৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ০৫২০১৭
 
 ০৫/০৮/২০১৭  Posted by

মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’
– অধ্যাপক শীতল চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী

দেশে-দেশে যখনই স্রষ্টার কলম নিয়ে নতুন পথের পথিক হতে চেয়েছেন যে সব কবিরা, তখনই অগ্নিশর্মা হয়ে বাধাস্বরূপ দাঁড়িয়েছেন চিরাচরিত ভাবধারায় আচ্ছন্ন ছুঁৎমার্গীরা। বহু কবিকূলকে এজন্য ব্যঙ্গবিদ্রূপ হজম করতে হয়েছে, সময়ে সময়ে এজন্য দণ্ডও ভোগ করতে হয়েছে। কঠিন জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফরাসি দেশের আধুনিক কবিদের পুরোধা বোদলেয়ারের নাম বিশেষভাবে করা যায়। ছুঁৎমার্গীদের কাছে তিনি জীবিতাবস্থায় ছিলেন অচ্ছুৎ। ‘হাংরি জেনারেশন’-এর প্রধান পুরোহিত তাঁর সময়কালে যে নতুন সাহিত্যপথের পথিক হয়ে ছুঁৎমার্গীদের কোপে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীকে শ্রীঘরেও অতিথি হতে হয়েছে।

কবি চসারের In the sowre hungry tyme পংক্তিটি থেকে ‘হাংরি’ শব্দটি তুলে নিয়ে ১৯৬১ সালের নভেম্বরে নতুন বাংলা কবিতা আন্দোলনের পুরোহিত মলয় রায়চৌধুরী যে পত্রিকা প্রকাশ করেন, তার নাম রাখা হয় ‘হাংরি জেনারেশন’। ‘হাংগরি’ বা ‘হাংরি’ যাই বলি না কেন — এই শব্দের আড়ালে প্রচ্চন্ন রয়েছে যে অর্থটি তা হলো ‘ক্ষুধা’। এ ক্ষুধা যে মানবিক, দৈহিক ও শারীরিক, এবং চিরাচরিত বস্তাপচা মূল্যবোধকে ভাঙার, তা বলা বোধ করি অনুচিত হবে না।

রোমান্টিসিজমের ছাঁচে বন্দি চিরাচরিত ভাবলোক থেকে আত্মানুসন্ধানে বেরিয়ে এসে মলয়বাবু বাংলা কবিতাকে অস্তিত্ব-সংকট মুক্তি দিয়ে এক নতুন আত্মদীপের সন্ধানে মুখর করতে চেয়েছেন। কবিতাকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন যৌনতা, জান্তব ক্ষুধা বা জৈবতার মধ্যে; এক জীবন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি। প্রচণ্ড জান্তব ক্ষুধাকে সঙ্গী করে তিনি চেয়েছেন বাংলা কবিতার দিকবদল ও অন্তরাত্মার মুক্তি। ‘হাংরি জেনারেশন’-এর মূলমন্ত্র এটিই। মলয়বাবুর প্রথম বাংলা বুলেটিনের তাত্ত্বিক ভাষ্যেই তা পরিষ্কার।

“ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন। টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে, কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে। এখন কবিতা রচনা হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে। সেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহুর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে ‘সচেতনভাবে বিহ্বল’ হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব। শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত। শখ করে, ভেবে ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন আর কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থব্যঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিণী হয়ে যেতে পারে।”

অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে তিনি কবিতাকে স্হাপন করতে চেয়েছেন বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের পারস্পরিক মেলবন্ধনে। একারণেই কিনা জানি না মলয়বাবু বহু-বিতর্কিত তাঁর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটিতে অস্তিত্বের সংকটকে বড়ো করে দেখিয়েছেন। কবিতাটির শুরুতেই তিনি যখন সোচ্চারে একথা বলেন —

