৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৮২০১৬
 
 ১৮/১২/২০১৬  Posted by

কবি পরিচিতি

কোজাগরী

কোজাগরী

কোজাগরী। জন্ম : ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ । জন্মস্থান : মালদা (ইংলিশ বাজার), পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। পিতা : মধুসূদন হালদার, মাতা : কল্পনা লাহিড়ী হালদার। শিক্ষা : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে (অনার্স) স্নাতকোত্তর। নেশা: বই পড়া, কবিতা লেখা, গান শোনা, শিক্ষকতা, আবৃত্তি, সংবাদপাঠ ও সঙ্গীত শিক্ষকতা!
প্রকাশিত বই : একাকিত্ব শুধু তোমাকে

কোজাগরী’র কবিতা ভাবনা

কবি হওয়ার বাসনা নিয়ে কখনও লিখিনি। আজও লিখি না। আসলে কবিতা আমার কাছে ভালোবাসা। অনুভূতির সংবেদনশীলতা। আবার স্পর্শকাতরতাও। আমার অব্যক্ত আবেগ। রজনীগন্ধার বাগান। প্রতিদিন সেই বাগানে কুঁড়ি দেখি। ফুল ফুটতে দেখি। কিছু ব্যক্ত, কিছু অব্যক্ত। আমার সমস্ত মান-অভিমান, অনুরাগ-বিচ্ছেদ, অনুভূতি প্রকাশ সবই এই কবিতায়। এক আত্মউপলব্ধির সুখ। আলো-অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত হাঁটতে হাঁটতে আমি ‘আমি’ থেকে পৃথিবীর বৃহত্তর আমিত্বে মিশে যাই। কবিতা আমার অলংকার। পুরোনো-নতুন কবিদের থেকে প্রতিদিন অনুপ্রাণিত হয়ে চিরাচরিত নিয়মকে অগ্রাহ্য করে স্বতন্ত্র কিছু সৃষ্টি করার প্রয়াস করি মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাকরণের নিয়মকেও না মানার দুঃসাহস দেখাই। আসলে আমি মনে করি কবিতায় রস আস্বাদন খুব জরুরি। যা পাঠককে এক অন্য জগতে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। অদ্ভুত এক ভালোলাগা যেখানে অনুভব জাগায় পাঠকের মননে-চিন্তায়। নির্জনতা, একাকিত্ব, বিরহ, বেদনা আরও বেশি ভালো করে নিজেকে চেনাই আমাকে। প্রশ্ন জাগে সুখি মানুষ কি কখনো কবিতার ‘অবয়ব’ সৃষ্টি করতে পারে! শব্দের লুকোচুরি খেলায় ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক জীবনবোধ, চেতনা যেখানে বিলীন হয়। যে কথা কেউ শুনতে চায় না বা শোনে না বা বলা যায় না, সে কথা শোনে কলম। এই কলম থেকে সদ্যস্নাত হয়ে বেরিয়ে আসে আমার নির্জনতার মোহনা, আমার একাকিত্বের রোমান্টিক মুহুর্তগুলো। জন্ম নেয় সেখানে অক্ষর, শব্দ, ব্রহ্ম.. আর যেখানে আমি দেখি ‘ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট ব্যথা,এক আকাশ গুচ্ছ কবিতার রামধনু।
যদিও সকলে কবি নন। তবে ক্ষতি তো নেই কিছু ‘নানা জনে লয় তার নানা অর্থ টানি’।

কোজাগরী’র দশটি কবিতা


আশাবরী

সৈকতকে যেদিন নীল সন্ধের কথা জানিয়েছিলাম শর্ট ওয়েভে  ভাসছিলো আশাবরী রাগ। একদিন দুটো বটগাছের মৃত্যু সংবাদ লিখেছিলাম। এরপর চৌরাশিয়া বাঁশিতে বিভোর হয়ে চৈত্রের বারান্দায় চোখ চুম্বন করেছি। বর্ষার রাতে হাত পেতে বলেছি ‘কি দেবে দাও!’ জানলার বাইরে তখন মেঘফুল- সুনসান

ওর হাতে হাত রেখে দেখেছি ম্যাগমা ঝড়। সে উত্তরে বলেছিলো- মেয়েরা চিরদিন মেয়েদের মতোই হাত খোঁজে। ঠাণ্ডা, তুলতুলে। জিরাফের গলার মতো একটা হাত চেয়েছিলাম শেষপর্যন্ত।

