৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ০৫২০১৭
 
 ০৫/১০/২০১৭  Posted by

“সরপুঁটির কানকোর ভেতর থেকে উঁকি মেরে দেখে নেবো- দুই পারের যৌথ জীবন”

ওবায়েদ আকাশের নিখিল কাব্যিক অঙ্গীকার
খালেদ হামিদী

খালেদ হামিদী

খালেদ হামিদী

বাংলাদেশের গেলো শতকের নব্বইয়ের দশকের কবিতায়, এরও বিশ-ত্রিশ বছর আগেকার পশ্চিমা তত্ত্ব পোস্ট মডার্নিজমের ‘সমমাত্রিক বিপরীত অভিঘাত (সূত্র: উত্তর আধুনিকতা/নতুন অন্বয়ের পরিপ্রেক্ষিত; এজাজ ইউসুফী প্রণীত গ্রন্থ)’খ্যাত উত্তর আধুনিকতার প্রভাব, সেই তিরিশের দশকের বহুলকথিত ‘সরাসরি প্রতীচ্য-অনুসৃত’ বাংলা কাব্যের পর, অংশত মুদ্রিত হতে শুরু করে। তরুণ-অতি তরুণ এক দল কবি-কবি যশোপ্রার্থীর এ-সংক্রান্ত আবেগে-উচ্ছ্বাসে প্লাবিত হন অনেকে। মতদ্বৈধতারও দুই শহরকেন্দ্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাঁদের আন্তরিক তৎপরতা লক্ষ করা যায়। তবে সব ছাপিয়ে কিংবা এসবেরও শেষে কবিতায় সামষ্টিক সাংস্কৃতিক পরিচয় মুদ্রণের বিষয়টি, ওই সময়কালের সকল কবির রচনায়, সমমাত্রিক রাজনীতিক-দার্শনিক সদর্থকতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। কবি ওবায়েদ আকাশ তাঁর আবির্ভাবকালের উল্লিখিত কলরবে সাড়া না দিয়েই নিজের দেশীয় ও বৈশ্বিক জীবনবোধের কাব্যানুবাদে ব্রতী হন এক সূক্ষ্ম পৃথকতাযোগে। এ সময় বিরুদ্ধ বিশ্বশক্তির সাহিত্যিক মোকাবিলায় স্বদেশী আত্মপরিচয় অবিস্মরণের দাবি উঠলেও সকল পদ্যকারের পক্ষে এই চেতনার গ্রহণযোগ্য অনুবাদ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এদিকে আমাদের আলোচ্য কবির ‘লৌকিক বাংলায় প্রত্ন-অনুসন্ধিৎসু অভিযাত্রা (দ্র: শামসুজ্জামান খান লিখিত ভূমিকা; উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল বইয়ে)’র কথা বলা হলেও, তিনি বাংলায় বিচরণ কেবল করেন না, যে কোনো জৈবনিক অবস্থানে গ্রাম-বাংলাকে গ্রথিত করে নেন নিজ সমগ্র সত্তায়। তা কীভাবে?

ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ

উপর্যুক্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে স্মৃতিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কথাসাহিত্যিক-নাট্যকার অলিভার গোল্ডস্মিথ রচিত, তৎকালের প্রেক্ষাপটে মারাত্মক একটি দীর্ঘ কবিতা The Deserted Village। এক ধনী লোকের বাগান নির্মাণের জন্যে বলপ্রয়োগে প্রাচীন এক গ্রাম ও এর খামারগুলোর ধ্বংস ও বিনষ্টিকরণ প্রত্যক্ষ করেন কবি। এই কবিতায় তিনি গ্রামবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড তথা কৃষিকাজের উৎপাদনশীল জমিকে আলংকারিক উদ্যানে পরিণতকরণের ফলে সরল-সস্নেহ কৃষকের আচরণিক সৌন্দর্য বিনষ্ট এবং অস্তিত্বও সংকটাপন্ন হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন সমিল চরণগুচ্ছে। দিঘল কবিতাটিতে গল্পের চিকন রেখাও মেলে। কবির সমাজচেতনা পাঠককে আন্দোলিত করে। প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে রচিত কবিতাটির অনেক পঙক্তি, কিছুটা হলেও বিস্ময়কর যে, এখনো প্রাসঙ্গিক ঠেকে : ‘Where wealth accumulates, and men decay:/Princes and lords may flourish, or may fade;/A breath can make them, as a breath has made;/But a bold peasantry, their country’s pride,/When once destroyed, can never be supplied.’ অবিস্মরণীয় এমন আরো অনেক উচ্চারণ সুলভ এই কবিতায়। ভোলা যায় না দলিত জনম-লির প্রতি কবির অসম্ভব দরদের কথাও : ‘Around the world each needful product flies,/For all the luxuries the world supplies.’ তবে ওবায়েদ আকাশের গ্রাম এখনো নিশ্চিহ্ন নয়। কেননা বাংলাদেশ গ্রামেরই দেশ। যদিও, ধনতন্ত্রের শকট সেনিটেশনের নামে, টুথপেস্ট হাতে, মানুষের দাওয়ায়-ঘরে এখন উপনীত। সেলফোনের টাওয়ার সেখানে সগর্বে দণ্ডায়মান। আমাদের আলোচ্য কবি নগরবাসী হলেও এই গ্রাম তথা মূল স্বদেশকে নানাভাবে, নানান মাত্রায় অস্তিত্বে ধারণ ও বহন করে চলেন :

(১) যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম/মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো/ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ (প্রকৃতিপুত্র; উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল; প্রথম প্রকাশ: ২০১৩)

(২) আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ পোড়ার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস… এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল- এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত (রূপনগর; ঐ)

(৩) একটাই ডাল গাছে দুই হাতে ধরা আছে/একজনই ঝোলা যায় তাতে/তুমি শুধু পড়ে গিয়ে স্মৃতিটুকু ফিরে পেয়ে/ভাবো আমি বাঁচি মাছে-ভাতে […] আমার তো হলো না তা ঘটে গেল অন্য যা-তা/ভবলীলা সাঙ্গ করে আঁখি/অচেনা ভ্রমণে এসে বাংলাকে ভালবেসে/শুধু তারা হয়ে যায় পাখি (ভ্রমণ; ঐ)

(৪) […] এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম।… কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে। […] আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযত্নে রাখি ঘরের নিভৃত কোণে। (বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো; ঐ)

(৫) কোকিলগুলো ডাকছে অযথা/চরভৈরবীর পারে কারো ছিন্ন হাসি/ঝুলে থাকবার পর/সান্ধ্যকালীন বিদ্যাভ্যাসের মতো কোকিলগুলো ডেকে ওঠে […] সাইবেরিয়ার পাখিগুলো কিছু হাসি তুলে নিয়ে গেছে/যা তোমার অধর থেকে খোয়া গেছে বলে/অন্তত চাঁদের আলোতে ঘুমাতে হয় আজও (আলোফুল; ঐ)

(৬) মক্তব থেকে তোমার নাম কেটে দেয়া হলো/[…] পাটের সুতো ছিঁড়ে, তোমার মুখ বেরিয়ে আসে বিশাল বন থেকে/মেঘ-রৌদ্র-ঘামে/তোমার কৃষক পিতা জানে/একদিন তুমি জাহাজ কিংবা এরোপ্লেনও বানিয়ে ফেলতে পারো/তোমার বয়স থেকে লিঙ্গ কেটে/সাগর থেকে গভীরতা তুলে আনা হলো (প্রাচীন প্রবীণ বালক তুমি; ঐ)

(৭) আমার মতো যারা মানব দেহ মাটি করে/ঝাড়বংশে বৃদ্ধি করছে আগাছার চারা/তাদের নামে তৈরি হবে গ্রামে গ্রামে দাতব্য ইস্কুল? (বুকের ওপর আগাছার চারা; ঐ)

(৮) পৃথিবীর নিভৃত ক্রোড়ে শরীরের বাকল খুলে উড়ছে তো দুরন্ত শৈশব/[…] একবার ঘুমিয়ে যেতেই টের পাও/সামান্য গাছের পাতা পড়লেও- একদিন/তাতে সাড়া না দিয়ে কোনোই উপায় ছিল না তোমার (এখন যা আছে, নেই; ঐ)

