৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ১৮২০১৭
 
 ১৮/০৬/২০১৭  Posted by

কুমার চক্রবর্তী-র একগুচ্ছ কবিতা


আ মা দে র গা ও য়া ল জী ব ন

সৃষ্টিতত্ত্ব ছেড়ে মেঘ চৈতন্যের দিকে চেয়েছিল
এই ছিল তার প্রাণ-রসায়ন, আমাদের সনাক্তকরণ মহড়া

ঠিকভাবেই আমরা চেয়েছিলাম নক্ষত্রের পানে
কুমারী বোন একে-একে জ্বেলে দিয়ে গেল সবকটি পিদিম,
এক-একটি রাত আমাদের কতিপয় তরলতাকে উজ্জ্বল করে তুলল,
মাঝে মাঝে মাছের চারা গজানোর মতো সংকেতপ্রবণ ছিল জ্যোতিষ্ক শরীর:
গভীর ব্যুৎপত্তি আর অঙ্গরাগ অস্থির করে তুলছিল আমাদের।
মনের ভেতর থলের মতো পরিপূর্ণ প্রসন্নতা
আমাদের ঘরবাড়ি নেই, আছে এক হৃদয়াশ্রিত ঠিকানা
তারি ভেতর গলে গলে পড়ছে চাঁদের মদনমোহন হাসি।

শুধু অপেক্ষা আমাদের দিয়েছিল জলের সততা,
এই দৃশ্যগ্রহণ, এই হু-হু করা স্তব্ধতা, আর
স্তব্ধতার ভেতর জেগে থাকা দেবতা আমার
চর্তুদিকে জেগে ছিল খামালের মতো
বিশাল জোনাকির স্তন

এই রাত্রির খামার দেখে-দেখেই ধন্য হলো আমাদের গাওয়াল জীবন।

 


দ্ব ন্দ্ব শী ল

ফুলে যে ব্যক্ততা পেয়েছ, তুমি হে উদ্ভিদগান
তুমি আলোসমুদ্রের ব্যাসকূট, আহা
আমাদের তাম্রলিপ্ত বিনীত প্রতিভা

ফল তুমি শোভামান অন্ধকারে ব্যাপ্ত হয়ে রও
অনুগত দিবসেও তোমরা একান্ত
মন্বন্তরহীন খাদ্যময় শোভনতা দাও।

ক্রমান্বয়ে তোমাদের উদ্বেগকাতর মন
বেদনাবোধ থেকে যৌথ প্রতারণা করে চলে
জলের শরীর হতে রূপান্তরগুলো
জন্মকথা ভুলে কায়াপ্রাণে দ্বন্দ্বশীল হয়

আজও সমীক্ষণ চলে, জাগে বোধ, জাগে শব্দনিয়ন্ত্রিত বহুবচনতা
তুমি ফলিত মহিমায় আমাকে দিলে ব্যঞ্জনাময় মনোবিজ্ঞানের পাঠ
আমি তাতে মন্তব্য সংযোজনে, লৌকিকতা দিয়ে চলে যাই!

 


রৌ দ্র ম ঙ্গ ল

 

বাক্যহীন পলায়ন-এই উদ্ভিদপ্রাণ ঋতুউৎসবে
আজ লৌকিক প্রহেলিকা থেকে
তোমাকে দিলাম রৌদ্রমঙ্গলের
জটিল বসন্তদিন
তুমি বিলুপ্তির চিহ্ন গোপন করে
আমাকে পাঠালে সম্ভাবনাময় অতীন্দ্রিয় কায়াবোধ
গুঢ় উদ্ভাবনে আমরা সার্থক
তবু এই মুদ্রাতাড়িত পরিপ্রেক্ষিতে
গতিবিদ্যায় পারদর্শী মৌমাছিরা
আজ
সাংকেতিক বার্তা রেখে চলে যায়
ফুলের পুর্বাপর স্তব্ধতায়।

 


মৃ ত্যু

কোথাও অন্ধকারে কম্পোজ হচ্ছে আমার পৈত্রিক কবুলিয়ত
মৃত্যুবিষয়ক স্বাধীনতা আমাকে পলক গাঢ়তা দেয়
একটি পাখি দিগন্তে ডুবে যেতেই অন্ধকার তাকে দৃশ্যমান করে দিলো।
দূর নিকটে কয়েকটি নক্ষত্রকে আমার আর দেখা হবে না,
সুদূর নীলিমাকেও আর আমার আমন্ত্রণপত্র বলে মনে হবে না,
আড়ালে চোখবিষয়ক আর্দ্রতা আমারে ছল-ছল করে তুলল।

একটি স্বপ্ন গহ্বরে দীর্ঘঘুমে গেল।
শুধু এক হিমস্পর্শ রক্তপূর্ণিমার রাতে
ছায়া আর ঝুলে যাওয়া মাধ্যাকর্ষণের অতীন্দ্রিয়তায়, একা একা,
আমি অদৃশ্যজনকভাবে বিবর্ধিত হয়ে উঠি।

 


সো না লি না রী র জ ন্যে এ পি টা ফ

 

