৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০১২০১৭
 
 ০১/০১/২০১৭  Posted by

লোকনাথ ভট্টাচার্য (১৯২৭-২০০১)

লোকনাথ ভট্টাচার্য

লোকনাথ ভট্টাচার্য

৯ই অক্টোবর, ১৯২৭ লোকনাথ ভট্টাচার্য চব্বিশ পরগনা জেলার ভাটপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন; মাতা কৃষ্ণদাসী দেবী। ২০শে মারচ, ২০০১ কায়রোতে সাহত্যসভায় যোগ দিতে যান এবং কার-দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।

কাব্যগ্রন্থ – মই ময়ূর মন (১৯৬৮); ‘হাঁটুতে হাঁটুতে নহবৎ (১৯৬৯); গোধূলিতে জ্যামিতি (১৯৭২); ঘর (১৯৭৫); ‘ খুনের শিল্পের ঢাকবাদ্যি (১৯৭৬), ‘অতি বিশিষ্ট অন্ধজন (১৯৯৭)।

উপন্যাস – ভোর (১৯৬৬); যত দ্বার তত অরণ্য (১৯৬৬); দুই-একটি ঘর, দুই-একটি স্বর (১৯৬৭); বাবুঘাটের কুমারী মাছ (১৯৭২); থিয়েটার আরম্ভ সাড়ে সাতটায় (১৯৮৩); অশ্বমেধ (১৯৯৭); গঙ্গাবতরণ (১৯৯৮); করেছ একি সন্ন্যাসী (২০০০)।

নাটক – শ্রী শ্রী কালীমাতা রেশনভাণ্ডার (১৯৬৮); কাক (১৯৬৯); ঠাকুর যাবে বিসর্জন (১৯৭০); বাঘের চোখ (১৯৭০); এক রাত্রি, এক নারী (১৯৭২); চক্র (১৯৭৪)।

গল্পগ্রন্থ – প্রেম ও পাথর (১৯৭৩); আপনার কীর্তি (১৯৯৮)।

প্রবন্ধ – তিক্ততার এই রঙে জন্ম (১৯৭৭)।

অনুবাদ – নরকের এক ঋতু (র‌্যাঁবো/কাব্যগ্রন্থ) (১৯৫৪); তার্ত্যুফ (মলিয়ের/নাটক) (১৯৬৩); এক দিগন্ত দিনান্তে (ফরাসি কবিতা পরিক্রমা/প্রবন্ধ) (১৯৬৫); গান্ধী – রঁমা রলাঁর দৃষ্টিতে (১৯৬৯); পদ্ধতি বিষয়ক আলোচনা – দেকার্ত (১৯৭৬); শব্দ -জাঁ পল সার্ত্র (১৯৮৮); আরি মিশো – এক স্তম্ভ শিলা (নির্বাচিত রচনা) (১৯৯১)।

 

লোকনাথ ভট্টাচার্য -এর কবিতা


পুনরুক্তির মাঝরাতে

হোক না পুনরুক্তি, তবু নিরুত্তাপ নয় যে-হাতটা বাড়াই তোমার হাতে–যা বলি, ভালোবেসেই। তাই খেদ নেই একই অরণ্যে-পথে, নিশীথিনীর শব্দহীন গন্ধহীন তমিস্রাতে আমি মশগুল স্নেহাকুল বুকে-বাজা ভোর নিয়ে, পাশে তোমাকে নিয়ে।

যেমন তোমারও, পা দুটোই আমার, পথটা তো নয়–তাই হোঁচট যদি খাও, রক্ত ঝরে, তো দোষ দিও পথেরই কর্তাকে। তুমি তো জানোই জানি, অরণ্যটাও আমার সৃষ্টি নয়, রাতটাও নয়। বুকে বাজে ভোর, দেবি, বুকে বাজে ভোর–শোনো, আমাদের পায়ে-পায়ে যে পৌঁছাতে চাওয়ার গান।

ক্লান্তি তোমার স্বাভাবিক, আমারও, এ-হাওয়াহীনতা গলা টিপে ধরে। যোঝার অস্ত্র শুধু ভালোবাসা, সেই নিশ্বাস তোমার-আমার–আর কী বলব এই রাতে?

অতএব হাত দাও হাতে, ফেলে যাবই এ-নিসর্গটাকে, পৌঁছোবই যেখানে অন্ধকার ক্ষীণ হয়ে আসে, গ্রামের প্রথম মুরগীটি ডাকে। তার একটু পরেই তোমার কপালে যেমন, আকাশেও লাল টিপ–গোলাপি আলোয় ধৌত মুখে অবশেষে বসব আঙিনায়।

বুকে বাজে ভোর, দেবি, বুকে বাজে ভোর।


এলে তুমি মালবিকা

দেখতেই পাচ্ছো, আমি প্রস্তুত নই–আর শুনলে না? –তোমার প্রস্তাবের পরেও বলেছি, ওরে বাবা, শিবনারায়ণপুর, সে যে অনেক ক্রোশ দূর, গোটা রাতের শেয়াল-ডাকা পথ!

