৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৫২০১৭
 
 ০৫/১১/২০১৭  Posted by

খালেদ হামিদী’র কবিতাভাবনা
সভ্যতার অসম্পূর্ণতাজনিত যন্ত্রণাবোধই কবিতা

খালেদ হামিদী

খালেদ হামিদী

চলমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কবিতাভাবনার প্রকাশ বলতে কবির রাজনীতিক-দার্শনিক দায়িত্ববোধের পরিচয় জ্ঞাপন ছাড়া আর কি বুঝে নিতে পারি? কেননা ফিলিস্তিনের পরে, ইরাক, সিরিয়া ও এ মুহূর্তে মিয়ানমার থেকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, লক্ষ লক্ষ মানুষকে, ঠিকানা ও রাষ্ট্রহীন করে চলেছে। ধনতান্ত্রিক এই সভ্যতা এর নিজের হিসেবে অপূর্ণাঙ্গ নয়। কিন্তু ধনতান্ত্রিক রাজনীতির সব অপশক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মানুষের এতো উৎকর্ষ লাভ সত্ত্বেও, সভ্যতাকে অসম্পূর্ণ করে রাখে। তাই স্থানিক-বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, পুঁজিতন্ত্রের সমস্ত সহায়ক শক্তি, সাম্রাজ্যবাদ এবং ধনতান্ত্রিক চিন্তা ও প্রকল্পের তুমুল বিরোধিতাই আমাদের পরম প্রাথমিক কর্তব্য বলে মনে হয়। আমাদের সাহিত্যে, বিশেষত কবিতায়, এই দায়িত্ববানতার অনুবাদ, বলতে গেলে, খুবই জরুরি। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্বকথাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল দস্তয়েভস্কিও, পশ্চিমের তথা ইয়োরোপীয় চিন্তা এবং আধুনিকায়নের, বিরোধিতা করেন। ওরহান পামুক যেমন বলেন : It is from Dostoyevsky’s gloomy, damning ambivalence-his familiarity with European thought and his anger against it, his equel and opposite desires to belong to Europe and to shun it…(Orhan Pamuk; chapter thirty-six; Dostoyevsky’s Notes from Underground: The Joys of Degradation; Other Colours; in UK in 2007; in USA in 2008)
দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট, ব্রাদার্স কারামাজভ এবং ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট-এর চরিত্রগুলো সেই পৃথিবীর বাসিন্দা, যে-জগৎ এখনো মনুষ্যোপম হয়ে ওঠেনি, হয়ে ওঠার জন্যে প্রক্রিয়াধীন :
…it is set in world still in the process of becoming. (Orhan Pamuk; chapter thirty-eight; The Brothers Karamazov; Other Colours; in UK in 2007; in USA in 2008)