কচুপাতায় প্রেম নীরব দর্শক। দীর্ঘশ্বাস পাতাবাহার গাছে। নতুন নতুন মেঘ ওড়ে মাঝরাতের ব্যালকনিতে। পৃথিবীর প্রেমিক-প্রেমিকারা সিন্ধু লিপির মতো ৩৪ নং জাতীয় সড়কের স্তব্ধ হ্যালোজেন।

ওদের কারো কারো রিংটোনে আজও বাজে আশাবরী রাগ…


আগমনী

এখন আর কোনও হিম গায়ে মাখি না। কবিতার উঠোনে অনেক রাত যদিও নির্বাক। কাশফুলের রাত্রি। কালো আর আলোর মাঝে শরতের দু’ফোঁটা আবেগ। বাতাসের মতো অবাধ শাদা মেঘে নদীর অন্তঃসলিলা। যতদূর চোখ যায় আমি রাখি নীল নাভিশ্বাস। কাশফুলের ভেতর শুনি ‘বাজল তোমার আলোর ভেরী।’ শিউলির শরতে কান্নার প্রলেপ…

এখন সারা বছরই গায়ে লাগে সম্পর্কের হিম…


গীতা-২

একটা চওড়া বুক, যেখানে এক শাশ্বত রাত্রি মাথা রাখতে পারি। সেদিনের সন্ধ্যেটা আর বারোটা দশের রাতটুকু। তোমার মুহুর্তে বাঁচা আমার শাশ্বত…

নিস্তব্ধ দুপুরে চিলের দলে এলোকেশী সাধন চেতনা। মৃত্যুর পরেও আমলকী খোঁজে অমরত্বের নিশ্চয়তা। কচি ঘাসের মতো আলোয় চোখে চোখ। খোলা চুলের সুগন্ধি অন্ধকার থেকে, কল্পনাকে একটু পাশে রেখে, ভালোবাসি শব্দহীন জ্যোৎস্নায় তির্যক গতিস্রোতের স্তব্ধতা। টুকরো সাধের জলছবি। মিশমিশে রাত্রিতে শব্দের সাতকাহন। ঘাসভর্তি বাগানে এখনো অপেক্ষায় শাশ্বত অনন্তরাত্রি…

তোমার মুহুর্তে বাঁচা, আমার শাশ্বত; এ ভাবেই ভালোবাসতে হয় শাশ্বত; এভাবেই…


ভায়োলিন

রিংটোনে হঠাৎ সারথি। হেমন্তের অনেকগুলো সকাল ইতিমধ্যে… কেমন আছো জিজ্ঞেস করতেই বললো : এক হাসফাস করা কষ্ট, বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা, আর মাথার ভেতর সারা রাত দগদগ করে ‘হিয়া’; আমার চারপাশ হু হু করে উঠলো। চারিদিকে সাজিয়ে রাখা সম্পর্কের চোরাবালি আর্তনাদ। এক মুহুর্তেই স্তনের ভেতর থেকে এক একটি নদী বেরুতে লাগলো… আগে প্রায়ই গিয়ে বসতাম জানলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীটির পাশে। ময়ূরাক্ষী, মন খারাপ কতো দেখেছি। আকুলিবিকুলি কেঁদেছি। ভালোবাসার আয়ুও যে শেষ হয় বুঝিনি! কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলাম হারিয়ে যাওয়া হাউসিং এস্টেটের পাতায়। যে রাস্তা একদিন পিচভর্তি ছিল। অল্প থেমে সাত্যকিকে বললাম : মনে আছে একদিন শিশুর মতো… হয়তো পৃথিবীর খুব কম প্রেমিক প্রেমিকাই এমনটি পারে… এখন বুকের হাড়ে চৈত্রের কাক। দীর্ঘশ্বাসে এলো এক একটি অনুভব।  একদিন অরুন্ধতী আলোয় প্রত্যাখ্যান করে চলে গেলে… তোমার ভিক্টোরিয়া… আমার ময়দান… প্রতিদিন দেখেছি এক একটি প্রজাপতির জ্বলন্ত চিতা…। তোমার কপাল ছুঁয়ে চোখ, চোখ ছুঁয়ে ঠোঁট, ঠোঁট ছুঁয়ে পাঁজরে দেখেছি সন্ধেগুলো হারিয়ে যেতে  অবহেলায়! অথচ জীবন এ সোনালি রোদ্দুর… প্রতিদিন এক এক রকম উষ্ণতা নিয়ে কাছে ঘেঁষেছি… আমারও ছিলো এক অভিমানী ভায়োলিন… তারপর…