তুমি বলেছো পথের শেষে ভোর, পথের শেষে গ্রাম, উত্তরে আমি যুক্তি টেনেছি রাতের শেয়াল-ডাকা পথের।

আজ এলে তুমি মালবিকা–চোখে তোমার একই তরঙ্গ যা চিরকাল দেখেছি–যখন আমার চোখে সন্ধ্যা নামে-নামে, মুখের উপর পাখির কাকলিহীন গোধূলি নিঃশ্বাস ফেলে।

শোনো এই শান্ত ক্লান্ত উক্তি, আমায় কাঁপালো না তোমার ভোর, আমি কোনো ইচ্ছাতেই নই স্পন্দমান–আর জানো? –একই নামে ডেকে ডেকে এ-দেয়ালের সব কোণগুলোকে লজ্জায় অপমানে বেকুব করে দিয়েছি।

যাও, বেলা বয়ে যায়, তোমার সঙ্গীরা বাইরে দাঁড়িয়ে।

শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলেই–চিরকাল বেসেছি মালবিকা, তোমার চিন্তার রঙে আমার আকাশ কত অবকাশে রঞ্জিত–যাবার আগে বলে যাও, কথাগুলো বুকে বিঁধে দাও বর্শাফলকের মতো, আমায় ঘৃণা করলে।

হয়তো এখনি নয়, তাতে পরে কোনো এক সময় তরঙ্গ উঠুক এই আমাতেও, মুক্তি অবশেষে পাই, নিজের প্রতি জাগি ক্ষমাহীন নির্মমতায় আসন্ন রাতের এক বিনিদ্র বিদ্যুৎগর্ভ মুহূর্তে–যখন তোমরা অনেক, অনেক দূর চলে গেছো।


অক্ষর হ’ল নদী

আমার নয়, অক্ষরের। মুক্তি আমাতে। নদী। চলেছে। তা শুধু বাড়াল বোঝা দুর্ভেদ্য অন্তরালের, পাষাণ জগদ্দলের, অচল, যাও আমার। একবার বলি, এইবার দরজা-খোলা, খিড়কি প্রস্তুত খোলার জন্যে, আমার হাতে । অন্যবার বলা বৃথাই, বলা আত্মার কান্নায়, খোলো দরজা–বলি। কাকে?

এই সৃষ্টি, দুটি হাত, আমার। আর ফুল ফোটে নির্লজ্জ। আর প্রিয়া ভালোবাসে। আর, ভালোবাসি ভাইকেও, কাছের, দূরের । কোলের পৃথিবী, যেন নারকেলের খোলের পৃথিবী, আবার যে-পৃথিবী দূরের, দোলে, এই এক মুঠোর বুকে।

আজ যদি ফিরে যাই সন্ধ্যায়, যদি না-ই যাই, তবে?

অক্ষর মুক্তি পেল আমাতে, রূপ দিতে অক্ষরকে।

ফিরে আমি যাব শেষে আজো সন্ধ্যায়, কারণ আমায় ফিরতে হবে, আবার চলার আগে, আবার ফেরার আগে। (কাল সকালে সূর্যোদয়, ফুল ফোটা, প্রিয়ার রাত্রির পরে) কারণ আনাগোনা, নিয়তি, মানুষের । ফেরার নয় অক্ষরের ।

ভাই, হাঁপিয়ে পড়েছ? আমি পেতে দেব আসন। আমি এনে দেব মাদুর, মেদিনীপুরের। দেব? ভাই

অক্ষর নদী হ’ল আমাতে। সে এখন বাঁচে আপনার স্বত্বাধিকারে।

মুক্তি কেন দেবে স্বাদ বন্ধনের? কোন মুক্তি মানবে না কিছুই, মুক্তি ছাড়া? ভাই, তুমি কেন হও না অক্ষরের?

বারবার চেয়েছি বাজাতে, যে-সংগীত তোলার ছিল, আজো তোলার আছে, আমার ঘরের বীণায়, যে-একই সংগীত বাজে দিনের, রাতের, দিনেরাতের ওপারের আঁধার বীণার তারে। এদিকে অক্ষর হ’ল নদী–আমার ধ্যানের সন্তান, আমাকে উল্টে ফেলে দিয়ে, আমাকে অস্বীকার ক’রে, ঐ চ’লে গেল সে, ঐ চ’লে যায়, আর নয় আমার ধরার, ছোঁওয়ার নাগালে।

সে পেল, পায়, যেখানে সব, সে-জগতে অন্য সূর্যাস্ত দিনশেষে–আমার, আমার প্রিয়ার চোখে তার আলোক পড়বে না।

এখানে–রইল স্বাদ শিকলের। নয় শুধু নির্বিশেষে শিকল, নিরুপায়, তার, নদীর অভাবের–কিন্তু এক অন্যতর শিকলের, যে প’ড়ে রইল ঐ স্বৈরিণী স্বয়ংবরা নদীর অবহেলিত কামুক, আক্রোশে।

ভাই, তুমিও রইলে সঙ্গে। তুমিও বুঝেছ। আর বলা কেন?


অন্য রঙ

আমি ক্ষীণকন্ঠ বহুদূর হতে, সঙ্গী তোমার। যেন যা বলছি শুনতে পাও; হে সন্ধ্যার মানুষ, আশা রাখো এই বিধ্বস্ত প্রান্তরে, যেখানে প্রাণ বলতে তুমিই আজ- একটি ফুলও জীবন্ত নেই, একটি শিশুও না, হাওয়া কাঁদে গুমরে-গুমরে কত মানসীর স্মৃতিতে।

তবু যতক্ষণ আছ, জেনো আকাশ দেখছে তোমায়- আকাশেরই মতো বড় তুমি আজ, হঠাৎ- সারা রাত ধরে দেখবে অরুন্ধতী,কালপুরুষের বিস্মিত নয়ন। এত আকর্ষণ কখনো ছিল না তোমার- জেনো যা বাজছে শেষ নয়, শুধু আবার আরম্ভ্বেরই গৌরচন্দ্রিকা অনাগত আসরের বীণায়।

আততায়ীরা গেছে যাক, সমাপ্ত তাদের কর্তব্য- তবু নিশ্চিত জেনো ওদের দলেরই কোনো প্রেয়সী যৌবনে সম্বিৎ হারাবে, কাঁপতে কাঁপতে পথ চিনে ঠিক আসবে একদিন সুরভিত অন্ধকারে। প্রেমোন্মাদ সে-উন্মুক্তযোনিকে ইতিহাস বলে দেবে বলে দেবে তোমার ঠিকানা স্থির তর্জনীতে।