দস্তয়েভস্কি যা নেই তার উপস্থিতির ঔচিত্যের বোধ দ্বারা তাড়িত একজন অতীব মহান লেখক। মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজে কি নেই? নেই মনুষ্যত্ব। ধনতন্ত্র-উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদ হত্যা করে এই মানবতাকেই। যদিও, গেলো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে উদ্ভূত প্রতীচ্যের পোস্ট মডার্ন চিন্তা বিষম সমাজভুক্ত শ্রেণীর ভেতরকার নানা শ্রেণী, যেমন নারীশোষণ, সমপ্রেমী, তৃতীয় লিঙ্গ ও রূপান্তরকামী মানুষদের অস্বীকৃত-অবহেলিত থাকার বিষয়গুলি শনাক্ত করে। সেই সঙ্গে তাদের সকলের মুক্তিসংগ্রাম আর প্রকৃতিবিধ্বংসী শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির বিপরীতে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনও সূচিত হয়। কিন্তু এই পোস্ট মডার্নিজম পুঁজিবাদবিরোধী নয়, তা ধনতন্ত্রের আওতার ভেতরে ওই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ক্ষেত্র সম্প্রসারণেরই দিকনির্দেশনা, বলা যায়। পাশাপাশি, ক্ষেত্রবিশেষে আপাত চমকের আড়ালে পুঁজিতন্ত্র ধ্বংস করে মানুষের এখনো-অবশিষ্ট মৌলিক বা আদিম গুণাবলী, যেমন : সহানুভূতি, প্রেম ও শ্রদ্ধাবোধ; জঁ জাক রুসো যে আদিম সাম্যবাদী সমাজের প্রসঙ্গ বিশদ করেন তাঁর মানব জাতির অসমতার উৎস এবং ভিত্তি শীর্ষক প্রথম রচনায়ই, আশ্চর্য সাবলীলতায়। দস্তয়েভস্কি তাই পশ্চিমের বিরোধিতা করেন। তাঁর ইডিয়টকে খুব মনে পড়ে। আমাদের উপলব্ধির গভীরে বেজে ওঠে এই প্রতীতি : মানুষের আসলে ইডিয়টের অনুরূপই হওয়া উচিত। কিন্তু পামুক দস্তয়েভস্কির ইয়োরোপ-বিরোধিতাকে, উপর্যুক্ত প্রবন্ধে, বর্তমান মুসলিমদের মার্কিন বিরোধিতার সঙ্গে মেলান কেন? দস্তয়েভস্কির পশ্চিমের প্রতি ঘৃণা আর ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ইসরায়েল-এমেরিকা-বিদ্বেষের মধ্যে মূলত কোনো অমিল নেই বলেই হয়তো।
…it is a notable irony that Dostoyevsky, who wrote one of the greatest novels ever, hated the West, and Europe, as much as today’s provincial Islamists.
মনুষ্যজগতে তো জাতি বাস্তবে দুটিই, ধনী ও দরিদ্র। তাই গরিব জাতির ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুদের মোকাবেলার আগে, আমরা, অন্তত সচেতন মধ্যবিত্ত মানুষেরা, এই সভ্যতার সীমাবদ্ধতা বা অসম্পূর্ণতার ক্ষেত্রগুলো বার বার চিনে নিতে পারি, যেভাবে, পামুক, উপরের একই গদ্যে, বলেন :
For a writer like Dostoyevsky, the world is a place that is in the process of becoming; unfinished, it is somehow lacking. It resembles our own world, which is also in the process of becoming, so we want to dig deep: to understand the rules that govern this world, to find inside it a corner wherein we might live by our own ideas of right and wrong.

৩১ অক্টোবর ২০১৭
চট্টগ্রাম

খালেদ হামিদী-র পনেরো কবিতা


ফিরে এসো

পিতৃতর্পণের জল কোথা পাই! নাফ শুধু নয়,
সব নদ, পুষ্করিণী, সরোবর, হ্রদ ও সমুদ্রে
মিশে একাকার আজ উদ্বাস্তু নারী ও
শিশুর অন্তিম শ্বাস, হৃতঠিকানার আরো
সতেজ বালিকা-লাশ। গত তিন প্রজন্মের পূর্ব
একুশ পুরুষও তবে ওপারেও ঠিকুজিবিহীন!
আগুন ও উদ্যানের মধ্যখানে স্বর্গমুখী অপেক্ষায় ম্লান!
মাত্র ত্রিদশকাধিক কাল আগে কিভাবে উন্মূল
হতে পারে কোনো জাতি পিতৃভূমি থেকে?
হায় ভূ-রাজনীতি! ক্রূর বাণিজ্যবেসাতি!
না। কোমর জলে এবার দাঁড়াবো আমি,
প্রেমে পরিশুদ্ধ পানিতে অঞ্জলি পূর্ণ;
ভয় নেই। ফিরে এসো প্রয়াত অগ্রজবৃন্দ,
দ্বিকরতলের জল নাও তবে, থেকো না নিঃশব্দ যামে।
আমার প্রণাম শুধু পৃথিবীর সারা মাতৃপিতৃভূমে।

০৪ অক্টোবর ২০১৭
(অগ্রন্থিত)


