৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ২৯২০১৭
 
 ২৯/০৯/২০১৭  Posted by

কবিতা : মানবজাতির মাতৃভাষা
মাসুদ খান

কারো মাতৃভাষা বাংলা, কারো চাকমা, কারো-বা ফারসি, ফরাসি, আরবি, ইংরেজি, চৈনিক, হিন্দি, হিস্পানি, জাপানি…। পৃথিবীতে কত জাতি, কত জনগোষ্ঠী, আর তাদের ভাষা, তাদের বুলি কত বিভিন্ন ও বিচিত্র! কিন্তু অনুভূতির মৌলিক ভাষা এক, অভিন্ন। আর সেই বিমূর্ত অনুভূতির সৎ ও মূর্ত প্রকাশই কবিতা। কবিতাকে তাই বলা হয়ে থাকে সমগ্র্র মানবজাতির মাতৃভাষা। মাতৃভাষা আমাদের যা-যা দেয়, যা-কিছু জোগায়- সৌন্দর্য, মাধুর্য, সহজতা, চিদানন্দ, জৈবটান, মাধ্যাকর্ষণ, জৈবানুভূতি, শুশ্রূষা, উপশম, স্তন্যদুগ্ধ, মোক্ষণশান্তি, প্রেরণা, এষণা, সাহস, শক্তি, উদ্দীপন, অক্সিজেন, করণ, বাহন, মাধ্যম…, তার অনেক কিছুই আমরা পাই কবিতার কাছ থেকে।

জন্মসূত্র, নাভিচিহ্ন
এক অর্থে কবিতার জন্ম ভাষারও জন্মের আগে। সেই অর্থে কবিতা মানুষের সমান বয়সী। বলা হয়, শ্রমই আদি মানুষকে ক্রমে ক্রমে মানুষ বানিয়েছে। পরিশ্রম করার সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের ঝোঁক বা ঘাতের সঙ্গে উচ্চারিত হয় কিছু ধ্বনি। সেই ধ্বনিগুচ্ছ যখন উচ্চারিত হয় নির্দিষ্ট পর্যায়বিরতিতে, তখন তৈরি হয় এক ছন্দ-স্পন্দিত ধ্বনিতরঙ্গ। দেখা গেল, সেই ধ্বনিতরঙ্গের মাজেজা এমনই যে তা মানুষকে দোলা দিতে পারে, করতে পারে উদ্দীপিত।

যৌথশ্রমের সময় প্রয়োজন হয় ঐক্য ও একাত্মতার, দরকার হয় উদ্দীপকের। আর সেই উদ্দীপকের কাজ করতে থাকল ওই ছন্দোস্পন্দিত ধ্বনিপুঞ্জের ভারসাম্য ও পর্যায়বিরতি। যেখানেই যে-কাজেই মানুষের প্রয়োজন হতো যৌথশ্রমের, যৌথশক্তির, সেখানেই সেই ছন্দোস্পন্দিত ধ্বনিতরঙ্গ- উদ্যম ও উদ্দীপনার জন্য, ঐক্য ও একাত্মতার জন্য। দাঁড় টানা কিংবা দল বেঁধে ভারি জিনিশ টানার সময়কার যে সমস্বর ‘হেইয়ো…হেইয়ো…’ ধ্বনি, কিংবা বেহারাদের যে ‘উহুম্না…উহুম্না…’ এ ধরনের ছন্দ-স্পন্দিত ধ্বনিতরঙ্গই কবিতার আদি রূপ, বীজাকার। কবিতার প্রোটোটাইপ।

কবিতা : ধ্বনিতরঙ্গ থেকে নান্দনিক শব্দ-আলেখ্য
কালে কালে জনগোষ্ঠীতে ধ্বনির সমন্বয়ে গড়ন পেয়েছে শব্দ, শব্দসমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ভাষা। হাজার হাজার বছর ধরে চলেছে এই প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া যৌথের, সমাজের। ভাষা তাই সামাজিক সম্পদ।

এখন এই যে ধ্বনিসমন্বিত শব্দ, এর রয়েছে অন্তত ৩টি তাৎপর্য বা গুণ- ধ্বনিগুণ, অর্থগুণ আর চিত্রগুণ।

শব্দ যেহেতু গড়ে উঠেছে ধ্বনির সমাহারে, সমন্বয়ে, তাই শব্দের প্রাথমিক গুণই হচ্ছে ধ্বনিগুণ। শব্দ-উচ্চারণে ধ্বনির যে দোলা, অর্থাৎ শব্দের যে শ্রুতিবৈশিষ্ট্য, সেটাই তার ধ্বনিগুণ।

আবার শব্দ হচ্ছে কোনো না কোনো বস্তু বা বিষয়ের প্রতীক। প্রতীকরূপী শব্দটির সঙ্গে উদ্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়টির স্বভাবচরিত্রের মিল থাক বা না থাক, যুগযুগ ধরে যৌথের ব্যবহারে প্রতীকটি জনগোষ্ঠীর মানসে এমনভাবে সুদৃঢ় ও অর্থপূর্ণ হয়ে গেঁথে যায় যে, তা ওই বস্তু বা বিষয়ের অবর্তমানেই তার প্রতিনিধিত্ব করে, যথার্থরূপে। ধরা যাক, ‘নদী’, উচ্চারিত এই ধ্বনিপুঞ্জটি একটি জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে ভাটির দিকে বয়ে যাওয়া প্রকৃত যে নদী, তাকেই বোঝায়, নির্দেশ করে প্রকৃত নদীরই অর্থ- আসল ‘নদী’ সামনে হাজির থাক বা না থাক। আসল সাপ না দেখেই শুধু ‘সাপ!’ এই আওয়াজটি শুনেই সচকিত হয় একটি ভাষাগোষ্ঠির যে কোনো মানুষ। এখানেই হচ্ছে শব্দের অর্থগুণ।

আবার, ‘নদী’ শব্দটি উচ্চারণে বক্তা বা শ্রোতার মানসপটে ভেসে ওঠে নদীর একটি চিত্রও- নদীর বয়ে যাওয়া, তার কলতান, নদীবক্ষ আর নদীপারের নানা অনুষঙ্গসহ একটি নদীচিত্র। এ-ই হলো শব্দের চিত্রগুণ।

শব্দে শব্দে এই যে ধ্বনি-, অর্থ- আর চিত্র-গুণ আরোপের প্রক্রিয়া, এটি একটি জনগোষ্ঠীতে চলে যুগযুগ ধরে। একইসঙ্গে চলে সেই ধ্বনির, অর্থের আর চিত্রের বিবর্তনও। আর এই ধ্বনি-, অর্থ- ও চিত্র-ম-িত, প্রতীকরূপী শব্দের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে জনগোষ্ঠীর ভাষা, প্রতীকনির্ভর এক ভাষাব্যবস্থা।

এভাবে ধ্বনিব্যবস্থা থেকে ভাষা ক্রমশ বিবর্তিত হতে হতে রূপান্তরিত হয়েছে প্রতীকরূপী শব্দসমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক প্রতীকমূলক ভাষাব্যবস্থায়।

অবশ্য হালের ক্রিয়াভিত্তিক শব্দতত্ত্ব জানাচ্ছে (বদৌলত: কলিম খান)- কোনো বস্তু বা বিষয়, এবং সেই বস্তু বা বিষয়কে প্রতিনিধিত্ব করে যে-শব্দ, এ-দুয়ের মধ্যকার সম্পর্কটি প্রতীকী নয়। কারণ, যেসব ধ্বনির সমন্বয়ে মানুষ গড়ে তুলেছে শব্দসম্ভার তথা ভাষাব্যবস্থা, তাদের প্রত্যেকটি এক-একটি ক্রিয়ার চিহ্নায়ক। ভাষাব্যবস্থার একেবারে আদি উদ্ভবপর্বে, সেই পশুযূথ থেকে মানবসমাজে উত্তরণপর্যায়ে অর্থাৎ হোমিনিড অধ্যায়ে, মানুষ এক-একটি ধ্বনির সাহায্যে চিহ্নিত করেছে এক-একটি ক্রিয়া বা কাজকে। যেমন, ক্-ধ্বনি করণ, গ্ গমন, চ্ চলন, জ্ জনন, ব্ বহন,র্ রহন, ধ্ ধারণ, দ্ দান, ত্র ত্রাণ, প্ পালন, ৎ উল্লম্ফন ইত্যাদি ক্রিয়ার চিহ্নায়ক। ফলে, একটি বস্তু বা বিষয় মূলত যে-ক্রিয়া করে, সেই ক্রিয়াকেই ইঙ্গিত করে ওই বস্তু বা বিষয়ের প্রতিনিধিত্বকারী শব্দটি। অর্থাৎ, ক্রিয়াভিত্তিক শব্দতত্ত্ব¡ অনুযায়ী শব্দ আসলে বস্তু বা বিষয়ের প্রতীক নয়, বরং তার ক্রিয়া-চিহ্নায়ক। এই তত্ত্ব শব্দকে প্রতীক হিসাবে মানতে নারাজ, যদিও এ-তত্ত্বেরই মর্মানুসারে, শব্দের মূলে রয়েছে যে ধ্বনি, সেটি কিন্তু এক ধরনের প্রতীকই; অর্থাৎ ক্রিয়ার প্রতীক।

