৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৫২০১৬
 
 ২৫/১০/২০১৬  Posted by
কবি বারীন ঘোষাল

কবি বারীন ঘোষাল

কবিতোরিয়া
– বারীন ঘোষাল

কবির কবিতা না কবিতার কবি

মুরগি আগে না ডিম আগে — এই ধাঁধাটা সবাই জানেন, কিন্তু উত্তরটা কেউ জানেন কি? কোন কোন বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত হয়তো বিশদ ব্যাখ্যা করতে পারবেন যা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম — বল তো, কবিতা আগে না কবি আগে? সে চট করে জবাব দিলো — কবিতা আগে। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, সেকি, তুমি জানলে কি করে? সে বলল — কেন, আপনিই তো আগে ‘কবিতা’ বললেন। না, আমি আসলে এরকম বুদ্ধিমান উত্তর আশা করিনি। যদি বলতাম — বল তো কবি আগে না কবিতা আগে? তার উত্তর হতো — ‘কবি’ আগে। সে জবাবও একই রকম বুদ্ধিমান হতো। প্রশ্নটা আমার বুদ্ধির কাছে নয়; বোধের কাছে, অনুভবের কাছে।

কবি যা করেন (অর্থাৎ লেখেন) তা কবিতা। তার সাথে সুর মেলানো ছবিকে অনেকে ‘ছবিতা’ বলেছেন। কবি যা করলেন — ভাবনার ওপর ওম (তা) দিয়ে একটা ছানা ফোটালো। এবার কবিতা ছানাটিকে বড় করে তুললেন, সাজালেন একটি বনসাই কবিতা, স্নেহ মাৎসর্য মিশিয়ে লাবণ্যময় একটি কবিতা পেশ করলেন পাঠকের বা প্রকাশকের দরবারে। তিনি কি লিখলেন, না রচনা করলেন, না গঠন করলেন, না নির্মাণ করলেন, না সৃষ্টি করলেন, না উৎপাদন করলেন — মনে হতে পারে এসব একই ক্রিয়ার হেরফের — সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শব্দটি নেওয়া যাক — তিনি সৃষ্টি করলেন। জরায়ুটি হৃদয়ে আর স্পার্ক বা স্পার্ম দিয়েছিল মাথা বা মগজ বা মেধা বা অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা — এসবও মনে হতে পারে একই শব্দের হেরফের। সৃষ্ট কবিতাটিকে যখন কবি কাটছাঁট করছেন, চুল ছেঁটে চিরুণী চালিয়ে বেঁধে দিচ্ছেন, নখ কেটে দাঁত মেজে পাউডার পমেটম লাগিয়ে লিপস্টিক কাজল — মেয়েলি হয়ে যাচ্ছে নাকি — যাক। কবিতাকে মনোমত সাজানোর পেছনে একটা প্রতিমা বা ইমেজ থাকে, কবিতার অঙ্গরূপ সম্পর্কে পূর্বাভাস — কবি এরকম এক হাজার কবিতা লিখলে ততগুলি প্রাকরূপ কবির মনে কালানুক্রমিক সময় ও পরিবেশ শর্তে জেগে ওঠে — এবং সেভাবে তিনি ক্রমান্বয়ে কবিতা গুছিয়ে রাখেন। এভাবে হাজার বছর ধরে হাজার হাজার কবি হাজার হাজার কবিতার হাজার হাজার প্রাকরূপের ফলিত চর্চা করে চলেছেন জেনে দেখে শুনে বিস্মিত হতে হয়। দশলাইনে হোক বা দশহাজার লাইনে হোক — তাকে একটি কবিতা বলাই বিধি।