প্রতিশোধের পালাবদলে সেদিন আকাশ ধরবে অন্য রঙ, এ-বিধ্বস্ত প্রান্তরে উঠবে দালান,মমতার পাতায়-ছাওয়া কুটীর- আবার শিশু হামাগুড়ি দেবে। কলগুঞ্জন তুলে চাকা চলবে।

আশা তুমি রাখবেই হে সন্ধ্যার মানুষ- আমি ক্ষীনকন্ঠ আজ বহুদূর হতে, সঙ্গী তোমার।


কৌটোর গল্প

ভ্রমণের পথ যেহেতু একই, রোজই, এভাবে যাত্রার বর্ণনা দিই কেন বার বার – এই তো প্রশ্ন?
উত্তর হল, সংখ্যার প্রতি আমার প্রেম।
যেন গম্বুজটা তিনবার আওড়ালেই তিনটে গম্বুজ হল, বা তিন কনে-দেখা আলোয় তিনটে ময়ূর হল, তিনটে তুমি হলে।
যেটা বলি না, কোনোদিনই না, সেই মনের গহনে সযত্নে বহন –করা কৌটোর ভীষণ অন্ধকারটাও তিনগুন হল।

আমি যে আজো আশা করে আছি, হে সুডৌল স্তনের মহিমা, আমরা ব্রমণে চির-সঙ্গিনী, একদিন নিজেই তুমি উদ্ধার করবে আমায় বার-বার এই একই ইঁটের সাজানো পিরামিড হতে, অবশেষে ঐ কৌটোর গল্পটা শুনতে চেয়ে।


যারা আছে, যারা নেই

যারা আছে, তারা আছে। যারা নেই, তারাও আছে।

কোথায়?

এই ঘরে।

কারা আছে?

তালিকা হবে একগাদা গদ্যের, তুচ্ছের, জড়ের। কখনো রকমারি কিছু, কিছু দেখতে মোটামুটি সুন্দরও, যদিও ধূলোর কাপড় পরা। এই যেমন হাতপাখা, যা ছবির মতো পেরেকে লটকানো দেয়ালে, বা মাটিতে পাতা আসন, যেখানে মনে হয় অনেকদিন কেউ বসেনি। বা কুলুঙ্গিতে অনিবার্য কৌটো, যা খুব কাছে না গিয়েও বলা যায় খোলা হয়নি জানিনে কত মাস ধরে এবং চাইলেও মরচের কল্যাণে আজও খোলা সহজ হবে না। কৌটোতে রয়েছি যখন, বলা উচিত ওটা একটা নয়, বহু জিনিসের সমষ্টি,কাণ গা-ভর্তি তার কাঁচের টিপও আছে, যার মধ্য দিয়ে আলো ঠিকরায়, কিন্তু সকল কিছুর মতোই যে প্রতিভাত আলো আজ ধূসর, রুগ্ন ও যার ফলে কৌটোটাকে কুষ্ঠরোগী মনে হয়। একটা বইয়ের তাক, যার উপর কিছু বইও। একটি ফুলহীন ফুলদানিও।

আর হ্যাঁ, সব ছাড়িয়ে কান পেতে শোনার মতো নিস্তব্ধতা আছে।

এবার, কারা নেই? অর্থাৎ না থেকেও কারা কারা আছে?

প্রথমেই, ফেলে এলাম যাদের বাইরে। আমার মুদ্রিত নয়নে তাদের বর্ণনা আছে। আমার নিশ্বাসে এখনো তাদের ঘামের গন্ধ, আমার হাতের চেটোয় তাদের আকুল আকাংখার গোটা একটা পৃথিবী। মন জুড়ে বসে আছে একটা অপর্যাপ্ত আয়ুব আকাশ যেখানে তাদেরি দুঃখের স্বপ্নের রঙে শাশ্বত গোধূলি, ও যে-আকাশের তলায় গঙ্গাতীরের নিসর্গ, সারি-সারি ভাঙা মন্দির, অন্য কোন জন্মের শৈশব স্মরনের মতো।

দ্বিতীয়ত, রয়েছি আমি নিজেও। অর্থাৎ নিজের যতখানি দেখা যাচ্ছে না, জানছি না, যে স্ফুলিঙ্গ থেকে থেকে ঝলক মারে কোন মণিকোঠার গুহায়, হৃদয় ঘনঘটার রাত, দূর দূর অরণ্যে উল্কি আঁকা কত বর্বর দামামা বাজায়। আছে নিজের মধ্যে নিজের এই প্রশ্নটাও – কেন ঢুকেছি ঘরে, কে ঢোকালো ? কী দেখব এখানে, কী দেখতে চাইব আমি? ও তাই জল্পনা কল্পনার নিরবিচ্ছিন্ন মালা,লাফ দিয়ে সামনে আসা কার বিচিত্র মুখ, ভ্যাংচানি,ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হো হো হাসি, পরেই ,নিমেষেই, এসবের অন্তর্ধান । অথবা সহসা কী এক সুখকর চেতনা, যেন নদীর দেহের মতো নারীর সঙ্গে সঙ্গমের, চোখে মুখে তুরীয় মুহুর্তের পুষ্পবৃষ্টি। কিম্বা নেহাৎই ক্ষুধা, খাদ্যের, বা প্রেমের, বা ঐক্যের।

এইবার, যারা আছে, তারা তো যেহুতু আছেই, এবং যারা নেই, তারাও যেহুতু আছে, এদের দুই দলকেই, মেলাই অন্য এক অভিনব অস্তিত্বের রসায়নে – হয়তো একই কথা,আমি মেলাই বা তারা নিজেরাই মিলছে, বা আমি কিছুটা মেলাই, তার কিছুটা নিজেরা মিলছে।
হচ্ছে কী, সার বস্তু সেটাই।
কী হচ্ছে?