ওঃ মরে যাবো মরে যাবো মরতে যাবো
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাবো ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাবো শুভা
শুভা আমাকে তোমার তরমুজ আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
শমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আমি আর পার্ছি না, অজস্র কাচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে

আমরা এখানে সহজেই উপলব্ধি করতে পারি কবি মলয়ের অন্তরের অস্তিত্বের সংকট কি ভয়ানকভাবে চেপে বসেছে, তাই তিনি চামড়া জ্বলার মধ্যে দিয়ে তাঁর যন্ত্রণার কথা যেমন ব্যক্ত করেছেন, তেমনি সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাবার কথাও প্রেমিকা শুভাকে বলছেন। তবু অস্তিত্বের সংকট থেকে পালিয়ে যাওয়া তো জীবনের ধর্ম হতে পারে না — তাই পরক্ষণে তিনি শুভার ‘তরমুজ আঙরাখার’ ভেতরে চলে যাবার আকাঙ্খা করছেন। এ আকাঙ্খার মধ্যে রয়েছে কবি মলয়ের এক দিকে যেমন অস্তিত্বের সংকট থেকে ক্ষণিক মুক্তি, তেমনি যন্ত্রণা-জ্বালা থেকে ক্ষণিক মুক্তিও। যে যন্ত্রণা-জ্বালা অভুক্ত হৃদয়ের, শরীর ও মনের।

একটা কথা মনে রাখতে হবে। পঞ্চাশের থেকে সাহিত্যে একটা বন্ধ্যা যুগ তৈরি হয়েছে। একথা বলার কারণ পঞ্চাশের কবিদের সৃষ্টি-নির্মাণে পূর্বজদের রোমান্টিসিজমে গড়া সাহিত্যধারাই চর্বিতচর্বণ হয়েছে। চল্লিশের বা তিরিশের কবিদের মতন তেমন কোনো সাহিত্য পটপরিবর্তনের স্বাক্ষর তাঁরা রাখতে পারেননি। এমনকি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরের ছত্রছায়ায় লালিত পরবর্তী-সময়ের ভেঙে পড়া মূল্যবোধের যন্ত্রণা-জ্বালা বুকে নিয়ে যে সব চল্লিশের কবিরা পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের বাণী নির্মাণের চেতনায় লিপ্ত হয়েছিলেন, তাঁদের মত ও পথের চর্বিতচর্বণ বাহকরূপেই পঞ্চাশের কবিরা কাটিয়ে দিয়েছেন পরবর্তী সময়কে কবিমানসের অনুশীলনে। বোধ ও মেধাচর্চায় আর নতুন কোনো আলোকিত জীবনমন্হনের হদিশ দিতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর সভ্যতা ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য হয়ে, মানুষকে ও তার ভাবনা ও চেতনাকে, এক নৈরাজ্যের বাসিন্দায় পর্যবসিত করে, ক্রমশ অস্তিত্ব-সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, এসত্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে কবি মলয় রায়চৌধুরী ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে, জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, সাহিত্যনির্মাতদের বুকে যেমন আগুন ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন, তেমনি চেয়েছেন চিরাচরিত ভাবধারা থেকে সাহিত্যের মুক্তি, শিল্পের মুক্তি । অনায়াসে কবি মলয় একথা বলেন —

আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফূলিঙ্গ

যৌনতায় ডুবে যাওয়া নয়, কেবল যুগযন্ত্রণার অসুস্হতায় আচ্ছন্ন থাকাই কবি মলয়ের কাম্য নয়। তিনি চান জীবন যাপনের সত্য প্রকাশের মধ্যে দিয়ে প্রেমে-অপ্রেমে-বিদ্রোহে ওলোটপালোট করে মানবিক, দৈহিক ও শারীরিক ক্ষুধায় জীবনের এক পূর্ণতা, এমনকি শিল্পেরও। পরবর্তী কটি পংক্তিতেই যার আভাস আমরা পাই কবি মলয়ের তির্যক কথায় —