(৯) একবার যখন ভালবাসতে শিখেছ, তেমাথার মোড়ে গাছগাছালির ভিড়ে নিঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখ- ভালবাসা কেন বারবার বৃষ্টিতে ভিজে উঠতে চায় (মুখর এলাহি কাল; ঐ)

(১০) ‘ভোর হলো দোর খোল’ প্রতি প্রত্যুষে/তোমাকে জাগাতে আসে বহুতল টাওয়ারের ছায়া/তুমি আনমনে উঠোনে বাগানের রোদে ক্লোরোফিল খোঁজো/হেলেদুলে ভোরের কুমারী ফুলে/ব্যাপক ঘ্রাণের সখ্য শরীরে ভাসাও (পুকুরপারে, ক্রমশ উজ্জ্বল বাড়ি; ঐ)

উপর্যুক্ত দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে জীবিকা সকাশে গ্রাম ত্যাগের কাব্যিক দৃশ্যায়ন পাঠককে স্পর্শ করে। দশম কবিতাংশে ‘বহুতল টাওয়ারের ছায়া’য় প্রত্যুষে নগরে জেগে উঠেও কেউ নিজেকে ফিরে পায় গ্রাম-বাংলায়। ত্রিপদী ছন্দে রচিত তৃতীয় উদ্ধৃতির কবিতাটিতে, মাছে-ভাতে বাঁচতে না-পারা, তাঁর সঙ্গে ‘অন্য যা-তা’ ঘটে-যাওয়া কবি বাংলাকে ভালোবাসেন আশ্চর্য দুর্মরতায়। গ্রামের সাঁকোয় দাঁড়িয়ে ‘স্রোতের প্রবাহ দেখে’, প্রখর দৃষ্টি ও দারুণ কবিত্বযোগে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সামন্তীয় বৈশ্বিক ইতিহাসের ভেসে-যাওয়া অবলুপ্ত নিদর্শন। ‘কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর… শিব শিব’ ক’রে হারানো প্রেমের সন্ধানে, ৪-সংখ্যক কবিতাংশে, ‘পোকা হয়ে (পাঠকের মনে পড়ে, ফ্রানৎজ্ কাফকার মেটামরফসিস উপন্যাসের শুরুতে নায়ক গ্রেগর সামসা, অনিষ্পত্তিকৃত স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় ঘুম থেকে জেগে উঠে সকালে দেখে, নিজের শয্যায় সে কীটে রূপান্তরিত হয়ে আছে)’ কবির ওড়ার ঘটনায় (যে উড্ডয়ন সম্পূর্ণতই ওবায়েদ আকাশীয়, আমাদের কবি ও সামসা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার চাপে পোকায় পরিণত হলেও) সচেতন পাঠকের চোখ ভিজে আসে (মনে পড়ে, তিন দশকাধিক কাল আগে আমি, এই অভাজন, রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি পাঠের সময় কেঁদে ফেলি)। মনে হয়, আরো আগে থেকে কবির হাত ধরে কেন ‘ইংলিশ রোড’ হতে বহু দূর হেঁটে যাইনি! ৫ম উদ্ধৃতাংশে স্বদেশ ও বিদেশ একাকার হয়ে প্রেমের বেদনাকে এক নিখিল পরিব্যাপ্তি দান করে। ৬-সংখ্যক পঙক্তিগুচ্ছে গ্রাম শহরে ঢোকে আর দ্যোতিত হয় সাগর-সম্ভাবনা। কারো কীর্তিহীনতাজনিত পরিতাপ বা আত্মব্যঙ্গের সুরে গ্রামীণ আত্মপরিচয়ই প্রতিষ্ঠিত হয় সপ্তম চয়নাংশের কবিতায়। অতঃপর এখন যা আছে, নেই কাব্যে কবি পাঠককেও ফিরিয়ে দেন দূরে রেখে-আসা জন্মগ্রাম, গভীর সংবেদনশীলতায়। এখানে বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য ওবায়েদের ভাষা। এতো সহজ, সাবলীল ভাষায় পাঠকের সত্তার অতল স্পর্শের ক্ষমতা কিংবা গভীরতম জীবনবোধের প্রকাশ তাঁর শক্তিমত্তার প্রমাণ মুদ্রিত করে। এই প্রগাঢ় কবিত্ব ও দৃঢ় কবিসত্তা বাক্সময় হয়ে আছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আলোচ্যমান নির্বাচিত কাব্য ছাড়াও তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতাকিতাবে। তাই পাঠকও নতুন করে ‘তেমাথার মোড়ে গাছগাছালির ভিড়ে নিঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে’ দেখে নিতে আগ্রহী হয় ‘ভালবাসা কেন বারবার বৃষ্টিতে ভিজে উঠতে চায়।’

