৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ২১২০১৭
 
 ২১/০৭/২০১৭  Posted by

মলয় রায়চৌধুরী

কবিতার কোনো সংজ্ঞা নেই, নির্দেশিকা হয় না
তাই যা ইচ্ছা, যেমন ভাবে ইচ্ছা লিখুন
– মলয় রায়চৌধুরী

আজকাল যা মনে আসে লিখি, আমি একে বলি আমার খামখেয়াল স্কুল অফ পোয়েট্রি। এমনিতেই কবিতার নিবাস ও উল্লাসের অনির্ণেয়তার ধূসর পরিসরে, এমনই একটা এলাকা যা হয়ে উঠতে চাইছে অথচ বোঝা যাচ্ছে না যে তা নির্ণেয়তা, অনিশ্চয়তাকে অতিক্রম করে আর সন্দেহুজনক রইল না। আর তাই-ই কবিতার কাছে আশা করেন কবি ও তাঁর পাঠক। তা ইশারা করে, আলাপ করে, বিনিময় করে, সঙ্কেত দেয়, ইঙ্গিত দেয়, সন্মোহিত করে, ভাবায়, পরোক্ষবার্তা দেয়— এবং এতকিছু করার পরও নির্ণেয় সমাধানে পৌঁছে দেয় না পাঠককে। তাতে ছন্দ থাকুক, তা আভাস দিক, সরাসরি ফাঁস করে দেবার চেষ্টা করুক, সাদা পাতায় শব্দদের জড়ো করে উপুড় করে দিক, কবিতা এই জন্যেই কবিতা যে তা ওই পরিসরটুকুতে ঘোরাফেরা করে বেড়ায়, যেখানে তা যুগপৎ স্পষ্ট আর অস্পষ্টের, আহ্লাদ ও সন্দেহের কুয়াশায় পাঠককে আটকে রাখে।

কবি নিজেই তাই কবিতায় কাটাকুটি করতে থাকেন, অনেক সময়ে দিনের পর দিন একটা কবিতায় স্পষ্ট আর অস্পষ্টের কুয়াশায় ঘুরে বেড়িয়ে নির্ণেয়-অনির্ণেয়র ঢেউয়ে শব্দের পর শব্দ, ছবির পর ছবি জালে তোলার জন্য নৌকো ভাসিয়ে দেন; লেখা শুরু করেছিলেন কোনো আভাস ধরে অথচ পৌঁছে গেলেন অন্য কোথাও। চিন্তার একটি রহস্যময়, এমনকি অপার্থিব, সীমান্ত-অঞ্চল থেকে টেনে বের করে কবি তাকে নিজের সামনে তুলে ধরতে চান। তাঁর ইচ্ছে হলে তিনি পাঠকের সামনেও তাকে তুলে ধরতে পারেন। যারা কৈশোর থেকে কবিতা বোঝার এই মানসিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি, বা স্কুলের শিক্ষকরা সেই ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিয়েছেন, তাদের কাছে কবিতা ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তিকর ঠেকবে। নির্ণেয় আর অনির্ণেয়র পরস্পরবিরোধীতার মাঝে ফেঁসে গিয়ে আহ্লাদিত হবার পরিবর্তে তারা পৃথিবীর বিভ্রান্তিকর অস্পষ্ট জটিলতাকে ধরতে পারে না, কনফিউজড হবার দরুণ কবিতার কাছে অপমানিত বোধ করে। স্যামুয়েল বেকেট অস্তিত্বের এই পরিস্হিতিকে বলেছেন ‘অ্যামবিগুয়াস মেস’।

