৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ০৬২০১৭
 
 ০৬/০৩/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি:

মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

মাজুল হাসান মূলতঃ কবি। তবে গল্প ও বিবিধ বিষয়ে গদ্যও লেখেন, করেন অনুবাদও। জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর। পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ ● জেব্রাক্রসিং, ২০১৭
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন পরস্পর ডট কম- এর অন্যতম সম্পাদক তিনি।

ইমেইল: majulhassan@gmail.com

মাজুল হাসান-এর কবিতাভাবনা

কবিতা আর কিছু না, একটা প্রাচীন স্টেশন, বয়ে চলা ফিনফিনা হাওয়া, যেখানে কেউ গেলে বা না-গেলে তার কিচ্ছু যায় আসে না।
তাহলে কেন লেখেন?
সুনীল গাঙ্গুলী বলতেন, ‘কিছু পারি না বলে লিখি’।

আমার অবশ্য লেখালেখির নির্দিষ্ট কোনো কারণ নাই। বড়জোর নিজেকে ফুটবল প্লেয়ার মনে করতে পারি। ছোটবেলায় আমাকে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিশতে কিংবা খেলাধূলা করতে দেয়া হতো না। খুব খারাপ লাগতো। খেলা না হলে কী আর থাকে।

জীবন জুয়া বাকবন্দী

সীমা কালবাসী বলে এক ইরানী কবি আছেন, যিনি এখন মার্কিন মুলুকে থাকেন, তার কয়টা লাইন মাথায় ঘোরে। সীমা বলছেন- ‘কিছুই ঘটে না। আমি কেন্দ্রীয় উদ্যান ধরে হাঁটি/ সেখানে নেই কিছু, তারপরেই নো-ফ্লাইং জোন/ কেবল গলা গলিয়ে নেমে পড়ে না নিরর্থকতা/ গুলি চলে, রক্ত ঝরে; তবু এখানে ঘটে না কিছুই/ তবু লিখি,/ নিরর্থকতা যাতে আর নিরর্থকতার ভার বাড়াতে না পারে’।

তাই খেলাটা জরুরী। খেলা অথর্বহ। বোদলেয়ারের রেশ ধরে বলি, খেলোÑমাতাল হও, কবিতা, নারী অথবা সুরা- যা তোমার ইচ্ছা।

শুনেছিলাম, নকশী কাঁথার মাঠের জসিমউদ্দীনকে লোকে কবি বললে উনি দারূণ খুশি হতেন। আমি কি তেমন?
মনে হয়, হ্যাঁ, মনে হয়, না।

নিজেরে মনে হয় মনোবৈকল্যের রোগী ও যুগপৎ ডাক্তার। যদিও মৃত্যুর অধিক কোনো শুশ্রষা নাই। তারপরেও লিখি।

মাজুল হাসান-এর কবিতা


মার্থা গঞ্জালেস

মাহিদা ফেরদৌস ঋণীকে প্রথম যেদিন মার্থা গঞ্জালেস বলে ডেকেছিলাম- সেদিনই কুড়িয়ে পেয়েছিলাম
একটা মাউথঅর্গান। মৃদঙ্গ নয়, সমীরছিদ্র বক্রবংশী নয়, মৃদু কিংবা ত্রিকালকম্পী রাজশঙ্খও নয়।
একটা একতারাও তো হতে পারতো। কিন্তু সব থুয়ে ক্যানো মাউথঅর্গান?

ভেবেছি, আর সকালটা অপেক্ষা করেছে হলুদ কার্ডিগানের, বিকেল পালিয়েছে কেতকীদের গোধূলি দালানে
আর ছুমন্তর বলে সন্ধ্যা হয়েছে আফিম-নিস্তব্ধ। ঋণীকে বলা হয়নি কোনোদিন- মার্থা গঞ্জালেস এক
অনিন্দলাস্য ও ফুটোন্মুখ গোলাপের নাম। শ্বেতশুভ্র মেষ চরে বেড়ানো ককেশীয় পর্বতরাজি নয়তো ল্যাতিন
অরণ্যের কোনো নিভৃত নিদ্রাটিলায় ওর জন্ম। অথবা কোথাও এই নামে কোনো ফুল নেই।