লক্ষ্মী পূজায় এবার

তুমি মা, হাতির পিঠে চড়ে কেন এলে ধরাধামে!
সৌর ব্যবস্থাপকের সঙ্গিনী হয়েও, দেখো,
আমার অকিঞ্চিৎকর সমূহ অর্জন আর
জন্মভিটাও হঠাৎ উপড়ে হস্তিপৃষ্ঠে তুলে ওরা যায় শ্যেন দৃষ্টি হেনে।
নিহতের ’পর হাঁটা হৃতসম্ভ্রম ও
জখমেও ক্ষীয়মাণ আমাদের কান্তার কি মরুভেদী ক্ষিপ্র
ধাবমানতায় কেন সামনে এসে পড়ে
শুধুপানি আর পানি! অনন্তর দিগন্ত পেরোয়
সমুদ্রের সব বিরাট তরঙ্গমালা।

তবে ফের কোথায় পালাই!
স্মৃতিই কি শেষাবধি অস্তিত্বের কেন্দ্র?
নইলে কেন, মাগো, আশ্চর্য পেঁচার পাশে
পদ্মাসনে তুমি এখনো দেদীপ্যমান!

এদিকে ওদিকে তবু কারা যেন কহে:
ইংরেজি বইয়ের সারি-কলামের সম্মুখে পাঠক
এক রাখেন কাঠের শো পিস সুচারু কালো ছোট ঐরাবত,
সেই ভাষা-সাহিত্যের আভিজাত্য বুঝে!
কেউ বলে, সাগর ও আকাশের সন্ধিস্থলে কখনো হারিয়ে গেলে
লক্ষ্মীছাড়া পেঁচামুখে আমিও তাকাবো দূর সভ্যতার দিকে।

০৫-০৭ অক্টোবর ২০১৭
(অগ্রন্থিত)


ও বি হামিংবার্ড

ও বি হামিংবার্ড,
তুমি কি হাভানা থেকে আসো খুব উড়ে,
নিজের চারদিকে নাকি আমি মরি ঘুরে!
পরিযায়ী পাখি নও ভুলেও কখনো;
তথাপি উড়াল তোর ক্রমাগত ঘন।
ক্ষুদ্রতম পক্ষী ওহে,
মৌমাছি সমান প্রায় ঝাঁকে ঝাঁকে এসে
কি খোঁজো আমার চোখে, মুখে, বুকে বসে?
মিলনযুদ্ধোত্তর অঙ্গে নিবিষ্ট তারপর,
অপিচ আমারই মধ্যে চাও তরুবর?
হে বাস্তব বিহঙ্গমী,
তোরও চেয়ে ক্ষুদ্রতর পুরুষ তোমারও
কি পায় আমার দেহে, সঙ্গে আর কারো?
তোদের সবুজ, নীল বিভার অঞ্জন
চোখে মেখে শুনি ডানা কি অনুরণন।

রে জ্বালানি কি সাম্রাজ্যকামী,
কলম্বাস নই মোটে, না ভূগোল আঁকি;
কিভাবে এশিয়া ব’লে কিউবাকে ডাকি?
হাওয়ার সমান আয়ু শ্বাসের আমার;
প্রাণ আর পাখি সদা চাহে অংশীদার।

১৪-১৫ মার্চ ২০১৬
(অগ্রন্থিত)


তোমার অযোগ্য আমি

মানুষ আমি কি আজও? জানি, কেইট মিলেট বলবেন:
না, এখনো উপগত তুমি প্রিয়জনের ওপর!
অধস্তন হই যদি কর্তার রাজনীতি
তোমাকেও দেয় সুবিধা লোটার তীব্র
নিরব উল্লাস আর এদিকে উদ্বৃত্তহীনতায়
আমিও ক্রমশ সংকুচিত, ভবিতব্য অনিশ্চিত জ্ঞানে।