যাঁরা এই কবিতা ভালো ওই কবিতা খারাপ ইত্যাদি যুগ্মবৈপরীত্যে ভোগেন, তাঁরাও, যে কবিতাকে তাঁদের খারাপ মনে হচ্ছে, সেই কবিতার সামনে পড়ে গিয়ে অপমানিত হন। কারণ ওই একই; নিজের জীবনের ‘অ্যামবিগুয়াস মেস’ ব্যাপারটাকে ধরতে পারেন না, কিংবা এড়িয়ে যান। তাঁরা মনে করেন যে প্রতিটি ব্যাপারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে; সংজ্ঞা হবে ধ্রুব। অমন চিন্তার দরুণ তাঁরা বহু ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞাকে বাদ দিতে বাধ্য হন, এবং তার ফলে চিন্তার দলবিভাজন করে ফেলেন। ধর্ম নিয়ে এই যে কাজিয়া চলছে, তাও অমন চিন্তার ফসল; অন্যের ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞাকে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না, অথচ প্রায় সবকটি ধর্মগ্রন্থই তো কবিতা। কোনো কবিতা যদি খারাপ মনে হয়, তাহলে কোনো ধর্মকে খারাপ মনে করার পাটাতন একই থাকবে। সিরিয়া আর ইরাকে দেখতে পাচ্ছি ইসলামের একটি ব্যাখ্যা আরেকটি ব্যাখ্যাকে বোমা মেরে, নারীদের ধর্ষণ করে, বিক্রি করে, সংজ্ঞাকে ধ্রুব প্রমাণ করতে চাইছেন। হিটলারও তাই করেছিলেন; ইহুদিদের হত্যা করার মাধ্যমে নিজের জীবনে ‘অ্যামবিগুয়াস মেস’ এর সমাধান খুঁজেছেন।

কবিতা ও কবিতার শরীরে যে রূপ দেয়া হয়, তা কেবল পরস্পরবিরোধিতা ও অনির্ণেয়তায় সীমাবদ্ধ নয়। শব্দকে ছাপিয়ে এবং সমগ্র পাঠবস্তুটিকে অতিক্রম করে, কবিতা-বিশেষটি ওই অনির্ণেয় পরিপার্শ্বের সাথে অনুরণন, অংশীদারিত্ব ও কুটুম্বিতা গড়ে তোলে, সম্পর্কজাল গড়ে তোলে। যদি কোনো কবিতা কারোর ‘খারাপ’ লাগে তাহলে সমস্যা তাঁরই চরিত্রের গঠনে; নিজের মধ্যে উঁকি দিলে তিনি দেখবেন যে তিনি অমুক ধর্মকে পছন্দ করেন না, অমুক দেশের মানুষদের পছন্দ করেন না, অমুক সংস্কৃতিকে পছন্দ করেন না, অমুক ভাষাকে পছন্দ করেন না, ইত্যাদি। অথচ ওইগুলোর অন্তর্ভুক্ত মানুষদের কাছে সেগুলো ভালোবাসার ও ভালোলাগার ব্যাপার। ধর্ম বা সংস্কৃতি তো ছবি হয়ে মস্তিষ্কে আসে এবং সেই ছবিগুলো বিশেষ মর্মার্থ বহন করে, সেই মর্মার্থগুলোয় থাকে ক্ষমতা। কবিতার শরীরে যে ছবি সাজানো হয়, তার মর্মার্থ পাঠক যদি স্বনির্মাণ ও অনুধাবন করতে না পারেন, তাহলে সমস্যাটি তাঁর। যেমন ধর্ম বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, কবিতার ক্ষেত্রেও উত্তর খুঁজতে গেলে নাও পাওয়া যেতে পারে। স্যামুয়েল বেকেট যেমন দেখিয়েছেন ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ নাটকে, অ্যামবিগুয়াস মেস আছে কিন্তু তার উত্তর নেই। হিন্দুদের বহু পুরাণকাহিনিতে দেখা যায় জটিলতা বেড়েই চলেছে, একটি চরিত্র একাধিক চরিত্র হয়ে চলেছে, একটি পুরাণের সঙ্গে আরেকটির মিল নেই; এই কারণেই ভালো-খারাপের বদলে কবিতাকে রসোত্তীর্ণ হবার কথা বলা হয়েছিল। সম্প্রতি সোমনাথ মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, কেননা কোনো বিদেশি দেবী-দেবতাদের রূপ নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করছিলেন। অথচ সেই বিদেশী হয়তো পিকাসোর কিউবিস্ট পেইনটিঙের সামনে অবাক বিস্ময়ে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।

মগজের সাবধানী ফাঁদ থেকে বেরোতে প্ররোচিত করে কবিতা। অনেকে বলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় বিষয় নেই, থাকে না। কিন্তু যা ওনার কবিতায় ধরা পড়ে তা হল মানবজীবনের অ্যামবিগুয়াস মেস; চাইবাসায় একটি যুবতীর সঙ্গে প্রেমে পড়ে নিজেই তৈরি করে ফেলেছিলেন অমন ‘অ্যামবিগুয়াস মেস’। জীবনানন্দকেও দেখেছি কবিতা ও উপন্যাসের মাধ্যমে সামাল দিচ্ছেন ব্যক্তি-প্রতিস্বের বিশৃঙ্খলা।