খুব করে মনে হয়- রাগ ইমন আর ঋণীদের কোনার ঘরটার একটা যোগসূত্র আছে। রোজ রাতে গানের
মাস্টার আসে। কী মলিন জামা! অথচ ফেরার পথ কী হীরকদ্যুতিময়! রোজরোজ অমন ঝকঝকে ঈর্ষা
দেখে অন্ধ হবার জোগাড়। সেই কবে নক্ষত্রবাগান তছনছ করে গেছে পাগলা হাতি। বিধ্বস্ত তারা ছড়িয়ে
পড়েছে চতুর্দিক, একান্ত গোপনে কাঠবাদামের অন্তরেও হয়েছে লহু-লুব্ধক ক্ষরণ। সেই সমুদ্দুর অবশ্য
পেরিয়ে গেছি পাগলা হাতির পিঠে চেপেই। গেছি ককেশীয় পর্বতরাজিতে, নয়তো ল্যাতিন অরণ্যের
নিভৃত নিদ্রাটিলায়। (অথবা যাইনি)।

রাজশক্সেখর মতো মৃদুস্বরে ডেকেছি- মার্থা গঞ্জালেস, মার্থা- ও ম্যারি! কী আশ্চর্য, মাউথঅর্গান কিংবা
চার্চ মিউজিক নয়, ঠিক তখনই ভেসে এসেছে রাগ ভৈরবী।


হিমঝরি ডালের ধনুক

(১)
‘দরজা থেকে ফিরে এলাম। কারণ দরজা খোলা ছিল।’
এখন মেহগুনি ফাটার শব্দ। বুঝি না, উৎসব কেন এত
মদমত্ত অক্ষমের আস্ফালন? একদা চুরি করে যে বেলপাতা
রেখে আসা হলো প্রযত্নে সুনেত্রার, তার অনুচ্চ ঘ্রাণ
কেন পারে না ঠেকিয়ে দিতে ডাকাত আগমন?
এখন রাত। ছুরি-কাচি টুংটাং, রংঅন্ধ রেড ওয়াইন
হায়! একটা ভারী চুম্বনও জুটলো না জীবনে! এই আক্ষেপ
অদৃশ্য-শ্রবণে একদিন সুনেত্রা বলেছিল- ‘গোশালা ছেড়ে
একবার শুধু নেক-মরদের মেলায় এসো। এসো জয়ফল ও
কোষানৌকার দ্বীপে, সেথায় পাবে তুমি গোষ্ঠের মাঠ।
আমাকে নাও, আমাকে নাও, বলে আলো দেখাবে
আহত দিকচক্রবাল।’
আমি যাই, ফিরে আসি দুয়ার থেকে। ভেতরে অপেক্ষা
কান্না কলহাস্যের…

(২)
সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির নোম্যানসল্যান্ডে পাখপাখালির যে অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে, সেখান যদি একটি কুইন আলেজান্দ্রিয়া বার্ডউইং ডানা ঝাপটায়, তবে তার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর কী সাঙ্গু নদের জলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।

যদিও ঢেউ আর পাতাম-নৌকা একই কুলবংশের, তবু বৈঠার সাথে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশের সম্পর্ক ভালো না। এ জন্য অবশ্য দায়ী জার্মানির অভয়ারণ্যের সেই বার্ডউইং প্রজাপতিটি।

বার্ডউইং জানে, বাতাসে ধনেপাতার গন্ধ না মিশলে কত কত দালান চিৎপটাং হয়ে যায়। কত কত জানালা বৌ-বাচ্চা ফেলে রাত করে বেরিয়ে পড়ে অদৃষ্ট হণ্টনে।

পথে কত ছায়াসুন্দর। শ্যামাকঙ্কাল। তবু তীব্র ঠান্ডায় একটা মেরুন হাত আরো ক্ষীণ মেরুন একটা কফিশেকার নিয়ে ঠকঠক কাঁপতে থাকে…

