৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ১৭২০১৭
 
 ১৭/০৩/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

মাহফুজ রিপন

মাহফুজ রিপন

মাহফুজ রিপন। জন্ম : ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৩। সাঁঝের মায়া, চন্ডিবরদী, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ। লেখার বিষয়: কবিতা, গল্প ও নাটক।  পেশা- প্রোগ্রাম অফিসার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা। শৈশব থেকে আবৃত্তি এবং নাট্যচর্চায় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। তাঁর রচিত এবং নির্দেশিত মঞ্চ নাটক দর্শকনন্দিত হয়েছে।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিসর্জনের নিশিকাব্য (২০১৪) জলকাদার ঘ্রাণ (২০১৬)।
পুরস্কার- নদী বিষয়ক কবিতায় চাঁদপুর ‘চতুরঙ্গ’ পুরস্কার (২০১৫)

মাহফুজ রিপন-এর কবিতা-ভাবনা

কবিতা সুন্দরের প্রতীক, আমার জীবনের একটি অংশ। ফুলের বাগানে একটি ছোট্ট শিশু বাহারি প্রজাপতির ধরার জন্য যে ব্যাকুলতা, যে আনন্দ থাকে, কবির কাছে কবিতা লিখা ঠিক তেমনি আনন্দের। তবে কবিতা শুধু মরমিয়া ভাবের নয়- এখানে সংশয় আছে, রয়েছে সঠিক পথ অবলম্বনের পশরা। কবিতা পাঠে কোন ক্লান্তি অনুভব করি না। পাঠের মধ্য দিয়েই পেয়ে যাই নতুন কবিতা লিখার উপযোগিতা, কাব্য রস সঞ্চারিত হয়, ভিজে ওঠে দেহ-মন-প্রাণ, সোনার কাঠি এবং রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় যেমন রাজকন্যার ঘুম ভাঙ্গে তেমনি কবিতার মধ্যেও থাকে সুক্ষ ব্যঞ্জনা, যার শক্তিতে পাঠক খুঁজে পায় দর্শন, পরিমিতিবোধ এবং শুদ্ধাচার। আমার কাব্যচর্চা সেই শৈশব থেকে শুরু হয়ে আমৃত্যু ধাবমান। শুধু পাঠের মধ্য দিয়েই কবিতা লিখার স্বপ্ন দেখেছি। মনে মনে ভাললাগা শব্দগুলো দানা বেঁধে চলেছে, কখন যে গোল হয়ে নেমে আসে সাদা পৃষ্ঠায় ভাবতেই পারি না। ছাপার অক্ষরে যখন নিজের কাব্য দেখি তখন নতুন করে লিখার প্রেরণা পাই, মন বাড়িয়ে খুঁজে বেড়াই সকাল দুপুর রাত্রি নাই। কাব্যদেবীর আসন তলে হাহাকারের বাঁশি বাঁজে। দ্রোহ, শূন্যতা, প্রেম, বিপ্লব এবং হাহাকারে দলা ধরা পরিমিতিই আমার কাব্য, যাকে আমি বিশ্বাস করি, ভালবাসি।

মাহফুজ রিপন-এর কবিতা


দরিয়া পাড়ের দরদে- আমরা যাচ্ছিলাম

কীর্তনখোলার পাড় দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম।
রথ চলা ভোরে, আমরা যাচ্ছিলাম।

মনিষা মেঘের ডাকে, আমরা যাচ্ছিলাম।
দরিয়া পাড়ের দরদে-
আমরা যাচ্ছিলাম।

সারি সারি নিম আর বটতলায় মিলেছিল-
শান্তির সুবাতাস।
আজ- বৃত্তের বাইরে সময়, তাই-
আমরা যাচ্ছিলাম।
আমরা যাচ্ছিলাম।
আমরা যাচ্ছিলাম।

জোর কদমে চলে সময়-
দোভাষীর শব্দ যুগল, আজ দোহার জ্বালায়।
নিধুয়া পথের- ঘন বন-এর মাঝ দিয়ে,
আমরা যাচ্ছিলাম।

