;
নদী থেকে পাওয়া সেই অদ্ভুত ফলের গাছ একদিন নদীই ভাসিয়ে নিয়ে গেল

তবে ওই সাবানফলেরা বহু বছর ধরে আমার বাবার ময়লা সন্তানদের
ততোধিক ময়লা পোশাকগুলিকে ঋতুতে ঋতুতে কিছুটা হলেও
ফর্সা ও উজ্জ্বল করে দিয়ে আসছিল…

১০
দমকল

উন্মাদ উঠেছে গাছে, তরতর করে, ছাড়া পেয়ে পাগলাগারদ।

নামে না সে কিছুতেই, যতক্ষণ-না ওই বেঁটেখাটো নার্সটি এসে
মিনতি করে না-নামায় তাকে।

নার্স আসে দ্রুত, দমকলের মতন।
কী-কী যেন বলে হাত নেড়ে নেড়ে,
তাতে খুশি হয়ে নেমে আসে উঁচু ডাল থেকে বিমুগ্ধ পাগল–
ঝোলের উল্লাসসহ যেইভাবে কইমাছ নেমে আসে পাতে
কানকো টেনে টেনে
ক্রমিক সংখ্যার মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে।

ঝিলমিল করে বয়ে যায়, সেবিকার বোধে, পাগলের বিকল বিবেক।

উন্মাদ আবার ফিরে যাবে আজ উন্মাদ-আশ্রমে
ধর্মগণ্ডিকায় মাথা রেখে নির্বিকার নিয়ে নেবে
তেরোটি ইলেকট্রিক শক
তেরোবার স্বীকারোক্তি, স্বাস্থ্যযাজকের শান্ত সুধীর নির্দেশে।

১১
প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল
(রামকৃষ্ণ পরমহংস…)

রামশরণ ব্যাধ গিয়েছিল শিকার করতে, প্রহ্লাদপুরের জঙ্গলে। শিকার মিলেছে প্রচুর। শিয়াল, শজারু, শকুন, গোধিকা, গন্ধগোকুল, ফেজান্ট, কাছিম…। মেলেনি কেবল কাক আর বক; ওদেরকে তো আগেই ভস্ম করে দিয়েছে তপস্বী। দুপুরের দিকে পশুপাখিগুলিকে কেটেকুটে মাংসের ভাগা দিয়ে বসেছে ব্যাধ, পাকুড় গাছের নিচে। সাতমিশালি মাংস, বিক্রি হচ্ছে খুব। শব হয়ে শুয়ে আছে শিব। কালী লীলা করছে তার বক্ষের ওপর, যেভাবে প্রকৃতি লীলা করে পুরুষের ওপর; জীব, পরমের। বালিতে মেশানো চিনি, নিত্য-র সাথে অনিত্য যেমন। এস পিঁপড়া দলে-দলে, সিরিজে-সিরিজে, বালি রেখে চিনি বেছে খাও।

ফেরার পথে একটি ঘাসখেকো বাঘের শাবকও সাথে করে এনেছে রামশরণ। জন্মের পরপরই মেষেদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল আলাভোলা ব্যাঘ্রশিশু। সে এখন ঘাস খায় বটে, কিন্তু রাগ আছে ঠিকই, ক্ষাত্রতেজ অব্যাহত…ঠাস-ঠাস করে থাপড়ায়, দাবড়ায় বড়-বড় নিরীহ ভেড়াদের।

১২
নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা…

মেঘের ডাকের মধ্যে গচ্ছিত আছে জগতের সমস্ত ধ্বনি, জমাট হয়ে, এক জটিল প্রকারে। ওই যে মেঘ ডাকছে আর মনোযোগ দিয়ে তুমি শুনছ, মনে হচ্ছে না কি, একসঙ্গে ধ্বনিত নিখিলের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন? ঘোষ? অঘোষ? এবং নির্ঘোষ?