আরেকটা কথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জসীম উদদীন, এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল আল মাহমুদ, গ্রাম কার কবিতায় নেই? রবীন্দ্রে, অমিয়ে, প্রেমেন্দ্রে গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতাই, বলা যায়, অনুল্লেখ্য পরিমাণে, মুখ্য। জীবনানন্দে গ্রামীণ ভূ-প্রকৃতিময় এক ঐহিক অধ্যাত্মপ্রাণিত অনুভূমিক পর্যটক সদা সক্রিয়। মনে রাখতে হয়, ঊনিশ শো চৌত্রিশের কবিতায় তিনি গ্রামে ধনতন্ত্রের প্রযুক্তিআশ্রয়ী উপনয়ন শনাক্ত করেন ধানক্ষেত ঘেঁষে ধূলি উড়িয়ে ‘মোটরকারের’ অনেকটা অভিযানরূপ যাত্রা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। জসীম উদ্দীনকে টান দিলে তো বাংলার শেকড়সুদ্ধ উঠে আসে। আর, আল মাহমুদ মুখে ক্ষণকালীন সাম্যবাদীর মুখোশ এঁটে ‘ক্ষেতের আড়ালে’ ‘যৌবন জরদ’ নগ্ন করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে কবি-সমালোচক-পাঠকবৃন্দ ওমর আলী, আল মাহমুদ কিংবা আহমদ ছফার কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা আস্বাদন করেন তাঁরাই জসীম উদদীনকে, নাগরিক মধ্যবিত্ত মান জবানে কবিতা রচনা সত্ত্বেও, কেবল তাঁর কবিতার প্রেক্ষাপট কিংবা প্রসঙ্গের কারণে ‘পল্লী কবি’ অভিধায় একঘরে করে দেন। অথচ জসীম উদদীন নিছক পল্লীর কবি নন। কাজী নজরুল ইসলাম যেখানে উপনিবেশবিরোধিতায় অসম্ভব সচকিত, জসীম উদদীন সেখানে, উত্তর ঔপনিবেশিক অবস্থানে, শান্ত-সমাহিত। তবে উপনিবেশের করাল গ্রাসে বাংলার সম্ভাব্য বিলীয়মানতা জীবনানন্দ দাশ টের পান ঢের আগে, তাঁর মাইল ফলকপ্রতিম রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থে। এদিকে বিস্ময় মানতে হয় এ জন্যে যে, ‘সোনালী কাবিন’ লিখেও আল মাহমুদ অনাগরিক কবি হন না আর গ্রাম্য কবিদের ছন্দবিচ্যুতি বা ত্রুটিপূর্ণ ছন্দ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকেও জসীম উদদীন কোণঠাসা হন। এমন পটভূমিকায় ওবায়েদ আকাশের, পৃথিবীর সারা বঙ্গে শ্বাস গ্রহণের ধরনটি, উপর্যুক্ত কোনো পূর্বজের সঙ্গেই মেলে না। কেননা তাঁর না আছে সেই অধ্যাত্মের সচেষ্ট কোনো সংস্করণ, না হতে দেন তিনি জন্মগ্রামকে ক্ষীয়মাণ। না তিনি হন তাঁরই সমকালীন একাধিক কবির ধরনে প্রমিত জবানে স্থানিক-আঞ্চলিক শব্দ ও ক্রিয়াদের গ্রন্থনায় ব্রতী, না তিনি মান ভাষায় রচেন, কেবল আক্ষরিক অর্থেও, গ্রামীণ আখ্যান। কিন্তু মুখোশধারী ছদ্মবেশী কোনো পূর্বসূরিকে শনাক্তকরণে তিনি অব্যর্থ বলেই অনবরত উদ্ধার করে চলেন জীবিত ও হৃত মানুষের মুখম-ল। বিষম সমাজব্যবস্থামূলক সভ্যতা মানুষকে, পৃথিবীর অগণিত শোষিত মানুষকে গ্রহণ করে না। বলা বাহুল্য, নিজেদের মুনাফাভিত্তিক পুঁজি গড়ার কাজে ব্যবহৃত এই লোকগুলোকে তাঁরা মানুষই জ্ঞান করেন না। উপরি চাকচিক্যের আড়ালে অবজ্ঞাত মানুষগুলির মুখম-ল মূলত আবিষ্কার ও উদ্ধারে প্রয়াসী কবি ওবায়েদ আকাশ। তাঁর কবিতায় তাই ব্যষ্টি যেমন সরব, সমষ্টিও তেমনি নীরব নয়। আরো লক্ষণীয়, একাধিক পূর্বজের ধরনে, অংশত বা সম্পূর্ণতই, শুধু গ্রামেই তিনি পরিব্রাজক নন। এরই মধ্যে পরিলক্ষিত যে, তাঁর গ্রাম যেমন নগরে প্রবিষ্ট তেমনি তাঁরই অবচেতনে কেবল নয়, নাগরিক চৈতন্যের গভীরেও গ্রাম প্রবহমান। অলিভারের সেই দুঃখ ও ভয় আর জীবনানন্দের অগ্রিম শঙ্কার উপলব্ধির পরে ওবায়েদ আকাশ বুঝি গ্রাম-বাংলা তথা তাঁর সমগ্র স্বদেশকেই জীবন্ত রাখেন তাঁর কবিতায় ও সার্বিক সচেতনতায় অনুরণিত আপন সত্তায়। আবু ইসহাকের সেই জয়গুণ থেকে শুরু করে এখনো অব্দি জীবিকা সকাশে কারো-না-কারো হাত ধরে গ্রাম শহরে প্রবেশ করলেও এবং সমান্তরালে গ্রামীণ জনপদ পুঁজিবাদী পণ্যায়নের শিকার হয়ে চললেও, ভাষায় ওবায়েদ একে জিইয়ে রাখেন, যেভাবে মাহমুদ দারবিশসহ ফিলিস্তিনি কবিদের কাব্যে বেঁচে থাকে তাঁদের স্বদেশ। কেননা তাঁরা উদ্বাস্তু হলেও মাতৃভাষা তো আর হারিয়ে ফেলেন না।