আমার পাঁজর গলে কে তুমি বেরিয়ে এসে, কোমরে কলস,
ধীরে হেঁটে যাও তবু দিগন্তের দিকে?
খালি কলসি কাঁখে কি হেতু চলিষ্ণু তবে?
তোমার অযোগ্য আমি মলিন একখানা ছোট থলে হাতে বসে
চাওয়া-না-পাওয়ার পয়সা গুনি চিরভিখিরির হেন।
অথচ ভ্রুকুটি ছুঁড়ে জলকে নয়, দৃপ্ত চলো তুমি
আকাশ ও মৃত্তিকার বিরান বিবাহস্থলে,
কেউ পৌঁছুবার আগে যেখানে নিবিড় বাজে হাওয়ার সানাই
আর জ্বলে অসংখ্য তারার মিটিমিটি শামিয়ানা।

রাত, ২৭ অগাস্ট ২০১৬
(অগ্রন্থিত)


তোমাকে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো

আমি হলুদের ফুল, সর্ষে পাতা কিংবা থানকুনির ভর্তাযোগে ভাতই খেতে চেয়েছি কেবল। হেলেঞ্চার মর্ম থেকে উৎসারিত রক্তাক্ত ফিনকি একদা জাতীয় পতাকাকে আহত করছে দেখেও কাচকির সাথে খেলে, মলার সংগে মিলে এবং ডাঙায় হামাগুড়ি এঁকে, আরও পরে ভুবন জুড়ে বুকে হেঁটে কিভাবে, কি করে যেন পাড়ি দিয়ে ফেলি আধেক শতাব্দী! নিজ গৃহশূন্যতায়, সংশ্লিষ্ট তাড়ায় আর বিভিন্ন ভাড়ায় অনন্তর ঠাঁই বদলের মজদুর বাংলার ফিলিস্তিনি আমার,মেলেনি আজও প্রাণ ভরে কিংবা নিজেকে উজাড় করে কাঁদবার ফুরসত। তথাপি তোমার পতাকার নিচে আমারও উড়েছে চুল।

পরিমাণবাদীদের তাচ্ছিল্যের নানা স্তর ডিঙিয়ে আমি কি আদুরে মধ্যম আজ? কতিপয় উত্তম চালিয়ে নিলে সংখ্যাহীন অধমদের, ক্ষুন্নিবৃত্তির সংগ্রামী সাথীদের সঙ্গে কোথায় দাঁড়াই তবে?প্রশ্নের অনতি পরে, জিজ্ঞাসার ঢের আগে, মাথা ঘষে মার্কিন ডলারে পুণ্যবান আখ্যায়িত যারা তাদের অনুুজ কতো মহাসাগরে ঝাঁপ দেয়, সে অর্থেরদিকে ভাসে বিরাট, বিশাল হরেক টায়ারে। এদিকে ওদের বিপরীতে আমি কি পুরোই ন্যুব্জ, বিচ্ছিন্ন, পরাস্ত? জানার আগেই তোমার ভূভাগ থেকে উড়ে এসে হামিংবার্ড আমারই সত্তার অতলে নিবিড় খোঁজে কোন অবশেষ? ক্ষুদ্রতম পাখিটির ক্রিয়ার সমান্তরালে, তোমাকে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, প্রণতি জানিয়ে রাখি, যে-তুমি দেহাবসানের পরেও সদা বিদ্যমান। যদিও, এখনো নই আমি নিজেরও সমান।

৩০ নভেম্বর ২০১৬
(অগ্রন্থিত)


বাংলার ফিলিস্তিনি

বেগুনক্ষেত ঘেঁষে দিব্যি সসঙ্গ মসৃণ রোদ পোহানোর পর
থেকে জ্ঞাত ও অদৃষ্টপূর্ব কতো জগতের পথ বুকে হেঁটে
উদরেরই দায়ে আমি এখনো উদ্বৃত্তহীন, তরকারিচাষার
কবর পাই কি টের নিজেরই অন্তরে?
লাঙলের মাটি-চেরা আর্দ্র শব্দে
কৃষির ভূখণ্ডটির ধরনে হারানো তাঁরই
বাস্তু থেকে ছিটকে পড়া নগরমুখো আত্মজের ঝুলিতে পিতার গোর
দেখেই কেউ কি হাঁকে : রে বাংলার ফিলিস্তিনি,
কিভাবে ফিরিয়ে দেই ছোটকালে খেলাচ্ছলে ধার নেয়া তোর
কইতরের ডিম, জোড়া টুনটুনি অথবা
বাবুইয়ের বাসা!

