৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২১২০১৬
 
 ২১/১০/২০১৬  Posted by
কবি মামুন মুস্তাফা

কবি মামুন মুস্তাফা

কবি পরিচিতি

মামুন মুস্তাফা। জন্মঃ ৩ জুলাই, ১৯৭১। জন্মস্থান: বাগেরহাট। যোগাযোগঃ বিসিসিপি, বাড়ি: ৮, সড়ক: ৩, ব্লক: এ, সেকশন: ১১, মিরপুর, ঢাকা ১২১৬। পেশাঃ একটি গবেষণামূলক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কাব্যগ্রন্থঃ

সাবিত্রীর জানালা খোলা (১৯৯৮); কুহকের প্রত্নলিপি (২০০১; দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৯); আদর্শলিপি : পুনর্লিখন (২০০৭); এ আলোআঁধার আমার    (২০০৮, কলকাতা সংস্করণ ২০১৪); এ বদ্বীপের কবিতাকৃতি (২০০৯); পিপাসার জলসত্র    (২০১০); শিখাসীমন্তিনী     (২০১২); একাত্তরের এলিজি (২০১৩); শনিবার ও হাওয়াঘুড়ি (২০১৫)।

প্রবন্ধগ্রন্থঃ মননের লেখমালা (২০১২); অন্য আলোর রেখা (২০১৬)।

সম্পাদনা: লেখমালা একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্যকাগজ ২০১৫ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।

ইমেল: mmustafa72@gmail.com

মোবাইল: ০১৭২৬৭০২৮৪৬

 

মামুন মুস্তাফার কবিতা ভাবনা

কবিতা, আরোগ্য হাসপাতাল

কবিতা কী প্রার্থনার সঙ্গীত? এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার থেকে বরং এটাই মেনে নেয়া শ্রেয় যে, মানুষের মনের ভেতরে আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের না বলা গুমরে ওঠা কথার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হলো কবিতা। মূলত সমাজ, রাষ্ট্র এবং এর চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ আর মনোজাগতিক ক্রিয়া থেকেই কবিতার উদ্ভব। বলা যায়, কবি তাঁর অন্তর্গত তাগিদ থেকে কবিতা লেখেন। আর কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে কবিতাই যথেষ্ট। এতে কবির কোনো দায়বোধ থাকে না। কেননা পূর্বেই বলেছি কবিতা গড়ে ওঠে চারপাশের আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাযুজ্যে।

তবে এ কথা সত্য যে, কবিতা আমাকে শুশ্রুষা দেয়। সকল প্রকার অবসাদ, হতাশা আর বেদনা থেকে সে আমাকে মুক্তি দেয়। সেরকম একটি কবিতা লেখার পর সংসারযাত্রার সমস্ত গ্লানি থেকে যেন অবমুক্ত হই, এমনকি জীবনের ভার থেকেও। আসলে কবিতা বিমূর্ত, তাকে মূর্ত করতেই কবির যত প্রচেষ্টা। একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিতার অধিবাস। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের না বলা অংশটুকুই কাব্যভাষায় প্রতিফলিত হয় সনতারিখের নির্দিষ্ট সীমারেখায়। সৃষ্টিশীল মানুষ তার মৌলিকত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কবিও তার ব্যতিক্রম নয়। তেমনই আমার কবিতার পশ্চাতে কাজ করে মৌলিকত্ব। আর তাই প্রচলিত রীতিনীতি, আচার-প্রথা, বিশ্বাসকে অস্বীকার করে নয় বরং এগুলোর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সাক্ষী করেই গড়ে ওঠে আমার কবিতা। সর্বোপরি ব্যক্তি আবেগ, উত্তাপ, অনুভূতি-বোধ থেকে কবিতা জন্ম নিলেও সৃষ্টিশীল কবিতা চিরকাল মুক্ত মানবতার সপক্ষে, এ এক আরোগ্য হাসপাতাল।

 

মামুন মুস্তাফার কবিতা


কবিতাশিল্প

দ্রাক্ষারসে মিশিয়ো না ঘৃণার কজ্জ্বল
সম্মুখ শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে জীবনশত্রু
তাকে আসন দেবে না? শানকিতে শাদা জুঁই?
টলমল অমৃত মাটির খুরিতে।
চন্দন বৃক্ষের নিচে শুকিয়ে শুঁঠ হয়ে
শুয়ে আছে কবি…
তার পায়ের কাছে লতাশাপ কুট কুট করে কাটে
লোকসংস্কৃতির শিকড়।
পানিফলের পাতা ছুঁয়ে আসা বাতাসকে বলো
দুদণ্ড বসুক এখানে, ক্ষতি নেই।

 