ঐ দ্যাখো, কী আশ্চর্য, রোজ আমি এই একই প্রশ্নে এসে থামব, অথচ যারই উত্তর একমাত্র ইপ্সিত বক্তব্য আমার চিরকালের, তবু যেটা জানি কখনো বলা যাবে না, অন্তত আমার দ্বারা না। আমি থাকব পড়ে যে-প্রকাশ নিয়েই, তার নিয়তি গদ্যের, তুচ্ছের, শবের চোখে পিচুটি পড়া ব্যাখ্যার, অর্থাৎ আমার বর্ণিত সেই প্রথম দলটি।
অন্য দলটি স্বপ্ন, দুঃখ, যা-ও নয় সত্যের সম্পূর্ণ নাম।

আভাসেও বুড়ী ছোঁওয়া হল না, রোজকার মতোই – তবু যেটূকু বলেছি, তাও ছোট মুখে বড্ড বড় কথা। স্পর্ধার টানে তার ছেঁড়ে-ছেঁড়ে । মুখের চেহারা পালটে যায় যখন, তখন আত্মসমর্পণের এই প্রণাম অতএব- বুঝছি রক্ত চড়ছে মাথায়, এবার ঘর থেকে বেরোনো ভালো। কারণ আবার, বারবার, ফিরে আসতে তো চাই- আসতে তো হবেই।


আমার বলার সময়

আমার বলার সময় হল।
আমার হাড় থেকে, লিঙ্গ থেকে, মেদ-মজ্জা-রাত্রি হতে, প্রিয়া খসে গেছে। চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে শিশুর মুখ, পদ্মের রক্ত পাপড়ি, নির্মম শিলায় জীবন মুছে গেছে, মৃত্যু ধুয়ে ভেসে গেছে বন্যায় এই হালকা শরীরে, এই হাওয়াহীন অন্ধকারে, আমি উড়ে যাব।
কার ছিল, কারা নেই। শাণিত বিদ্যুৎ চড়ুইপাখির মতো খেলা করে নীরবতার আকাশে-আকাশে।
এমন একা, ভীষণ একা- কে আমায় দেখবে? আমিও দেখছি না নিজেকে। সব চোখ হয়ে বসে আছে, তাকিয়ে আছে। দেখার কিছু নেই।
ভেঙে পড়েছে সব প্রাসাদ, হাহাকার স্তব্ধ হয়েছে। স্বপ্ন ছিল কিনা, সে -স্মৃতিও নেই। সবই পথ, এত পথ, কোথাও যাওয়ার নেই। আর বাজে না কাঁকন, নাচে না নূপূর।
পৃথিবী পড়ে আছে জলেতে-বায়ুতে-অন্তরীক্ষে। শাণিত বিদ্যুৎ।
পাখনা গজালো শরীরে। এবার আমি উড়ব।
আমার বলার সময় হল।


মধ্যরাতে কবির উক্তি

আমরা সেই তারা, গত সূর্যাস্তের উল্কি ছিল যাদের গায়ে ও যাদের কোন ভ্রমে পারদর্শী নট ভেবে রাজার প্রহরী ধরে আনে দরবারে –ঝাড়লন্ঠন জ্বলে ঊঠেছিল তখনই, কারণ সন্ধ্যা হয় হয়।

রাজা বসেছিলেন ফ্রেমে-আঁটা ছবির মতো, ঢুলু ঢুলু চোখ, গোঁফে আঙুল চালিয়ে বলে ওঠেন, কী পার দেখি, কিছু তামাশা হোক।

দলের এই অধমই সেই সর্দার, অসভ্য অশোভন উক্তির সাহসে যার জুড়ি নেই, বলে উঠি, খেতে দাও-একবার, দুবার, পর পর তিনবার, তৃতীয়বার এত চেঁচিয়ে, হুমকি দিয়ে, যে হয়তো নিজেও চমকে ঊঠি, নাই বললাম মণি-মুক্তার পাখি বসানো সে মসৃণ মর্মর দেয়ালের বিড়ম্বনা।

রক্তচক্ষু রাজাঃ- ‘তবে এই বুঝি তামাশা তোমার?’ দে ছুট, দে ছুট, সঙ্গীদের নিয়ে, প্রহরীরা জাগবার আগেই-ফটক পেরিয়ে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে বন, বন পেরিয়ে এখন এই অন্ধকার অরণ্যের গহনে, হন্যে হয়ে মধ্যরাতের দূরশ্রুত হায়েনার হাসির হাহাকারে হঠাৎ-হঠাৎ -কে কার খাদ্য কে জানে।

প্রহরীরা পিছু নিয়েছেই। জানি এবার যদি ধরে, আর দরবারের জন্য নয়, তা হবে রাষ্ট্রের শত্রু বলে কারাগারেই পুরতে।

সূর্যাস্তের উল্কি ছিল গায়। ভোরহীন গ্রামহীন হে অরণ্য এই, হে মধ্যরাত, আমাদের এই এক কবিতার সময়।


ছায়া

মুখোমুখি মৃত্যুর, মুখোমুখি রক্তের, মুখোমুখি জীবনের। আমারি মৃত্যুর, আমারি রক্তের, আমারি জীবনের।

আর এই দিগন্ত, দিনান্ত, বনান্ত।

আর এই কে বলে গেল স্বপ্নের কথা, ফিসফিস করে, খোলা হাওয়ায়? বলে গেল হঠাৎ। যেন আরো আছে এসব ছাড়িয়ে, আরো হাহাকার আনন্দের ও বেদনার, ও ব্যর্থতার- মধুর,মধুর ব্যর্থতার। যেন একটি অপেক্ষার, নিরীক্ষার প্রান্তর, যে চেয়েছে হতে ধানখেত অনাগত অন্য এক সূর্যাস্তের সুষমায়।

শুনলে কি গঙ্গা ধমনীতে? শুনলাম কি?