কবিতা পড়ার সময়ে পাঠক যদি সাবধানের ফাঁদ কেটে বেরোতে না পারেন, তাহলে কবিতার কাছে তিনি অপমানিত বোধ করবেন। পাঠককে কবিতার ঐন্দ্রজালিক ডাকে সাড়া দিতে শিখতে হবে। মানবাস্তিত্বের বৃহত্তর জগতে প্রবেশের জন্য ভাষার সন্মোহনে সন্মোহিত হতে হবে, যে জগত সম্ভাবনার, যে জগত স্বপ্ন দেখতে প্ররোচিত করে। এই একই কারণে অনেক সময়ে কবিতা রাষ্ট্রের কাছে হয়ে ওঠে বিপজ্জনক, কেননা রাষ্ট্রের অধিপতিদের মনে হতে পারে যে পাঠককে সন্মোহিত করে পাঠবস্তুটি তাকে ক্ষমতাপ্রতাপের বিরোধী করে তুলছে। আমরা দেখেছি কবিদের খুন করে ফেলছে রাষ্ট্র কিংবা পাঠিয়ে দিচ্ছে সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে। বেশ কয়েকজন বাঙালি কবি গিয়েছিলেন প্রাক্তন সোভিয়েত দেশে, অথচ সেখানকার সমাজের ভেতরে-ভেতরে চলতে থাকা খতরনাক বিশৃঙ্খলা ধরতে পারেননি, আর পারেননি বলে তাঁদের নিজের কবিতাও সন্মোহন গড়ে তুলতে অসফল হয়েছে। অবশ্য তাঁদের কবিতাতেও নিজেদের জীবনকে প্রতিভাত হতে দেখেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা।

২.
সংস্কৃতকাব্যের রচয়িতাদের আমরা ‘শিল্পী’ বা ‘সংস্কৃতিকর্মী’ খেতাব দিই না। রামায়ণ ও মহাভারতকে আমরা বলি না ‘মাস্টারপিস’ । কালিদাসকে আমরা বলি না ‘জিনিয়াস’। বলি না, কেননা, ভেতরে-ভেতরে আমরা টের পাই যে এই ধরণের আখ্যা ওনাদের ক্ষেত্রে অপমানজনক। এই সময়ের কালখণ্ডে কিন্তু ওই লেবেলগুলো যে ধরণের গর্ব বিতরণ করে, তাইতে একজন মানুষকে বা একটি কাজকে আলাদা করে তার ওপর আভিজাত্য চাপিয়ে দেয়া যায়। আলাদা হবার এই যে আভিজাত্যবোধ, যা চাগিয়ে উঠছে ওই খেতাব থেকে, তা আমরা ভারতীয়রা পেয়েছি আধুনিকতাবাদী চিন্তা মারফত। আমরা দেখতে পাই, কাউকে কবি বা শিল্পী বললে অথবা তাঁর কাজকে মাস্টারপিস বললে, তিনি বেজায় আহ্লাদিত হন। তাহলে ‘আমাদের কবিতা ভাবনা’ এবং আমাদের কাজ যাকে ইদানিং বলা হয় ‘নির্মাণ’ বা ‘সৃষ্টি’ তা ওই আহ্লাদ সংগ্রহের জন্যে।

আধুনিকতাবাদ নামক আভিজাত্যবোধটি যখন কাউকে ‘কবি’ বা ‘প্রতিভাবান’ খেতাবের স্বীকৃতি দিয়ে জনগণ থেকে আলাদা হবার অধিকার দিচ্ছে, তখনও কিন্তু তা দিচ্ছে নিজের শর্তে। ‘শিল্পের’ এবং ‘কবিতার’ একটি মানদণ্ড বা ক্যানন তৈরি করে দিচ্ছে আধুনিকতাবাদ, আর তার চৌহদ্দির মধ্যেই বসবাস করতে বলছে। আমি যখন বলি ‘আমার কবিতা ভাবনা’, তখন যে সমস্যা খাড়া হয়, তা হলো যে ‘আমি’ যদি মানদণ্ডটি ভেঙে ফেলে অন্য কিছু করার চেষ্টা করি, তাহলে আমাকে কবি বা প্রতিভাবান খেতাব থেকে বঞ্চিত করা হবে। একটু আগেই যেমন বলেছি ইসলাম ধর্মের একটি বিশিষ্ট ক্যাননকে মান্যতা না করার জন্য সিরিয়া-ইরাকে কী ঘটছে। ‘ক্যানন’ ব্যাপারটায় রয়েছে ক্যাননের ধ্বজাধারীর স্বার্থ। তাছাড়া ‘আমার কবিতা ভাবনা’ বললে ‘আমি’ ব্যাপারটাকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।