প্রতিমানগর

বৃষ্টিক্ষত লুকোছাপা প্রতিমানগর
মগজের কোষে উঁকি দ্যায় শিল্পতরু
সলজ্জ ঘুঙুর বাজে নিষিদ্ধ পল্লীতে
লতাশিল্পে বাস করে পানখ গোক্ষুর
বনপাতা পুড়ে যায় কালধুনি রাতে
বাদাড়পায়ে ছুটে আসে ঘাইহরিণী
পরকীয়া পথে পড়ে থাকে বর্জ্যবীর্য
তাকে ছেনে শিল্প গড়ে ধুনীর কঙ্কাল।

 


নিষিদ্ধ নারী

তোমার আঁচলে এখন নিষিদ্ধ নারীর ঠোঁটের ভাপ
গণিকালয়ের ভিত ফুঁড়ে উঠেছে দুধশাদা ভাঁটফুল
আর শোনো লম্পট হাওয়ার পদধ্বনি আলপথে
পথ থেকে আলিসায়–আলিসা থেকে–আঃ!
সারাদিন উপোসী শ্মশানবন্ধু খুঁড়িয়ে চলেছে,
ভ্যালা রে নাগর!
দরজার চৌকাঠে সংসারী বউয়ের ছবি,
আর তার স্তনদুটি টাটিয়ে উঠেছে অপত্য পিপাসায়।

 


বিশুদ্ধ কবর

সারারত মাটি কাটার শব্দ
কোদাল উঁচুতে ওঠে ভূতলে নামে
চারদিকে শুনশান অন্ধকার
বাঁশের মাথায় ঝোলে হ্যারিকেনের আলো
মাঝে মাঝে ঠন করে শব্দ হয়
প্রত্নকরোটির সাথে কোদালের সখ্যতা বাড়ে

সারারাত পাশ ফিরে শোয়া
মাথার ভেতরে কাঁচপোকার হাঁটাহাঁটি
আগামী ভোরের আগে শেষ হবে গোরখনন
জীবনের দিকে ধেয়ে আসে বিষাক্ত সাপ
সংসারবিষে লতিয়ে ওঠা শরীর এখন
শুদ্ধি পেতে চায়
নিজহাতে খনন করা বিশুদ্ধ কবরে

 


দেহচূর্ণ

এখানেই ছিলে তুমি, ঠিক এইখানে,
হাত রাখো। দ্যাখো তার অনুভূতিটুকু।
জ্যামিতিক কম্পাসে গাঁথা কষ্টের দানা।
সেই বয়সী মুখ জোলো, শিরাধমনী
অশ্বত্থ হয়ে ফুটে থাকে কার্নিশে, ছাদে।
এখানে পা রাখো ধীরে। গোসাপ দরজা
মুখে। উত্তরণের বাঁকে বাঁকে যে দেহ
তুমি হারিয়েছো তার ফসিল এখানে
আজো রয়ে গেছে! তাকে যত্নে ছেঁকেছুঁকে
অমরত্ব দ্যায় অই বিষাক্ত গোক্ষুর।
তোমারও জীবননির্মিতি এইখানে-
এই পতিত মাটির নিবিড়গহ্বরে!
তাকে সাথে নিয়ে চলো।

 


বীজমন্ত্র

ভোগবৈরাগ্যে বাঁধা দেহ মজে পরনারী শরীরে
কে সেই অসূর্যম্পশ্যা?
পরকীয়া পথে পথ চলে লতাসাপ হয়ে!
কুট কুট কেটে চলে নিবিড় বসতি,
দেহনাশ…কুলটাসময়… পচনশীল মাটি
কার কাছে কে শোধে রক্তঋণ?

পারে না ধুলোবালি সংসার নিমগ্ন হতে
জাতশিশু হামাগুড়ি দ্যায় দক্ষিণা পাবে বলে!
রগচটা বাতাস…হাওয়ার ওড়াউড়ি…বিরান জমি
চিতার আগুন ডাকে সোহাগী ঢঙে, আয়…আয়…
তারও আগে মাটিচাপা পড়েছে বীজমন্ত্র।

 


আত্মহত্যা

কিশোরীর গুম হওয়া কাকে বলে?
শহরের খুব কাছে যখন ভোর হচ্ছিল
রাতের মদিরতা তখনও শরীরে,
সেই আবেশ নিয়ে
স্নানঘরে কাপড় খোলার শব্দ,
দেহের বন্ধুর ভাঁজ গড়িয়ে নামে জলফোঁটা।

সূর্য দূরনিকট থেকে আলো দিচ্ছিল

তালগাছে মৃত কিছু বাবুইয়ের বাসা
আর বন্ধ্যার জরায়ুতে মাতৃত্ব লুট হয়,
পিতাকাহিনী শহরের কানাগলিতে
পড়ে থাকে কাকেদের মৃত রবের মতো।

তবুও উদিত সূর্য ধীরে ধীরে মুছে নেয়
গণিকাশহরের মাতাল রাত্রি।

 


যবনিকা

এই মাত্র চলে গেলো আলো।
লোডশেডিং-এর ছায়া
বালিকার কিশোর শরীরে তির তির করে কাঁপে।
উল্টোডাঙার দিকে বয় নদীর জল,
কে বা কারা ঝোড়ো রাতে বয়ে নিয়ে যায়
কিশোরীর নিষ্পাপ নিঃশ্বাস।