একদিন ওই মেঘই মেদিনীর বুকে ছিটিয়ে দিয়েছিল ধ্বনির বীজ। আজও মেঘ থেকে ঝরে রকমারি ধ্বনির পরাগ– ঝরে বিজলির সঙ্গে ব্যঞ্জন, বৃষ্টি ও বাতাসের সঙ্গে স্বর।

অতঃপর ওই বীজ অঙ্কুরিত হলো ঝড়ের নিস্বনে, ঝরনার কলস্বরে, শঙ্খের নিনাদে, ঢেউয়ের চ্ছলচ্ছলে…। ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে গেল ধ্বনির ফুলকি সবখানে– কেকায় কুহুতে, কূজনে গুঞ্জনে, হ্রেষায় বৃংহণে…

এই যে আজ পাখি ডাকছে আবার এতকাল পর, তার ওই কূজনের মধ্যেও জটপাকানো বিশ্বের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন। পাখির কূজন আর পতঙ্গগুঞ্জন– সে-এক আশ্চর্য ধ্বনিপ্রপঞ্চ যার মধ্য থেকে শনাক্ত করা অসম্ভব একক কোনো ধ্বনি। সব ধ্বনি যেন এসে মিলেমিশে টালমাটাল একাকার।

স্মরণে আনো একবার সেই দূর-দূরতর দিনের স্মৃতি (অতীত দিনের স্মৃতি, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে), যখন কোথাও ফোটেনি কোনো ভাষা, কেননা ধ্বনিই তখন ফোটা-অফোটার দোলাচলে…। অসহ্য সুন্দর সেই ভাষাহীন নিঃশব্দ নির্বাক্ অথচ কী অপূর্ব আধো-আধো ধ্বনিগন্ধময় জগৎ! সমস্ত বস্তু বৃক্ষ প্রাণী, সমস্ত ক্রিয়া প্রবাহ ঘটনা, সবকিছুই কী বিশুদ্ধ কুমার-কুমারী! নামের কোনো দূষণ, প্রতীকের কোনো কেলেঙ্কারি তখনো ছোঁয়নি তাদের।

মনে কি পড়ছে তোমার, সেই নামপূর্ব ভাষাপূর্ব অবাক্ অমলিন অকলঙ্ক নিসর্গের ভেতর দিয়ে, খুলে রেখে আমাদের নামের খোলস, কালাকালহীন তুমি-আমি হেঁটে চলেছি সমান্তরাল– নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা, ভাষাহীন, বাকলবিহীন…

১৩
দীক্ষা

পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।

আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে
কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে…
ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব
নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।
মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,
দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরীর মতো শুদ্ধ সালঙ্কার…

দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু
দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,
নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল
এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব
কখনো প্রেমের ফের কখনো রাগের…
অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়
ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ
সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।
আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন–
ঝাঁজের ঝাপটায় উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে সবে, এমনকি বৃদ্ধরাও।
যখন প্রেমের গল্প– কমলায় রং ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।
আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের–
ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।

১৪
মা

এই ধূলি-ওড়া অপরাহ্নে,
দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি
ওই যে খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়ে আছেন–
তিনি আমার মা।
দূর্বা আর ডেটলের মিশ্র ঢেউয়ে, ঘ্রাণে রচিত সে-শয্যা।
নাকে নল, অক্সিজেন, বাহুতে স্যালাইন, ক্যাথেটার–
এভাবে প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে
জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

শয্যা ঘিরে অনেকদূর পর্যন্ত ধোঁয়া-ধোঁয়া
মিথ্যা-মিথ্যা আবহাওয়া।

মনে হলো, বহুকাল পরে যেন গোধূলি নামছে
এইবার কিছু পাখি ও পতঙ্গ
তাদের উচ্ছল প্রগলভতা
অর্বাচীন সুরবোধ আর
অস্পষ্ট বিলাপরীতি নিয়ে
ভয়ে ভয়ে খুঁজছে আশ্রয় ওই প্লাস্টিকের ঝোপঝাড়ে,
দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মাতৃছায়ায়।

১৫
ধর্মাধর্ম

যেদিন গাছেরা ত্যাগ করবে তাদের বৃক্ষধর্ম
মিষ্ট নয়, ফল হবে কটু বা কষায়
আর সোজা না ফেলে সে ফল ফেলবে তির্যক ভঙ্গিতে
যেদিন আমের গাছে জাম হবে, এবং তামার গাছে সিসা…

দস্যুকে তো শীলাচারী হলে চলে না
তবুও যেদিন সে ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে
হয়ে উঠবে সুশীল, পাদ্রি ও পরার্থপর
বকেরা যেদিন মশগুল হবে মাছেদের মঙ্গলচিন্তায়
সাপেরা অহিংস হবে, হরিণেরা তাড়িয়ে বেড়াবে সিংহদের…

যেদিন আয়না পরিত্যাগ করবে তার আর্শিধর্ম
দেবে না তো আর কোনো প্রতিবিম্ব
পাহাড় দেবে না প্রতিধ্বনি…