প্রতীকবাদী তত্ত্বমতে শব্দ হচ্ছে বস্তু বা বিষয়ের প্রতীক। অর্থাৎ এ-তত্ত্বের মর্মানুযায়ী শব্দ চিহ্নিত করে বস্তু বা বিষয়ের নাম-কে, যেখানে ক্রিয়াভিত্তিক তত্ত্ব অনুসারে শব্দ চিহ্নিত করে বস্তু বা বিষয়ের ক্রিয়া-কে। উভয় তত্ত্বমতেই শব্দ হচ্ছে চিহ্নায়ক, যা কিনা চিহ্নিত করে উদ্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়কে। পার্থক্য হচ্ছে- শব্দ এই যে চিহ্নিত করে বস্তু বা বিষয়কে, ব্যাপারটি প্রতীকবাদী তত্ত্বমতে আকস্মিক ও আরোপিত, ক্রিয়াভিত্তিক তত্ত্বমতে তা আকস্মিক নয়, আরোপিতও নয়। প্রতীকবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী একটি শব্দের সাধারণত একটাই অর্থ, আর সেই অর্থকে জানতে হয় শব্দের বাইরে থেকে; অপরদিকে, ক্রিয়াভিত্তিক তত্ত্বমতে একটি শব্দের বহু অর্থ, আর সে-অর্থ জানা যায় শব্দের ভিতর উঁকি দিয়ে, তার ধ্বনিগুলি ভেঙে ভেঙে বিশ্লেষণ ক’রে।

আর কবিতা? আদি কবিতা যদি হয় ধ্বনিতে ধ্বনিতে ছন্দোস্পন্দ জাগানো এক ধ্বনিতরঙ্গ, তবে কালান্তরে কবিতার স্বরূপ গিয়ে দাঁড়িয়েছে শব্দে শব্দে ছন্দোস্পন্দ ও অন্বয় দিয়ে গড়া এক শব্দ-আলেখ্য।

বিকাশ, বিবর্তন
শব্দকে যৌথ দিয়েছে ধ্বনি-, অর্থ- আর চিত্র-গুণ আর সেই বিচিত্র গুণ ও তাৎপর্যে ভরা রকমারি শব্দের অন্বয়ে ও সমাহারে গড়ে ওঠা এক সুষম নান্দনিক আলেখ্যই কবিতা।

অবশ্য পরবর্তীকালে, আধুনিক যুগে এসে, কবিরা শব্দ থেকে যৌথের দেওয়া অর্থ- তথা চিত্র-তাৎপর্যকে পিছলে সরিয়ে দিয়ে খুলে দিতে থাকলেন শব্দের নতুন নতুন তাৎপর্যের সম্ভাবনা। কবিতার রাজ্যে ঘটে চলল এক বৈপ্লবিক তোলপাড়। সৃজনশীলতা প্রকাশিত হতে থাকল নানা উপায়ে, নানা ভঙ্গিতে। কবিতায় বাস্তবের অভিমুখ ঘুরে গেল কখনো কখনো কল্পনার দিকে। কখনো কখনো কেন্দ্র থেকে উৎকেন্দ্রিকতায়। বাস্তবকে উতরে নিয়ে যাওয়া হলো অতি-, অধি- আর পরা-বাস্তবতায়, মূর্ততাকে উতরে নিয়ে বিমূর্ততায়। চলতে থাকল নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা।

এর ফলে আবার ঘটতে থাকল আরেক রকম ঘটনা। শব্দ থেকে যৌথের দেওয়া অর্থ- ও চিত্র-তাৎপর্যকে হটিয়ে দেবার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে কবিতাও সরে আসতে থাকল যৌথের কাছ থেকে। কারণ, কবিতার যে বিশেষ সূত্র ও স্বভাবের আবেশে আবিষ্ট হয়ে একাত্ম হতো যৌথের সকলে, আদিতে তা ছিল কবিতার ধ্বনির দিক, পরে তা বদলে হয়েছিল শব্দের অর্থ ও চিত্রের দিক। এখন যদি যৌথের দেওয়া শব্দের সেই অর্থ- বা চিত্র-তাৎপর্যই বদলিয়ে দেওয়া হয় কবিতায়, তবে তো স্বাভাবিকভাবেই তা ভুগতে থাকবে যৌথবিচ্ছিন্নতায়।

বলা বাহুল্য, ইতোমধ্যেই চলে এসেছে মুদ্রণযন্ত্র। বস্তুত মুদ্রণশিল্পের কাল থেকেই অন্যান্য অনেক কিছুর মতো কবিতার চরিত্রেও ঘটতে শুরু করল বৈপ্লবিক রূপান্তর। কারণ, আগে কবিতা ছিল কণ্ঠ-, শ্রুতি- ও স্মৃতি-নির্ভর। যৌথের কণ্ঠ-, শ্রুতি- ও স্মৃতি-বাহিত হয়েই কবির কৃতিকে পৌঁছুতে হতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। যৌথই ছিল কবিতার উদ্দিষ্ট, যৌথই ছিল ভরসা। যৌথই বাহন, যৌথই ছিল চালক ও সঞ্চালক, কাব্য ও কবিতার। কিন্তু মুদ্রণশিল্পের সুবাদে কবিতার স্থায়িত্বের জন্য, কবির কৃতিকে সমকাল থেকে কালান্তরে পৌঁছে দেবার জন্য আর নির্ভর করতে হলো না যৌথের ওপর। যৌথের ওপর নির্ভরতার বদলে এল মুদ্রণ, প্রকাশনা আর প্রচার-প্রপাগান্ডার ওপর নির্ভরতা। এরই মধ্যে আবার নবোদ্ভূত পুঁজিবাদী বিশ্বকাঠামোতে ক্রমশ ব্যক্ত হয়ে উঠতে থাকল ব্যক্তি-র ধারণা, পাল্টাতে থাকল যৌথ-সম্পর্কিত প্রথাগত প্রত্যয়। সর্বোপরি ভেঙে পড়তে লাগল ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের সূত্র ও সেতু। ব্যক্তিবাদিতা আস্তে-আস্তে পর্যবসিত হতে থাকল ব্যক্তিসর্বস্বতায়। কবিতা হয়ে উঠল আরো নির্জন।

অতএব দেখা যাচ্ছে- (১) মুদ্রণ, প্রকাশনা ও প্রপাগান্ডা-মাধ্যমের উদ্ভব ও প্রসার, (২) পুঁজিবাদী বিশ্বকাঠামোতে ব্যক্তি-র উদ্ভব ও বিকাশ, (৩) ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষয় এবং (৪) শব্দ থেকে যৌথের দেওয়া অর্থতাৎপর্যের বিচ্ছেদ ঘটানোর প্রক্্িরয়া- মোটামুটি এসব কারণে কবিতা সরে এল যৌথের কাছ থেকে। হয়ে উঠল নির্জন থেকে নির্জনতর।

কবিতা তথা শিল্পকলা : ঈগলের অন্তর্ভেদী চোখে
মানুষ তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই ভেতরে নিয়ে নিচ্ছে বাইরের জগতের নানা সংকেত। সেই সংকেত সম্পর্কে অনুভূতি ও প্রাথমিক ধারণা তৈরির মাধ্যমে তার ভেতর গড়ে ওঠে ফার্স্ট সিগনালিং সিস্টেম অর্থাৎ ১ম সংকেততন্ত্র। বহির্জগৎ থেকে পাওয়া সংকেত ও সংবেদনগুলি বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করতে করতে মানুষের মধ্যে বিকশিত হতে থাকে এই সংকেততন্ত্র। এখন, প্রাপ্ত সংকেত বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের ফলে মানুষের ভেতরে যে অনুভূতি ও উপলব্ধির সৃষ্টি হয় তার প্রকাশ বা প্রতিফলন ঘটানোর জন্য তাকে আশ্রয় নিতে হয় অন্য এক সংকেততন্ত্রের। সেই তন্ত্রের নাম বাচনিক সংকেততন্ত্র বা ভাষা। এই ভাষাই হচ্ছে মানুষের সেকেন্ড সিগনালিং সিস্টেম বা ২য় সংকেততন্ত্র। ২য় সংকেততন্ত্র আসলে ১ম সংকেততন্ত্রেরই সাংকেতিক প্রকাশ।