তুমি ঝড় শেষে
ভণ্ডুল শহরের ধসে যাওয়া
প্রাচীরে না হয় বোসো।
দেখবে তরুণীর পরিচ্ছদ নীল যবনিকায় ঢাকা!
এখানে জীবন নেই। তবু সমাগম পাবে।

এক বেদনাগুচ্ছ আঙুরের বন।
আর কিছু সুতোয় বোনা নক্ষত্র।

 


কণ্ঠিনালার পাড়ে

মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে কণ্ঠিনালার পাড়ে
ওকে হাত ধরে নিয়ে এসো কেউ
চৈত্রসংক্রান্তির আগে।
নইলে মরে যাবে অন্তঃসলিলা নদী
পুড়ে যাবে শস্যক্ষেত,
ধনেশ্বরের ঠোঁটে পাবে না একটিও ফলবান বীজ।

মাছরাঙা বক কণ্ঠিনালার হাড় গেঁথে নিয়ে যায় ঠোঁটে
কপিলার শ্রোণীহাড় যেমন নিয়েছে বণিকপুঁজির দাঁত
কে পাতে ওখানে রাত্রির ক্যাম্প মেয়েটির জীবন ঘেঁষে?
অবশিষ্ট শুধুই শরীরাংশ, ঈষৎ বাঁকা-
পশ্চিমগামী সূর্যের নিভে আসা রোদে
চুম্বনের গাঢ় মসীলেপ।

মেয়েটিকে দেখোনি কেউ কণ্ঠিনালার পাড়ে?
পড়োনি তার শাড়ির নিপাট ভাঁজে দেহকথা?

স্বামীর চিতায় সহগামিনীর মতো সতী

 

১০
বালিকামুখ

কবরের ঘাসে মুখ লুকোয় মেয়েটি
আধখানা মুখ তার অধখানা চাঁদ।
পৃথিবীর মুখ আঁচড়ানো নখে তার
আধখানা নখপালিশ। সমাধিমাটি
বুকে চেপে জেগে ওঠে ঈশ্বরের পুত্র
নির্মাণে। মাটি লেপা দাওয়ায় সংসার
ছিলো। হামাগুড়ি দিতো কাঁসার বাসন।
আমি জানু পেতে ভাঙা কবরে হাড় ও
করোটির সিথানের পাশে বসি। দেখি
পৃথিবীর যত সুন্দর জড়ো হয় ঐ
গ্রহণলাগা পিপাসার্ত বালিকামুখে।

 

১১
মৌনতার হাঁস

দারিদ্র্যবাড়ির লেকে সাঁতার কাটে গুটিকয়েক মৌনতার হাঁস
গুণটানা মাঝির হাতের রেখার মতো যে জীবন, তারও
কিছু জটিলতা আছে…থাকে,
নদীও জটিলতা জানে, নতুবা
মাছেরা লুকতো না পানির নিচে।

মৌলিদির দেহে পেঁচানো শাড়ির মতো কিছু জটিলতা
নইলে মানুষ কি ভাবে টিকিটকাউন্টারে কিউ দেবে?

আর ওই যে গুটিকয়েক মৌনতার হাঁস
এবং তার নিবিড় জলবিলাস
সেখানে মৌলিদির গোপন শাড়ি
ধুয়ে নেয় দারিদ্র্যবাড়ির কনিষ্ঠ পুরুষ।

 

১২
পিতার মুকুট

আলো, ধাবমান – আঁধার, এই যে তমস-
ছুঁয়ে দেখো, বিশালতার ওপারে দাঁড়িয়ে
আজন্মপিতা- আমাকে খনন করে তোলে
তার সকল অস্তিত্ব। পাঁজরের ঘুমে বাঁধে
স্বপ্ননীড়;- ভবিষ্যত দুলে ওঠে কাহারবা
তালে! জীবনের সমান চুমুক শেষে-
জেনে যাই ওই বুকের জমিনে
খেলা করে এক পতিত এস্রাজ। সেই
পিতার আঙুলে দেখি নিভে আসে
দিনের আলো – ক্রমশ ঘন হয়
নিয়নবাতি- ছিনিয়ে আনি পিতার মুকুট,
বিবমিষার করতলে!

 

১৩
নক্ষত্র-কনসার্ট

উজানে উজানে কেটে গেছে সারা বেলা
পক্ষকালব্যাপী মাথার ওপরে উড়ছে
একটি শকুন, আসশ্যাওড়ার ডালে উপকথা

রঙিণ খুনের জমি খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে
এলো আধখানা চাঁদের শহর, তোমারও
বাঁশি, যে বীণা ভাঙে সংসারের কোরক

আজ এই শ্যাওড়ার ডালে শ্রমণ-রমণে
বাজে টুকরো টুকরো চাঁদের কণা-
নক্ষত্র-কনসার্ট

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E