এই উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল-এই ওবায়েদের আরো কবিত্ব, সৃজন ও মননশীলতার দৃষ্টান্তস্বরূপ জাজ্বল্যমান, যার প্রথাবদ্ধ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়, পাঠককে কেবল বিমুগ্ধ হতে হয় :
(১) […] ওগো সখি/বিলাপ বিপন্ন হলো, শীতে মরে আছি উনুনের পাশে/ডানায় জমেছে মেঘ, কার হাতে বিষ পান করি! (টান; ঐ)

(২) প্রতারিত ফুল ফুটে থাকি। ব্যাপক ঘ্রাণের তোড়ে/ঝরে পড়া অর্থবহ হয়, কখনো কি ঝরে যেতে পারি?/ফসিল সত্যের ভিড়ে ঢেকে যাবো ভ্রূণের নগ্নতা/হৃতসুখ মানুষেরা যতটুকু ডুবে থেকে পারে (টান: নয়; ঐ)

(৩) ঝরাপাতা বিস্মৃত অধরে বাজে। নিমগ্ন শিল্পের ক্ষারে/খসে গেছে ত্বকের সুদিন- কোন মুখে ভুল ঠোঁটে জাগি? (টান: দশ; ঐ)

(৪) সতীন-জোছনার তাপে খসে গেছে রাতের পালক/হায় সখি, ঘুম ভেঙে তার মুখ দেখি! (টান: চৌদ্দ; ঐ)

(৫) পরম শূন্যের ভেতর/ নিবস্ত্র শরীরে খুব নিশ্চিন্ত হওয়া যায়/কখনো বালুকাবেলায় ঢেউয়ের গর্জনগুলো পরম শূন্য হতে পাওয়া […] প্রকৃত মানুষ-সকল গুহাময় পৃথিবীটা এফোঁড় ওফোঁড় করে/মরে থাকে পরম শূন্যের গভীরে (পরম শূন্যের ভেতর; ঐ)

