৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ২৯২০১৭
 
 ২৯/০৪/২০১৭  Posted by

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

প্রথমে  বলে রাখছি, আমার কাছে বড়ো কবিতাকেও মাঝে মাঝে ছোটো মনে হয় আবার ছোটো কবিতাকেও বড়ো মনে হয়। এটা আমার  কোনো ইন্দ্রিয়গত বিপর্যয় বা  অন্ধতা নয়, এটা আমার এক জাতীয় বিপরীত ইন্দ্রিয়চেতনা। এই ক্ষমতা দিয়ে ছোটো-বড়োর ঝামেলাকে মোকাবিলা করি আমি: দেহ থেকে মন আর মন থেকে দেহে গতায়াত করি। মনে রাখা দস্তুর, দীর্ঘ কবিতার ভেতর ছোটো কবিতা লুকিয়ে থাকে আবার ছোটো কবিতার ভেতরও অদৃশ্যভাবে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ কবিতা।

এখন আসি আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তরে:

কবিতা দিন দিন ছোটো হয়ে যাচ্ছে এটা কেমন কথা! কবিতার ক্ষেত্রে ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন বিধি কি প্রযোজ্য? কবিতা ছোটোও হয় না বড়োও হয় না, কবিতাকে হতে হয় নিটোল ও যথাযথ। তবে কবিতায় ঘটতে পারে বাহুল্য ইংরেজিতে যাকে বলে ৎবফঁহফধহপু, এটা দীর্ঘ কবিতায় ঘটার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু অনেক পঙ্ক্তি নিয়েও একটি কবিতা হয়ে উঠতে পারে যথাযথ, আবার কম পঙ্িক্তর কবিতাও হতে পারে ভঙ্গুরতাগ্রস্ত, ও বাহুল্যময়। বিংশ শতাব্দ এবং তার পরবর্তী সময়েও রচিত হয়েছে সার্থক দীর্ঘ কবিতা: এলিঅট, রিলকে থেকে জীবনানন্দ পর্যন্ত, এবং তারপর এখন পর্যন্ত, এ কথা বাস্তব হয়ে  আছে। ওয়ালকট বিংশ শতাব্দেই লেখেন ওমেরস। আমিও  তো লিখেছি তবে এসো, হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ। এখন অনেক তরুণ কবিরা দীর্ঘ কবিতা লিখছেন। ফলে দীর্ঘ অবয়বের কবিতা লেখার দিন ফুরিয়ে আসছে এটা নিছক বাগাড়ম্বর মাত্র।  আবার ছোটো কবিতার একক হিসেবে হাইকু বা তনকা এ সময়ে খুব যে  লেখা হচ্ছে বা ভালো  লেখা হচ্ছে তা বলা যাবে না। এটা দম-দুর্বলতাগোছের ব্যাপার না; যিনি খেয়াল গান তিনি বন্দিশও করেন। পাউন্ড তিন শব্দের কবিতা যেমন লিখেছেন তেমনি ক্যান্টোসের মতো দীর্ঘ প্রপাতধর্মী কবিতাও লিখেছেন। অক্তাবিয়ো পাসও লিখেছেন, যেমন, প্রায় ছয় শ পঙ্ক্তির কবিতা ‘সূর্যপাথর’ তেমনি তিন পঙ্ক্তির ‘ভোর’ নামক কবিতাও।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা  ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

দীর্ঘ ও ছোটো কবিতার ফেনোমেনাল পার্থক্য তো অবশ্যই তার অবয়বগত দীর্ঘত্ব আর  হ্রস্বত্বে , তবে  এপিফেনোমেনাল পার্থক্য অবশ্যই  প্রণিধানযোগ্য: এই পার্থক্য অনেকটা খেয়াল ও ঠুমরির  পার্থক্যের মতো। ছোটো কবিতায় থাকে বা থাকতে হয় মুহূর্তের বিস্মাপন আর দীর্ঘ কবিতায় পরাসময়বোধ বা অধিভ্রমণ। শব্দহীনতা হচ্ছে  হ্রস্ব কবিতার মর্ম, তা বাস্তবকে ছুঁয়ে থাকতে চায়। হাইকু সম্পর্কে বলা হয়: ন্যাচার ইজ লিঙ্কড উইথ হিউম্যান ন্যাচার। পাউন্ড যখন  লেখেন তিন শব্দের কবিতা প্যাপিরাস: ঝঢ়ৎরহম…../ ঞড়ড় ষড়হম…../ এড়হমঁষধ…..: বসন্ত/ অতিদীর্ঘ/ গঙ্গুলা, তখন এই কবিতাটির সম্প্রসারিত কোনো রূপ আমরা কল্পনা করতে পারি না, কবিতাটি নিজেই যেন তার তার বীজ এবং বৃক্ষ – একই সাথে, আবার জীবনানন্দর ‘অবসরের গান’-এর সামান্য সংক্ষিপ্ত রূপও আমরা কল্পনা করতে পারি না, এটি যেন অসংখ্য অন্ধনন্দন ও উদ্ভাস নিয়ে একটি একক যেখানে ফুটে উঠেছে অসম্ভব ও অসহনীয় এক মন্থরতার দর্শন। দুটোর ক্ষেত্রেই বিশেষত্ব এক: ভাষার মাধ্যমে মানবাস্তিত্বের রহস্যময় প্রকাশ ঘটানো, তবে হয়তো করণকৌশল কিছুটা ভিন্ন,।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন? খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি? গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