বন রইল বাঁ হাতে, মাঠ রয়েছে সামনে- যে আরো আছে ছাড়িয়ে এসব, তারি মধুর, ব্যর্থ,অনিবার্য পান্ডুলিপির মত। মাথার উপরে আকাশ হতাশার, আশার, দুরাশার। চোখে আমার দূর সপ্তর্ষির ঘ্রাণ,ইতিমধ্যেই। প্রিয়া তার যর্থাথ অন্তঃপুরে,অর্থাৎ অন্তরে আমার। বিহ্বল, বিলীন, অথচ জাগ্রত।

আমি এক মানুষ নামহীন, ক্ষীণকায় – তবু এই অল্প আলোয় আমার ছায়াও পড়ে গেল পাশের ভাইয়ের উপর, সেও চলেছে।

১০
অনুক্ষণ সেই রাধিকা

অনুক্ষণ সেই রাধিকার কথা মনে হয়, যে একবার, কেবল একটি লহমারই জন্য, কী
ভেবে, বা কিছুই না ভেবে, চলতে-চলতে থমকে দাঁড়িয়েছিল, রাত্রি যখন ডানা-মেলা
ঈগলের মতো আকাশে-আকাশে,

সেই অভিসারিকা, যার হঠাৎ-স্থির গোড়ালি বুকে ধরে চিরকুমার মাটীর পৃথিবী হতে
চেয়েছিল মধ্যযুগীয় গীর্জার গাত্রে-খোদিত নতজানু যাজক,

আর যেন-অনন্ত খরার পর বৃষ্টি ঝরেছিল আমার শিরায়-ধমনীতে, রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা
এই বুঝি বেজে উঠল-উঠল শঙ্খধ্বনি, বাতাস পেল-পেল প্রাণ,
অনেকে যারা দ্বার-খোলা মাদুর-বিছানো ঘরে এসেছিলেন সেদিন, এমনিতেই,
বসেছিলেন কোনো প্রত্যাশা না করেই,

তারাও নিমেষে সে-কী করজোড় ভাস্কর্য, যাদুর মন্ত্রে উদ্ভাসিত কপাল–

যদিও হল না কিছুই, শঙ্খ বাজল না, চকিতে গতি ফিরে পেয়েই সে-নারী হারিয়ে গেল
দেওদার-অরণ্যে, পরে হয়তো দিগন্তে নীল রেখার মতো ভাসমান আরো-দূর পাহাড়ের
উদ্দেশে-উদ্দেশে।

শুধু প্রস্তুতির মুহূর্তটি আমিই আজও সাজিয়ে রেখেছি রেকাবিতে, দিনের পর দিন,
মাসের পর মাস, ওরাও নিত্য-নিয়মিত আসছেন, তাই খোঁজখবর দেওয়ায়-নেওয়ায়
আমার কুটীর কলগুঞ্জনময়,

আঁধারে বিদ্যুৎ খেলা করে যায়।

১১
বিকলাঙ্গ

কনুই-এর গুঁতো খেতে-খেতে এসে থেকেছি একটি ধূলিকণায়, জানি না তাতে স্বর্ণ
আছে কিনা, অথবা তা গোবরের ভস্মীভূত অংশ, কিম্বা তিন দিন আগে মৃত
উইপোকারই পিঠের ছালের একটুখানি।

অন্যের শরীরের প্রশ্ন উঠল বলেই এটাও জানানো ভালো, আমারও চোখটা-নাকটা-
ভুরূটা কে কোথায় যেন ক্রমশই কেড়ে নেয়, চোয়ালের খানিকটা কোন গিরগিটি
খাবলে নিয়ে গেছে, হাঁটুর কাছে গর্ত, যা দিয়ে শিরশির হাওয়া ঢোকে হাড়ে।

আমরা চোখটা আছে কোথায়?–ঐ দেয়ালের ছবির ফ্রেমে। নাকট্য?–কুলুঙ্গির
কৌটোর ভিতরে। ভুরূটা ?–ঐ-যে খড়টা হঠাৎ-হঠাৎ নড়ে-চড়ে, ঘুরে বেড়ায় এ-কোণ
থেকে ও-কোণে, তাইতে।

যদিও ভেবেছিলাম এসবই আমি বিলিয়ে দেব, সানন্দেই, জড়কে নয়, প্রাণের
জোয়ারে–ওঁ স্বাহা বলে ডান পথিকের ঘামকে, তোমার উচ্চারিত নামকে।

তাছানা ত্রিভুবনের অপ্সরী, সেই তুমিও তো স্বয়ং বসে রয়েছ সামনে, উরু-দুটি ফাঁকে
করে, আমাকে নিয়ে শয্যায় উঠে যাওয়ার আশায়,

যখন বাহাত অক্ষত হয়েও আমি সর্বাঙ্গে বিকলাঙ্গ, ফুঁ দিলেই ধ্বসে পড়ে যায়-যায় ঘর।

তাই ভাবনা, অবশেষের এই-যে ধূলিকণা, তাতে স্বর্ণ আছে কিনা–এমন যাদু যা
ফিরিয়ে দিতে পারবে হারানো অঙ্গগুলি।

১২
উপরন্তু যার পুরুষাঙ্গ

আমাকে এইবার সেই কথা দাও যা নয় রাংতার বাক্সে মোড়া, রঙিন ফিতে-বাঁধা,
বড়লোকের খোকার জন্মদিনের টেবিলে মিষ্টি হেসে আলতো করে রাখার জন্য আদব
কায়দায়।