বিবর্তনের ধারায় মানুষের যৌথশ্রমভিত্তিক নানা ক্রিয়াকাণ্ড ও গোষ্ঠীবদ্ধ যাপনের ফলশ্রুতি হিসাবে মানুষের মানস-ক্রিয়াকলাপে সূত্রপাত হয়েছে নতুন এই প্রক্রিয়া- এই ২য় সংকেততন্ত্র। ব্যক্তির ও যৌথের মধ্যকার এক জটিল সম্পর্কের ফলাফল হিসাবেই গড়ে উঠেছে এই সংকেততন্ত্র। কেবলমাত্র সামাজিক পরিবেশই সম্ভব করে তুলেছে মানুষের এই ২য় সংকেততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ। যেহেতু এই সংকেততন্ত্র অর্থাৎ ভাষাব্যবস্থা নিজে একটি বিমূর্ত প্রতীকভিত্তিক ব্যবস্থা, তাই এর মাধ্যমে মানুষ অর্জন করে বাস্তবের বিমূর্তায়ন ও সাধারণীকরণের সামর্থ্য। আর এখানেই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মানসিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যকার প্রধান পার্থক্য।

মানুষের এই ২য় সংকেততন্ত্র অর্থাৎ ভাষাবিশ্ব যতই বিকশিত হতে থাকে, বাস্তবের বিমূর্তায়ন এবং বাইরের জগতের সামান্যীকৃত প্রতিফলন ঘটাতে সে সমর্থ হয় ততই সূক্ষ্ম ও সার্থকভাবে। মানুষ চিন্তা করে এই ভাষার সাহায্যে, ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় এই ভাষা দিয়েই, বাস্তবের বিমূর্তায়ন ও বহির্জগতের সাধারণীকৃত প্রতিফলন ঘটায় এই ভাষার মাধ্যমেই। এখানে একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১ম সংকেততন্ত্র যতটাই সহজাত ও প্রকৃতিগত, ২য় সংকেততন্ত্র ততটাই সমাজগত।

এখন, যিনি কবি, যিনি শিল্পী, তাঁর ১ম সংকেততন্ত্রটি থাকে বেশ প্রখর। বাইরের জগৎ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সংকেত ও সংবেদনকে বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের ক্ষমতা কবিদের, সৃজনশীলদের থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই পারিপার্শ্বিক নানা টানাপড়েন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থেকেও, বাইরের যে কোনো সংকেতে- তা-সে দৃশ্য, শ্রব্য, স্পর্শ, আঘ্রাণ কিংবা আস্বাদ, যে আকারেই হাজির হোক না কেন- নিবিড় ও গভীরভাবে আলোড়িত হওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে কবিদের, শিল্পীদের। তাঁরা দ্রুত অনুধাবন করতে পারেন ওইসব সংকেতের নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য। তাঁদের থাকে সূক্ষ্ম ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং সেইসঙ্গে দূরদৃষ্টিও। তাই আলোড়িত হওয়ায় পাশাপাশি তাঁরা দ্রুত ও কার্যকরভাবে টের পেয়ে যান সেই সংকেতের অব্যবহিত ও দূরপ্রসারী প্রভাবের নানা দিকের খবর। পেয়ে যান সংকেতের মধ্যে নিহিত সংকট কিংবা সম্ভাবনার আগাম ইশারা। প্রাপ্ত সংকেত ও সংবেদনকে বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের সাথে সাথে কবি যুক্ত করেন নিজের বোধশক্তি। নিবিড় ও গভীরভাবে আলোড়িত হন বলেই কবি তাঁর সেই অনুভূতির, উপলব্ধির প্রকাশ ঘটানোর জন্য অনুভব করেন তীব্র তাড়না। আর এই পর্যায়ে কবিকে আশ্রয় নিতে হয় ২য় সংকেততন্ত্রের অর্থাৎ ভাষাব্যবস্থার।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কবি, শিল্পী বা সৃজনশীল ব্যক্তিমাত্রেরই ১ম সংকেততন্ত্র থাকে অত্যন্ত প্রখর। সহজাত বা প্রকৃতিগতভাবেই তা হয়ে থাকে। সৃজনশীল হওয়ার এটাই প্রথম এবং প্রধান শর্ত। এরপরে, কবি বা শিল্পী যখন প্রকাশ ঘটাতে যান তার অনুভূতির, তখন তাঁর প্রয়োজন পড়ে ২য় সংকেততন্ত্রের তথা ভাষাবিশ্বের, অর্থাৎ ভাষার মাধ্যমে উপমা, রূপক, প্রতীক ও অপরাপর অর্থালঙ্কারের, শব্দালঙ্কারের…

এই ২য় সংকেততন্ত্রটি যে-কবির বা যে-সৃজনশীলের যত বেশি বিকশিত, ভাষাবিশ্বের ওপর যাঁর যত অনায়াস দখল, তিনি তত নান্দনিকভাবে, তত উচ্চতর চিন্তার আকারে প্রতিফলন ঘটাতে সমর্থ হন তাঁর অনুভূতির, তাঁর উপলব্ধির। বলা বাহুল্য, অভিজ্ঞতা আর অনুশীলনের মাধ্যমেই বিকশিত হয় তাঁর ২য় সংকেততন্ত্র, তাঁর নিজস্ব ভাষাবিশ্ব।

ভাষার নিদারুণ কপটাচার ও কবির জন্য চ্যালেঞ্জ
সমস্যা হলো, অনুভূতি হচ্ছে একটা মনোদৈহিক ক্রিয়াকলাপ, বিমূর্ত ও অন্তর্গত। তাকে কীভাবে অবিকৃতভাবে, সদ্সদ্রূপে প্রকাশ করা যাবে ভাষার মাধ্যমে, শব্দের মাধ্যমে? এমনিতেই শব্দ যেখানে বস্তু বা বিষয়ের বিমূর্ত প্রতীক বা চিহ্নায়ক, তা-ও আবার সেই প্রতীক বা চিহ্নায়ক যার মধ্যে উদ্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়ের স্বভাবচরিত্রের নাই কোনো প্রতিফলন। যেমন, ‘নদী’ শব্দটির ধ্বনিরূপ বা লেখ্যরূপ কোনোটাই প্রকৃত নদী-র মতো নয়। ‘অশ্ব’ বা ‘ঘোড়া’ শব্দের রূপও নয় প্রকৃত ঘোড়া বা অশ্বের মতো। বস্তুত কোনো শব্দের স্বভাবই ওরকমটা নয়, কেবলমাত্র কিছু ধ্বন্যাত্মক বা অনুকারজাতীয় শব্দ ছাড়া।

কিন্তু ধরা যাক, যদি এরকম হতো, নদী কে ‘নদী’ শব্দটি দিয়ে না বুঝিয়ে যদি বোঝানো হতো ‘কুলুকুলু’ বা এমন এক শব্দের সাহায্যে যা শুনে মনে সরাসরি দ্যোতিত হতো নদীর অর্থ ও চিত্র! ঘোড়া বোঝাতে যদি আমরা ব্যবহার করতাম ‘টগবগ-টগবগ’ বা ‘চিঁ-হিঁ-হিঁ…’ বা এই জাতীয় কোনো ধ্বনিসমষ্টি যা ঘোড়ার ক্রিয়াকলাপজনিত ধ্বনিরই অনুরূপ, কিংবা বালু-র নাম যদি ‘বালু’ না হয়ে হতো ‘চিকচিক’ বা ‘কিচকিচ’, তরঙ্গ বা ঢেউ যদি হতো ‘ছলাৎ-ছলাৎ’ কিংবা মৃদু-মৃদু তরঙ্গ যদি হতো ‘ঝিলমিল-ঝিলমিল’, ঝোড়ো হাওয়ার নাম যদি হতো ‘শোঁ-শোঁ’ আর মৃদুমন্দ বাতাসের নাম যদি হতো ‘ঝিরঝির’ কিংবা ‘মিলমিল’, বৃষ্টির নাম যদি হতো মাত্রাভেদে ‘ঝমঝম’, ‘রিমঝিম’ ‘টিপটিপ’, ‘ঝিরিঝিরি’ ইত্যাদি… তাহলে হয়তো প্রকৃত বস্তু বা বিষয়ের সঙ্গে শব্দের কিছুটা হলেও মিল থাকত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ঘটেনি। (অবশ্য সব বস্তু বা বিষয়ের ক্ষেত্রেই কি আদৌ সম্ভব ছিল ওরকম সাযুজ্যময় প্রতিনিধিত্বমূলক ধ্বনিগুচ্ছের উদ্ভব?)

