৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ২৫২০১৭
 
 ২৫/০৪/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

মেহেদী ধ্রুব

মেহেদী ধ্রুব

মেহেদী ধ্রুব। সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক। জন্ম ১৯৮৯ সালে, ৩ ফেব্রুয়ারি। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায়। স্কুলজীবনে কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে লেখালেখির শুরু। এ পর্যন্ত দৈনিক সমকাল, দৈনিক সংবাদ এবং লিটলম্যাগ চিহ্ন, শালুক, গল্পপত্র, গল্পকথা, বয়ান, পাতাদের সংসার এবং ওয়েবম্যাগ কথা ও কবিতার ঘ্রাণে বেশ কিছু গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে।

মেহেদী ধ্রুব-এর কবিতা ভাবনা

একদিন এক ঝড়ের রাতে আমার দুঃখের সাথে মানুষের দুঃখের দেখা হয়ে যায়। তখন তারা চোখাচোখি করে, কাছাকাছি বসে ভাবাভাবি করে। তারা চলে যাবার সময়ে আমার হাতে দিয়ে যায় নীলকণ্ঠী পাখির পালখ। আমি সেই পালখ দিয়ে এক এক করে আঁকার চেষ্টা করি শঙ্খঝিনুকের চিহ্ন। কখনো সারা রাত ধরে খুঁজি গোপন এক ঝিনুকপাখি। হয়তো সেই পাখি আমার মগজেই বাসা বেঁধেছে। আর গান গেয়ে যাচ্ছে সুর অথবা অসুরের।

মেহেদী ধ্রুব-এর কবিতা


জন্মান্ধ শিউলিগাছ

জন্মান্ধ এক শিউলিগাছ এক নদীর পানি পান করে না কখনো
এক মাটির চোখের ডগায় টেনে দেয় না কাজলের শেষ আঁচর
তবু তার ঘ্রাণ পায় মানুষেরা, তবু তার ভাসমান সৌন্দর্য মেখে
দুয়ে দুয়ে চার সাজে কেনাবেচার রাজকন্যারা, আমিও মাথায়
পরেছি তার উত্তরজন্মের দুমুখো পাপড়ির অবিন্যস্ত চুল, কিনে
আনা ভোরেও তার সাঁতারুদেহ ঘুম ঘুম ব্যাকরণে ব্যাখ্যা করে
খেলার মাঠে কুড়িয়ে পাওয়া নিয়মে কর্নের মতো এক রূপকথা।
তবু আমি বাগানের শেষ পাড়ে গোপনে গড়ে তুলি শিউলির ঘ্রাণ
তবু আমি অপেক্ষা করি শহুরে বসন্তে তৃষ্ণা শেষ হবে মস্তিষ্কের
তবু আমি বিশ্বাস করি আত্মহত্যা করবে জমানো সব অন্ধ রাত।


ফসিল

আমাদের পূর্বপুরুষেরা সমুদ্র-দর্শনে পথ ভুলে ছিল একদিন
বাতাসের একটানা আক্রোশে পানির বিশ্বাস নড়বড়ে হলেও
ব্লুফিনটুনা অথবা হগফিশ স্ন্যাপার দেখে জিভে জল এসেছে
আহত অক্টোপাস আর স্টিনগ্রের সঙ্গমে মাস্তুল বিষাক্ত হয়েছে
ট্রলারের ক্রমাগত ঘূর্ণনেও তাদের চোখে ছিল শিকারের তেজ।
এ ফেনায়িত স্রোতের উচ্ছ্বাসে মৌলিক নেশা দীর্ঘতা পেয়েছে
উন্মুক্ত গর্জন আর মিলিত হুংকার সৃষ্টি করেছে স্বতন্ত্র জলসিঁড়ি
মৃত্যু হয়েছে নাম নাজানা গ্রাউপার আর গর্ভবতী স্যামেনের।
একদিন তারা নোঙর ফেলেছে ঘরে, কাঁধে সোনা-রূপার বোঝা
একদিন সমুদ্রের জোছনায় ভেসেছে শুধু হাঙর ও তিমির ফসিল।