‘আমি’ এতো সমস্যাকীর্ণ যে তাকে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব তো বটেই, অমন অজস্র ‘আমি’ রয়েছে, এবং একটি ‘আমির’ সঙ্গে আরেকটি ‘আমির’ কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। এদিকে মানদণ্ডের বা ক্যাননের কথা বলা হচ্ছে, অপরদিকে আমির সঙ্গে আমিদের মিল হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই কারণেই বিশ্বাসের সংঘাত আর তজ্জনিত পৃথিবী জুড়ে খুনোখুনি। যাঁরা কবিতা ‘ভালো লাগা’ বা ‘খারাপ লাগার’ প্রসঙ্গ তোলেন তাঁরা ‘ভালো লাগার’ মাধ্যমে একটি ‘সার্বজনীন আমি’ গড়তে চান, দরকার হলে পিটিয়ে, যেমন স্ট্যালিন, ফ্রাংকো, পিনোশে করেছিলেন, তাঁদের ‘ভালো লাগার’ মানদণ্ডে খাপ খায়নি বলে কবিদের হাপিশ করতে কুন্ঠিত হননি। সনাতন ভারতে ভালো লাগা নামক অনুভূতির অধিকার কেবল রাজার থাকলেও, ওই ভালো লাগা কাজটিকে অলঙ্কারশাস্ত্রের চৌহদ্দির বাইরে স্বীকৃতি দেবার নৈতিক ক্ষমতা তাঁর ছিল না।

কবির কবিতা ভাবনা থাকা দরকার, এটা হল আধুনিকতাবাদী চিন্তা। কবিতা বলতে সুস্পষ্টভাবে কী বোঝায় তাও ইউরোপ থেকে আনা আধুনিকতাবাদী চিন্তা। আমি একটু আগেই আলোচনা করেছি যে নির্ণেয় আর অনির্ণেয়র মাঝে একটি ‘অ্যামবিগুয়াস মেস’কে ধরার প্রয়াস করে কবিতা বা ছবি আঁকা। ‘আমার কবিতা ভাবনা’ উচ্চারণের সময়ে ‘আমি’ একটি সমস্যারূপে উদয় হয়। ‘ভাবনা’ ব্যাপারটি আরও সমস্যার, কেননা তা চিন্তাশৃঙ্খলার দ্যোতক নয়; তা রৈখিক নয়, চিরকাল নিশ্চিত নয়, তা অভিজ্ঞতাপ্রসূত। একজন আমির পক্ষে আগেভাগে বলা সম্ভব নয় যে সে কি ভাববে। তার মগজের রসায়ন প্রক্রিয়া একযোগে বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক ভাবনা ভাবে। আধুনিকতাবাদের মানদণ্ড প্রত্যাশা করে যে ভাবনা নামক একটি কেন্দ্র গড়ে ফেলা হোক যাতে তার যাযাবর চরিত্র নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং একটি চিন্তা থেকে শুরু করে সেই চিন্তারই শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাক। উনিশ শতকের ইউরোপে ‘ভাবনা’কে ধ্রুব খুঁটি পুঁততে দেখা গিয়েছিল, যেমন : সত্তা, সত্য, আঙ্গিক, একেশ্বর, মানুষ, চেতনা, ইতিহাস, সমাজ, উদ্দেশ্য ইত্যাদি, যেগুলোকে পরিভাষিত করা যায়। সিরিয়া-ইরাকের বর্তমান বিশৃঙ্খলার দিকে তাকালেই বোঝা যায় কোথায় গিয়ে ভাবনার ‘অ্যামিগুয়াস মেস’ ঠেকেছে। আরেকটি উদাহরণ বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা এবং রাজপথে নাস্তিক-আস্তিক খুনোখুনি। আমাদের দেশেও কিছু গেরুয়াধারী মনে করেন যে তাঁরা যা বলছেন তা ধ্রুব।