…১৬ মার্চ ২০১০
(স্লামডগ, মিলিয়নার নই; ফেব্রুয়ারি ২০১৩; প্রকৃতি)


অবিরাম ফিলিস্তিনি

চাষীসন্তান প্রত্যেকে তারই অভিভাবকের গোরের সমান;
ভূপাতিত, কিন্তু ঢের ভার্টিক্যাল ছলাৎছলে নগরগামিতায়,
সমরশূন্য, তবু ফের অবিরাম ফিলিস্তিনি। গাড়ির ধাক্কায়
নিঃসৃত শোণিতে তার কে তবে শুনিছে দিব্যি পাখির সংলাপ,
তাকে ফেলে অভিমানে বহু দূরে বয়ে-যাওয়া নদীর সঙ্গীত
কিংবা সদ্য বাস্তুভিটা হারানোর রক্তপ্লাবী সংগোপন শব্দ?
না, দেখো, প্রবহমাণ ঊনিশ শো একাত্তর, বাবা-পিতামহ
তার, সপরিবারেই, হাওয়াভেদী ধাবমান গুলির ভেতর
ঊর্ধ্বে তুলে আত্মসমর্পণের একক হাত, কম্পমান বক্ষে
ক্রমে পেরোয় সম্পত্তি, জন্মগ্রাম, তেপান্তর, মহল্লা, সীমানা।

১৯ এপ্রিল ২০১০
(প্রাগুক্ত)


বর্ষায় প্রার্থনা

পথিপার্শ্বের আশ্রয় থেকে ঝুপড়িতে ওঠা তবে কি পদোন্নতি?
অঝোর বর্ষা যে মাংসভেদী ভুলে যাবো নাকি সড়কের কূল ছেড়ে?
দেড় ফিট উঁচু, পলিথিন আর কঞ্চিতে বর্গাকার গৃহেই রতি
সেরে কালা জ্বরে খদ্দেরহীন মরেও তন্বী বাঁধে কি আমায় নিগড়ে?
না, না, এ কি ভুল! বৃষ্টি অতুল, কুয়াশাপ্রতিম বর্ষণ আনে স্মৃতি-
একটি পাতার নিচে দুইজন, গল্প কি যায় থেমে?
কচু পাতা বেয়ে সবুজ সাপের গুঁই-পায়ে নেমে আসা!
কিচির মিচির আষাঢ় শ্রাবণে উভয়ে সিক্ত শুধু শঙ্কার ঘামে;
তুমি বিবাহিত, রাবণবিহীন পুষ্পকরথে আমার কেবলই ভাসা।
আমারও মৃত্যু ঘনালে দয়াল, পাখির ধরনে যেতে দিও দূরে,
বুঝতে দিও হে, অপরাপরের শব্দশূন্য দুনিয়ার শেষ তিথি!

২৬-২৭ জুলাই ২০১০
(প্রাগুক্ত)


স্লাম ডগ

মৃত্যু যদি অনন্ত নিদ্রাই
তবে কেন না থাকার আকস্মিক অনুভবে ভাষাতীত ভয়!
ঝুপড়ির চালার লঘু পলিথিন, উনুনের অতি মূল্য কেরোসিন
কিংবা পুঁটলি থেকে সরে অপলক নেত্রে দেখা অন্ধকার
ইত্যাদি ভাবতেই আজ কিভাবে আতঙ্ক
জানার আগেই
অদূরে উদীয়মান বহুতল ভবনের জানলার আকাশ হতে দিনমজুর এক
প্রতিবেশী পথিকের ’পর খ’সে পৃথ্বীচ্যুত এঁকে
অগ্নিহীন ভিন্ন সহমৃত্যুর নমুনা;
ঠিক যখনই ঝকঝকে গাড়ি থেকে জায়নামাজ হাতে সফেদ পোশাকে
মসজিদের সামনে নামে কেউ
না শুনে আমার
জিজ্ঞাসা অথবা
কুকুরের ঘেউ।