যা হোক, উচ্চারিত বা লিখিত শব্দের সঙ্গে যদি উদ্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়ের থাকত সরাসরি মিল, ধ্বনিগত কিংবা চিত্রগত, তাহলে হয়তো কবির পক্ষে তবু কিছুটা সহজ হতো অনুভূতিকে ভাষায় রূপান্তরের কাজটি। বাস্তবে তা হয়নি। আর এখানেই কবিকে মুখোমুখি হতে হয় এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জের। কবি ঘটাতে চান তার অনুভূতির অবিকৃত সৎ প্রকাশ, কিন্তু বিদ্যমান শব্দ তথা ভাষাব্যবস্থা মোটেই তার অনুকূল নয়। অথচ এই শব্দই কবির একমাত্র অবলম্বন, এ ভিন্ন অন্য কোনো সহায় নাই তাঁর। অপরাপর শিল্পমাধ্যমের মতো তাঁর নাই কোনো দৃশ্য, সংগীত, আলো, আলো-আঁধারি, রং, রেখা, পাত্রপাত্রী, কুশীলব। একমাত্র শব্দই তাঁর অবলম্বন, শব্দই সহায়। সেই শব্দের আচরণও ফের বিমাতাসুলভ।

এরকম এক নিঃসহায় ও নিঃসঙ্গ অবস্থার মধ্যেই কবিকে গ্রহণ করতে হয় শব্দ ও ভাষার ছুঁড়ে দেওয়া সেই চ্যালেঞ্জ। তিনি তাঁর অনুভূতিমালাকে যতটা সম্ভব সৎভাবে ভাষায় রূপান্তর ঘটানোর প্রয়াস পান। এই প্রয়াস আত্যন্তিক। এই প্রয়াস চলে চেতন ও অবচেতনের এক অপরূপ গোধূলিলগ্নে, এক অভূতপূর্ব ঘোরের ভেতর, এক অনির্বচনীয় টানাপড়েন ও দোলাচলের মধ্য দিয়ে। অনুভূতিকে ভাষায় রূপান্তরের এই কৃত্যে কবি কখনো সফল হন, কখনো-বা ব্যর্থ। কিন্তু ব্যর্থতাও ফুটে ওঠে মহৎ ও অপরূপ হয়ে। কবিতার শরীর জুড়ে অলক্ষ্যেই লিপ্ত হয়ে থাকে কবির আন্তরিক রক্তক্ষরণের চিহ্ন।

ভাষার এই নিদারুণ কপটাচার সত্ত্বেও কবিকে ওই ভাষার মাধ্যমেই ঘটাতে হয় তাঁর অনুভূতির প্রতিফলন, ভাষার মাধ্যমেই আকার দিতে হয় নিরাকার অনুভূতিকে, মূর্ত করে তুলতে হয় বিমূর্ত উপলব্ধিকে। আর এটা করতে গিয়ে তাই অনিবার্যভাবেই ভাষার শরীর যায় ফেটে ফেটে। চিড় ধরে ভাষিক শৃঙ্খলায়। লঙ্ঘিত হয় ব্যকরণ, ভেঙে পড়ে স্বাভাবিক যুক্তি ও পরম্পরা। বস্তুত যে কোনো সাধারণ একটি কবিতায়ও আমরা ভেঙে পড়তে দেখি ভাষার ওই প্রথাগত শৃঙ্খলা।

অপৌরুষেয় বলে ভ্রম হয় কবিতাকে, দেশে দেশে, যুগে যুগে
ভাষাকে ফাটিয়ে, বিশৃঙ্খল করে দিয়ে, নেমে আসে কবিতা। ভাষার ভিতরে ঘটিয়ে দেওয়া এক তুমুল রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে কবিতা। ভাষার এক শুদ্ধসৎ আরতিকতার ফসল কবিতা। উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, রূপকে, প্রতীকে, প্রতিমায় আর ভাষা ও যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক নতুন শৃঙ্খলা, এক অভিনব গোধূলিভাষ্য। এ যেন খোদ অনুভূতিরই এক অবিকৃত সৎ প্রতিচ্ছবি, উপলব্ধিরই এক অকপট আলপনা। কবিতা। পরম মমতায় কবি তাকিয়ে থাকেন তাঁর নবজাত কবিতার দিকে। কবির তখন যুগপৎ শান্তি ও সংশয়। এ-শান্তি সৃজনের, এ-শান্তি গর্ভমোচনের- পরম ও অনির্বচনীয়। এ-সংশয় আধ্যাত্মিক- ‘আমিই কি জন্ম দিলাম এই কবিতার, নাকি তা নাজিল হলো এইমাত্র আমার ভেতর?’

কবিতাকে তাই অপৌরুষেয় বলে ভ্রম হয়, হতে থাকে, দেশে দেশে, কালে কালে।

কবিতাও পৌঁছতে চায় সঙ্গীতের মতো সৌন্দর্যের এক নিরাকার নিঃসংজ্ঞ দশায়
চূড়ান্ত বিচারে সব শিল্পই সঙ্গীত হয়ে উঠতে চায়। শিল্প হিসাবে কবিতাও তার ভাব, ভাষা, রূপ, রীতি, শৈলী, ছন্দ সবকিছুকে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে, সবকিছুকে চূড়ান্ত পর্যায়ে দ্রবীভূত করে নিয়ে পৌঁছতে চায় সঙ্গীতের মতো, সুরের মতো, সৌন্দর্যের এক নিরাকার নিঃসংজ্ঞ অনির্বচনীয় দশায়।

নানা ধারা, নানা স্রোত, কবিতার
প্রকৃতপ্রস্তাবে কবিতার কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয় না, তাই তার বিভাগ-বিভাজন করাটাও চূড়ান্ত বিবেচনায় নিষ্ফল। তবু চরিত্রলক্ষণ বিচারের সুবিধার্থে, ধারাকারা বিশ্লেষণের কেজো অজুহাতে করা হয়ে থাকে বিভাজন। বলা বাহুল্য- এই ধারাবিভাজন, এই স্রোত-বিশ্লেষণ, মোটা দাগের।

ধ্রুপদী ধারা
বহু বিষয় আছে যেগুলি সম্পর্কে মানুষের মৌলিক চেতনা শাশ্বত, চিরন্তন। বাৎসল্য, প্রেম, ঈর্ষা, হিংসা, জিঘাংসা, জুগুপ্সা, রিপুতাড়না, বিশ্বাস, সংশয়, অলৌকিকতা, বিয়োগবোধ, স্বার্থ, পরার্থ, মোক্ষ, ঈশ্বরভাবনা, ধর্ম, পুরাণ, নীতিবোধ, জগৎ ও জীবনের উদ্ভব প্রগমন বিলয় পরজগৎ পরজন্ম এসবের রহস্য ও নিহিতার্থ বিষয়ে ভাবনা, অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়র প্রতি ভয় ও রহস্যবোধ, মৃত্যু ও নিয়তির কাছে অসহায়ত্ব, মনোজগতের দুর্বোধ্য বহুবর্ণ ব্যাকরণ, মানুষের বিচিত্র ও ব্যাখ্যাতীত আচরণ…এইসব চিরকালীন বিষয়াদি উপজীব্য করে রচিত হয়ে আসছে কাব্য ও মহাকাব্য, যুগে যুগে। হোমার, ওভিদ, ভার্জিল, হোরেস, কাতুল্লুুস, লাও ৎসু, লি পো, বাল্মিকী, ব্যাসদেব (ধারণা করা হয় ব্যাস কোনো একক ব্যক্তি নন, বরং একটি ম-লী), কালিদাস, দান্তে, ফেরদৌসি, মিল্টন, শেক্সপিয়ার, গ্যেটে…এঁদের কাব্য ও কাজ বিভিন্ন ধ্রুপদী উপাদানে সমৃদ্ধ।