শব্দেরা অভিসারী পথে খোঁজে বুদবুদের সান্ত্বনা। ডায়েরির পাতায় কলমের বিকীর্ণ উত্তাপ…


বিদেহী

বিদেহী হয়ে মাঝে মাঝে প্রেত-আত্মার সাথে কথা। রেললাইনের শব্দ ধরে হাঁটতে থাকি। তোমার বোবা জানলাটা খুলে দাও। অন্ধকার  এবার কথা বলুক। তোমার সর্বাঙ্গে ঝরে পড়ুক শিশির নামার শব্দ। বুঝতে পারছো জোনাকির উত্তাপ?

স্বপ্ন ভেজাতে বৃষ্টি তো লাগেই…

সকাল নয়, বিকেল নয়, সন্ধ্যে ছাড়াই অবৈধতার অসীম শূন্যতায় তুমি-আমি অঙ্ক আর কিছু ডট ডট ডট…

ভেঙে ফেল চৈত্রের দরজা…..


আত্মসহবাস

প্রতিরাতে জীবন-মৃত্যু ঘুমোয় বিছানায়। অসহিষ্ণু অসাড় দেহ। লাশকাটা ঘরে ক্লান্ত তমিস্রা!
 
আবহমান এক অচেনা গন্ধ শরীর সিক্ত করে শোণিতে বাস করে। কোনওদিন চলে যাবো কোনও এক বসন্তের বুক ছুঁয়ে। অপরাহ্ণ মৃত সঞ্জীবনী কোনও কোনওদিন স্বপ্নে আসে। তোমার ঘরে চলে জোনাকির গান। আমার পৃথিবী পূর্ণিমার নীল চাঁদ…

তপ্ত সম্মোহন। তুমি ছোঁও, তুমি ছোঁও আর একবার… আত্মসহবাসে বিশল্যকরণী জন্ম নিক!

হয়তো বা কোনও একদিন একগাছা দড়ি অথবা ফলিডলের শিশি পৌঁছে যাবে একা, একা মাঝরাতে… অথচ, দেখো : কাকভোর হলো জোনাকির অভ্যর্থনায়। তুমি ছোঁও, তুমি ছোঁও আর একবার…

কোনও নথিভুক্ত ছাড়াই সম্পর্ক সংগোপন। হাতছাড়া করে বিলিয়ে দিয়েছি… ক্লান্ত অভিসারিকা! রোদে পোড়া সোদা মাটির গন্ধ ফেলে তুমি চলে গেলে প্রেইরি থেকে ফের আফ্রিকায়।

নিজেকে দেখার জন্য আর একটা প্রতীক্ষার পালা…


নীলকণ্ঠের হাত

কবি শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন : ‘হাতের উপর হাত রাখা সহজ নয়।’ কিন্তু আমি বহুবার রেখেছি। দেখেছি কোনও হাত বেশ পুরুষ পুরুষ। কোনওটা বেশ নরম নরম। আগুন আগুন দু’একটা আবার। কোনওটা মেঘ মেঘ। কোনওটা বৃষ্টি বৃষ্টি… দেখুন না এতোগুলো হাতে হাত রেখেও আমি অতিমানবী হতে পারি নি।

অথচ সুবোধবাবু আপনি বলেছিলেন : ‘যারা এক পেগ খেয়ে ডিনার পার্টিতে মেয়েদের কাঁধে হাত রাখে, তারা একটা সন্ধ্যার জন্য অতিমানব হয়ে ওঠে।’ আমি তো হৃদয় ছুঁয়েও দেখেছি। কিন্তু কই!