১৭ অক্টোবর ২০১০
(প্রাগুক্ত)

১০
আরব্য উপনিবেশে

জবান আরবি না, অথচ মুসলিম!
কেন!! এ প্রশ্নেই উপনিবেশিতের
অমোচনীয় গ্লানি এখনো স্মৃতি থেকে
স্বদেশে বয়ে আনি। আরব মনিবের
চকিত গর্জন অবিস্মরণীয়
হলেও গে এরাব ক্লাবের নানামুখ
শিশ্ন-নিতম্বপ্রধান হাসি ছুঁড়ে
খুলেই ওয়ালেট রিয়াল দেখাতেই
আমার রিরংসা পেরোয় প্রভুত্ব।
তাতেও লাভ কই? জেব্রা ক্রসিঙেও
কখনো শকটের আলতো ধাক্কায়
বাঙালি পুরুষের মূল্য কমাতেই
সফেদ পোশাকের নরের দঙ্গল
সচল বিলকুল, ট্রাফিক সিগনাল
না মেনে, দাম্মাম কি আল খোবারে।
এর চে’ ঢের ভালো মিনারহীন এক
বেহাত মন্দিরে, স্মৃতির কল্পিত
চিত্রপটে আজো, নানান দেবপূজা
কি নমঃশূদ্রের সীমিত অর্চনা।
এসব ভাবনার প্রেক্ষাপটে তবে
আরেক রাম এসে রাবণ ভেবে মোরে
রাজ্য শাসনের পুছবে রীতিনীতি?
মহৎ নই অতো, আসলে মজদুর।
নিয়ত মৃত্যুর আহত প্রাক্কালে
আমিও দশাননে কহি কি একা তবে :
মর্ত্য থেকে দূর স্বর্গতক সিঁড়ি
পারিনি নির্মিতে, যেমন চাহিয়াছি
আকুল মনেপ্রাণে, বেঁচেও প্রতিকূলে!

…০৬ নভেম্বর ২০১১
(প্রাগুক্ত)

১১
সেলুন ও কয়েদখানা

ঘন জেদ্দায়, সবুজ-নিবিড় কি আল খোবারে এক
সেলুনে হঠাৎ আলাপ মাত্র ‘বাংলাদেশের
মানুষ মিষ্টি এবং সহনশীল’ উচ্চারি মজদুর আমাকেও
সম্মান এনে দেন যে ফিলিস্তিনি
বিস্মৃত-নাম হলেও আরববিদ্বেষ তাঁর
আজো পথ হাঁটে সঙ্গে আমার, স্বদেশেও কোন্ ত্রাসের উপনিবেশে?
পিতার দোকানে অপেক্ষমাণ খদ্দেররূপ তাঁরই সে-আসন থেকে
সোয়া যুগ আগেকার পরিচয় অনন্ততক বহমান।
পুংসন্দেহ সম্ভব রেখে নিজ রিরংসা উস্কে দিতেও বুঝি
মধ্যে কেবল নরসুন্দর খোদ দোকানির ব্লেডেই শ্মশ্রু ত্যাগ।
অথচ শিরñেদের অনতি আগেও জানেনি আমারই স্বদেশী যুবা
কয়েদখানায় নিজেরই মাথার চুল হারানোর কারণ কিংবা পরিণাম!

১০-১১ নভেম্বর ২০১১
(প্রাগুক্ত)