নিষিদ্ধ খেলা

শীতের চুম্বন সহ্য করতে না পেরে অপেক্ষার মৃত্যু বেছে নিয়েছিলো একটি শিউলিগাছ, আমাদের এক কালের প্রেয়সীরা শিউলির মালা পরে আগুনের কাছ থেকে শিখেছে কীভাবে অদৃশ্য হওয়া যায়, কীভাবে ফুড়ুৎ করে রহস্যের অবসান করে মাংস পোড়ানোর গন্ধ অমর হয়েছে, কীভাবে মাংসের পচনরোধে গন্ধমখেকোরা মজেছে এক নিষিদ্ধ খেলায়।


কাঠপুতুল

শীতের শুরুতে দাদুর সাথে গল্প শুনতে যাই বনের কাছে, আমাদের সাথে থাকে দাদুর লাল কুকুর, আমরা গাছের কাছে শুনি মানুষের গল্প। গাছেরা সপ্রতিভ হয়ে ওঠে, তখন তারা বলতে থাকে রাতের মানচিত্র, রাত নামলে তারা হেঁটে চলে নদীর দিকে অথবা উড়ে চলে মেঘের উপরে। তখন আমাদের রক্তে টান পড়ে, আমাদের নেশা ধরে, একদিন আমরাও হাঁটি দ্রুতপদে, একদিন আমরাও উড়ি দ্রুতরথে। আকাশে বাতাসে জন্ম নিই পুনর্বার, পরিদর্শন করি স্বর্গ আর নরকের আয়ু।একদিন পৌষের ঝড় আমাদের থামিয়ে দেয়, আমাদের সামনে থাকে শুধু শালবনের কঙ্কাল। তখন আমি কাঠপুতুল হয়ে যাই, দাদু আমাকে কোলে নিয়ে হেঁটে চলে, কুকুরটা পাশেই থাকে, আমি আবার মানুষ হতে চাই, আবার উড়তে চাই, কিন্তু দাদুর হাত পা শরীরে জন্ম নিতে থাকে বাকল-লতা-পাতা, দেখতে দেখতে দাদু গাছে রূপ নেয়, আমি নিজেকে গাছের মগডালে বসে থাকতে দেখি, দাদুকে দেখি না। কুকুরটা গাছের পাশে বসে থাকতে থাকতে মারা যায় একদিন। আজো দাদুর ঘুম ভাঙেনি, আজো আমি পুতুল। কাঠপুতুল।


ঘড়ি

আমার মাথার ঠিক ভিতরে টিকটিক আওয়াজ তুলে
জেগে আছে একটা ঘড়ি, ব্যথায় যখন ঘুম আসে না আমার,
তখন রাত তিনটে বা চারটের সংকেত দেয় সে,
অবাক আমাকে বলে, ‘বন্ধু এতোটুকু ব্যথা সইতে পারছো না’,
আমিতো আজন্ম এই ব্যথা বুকে নিয়ে তোমার চলার পথ বাতলে দিচ্ছি’।
বিব্রত আমি থমকে যাই, পরক্ষণেই চিন্তনের তারে সুর ওঠে,
‘আমিও কি এই ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছি না প্রথম দিন থেকে?’


কবিদের কোন ভাষা নেই

স্বপ্নের সকালে ইচ্ছামৃত পাখিরা মরে গেলে বেঁচে ওঠে খুব
তাদের ঠোঁটে ঝুলে না তখন বিষাদে রাখা খড়কুটোর স্তুপ
নদীও মরে কখনো সঙ্গোপনে শরীরে পরে জলের খোলস
জন্মান্ধ জেলের পাতানো জালে জমা হয় জন্মমৃত্যুর ছাপ।
কবিও মরে কোন এক ইচ্ছা মৃত্যু, পাখিরাও জানে কবিদের
কোন ভাষা নেই, তাদের সুতোয় মোড়ানো অনুভূতির তারে
ঝুলে শুধু মৃত পাখির কফিনেমোড়া কালো কালো কথা।


পাখি পাখি রঙ

ফড়িঙের আয়ু বেড়ে গেলে পাখি পাখি রঙ পায় তারা
তাদেরও আছে নিজস্ব ভাষা স্তব্ধতার ঘ্রাণের পাহারায়
তাদেরও পাখায় রোদের ছায়া লেগেছে হারানো ছোঁয়ায়।
ফড়িঙেরাও পাড়ি দেয় সমুদ্রের সীমানা গোধূলি বেলায়
আমাদের ঘুমের পাহাড় চলেছে পথে হারানো ঠিকানায়
আমাদের ভালোবাসা মৃত্যুর ঘরে ঘরে পেতেছে সংসার।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E