আমাকে এইবার কথা দাও যা উলঙ্গ তো বটেই, উপরন্তু যার পুরুষাঙ্গে হয়তো
সবেমাত্র গনোরিয়া ধরেছে, বা হয়তো গিয়েছিল প্রেমিকার দরবারে, ফিরে এসেছে
উপহাসের চাবুক নিয়ে মুখে, যে আবেদন করেছিল খোলা-বন্ধ সব দরজায়, তবু চাকরি পায়নি।

যার আঙুলগুলো বেঁকে গেছে ক্রোধে-গ্লানিতে-অনুশোচনায়, যে ছটপট করছে জ্বলে
উঠতে চেয়ে, পারলে ঝাঁপিয়েই পড়ে সাততলা বাড়ী থেকে,

পথে-দেখা বসন্তের-আঁচল-মেলে-দেওয়া সুন্দর-সুন্দর পটের বিবিদের স্তনগুলো
যে চটকে ছিঁড়তে চায়।

আমাকে কথা দাও এইসব ভাবতে পারার, বলতে পারার, পরে অট্টহাস্য ফেটে
পড়ার, না-হয় কনে-দেখা আলোরই গম্বুজ নিয়ে সামনে,

না-হয় এখনই, যখন তুমিও এক আশ্চর্য স্তনেরই রমণী, ঈপ্সিতা প্রেমে ও প্রত্যয়ে,
পাশেই রয়েছে বসে আপাত-শান্তির স্ফটিকের প্রাচীরে নিজেকে ঘিরে।

১৩
আমার মেয়ের সঙ্গে দুটো কথা

আজ যারা চল্লিশ বা কাছাকাছি কোঠায়, আমার সমকালের সেই কত খোকা-খুকুদের
বলতে শুনি চোখ কপালে তুলে, নৈরাশ্যে-অবজ্ঞায়, “বাবা গো, কালে কালে দেখব
কত, কী অমানুষ হচ্ছে এই ছেলেমেয়েগুলো, কী অরাজক যুগ!”

আমি তো বলব, আবার যদি জন্মাতে পারতাম তোমাদেরই কালে, তোমার সঙ্গে এই
সকালসূর্যকে চুমু খেতে।

দেখছি তো, তোমরা শিখছ কত এই অল্প বয়সেই, শক্ত-শক্ত বীজগণিত-পাটীগণিত,
জৈব ও পদার্থ বিজ্ঞান–প্রাণের রহস্য, ফুলের সংকেত, আমরা তত শিখিনি। সময়
হলে ভালোবাসার যে-অট্টালিকা তুলবে, আমাদের বাড়ি থেকেও তা হবে অনেক সুদৃঢ়
কারণ ভিত্তি আরো গভীর।

আমি তো বলব, আবার যদি জন্মাতে পারতাম তোমাদেরই কালে তোমার সঙ্গে এই
সকালসূর্যকে চুমু খেতে।

তোমাদের ভোর এসেছে এক অন্ধ রাত্রির পরে, যার কিছু সাংঘাতিক কুয়াশা জানি
এখনো লেগে রয়। তাই পথে নামার অটুট প্রতিজ্ঞা তোমাদের, শত্রুর সঙ্গে এস্পার-অস্পার
যোঝার কী মরণপণ! বিশ্বাস করো, যা দেখেছি জ্বলজ্বল তোমাদের চোখে,
আগামী পথের অগ্নিসম্ভব দায়িত্বের এত বড় জ্ঞানে আমরা জাগিনি কোনোদিন।

আমি তো বলব, আবার যদি জন্মাতে পারতাম তোমাদেরই কালে তোমার সঙ্গে এই
সকালসূর্যকে চুমু খেতে।

১৪
বিলাতী কায়দা

এরকম আশ্চর্য রৌদ্র এক কমই আসে আমাদের বাসভূমের বছরে–

ছাতা-পড়া সাদা-সাদা বাড়িগুলোর হঠাৎ জন্মান্তর যেন কোন ভূমধ্যসাগরীয় তীরের
নীলের স্নানে, সারি-সারি ফুলন্ত কমলালেবুর গাছের সুবাসিত নিশ্বাসে–
চোখ দিয়েছ দেখতে

হে বিধাতা, যখন এই আমার পোড়া দেশে কিছুই দাওনি আর, যখন যে-গানের সুরে-বাঁধা
তানপুরা বেজেই চলেছে, ষড়জে-গান্ধারে-পঞ্চমে, উদারায়-মুদারায়-তারায়, তা
কখনো খরায় কখনো বন্যায়

শুধুই মরাকান্নার স্তিমিত ঠুংরি মহিষের আর বাড়ন্ত বয়সের মেয়েদের।

তাই কিছুতেই হতে পারি না নিজে যা আমি হতে চাই–মসৃণ দেওয়ালে টাঙানো সেই
নিপুণ শিল্পীর আঁকা ছবি, সম্পূর্ণ শান্তি ও সুষমার দ্বৈত মৈত্রীতে, যাকে দেখতে
আসতে পারা যায় জলের-কুঁজো-হাতে দূর-দূর খাড়াই-এর পথ ভেঙে, রিক্ত কোনো
ভিন্ন গ্রামের গোধূলির ময়ূরের রুগ্নতা হতে–

আমায় ঠেলে বেড়ায় বন্ধ্যা আকাঙ্ক্ষার কত-না দুর্দম জোয়ার, প্রার্থিত গম্বুজের কোণে-কোণে
নিষ্ঠুরতায় সিঁড়িহীন চারটি মিনার, এমন-কি ঘরে ধূপ জ্বালানো নেই বলেই
মধ্যরাত্রেও স্তনে হাত দিতে দেয় না প্রিয়া।

তবু কিছু না দিয়েও যে এই রৌদ্র দাও, তাকে দেখার চোখ দাও, এ-পাড়ার মুমূর্ষুক্ষণে
এখনো দিচ্ছ–স্বপ্নেরও অতীত পাহাড়ের সামনে পড়ে আমার সে-এক কোন জন্তুর
বিস্ময়, রোমাঞ্চিত অপ্রত্যয়–