‘আমার কবিতা ভাবনা’ নামক ব্যাপারটি একটি নিশ্চয়তার খোঁজ করে, এমন একটি সন্দেহাতীত ভিত্তি যার ওপর দাঁড়িয়ে নিশ্চিতভাবে আরম্ভবিন্দুটি কল্পনা করা যায়। নিশ্চয়তার ধারণাটি, যার ওপর ‘আমার কবিতা ভাবনা’ নামের ব্যাপারটির সম্ভাব্য নির্ভরশীলতা, তা আক্রান্ত হয় সর্বপ্রথম ১৯৯০ সালে, যখন বৈজ্ঞানিক ম্যাক্স প্লাংক কৃষ্ণবস্তু বিকিরণের গ্রাফকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, যে, শক্তির উৎসর্জন ও বিসর্জন নিরবিচ্ছিন্ন ধারায় হয় না, হয় টুকরো-টুকরো ভাবে, বিচ্ছিন্ন আকারে, যে বিচ্ছিন্নতাকে বলা হলো ‘ওয়েভ প্যাকেট’ অথবা ‘কোয়ান্টাম সময়’, কাঁটাচামচের কাঁটাগুলোর মতন যা বহুরৈখিক। একটি বহুত্ববাদী সমাজে হিন্দু, সুন্নি মুসলমান, শিয়া মুসলমান, বোহরা মুসলমান, আহমেদিয়া মুসলমান, মোমিন মুসলমান, ক্যাথলিক খ্রিস্টান, প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান, শিখ, নিরঙ্কারি শিখ, মহাজান বৌদ্ধ, হীনজান বৌদ্ধ, তিব্বতী বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ইত্যাদি বহুমুখী শক্তিসমূহের যে টুকরো-টুকরো উৎসর্জন হতে পারে, সে ধারণা ১৯৯০ সালের আগে ছিল না। এখনও অনেকে নিজেদের ভাবনাকে অন্যের ওপরে চাপিয়ে দিতে চান। একটি রাজনৈতিক দলেই তো দেখি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব লেগে যায়। মার্কসবাদীদের যে কতো বিভাজন হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ম্যাক্স প্লাংক বলেছিলেন, কোনও কোনও ঘটনা ব্যাস ঘটে যায়, তার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না, তা অনির্ণেয়। ‘আমার কবিতা ভাবনা’ ব্যাপারটিতে থাকবে এই অনির্ণেয়তা, এই জটিলতা।

তার আগে, রেনে দেকার্তে (১৫৯৬-১৬৫০) যে বক্তব্য রেখেছিলেন তার সারাৎসার হলো, আমার নিজের অস্তিত্বে আমার নিজের সম্পর্কিত অবগতির মধ্যে, আমি একটি নিশ্চয়তার কেন্দ্র চিহ্ণিত করি। মন ও বস্তুর মধ্যে পার্থক্য দেখতে পায় দ্বৈতবাদী বক্তব্যটি। এই দুটি এলাকাকে মিলিত করার জন্য চাই দৈববিধান, বলেছিলেন উনি। তাঁর ভাবনাটির চাপে তিনি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, জন্তু-জানোয়ারের চেতনা হয় না।

দেকার্তের পর এক ধাপ সরে গিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন ইম্যানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪), তাঁর আলোকপ্রাপ্তির দর্শনে, যে সূত্রে আধুনিকতাবাদের উন্মেষ। মনোজগত ও বস্তুজগতের মাঝে সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা এঁকেছিলেন কান্ট। মনোজগতের সত্য তাঁর মতে অভিজ্ঞতাপূর্ব এবং বস্তুজগতের সত্য অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে বস্তুজগতে আছে মনোধর্ম, মনের উপাদান। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী উইগনার বললেন যে, জড়ও মনোগুণ সম্পন্ন। কান্ট বলেছিলেন, মানুষের যাবতীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তি হলো ইউক্লিডিয় জ্যামিতি। আইনস্টাইন বললেন যে, মহাজাগতিক নীহারিকাপূঞ্জ এবং গ্রহনক্ষত্রগুলো ইউক্লিডিয় আচরণ করে না। ইউক্লিডিয় জ্যামিতি ছিল স্হির, নির্ণেয়, সরল, স্বতঃসিদ্ধ। আমরা ইসকুলে এই জ্যামিতি মুখস্হ করে বেরোই বলে আমাদের মধ্যে অনেকে ‘আমার কবিতা ভাবনা’ নামক নির্দিষ্ট অহংচিত্র আঁকতে চান। তাঁদের ‘আমি’ হলো দেকার্তীয় বিশুদ্ধ অহং, যে আমি হয়ে দাঁড়ায় স্হানকাল-নিরপেক্ষ। দেকার্তীয় বীজ-অহং নিজেকে মনে করে সন্দেহাতীত, অথচ বাদবাকি সবাইকে সে সন্দেহের অধিকার রাখে।