(৬) আমি যে মৃত মেয়েটির কাছে ফুলের গন্ধ বয়ে নিয়ে এলাম, তার জারুলপাতা শাড়ি, ধূসর হাতঘড়িটির পাশে রেখে এলাম আরেকটি বৃক্ষের স্বপ্নচ্যুত স্তূপীকৃত ফুল… (যে এই নারী; ঐ)

(৭) আমরা ভাল-স্বাস্থ্য, ছৈ-সমেত নাওয়ের গভীরে যা কিছু করি তারও মাহাত্ম্য থাক- আমরা বলবো না কোথাও। (আমাদের প্রয়োজন সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য; ঐ)

(৮) […] উদোম শিশুরা দেখে/অপার পৃথিবী ফুঁড়ে চুল খুলে বসে আছে জোছনায় বাগানের মেয়ে (আমাদের বাড়ি একজন বাগানের মেয়ে; ঐ)

(৯) আমাদের বড়ইতলা বুক উজাড় করে/ঝরাফুল নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কাল (পৃথিবীর করুণারাশি; ঐ)

কবির নান্দনিকতার উপর্যুক্ত নমুনাগুলোয় তীব্র সংবেদন ও অন্তঃকরণ, তাঁর বিস্তৃত অভিজ্ঞতার বিস্ময়, ‘পরম শূন্য’ বিষয়ে প্রায় অকল্পনীয় প্রাজ্ঞতা এবং এ-সংক্রান্ত উচ্চারণের বাণীপ্রতিমতা সহজে বিস্মরণীয় নয়।

কিন্তু ওবায়েদের কি প্রাগুক্ত স্বাদেশিক অঙ্গীকারই সার? না। তিনি আপন অনুভবে নির্ণয় করে চলেন স্বদেশীয় ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার কল্লোল। কিন্তু কীভাবে? তাঁর শ্রেণীবোধ ও শ্রেণীচেতনা তিনি অনুবাদ করেন এভাবে:

“আমি একজন মাঝি/আমার পায়ে বাঁধা শেকল নিয়ে খেলছে শিশুদের দল/আমার প্রপিতামহ কিংবা তারো/হাজার গোষ্ঠী আগের এই শেকলের/অবিকল চকচকে প্রতিবিম্বে/আমাকেও কি বোকা বোকা সুদর্শন লাগে […] আমি ব্যাবিলনীয়-ক্যালডীয় সভ্যতাকালেও/পুরোদস্তুর অবৈজ্ঞানিক বিবেচিত হলাম/আজ আবার সাম্প্রতিক গবেষণাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে দেখি/জ্বলেপুড়ে অঙ্গার- তবু বেঁচে উঠছি/পৃথিবীর প্রাচীন দীর্ঘশ্বাস” (বিকলাঙ্গ ভাবনাসূত্র; উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল)

অবৈজ্ঞানিক বিবেচিত হওয়া আর ‘পৃথিবীর প্রাচীন দীর্ঘশ্বাস’রূপ বেঁচে ওঠার মধ্যে, বিশ্বমনুষ্যসমাজে শ্রেণীবিভক্তির শুরু থেকে শোষণের ফলে এ-যাবৎ হৃত-মৃত সকল মানুষের, মর্মছোঁয়া প্রতিবাদ ও আর্তনাদ কল্লোলিত হয়ে ওঠে। কথা বলে ওঠেন সেই রুসো থেকে মার্কস-এঙ্গেলস্। ফের শুনতে পারা যায়, রুসো বলেন:
যে মানুষটি সর্বপ্রথম এক টুকরো জমি ঘের দিয়ে একথা বলার কথা চিন্তা করেছিল ‘এ জমি আমার’ আর যার চারপাশে একথা বিশ্বাস করার মতো সহজ সরল লোক ছিল, সে মানুষটিই সভ্যসমাজের আদি প্রতিষ্ঠাতা। কেউ যদি সেদিন তার পোঁতা খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলে, গর্ত ভরাট করে দিয়ে বলত ‘তোমরা এ প্রতারকের কথায় বিশ্বাস করো না- আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে আমরা যদি একথা ভুলে যাই যে পৃথিবীর ফুলফল আমাদের সকলের, কিন্তু এ মাটি কারো একার নয়’- তাহলে কত খুনজখম, অপরাধ, যুদ্ধ, বিভীষিকা আর দুর্ভাগ্যের হাত থেকেই না মানবজাতি রক্ষা পেত। (মানব জাতির অসমতার উৎস এবং ভিত্তি; অনুবাদ: হারুন-উর রশিদ)
এই খুনজখম, অপরাধ, যুদ্ধ, বিভীষিকা আর দুর্ভাগ্যের হাত থেকে রেহাইশূন্য মানবতার ধারায়, নান্দনিকতার পাশাপাশি সার্বিক সচেতনতায়ও, আমাদেব কবি নিরন্তর সক্রিয় থাকেন। তাঁর বাক্যবন্ধন অধিকতররূপে লাভ করে দৃঢ়তা, অনবরত জোর বাঁধে ভাষা ও কবিত্ব:

(১) এবার তারা আমাকে লিঙ্গান্তর করে/একটি হিমাগারের দিকে নিয়ে যেতে চাইবে/দরজায় বসিয়ে দেবে সমাজতন্ত্রের ঘোড়া/কেননা আমার তো লিঙ্গ ছিল না কোনো, বরং/এ জাতীয় ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে জমেছিল সহস্রাব্দের মেদ (বর্ণ ও বৈশ্বায়ন; ঐ)

(২) […] অথবা যে এক চিলতে চাঁদ/মুখের কার্নিশে বসে, আমার অক্ষত লাবণ্যের দিকেই/ঝুঁকে পড়েছিল, অগত্যা/জন্মান্ধ প্রবীণ নাবিক, চড়ে বসেছিল/জাহাজের লিঙ্গের চূড়ায়/আমরা তুষারের ভেতর, একটি জাহাজের নোঙরের ভেতর/একটি মাস্তুলের কথা কখনো বলিনি! (প্রাগুক্ত)

(৩) আমার লাশ বয়ে নিয়ে কেউ কেউ/রাজতন্ত্রের ক্লান্ত গাধাটির মতো/গড়িয়ে পড়ছিল তলে/ধনতন্ত্র আর সাম্রাজ্যবাদের তুষার রূপসীরা/আমাকে টেনে নিয়েছিল নিরন্তর প্রসব বেদনায় (প্রাগুক্ত)

(৪) মরে যেতে দেখেছে সে টাইগ্রিসের ঢেউ। তার আছে/দাসত্বের বিশ্বস্ত ভ্রমণ। ক্রীট ও ফিনিশীয় কালে/চাঁদের কলঙ্ক ছেঁকে ধামাভর্তি এনেছিল জোছনার রোদ/আজ আবার গোকুলে দাঁড়াল সে। […] হারানো দাসত্ব তার দৈর্ঘ্যেপ্রস্থে কতটা পেরুলো/জানে শুধু নেকাবে আবৃত মুখ (বানেশ্বর; ঐ)

(৫) আমি এক মৃত নগরের শব/কাঁধে করে নিয়ে যাই পারস্য নগরে/যেতে যেতে কেউ দেখে, হালখাতা এসে গেছে/আমারও রয়েছে কিছু কারবারি দেনা/শবখানা নড়েচড়ে দেখে/পারস্য নগরে কিছু গজিয়েছে মাঠ/ কেউ তার বোঝে না ব্যাপার (হালখাতা; ঐ)

(৬) প্রেমিকার ঠোঁট কেটে গড়ানো সমুদ্রের ভেতর কতকালের রতিগন্ধ থাকে- আজ তার চিরুনি অভিযান/শূন্যতার নদীপথে বিবাহিত যুদ্ধবিমান। পরস্পর বিরহকালের পাঁজরের ব্যথা নিয়ে অগত্যা ঘোষণা করে কতিপয় শাসকের পশুজন্মকথা। (শূন্যতার রাত্রিদিন; ঐ)