ক্লাসিকো-রোমান্টিক ধারা
ধ্রুপদী বিষয়াদির পাশাপাশি- জীবে প্রেম, পরমে প্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম- প্রেমের এইসব বিচিত্র প্রকাশ, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে পরস্পর-সম্পর্ক পরস্পর-প্রভাব, রোমাঞ্চ, রোমান্টিকতা, রহস্য, বিস্ময়, মরমীয়তা, আধ্যাত্মিকতা, জগৎসংসারের নানা ব্যক্ত-অব্যক্ত উপাদান ও প্রপঞ্চরাশি…এইসব বিষয়ে বিচিত্র কল্পনাবিস্তার, নানা দার্শনিক ভাবনা ও প্রত্যয় রকমারি ছন্দে, বর্ণাঢ্য অলঙ্কারে, কখনো-কখনো কাহিনি-রূপকে, প্রতিফলিত হয়েছে কবিতায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলি, কিটস, বায়রন, ব্লেক, রুমি, সাদি, হাফিজ, খৈয়াম, চ-ীদাস, বিদ্যাপতি, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ…। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও কাজ ক্লাসিক, রোমান্টিক ও আধুনিক এই ত্রিধারার যেন এক উজ্জ্বল স্রোতঃশীল ত্রিবেণিসঙ্গম, নানা ঘরানার যেন এক মার্গীয় পরিবেশ।

ঘরানার নাম কলাকৈবল্যবাদ
পশ্চিমে পুঁজির উদ্ভব ও বিকাশ, শিল্পবিপ্লব, নগরায়ন- এসবের অনিবার্য ফসলরূপে দেখা দিল আধুনিকতা। সেইসঙ্গে প্রকাশিত হয়ে উঠতে থাকল ব্যক্তিবাদ। ব্যক্তিবাদের সেই প্রকাশ ও বিকাশের সাথে কবিতা ঢুকে পড়তে লাগল এক ধরনের অন্তর্মুখিতার জগতে। ব্যক্তিগত সুখদুঃখ, অহংবোধ, প্রেম, যৌনতা, বিষণ্ণতা, মৃত্যুচিন্তা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, আত্মস্বীকারোক্তি, মনোলোকের নানা অলিগলি- এইসব ব্যক্তিক ও অন্তর্জাগতিক বিষয়-আশয়ই হয়ে উঠল কবিতার উপজীব্য, বেশি-বেশি করে। আধুনিক কবিতা (আধুনিকতাবাদী অর্থে) এগুলো থেকেই সৌন্দর্য-নিষ্কাশনে হয়ে উঠল অতিমাত্রায় আগ্রহী।

অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের যে বিচিত্র রঙ্গলীলা, শোভাযাত্রা, তাদের মধ্যে যে ঘর্ষণ ও মিথস্ক্রিয়া আর তার যে ধরন ও ফলাফল, সেসব অবলোকন আর তা থেকে আপনমনে যার যার মতো করে চিত্র দৃশ্য ও প্রতীক উদ্ভাবন ও তথাকথিত বিশুদ্ধ সৌন্দর্য রচনাই হয়ে উঠল আধুনিক কবিদের আরাধ্য বিষয়। একই বস্তু, একই বিষয়, একেকজন কবির আলাদা আলাদা চেতনার রঙে রঞ্জিত হতে থাকল আলাদা-আলাদাভাবে। সেই রং কবি থেকে কবিতে এত আলাদা যে একই জিনিশকে ভিন্ন বস্তু, ভিন্ন বিষয় বলে ভ্রম হতে থাকল। কবিতায় দেখা দিল এক ধরনের নৈরাজ্যিক বৈচিত্র্য। শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের মতো কবিতায়ও চলল নানা পরীক্ষানিরীক্ষা। শিল্প কেবল শিল্পের জন্যই, শিল্প শুধু শিল্পেই স্বয়ম্ভর, স্বয়ংসম্পূর্ণ; শিল্পেই সমাহিত, আত্মহারা; সৌন্দর্যরচনাই শিল্পের একমাত্র দায়- এ-ই হচ্ছে কলাকৈবল্যবাদী শিল্পতত্ত্ব।

সূচিত হলো নানা ইজম- ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, পয়েন্টিলিজম, ভোরটিসিজম, ফভিজম, ডাডাইজম, সাউন্ড পোয়েট্রি, স্যুররিয়ালিজম, ইমেজিজম, ফর্মালিজম, ফিউচারিজম, সিম্বলিজম, ফটোগ্রাফিক সিম্বলিজম, কনফেশনাল পোয়েট্রি, ব্ল্যাক আর্ট ঘরানা…ইত্যাদি নানা কলাকৈবল্যবাদী ঘরানা। কবিদের শিল্পীদের বেশভূষা, চলাফেরা ও জীবনযাপনেও দেখা দিল রংবেরঙের পরীক্ষানিরীক্ষা, নানা রকমের চমক, কখনো কখনো উদ্ভটতা, তাদের লেখালেখি ও শিল্পকর্মের মতোই। কারণ তাঁদের অনেকে তখন ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ঐতিহ্যবিচ্যুতির। আর ঐতিহ্য নেই তো কোনো অতীত নেই, অতীতের দায় নেই, উত্তরাধিকার নেই, ভূমি নেই, কেবলই শূন্যস্থান, অতএব কেবলই নতুন করে শুরু করা শূন্য থেকে। আর এরকম ঐতিহ্যবিচ্যুত দশার মধ্য থেকে নতুন যা-ই করা হবে তা-ই হয়ে উঠবে ঐতিহ্য- এমনটাই ভাবতে থাকলেন তাঁদের অনেকে।

বোদলেয়ারেই প্রথম স্পষ্টভাবে সূচিত হতে দেখা যায় এই অভিনব আধুনিক চেতনা। আর উপর্যুক্ত নানা স্রোতোধারায় বিচিত্র বেগ ও জল জুগিয়েছেন, সেগুলিকে ক্রমে ক্রমে পুষ্ট ও পূর্ণ করে তুলেছেন র্যাঁবো, মালার্মে, ভালেরি, ভের্লেন, রিলকে, গটফ্রিড বেন, ত্রিস্তান জারা, হিউগো বল, আঁদ্রে ব্রেতোঁ, লুই আরাগঁ, পল এলুয়ার, আপোলোনিয়র, উনগারেত্তি, মেরিনেত্তি, পাউন্ড, এলিয়ট, ইয়েটস, ই.ই. কামিংস, এমি লাওয়েল, জেমস জয়েস, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, সিলভিয়া প্লাথ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভূগোলের আধুনিক কলাকৈবল্যবাদী কবিকুল।

বাংলা ভাষায়ও ফলেছে আধুনিকতাবাদের বহু উজ্জ্বল ফসল। সেবের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল জীবনানন্দ দাশের কবিতা। তবে একটি বিষয় উল্লেখ্য- আধুনিকতাবাদের চরিত্রলক্ষণ ধারণ করেও জীবনানন্দের কবিতা যেন বিশেষ ও নির্বিশেষের এক অপূর্ব লীলাঞ্চল, ক্লাসিক ও আধুনিকের এক ব্যতিক্রমী আলো-আঁধারি। তাঁর কবিতায় সমসময় ও চিরসময় এসে যেন মিলেমিশে গেছে কিছু ধূসর কৌণিক বিন্দু বরাবর।

আধুনিক যুগ কবিকে রূপান্তরিত করেছে চিত্তরঞ্জন গোঁসাইয়ে
আধুনিক কবিতা লেখেন এক-একজন ব্যক্তি-কবি, আর তার পাঠক যেন এক-একজন ব্যক্তিপাঠক। পরস্পরের মধ্যে তাদের হয়তো সাযুজ্য-সামঞ্জস্য থাকে, যোগাযোগ থাকে, কিন্তু তা যেন ওই দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরের মধ্যকার সংগতি ও যোগাযোগের মতোই ক্ষীণ ও দূরবর্তী। যেন একজন ব্যক্তি-কবি কিছু ব্যক্তিপাঠকের উদ্দেশ্যে লিখে চলেন রাশি-রাশি চিত্তরঞ্জনী কবিতা। চিত্তরঞ্জনই যেন কবিতার একমাত্র কাজ, যেন তার আর কোনো দায় নেই, স্বপ্ন নেই, উদ্দেশ্য নেই, বিধেয়ও নেই- তা-ও সেটাও কিছু বিদগ্ধ ব্যক্তিমানুষের চিত্তরঞ্জন।