আর যত শীল ও দুঃশীল গতি অগতি কুশল অকুশল
আর যত অভিজ্ঞা ও সমাপত্তি, বারো রকমের বন্ধনযাতনা
সংসার সন্ন্যাস মোক্ষ মোহ কাম কৃত্য ঘাম মূত্র
ঔরস ও ধর্মাধর্ম পুরীষ পৌরুষ
সব একাকার হবে যেইদিন
সেদিন কোথায় কোন দূরে নিয়ে যাবে গো আমায়
ধর্মহারা বীতকৃত্য সূত্রহীন পুরীষবিহীন…

১৬
স্বপ্নভূভাগ

এবার বলো হে ফিরতিপথের নাবিক,
ওহে মাথা-মুড়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,
সেই দ্বীপদেশের খবর বলো
যেইখানে মানিপ্ল্যান্ট ও সোলার প্ল্যান্টের পাতারা
একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে
পান করে রোদের শ্যাম্পেন।
কোন প্রজন্মের উদ্দেশে তাদের সেই স্বতঃস্বাস্থ্যপান?

সেই দ্বীপদেশের কথা বলো যেখানে নারীরা
সামান্য একটি কাঠের কুটিরে
ফুটিয়ে তোলে বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।

প্রীতিপরবশ সেইসব কুটিরের কথা বলো, সেই
একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান
যে-দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা
পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে।
আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে
তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়
নবীন উলটকমলের চটপটে পাতা ও পল্লব।

এবং হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে
তরুণী বনবিড়ালিনীর সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি।
তাক লাগিয়ে দেয় দ্বীপদেশের অরণ্য অধ্যায়ে।

নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় একদম সরাসরি,
সোজা ও সহজ।

ও ফিরতিপথের নাবিক, ও মাথা-মুড়ে-ফেলা প্রবীণ কাপ্তান,
তুমি সেই প্রসন্ন দ্বীপের কথা বলো, কী কী দেখলে সেখানে?
জলবায়বীয় পরিস্থিতির কথা বলো
প্রাণী ও পতঙ্গদের উল্লোল উচ্ছ্বাস
আর গাছেদের স্বতঃস্ফূর্তির খবর…

আমরাও তো চলেছি উজানে।
চলছি তো চলছিই অনিঃশেষ
উত্তর পেরিয়ে আরো দূর উত্তরোত্তর অঞ্চলে…
উগ্র লোনা বাতাসের সোহাগে লেহনে
বিকল হয়েছে আমাদের সেক্সট্যান্ট
মর্চে ধরেছে কম্পাসে, দুরবিনে।
চলেছি তবুও।

বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধ্য-সাধনার যোগ্য
স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাতীত?

১৭
সাব-জিরো সাইলেন্স

চোখ-বাঁধা জিম্মি-হওয়া মানুষ জানে না
ঠিক কোন মুহূর্তে গুলি এসে লাগবে ঠিক কোথায় কোথায়।
অচেনা রোমাঞ্চে, রোমহর্ষে, ত্রাসে, সর্বোচ্চ সংরাগে
শরীরের প্রতি ইঞ্চি তাই প্রতিস্পর্ধী, টানটান।
যেমন ‘দেহের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা
পোশাকের ফেলে-রাখা ফাঁকা স্থান।’

একদিকে তোমাতে সঞ্চার করা হবে
অনন্ত বাকতৃষ্ণা, চিৎকারের উদগ্র তাড়না, উদ্গার
অন্যদিকে নিষেধ বাকস্ফুরণ। নিষেধ চিৎকার।
কোন দিকে যাবে?

কোন দিক থেকে তেড়ে আসবে কোন ধারালো ছোবল,
কোন কোপ, কোন কার্তুজ, লেলিহ ফিসফাস–
এই গা-ছমছম ভূতবান্ধব জ্যোৎস্নায়
বুঝতেও পারবে না আর, ওরে নিরুপায়।

এই এখনই শুনবে বহু ঘোলাটে ভয়ের ঘোলতরঙ্গবাদন
আবার এখনই উচ্চনাদী নীরবতা।

কতশত সশব্দ উচ্চার, ঘুরে-দাঁড়ানো চিৎকার,
অন্তরাত্মা-কাঁপিয়ে-তোলা কান্না, আর্তি, আহাজারি,
বহুমাত্র বিচিত্র আওয়াজ–
স্রেফ দ্বিমাত্রিক কালো টোটেম-অক্ষর হয়ে
একদম খামোশ মেরে থাকে তারা নিঃসহায়
কখনো তা ভাবদোষে, কখনো-বা রাজরোষে
স্তরে-স্তরে-রাখা রাষ্ট্রপুথির ঘোর-গুমসুম নিঝুম পাতায়।