বস্তুত কবিতা যে কবিতাভাবনাহীন, অইউক্লিডিয়, অনির্ণেয়, জটিল, আলটপকা, রৈখিকতা-বিরোধী, ধারাবাহিকতা-বর্জিত, ফেনানো, মানেহীন, অতিসামান্য, আধিপত্যবিরোধী, ছেঁড়াছেঁড়া, আকস্মিক, বিশৃঙ্খল, ঘটমান, ভাঙা-ভাঙা, কেন্দ্রাতিগ, এলোমেলো-চিন্তাপ্রসূত, সর্বব্যাপক, স্হানিক, খেপে-খেপে, বহুত্ববাদী, অস্বাভাবিক, আইডিয়াহীন হতে পারে তা তরুণ কবিরা দেখিয়ে চলেছেন। এইসমস্ত কাজগুলো অ্যাপ্রিশিয়েট করার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা দরকার।

যেহেতু বাঙালি পাঠকমাত্রেই কবিতার আহ্লাদ গ্রহণের, আবদার করার অধিকারী মনে করেন নিজেকে, যেহেতু ইসকুলের পাঠবস্তুর মতন ‘কবিতা’ তাঁরা ‘বুঝতে চান’ এবং মনে করেন যে একটি কবিতার একটিই অপরিবর্তনীয় ‘মানে’ হয়, তাঁদের অনভিপ্রেত চাপে নিজের অজান্তেও কোনো-কোনো কবিকে দেকার্তীয় ভাবুক সাজতে হয়। পাঠক চায় অতিনির্ণেয়তা; এই কারণেই একদা শৈলী ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনকার তরুণ কবিদের ‘আমার কবিতা ভাবনা’ নামের লাইফবোটের আর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। মরিস মের্লোপন্টি (১৯০৮-১৯৬১) তাঁর ‘দি ফেনোমেনোলজি অব পারসেপশান’ গ্রন্হে বলেছেন যে জগতসংসারে আমাদের উপস্হিতিই আমাদের অভিজ্ঞতার কারণ। সেটি কোনো বদ্ধ, ব্যক্তিগত এলাকা নয়। আমরা মানুষের অবিরাম মিলিউতে বাস করি এবং তাকে ব্যক্তিগত জেলখানায় আটক রাখা যায় না। আমাদের অনুধাবনক্ষমতা আর আমাদের কার্যকলাপ থেকে আমরা নিজেকে আলাদা করতে পারি না।

৩.
কবিতা কবির ইন্দ্রিয়ের পাতালে হাত ডুবিয়ে স্মৃতি আর সংবেদনকে ইচ্ছানুযায়ী তুলে আনে, কেবলমাত্র পাঠককে আনন্দদানের জন্য নয়, ব্যক্তি-অস্তিত্বের বিশৃঙ্খলায় লুকোনো নৈরাত্মবোধের রহস্যের সঙ্গে পরিচয় করাবার জন্যও; তাই অনেকের কোনো-কোনো কবিতা ‘খারাপ’ লাগে। আমি যে দুটি কবিতা এখানে দিয়েছি, তা অনেকেরই, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত-চেতনায় লালিত ও সীমিত অভিজ্ঞতার পাঠকদের ‘খারাপ’ লেগেছে এবং তাঁরা গায়ে পড়ে তা জানিয়েছেন আমার ফেসবুকের পাতায়। কবিতা তো ভাষা, এমনই একরকমের ভাষা যা ঐকান্তিক, প্রগাঢ়, সনির্বন্ধ। সাধারণ প্রতিদিনের ভাষা থেকে তার পার্থক্য এই যে সেই আটপৌরে ভাষা প্রয়োগ করেও পাঠবস্তুটি নিজের ভেতরে ঝোঁক গড়ে তুলতে পারে, নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।