বলা হয়ে থাকে, একজন কবি হচ্ছেন তাঁর সময় ও সমাজের কণ্ঠস্বর। কবি হচ্ছেন তার জনগোষ্ঠীর (ব্যাপক অর্থে মানবগোষ্ঠীর) আবেগ ও বিবেকের উজ্জ্বল আইকন। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আধুনিক যুগে এসে কবিরা যেন হয়ে উঠেছেন এক-একজন চিত্তরঞ্জন গোঁসাই।

কবিতা : সময় ও সমাজের আকাক্সক্ষা, আবেগ ও স্বপ্নের প্রতিধ্বনি
অবশ্য পাশাপাশি সারা দুনিয়াজুড়েই অব্যাহত আছে অপর এক ধারাস্রোত। কেবলই শব্দে শব্দে মিলন ঘটিয়ে, নিরীক্ষা চালিয়ে, কখনো চমক লাগিয়ে, গিমিক খাটিয়ে, প্রতীকের পর প্রতীক, চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প সাজিয়ে নির্লক্ষ্য নিরাশ্রয় সৌন্দর্য রচনা ও চিত্তরঞ্জনের কলাকৈবল্যবাদী ভূমিকা থেকে মুক্তি দিতে তৎপর সেইসব কবিতা। ওইসব কবিতায় ধ্বনিত হয় কবির সময় ও সমাজের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, স্ফূর্তি ও প্রাণশক্তি। প্রতিফলিত হয় সময় ও সমাজের নানা বিচ্যুতি, বিসঙ্গতি। স্পন্দিত হয় জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা, আবেগ ও বিবেক, তার হাসফাঁস ও চাপা আর্তনাদ- ভিনদেশে ভিনকালে বসেও টের পাওয়া যায় সেগুলোর অনুরণন, ওইসব কবিতা প’ড়ে। অনুধাবন করা যায় কেমন ছিল সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন, যাপন ও উদ্যাপন। একইসঙ্গে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক, মাইক্রো ও ম্যাক্রো, অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী বিষয়-আশয়ের এক সুষম সমন্বয়ের নিরন্তর চেষ্টা থাকে ওইসব কবিতায়। তথাকথিত বিশুদ্ধ ও ফলিত কবিতার কৃত্রিম ভেদ ঘুচিয়ে দিতে তৎপর ওইসব কবিতা।

ব্রেখট্, নেরুদা, লোরকা, মায়াকোভস্কি, নাজিম হিকমত, ল্যাংস্টোন হিউজ, এইমে সেজেয়ার, লিওপোল্ড সেংঘর, এর্নেস্তো কার্দেনাল, নিকানোর র্পারা, রোকে ডালটন, নিকোলাস গ্যিয়েন, আবু সাইদ আদোনিস, মাহমুদ দারবিশ, সামিহ আল কাসিম, নজরুল, সুকান্ত… এঁদের কবিতার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এ-ধারা কাব্যবিশ্বাসের কমবেশি প্রতিফলন, যদিও দেশ-কাল-পরিপ্রেক্ষিত সাপেক্ষে কবিতে কবিতে এর প্রকাশ ভিন্ন, প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন।

কবিতার কাজ নীরব অথচ গভীর ও অন্তর্ঘাতমূলক : সমাজের নিচুতলার মানুষদের ভাবকাব্য
আরো এক স্বভাবের কবিতা রচিত হয়ে আসছে দেশে দেশে যুগে যুগে। সেসব কবিতার কাজ নীরব, কিন্তু গভীর ও অন্তর্ঘাতমূলক। প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত। সাধারণত গান আকারে গাওয়া হয় সেইসব কবিতা। এ ধরনের কবিতা বা গান সমাজের নিচুতলার মানুষদের মধ্য থেকে উঠে আসা ভাবুক-সাধকদের দ্বারা রচিত এবং তা গীত হয়ে আসছে সাধারণ্যে যুগ যুগ ধরে। এইসব কবিতা বা গানের মাধ্যমে মূলত তারা ভাব বা দর্শনের চর্চা করে থাকেন।

ক্ষমতাকাঠামো সমাজের ওপর যেসব অন্যায্য ও বিভেদমূলক প্রথা ও সংস্কার চাপিয়ে দেয়, সেগুলোকে ভেতর থেকে কুরে-কুরে অসার করে তুলতে চায় এইসব কবিতা ও গান। নীরবে রূপান্তর ঘটাতে থাকে জনগোষ্ঠীর ভাবপরিম-লে। তিলে তিলে বিনাশ ঘটাতে থাকে সমাজের ভেতরে তৈরি-হওয়া নানারকম বিভেদবুদ্ধির বীজাণুর। বিচিত্র ভেদবুদ্ধির প্রাদুর্ভাব ঘটে সমাজে- সাম্প্রদায়িক, আঞ্চলিক, ধর্মীয়, লৈঙ্গিক, জাতিগত, বর্ণগত…। এছাড়াও আছে প্রাণ ও প্রকৃতির মধ্যে ভেদবুদ্ধি। মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে ভেদবুদ্ধি। বস্তুত সমস্ত ভেদবুদ্ধির মূলে রয়েছে মানুষের ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে, বৃত্তিসমূহের মধ্যে ভেদবুদ্ধি। যখন থেকে মানুষ তার বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মধ্যে, বিভিন্ন বৃত্তির মধ্যে বিভেদ করতে শুরু করল, ইন্দ্রিয় ও বৃত্তিগুলির সুষম বিকাশ না ঘটিয়ে ঘটাতে থাকল সেগুলোর অসম উন্নয়ন, তখন থেকেই সূচনা নানা ধরনের বিভেদবুদ্ধির। কালে-কালে ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে দর্শনেন্দ্রিয় এবং বৃত্তিসমূহের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিকে সর্বেসর্বা করে তোলা হলো। তারপর ক্ষমতা ও বুদ্ধি চলতে থাকল পরস্পর মিথোজীবিতায়।

ক্ষমতাকাঠামোর নানারকম অভীপ্সা কায়েমের লক্ষে সমাজে চাপিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন বিভেদবুদ্ধিমূলক প্রথা, কানুন ও সংস্কার। আর ক্ষমতাকাঠামোর দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানারকম ধারাবাহিক চাপ ও প্রভাবের কারণে জনগোষ্ঠী সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে মেনেও নেয় একপর্যায়ে।

এইভাবে একদিকে সমাজে তৈরি হয় নানারকম ভেদবুদ্ধির শর্ত, অন্যদিকে ভাবুক-সাধকরা তাদের কথা, কবিতা ও গানের মাধ্যমে, তাদের ভাবচর্চার মাধ্যমে, ভেতর থেকে সেইসব শর্তকে প্রতিনিয়ত অসার করে দেবার প্রয়াস চালান। আগেই বলেছি, এ-জাতের ভাবুক-সাধক-কবিরা সাধারণত উঠে আসেন সমাজের নিচুতলার মানুষদের মধ্য থেকে। তাদের এইসব কবিতা বা গান কণ্ঠ-, শ্রুতি- ও স্মৃতি-নির্ভর। আর নিচুতলার মানুষদের ভাব ও সংস্কৃতির মধ্যে বিরাজ করে এমন কিছু উপাদান, যা অনিবার্যভাবে হয়ে উঠতে চায় সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের ভাব ও সংস্কৃতি, হয়ে উঠতে চায় সর্বজনীন, বিলয় ঘটাতে চায় সমাজের নানারকমের ভেদবুদ্ধির শর্ত ও সম্ভাবনা।

আরো একটা কাজ করে এইসব কবিতা বা গান। ধর্মসংস্কৃতির মধ্যে বাস করে ধর্মসংস্কৃতির ভাব ও ভাষা দিয়েই সমাজে আচরিত বিভিন্ন ধর্মতত্ত্বের দৈবী ভাব, দৈবী বেশবাস আস্তে আস্তে খুলে ফেলে দিয়ে সেগুলির সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক রূপান্তর ঘটানোর কাজ করে এরা। এই রূপান্তর ইতিবাচক। সমাজে চর্চিত নানা ধরনের ভাব ও সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এইসব কবিতা বা গান। এরা সবসময়ই তা-ই করে আসছে।