ছেউড়িয়া পার হয়ে, আরশিনগর পথে-
আমরা যাচ্ছিলাম।
জাদুবাঁশির টানে আমরা যাচ্ছিলাম।
তোমাকে পাব সাঁই!
এক বুক আশায়, তাই

আমরা যাচ্ছিলাম।
আমরা যাচ্ছিলাম।
আমরা যাচ্ছিলাম।


মেঘেদের রেলগাড়ি

আমার নতুন যৌবনে মেঘ হয়ে এসেছিল
একটি সবুজ ট্রেন।
ইস্কুল পালিয়ে প্লাটফর্মে বসে থাকা।
সেই অলস সময়।

হুমড়ি খেয়ে পড়া গাছের উপর
বসে থেকেই গড়িয়ে যেত সময়।
হাতে দশ পয়সার শুভ্র মেডেল।
জীবনের ভাঁজে- ভাঁজে মানুষ দেখা
কত মানুষ, রঙের মানুষ।

রক্তের শিরায় শিরায় আপন উত্তরাধিকার।
তারে দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায় না।

গোপন যন্ত্রনায় নীল ধোঁয়া ছাড়ে আদিম ট্রেন।
গন্তব্য তাহার মদিনাবাদ, সে পথে রেললাইন নেই।
শুধু ভালবাসা আছে।


ঢোল

আমার একটি ঢোল আছে বাঙলা ঢোল।
পঁচিশটি বছর অন্ধকার রাতে সে আমার সাথেই ছিল।
অন্ধকার বারান্দায় ছায়ার মতো বেঁচে থাকা সেই
গভীর সময়।
ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকও মিশে যায়-
ধাক্ ধিন্ নাক ধিন্ নানা তেটে’র মাঝে।

কবিগান থেমে গেছে কবে
ট্রাক্টর চলে এসেছে ডিজিটাল উঠোনে।
এখন আর মলোন চলে না
গাজীর গানে ভরে ওঠে না গোবর লেপা উঠোন।

ধা  ধিন্ ধিন্ ধা
না  তিন তিন না
তেটে ধিন্ ধিন্ ধা

অভুক্ত দিন কেটে যায় মনবাউলের সাথে।
লন্ঠন নিভে গেছে আজ, আলো নেই কোথাও।
ঘুমিয়ে পড়ে পরাণসাঁই
শুধু ঘুমায় না তার হাতের আঙুল !

ধা  ধিন্  ধিন্  ধা
তেটে  ধিন্  ধিন্  না।


যুদ্ধ

দিনগুলি নিঝুম
রাতেরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে।
বাতাসে ভরকরে বারুদের গন্ধ
রক্ত নদী বয়ে যায়, নতুন জন্মের দিকে।

পানার মত ভেসে যায় মানুষের পচা লাশ।
অথৈ জ্বালা বুকে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন
সমরের সাথিরা নিয়েছে বিদায়
গভির অরণ্যে কাটে যুদ্ধের নয় মাস
কাঁধে ছিল  ত্রি নট ত্রি রাইফেল।
ভেষজ জীবন পার হয়, একটি গোলাপের আশায়।

ভবের মানুষ হেঁটে যায় পূবের দিক, পড়ে থাকে-
বাস্তু ভিটা, হালের লাঙল, আধা পাকা সব জমির ফসল।
ভূমিপুত্র  লড়াই করে-
দিনের আলো মিশে যায় নতুন যুদ্ধের টানে
হঠাৎ গুলির শব্দ, আগুনের ফুলকির মত সে গুলি!
উড়িয়ে নেয় প্রাণ পাখি, স্বাধীনতার নেশায়।
সমস্ত লাল মিশে যায় কালিন্দি নদীর ঢেউয়ে।

ব-দ্বীপে লাল সবুজের নিশান
বারুদের গন্ধে দু চোখে ঘুম আসে না।
সব সুখ ফিরে আসে যুদ্ধ জয়ের ঘরে,