১২
হে জনাব ফিলিস্তিন

এমন তীব্র, তীক্ষè, ক্ষিপ্র, গভীর ও গহীন পারস্পরিক চুম্বনে দু’জন নিমগ্ন যে যুগলটি বিষম নাকি অভিন্ন লিঙ্গের দর্শক-মস্তিষ্কে এ সংক্রান্ত প্রশ্নোদয়ের পরিবর্তে ওষ্ঠ কেবল নয়, জিহ্বাকেও উভয়ের অতোটা উপাদেয় করে তোলার উপায় বিষয়ে ভাবতে সচেষ্ট সঙ্গহীন অনেকেই। আর, এদের প্রত্যেকেই অনুপস্থিত কাক্সিক্ষতের অস্তিত্বে অবগাহনের সূচনাতেই হয়ে ওঠে ডুবুরি প্রায়। চুমুর এহেন দৃশ্যায়ন পশ্চিমে তো বটেই পূর্বেরও কোথাও-না-কোথাও সামান্য ও বৈচিত্র্যহীন এবং মধ্যপুবে নিতান্তই বিরল হলেও, স্মৃতি থেকে এসে লৌহকঠিন করমর্দনে, হে জনাব ফিলিস্তিন, হাত চেপে আমাকে জাগাতে চাও কোন্ চৈতন্যে? নদীর ধমনিখচিত, বৃক্ষপ্রাণিত ও সমুদ্রে পদবিধৌত ঘাসের আয়নার এই বাংলা থেকে ঢের দূরে হলেও মরুর কিতাবে তোমার পিতৃভূমি সেই কবে থেকে বরকত ও রহমতধন্য অনারব শ্যামল ভূখণ্ড! কিন্ত একেক হামলায় তোমারই কোন্ নারী সইবে না আল্লায় হেঁকে সংক্ষোভে কেঁদে ওঠেন মৃত্যুদ্রাবী, অনন্তর জাগ্রত, স্মৃতিময় রামাল্লায়? ঠিক তখন এক নরের ডান গালে বাড়ি মারার ধরনে ন্যূন তিনবার ডান কপোল ঠেকিয়ে অপর পুরুষ শূন্যে চুম্বনের শব্দ তোলে এবং শেষে চুমু গেঁথেও দেয় সৌজন্য-বন্ধুত্ব-আত্মীয়তার সাংস্কৃতিক প্রচল অনুসারে, জোড়ায়-যুগলে, কতো যে আরব রেস্তোরাঁয়-রাস্তায়-গৃহে আর ঘরে!

…২৯ জানুয়ারি ২০১২
(প্রাগুক্ত)

১৩
স্লাম ডগ, মিলিয়নার নই

গ্রাম ছিলো, আছে, নেই। দেশ মানে কিন্তু তাই স্মৃতির সমষ্টি।
এ-নগরে ঝুপড়িবাসে শৈত্য-বৃষ্টি-দাবদাহে ভবিতব্যহীন
দেহই নিয়ত সার, হাড়সর্বস্ব, কখনোবা ক্ষিপ্র মাংসাশী।
কুক্কুট, মনুষ্যরূপে, পাওয়া মাত্র যুদ্ধংদেহী বরাহ আমিও;
বিষমের চেয়ে কভু অভিন্ন অধিক প্রিয়, জয়তু শরীর।
কাঁচা মরিচের দরে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নুন আনতে পান্তা
চুরি গেলে শিহরিত, আর, বিপরীতে শ্বাস হারানোর ভয়
সত্ত্বেও বিরতিশূন্য বিচিত্র রতির শেষে খুবই নিদ্রাতুর।
দুর্ধর্ষ রমণে জড় নিয়তিকে কষে তবে হানি কি আঘাত?

প্রভুর গালমন্দে রিকশা ছেড়েই একদিন শুলে রাতের সড়কে
চিৎ হতেই আতঙ্ক দালানে, উপুড় হলে বলাৎকৃত আমি
সভ্যতার দ্রুতযানে, নিয়মে, হুকুমে, শব্দে, আরো অজানায়।
মানুষ দরিদ্রতর রয়েছে আমার চেয়ে, জ্ঞানেই পুলক;
সাথে বুঝে দেহত্যাগ হঠাৎ চেতনা থেকে দৃশ্যের বিলোপ।
তথাপি কোথাও কাছে পাখির প্রখর শিসে অতীত অনন্ত
হলে, কভু না মরার আবেগে, সঙ্গমই স্নান, টের পাই শুধু।

০৭-০৮ জুন ২০১২
(প্রাগুক্ত)