যুক্তাক্ষরহীন সাদা হৃদয়ে মেখে
চোখে ধরে রেখেছি চন্দ্রের ভাটিয়ালি টান
নীরবতার শরীর শেষ পর্যন্ত আমাদের ছাতু করে দেয়

অতএব ধ্বনিসমগ্রের ভেতর জেগে ওঠে তার বিশুদ্ধ প্রশাসন

ছায়াদিকে আঁকি তার দেহ

এইখানে নাম লিখি বীজগণিতের

 

 


ম হা কা ল ম ন্দি র

দেবতা এখানে ইশারা ছুড়ে দেন
আর শাশ্বত এসে জীবনমুদ্রা তৈরি করে
আকাশ চালুনি দিয়ে চেলে দিচ্ছে বিনাশের সূত্র:
বিন্দু বিন্দু নীরবতা
সাদাকালো পর্বতারোহীর আত্মার স্বপ্ন
স্বর্গ ওঠানামা শুরু করে দেয়।

আকাশের কেন্দ্রে হিমালয়ের চাবি:
আলোগুলো ছায়া আর
ছায়াগুলো আলো হয়ে যায়,
আনন্দধাম জেগে ওঠে
মেঘেদের জোড়াতালি আর
ছায়ার ভেতর সশরীরে হেঁটে যাওয়া দেখে
জীবন নবায়িত হয়;

ওজনহীন গুপ্তঘাতকের মুখ আর মুচকিহাসির আয়তন
দেবতা একহাতে ধরে রাখে শূন্যের খিলান
বাস্তবতা এখানে ন্যুব্জ
আর দিগন্তরেখা কাচের মতো ভেঙে পড়ে

মেঘেদের চলাফেরা, তারাদের বাচালতা
পৃথিবী নিজ চিন্তার ভেতর পিছলে যায়
লিখে আর মুছে ফেলে
আর গোলকধাঁধা বিরামচিহ্নের মতো মূর্তিমান

পর্বতমানবীরা নৃত্যরত
তাদের মাকু অনন্তের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত
তাদের পবিত্র কুম্ভ –
তৃষ্ণার ভূগোল
তারা জোছনার বকুল
বুকের ভেতর ফুটিয়ে রাখে আশ্চর্য বাগান

পাথরগুলো ওড়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়
তারা জীবন অপেক্ষা ভারী :
পাথরগুলো ছায়া হয়ে যায়
তারা মৃত্যুর আগে গড়িয়ে পড়ে
তারা ভাষাচিহ্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে
তারা অনন্তের প্রশিক্ষণ নেয়

দেবতা ইতিহাস লিখেন
জ্বলে ওঠে তার আশ্চর্য শামাদান
তার কাল আর নীরবতা
ব্যাখ্যা করে চলে মহাজগতের নিজস্ব সীমানা।

 


আ ত্ম জী ব নী

পাহাড়ের সানুদেশে বেড়ে ওঠা আমাদের জীবন মায়ামমতার চাষ
করে; আর বিকেল হলে মেঘেদের ঘর-সংসার হতে কুহকি আলো
এসে অন্তর্দেশ তরল করে দেয়। মাঝেমাঝে রাত বেশি হলে পাহাড়-
গুলো মাটি ছেড়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়, তার জায়গায় জমা
হতে থাকে চাঁদের থাল-থাল সোনারূপা। আমরা তখন যূথবদ্ধভাবে
বের হয়ে পড়ি, ঘুরে বেড়াই, হাওয়াই গান করি, আর ভাঙা আকাশের
টুকরো কুড়োই। কখনো জোছনাগুলো বুকে ভরে নিজেদের চেহারা গোপন করে ফেলি।

প্রভু আমাদের ছবি তুলতে বারণ করেন,তার তো নিষেধ তাই, তবু
স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে মানচিত্র ভর্তি ছবি আমরা ছড়িয়ে দিই জলের
নিকটে প্রতিবিম্বে।

আমাদের এই স্বয়ংপ্রভ কাজে তার আপত্তি ঘোর। তিনি আমাদের শাস্তি দিতে পেনাল কোড
প্রবর্তন করেন এবং নক্ষত্রদের জুরি করে আদালতি কাজকারবার শুরু করে দেন।

আমরা বিশ্বস্ত নভোদাস, একবার প্রান্তদেশে আপরাধ করি তো অন্যবার
আলোকবর্ষে বেকসুর খালাস পেয়ে যাই।
শুধু এই দাদামেঘ আমাদের শীতল ছায়া দিয়ে সমর্পণ করে রাখে রাতদিন।

তবু দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামি-
র মতো, আমরা একটি মেঘের পরজন্ম দেখে
ভাববাদী হয়ে উঠি বারবার।

 


কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো–কবিতা:
লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব (২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২). তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪); প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬) /অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯) , মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫), আত্মধ্বনি (২০১৬) ; অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪), বহু হই ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা (২০১৬)।

পুরস্কার: হুমায়ুন আজাদ কবিতা পুরস্কার (২০১০), লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০১০) ।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E