তোমার আমার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে ‘কোল্ড কফি উইথ ভেনিলা আইক্রিম’। সাইক্লোন আইয়ের মতো মহাকালের মধ্যে মিশে যাচ্ছে কতক জাফরানি আর কিছু ইরানি গোলাপের আভা…

তোমার চোখে রঙের হরবোলা, তাও জার্মানির ওই কুইন আলেজান্দ্রিয়া বার্ডউইং প্রজাপতিটির জন্য…

(৩)
যদিও যাত্রা মানেই সায়াহ্ন ও সিংহের দিকে, তবু নিবেদিতা সিস্টারের ঠোঁটে আমি খুঁজেছিলাম বাঘাফড়িং, কামভাব আর শুক্রবার থেকে ১০ মিনিটের হাঁটাপথ।

আমি ভোগী মানুষ, রঙ্গশালায় বোধিলাভ। এখন কেদারনাথ, বাসক-পাতার মিথুনমূর্তি আর দোলনচাঁপার দিককার যাত্রী মহোদয়গণ, কোনো নড়াচড়া না। মন দিয়ে শুনুন- ওয়াগনের কোরাস; দ্রিম শব্দের অ্যাডাল্ড জোকস।

একটাই অনুরোধ : সবুজ লাউডগা সাপের মতো যাত্রাপথে বৌকে ঘিরে লিকলিকে সন্দেহটাকে কাব্জায় রাখুন। প্রয়োজনে মৃদু চাবকান আর শেষবারের মতো দেখে নিন : দৈত্যের মতো লোহার ঘণ্টা, রাঁধাচূড়ার সিগন্যাল ফ্ল্যাগ, সাথে বিশাল ইঁদারাটাকেও।

দেখে নিন- কিশোরী ঝাঁপ দিলে ইঁদারার রিং বেয়ে কীভাবে উঠে আসে ইউনিফর্মের চিৎকার, মোনার্ক প্রজাপতি আর স্কুলব্যাগ ভর্তি ছুটির সরঞ্জাম।

ওদিকে জারুলের পতাকা নিয়ে শুরু হয়ে যায় স্টেশন মাস্টারের দৌড়ঝাঁপ। ছলকায় মাটির কাপ।

কেমন আছ?

ব্যস, এটুকুই…

সিস্টার নিবেদিতা!

(৪)
বন্দরের কথা এলেই চলে আসে ক্রন্দনরত তলোয়ার আর হাস্যোজ্জ্বল শিশুর গল্প। আর হুটোপুটি হলে কাচের বয়াম তো ভাঙবেই, ছিঁড়ে যাবে বিনয়ের বোতাম। এখন ছেড়া শার্টে কোন দিকশূন্যপুরে জাহাজ ভাসাবে সারেং? মহাবৃক্ষের ছায়ার মতো ভাবো। ততক্ষণে আমি দূর থেকে চীনা গণিকাটাকে দেখে পিনিক করে নেই। জানোই তো- একটু আধটু আমিষ না হলে পৃথিবী আদতে পোকা খাওয়া একটা সুগোল কমলালেবু। যেমনি রেড-ইন্ডিয়ানরা বলে, একটা কচ্ছপের ওপর আরেকটা কচ্ছপ, তারপর আরেকটা, তার ওপর পৃথিবী… এভাবে গড়ে উঠেছে মোরগফুলের মতো রক্তরাগমিশ্রিত মহাব্রহ্মা-। যেখানে দ্যুতিবিচ্ছুরণ। কুহকের নদ। নারী। তার হুহু ময়দানে মটরদানা কি সরিষাকণার চেয়েও ক্ষুদ্র যে টিপ সবুজ তার মধ্যে আড়াআড়ি শুয়ে থাকে গাছের গুঁড়ি, করাতকল, মাঝারি ট্রাফিক জ্যাম, মানুষের ঝুলন্ত উদ্যান। একদিন এ সবই মিথ্যে হয়ে যাবে। সূর্য কুঁজো হলে সকাল মিথ্যে আর বিকেল মানেই ভাবুকতা। ভাবতে ভাবতে একদিন ম্যাগিলানও বলেছিল, আশলে কেউ ফেরে না শুরুর বিন্দুতে। এমনকি ধবধপে উরু, মেসবাড়ি, চীনা গণিকা, জাহাজ ভাঙার শব্দ। শুধু একটা পরিত্যক্ত ডক ফিরে ফিরে আসে। ডকের ডান পাঁজরে দশভুজার মতো মহাবৃক্ষের অধিষ্ঠান; আর বাম পাঁজরে আকুলিবিকুলি করে বাস্তুচ্যুত মন্থর তারা-কচ্ছপ… ওরা চীনা গণিকা আর বোতাম ছেঁড়া সারেংয়ের হারানো সন্তান।