মূল প্রশ্নে ফিরে যাই। কবি আগে না কবিতা আগে। যদি কবি আগে হয় তবে ওপরে লেখা কথাগুলো যুক্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে।  পৃথিবীতে তাই চিরকাল। কিন্তু যদি কবিতা আগে হয় আর পরে কবি, তাহলে? কবি হয়ে জন্মায় নাকি কেউ? জ্যোতিষীরা হাত-টাত দেখে বা মুনি ঋষিরা গর্ভবতীর ভবিষ্যৎ চিন্তা ক’রে বলেও দিতে পারেন হয়তো — যে, অমুক সন্তান কবি না হয়ে যায় না। অন্ততপক্ষে কবিতা না লিখে ছাড়বে না। শুনেছি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এই ভবিষ্যতবাণী ছিল, কৃষ্ণের মতো অষ্টম গর্ভের সন্তান তো, এবং তিনি সেটা জানতেন। জ্যোতিষ বিদ্যার এমন প্রামাণিক খবর আজকালকার জ্যোতিষীরা জানেন না বলেই বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেন না। আমার বেলায় জ্যোতিষী বলেছিল — এ ব্যাটা ডাকাত হবে। সেই থেকে বাবা আমাকে চোর লোফার মাস্তান নেতা — এদের থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। বাবা ছিলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য। বদসঙ্গ থেকে আড়াল করার জন্য লাঠিখেলায় তিনিই আমার হাতেখড়ি দেন। সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির পেছনের দেয়ালঘেরা ঊঠোনে আমাকে লাঠিখেলা শেখালেন, ছোটবেলা থেকেই লেঠেল সমাজসেবী গড়ে তোলার বাসনায়। তার চোখের আড়ালে ক্রমশ আমি ভাড়াটে গুন্ডা হয়ে উঠলাম। কানে লেগে থাকলো কোন সঙ্গীত নয়, শুধু বাতাসের নিঃস্বন আর টরে টক্কা। আর জুড়লো হুঙ্কার আর আর্তনাদ। চারপাশে ‘পালাও পালাও’ শব্দ। ভয়। রক্ত। যন্ত্রণা। আমারও। বন্ধুরা আমাকে শব্দখেলায় নামালো। শব্দ ভাঁজছি এখনও। বারীন কবি না, বলুক কেউ।

কোন কথা থেকে কোন কথায়। যদি কবিতা আগে হয় আর কবি পরে, তাহলে অবস্থা কীরকম দাঁড়ায় — এই হল মূল প্রশ্ন। তাহলে তো কবির মনে কবিতার যে প্রাকমুর্তিটি আছে তাকেই সমর্থন করতে হয়। এই — সেই ‘মুরগি না ডিম’ এসে পড়ল আবার। একজন কবি, তাই সে কবিতা লেখে। আর একজন কবিতা লেখে, তাই সে কবি। আপনারা ভাবুন, আমি যাই প্রশ্নান্তরে। পাকা উত্তর দেবার অধিকার আমার নেই। সেই প্রবচনটা জানেন তো? ‘গু যদি কাজে লাগে / বেড়াল গিয়ে পাহাড়ে হাগে।’ – এই ইতরামির জন্য মার্জনা করবেন। বেড়ালের অভ্যাস জানেন তো? পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য সে পায়খানায় মাটি চাপা দেয়। যদি সে জানতে পারে তা কারও উপকারে লাগছে তবে সে এমন আড়ালে কম্মোটি করবে যাতে কাকপক্ষী জানতে না পারে। আমি সেই কালো বেড়ালটা, পথ ডিঙ্গোবো। দাঁড়িয়ে থাকবেন, কিন্তু বলবো না। নিজেরা ভাবুন। অধুনা বাংলার কবিকুলে এই-ই সচরাচর।

ছোটবেলা থেকে স্কুলে বাড়িতে মা-ঠাকুমার কাছে — এবং মনে আছে সেই বই দুটো — হাসিরাশি আর হাসিখুশি — রাইম আর ছড়া? — এবং স্কুল ফাইনাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ, যতীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, নজরুলনাথ , না না, শুধু নজরুল হবে — এসব চর্চার উদ্দেশ্যই ছিল রাইম আর রিদম, ছন্দ লয় আর স্পন্দন সম্পর্কে কান তৈরি করার প্রয়াস। যেমন বাড়িতে বাড়িতে হারমোনিয়াম সহযোগে মেয়েদের গলামাজার অভ্যাস। দলে দলে কবি তৈরি করার কোন উদ্দেশ্য নেই স্কুল সঞ্চালক কমিটির। শরীরে এবং জীবন যাপনে নিজস্ব রিদম খুঁজে পাবার উৎসাহ তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য। যারা তা পেলেন তারা সবাই কবি। না লিখলেও কবি। তাদের নিজস্ব স্পন্দনের সাথে যা অ্যাটেনিউ করবে বা সংশ্লিষ্ট হতে পারবে —তা-ই তাদের কবিতা। তা কারও লিখিত রচনা হতে পারে অথবা তার মনের মধ্যে ধরা পড়ে যা কিছু। আমরা তাদের মধ্যেই সীমিত থাকি যারা কবিতা লেখেন, লেখক কবিরা। অর্থাৎ কবিও আছেন, কবিতাও আছে এক সঙ্গে, একই সময়ে। আগে পরের ব্যাপার না। কবিতা কবিকে চেনে না। কবি কবিতা চেনেন।

কবি কিভাবে কবিতা লেখেন?