অতিরিক্ত অবদমনের অবশেষ
দোষযুক্ত স্বপ্নে ভরে যায় সারা দেশ।
স্বপ্নের ভেতর থেকে ঘটে যায় তার
লাভাভর্তি পিচকারির ঘন পিচিৎকার।

১৮
হর্ষতরঙ্গ

সরো সরো, ঈশান থেকে তিরের বেগে ওই নেমে পড়ছে হংসবাহিনী– উঠানে, অঙ্গনে, ধানখেতে, নয়ানজুলিতে। আর নৈর্ঋত থেকে ছুটে আসছে দস্যি বাচ্চারা। এসেই দুই ডানা পাকড়ে ধরে উঠে পড়ছে রাজহাঁসের পিঠে। তা-ই দেখে ঘাস থেকে মুখ তুলে মুচকি হাসছে খরগোশ, প্রশাখাজালের আড়াল থেকে কাঠবিড়ালি।

এক হোঁদলকুতকুতে, দুষ্টের চূড়ামণি, এমনিতেই লেট লতিফ, তদুপরি পিছিয়ে পড়ছে বারবার, কুকুরছানার কান মলে দিয়ে, পোষা শজারুর শলাকা ধরে টান মেরে, খুচরা নৌটাংকি সেরে, দুই কাঁধে দুই অস্থির গুঞ্জরণরত বাচ্চা বসন্তবাউরিকে বসিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে শেষ হংসবাহনের দিকে। হাঁসটি তখনো নয়ানজুলির জলীয় রানওয়েতে। উড়ালে উন্মুখ। বাচ্চাটি জলকাদা মাড়িয়ে এসে আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে কোনোমতে হাঁকুচ-পাঁকুচ করে উঠে পড়ছে সর্বশেষ হংস-ফ্লাইটে। পেছন পেছন আলপথে হেলেদুলে আসছে কান-মলা-খাওয়া নাদুসনুদুস কুকুরছানাটিও।

তুলাপ্রসূ সব শিমুলের গাছ, ফলপ্রসূ সব আম ও আমড়া বাগান। তাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে হংসবাহিনী। এক-একটি হাঁসের পিঠে এক-একটি শিশু। উড়ে যেতে যেতে উৎফুল্ল বাচ্চারা ভূমণ্ডলের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেবার মুদ্রায় ফুঁ দিচ্ছে হাতের তালুতে। একবার ডান হাত, আরেকবার বাম। দুই দিকে জেগে উঠছে ছোট-ছোট হাওয়াহিল্লোল। আর সেই হিল্লোলের হালকা ধাক্কাতেই সঙ্গে-সঙ্গে নিচে আগুন ধরে যাচ্ছে হুলুস্থুল কৃষ্ণ- ও রাধাচূড়ায়, আর আমের পাতারা খিলখিল আহ্লাদে ঢলে পড়ছে প্রতিবেশী আমড়ার পাতাপল্লবের ওপর।

আজ আগুনে-বাতাসে গুলতানি, পলাশে-শিমুলে শয়তানি,
আমে-আমড়ায় দুষ্টামি একটানা
আর সাগর দুলছে পাহাড় ঢুলছে আকাশ ঝুলছে মাথার ওপর উড়াল শহর
ভোলাভালারা ভুলছে, লহরি তুলছে, ধীরে ঊর্ণা খুলছে মেঘের বহর…

১৯
বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা

মেঘ থেকে মেঘে লাফ দেবার সময়
তূরীয় আহ্লাদে দ্রুত কেঁপে-বেঁকে
একটানে একাকার যখন বিজলিসূত্র, ওই ঊর্ধ্বতন
মেঘের আসনে এক ঝলক দেখা গেল তাকে
আলোকিত ঘনকের আকারে।

তাকে ডাক দেবো-দেবো, আহা কী বলে যে ডাক দিই!
জন্ম এক রুদ্ধভাষ জাতিতে আমার–
মুহূর্তে মিলিয়ে গেল অপর আকারে।