শুধু মানুষগুলো আর ফিরে আসে না।


চাষারপুত

উর্বর শস্যভূমি থেকে মুছে ফেল সব বিভক্তিরেখা
সমস্ত মাঠ ভরে যাক অনাগত শস্যের গর্ভবতী বীজে।
ফল্গুধারার মত ভরে যাবে গৃহস্থের গোলাঘর
কালের বর্গাচাষিরা ভেঙ্গে ফেল সব গাণিতিক জ্যামিতি।
মহাপ্যাচের মিতি- পরিমিতি।
সমস্ত আইল তুচ্ছ করে পুরো প্রান্তকে মিলিয়ে দাও।
সবাই হয়ে যাক সমানে সমান।

শীতনিদ্রায় জর্জরিত সাধের মূল্যবোধ
চাষারপুতকে করে দিয়েছে একা।
সে এখন জোড় বেজোড় বোঝে না, মাথায় শুধু-
ডেবিড কেডিট আর ডিজিটাল একাউন্ট নম্বর।
তিনবেলা খাবারের থালায়- ফরমালিন
আমিষের লাফালাফি।

বিভক্তিহীন ফসলের মাঠে বর্ণিল শস্যের বাহার
মুষ্টি চাল, ঝুনা নারকেল আর জলি দুধের ক্ষিরে-
ভরে উঠে বট তলার মেলা।
ভাটিয়ালি, মুর্শিদীর সুরে গ্রামবাসী কাঁদে ;
সে কান্না সুখের না হরষের।

চাষারপুত ছাড়া তা কেউ জানে না!


মঞ্চের টানে

আজও আমাকে টানমারে
পাদপ্রদীপের আলো।
মন ছুঁয়ে যায় স্বর্গ নরক।
কখনও মনে হয় থেসপিসের হাত
ধরে উঠে যাই কোন মাটির টিলায়।

আজও আমাকে টানমারে
কোরাসের দল।
গোল হয়ে আসে পাচদোহার
নবাবের শেষ সংলাপ তবু
শেষ হয় না।

কোথায় লুকলে পলমরি
আমাকেও নিয়ে যাও নাটকের দেশে।

আজও আমাকে টানমারে

মঞ্চের শুভ্রতা আর শূন্যতায়।
অভিনীত চরিত্ররা ফিরে-ফিরে আসে।
বিবেকের গান আর কথকের বন্দনায়
আমি শূন্যে হাঁটি আর শূন্যে মিলাই।

আজও আমাকে টানমারে…!


শীতের সকাল

মাটির মমতায় পৌষের বৈকুন্ঠ বিলাপ
ঝড়ের মতো নাড়াদেয় উদ্বাস্ত শহর।

কোথায় শীতের সকাল!

মূহুর্তে ইশারায় ডাকে
আলো ঝলমল আমদহ গ্রাম
শীতের কুয়াশা ভাঙ্গা ফুলেল সকাল।

খেজুরের রসের মত, সে গায়ে সুখ ছিল।
মাটির বাসনে মায়ের হাতে পিঠাছিল
উলে বোনা মাফলার ছিল, সবই ছিল।
সন্ধ্যায় মলন চলতো- গাজীর গানে ভরে যেতো
গবরলেপা উঠোন।

পাড়ায়- পাড়ায় মেলায় মেলায়
নাগরদোলায়-  চড়তো সবাই।

মনেপড়ে একদিন ডাকাতপড়া শীত নেমে ছিল আমদহ গ্রামে।
পুরো গ্রাম শীতে কাঁপছিল।
শুধু শিশুরা সেদিন ভোরে খালি পায়ে হাটছিল আর গাইছিল-
নগরকীর্তন।

আজ গ্রাম ভেঙ্গে হয়েছে নগর!
মনঘড়ি পায়ে পায়ে হাটে পূর্বপুরুষের পায়ের ধূলো খোঁজে।
প্রাজ্ঞ নাগরিক আজ ভুলে গেছে শীতের সকাল।
এ শহরের আলো আধারে প্রেম আসে বারবার
শুধু বছরে শীত আসে একবার।


জলকীর্তন

মূর্ধন্য সূর্যের তেজ আমাকে বার বার
জলের কাছে নিয়ে যায়
পিপাসার শরীরে লোনা ধরে।
জোয়ারের আশায় মন
মাতায়, ঝাপায় দুনিয়ার প্রান্ত
থেকে অন্য প্রান্তে।