মা তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতোদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মুত্রাশয়ে
সব ভেঙে চুরমার করে দেবো শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেবো তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাবো আমার ক্ষুধায়

আসলে অনুপযুক্ত পৃথিবীর ধ্বস্ত সময়ের ফাঁস ছিন্ন করে কবি মলয় দাঁড়াতে চান প্রকৃত সত্যসন্দর্শন শিল্পের কাছে। তাই তাঁর অকপটে বলতে বাধে না — “ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতোদিন”। আবার পরক্ষণে তিনি যখন বলেন, কবিতার আদিত্যবর্ণা মুত্রাশয়ে/এসব কি হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ/সব ভেঙে চুরমার করে দেবো শালা” — তখন বুঝতে বাকি থাকে না শিল্পের চর্বিতচর্বন সূতিকাগারে তিনি আবদ্ধ থাকতে চান না, তিনি চান গতানুগতিক বিশুদ্ধ শিল্পের নামে ধর্ষিত শিল্পভাবনার জগৎটিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে। “ছিন্নভিন্ন করে দেবো তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব”, এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবিতা রচনাকারদের শিল্পের নামে বাহারি ‘সম্মেলন’ নামক ভণ্ডামির প্রতি তাঁর তীব্র ধিক্কার ও প্রতিবাদ একই সঙ্গে ব্যক্ত হয়। নারীই যুগে-যুগে যেহেতু কবিদের কাছে কবিতার প্রতিমূর্তিরূপে উদভাসিত হয়েছে, কবিকে সমৃদ্ধ করেছে, সেহেতু কবি মলয় রায়চৌধুরীও শুভাকে চেয়েছেন শিল্পের জন্য। “হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাবো আমার ক্ষুধায়”, একথা বলার মধ্য দিয়ে শিল্পের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাই প্রকাশ পেয়েছে। এ-কথা বলার কারণ, কবিতাকে তিনি নারীর মতনই সম্ভোগ করতে চান নিজস্ব আত্মদর্পণে। কোনো গতানুগতিক ধারার অনুসরণে নয়। শিল্প গড়ে উঠুক কবির মননসমৃদ্ধ ব্যক্তিক আত্মদর্পণের নিজস্ব নিয়মে, সময়কালের প্রেক্ষিতে, আত্মশ্লাঘা ও আত্মজিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে।

কবি মলয়ের ইংরেজি বা বিদেশি ভাষানবীশ কবিওয়ালাদের প্রতি ব্যাঙ্গোক্তিও দেখি এ-কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে। যারা নিজস্ব অন্তরাত্মার দিকে না তাকিয়ে পরদেশীয় ভাবনার অবগাহনে শিল্পের মুগ্ধতার চমৎকারিত্বে সদাই মশগুল। বিশেষত শহর কলকাতার শিক্ষিত কবিকূলেদের যা একান্ত ধর্মরূপে প্রতিভাত। আর এজন্যই কবি মলয়ের কন্ঠে এক অসহায়তাবোধ জেগে উঠেছে, সঙ্গে-সঙ্গে এক ধিক্কার ও ব্যঙ্গও তাই তিনি অকপটে বলতে দ্বিধা করেননি —

কলকাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কি করব বুঝতে পারছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার

কবি মলয়ের অস্তিত্বময় সংকট ও আত্মদর্পণের বিস্ময়প্রসূত আত্মজিজ্ঞাসার একটি সার্থক সত্যসুন্দরের দলিল হল এই ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি। একথা বলার কারণ মলয়ের আত্মধিক্কারের মধ্য দিয়ে নতুন পথ খোঁজার আত্যন্তিক ইচ্ছের ব্যাপারটি কবিতাটির মধ্যে বারবার ব্যক্ত হয়েছে, কখনো সরাসরি ভদ্র-প্রতিবাদীর মোড়কে, কখনো শ্।ইলতার মাত্রা ছাড়ানোর অভিব্যক্তিতে। শ্লীলতার মাত্রা ছাড়ানোর অভিব্যক্তি যেমন —

অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
যোনিকেশরে কাঁচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা

একটা কথা এখানে বলা বোধ করি উচিত হবে, এই শ্লীলতার মাত্রা ছাড়ানো অভিব্যক্তি কিন্তু কখনো অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা যাবে না। কবিতাকে নারীদেহ রূপে দেখাটাই সাধারণত সৎ কবির ধর্ম। বৈষ্ণব সাহিত্যেও প্রেমের অভিব্যক্তির চরম প্রকাশে বার বার উঠে এসেছে নারীদেহের সুধামন্হন ও সৌন্দর্যের বর্ণনায়। যোনিই যেহেতু সন্তানের জন্মদ্বার — সেহেতু যোনির সুস্হতা চাওয়ার মধ্য দিয়ে কবি মলয়ের সার্থক কবিতা নির্মাণের ভাবটিই এখানে ব্যক্ত হয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি । সময়ে সময়ে ধর্ষণ শব্দটি দেখি তাঁর কবিতায় ফিরে এসেছে । ধর্ষণ শব্দটিকে ধ্বস্ত বা নষ্ট অর্থে ধরতে হবে। যা চর্বিতচর্বনে বহুব্যবহৃত তাকেই সম্ভবত তিনি ‘ধর্ষণ’ অর্থের দ্যোতনায় চিহ্ণিত করতে চেয়েছেন।

‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটিকে শল্যচিকিৎসকের মতন যদি প্রথম থেকে শেষাবধি কাটাছেঁড়া করা যায় — তাহলে যে সত্য চালচিত্রটি ধরা পড়ে তা হলো এক নবীন কবির আত্মবীক্ষণের ও আত্মমন্হনের এক সুগভীর প্রশ্ন-বিহ্বলের সুতীব্র আর্তনাদ, এবং এক অসহায় অস্তিত্বের তীব্র সংকটের।

শিল্পকেই একমাত্র জীবনযন্ত্রণার নিস্তার ও মুক্তি বলে মনে করেছেন বলেই তাঁর কবি-অন্তরে দ্বান্দ্বিকতা দেখা দিয়েছে। কবি মলয় একারণে যেমন বলতে বাধ্য হয়েছেন — ‘ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন’, আবার বলতে বাধেনি — ‘আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই’। কৃত্রিম ভাবনালোক ত্যাগ করে মলয় চান সত্য সন্দর্শনের প্রকৃত জীবনযন্ত্রণার অক্ষরের পিনবিদ্ধ রক্তঘামে-ভেজা রক্ত-মাংসজনিত সাবলীল ভাবনালোক। কবিতা তাঁর কাছে ঈশ্বরী না হয়ে, হয়ে উঠুক সময়কালের দর্পণে জীবনযন্ত্রণায় পোড়া সত্যকারের মানবী। তাই দেখি শুভাকে তিনি শিল্পের মানবীসত্ত্বার প্রতীকীব্যঞ্জনায় আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন, তাকে বারবার রমণে ও মননে। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির সারসত্য এইটাই। কবিতাকে তিনি তাঁর চূড়ান্ত অসহায়বোধ থেকে শেষ পর্যন্ত গভীর তৃঢ়্ণায় নিশ্চিন্ত বোধের জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। কল্পনার রঞ্জিত বিলাসে তিনি যে গা ভাসাতে ইচ্ছুক নয়, তা স্পষ্ট করেছেন বিশেষত মাতৃগর্ভে ফিরে যাবার পর ফের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে জীবনের আস্বাদকে লেহন করার মধ্যে দিয়ে। শুভা কেউ নয়, কবি মলয়ের জীবন-আস্বাদনের প্রতিভূ — শিল্পের মানবী বা আধার। মলয়বাবু শিল্পরূপী কবিতাকে টেনে আনতে চেয়েছেন প্রকৃত জীবনের কাছে, প্রকৃত বাস্তবের সত্যসন্দর্শনে।