কবিতা সৌন্দর্যের ব্যাপারী নয়, দার্শনিক-সত্যের টোল নয়, তা ব্যক্তির ও ভাষাভাঁড়ারের সমগ্র অভিজ্ঞতার পরিসর; তাই কবিতার অভিজ্ঞতায় পাবো সেই সবকিছুই যাকে কেউ বলবেন নোংরা, কুৎসিত, বিদকুটে, অভদ্র, অশালীন, অশ্লীল, মেকি, বানানো, অবিশ্বাস্য ইত্যাদি।

দুটো কবিতা দিচ্ছি, যাতে জুফিলিস্ট কবিতা সম্পর্কে ধারণা হয়; জুফিলিয়া মানে পশুপ্রেম। প্রেমের কবিতা কেবল মানুষকে নিয়েই কেন হবে, ভাবছিলুম; জগতসংসারে যা কিছু আছে সকলকেই তো ভালোবাসা যায়, প্রিয় গাছ, প্রিয় ফুল, প্রিয় ঘর, প্রিয় ফল, প্রিয় খাবার, প্রিয় মাজন, প্রিয় সমুদ্রতট, প্রিয় বিছানা, প্রিয় স্কুল, প্রিয় শিক্ষিকা, প্রিয় দোকান, প্রিয় পাড়া, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় বৌঠান, প্রিয় হিপিনী, প্রিয় মাদক, প্রিয় গলি, প্রিয় অন্ধকার, প্রিয় প্রতিধ্বনি, প্রিয় গান, প্রিয় বাজনা। সেরকমই প্রিয় পশুর স্মৃতি; যেমন প্রথম প্রেমিকার স্মৃতির রেশ ছাড়তে চায় না, তেমনই প্রিয় পশুর সঙ্গে প্রেমের মুহুর্ত।

প্রথম কবিতাটা এক বাঘিনীকে নিয়ে, দ্বিতীয় কবিতাটা এক চিতল হরিণীকে নিয়ে। খাদক আর খাদ্য দুজনের সঙ্গে আমার দুরকম প্রেম, কবিতায়।

বাঘিনীর ভালোবাসা

বাঁশে চার থাবা-বাঁধা মরা বাঘিনীর
ঘুষঘুষে বুকে শুয়ে পড়ি পূর্ণিমার রাতে
উপুড় উলঙ্গ ঘ্যামা ওল্ড মংক স্খলিত সত্তা মুড়ে
বাঘিনীর মাইয়ের বোঁটা মুখে কান্না পেয়ে গেল
চুষি আর বেহেড ফোঁপাতে থাকি
ক্রমে লিঙ্গ জেগে ওঠে, কান্না বন্ধ হয়
বাঘিনীর যোনিতে মুখ রেখে বলি, ভালোবাসি তোকে
অবন্তিকা, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি

 

অবন্তিকা, চিতল হরিণী

তোকে ছুঁই, কি মসৃণ তোর দেহের করুণা, দয়া আর চাউনির কৃপা
জানিস সৌন্দর্য তোর কিসে? দিতে পারবার ক্ষমতা ও কৃতজ্ঞতায়
যখন আঁকড়ে ধরি গলাখানা তোর, মুখে মুখ ঘষে তুই আদর করিস
সৌন্দর্য মানেই যেন আত্মবলিদান, কী করে শিখলি এই ভালোবাসা?

চিতল হরিণী তোর চোখের গভীর থেকে ধর্মাধর্ম শুরু হয়েছিল;
বনের চঞ্চল দেবী, লোভ দেখাস জাগতিক বস্তুফাঁদ ছেড়ে থেকে যাই
হাজারিবাগের এই ঘন জঙ্গলে; সমাজ সভ্যতা থেকে দূর ইন্দ্রজালে
প্রতিদিন আদায় করিস তোর জিভ দিয়ে পৌরুষের যৌননির্যাস–

প্রথম-প্রথম কাতুকুতু লাগত খসখসে জিভের রহস্য-প্রণয়ে
এখন নেশা ধরে গেছে; কখন ফিরবি তুই বনভোজন সেরে সন্ধ্যায়
অপেক্ষায় থাকি। জন্মউলঙ্গ তুই, আমি তো ইনফিডেল, তোর কাছে
শিখলুম উলঙ্গ থাকার ইনোসেন্স; সমস্তকিছুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার যৌনতা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E