ক. ছোটো কবিতার গঠনকাঠামো হবে, হওয়া উচিত ছোটো, আর অন্তর্কাঠামো হওয়া উচিত একক উন্মীলনমূলক, এই আর কি! নানা ধরনের আঙ্গিক তো রয়েছেই। যে যেমনটা নেয়। আবার কোনোটা না নিয়েও ছোটো কবিতা লেখা যেতে পারে।
খ. কবিতা হলো কয়লার মাঝে মিশে থাকা হিরণ্য, অনেক খননের পর হঠাৎ দেখা মেলে, আর মন জ্বলে ওঠে।  কবিতার কাজ নয় তৃপ্তি দেওয়া বরং তার কাজ অতৃপ্ত রাখা। তৃপ্তি বা মনোরঞ্জন শব্দ কবিতার জন্য নয়, বরং অসহনীয় ও অসম্ভব শব্দই কবিতাকে বোঝার জন্য জরুরি। কবিতার কাজ জাগিয়ে রাখা, জীবনের রাতকে পাহারা দেওয়া।
গ. মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা এখনকার কবিতার জন্য কাম্য নয়। সুতরাং এর অন্বেষণ অপ্রয়োজনীয়।

৪. ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে? খ) আপনার একগুচ্ছ ছোট কবিতা পড়তে চাই।

উত্তর: ক.
দেখেন,  কবিতার ক্ষেত্রে ছোটো কবিতা বড়ো কবিতা, এই ভাব বা প্রতীতি আমার ভেতর কোনো রেখাপাত করেনি কখনও। কবির কাজ হলো , মালার্মের ভাষায়, জগতের অর্ফিক ব্যাখ্যা হাজির করা, তা সব কবিতাতেই সম্ভব। সমস্যাটা কবিতার নয়, কবির, অর্থাৎ কবির যোগ্যতার বা সক্ষমতার। তবে এটা ঠিক কবিজীবনের শুরুতে অনাবশ্যক সম্প্রসারণপ্রবণতা অনেক কবির ভেতর কাজ করে।
আমি পরিকল্পনা করে কোনো ছোটো কবিতা লিখিনি, তবে  দেখছি, শরীরী বিবেচনায় কিছু ছোটো কবিতা রয়েছে আমার, এটা হয়ে ওঠা। ভবিষ্যতে বিবেচনা করে ছোটো কবিতা চর্চা করব তা নয়, তবে লক্ষ করছি, হয়তো জীবন ক্রমশ নৈঃশব্দ্যমুখী হয়ে যাচ্ছে বলে আমার কবিতাও যেন আকারে ছোটো হয়ে আসছে, এটা নির্বাক্ হওয়ার মহড়া বোধ হয়।

খ.

ঝরে যাব বলে

তোমার কাছেই আছি চুপচুাপ
বলিনি তো কিছু এতকাল, বলেছি কি?
গোপনে গোপন ঝড় আসে, ঝড় চলে যায়
কে যেন একাকী এসে বলে যায়:
থেকে যাও, থেকে যাও, থেকে যাও আরও কিছু কাল,
আমি বলি, নশ্বরতা এখন তো রয়েছি
ঝরে যাব বলে―আসছেকাল

এই ঋতুকাল

সমুদ্রের পথগুলোকে খুঁজতে গিয়ে আমি
ডুবে গিয়েছিলাম
আকাশের পথগুলোকে ধরতে গিয়ে আমি
হারিয়ে গিয়েছিলাম,

এই ঋতুকাল প্রচ্ছন্নতার
যদি থাকে ডানা, জীবনের

ফোটোফোবিয়া

হাঁটার আগেই
তারা কেটে নিয়েছিল আমার পা-জোড়া
ঘুমানোর আগেই
ফেলেছিল উপড়ে চোখ দুটি
লেখার আগেই…
হস্তযুগল