দূর মহাকাশে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে কত ফুয়েল-স্টেশন–
সেইসব এলোমেলো নৈশ নকশার মধ্যে তাকে, প্রিয় তোমাকেই,
ঘোর মধ্যরাতে
এইভাবে দেখে ফেলি আমিও প্রথম।
সর্ববায়ু আমার সুস্থির হয়ে যায়।

যেই দেখি আর ডাক দিতে যাই প্রিয়, অমনি
তোমার সমস্ত আলো, সকল উদ্ভাস
হঠাৎ নিভিয়ে নিয়ে চুপচাপ অন্ধকার হয়ে যাও।
আবার উদ্ভাস দাও ক্ষণকাল পরে–

এইরূপে খেলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি সুদূর রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমারই সাহিত্যে আহা এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

এরপর থেকে একে একে এক উচ্চতর জীবের বিবেক
প্রথমে প্রয়োগ করে দেখি,
মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি আকারে ও নিরাকারে।
এক অতিকায় জট-পাকানো যন্ত্রের
আগ্রহ সাধন করে দেখি,
তা-ও তিনি ছড়িয়ে পড়েন সেই আকারে নিরাকার;
আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,
একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব
অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।

একদা মণ্ডলাকার ছিলে জানি
আজ দেখি দৈবাৎ ধর্মান্তরিত, ঘনকের রূপে!
ঘনক তো গোলকেরই এক দুরারোগ্য সম্প্রসার।
তবুও তো ধর্ম রক্ষা পায়। রক্ষিত, সাধিত হয় তবু।

গোলকত্ব পরম আকার
গোলকতা যথা এক অপূর্ব বিহেভিয়ার, প্রায়-
নিরাকারসম এক নিখুঁত আকার।

শৈশবের কালে, এক আশ্চর্য মশলা-সুরভিত
গুহার গবাক্ষপথে আচম্বিতে ভেসে উঠেছিল মেঘ,
যার বাষ্পে বাষ্পে কূটাভাস।
কিছুতেই পড়তে পারি নাই সেই মেঘ
আমরা তখন।

বিব্রত বাতাস তাকে, মেঘে মেঘে সংগঠিত ক্ষণ-ক্ষণ-আকৃতিকে,
ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাচ্ছে কত বিভিন্ন প্রদেশে।
নিরাকৃত হতে হতে প্রায়, ওই তো ব্যক্ত হচ্ছেন ফের আকারে আকারে।
ধর্মচ্যুত হতে হতে প্রায়, ফের প্রচারিত হন ধর্মে ধর্মে।
আহা, ধর্ম হারালে কী আর থাকে তবে এ ভুবনে!
ঘনক যে গোলকেরই এক নিদারুণ তাপিত প্রসার।

বৃহৎ, অকল্পনীয় এক জড়সংকলন। বড় বালিপুস্তকের মতো–
তারই মধ্যে অকস্মাৎ একটু প্রাণের আভা। মাত্র তার একটি পৃষ্ঠায়।
এই সংকলনের ভূমিকাপত্রটিও নেই। ছিন্ন। সেই প্রধান সংঘর্ষে।

নিষ্ক্রান্তিদিবসে, অতঃপর, ওই গুহামুখে পড়ে থাকে
এ বিপুল জড়সংকলনের ছেঁড়া ভূমিকাপৃষ্ঠাটি,
অর্থাৎ সেই যে প্রথম ক্যাজুয়াল্টি, নিখিলের–
ওই গুহাপথে, নিষ্ক্রমণকালে।
একবার মাত্র দেখা হয়েছিল কায়ারূপে
ঝাপসা, ছায়া-ছায়া!
তা-ও বিজলির দিনে, তা-ও মেঘের ওপরে
উল্লম্ফকালীন।
এরপর থেকে শুধু ভাবমূর্তি…
যেদিকে তাকানো যায়
কেবলই, উপর্যুপরি ভাবমূর্তি ঝলকায়।

মাঠে মাঠে স্প্রিং-স্ক্রু আর নাটবোল্ট ফলেছে এবার সব জং-ধরা।
সে-সব ভূমিতে হাঁটু গেড়ে গলবস্ত্র হয়ে পরিপূর্ণ দুই হাত তুলে
যাচ্ঞামগ্ন সারি সারি সম্প্রদায়– তারা অসবর্ণ, তারা
লঘিষ্ঠ– কলহরত বিড়ালের আধো-আলো-আঁধারি বাচন ও কণ্ঠস্বর
কেড়ে নিয়ে দ্রুত নিজ কণ্ঠে কণ্ঠে গুঁজে দিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে যায় তারা।