এই প্রশ্নটার কয়েকটা উত্তর হতে পারে। শব্দগণিতে অভ্যস্ত কবি নিপুণ শব্দসজ্জায় কবিতা লিখতে পারেন ছন্দমালায়। চিত্রমোহে জারিত কবি দৃশ্যসম্ভারে আলোকিত কবিতা লিখতে পারেন চিত্রমালায়। সঙ্গীতজ্ঞ কবি কশেরুরোহন কাব্যসঙ্গীত লিখতে পারেন। জার্নালিস্ট কবিরা লিখতে পারেন সংবাদমূলত কাব্য। রোমান্টিক কবিরা মায়াবী আনন্দ, ন্যাচারালিস্টরা জীবনের জয়গান, অ্যাডভেঞ্চারিস্টরা ভ্রমণের প্রকৃতি জয়ের, ধার্মিকরা আধ্যাত্মিক ভক্তির, দার্শনিকরা মায়ামুক্তির কবিতা লিখতে পারেন। এই শিল্পটা সবচেয়ে সহজে সস্তায় রচনা করা যায়। নিজেকেই নকল করা যায়, অন্যকে নকল করা যায়, দশজনের কবিতা থেকে খামচাখামচি করে খিচুড়ি কবিতাও লেখা যায়। পয়সা এত কম যে পুলিশ নেই বললেই চলে। আমি এর মধ্যে কোথায় ফিট হবো বা, আড়ালে আমাকেও কেউ শ্রেণীকরণ করছে কিনা জানি না। শিল্পের জন্য ফলিত শিল্প এখানে। শব্দশিল্প।

কবিতার হোলটাইমার দেখলাম না। রবীন্দ্রনাথও না। শেষ শেক্সপিয়ার। এখন তো সবাই পার্টটাইমার। দিনে একঘন্টার বা সপ্তাহে তিনঘন্টার কবি। জীবন থেকে শিখুন বা, বিদ্যালয়ে শিখুন, ভাষা-ব্যবহারটি জানলেই হল। ছন্দজ্ঞান থাকলেও হয়, না থাকলেও হয়। এখন ভাষার প্রান্তিকতা গুরুচন্ডালিকাকে মুছে দিয়েছে। যুক্তি বা সন্তুলনের বালাই না থাকলেও চলে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেধাবী (আইনস্টাইন) মগজের ধারণক্ষমতার দশ শতাংশ ব্যবহার করেই শিরোপা নিয়ে চলে গেলেন। আমরা দু-তিন শতাংশেই কাজ চালিয়ে নিতে পারবো। এমনকি ভাষার ব্যাপারেও। অভিধান মনস্করা জানেন যে কুড়ি ভলিউম অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে (১৯৭৬) ৬১৬০০০টি শব্দ আছে, এবং অভিধানটি এখনও অসম্পূর্ণ। কাজ চলছেই। শেক্সপিয়ার ৩০০০০টির কম শব্দ ব্যবহার করেছেন (৫ শতাংশেরও কম) এবং চার্চিল ৬৫০০০ শব্দের কিছু বেশি। (অর্থাৎ প্রায় দশ শতাংশ)। প্রথমজন কুড়ি বছরে, দ্বিতীয়জন চল্লিশ বছরে। ফলে আমাদের ভাষা নিয়ে কোন সমস্যা নেই মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ কতগুলো শব্দ ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে কেউ এখনো পি এইচ ডি করেননি। প্রশান্ত দাশের বইয়ে তা পাওয়া গেল না। রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ করলাম একারণে যে তিনি ৭০ বৎসর ধরে সাহিত্যের সমস্ত বিভাগে কাজ করেছেন। পৃথিবীতে আর এরকম উদাহরণ নেই। হরিচরণবাবুর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এর শব্দসংখ্যা কত তা আমাকে কেউ জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো। যাক গে। আয়ত্ব শব্দসংখ্যা যত সীমিতই হোক, কবিতা লেখার অধিকার সবার আছে। তার জন্য চাই ১২ পয়সার একটা কাগজ, একটাকার একটা ডটপেনের রিফিলের একপয়সার কালি, ব্যাস। যদি কোথাও পাঠাতে হয় তবে ৫০ পয়সার একটা খাম আর ৫ টাকার ডাকমাশুল। নয়তো হাতে হাতে বা, এখন ফেসবুকে বিনে পয়সায়। আপনি কবি হয়ে গেলেন।

