৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ০২২০১৭
 
 ০২/০৮/২০১৭  Posted by

কুমার চক্রবর্তী

জলজাদুকর


রাংতায় মোড়ানো অন্ধকার নিয়ে এবার
হাজির হয়ে গেল জীবনবাবু,
দেখতে-দেখতে শুরু হলো ছায়াজীবনের চলাফেরা।
গতির ভেতর লাটিম খেলার দিন—
বারে বারে তাই অদ্ভুত শূন্যের জোড়াতালি
দুই বিন্দু চোখে ধরা পড়ে।

নাম ও মহিমা অবিরাম মন্থরতাময়
শুধু এক আরামের হাসি, ওষ্ঠের স্থিরচিত্র
যৌথ মেঘদ্বন্দ্ব: আমাদের ছায়ার লুন্ঠন শুরু হয়ে যায়
আলোর সাম্রাজ্যে আজ কাহিনির ফাঁকফোকরতা
জলজাদু আমাদের বিদগ্ধ করেছে।

আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি
সঙ্কেতখামার আর ব্যক্ত শালিখের সমন্বিত চিন্তাবোধ
আর ডানার দ্বৈতসাফল্য
জ্যামিতির ত্রিভুজরহস্য
সূর্যের জলচ্ছাপ নীরবতাকে স্পষ্ট করে তোলে
একটি শিখার মতো, পাখিদের উড্ডয়ন প্রতিভার মতো
বিশালতা এইখানে সান্দ্র নিবিড়তা নিয়ে
রয়েছে দাঁড়ায়ে।
ঝরে পড়া কয়েকটি মুহূর্ত
আত্মার ভেতর দিয়ে চলে যায় বছরের মূক নাচগান
পৃথিবীও তাই, আনুগত্য নিয়ে চিন্তা থেকে দূরে,
নিদ্রার ভেতর স্বরলিপি উড়ে উড়ে যায়,
কবিতার ভেতর রৌদ্রগ্রামের
ঘনছায়া… জীবন জীবন বলে
দরদাম হাঁকে।


শরতে এসে কাশবনের দেখা পেয়ে যাই
মনে মনে ভাবি
ঠাকুর তুমি তন্ত্রশাসিত, নদী পারাপার আর
চণ্ডীপাঠের সকালে আমাকে জলের
নিখিল সার্বভৌমত্বে নিয়ে এলে আমি
এসে দেখি রহস্যময় শব্দের ওঠানামা
অব্যয়মুক্ত প্রবাহের সর্বব্যাপী গীতধ্বনি
শাস্ত্রের মেঘ ও আকাশের স্থূল মহিমায়
বৃক্ষদের অদ্ভুত রেডওয়াইন
এক অসম্ভব ব্যবস্থাপত্র; তাই
তুমি বঙ্গের প্রফুল্ল
কীভাবে ব্রহ্মপুত্রের বঙ্কিম ব্যঞ্জনায়
কবিরাজি দক্ষতায় অরিষ্টের গাঢ়রসে
হাঃ হাঃ, উদ্ভাসিত করে দিলে
দিন ও রাত্রির ভার্তৃত্ব-বেদনা!


স্থিরচিত্রময় এই মধ্যাহ্নের প্রযোজনা :
মহিষের গাঢ়দুধ মাতৃত্বের রসে
উঠে আসে মাংস-মজ্জা ঠেলে; এ-প্রবাসে
সে মোহের ঘনত্বছায়ায় মোষের রঙিন পিঠ
অনুরাগ মহিমায় ধরে রাখে শালিখের বন্দেগি জীবন,
ঘাসেদের বেদনায় সবুজ নিসর্গ আছে কাছাকাছি
তবু এক গঙ্গাফড়িং আর তার সামূহিকতা
অদৃশ্য চাঁদের পানে তুলে ধরে ভারাক্রান্ত মুখ;
ছায়া-ভেঙে-গিয়ে দোদুল দুলিছে আজ শীতের দুপুর
জলজাদু আমাদের মনস্তত্ত্বে গাম্ভীর্য এনেছে।


দেখতে দেখতে শীতকাল এসে বাবুহাসি দিল
শরৎ দেবীমাহাত্মে, নিজেকে গুটিয়ে নিল,
হেমন্ত নিজেকে নরম করতে গিয়ে অবশেষে
হারিয়ে গেল অজানা জীবনের ভেতর,
আর ছায়া জমা শুরু করে দিল শীত—
অতঃপর অখণ্ড মনোযোগে।
আলোছায়ার নরম অনুপ্রাসে দিন কাটে আর সন্ধ্যা হলে
পাখিদের শরীর থেকে এক অদ্ভুত ছায়া বের হয়ে
আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যায় :
ঘুমের ভেতর আঁকিবুঁকি কাটি জীবনের রূপরেখার
শীতকালের ছায়ার মতো আমার ভেতর জমে ওঠে
কোমল পানীয়ের অবিশ্বাস্য ঘুমকাতরতার দিন,
বরফের ভেতর আগুন,ঢোকানোর ক্রমাগত উচাটনে
আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি
মৃত্যুদীর্ণ জলের পরিণামী প্রহেলিকায়
গাদাবন্দুক সমভিব্যাহারে আমি
অতলে ডুবে যেতে থাকি;

জলজাদুকর এসে অন্তর্বর্তী দূরত্বকে ভেঙে দিয়ে যায়


কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো–কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব (২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২). তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪); প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬) /অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯) , মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫), আত্মধ্বনি (২০১৬) ; অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪), বহু হই ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা (২০১৬)।

পুরস্কার: হুমায়ুন আজাদ কবিতা পুরস্কার (২০১০), লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০১০)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E