তেজের অধিক তেজ
বাক্-এর অধিক বাকস্ফূর্তি তুমি,
গোলকে স্ফুরিত হয়ে এসো পুনর্বার
পূর্বধর্ম ধারণ ক’রে সরাসরি উত্তম পুরুষে।

আর
কত অর্থ যে নিহিত করে রাখো বীজাকারে
সেইসব ভাসমান বাক্যের অন্তরে,
দৃশ্যত যা অর্থহীন অতি-অর্বাচীনদের কাছে।

সংকটে সংকটে, সর্ব-আকারবিনাশী
দহন দলন আর দমনের দিনে
আদিগন্ত কুয়াশা-মোড়ানো সেই তৎকালীন রৌদ্রের মধ্যেই
চতুর্দিক থেকে একসঙ্গে আর
বৃক্ষে বৃক্ষে আর দ্রব্যে দ্রব্যে আর ভূতে ভূতে সর্বভূতে
মুহুর্মুহু উদ্ভাস তোমার, এক অবধানপূর্ব রহিমের রূপে।
ঘনক তো গোলকেরই এক অপূর্ব অপিনিহিতি।

এইরূপে লীলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি দূরের রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমার সাহিত্যে দ্যাখো এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

২০
মুখোমুখি, যুযুধান
(কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শত্রুতর বন্ধু, বন্ধুতর শত্রুবরেষু)

কে হে তুমি প্রতিবাক্য ছুড়ে দিচ্ছ বারবার ওইপার থেকে
প্রতিপদ স্থানাঙ্কে দাঁড়িয়ে আমার?
তোমার তিরের হালকা টঙ্কার আর ধনুকের মন্দ-মন্দ জ্যা-নির্ঘোষ
বায়ুর প্রথম স্তরে আলোড়ন তুলেছিল ভোরের বেলায়–
আয়ত চৌকো ত্রিকোণ বর্তুল…

এখন এ অপর বেলায়,
ওইসব শব্দের বুদ্বুদ বহুগুণিত হয়েই ফেটে পড়ছে
ঠা-ঠা মেঘনাদের ভাষায়–
আচমকা কোনো বোমা ফাটলে
যেমন সহানুভূতিবশে আশেপাশে পুঁতে-রাখা
সব বোমা ফাটতে থাকে এক-এক করে, সেইরূপ…
সেইরূপ বিস্ফোরক সহানুভূতির লীলা
লীলাচ্ছ হে গুপ্ত লীলাকর।

ভিন গোলার্ধের কোনো নাম-না-জানা
মর্কটে-কর্কট-লাগা এক জম্বি-প্রজাতন্ত্র থেকে ছুটে আসছে
মারণজীবাণু-মাখা জং-ধরা একাঘ্নী হারপুন।
পৃথিবীতে এত প্রাণী, তা থুয়ে কেবলই খুঁজে-খুঁজে
আমার দিকেই ধেয়ে আসে
হারপুনের দাঁত-খেঁচা হিংস্র আস্ফালন।

বীজাণুব্যসনে ন্যুব্জ এই নবদ্বার দেহ, এ-ব্যাধিমন্দির, এই ভূতাবাস, একে
উপলক্ষ করে আর কত ছুড়ে দেবে কল্প-ঔষধ, প্রবোধ, প্রতিবাক্যরাশি?
এমনিতেই তোমার জ্ঞানাঙ্কুশের খোঁচা খেয়ে হয়েছি কাহিল
তার ওপর এত সব প্রবোধ, ঔষধকল্প,
এই যে উপর্যুপরি সিমপ্যাথেটিক ডেটোনেশনের খেলা,
উড়াল পাখির ঝাঁকে ছুড়ে দেওয়া ভেলকিজাল,
হারপুনের ভানুমতি খেল,
জ্ঞেয় দিয়ে অজ্ঞেয় ধরার লীলা…
অসহ, অসহ্য লাগছে সব
কিন্তু কখনোই বার্তা পাঠাব না থামাতে এসব।

থেকে-থেকে অবমাননার মতো গায়ে এসে বেঁধে
বিরামচিহ্নিত ধোঁয়াচিৎকার, তর্জন আর কেরদানিধ্বনি।
প্রত্যুত্তরে পাঠাই তোমার প্রতি উচ্চকিত যত
ভাবনা আমার।
কিন্তু কী যেন কী ঘটে যায়
আমারই সশব্দ ভাবনারা হায়
আমাকেই ফাঁকি দিয়ে নিঃশব্দে মিলায়
হোগলা আর কাঁকড়াভরা হিজিবিজি জলায়, জংলায়।