এ তো গেল ফ্রি ফর অল। আমার সমস্যা ছিল ভিন্ন। আরো অনেকেই নিশ্চয়ই এরকম সমস্যায় পড়েছিলেন। আমার কি হয়েছিল, বলি। অন্যজগৎ থেকে এসে আমি কবিবন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যাই। লিখে তাদের পড়ে শোনাতাম। লেঠেলটাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে তারা আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতো। আজ পিছনদিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে চোখ জলে ভরে ওঠে। অমুকের মতো হল কেন, এত তৎসম তৎভব কেন, অন্তমিল আছে কেন, ছন্দে কেন, মাত্রাবৃত্তে কেন, পয়ারে কেন, আধুনিক বিষয়ে কেন, ইমেজারি নেই কেন, কল্পনা নেই কেন, গল্প ঢুকছে কেন, নাটক কেন, সংলাপ কেন এত, মন্তব্য কেন, বিমূর্ত কেন, বিষয় নেই কেন, সুররিয়াল কেন, তুলনা উপমা কেন, প্রতীক কেন, রূপক কেন, অলংকার কেন, এত ক্রিয়াপদ কেন, একটা কথায় তিনটা ক্রিয়া কেন, এত ‘মতো’ কেন, বর্ণনা কেন, সিনিক কেন, সিদ্ধান্ত কেন, পাংকচুয়েশন আছে কেন, নেই কেন, সেক্স কেন, জীবন নেই কেন, নিষ্প্রাণ কেন, সমসাময়িক বিখ্যাত ঘটনা নেই কেন, আঞ্চলিক কেন, আকাড়া শব্দ নেই কেন, ইতিহাস ভূগোল নেই কেন, মিথ কেন, পরম্পরা নেই কেন, সঙ্গীত নেই কেন, যৌনতা নেই কেন, প্রেম নেই কেন, রাজনীতি নেই কেন, ইত্যাদি — আর মনে পড়ছে না — তবে এতসব ‘কেন’-র চাপ আমাকে ভাবতে শেখালো। যার মনে প্রশ্ন নেই সে ভাবে না। প্রশ্নগুলো এক একটা ফিলটার। এদের কোনটা পাকা আর কোনটা সাময়িক সে হিসেব গুলিয়ে গেছে। একদিন এমন হল নতুন ফিলটার আর পাওয়া গেল না। আমার তো ঝোঁকে এগনো। এগোতেই হবে। কবিতা কবিতাই হয়। শ্রেষ্ঠ বলে কিছু হয় না। যেখানে আমি থামলাম সেটাই আমার শ্রেষ্ঠ চূড়া — এমন মনে হয়নি। বাংলার শ্রেষ্ঠ অর্থে সর্বগুণ সমন্বিত নয়। শ্রেষ্ঠ অর্থে সমাদরে গৃহীত, জনপ্রিয়, সেখানে ল অফ অ্যাভারেজ কাজ করে। এছাড়া কোন ম্যাপ নেই। কালোত্তীর্ণ বলতে ধরুণ দাশরথি তা-এর ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’। আপনি কি জনপ্রিয়তার লোভে লিখবেন, মিডিয়া খ্যাতির লোভে, না কি মনের আনন্দে যা খুশি তাই লিখবেন? হতে পারে সম্মান, পুরস্কারের দিকে আপনার নজর, আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চান আপনি, সিম্পলি এই একটা কাজ পারেন বলেই লিখে যান, বন্ধুদের সাথে একাসনে বসে পান-ভোজন সহ কবিতার আড্ডা দেয়া পছন্দ করেন, যাই হোক, কবিতা লিখলে সমাজের উপকার না হোক, অপকার তো হয় না, কিছু কবিতাভাষ্য না হয় আপনি সমাজের জন্য রেখে গেলেন, পাস্টটাইম হিসেবে মন্দ কি?

