৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৭২০১৭
 
 ১৭/০১/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

কচি রেজা

কচি রেজা

কচি রেজা। জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার গোপালগঞ্জ শহরে। ছোটোবেলা থেকে দেশের বাইরে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাস। পড়াশোনা দেশে এবং নিউ ইয়র্কে। নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি। জন্ম : ১০ এপ্রিল, ১৯৬৮!

প্রকাশিত বই :

কাব্যগ্রন্থ : ঠোঁটের গড়ানো রক্তে বিঁধে আছে কাঁটা [১৯৯৯]; সহস্র অব্দের প্রহর [২০০০]; দূরের বেহুলা তুমি [২০০১]; ও কষ্ট [২০০৩]; হরপ্পার মেয়ে [২০০৫]; প্রসন্ন হও, জল পূর্ণ করো তড়াগ [২০০৬]; পাশ দিয়ে যায় নাৎসির গাড়ি [২০০৭]; আমি কেবলি করেছি পাঠ বড়ু চন্ডিদাস [২০০৮]; অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর [২০০৯]; ভুলের এমন দেবতা স্বভাব [২০১০]; সে থাকে বুকের বাম পাশে [২০১২]; অন্ধ আয়না যাত্রা [২০১২]; মমি ও কাচের গুঞ্জন [২০১৩]; কফিনভর্তি কোলাহল [২০১৫]।

সিরিজ কবিতা : বিজিতা [২০১৪]; দুই বাংলার যৌথ কবিতা, নাকছাবির ইতিকথা [২০১২]।

ছোটগল্প : অগ্নি-সোয়ারী [২০০৪]; যে লতার নীলকন্ঠ নাম [২০০৮]

সম্পাদিত লিটলম্যাগ: কাল ভাঙ্গো ঢেউ

কচি রেজা’র কবিতা-ভাবনা

এক একদিন খুব আশ্চর্য হয় নীরবতার বোধ! মগজে চঞ্চল হয়ে ওঠে ধ্বনি আর দৃশ্য! যা দেখিনি সেই অভূতপূর্বতা নিয়ে একলা মানুষটির মতো বেঁচে থাকি আমি! নদীর পাড় ধরে হেঁটেছি কি কোনও দিন! দেখেছি, সারি সারি শুপারির নিচে সন্ধ্যার ছায়া কীভাবে নেমে আসে! অন্ধকারে গাঢ় হয় জোনাকির আলো! দিগন্ত রাঙিয়ে ফিরে আসা পাখির ঝাঁক কীভাবে নীড় খুঁজে নেয়!

এ-জীবনে দেখা হয়নি অথচ সেইসব অচেনা হরিণ আমাকে পিছনে ছুটিয়ে বেড়ায়! এক সময়ে ঘুম এসে কেড়ে নেয় চেতনা! স্বপ্ন জাগিয়ে দিলে রাতের ঘ্রাণে অনুভব করি এমন একটি প্রভাতকালের উদ্ভাস, যার জন্যে অপেক্ষা করিনি অথচ তার অনিবার্যতায় শুরু হয় দিনের পরিক্রমা!

এই ধাঁধাঁর থেকে বেরুতে চেয়েছি বার বার, কিন্তু আর কোন স্বপ্ন আছে যেখানে আমি যেতে পারি! সেই স্বপ্নের নদী যার নাম মধুমতী আর সেই স্বপ্নের শহর যার নাম গোপালগঞ্জ! সেই শহরের আমি বড়ো হয়ে দেখতে পাই, দূরে অনেক দূরে সরে যাওয়া নদী! কাঠের সিঁড়ির বদলে ইঁটের দেয়াল!
মেনে নিতে গিয়ে দেখি, আমি মেনে নিতে পারি না কিছুই!