জীবন ফোটোফোবিয়া
উঁকিবাজ অন্ধকার হাসে

নিদ্রাহীনতা

ঘুম জীবিতের
মৃতরা তো নিদ্রাহীন

তরঙ্গের চোখ খুলি, বুঝি
দূরত্বের রয়েছে যে দায়
মরুভূমি উটের আয়না
জিরাফ তো দাঁড়িয়ে ঘুমায়

দ্বিত্ব

নদীগুলো হলো রেখা
যা রচনা করে বৃত্ত―সমুদ্রের,
পাথর জানে এই ইতিহাস,
কেননা তাদের রয়েছে স্তব্ধতা
যা একাকার করে  হ্রস্ব আর দীর্ঘতার গূঢ়ৈষা

আমরা―আসলে দুটিই:
জীবন ও মৃত্যুর।

অঙ্ক

আমার মধ্যে যা নেই
তা রয়েছে তোমার ভেতরে
তোমার মধ্যে যা নেই
তা রয়েছে বৃক্ষের ভেতরে

: স্তব্ধ, আর স্তবকিত

পরিবর্তন
যা উঁকি দেয় শরীরে তোমার
: কঙ্কাল
প্রস্তুতি নেয়
: রূপান্তরে

অনন্তের
: তৃষ্ণায়

মদ

ওক গাছের পিঁপের ভেতর
ছলকে ওঠা মদ
এখন
মাতলামি করতে করতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
আমার করোটির পেয়ালায়

ভাষা

অব্যক্তের ভাষা নিয়ে লিখে যাই একটি কবিতা
তোমরা তা পড়ে নিয়ো, সুখীজন, ব্যক্ত মানুষেরা।

রূপান্তরিত

কেন্দ্র লঙ্ঘন করে যে পাখি ওড়ে তার স্থির ছায়া
জল ও পটভূমি নিয়ে সংকেতের মতো অস্পষ্ট
রয়ে যায়, শুধু দেহ জুড়ে বৃষ্টির সুতো দিয়ে
বেঁধে রাখা ঋতু আজ ভাসমান পাখিরোদে
উড়ে চলে যায়

প্রতিবিম্ব ঘুম যায়, পাখিদের চোখ থেকে ঝরে
ঘুম… স্বপ্ন… দিকে দিকে… শূন্যতায়…

আত্মপরিচয়

নাম যদি রাখতেই হয়, আত্মপরিচয় দিইÑ“ঘাস”
অস্তিত্বজটিল এক শিশিরস্থাপত্য নিয়ে করি বসবাস

প্রস্থান

অইখানে নিয়ে যাও, আর আস্তে করে শুইয়ে দাও যেন
মাটি না পায় টের
মেঘগুলো সবেমাত্র অদৃশ্য হতে শুরু করেছে

পা-তা-রা-ও ঝরছে

অতিক্রম

মুহূর্ত ভরে আছে মুহূর্তে
যেমন জীবনের ভেতর ডুব দিয়ে থাকে জীবন

স্তব্ধতার আয়না

না-বলতে-না-বলতেই
আমরা পেরিয়ে যাব বলার সীমানা

বৃষ্টিশাসিত বরষায়

মনে হয় আবরণহীন হই
জলে ও ছায়ায়, অন্তরীক্ষ বৃষ্টির নগর
এই মোহকাল, পরাজিত এবং গোপন
আমাকে তাদের কাছে নিয়ে যায় ইচ্ছাপ্রত্যাশায়
দেহ থেকে বের হওয়া শিকড়-বাকড়
জড়িয়ে রেখেছে এই অদৃশ্যতা, গূঢ় অভীপ্সায়
যেন আমি ত্বকহীন হই
যেন আমি হই পরিচয়হী

বৃষ্টিশাসিত  বরষায়

জলের সংগীত

তুমি তোমার দুই নীল বাহুর ভেতর ধরেছিলে দিন আর রাত্রি
দৃঢ় সূর্য তরল বুকে আলতো আদর বুলিয়ে দেয়:
যুগল আয়নায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মর্মর মুহূর্ত!

আমরা ভুলে গেছি জীবন
নীলিমায় তোমার  চোখ গাঁথা
তারা খুঁজে ফিরে আচ্ছন্নতা

আমি তোমার ভেতর লুকিয়ে থাকা বেলাভূমিতে হেঁটে যাই
আর উপভোগ করি বেজে ওঠা এই জলের সংগীত!

ক বি প রি চি তি

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো–কবিতা:
লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব (২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২). তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪); প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬) /অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯) , মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫), আত্মধ্বনি (২০১৬) ; অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪), বহু হই ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা (২০১৬)।

পুরস্কার: হুমায়ুন আজাদ কবিতা পুরস্কার (২০১০), লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০১০) ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E