তার জন্য হে বিধাতা, বিলাতী কায়দায় বলতে দাও

ধন্যবাদ, তোমায় ধন্যবাদ ।

১৫
বাইরে-ভিতরে বন

বাইরে তাকালে বন, ভিতরে তাকালে বন। এখনো দুটো দুরকম।

একটা শাল-তমাল-দেওদার, রৌদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ, ছায়ায় সুনিবিড় কোণগুলিকে
পোকামাকড়-পিপীলিকার আনন্দ। অন্যটায় নাম-না-জানা অন্ধকারের বসা, মণি-মুক্তার
হঠাৎ-হঠাৎ দ্যুতি।
তবু চোখ খোলায় ও বোজায় যে-কসরৎ, তাতে ইতিমধ্যেই ধীরে-ধীরে একটি
রসায়নের প্রক্রিয়া শুরু, লাল গেলাসে নীল মদ ঢালা। শাল-তমাল-দেওদারে মণি-মুক্তা,
অন্ধকারের বর্ষায় রৌদ্রে।

বাইরে তাকালে তুমি, ভিতরে তাকালে তুমি। এখনো দুজন দুরকম।

একজন গৌরবর্ণা, নাকে নোলক, পরনে ধনেখালি। অন্যজন কৃষ্ণাঙ্গী, হাতের কাঁকন
ভিন্ন অলংকার নেই দেহে, পরনে বেনারসী।

তবু ধীরে-ধীরে গৌরবর্ণার হাতে কাঁকন, কৃষ্ণাঙ্গীর নাকে নোলক–এক মোহনার
জল।

অপেক্ষা করছি আরো কতক্ষণ লাগবে দুটিতে মিলে সম্পূর্ণ এক হওয়ার, দ্বন্দ্ব ঘোচার,
পরে বহুদূরের যে-যাত্রীর দাঁড়িয়ে রয়েছে খেলা শেষ হওয়ার, তাদের সঙ্গে এ-
ঘরের ঐক্যকে বিদায় জানিয়ে
আমরা দুজনে বেরিয়ে যাব পরম বৈরাগ্যে।

১৬
কলকাতায় আজো বসন্ত

মনে টাটকা কৈশোরের মতোই, সারা বিশ্বে নোংরার প্রথমা প্রধানা রাণী কলকাতায়
আজো বসন্ত আসে–কৃষ্ণচূড়ার একই সমারোহ।

জাপানী যদি হতাম, গোটা তিনদিন তিনরাত ধ্যান করতাম সামনের কৃষ্ণচূড়াটার, তার
ফুল-পল্লব-প্রমত্ত রঙের রহস্যের, পরে আরো ঘণ্টা দুই সময় নিয়ে বাহারের কত রকমারি
কাটাকুটির পর সংক্ষিপ্ত আন্তরিক যদিও প্রথামতো অতি অর্বাচীনই চারটি লাইন লিখতাম,
এই যেমন

‘বসন্তে কৃষ্ণচূড়ার রঙ কী সুন্দর’ ইত্যাদি ইত্যাদি;

ও শেষে দীর্ঘ তৃপ্তির নিশ্বাসে বুকে ঢেউ তুলে উঠে পড়তাম–ধীর পা স্নানের ঘরের
দিকে–জীবন নিশ্চিতভাবে ধন্য জেনে।

এবং কে জানে, হয়তো পাঁচশো বছর পরে এক পুরাতাত্ত্বিক সম্পাদকের কোনো
ইউনেস্কো-সুলভ সংকলনে সে-কবিতা স্থান পেত টীকাসমেত, নামটা থেকে যেত।
অতএব এখন বুঝছ তো, আক্ষেপটা কোথায়?

কারণ উল্টে কৃষ্ণচূড়া, নিসর্গের চাবুক-কষা পরিহাস, আমার শহরের এ কী দিন এনে
দিলে দরজায়–সব কথার স্তম্ভিত অর্থহীনতার, ধেই-ধেই মৃত্যুর মুকুট-পরা-শির অন্য
আরেক কবিতা।

১৭
দরবারি কানাড়া

ভূত এড়াতে যে-খ্যাপা রামনাম জপে, অনেকটা তারই মতো আমি আওড়াই প্রেমের
মন্ত্র, প্রেম-প্রেম-প্রেম, আর পথ কাঁপে, পা কাঁপে। বিশ্বাস কর আর নাই কর, সে-
উচ্চারণের এমনই নিহিত শক্তি, কখন এই অন্ধকারে মানুষকে ভালোবেসে ফেলি,
মরুতে ফুল ফোটে, যেন নিজেরই অজান্তে।

কী ভালো যে লাগে, মজ্জায় কী মধুবাত, যেন আরোগ্যের শয্যায় রোগী লাল তাজা
কমলালেবুর রস পথ্য করে – এক ঢোঁক, দুই ঢোঁক, তিন ঢোঁক, যত চাও তত ঢোঁক
প্রাণ ভরে।

মানি, এটা আসেনি সঙ্গে সঙ্গেই, রাতের প্রথম প্রহরেই, কারণ মনে তো পড়ে – পড়ে
না? – সেই গ্রাম যা পেরিয়ে এলাম, যেখানে বুড়োদের দেখেছি শকুনের চোখ, শিশুরা
সম্ভাব্য খাদ্য তাদের । আর সে কী কাদা, সে কী কাঁটার ঝোপঝাড় এবড়ো-খেবড়ো
পথের।

তবু প্রেম-প্রেম-প্রেম, তাই এই দ্বিতীয় প্রহরেই প্রান্তর যাদুবলে দরবারি কানাড়া নিসর্গ,
স্নিগ্ধ আমেজ গাছের নিশ্বাসে, যেন বীণাও বাজে কোথাও।