কচি রেজা’র কবিতা

অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর

প্রতিদিন যে-বেদনা প্রদক্ষিণ করি তাকে প্রশ্ন করেছি,  যখন আমার আঙুল থেকে ধুয়ে ফেলেছি আগুন তখন কেন জ¦লে উঠেছ? আর খেরোখাতায় বছরের পর বছর যে-নীল হিসেব আমি জমা রাখি, সে অন্ধকার তুমি পড়তে পারোনি অন্ধ? এখন কোষ্ঠী হারানো ক্ষতে ভুল করে তক্ষক ডেকে উঠলে নূপুরগুলো খুলে খুলে যায়, দুপুর হারানো বালিকার শরীর অবশেষে বিতর্কিত দর্শন? জীবনভর কিছু অপরাধ মানুষ-ই করে আমিও পার হয়ে এসেছি ঝড় জল মাপা আঙুল, এখন ছায়ারা অপেক্ষা করে না, আমিও মনোনিবেশ করি বিস্ময়ে! যমুনায় সর্বনাশ বেজে উঠলে রাত্রির শরীরে কবে জমেছিল
এত নুন! আরও একবার দেখতে ইচ্ছে করে শরীরে বেড়ে ওঠা তক্ষক, ছায়া অঙ্কুরিত হয়েছে কতটা, টেবিলে আনমনা পড়ে থাকে দুটিমাত্র হাত, জানতে ইচ্ছে করে, এখন তুমি রবীন্দ্রনাথ পড়ো না পড়াও!


কাল বৃষ্টি হবে! বৃষ্টি দিয়ে কী আত্মহত্যার জন্মদিনে মোমবাতি জ¦ালাব! আর বন্ধু সক্রেটিস, তুমিও পান করো রোদের নিষ্ঠুর মদ, পৃথিবীর জলশূন্য
রোগ হয়েছিল দর্শনের মৃত্যুর পর, সেদিন সব অন্ধকার হেমলক পান করে মরে গিয়েছিল, সেদিন থেকে পালকছেঁড়া হরিয়াল কিছুতে যায় না আমার ঘুমের বালিশ ছেড়ে, অনুশোচনা নেই, কেন বহুদিন কোনো পাখি আঁকি না পম্পাইয়ের ধবংস সাক্ষি, এই যে পুড়েছে হাত—-এই হাতে আর কতবার  আত্মহত্যা করব! এ-উপবাস তাই এই জন্মের, যে-জন্মের নদীতে কান্নার ধর্মে কোনো বৃষ্টিপাত-ই হয় না আর! একদিন অমল-ধবল দর্শনের বাণী শুনেছিল পৃথিবী, হেমলক পান করে সক্রেটিস মরে গেলে মানুষের মত ঠিকানা খুঁজে পাইনি আমিও, এ-জন্মের চোখ তাই ফুটলো না, সব ছবি পুড়িয়ে দিল চেঙ্গিসের তলোয়ার! আমার কান্নাটা তাই আমিও দেখতে পাই না রোজ তবু মায়ের মুখ মনে পড়লে জামার বোতাম আটকাই, লেপ টেনে নিই বুকে! প্রতিদিন আত্মহত্যার জন্য যে লগ্ন খুঁজি, মায়ের এক দীর্ঘশ্বাসে সে মোমবাতিও যায় নিভে! তাই আত্মহত্যার জন্মদিন পালন হয় না, কেবল-ই লেখা হয়ে চলে এক আহত গ্লাসের গল্প!

মৃত্যুর প্রেসনোট


বহমান জলের  কাছে, উদাস এক নারী পাগল যেখানে অকারণে শরীর ভেজায় সেই তার দুঃখের কাছে বসি। ছিন্ন-নিঃস্ব, সন্তান জন্মদানচিহ্নপরিস্ফুট তলপেট, শুধাতে ইচ্ছে করে, কার আলিঙ্গনে? চুরমার কপালের নিশ্চুপ রেখায় থমকে যাই। নৈঃশব্দ্য ভাঙতে খুঁজে পাই না যুৎসই অক্সিজেন। মেঘ কুড়িয়ে স্তূপ করতে করতে সংকুচিত হয়ে আসে ফুসফুস।


ঝরাপাতা মাড়ানো পায়ের দিকে চেয়ে মচমচ শব্দে খুলে যাচ্ছে বেণী। স্ট্রবেরি শুকিয়ে আমি লিখতে বসি মৃত্যুর প্রেসনোট! যেসব কবুতর আজ লাটাই ছিঁড়েছে, ঘুড়ি ভেবে দিয়েছে উড়াল, নিবিষ্ট চাদর গায়ে যে মেয়েটি একশত পাখা রেখে কোথায় যে গেছে নেমে! বালু আর কাঁকরের সেলাই এ-জীবন! বাকি অর্ধেক কেবলই নষ্ট হয়ে যায়!