নানারকম গোঁড়ামি ও ভেদবুদ্ধির বীজাণুবিনাশের ক্ষেত্রে অনেকটা বীজাণুনাশকের কাজ করে তাদের এই ভাবচর্চা, তাদের এইসব দর্শন-ঋদ্ধ কবিতা বা গান। কারণ আমরা জানি কবিতা জেগে ওঠে ভাবে. ভাষায়, রূপকে, ছন্দে। তার ওপর এই ধরনের কবিতায় সহজাতভাবেই যুক্ত থাকে সুর ও সঙ্গীত। আর এ কথা তো স্বতোসিদ্ধ, মানুষের ওপর ছন্দ, অলঙ্কার ও সঙ্গীতময় ভাষ্যের প্রভাব অনেক বেশি গভীর এবং স্থায়ী। সমাজে এইসব কবিতা বা গানের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষেই নীরব ও অন্তর্ঘাতমূলক। প্রভাব ব্যাপক ও দূরপ্রসারী।

ভারতবর্ষে ভক্ত কবীর, দাদূ দয়াল, বুল্লা শাহ, বাংলা-অঞ্চলে ফকির লালন শাহ, কুবির শাহ, দুদ্দু শাহ, পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ, জালালউদ্দিন খাঁ, রাধারমণ দত্ত, কবিয়াল বিজয় সরকার, ভবা পাগলা, মিয়াজান ফকির, আব্দুল হালিম, খালেক দেওয়ান, রাজ্জাক দেওয়ান প্রমুখ জানা-অজানা অনেক ভাবুক-সাধক-কবি চর্চা ও সাধনা করে আসছেন এইসব গুরুত্বপূর্ণ কাব্যধারার, যে-কাব্য একাধারে কবিতা, গান ও দর্শন। পৃথিবীর অপরাপর ভূগোলগুলিতেও নিশ্চয়ই, অতি-অবশ্যই, চর্চিত হয়ে আসছে এ-জাতীয় কাব্য। কিন্তু দুনিয়া জুড়ে অধিপতি শ্রেণির এই যে আধুনিকতাবাদ, উত্তর-আধুনিকতাবাদ, এদের দোর্দ- প্রভাব-প্রতিপত্তির চাপে দমিত হয়ে রয়েছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই কাব্যধারা। তবে এখন কোথাও কোথাও বেশ জোরেসোরে উঠে আসছে, বিকশিত হয়ে উঠছে এইসব জাতের কাব্যঘরানা।

কবিতা তথা শিল্পের পরম্পরা ও প্রাসঙ্গিকতা:
সময়ের সাথে বদলে যায় সমাজ-পরিস্থিতি। বদলায় ভাষা। বদলে যায় বয়ান। চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও উন্মেষ ঘটে নতুন নতুন দিগন্তের। স্বভাবতই বদলে যায় সংবেদনাও। অবশ্য এই বদলে যাওয়ার মধ্যে থাকে একটা যোগসূত্র, একটা ধারাবাহিকতা। পরিবর্তনশীল সমাজ-পরিস্থিতির সাথে শিল্পকলাও তার যোগসূত্র ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই এগিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। অনেকটা সোপানবিন্যাসের মতো। সোপানের যে কোনো একটি ধাপের ভিত্তি যেমন তার অব্যবহিত আগের ধাপসহ পূর্ববর্তী সমস্ত ধাপ, শিল্পকলার ক্ষেত্রেও তেমনি পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাজসমূহ হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাজের ভিত্তিভূমি। নতুন প্রজন্মে শিল্পসোপানের নতুন যে ধাপটি নির্মিত হয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সংবেদনা। অতএব, পূর্ববর্তী কাব্যকৃতি-সম্ভারকে ভিত্তিভূমি ধরে নতুন সংবেদনা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ভাবকে অপেক্ষাকৃত নতুন আধারে অর্থাৎ নতুনতর স্বর-সুর-ভাষা-শৈলীতে উপস্থাপন করে নতুন প্রজন্ম। এখানে অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ যুক্ত থাকে, তা হলো কবির নিজস্ব সৃজনপ্রতিভা, তাঁর প্রাতিস্বিকতা, সেইসঙ্গে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টিও ।

কবিতা বা যে কোনো শিল্পবস্তু যা করে তা হচ্ছে– সমকালের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে নিয়ে নিজেকে ভবিষ্যতের সওদা হিসাবে তুলে দেয় প্রবহমান কালের গাড়িতে। এখন, কোন সওদা কালের গাড়িতে কতদূর যাবে, তা নির্ভর করবে কোন মাত্রায় কতটুকু সর্বজনীনতা বা কালান্তরগম্যতা-গুণ আছে সেই সওদার ভেতর।

আজ ও আগামীকালের কবিতা
সমসময়ের সংবেদনকে, স্পন্দনকে, আগামীদিনের সওদা করে কালের প্রবাহে তুলে দেওয়া কবিতার কাজ। আজকের সংবেদন ও স্পন্দনকে আগামীকাল অবধি এগিয়ে দেওয়া, বাড়িয়ে দেওয়া, কবিতার অভীষ্ট। এখন দেখা যাক, আজকের বাস্তবতা থেকে আগামীকালের কবিতা সম্পর্কে কোনো ইশারা পাওয়া যায় কিনা। এ-প্রবন্ধের শুরুর দিকে কবিতার বিকাশ, বিবর্তনের বিষয়ে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলাম কবিতার ওপর মুদ্রণপ্রযুক্তির একটি প্রভাবের কথা। সেটি ছাড়াও আরো একটি বড় ধরনের প্রভাব আছে এই প্রযুক্তিটির। এই মুদ্রণপ্রযুক্তিই সম্ভব করে তুলেছিল গদ্যভাষার উৎপত্তি ও তার ব্যাপক বিকাশ। গদ্যের সেই বিকাশ আবার সম্ভব করে তুলল চিন্তার অভূতপূর্ব বিকাশকে, সম্ভব করে তুলল ভাব ও দর্শনের নানা অঞ্চলের উন্মোচন ও প্রসারণ। চিন্তা ও মননের জগতে এক অভূতপূর্ব বিপ্ল¬ব ঘটল এই মুদ্রিত গদ্যভাষার বদৌলতে। কারণ গদ্যই চিন্তার বাহন। আর এ-পর্যায়ে এসে কবিতাকে নামতে হলো গদ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। গদ্যের সাথে সাথে কবিতাকেও নিতে হলো চিন্তা ও দর্শনের বাহনের ভূমিকা।

কবিতা দর্শনের আগে-আগে-থাকা একটি শিল্পপ্রপঞ্চ। এটি সবসময় তা-ই ছিল। একটি কালপর্বের কবিতার মধ্যে আগাম পাওয়া যায় সেই কালের অস্ফুট ও স্ফুটমান বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শনের রূপরীতি, তাদের নানারকম উদ্ভাস। একটি কালখ-ের মধ্যে জন্ম-নেওয়া কাব্যসমুদয়ের বিপুল হাঁড়িতে ফুটতে থাকে, আকার পেতে থাকে, সেই সময়কালের নানা ভাব ও দর্শন।

এখন এই কালপর্বে, এই দ্রুত বদলপ্রবণ সমাজ-বাস্তবতায়, চিন্তা ও দর্শনের বিস্ফোরণের এই যুগে, কবিতা আরো বেশি-বেশি করে জড়িয়ে পড়তে চায় সমসময়ের বিভিন্ন স্ফুট-অস্ফুট চিন্তা, ভাব ও দর্শনের সম্ভাবনাকে কবিতায় আগাম ধরে ফেলার কাজে। চিন্তা ও দর্শনের জগতে যখনই যে-নতুন উদ্ভাস দেখা দেয় তখনই কবিতা সেগুলিকে আগাম আটকে ফেলতে চায় উপমা-প্রতিমায়, রূপকে-প্রতীকে, আভাসে-ইশারায়- গদ্য হয়ে নয়, কবিতার নিজস্ব স্বভাবকে বজায় রেখেই, তার মায়া ও ম্যাজিককে অক্ষুণ্ণ রেখেই। বলা বাহুল্য, মানুষের ওপর রূপক-প্রতীকের ম্যাজিকময় ভাষার প্রভাব গভীর ও স্থায়ী।

কবিতা : চিরপ্রাসঙ্গিক, অপ্রতিরোধ্য
যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন থাকবে তার আবেগ, অনুভূতি, সংবেদনা। ততদিন থাকবে কবিতা। বহির্জগতের নানা ঘটনাসংকেতে আলোড়িত হবেন কবি, সেগুলির ছাপ পড়বে তার চেতনায়, তৈরি হবে সে-সংক্রান্ত অনুভূতি আর সেই অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাবেন তিনি কবিতা লিখে। আর মানুষ যেহেতু থাকবে সংবেদনশীল, অনুভূতিপরায়ণ, তাই সে পড়বে সেই কবিতা।