জ্বরান্তক বটিকা পাঠাই,
পাল্টা পাঠাও হে তুমি পাতলা সিরাপ।
অর্শে যে সিরাপ, মধুমেহতেও তা-ই…
বড় আতান্তরে পড়ি বারবার।

আসলে কে হে তুমি? নেপথ্যে, বহুদূর যবনিকার আড়াল থেকে
বারবার হেঁকে যাচ্ছ সেই একই হিতেচ্ছা হিমেল…
‘পূতি ঘেঁটে ঘেঁটে পূত হয়ে ওঠ
পুঁথি ঘেঁটে ঘেঁটে হয়ে যা রে তুই ত্রিপণ্ড পণ্ডিত
ময়লা-ঘাঁটা কীট হয়ে কাটিয়ে দে ঝকঝকে একটি জীবন।’

এক ঘোড়া একাই ধারণ করে তিন হর্স-পাওয়ার–
আমার সে-তুফানাশ্ব একদা ছুটত
মত্ত হ্যারিকেনের উচিত ঘূর্ণি তুলে।
আজ অশ্বধর্মে মতিগতিহীন আমার সে-ঘোড়া
ব্যাটারি-ফিউজ হয়ে পড়ে আছে আস্তাবলে।

অন্তিম-গাঁজলা-ওঠা প্রিয়তম সে-ঘোড়ার
নিবিড় নিতম্বে কষে চাবুক দাগিয়ে
বিছুটির পাতা ঘষে দিয়ে গুহ্যপ্রদেশে, উঠিয়ে নিয়ে
যাব ঠিকই রিচার্জ করাতে।
জিল্লিক পাড়তে পাড়তে সোজা ছুটে যাবে
জিল্লিকপাড়ার সেই বেঘোর ব্যাটারি-ময়দানে।

বুস্ট চার্জ দেব
জং-পড়া টেংরি আর খুরে খুরে দেব কেরাটিন ট্রিটমেন্ট।
নিজের মেরুদ-েও সেরে নেব টুকিটাকি মেরামত, রাংঝালাই।
তারপর, চূড়ান্ত চার্জিত ওই ঘোড়াকে ছোটাব
তুফানতরঙ্গ তুলে তোমার দ্রাঘিমা বরাবর।

পথিমধ্যে বাড়বাগ্নি, জলে ও জঙ্গলে, সাগরে, ভূধরে, গিরিকন্দরে…
বারুদবাতাসে ঠাসা আবহবলয়–
তারই মধ্য দিয়ে ক্ষিপ্র চৌকস চকমকি ঠুকতে ঠুকতে ছুটতে থাকব আর
আমার সে-তুফানাশ্বের উড়তে-থাকা ধাবন্ত ধারালো
কেশরের ঘষা-লাগা-মাত্র
হাওয়ায় লাফিয়ে উঠবে লকলকে রোহিতাশ্বের শিখা।

পথে ঘনঘন-রং-বদলানো গোয়েন্দা গিরগিটি, কুতক্ষক,
কাঁটার সাঁজোয়া পরে হঠাৎ হাজির হওয়া শজারুবাহিনী,
জলে তিমি, তিমিঙ্গিল, ডাঙায় খাটাশ,
তিরিক্ষিমেজাজ কৃশ কাকলাস, বৃশ্চিকের ক্যামুফ্লাজ,
মৌমাছির মাধুকরী, পায়রার কপোতবৃত্তি আর
উভচর ঘোড়েলের বেতালা ঘোড়েলকাণ্ড ঠেলে ঠেলে
উজিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তা-ও জানি…

পর্বতের ভাঁজ থেকে খসে গিয়ে অভিযাত্রীদল
টুপটাপ ঝরে পড়বে সরু গিরিপথ-দিয়ে-চলা চোরাই মাল আর
মালের কারবারিবাহী খচ্চরের কাফেলার ওপর।

পুলসেরাতের মতো সরু পুল-তার ওপরে
ভল্ল-হাতে নাঙ্গা পুলিশের মতো সার-সার দাঁড়ানো
একচক্ষু হিংস্র ঊনমানব, বামনপ্রজাতির।
তাদের কিনার দিয়ে তুরন্ত তাড়িয়ে
উড়িয়ে নিয়ে যাব ঘোড়াকে আমার।
ছুটতে ছুটতেই ছোঁ মেরে উঠিয়ে নেব
দু-একটি শস্ত্রপাণি বিচ্ছুটে বামন।