১৪
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

তোমার অতুল জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে নিরবে
কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প আজও লিখে চলেছি দেদার!
পৃথিবীর যাবতীয় অর্থবিত্ত কথা কহিলেও
ইংরেজি ভাষায়, তুমি, পারঙ্গম বিলেতি সাহিত্যে,
মহৎ, শিক্ষকতায়; অস্ত্র হাতে কেন হে লড়িলে
নিজেরই অর্জন আর সাম্রাজ্যের অখিল বিরুদ্ধে?
অনুধাবনের আগে কেন কেউ, নিজ নারীদেহ
বাঁচাতে নির্দ্বিধ হলে তুমি আত্মহননে ভেবেই
বেমালুম ভুলে যায় জাগৃতির আশ্চর্য উচ্চতা?
মানুষ আপাদনাভি শুধু তবে হোমোসেপিয়েন্স?
তাহলে সফল সেনা, সহযাত্রীদের বাঁচাও কি
আপন মৃত্যুর অধিকর্তা হয়ে শত্রুর সম্মুখে,
বিলকুল অক্ষুণ্ণ রাখতে অভিযানে প্রথম বিজয়?
দুশমনের হাতে মৃত্যু কি বন্দিত্বে না হোক মলিন
কখনো একজনও সংশপ্তক, এই প্রতীতি হেতু কি
নিজ কণ্ঠে ঢেলে নিলে মৃত্যুঞ্জয়ী ভীষণ গরল!
স্বাধীন ভূখ- আজ তোমাদেরই উত্তরাধিকার।
তথাপি মশগুল কিসে মোরা আত্মপরিচয় ভুলে?

আমার অসুরজনম বিফল, সুবিধাবাদিতায়!
মেরীর ধরনে নও বাগদত্তা কি কুমারী জননী;
তবুও মাতার মাতা, পুনর্জন্ম দেবে কি আমায়?
তার আগে এ আশ্বিনে পুজো দেবো তোমাকে কেবলই।
তুমিই আরাধ্য আজ, দুর্গা নয়, হে অভিভাবক,
পুনশ্চ না হই যাতে বিস্মৃতিপ্রবণ কিংবা ঠগ।

১৯-২০ সেপ্টেম্বর ২০১২
(প্রাগুক্ত)

১৫
কহি কেউ নারাজ হলেও

লেনিনের প্রতিরূপ কেক কেটে প্রীতিভোজ সেরেও পশ্চিম
নিরুদ্বিগ্ন কেন আজ অবলুপ্ত ব্যবস্থার উত্থানে কোথাও?
হাভানা, কাঠমাণ্ডু, কিংবা প্যারিস ও কারাকাসে তবে উপাদেয়
খাবার কি নেই?নাকি মেলে না নগদ স্তন, নারীরও নিতম্ব?
অবাধ মদিরাঢেউ, নরে ও পুরুষে বিয়ে, কৃত্রিম ও খাঁটি
কামাঙ্গ-দোকান কিংবা রতিরও প্রামাণ্য চিত্রে সাড়াই পড়ে না
সব ভূখ-ে তাহলে? প্রাক্তন দুশমন লঘু দ্বিতীয় হলেও
দূর পরাহত নয়, এ কথা ক’জন জানে কামার্ত প্রতীচ্যে?
তৈলই কেবল লক্ষ্য ব’লে কি যুদ্ধাপরাধে নির্বিচারে হত
জনপ্রেমিক নেতার স্মৃতির ওপর খেলে তীব্র প্রতিক্রিয়া,
অধিকৃত লিবিয়ায়? ভয় নেই; স্বপ্ন দেখতে হয় না সবার
ভুল। চতুর্থ বিজয়ে লাতিন ভূখণ্ডে মানুষ উদ্বেল। তাই
অদ্য সারাদিনই ভেনিজুয়েলা আমার। কেউ নারাজ হলেও
কহি : হোক চে-বাণিজ্য খুব। আজ থেকে সারা জীবনই চাভেজ।

১১-১৫ অক্টোবর ২০১২
(প্রাগুক্ত)

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E