কবিতোরিয়া

কবিতা লিখলেই হল, ছাপলেই হল, আন্তর্জালে ভাসলেই হল। সভাটভাতে গিয়ে পড়ে আসা, আর ডাক পাবার জন্য বা, ডাকার ক্ষমতা নিজের হাতে নেবার জন্য কিছু কাঠখড় পোড়ালেই হল, পাখির ডিমটি টুপ করে গাছ থেকে সেই আগুনে পড়বেই। খামোখা এতসব ভেবে কি লাভ ? আমার মতো এতসব ভেবেটেবে সবার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কবিতা কাউকে লিখতে দেখলাম না। কবিতা লেখার জন্য প্রতিভা চাই। না পড়ে না ভেবে উৎকৃষ্ট রচনা সম্ভব, যেমন লালন। আর আমার মতোই যাদের প্রতিভা নেই তারা পরীক্ষা টরীক্ষার নামে কি সব লেখে — দেখে শুনে পরীক্ষার নামেই নাক সিঁটকোন অনেকে। এমত কবিতা থেকে তরুণদের দূরে থাকার পরামর্শ দেন, বলেন — বাংলা কবিতার বারোটা বাজালো এরা।

এ পর্যন্ত এসে আমি থেমে দেখলাম, এযাবৎ যা লিখেছি তা তো কবিতা নয়। কবিতার মতো একটা ইলিউশন। কবিতার কোন প্রতিমা নেই। কবিতা নিরাকার। ঈশ্বর নিরাকার হলেও নিজেদের স্বরোপিত পছন্দসই আকৃতিতে ঈশ্বরজ্ঞান আপামর জনসাধারণকে যেমন আসলকে ভুলিয়ে দেয়, সেরকমই কবিতা নিরাকার জেনেও কবি ও পাঠকরা আসলকে ভুলে পছন্দসই আকৃতিতে নকলকে গ্রহণ করে। সেটাই কাব্যপ্রতিমা। আকৃতির চর্চা আর পূজাই মূখ্য হয়ে ওঠে। এসব জেনে আমি হতাশ হলাম। তখন আবার আমার খোঁজ শুরু হল নতুন করে। উৎস কবিতার খোঁজে। ওই কাগজের পাতায় নয়। কবিতা বাইরে আছে কোথাও। মনের ভেতরে কবিতার যে প্রাকরূপ আছে তা মিথ্যা। প্রায়কবিতা কবিতা নয়।

ইটের পাঁজায়, বাড়ির কার্নিশে যেমন বট অশ্বত্থের জন্ম হয়, আমার মনে হয়, বাঙালি বলেই, এই বঙ্গদেশে, পৃথিবী ও বিশ্বের সর্বত্র জড় অজড় প্রতিকণায় প্রতি মুহুর্তে কবিতার জন্ম ও সঞ্চরণ হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে বা একদৃষ্টে খুলে রেখে সূক্ষ্ম কালো তারের স্প্রিং-এর টুকরোর মতো, ভাঙা প্রশ্নচিহ্নের মতো স্টিং বা, বাঁকানো কাঁটা দেখতে পাই, যা তরঙ্গের মতো সদা প্রবাহিত। কাছে দূরে বাতাসভেদী সেসব দৃশ্য এমনকি দৃশ্যহীনতার মধ্যেও তা নাচতে থাকে। কানে, বন্ধ বা খোলা, বাজনা শুনতে পাই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের মতো। বাতাসবাহিত সমস্ত শব্দ সেই অন্তর্গত শব্দের উপর সুপারইমপোজড হয়। চোখ মেলে মেঘের সরণে, জঙ্গলের সরণে, মরুভূমির সরণে, জলপৃষ্ঠের সরণে নানারকম মুর্তি দেখি, সবই আশ্চর্যভাবে পরিচিত মুখ। হেঁটে যাবার সময় ঝং-করে একটা আওয়াজ হল — টের পেলাম মানুষ মানুষে অদৃশ্য সম্পর্ক-তারে ছুঁলো আমার শরীর। একজন ডাক্তারকে এসব খুলে বলতে তিনি কয়েকটা ল্যাটিন শব্দে মোটামুটি বললেন এটা আমার কবিতারোগ। কবিতোরিয়া হয়েছে আমার। যেমন আপনারা সবাই শুনেছেন ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, ডিপথেরিয়া, গনোরিয়া, তেমনি আমার হয়েছে কবিতোরিয়া।