ওদিকে নটখটে কিছু হনুমান নিজ-নিজ লেজে
আগুন লাগিয়ে নিয়ে ডাল থেকে ডালে
চিল্লাতে চিল্লাতে ধোঁয়া-মাখা হুতাশন দিয়ে যাবে ভিমরুলের চাকে।
লেগে যাবে মহা-ভজঘট, শুরু হবে ভেলকিনাচ
উল্লুক-ভল্লুক-সিংহ-শুয়োর-তরক্ষু-অধ্যুষিত ওই জঙ্গল-সাম্রাজ্যে।
জাঁকান্দানি শুরু হয়ে যাবে রীতিমতো
পরাক্রান্ত স্বরাট সিংহের একচ্ছত্র পরাক্রমে।

বেলাশেষে অ্যাশফল্টের ঘোর ধোঁয়াভস্মের মতন
মিশিকৃষ্ণ অমানিশা নামবে এক আয়ামে জাহেলিয়ার।
শতশত চেরাজিভ সরীসৃপ-চমকানো আঁধার আকাশ…
ছিঁড়ে-যায়-যায়-প্রায় শনি ও রবির মাঝখানকার
সঘন বুনটবদ্ধ সুদীর্ঘ সেলাই…

অবশ্যই দেখা হবে একদিন। এবং অচিরেই।
তারপর লড়াই হবে মুখোমুখি সেয়ানে সেয়ান…

আড়াই প্যাঁচের চালে, গণেশ-উল্টানো গ্যাংনাম তালে
ফণা-তোলা ফানাফিল্লা ছন্দে, ফোস্কা-ফোটা অশ্বগন্ধে
তিন্তিড়ি গাছে জোনাকির ঝাঁকে তিড়িংবিড়িং ভেলকির ফাঁকে
দ্যাখো-না হে খালি বিতিকিচ্ছিরি
কী-কী ঘটে আর মহা-ধুন্ধুমার ধুলান্ধকারে আ-কারে ই-কারে
হ্রস্বলিদের উল্টাপাল্টা উল্লম্ফনে
ফাটাফাটি আর মারকাটারি শর্ট-সার্কিটে
তামাশা খামোশ-করা পাল্টা-তামাশায়
সার্কাস উল্টে-দেওয়া অ্যান্টিসার্কাসে
গজব-জাগানো কেয়ামত যেন ব্লাডার-ফাটানো গেণ্ডুয়া খেলা…
দ্যাখো-না হে খালি,
কী-কী ঘটে আর মহা-ধুন্ধুমার ধুলান্ধকারে আকারে বিকারে
হ্রস্বলিদের চিল্লাপাল্লা নাচনে-কুঁদনে
ব্লাডার-ফাটানো গেণ্ডুয়া খেলা… দুর্যোধনে দুঃশাসনে…
খুন ও জখম শকুন শকুনি অশ্বত্থামা…
তোমাদের ওই আরাম-আরাম তুলতুলতুলে তাসের রাজ্যে
ঘটিয়ে দেবই মৌলিক হাঙ্গামা।

দেখো, বৃথা যেন নাহি যায় কিছুতেই
আমাদের অনচ্ছ অথচ উচ্চ-ভোল্টের সমরনীতি, যুদ্ধরঙ্গ
এবং এ জঙ্গসমীকরণে সুমেরুপক্ষ হও যদি তুমি
আমি হব নিশ্চিত বিষুবপার্শ্ব তবে।

যুযুধান আমরা দু-পক্ষ মিলে, পরস্পরে,
মেটাব গায়ের ঝাল
গরমাগরম।
কেবলই ঘটিয়ে যাব লাগাতার
প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি আর
বলাই বাহুল্য, সব ক্ষতিই অবধারিতভাবে কোল্যাটারাল…


মাসুদ খান

মাসুদ খান

মাসুদ খান। কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী।

প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় বুয়েটের হল ম্যাগাজিনে, ১৯৭৯-তে। জাতীয় পর্যায়ে লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে মধ্য-আশি থেকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্রিকায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সাহিত্য-পত্রিকায় ও কবিতা-সংকলনে।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :

পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩)
নদীকূলে করি বাস (২০০১)
সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)
আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১)
এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)
দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)
প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬)

ই-মেইল : masud_khan@yahoo.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E