কী যে একটা অসুখ আকাক্সক্ষা গাঢ় করে মুছে নেয় সন্ধ্যাবেলাটা। কেউ দেখেনি, সাঁতারের প্রমাণাদী। হাতগুলো রোদ্দুরে দিয়ে মুঠোর ভিতর ধারণ  করি সুস্মিত ঘাস! আমার নির্নিমেষ দৃষ্টিতে অন্ধকারও শাদা। এই তীব্র জানালাপ্রীতি নিয়ে রোদের দিকে চেয়ে থাকি, যতক্ষণ না ম্লান বিকেল আসে পায়ের কাছে। আমি বিকেলকেও সন্ধ্যার অন্ধকারে শ্লথ হতে হতে হারাতে দেখি। গাঢ় পায়ের কাছে বসে পৃথিবীও বুঝে নেয় অন্ধকার।


আয়নার কোনো ভাষা নেই! প্রতিভাহীন বলে ভুলতে বসেছে ক্রান্তিকাল অস্থিসমূহ ফুটে উঠেছে একান্ত জেদ করেই। কোনও নীল জামার সাথে মানুষ কিন্তু তূলনীয় নয়। আনন্দকে যতই চিবুকের নিচে রাখো পথের দু’পাশের অস্থিসার ঘরের মতো সে বানায় অজ¯্র ছিটেফোঁটা! পাতা-কাঠ আর ছুঁড়ে ফেলা রঙহীন তুলোর বালিশের আশ্রয়। মানুষের করতল বিশ্রাম প্রার্থনা করে আর আশ্রয় শব্দটি যেন একজন খোঁড়ার জন্য চেয়ে-চিন্তে আনা তিন চাকার ঠেলা।


তাকে দৈবাৎ থামিয়ে ডেকে নেয় এক অতিক্রান্ত করবীবেলা! মনে পড়ে, রাঙা জ¦র সমাচ্ছন্ন চোখ। মাত্র-ই যেন অজানা স্বাদের আফিম গিলেছে।
সে দেখে, বাহুর ভাঁজে ফুটে ওঠা যৌন ছিট, হালকা হলুদ শীতে ফেটে যাওয়া দু’গাল। বৃন্ত দেখে অথবা আঙুলের রক্তাভ। গ্রহণভেদে কতবার ঘুরে আসে আহ্নিকের অন্ধকার। মোহিত হতে হতে উত্তাল হয় ঝিনুক অথবা দূরবেলাভূমির বালুর মতো নাভির নানারকম মোহ!

পাঁজরের হাড় খুলতে কীরকম কষ্ট

একদিনও আমি তোমাকে না দেখে থাকতে পারি না, একটি বেলাও। তবু এই শীতে পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যেতে চাই না। কোনো শীতকালেই আমি যাবো না তোমার কাছে। কবে যেন অভিভূত হাসিতে ঘাস আর রোদের মতো ছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজে কীরকম জ¦র হতো তোমাকে বলতাম। এখন আমার ঠোঁটে বিড়ম্বিত বালুকণা, পাঁজরের হাড় খুলতে কীরকম কষ্ট – তুমি কি তা জান? তবু আমি এক এক করে তা খুলেছি। এখন এক ফালি জীবন একা রেখে স্থির করতে চাই সম্পর্ক; – ভালবেসে স্বস্তি হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে আমারও সং¯্রব নেই চোখের সঙ্গে – যারা অন্ধ তারা জানে অন্ধতাও অসুখ। ভালবাসার নাম তুমি, সে-কথা মনে পড়ে কত কী নিস্তব্ধ হয়ে যায়!

পা

পায়ের কথা শুনিনা বলে কুকুর হয়ে তোমার সামনে দাঁড়াই! তুমি আমাকে আরেকটু যন্ত্রণা দিয়ে আমার রক্ত দেখো! জিহ্বার ঘা আর দেখো হঠাৎ জ্যোৎস্নায় ঠান্ডা বালিতে আঁচড়! তবু দিক ভুলে না গিয়ে ধীরে ধীরে আমাকে আমার পল্লীতে ফিরিয়ে আনে পা! লম্বা ঘুমের জামা পরে শয্যায় একটি স্বপ্নের ভিতর শিশুর গা ছুঁয়ে শুয়ে  থাকি!

পাথর ও প্রার্থনা

প্রার্থনার পর আমি অনুভব করি নিজের ভাঙা কন্ঠস্বর। প্রার্থনা অনুমোদিত হয় ভেবে আবার হাঁটু ভেঙে বসি। মাঝে মাঝ স্ফিঙ্কসের মতো পাথর সময় আসে। এক ক্যারাভ্যান বালু দিয়ে কারা যেন বানায় আমাকেও। এ-বিষয়ে আমার হাসি-ই সবচেয়ে শুদ্ধ যন্ত্রণা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E