এ আলোচনার সমাপ্তিকালে কটি কথা বলা বোধ করি উচিত হবে, ‘হাংরি জেনারেশন’এর পুরোহিত কবি মলয় রায়চৌধুরী প্রকৃত কালসত্যের সন্দর্শনটি মেলে ধরেছিলেন তাঁর সুবলিষ্ঠ লেখার মাধ্যমে বলেই, বাংলা কবিতায় আজ শ্লীল-অশ্লীলের কাল্পনিক বা সমাজবিদদের চাপানো কতকগুলি ধারনার বেড়াজাল ছিন্ন হয়ে বাংলা সাহিত্য প্রকৃতপক্ষে যে সাবালকত্বের দুয়ার খুঁজে পেয়েছে, তা সত্তর দশকের কবিকূলের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। বিশেষ করে সত্তর দশকে প্রখ্যাত কবি জয় গোস্বামীকে আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বমহিমায় ‘দশচক্র’ কবিতাটির কথা বলা যেতে পারে । জয়ের এ উচ্চারণ—

স্বয়ং মা সরস্বতী বীণা ও পুস্তক ফেলে দু-হাত দিয়ে পথ আটকে
দাঁড়ালেন আমার রাস্তায়
পরনে কিচ্ছুটি নেই, একদম ন্যাংটো শুধু আঙুলে নেলপালিশ
সরু সরু নখসুদ্দু আঙুল
ঢুকিয়ে দিলেন চোখে, মরে গেলাম মরে গেলাম, মরতে মরতে কী দেখলাম
বলব কী ভুতুম আমি কী বলব তোমায়
দেখতে দেখতে আমি স্বয়ং ভগবান হয়ে যাচ্ছি মাকে ডাকছি বাপকে ডাকছি
চোদ্দগুষ্টিকে ডাকছি আয় আয় আয়
বাপকে মেয়ের সামনে ছেলেকে মায়ের সামনে মেরে শুইয়ে দিচ্ছি কেটে।

জয়ের এ-উচ্চারণে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাব পাওয়া যায় না কি ? হাংরি জেনারেশন আন্দোলন যে বৃথা যায়নি, তা টের পাই সত্তর দশকের বহু কবিদের বেশ কিছু রচনাতেই। সত্তর দশকের কবিদের গতানুগতিক বৃত্তভাঙার মন্ত্রবীজটি যে হাংরি জেনারেশনের কাছ থেকেই এসেছে তা বোধকরি মনে কোনো দ্বিধা না রেখেই বলা যায়। কবি মলয় রায়চৌধুরী হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পুরোহিত বা পুরোধা হিসাবে সার্থকতা এখানেই। তিনি প্রকৃত কবিতার বিবর্তনের স্রোতটি খুব অনায়াসভাবে পৌঁছে দিতে পেরেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের বোধে-মননে ও হৃদয়ে। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ যথার্থই একটি সার্থক কবিতা। কি উপমা প্রয়োগে, কি শব্দচয়নে, কবি মলয়ের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে ‘নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা’ ও ‘কাঁচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা’ উপমা দুটি নজর কাড়ে। ‘তরমুজ আঙরাখার’,’ আঁচ মেরে’, ‘ক্লিটোরিসের’, ‘লাবিয়া ম্যাজোরার’, ‘হিপ্নটিক’, ‘যৌনপরচুলায়’, এসব শব্দ যেমন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কবিতাটিকে অর্থবহ করে তুলেছে, তেমনি রসঘনভাবে একটা বিশ্বাসের ভূমিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সর্ব অর্থেই একটি তারিফযোগ্য কবিতা এটি, এবং হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রকৃত মন্ত্রবীজ হয়ে উঠেছে এই কবিতা। কবিতাটির যথার্থ মূল্য এখানেই।
——————————————————-
Published in ‘Swapna’ literary periodical, ( 2008 ) Edited by Dr. Bishnu Chandra Dey, Nabin Chandra College, Assam University, India.

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E