(৫)
আমার ভেতর এক আজব চিড়িয়াখানা। এখন যদি উজ্জ্বল নক্ষত্রের কথা বলো, ওঠাও নারী প্রসঙ্গ… তবে আমি বলে দেবো ডাহুকের ডাক। তবু একদা আবেগের অনুবাদ-মেশিন ছিলাম বলে কাঠঠোকরা সাহিত্য সম্পাদক পরকীয়া-পরকীয়া বলে খেয়ে যায় মগজের মানচিত্র। বলে, লেখা পাঠান, লেখা পাঠান!

ভাই, সূর্য থেকে যদি হলুদ উবে যায় তবে কি তাকে আগুন বলা যায়?

মানে না সে।

অগত্যা নিজের মড়া কাঁধে আমাকে ছুটে যেতে হয় মদের টেবিলে। যেখানে দিনের সাথে দিন, রাতের ভেতরে রাত, যেন কোয়েলের গানের সাথে কোয়েলের ফারাক। তবু রাত কাউকে ফেরায় না খালি হাতে। রাত মানেই বজরায় মুখোমুখি পুরুষের বাঁধাধরা মুখরা গণিকা। কভু ঢেউয়ের শব্দে চলে আসে মীন, শান্ত¡না, জেলিফিস। কখনো আবার জল-ডলফিন সমানে সমান। শুধাই ওদের- তোমাদের সমাজে কি ভাইয়ের হাতে খুন হয় ভাই? ওখানে গৌতমবুদ্ধ বলে কি কেউ আছেন?

কিছুই বলে না সে।

শুধু মায়াবী কুহকের মতো গুলে যায় মদের গেলাসে। আর আমি দেখি অশোকের কলিঙ্গযুদ্ধ। গেলাসে ডায়া নদী; জাত্মাভিমানের রক্ত সরোবর …


পারিবারিক অস্ত্রাগার

সহোদরার স্নানদৃশ্য দ্যাখে কিশোর। তৈরি করে গ্ল্যাডিওলাসের বাগান। সপ্তাকাশ থেকে খসে পড়ে ধূমকেতু। ঝাঁটা, বর্শা, শুকনো সেঞ্চুরি পাতার মর্মর শব্দের ধুমকেতু। তখন শহরের সবচেয়ে ভালো কালেকশনের নীলছবির স্টোরটিতেও ভয়ে, জীবনের প্রতি আঠালো মমতায় ফুল বেচতে লেগে যায় ভীতু দোকানদার। তারা ধামাচাপা দিতে চায়, মাকে চুমু খেতে দেখে মনে মনে বাবাকে খুন করার ইচ্ছে পোষণকারী ৮২ হাজার শিশুকে। সমস্ত শৈশবজুড়ে যারা কিনা খুঁজতে থাকে ৮২ লক্ষ জুতসই অস্ত্র। তাই ফিতাঅলা জুতো, নাইটক্যাপ আর স্ট্রবেরি রাবারের মতো ৮২ কোটি উপহার- শিশুকে যা-ই দেয়া হোক না কেন, তাদের মন ভরে না। কারণ, শিশুরা পিস্তল পছন্দ করে।


সদয় ট্রাফিক

জন্মের পর মা শিশুর হাতে আকাশ লিখে দেন যেন ক্রিস্টালের খেলনার সাথে তার ময়নাপাখিটি বদল হয়ে না যায়। পৃথিবীর সব সংখ্যার সূত্রপাত এজন্য যে, বাসা বদলের কারণে কেনো শিশু হারিয়ে গেলে সে যেন অন্তত ফোন নাম্বারটা বলতে পারে। কিন্তু যেমনটি হয়, পৃথিবীর সব শিশু বড় হয় আঙুরবনে হারিয়ে যাবার জন্য। আর আঙুরবন এমন এক জায়গা যেখানে বকশিস নেবার অনেক মানুষ তো থাকে, কিন্তু বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য একজন সদয় ট্রাফিকও থাকে না।