নদী নারী মৃত্তিকা জলকীর্তন করে
পিপাসা কাতর শঙ্খচিল
মেঘেদের বর্ষার গান শোনায়।

আদিম পৃথিবী থেকে জলের স্তর
নেমে গেছে সীমা থেকে শীলায়
প্রকৃতির বৈরিতায়
বিপ্রলব্ধে মধুমতি
পদ্মার বিহনে কুমার
কালের মৃত্যু ঘটে
ঘন হয়ে আসে মহাকাল।
জলমঙ্গলের আশায়
উদাসী বেহুলা আসন পাতে
অর্বাক বৃক্ষের তলায়।
বৃদ্ধ সবই দেখে, মৃদু হাসে
আবার নদী হয়ে যায়।


ভাগের মানুষ

রানী ভবানীর রাজ প্রাসাদে
বসে আছে কালের খেয়া
জলডুঙ্গির জলধারায়
চিৎ সাতারে ডুব সাতারে
ভাসতে থাকে বনলতা।
সুলক্ষণার রাজ বাড়িতে
দেখা দিল ভাগের মানুষ
অবাক চোখে দেখি শুধু
ছোট তরফ বড় তরফ।
কাচারী বাড়ির আমোদগুলো
নিয়ে গেল ঘড়ির কাটা
রাস লীলা নাশ হলো
রইলো শুধু কথার কথা।
বনলতার স্বপ্নগুলো
লুটে নিলো ভাগের বাঘে
শরীর শুধু পড়ে রইলো
বাইজি ঘরের অন্ধকারে।
রানী ভবানী রানী ভবানী
কোথায় তোমার গেরস্থালি
মানুষ গুলো ভাগ হয়েছে!
বাঘ হয়েছে, ভাগ হয়েছে!
আগুন মুখে গিলে খাবে
সভ্যতারই  শুভ্রতাকে।

১০
মৃগশিশু

এরিস পর্বতের গুহায় জন্ম নেয় এক দুধের শিশু
তাকে প্রদক্ষিণ করে উদাম আকাশ
শিমুল তুলো মেঘ।
বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় আতুরের গন্ধ
মিশে যায় কালিন্দী নদীর ঢেউয়ে।

দীর্ঘ দিন অবকাশের পর মৃগ শিশুটি উঠে দাঁড়ায়
চোখ খুলে দেখে বসুধার দুয়ার।
বিষঅনল মায়ার খেলায় জাগ্রত হয় পাপ
বৈরিতা আর ধ্বংস তার খেলার- খেলা মাত্র।
শিকারের সন্ধানে পাপের শরীর-
ভান ধরে বসে থাকে গুহার ভেতর।
ভারী নিঃশ্বাস শিশুটির গায়ে লাগে।
হঠাৎ এপোলোর মন্দির থেকে গড়িয়ে পড়ে পূজোর থালা।

পাপাত্মা ঢুকে যায় শিশুটির অন্তর্ধানে-
এঁকে দেয় ঘোর তমসা আর ধ্বংসের কুট-কৌশল।

বাতাসে ভর করে নিমেষে উড়ে যায় সে-
প্যারিস, সিরিয়া এবং কান্দাহারে।
গায়েবী ভারী অস্ত্র তার কাঁধে
রক্তপাত ছাড়া পৃথিবী উর্বর হবে না বিশ্বাস তার মনে।

কালিন্দি নদী কাঁদে আতুরের গন্ধে।
লজেন্সের খোসার মত পড়ে আছে মানুষের শরীর।
জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে মানবতার নিনাদ্র।
আমোদে আত্মহারা পাপ!
স্বজন হারা মানুষ ঘন হয়ে আসে।
নাবিকের হাল, মাস্তুল, পাল সব ছিড়ে যায়।
খুনিদের রক্তাক্ত হাত পাথর হয়ে ওঠে।
কালিন্দির কান্নায়-
নদীতে জলের রঙ বদলে যায়।

 

———————————————-

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E