তখন আমি উদ্ধত বাঘ এবং মৃত্যুভীত মানুষ দুয়েতেই কবিতা দেখি, লাভাপ্রবাহ এবং পলায়নপর মানুষ, প্রতিপালিত গাছ এবং মানুষের কুঠার, যুদ্ধের দামামা এবং মানুষের গান, পুলিশের অত্যাচার এবং প্রেমিকার স্নেহ, সবেতেই কবিতা ফুটে থাকে। যে মানুষটা হাঁটছে, যে পাথর টুকরোটা পদাঘাতে গড়িয়ে গেল, পাথরের ভেজা পথটা, পিঠের প্রোটনগুলো, প্রোটনের প্রেম, প্রেমের কোয়ার্ক সূর্যের সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার। এসবই কবিতার র মেটিরিয়াল। র মেটেরিয়ালই কবিতার উৎস। তা নিয়ে ভাবনাই কবিতা। জনসংসর্গের মতো কবিতার সংসর্গে এই কবিতোরিয়া নামের দুষ্টরোগ হয়। এই রোগ না হলে, এই কবিতারোগ, লেখা যায় না কবিতালিপি। অনেক ভাবনা নিয়ে একটা কবিতামিশ্রণ করা যায় যা চানাচুরের মতো মুখরোচক কৃত্রিম বা ভার্চুয়াল কবিতা হতে পারে। কিন্তু কবিতাযোগ হয় না, রসায়ন হয় না, যা উৎস কবিতার স্মৃতি ও সম্পর্ক বজায় রাখবে। একটা জল বা একটা বাতাস যেমন হয় না, তেমনি ‘একটা কবিতা’-ও হয় না। তা অনবরত, দশদিকে প্রতিনিয়ত বহমান। তবু তা সংবাদ নয়। খবরের কাগজে নেই, মিডিয়ায় নেই, বিরোধিতায়ও নেই। আছে মানুষের প্রকৃতিতে, আছে বস্তুর ধর্মে। ই এস পি’র মতো দূর দূরান্ত ও আশপাশটি মুহুর্তে একত্র করে দেয়। এই কবিতা গ্রহণ ও প্রকাশ করার জন্য আমি ভাষার কোন বাঁধন টের পাই না। কোন সীমাও না, সীমানাও না। যা মনে আছে সে-ই শব্দ, তা-ই ভাষা। আমার ও পাঠকের মধ্যে সামান্যতাকে সহজ করে আনার জন্য ধ্বনির কাছে যাবার চেষ্টা করি। ভাষার এই পর্যায়টি জটিলতা বর্জিত। যদিও তার বহিরঙ্গটি কষ্টকল্পিত মনে হতে পারে, তবুও, চিহ্ন ও চিহ্নিতের যোগসাধনে উপযুক্ত চিহ্নটি উচ্চারণ করাই আমার ভাবনার সূত্র। এটা শিক্ষার ব্যাপার নয়। লিপি থেকে কবিতার উদ্ধার অভ্যাসের ব্যাপার। এজন্য কোন তত্ত্বজ্ঞান বা যুক্তির প্রয়োজন নেই। অগ্রিম চেতনা আবিষ্কারের দায় নেই পাঠকেরও। কবিতা ভাবনাই তার চেতনা পরিচালনের জন্য যথেষ্ট। আমার কাজ পাঠকের কবিতা-ভাবনাকে ট্রিগার করার জন্য ধ্বনি সম্পাদন। এভাবেই পাঠক একজনের লিখিত কবিতার মধ্যে তার নিজের কবিতাকে আইডেন্টিফাই করতে পারে। কবিতা তখন গ্রহণীয় হয় তার কাছে।

ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান, ভেজাল সংস্কৃতি, কলোনিয়াল হ্যাংগওভার, ইজম, আধুনিকতা এসব কোন কিছুই অন্তরায় হয়ে আমার কবিতাসৃষ্টির পরিবেশ গরম করে দেয়নি। আর আমি কবিতা সৃষ্টি করার কে? কবিতা তো প্রতিক্ষণে চারপাশে সৃষ্টি হচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি তো শুধু পথে বেরিয়েছি ভোরের শিউলি, পাথর-নুড়ি, রাতের সন্ধ্যামনি টোকাবো বলে, গান শুনবো বলে। এর জন্য কাছে দূরে বলে আমার কিছু নেই, আপন পর নেই। যদি ভাবো পাগল, যদি ভাবো মিথ্যেবাদী, তবে তাই। তবু লক্ষ্য করবো তুমি কেমন করে গান কর। আমি অবাক হয়ে শুনবো। এই বিস্ময় আর কাটবে না আমার। এটা কবিতারোগ। ধরলে ছাড়ে না। কোন ওষুধ নেই। যাদের এই সমস্যা নেই তারা হেসে খেলে কবিতা লিখে যান, রোগ এড়িয়ে চলুন। ছেলেপুলে মা-বাবা বৌ অফিস আছে না?

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E