লাল রঙের ভাঁজ

বাড়ি ফেরার পথ এত সর্বভূক, এত কুকুরময়! এমন সময় কেউ যদি একই পথে উনিশবার চক্কর কাটতে থাকে, খাম্বা ধরে ডুকরে ওঠে- ‘মা! মা!’ তারপরেও লালরঙের ভাঁজ খোলা যায় না। এমনই যমগিট্টুর কথা আগে থেকে জানেন বলে মায়েরা বড় বেশি উৎকণ্ঠায় থাকেন। এমনকি শিশুরা বড় হয়ে বুড়োশিশু হলে অথবা ময়নাপালকে ঘুমিয়ে গেলেও উৎকণ্ঠা কাটে না। একটা মেরুন-তারা হয়ে মা ইশারায় বারবার হাত দেখতে বলেন। কিন্তু শিশুরা বড় হয়ে হাতঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিচলিত হয়ে ওঠে। একদিন মা যে তার হাতে ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন, শালফুলের মতো সেই সত্য কথাটাও সে মনে করতে পারে না।


মালিনী মধুমক্ষিকাগণ

(১)
রোজ বেণী দুলিয়ে যে কিশোরী চলে যায় কুয়াশাভিলায়- তার কাছে
নদী মাত্রই নাচের শিক্ষক। তাই পিতলের ঘুঙুর হাসলেও
কারো কারো কাছে মিশন স্কুল হয়ে ওঠে দুঃখ সমার্থক।
আর অশ্রুনীল জানে- সুখ হলো এক নিরিবিলি গির্জার মতো
যেখানে মরমর শব্দের মেঠোপথ; পলেস্তারা খসা দেয়ালে
ভাঙাচোরা বিষণ্ন পাদ্রির গলে যাওয়া প্রতিকৃতির মতো পয়মন্ত সময়
এপ্রিলের সেই লু-ঝড় আর জুনের মাছবৃষ্টির মধ্যবর্তী সকালে
স্বর্ণলতিকার মতো মায়ের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল বাবার
আর প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কোনো গির্জায় বেজেছিল চার্চবেল
সেদিন ছুটির ঘণ্টা ভুলে মিশন স্কুলের ১৫ লাইনের রুলটানা খাতায়
মা যে তারাগেন্দা এঁকেছিলেন; শুনেছি বাবা তার ক্যাপশন লিখেছিলেন
‘মধু’
সেই থেকে মৌমাছির সাথে আমার এত মিল
আর কাগুজে ফুল মাত্রই আমার কাছে মায়ের মতো প্রিয়…

(২)
‘নগর সন্ত্রস্ত করতে একটা পাগলা কুকুরই যথেষ্ট’ -এই কথা জানে না
নগর পুলিশের পুরোধা ব্যক্তি
অথচ কৃষ্ণচূড়ার লাল দেখে অনবরত হুইসেল বাজছে
দৌড়ে আসছে দমকলগাড়ি। জোড় ছাড়িয়ে সঙ্গমকে
পোরা হচ্ছে ১৪ শিকের ভেতর

আমি ভাই ঘরেলু মানুষ। ভাদ্রমাসে রাস্তায় মা-বোন নিয়ে
বেরুতে ভয় পাই। ভয় পাই শিমুলের পাশ ফিরে শোয়া
বিবেকের কথা যদি বলো- তবে বড়জোর রক্তের বোতল নিয়ে
ও.টি’র সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাটাকে মনে হয় বায়েজিদ বোস্তামি

হে শহরশিশু, বলো- শেষ কবে বর্ষা নিয়ে দাঁড়িয়েছি শিয়রে তোমার?
কবে বলেছি- ভোক্কাট্টা? কোথা থেকে- পুষ্পরাগ?
তবু রেণুসুর, কোয়েলকাব্য ছিঁড়ে গেল রবিবার- বৃষ্টির মুখে
চুমু খেতে গিয়ে আঁতকে উঠেছি…