সঙ্গে বেরিয়েও ওরা যে কোথায় মিলালো – না কি কাছেই আছে? – জানি না, আলোয়
দেখা হবেই। যদিও অনেক দেরি, জানি প্রত্যাশার ভোর পথের প্রান্তে জেগে রয়, রয়ই,
মালা হাতে স্বয়ম্বরার মতো – যত এগোই, কাছে আসি পুরীর তোরণদ্বারের।

আপাতত চলমান কানাড়ার নিসর্গ।

১৮
প্রৌঢ়া প্রেয়সী

এ-ব্যাধি বহুকালের। তাই ছেলেবেলায় যখন কবিতা লিখতাম, মাঝে মাঝে বিশ্বাসের
কথা বলেছি। আজ আর বলি না, কারণ হয়তো বয়স হয়েছে, পৃথিবীর ক্রূর
পাঠশালায় শিক্ষিত হ’য়ে বুঝেছি, বিশ্বাস ব’লে জিনিস নেই। তাই অবিশ্বাসও নেই।

আর সবই আছে, আমাদের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, বৃষ্টি-ঘাম-রোদ্দুর, তোমার চোখের চাওয়া,
খাওয়া আর পায়খানায় যাওয়া–দিনের পথে ঘোড়দৌড়, রাত্তিরের ঘুম। পায়খানার
নিত্য নৈমিত্তিক কোঁৎ পেড়ে চালান দেওয়া বিশ্বাস-অবিশ্বাসের যত তর্ক, গতকালের
খাবার–আর আজকের খাবারের জন্যে প্রস্তুত হওয়া।

ছেলেবেলাকার সেই বটগাছটা যদিও আজও সমৃদ্ধ, জানি আর বিশ্বাস নেই সে-
বুড়োটারও। আমরা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ঝিমোই।

মনে কোরো না এ কোনো সাবেকী দুঃখবাদী বক্তব্য–ঐ দুঃখটাও যদি থাকত তো
হয়তো বেঁচে যেতাম। আসলে বক্তব্যই নেই। আর–মনে পড়ে ? সেই মানুষী
করুণার দুটি গোলাপ আমার দুই হাতে দেবে বলেছিলে একদিন, তখন আমরা কিশোর
কিশোরী, দাওনি কেন? না প্রৌঢ়া প্রেয়সী, তুমিও সমানই অসমর্থ?

তবু পৌঁছোতে হবে মন্দিরে, পৌঁছোতে যে হবেই রাণী, কেন এই অকথ্য অবোধ্য
অভিপ্সা আজো আমার হাঁটুর অন্ধকার থেকে থেকে আকুল করে!

১৯
প্রেমের ও প্রেমাতীতের

বলতে হবে কেন এলাম?

এক পলক চাওয়ায় হানব সূর্যের রশ্মি ঐ শেওলা-পড়া দরজার বুকে–আনব ডেকে
যে-মন্থরতা মদিরতা রাত্রির, উন্মত্ত কোলাহলে।

যা ছোঁবে, তার সব হবে না আর পাথর; কান পাতলে শুনতে পাবে তাতে যোজন
দূরের কল্লোল, ক্রমাগতই এগিয়ে আসা।

আর সেই যাদু ঘটাতে গেলে একলা আমার আসা হবে অর্থহীন–এই আসা পাড়ি-দেওয়া
রাত্রি-অরণ্য-মরু (কেন ? কেন ?)–যদি না ঐ পদ্মচোখ তুলে তুমিও তাকাও,
দ্যাখো অতিথিকে।

জেনো আমার ফিরে যাবার নেই পথ, আসিনি ফিরতে।

এসেছি রিক্ত হাতে। ফুল গেছে শুকিয়ে আগুনের হাওয়ায়, দীর্ঘ যাত্রায়। শুকায়নি লগ্ন।

২০
সে আমায় দিয়েছে

সে আমায় দিয়েছে এক আশ্চর্য আগুন-আমায় দিয়েছে সেই আগুনে অনির্বাণ জ্বলার মত তেমনি বিরাট এক অন্ধকার। তাতে প্রতি মুহুর্তেই খুলে গেল পথ, জ্বলে গেল বুক। তবু তাও শেষ নয়।

আমি বলি তাই তারই কথা কখনো চুপ করে, কখনো গুমরে গুমরে,কখনো মরতে মরতে, জ্বলতে জ্বলতে। এই পাথেয় অশেষ, আমায় মুক্তি দিয়েছে, দাস করেছে অসহ্য নিয়তির, এ আমার মস্তিষ্ককে চিরবিমূঢ় করে দিয়েছে একেবারে জন্মের মূহূর্তেই, অবাধ্য আভায়, অকাট্য আঁধারে।

আমি কেবল ছুটব, হাঁপাব,মুঠো-মুঠো ভরব অন্ধকার, ছুঁড়ে দেব আগুনে। আর আগুন লেলিহান হয়ে শত শত প্রসারিত করে তাকে গ্রাস করবে অট্ট হেসে।

এই পোড়া মাটিতে যে-ফুল ফোটাই আমার বেদনায়, সে আগুনের ফুল- টেক্কা দেয় কোটি যোজন দূরের তারার সঙ্গে। আকাশ তাকে দেখবার জন্যে হয়েছে পাষাণ-শতদল-মুখ ঘুরিয়ে বিস্ফারিত সে চেয়ে আছে তলার দিকে, বোঁটা তুলে অদেখা শূন্যে।

যাকে বাঁধতে চাই, ভালোবাসতে চাই, যার রূপ গড়ে তুলি মনে-মনে, তাকে বৃথাই ডাকতে চাই একটু মূহূর্ত ধরে, এই অনন্তে জ্বলন্ত রাতের কারখানায়।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E