মাঝে মাঝে এই ভেবে শুধু অন্ধকারেই নয়, দুপুরেও কেঁদে নিই। আচ্ছা সুবোধবাবু, বলুন তো- কোন হাত ঠিক ধরা যায়?
আমার হাত ক্রমাগত একটা হাত খুঁজতে থাকে আলো-অন্ধকারে। ময়দান পর্যন্ত এগিয়ে যাই। জলপাইগুড়ির বন্ধ চা বাগান। ফিরোজ মিনারের মাথা। মনুমেন্টের বন্ধ দরজা ঘুরে খড়গপুর প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত। বহু হাতের ছড়াছড়ির ভিড়ে হাতগুলো বার বার এসেও ফিরে যায়।
বসন্তের দুপুরে জাহাজের ভোঁ ভোঁ শব্দে হৃদয় কেমন যেন অতীন বাড়ুজ্যে হতে চায়! এলো চুলে নীলকণ্ঠ পাখির ডাক। বহু হাত ঘুরে ফিরে আসে। তবু একটা হাত খুঁজি। সমুদ্রের ঘোর অন্ধকারে শিরা-উপশিরা ওঠা একটা হাত থেকে থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসে। আমি স্পর্শ করি আমার নগ্ন নির্জন হাতের চারপাশ…

ভাবুন তো সুবোধবাবু, অরণ্যের এতোগুলো হাতে হাত রেখেও অতিমানবী হতে পারি নি আজও…


বর্ণপরিচয়

একাকিত্বেরও আছে গভীর বর্ণপরিচয়। তুমি নও তো আর কেউ তুমি। গোপন হৃদয়ে লুকিয়ে রাখা সচিত্র পরিচয়পত্র। কত রাত ভোর বিবর্ণ পলাশ। ঠিকানা জমেছে কিছু আউটডোরে। এক এক পড়ন্ত বিকেলে সফেন ভেসে গেছে পৃথিবীর সব ‘তুমি’। রাত্রিকালীন কাব্যে কিশলয়।

পাঁজরের হাড়ে নির্জনতা চুম্বন করেছে। ভেসেছে রাত্রির গন্ধ…

তারপর একদিন অরণ্যের সিঁড়ি বেয়ে আরও নিচে দেখেছি এলোমেলো পৃথিবীর সব তুমি ‘তুমিহীন’ বর্ণপরিচয়ে…


মনমোহিনী

সবুজ ঘাসের দ্বীপ মোহনার বুকে। সেখান থেকে পৃথিবীর বুদ্ধিজীবীরা ফিরোজা সংগ্রহ করেন। একদিন কবি হওয়ার স্বপ্নও দেখেন। ঝলমল করে মোহনার নির্জনতা। বিদ্যুৎ চমকায়, মেঘ আসে। মেঘের ভেতর থেকে এক একজন কবি বেরিয়ে এসে নদীগর্ভে মুখ লুকোয়।

পৃথিবীর সাক্ষ্যবহন করে নির্জন মোহনা। বৃষ্টি মাথায় করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। অর্ধেক হাসিও হাসে। অভিমান বাক্সবন্দি কফিনে। সকাল থেকে রাত, প্রতিদিন সূর্য ফেরে। কবিরা যায়, আসে।

মধ্যদুপুরে মাছরাঙা ডুকরে কাঁদে। পাহাড়ের চূড়া থেকে পৃথিবী মরুভূমিতে একরকম বৃষ্টি পড়ে। তোমার ঠোঁট থেকে বুক কামড়ে ধরি। পাঁজরে আমার কাক ডাকে। আকণ্ঠ ডুব দিই সদ্যস্নাত চুলে।

মোহনায় ভেসে ওঠে ভোরের জলতরঙ্গ…

১০
অস্থি

পাড়াসুদ্ধ লোক ঘুমিয়ে পড়লে নিজেকে পুড়িয়ে আসি রোজ ইলেক্ট্রিক চুল্লিতে। যেখানে একদিন আরো দু’জন এবং প্রতিদিন বহু। ছাইটুকু নিয়ে আসি। যে আগুনে ঝলসে ছিলো জানকি। সারথি বলুন আপনি পেরেছিলেন?

প্রতিটি রাতের সাথে ঘুমোয় প্রতিদিন। এটা ওটা সেটা নেড়েও দেখি। এক একভাবে ফুলশয্যা করি। বলুন মহামান্য আমায় কী নাম দেবেন?

হে কবি, প্রতিটি রাত আমায় ধর্ষণ করে। আমি ভালোবাসি, চুমু খাই, আদর করি। বলুন কবি আমার কি পুণ্য  হবে?

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E