(৩)
মুহুর্মুহু বুলেটের শব্দ বিছানো পথে আক্রোশ শব্দটিকে রেখে এলাম
৭ কোটি ৮ ক্রোশ দূরে। তবু কে আমার ধ্যানের টেবিলে রেখে যায়
লেবুপাতার কুচিকুচি কান্না?
কোথা থেকে পার্সেল আসে রক্তাক্ত শার্ট, ভাঙাচুড়ি আর সুশ্রী ঝড়সকল?
আমার কলব-হলব সব উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে
লিখতে চাচ্ছি ফল, অমনি ফুটে উঠছে ৭ ফোঁটা জল
প্রিয় সেবিকা অপ্রিয় জলদাস, ডমরুর মতো আমার হাড়কালা শব্দরা
বদল হয়ে যাচ্ছে। গাছ হয়ে যাচ্ছে নাচ। প্রেম হচ্ছে গেম
ভালো বলতেও কালো আছি
প্রতিদিন তামাকজ¦লা গনগনে হাত আমার রোলেক্স ঘড়িতে দম দিয়ে যায়
ভালো লাগে। আমি দম ভালোবাসি।
সবুজ ভালোবাসি। আমি সবুজ যম ভালোবাসি।
ভালোবাসি আর গ্যাসোলিন কু-লীর ভেতর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে আসি
তিন চক্কর। প্রমাণ করি : লাল পূর্ণিমা শেষে মানুষ জীবনের পক্ষে ছিল
আর রতি-অমাবশ্যার শুরুতে, বুধবারে এসে
সেই নিষ্কাম ঋষি মালিনীর রক্তে পিপাসা শব্দটি ঠিক লিখে দিতে পারে

(৪)
হে যুদ্ধদিনের সাইকেল, এতদিনে তোমার গামবুট ও কাঠের পায়ের
পুরনো ব্যথাটা একটু হলেও সারবার কথা। আর তেমনটি হলে
প্লাস্টিকের সাপ হাতে তুমি চলে যেতে পারো মহামান্য ফ্রয়েডের বাড়ি…

স্বপ্নতত্ত্বর কয়টা ঠ্যাং? কী খায় তারা? অথবা পাটখালাসী?
কীভাবে সাড়ে ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে একটা পাটকাঠির উপর দিয়ে যেতে যেতে
মানুষ লাফিয়ে পড়ে ক্রিস্টালের নদীতে? কীভাবে কেঁপে ওঠে
পৃথিবীর নাভি? বিশ্বাস করো জনার্দন, আমি তার জানি না কিছুই…

তাই বলছি আসো, আমরা বরং শান্তিতত্ত্ব নিয়ে তাফালিং মারি
জানোই তো, সম্রাট নেপোলিয়ন আক্ষরিক অর্থেই বিড়াল ভয় পেতেন
এই তথ্যের পর, বিড়ালকে শান্তির দূত ভাবলে ক্ষতি নেই
তবে তার আগে, শুধু একবার শুনে নিতে হবে গৃহস্বামীর আর্তনাদ
– ইশ! খেয়ে গেল কী?
দুধ!

(৫)
সমাচ্ছন্ন দুপুর ছুঁয়েছিলে বলে এই হাত এখনো বর্শা

মদ ও কবিতা সংহারের দেবী, আমি তো চোখ খুলে পকেটে রেখেছি
লাশের ভেলায় পাড়ি দিয়েছে পথ। এখন করোটিসুড়ঙ্গ থেকে
বেরিয়ে আসে থিকথিকে আলো…

যা কিছু ধেয়ে আসে মনে হয় ঐশীবাণী
ভরাকটাল, বিগব্যাং, অশ্ব যাযাবর
অথচ হ্রেষাধ্বনি আর কবোষ্ণ খুরের ছাপ বলে দেয়-

পবিত্র যুদ্ধ ও শুদ্ধ প্রেম বলে জগতে কোথাও কিছু নেই!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E