দ্রব্যগত কোনো মূল্য নাই কবিতার। ভবিষ্যতে খোদা-না-খাস্তা মানুষ যদি কখনো হয়ে পড়ে নিরঙ্কুশ দ্রব্যের দাস, দ্রব্যমূল্য নাই অজুহাতে কিংবা উল্টিয়ে দিতে পারে দ্রব্যতন্ত্রের গণেশ এই ভয়ে যদি কোনোদিন নিষিদ্ধও করে দেওয়া হয় কবিতাকে, সম্ভবত তারপরও থেকে যাবে কবিতা। মানুষ হয়তো তখনো, কবি রণজিৎ দাশের ভাষায়, ‘শহরের পাশে ফেলে রাখা ভাঙা অতিকায় টেলিভিশন বাক্সের মধ্যে বসে মাফিয়া, মগজ-ব্যাংক আর রোবট-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লিখে যাবে কবিতা’, গেরিলা কায়দায়, পড়তে থাকবে কবিতা। বেরিয়ে আসবেই কবিতা যে কোনো বন্দিদশা থেকে, যে কোনো দমন-দলন উপেক্ষা করে- হয়তো ভিন্ন ভাব ভাষা রূপরীতি নিয়ে, কখনো ত্রুবাদুর কখনো বাউল কিংবা অন্য কোনো রূপে (অতীতে যেমন দেখেছি), কিন্তু বেরিয়ে সে আসবেই।

পরিশেষ:
কবিতা একটি শিল্পমাধ্যম। অপরাপর সৃজনশীল শিল্পমাধ্যমের মতো এটিও একটি সৃজনশীল মাধ্যম, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম। কারণ, মানুষের অনুভূতির ও উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রতিফলন ঘটে কবিতায়, আর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধি একজন সৃজনশীল শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি।

শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি। আগেই বলছি যে, একজন শিল্পীর ফার্স্ট সিগনালিং সিস্টেম থাকে শক্তিশালী। কবিদের, শিল্পীদের ইন্দ্রিয় থাকে নিত্যজাগর, সদাপ্রখর। বাইরের জগতের যে-কোনো সংকেত- হোক তা সুখের কিংবা অসুখের, আনন্দের কিংবা ব্যথার, ভয়ের বা নির্ভয়ের, হোক সে-সংকেত উত্তাল কিংবা নিস্তরঙ্গ, লাউড কিংবা হাস্কি কিংবা মাফল্ড- সবচেয়ে আগে ধরা দেয় শিল্পী তথা কবির অ্যান্টেনায়। সাড়া তোলে তাঁর সংবেদী চেতনায়, তৈরি হয় সে-সম্পর্কিত অনুভূতি ও উপলব্ধি। আর যেহেতু কবি সৃজনশীল, তাই তাঁর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধির অকপট প্রতিফলন তিনি ঘটাতে চান এমন এক কাব্যিক জগৎ তৈরির মধ্য দিয়ে, এমন এক প্রকৃতি-সৃজনের ভেতর দিয়ে যে, সেই জগৎ, সেই প্রকৃতি এই প্রচলিত জগতের বস্তু-বাস্তবতা, শব্দ-নৈঃশব্দ্য দিয়েই গড়ে ওঠে বটে, কিন্তু গাঁথা হয়ে ওঠে এক ভিন্নতর সম্পর্কসূত্রে, বিন্যস্ত হয় যেন এক অপ্রাকৃত বিন্যাসে, এক আপাতছদ্ম যুক্তিসিলসিলায়।

এজন্যই, কবি যা সৃষ্টি করেন তাকে বলা হয় ‘বিকল্প নিসর্গ’, ’বিকল্প প্রকৃতি’, যেখানে খেলা করে অন্য আলো-ছায়া, অন্য মেঘ-রোদ্দুর- ভিন্ন চালে, ভিন্ন লজিকে। প্রথাগত যুক্তিশৃঙ্খলার গভীর বিপর্যয় সাধনের মধ্য দিয়ে কবি রূপায়িত করে তোলেন এক প্রায়-অলৌকিক নৈরাজ্যবিন্যাস। তারপর তার সেই স্বরচিত বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকে সৃজন করতে থাকেন ভিন্নতর এক নান্দনিক শৃঙ্খলা, এক ভাষাতীত ভাষাপ্রপঞ্চ। শৃঙ্খলা ভেঙেচুরে নতুন শৃঙ্খলা। ‘অর্ডার অব ডিসঅর্ডার’-এর গণিত… গণিতের উচ্চতর লীলাকলাপ।

এবং এই ‘বিকল্প প্রকৃতি’ সৃষ্টির যে-রসায়ন, তাতে অবলীলাক্রমে, এক অকপট বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সংশ্লেষ ঘটে নানা ছন্দ ও স্পন্দন, প্রতিমা ও প্রতীক, উপমা ও রূপকের। আর মানুষের মনের ওপর ছন্দ-স্পন্দন, প্রতিমা-প্রতীক, উপমা-রূপকমেশানো ভাষার অভিঘাত সবসময়ই হয় তীব্র ও কার্যকর। ভালো কবিতা তাই ছুঁয়ে যায় পাঠকের যুগপৎ হৃদয় ও মনন, দুলিয়ে দেয় তাকে, হন্ট করে চলে প্রতিনিয়ত। একটি উৎকৃষ্ট কবিতা কোনো-না-কোনোভাবে ছাপ ফেলেই যায় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে।

এগুলি তো আছেই, কবিতার গুরুতর ভূমিকা অন্যত্র। কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে, যে-শব্দরাশি একটি জনগোষ্ঠির ভাষার অন্তর্গত, যে-ভাষা ফের যৌথের সম্পদ। আর ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল, স্থিতিস্থাপক, সৃজনমুখর ও সৃষ্টি-উন্মুখ দিকগুলি নিয়েই কবিতার কারবার। শব্দের প্রচলিত, অভিধানসিদ্ধ অর্থেরও অতিরিক্ত, সম্প্রসারিত ও নব্য অর্থের সম্ভাবনাকে ক্রমাগত উসকে দিতে থাকে কবিতা। টালমাটাল করে দিতে থাকে শব্দের প্রথাগত অর্থ, উৎপাদন করে নতুন-নতুন অর্থ। ভাষার বিভিন্ন সুপ্ত শক্তি ও সম্ভাবনাকে বিচিত্র ধারায় উন্মোচন করে করে এগিয়ে চলে কবিতা।

‘পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ইউজ অব ল্যাংগুয়েজ।’ মানুষ ভাষিক প্রাণী; সমাজ একটি ভাষাবদ্ধ ব্যবস্থা। আর কবিতা সেই ভাষার মধ্যে ঘটিয়ে দেয় এবং নিত্য জারি রাখে একধরনের বৈপ্লবিক অন্তর্ঘাতের ধারা, নীরবে-নীরবে, আস্তে-আস্তে, গেরিলা কায়দায়। আর এভাবে প্রতিনিয়ত ঝাঁকুনি-খেতে-থাকা ভাষার মধ্য দিয়েই ঝাঁকুনি খায় সমাজের নানা ক্ষেত্রের স্থিতাবস্থা, রক্ষণশীলতা। কবিতা ঢেউ তোলে ভাষার সাগরে আর সেই ঢেউয়ের ধাক্কা গিয়ে লাগতে থাকে সমাজে প্রচলিত নানা প্রথা ও মূল্যবোধে। কবিতার কাজ এক্ষেত্রে নীরব, অন্তর্ঘাতমূলক। আপাতদৃষ্টিতে, বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু কাজ চলে নীরবে, ভেতরে-ভেতরে। আর বলাই বাহুল্য, এই অন্তর্ঘাত সদর্থক। এই অন্তর্ঘাত ইতিবাচক।

বাঞ্ছা, শুভানুধ্যান
জয়তু কবিতা।

 


মাসুদ খান

মাসুদ খান

মাসুদ খান। কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী।

প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় বুয়েটের হল ম্যাগাজিনে, ১৯৭৯-তে। জাতীয় পর্যায়ে লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে মধ্য-আশি থেকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্রিকায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সাহিত্য-পত্রিকায় ও কবিতা-সংকলনে।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :

পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩)
নদীকূলে করি বাস (২০০১)
সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)
আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১)
এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)
দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)
প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬)

ই-মেইল : masud_khan@yahoo.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E