(৭) কমল (মাঝি বাড়ির ছেলে)/ডাকনাম কৃষ্ণকমল/কাদা পায়ে উজিয়ে চলেছে চিরকাল/এইমাত্র (বয়স হয়েছে বলে কেউ কেউ)/রিকশার প্যাডেলে ঘুরিয়ে দেখল আজন্মের চঞ্চলতা, সুর-/ততদূর, যতদূর কৃষ্ণকমল থাকে/কমল, তার এই নাম থেকে বাজারের দূরত্ব যতোটা/ততদূর, কোমরে গুটানো সুতো/এক এক করে খুলছে/আর কষে বাঁধছে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের গ্রীবা/আর তা, যেহেতু ছিঁড়ে পড়ছে ঝড়ে/কমল, চিৎকার করে হাসছে (কৃষ্ণকমল; ঐ)

কাব্যিকতাযোগে তীক্ষ্ণ পুঁজিবাদবিরোধিতা, বড় কবির ভাষ্যে বিরল কবিত্ব প্রকাশ, শীর্ষস্থানীয় কাব্যিক সৌন্দর্যে উক্ত বিরুদ্ধতার স্পষ্টতা নিশ্চিতকরণ, বৈশ্বিক-ঐতিহাসিক পর্যটন, দারুণ সচ্ছন্দ ছন্দে রূপক-প্রতীকে অন্যরকম গভীর প্রাজ্ঞতা প্রতিষ্ঠা, রক্তচোষক শাসক-শ্রেণীর মুখোশ উন্মোচন এবং সমাজতান্ত্রিক বোধের স্পষ্ট কিন্তু কবিতানুগ অনুবাদ ওবায়েদের উপর্যুক্ত কবিতাগুলোকে মহিমান্বিত করে। তাঁর আরো অনেক কবিতায়ও জীবনকে দেখার এই অবলোকন, যা প্রায় বিরল, সচেতন পাঠককে আশ্বস্ত করে। ম্যাজিক (ঐ) কবিতায় প্রকৃতি ও বিশ্বরাজনীতির চাপে দলিত জনপদ কাব্যিক কলরোল তোলে। এই কবিতার অন্তিমে শ্রেণিবাস্তবতাকেও ম্যাজিক আখ্যায়িত ক’রে দুঃখময় দ্ব্যর্থবোধকতা সৃষ্টি করেন কবি, অসাধারণরূপে:

“এইভাবে, আরো এক ম্যাজিকের কথা বলি- পৃথিবীতে শ্রেণীগত সম্বন্ধগুলি যেভাবে নির্মিত হতে থাকে, পরস্পর-”

তাছাড়া কবির সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ, উইট ইত্যাদির দৃষ্টান্ত চয়নের মাধ্যমে উদ্ধৃতির পরিমাণ না বাড়াতে চাইলেও অবশ্যউল্লেখ্য হয়ে ওঠে আলোচ্যমান কবির ব্যতিক্রমী উচ্চারণ ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অন্তত একটি উজ্জ্বল নমুনা:

‘পৃথিবীতে মাতাল অশ্বকুল উড়িয়েছে তাদের ব্যাপক পুচ্ছরাশি। আর আমরা ভাবতে থাকি যে, আমাদের প্রত্যেকের নিজ হাতে অন্ন গ্রহণের প্রথম দিনটির কথা কেন যে মনেই পড়ে না! […] এই আজকের দিনটিও গত হবার আগেই তা জড়াবে-মোড়াবে ইতিহাসের মাকড়সার আঠায়…’ (কাঁচের পেয়ালাগুলোয় সুখদুঃখের চুম্বনের খসড়া; ঐ) প্রসঙ্গত মনে পড়ে, অতীতে ইয়োরোপে ও প্রায় সারা পৃথিবীতেই কৃষিজীবী ও অ-কৃষিজীবী সমাজের জন্যে অভিন্ন প্রয়োজনে গোষ্ঠী নির্মাণের এলাকাভিত্তিক নামই ছিলো গ্রাম। বলা হয়, গ্রেট ব্রিটেনে হ্যামলেট বা একটি ছোট্ট গ্রাম গীর্জা প্রতিষ্ঠার পর পূর্ণাঙ্গ গ্রাম হয়ে ওঠার অধিকার লাভ করে। অনেক সংস্কৃতিতেই, মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ ছোট শহর বা বড় নগরে বাস করতো। শিল্প বিপ্লব ইয়োরোপের জনম-লির বিরাট অংশকে মিল ও ফ্যাক্টরির কাজের প্রতি আকৃষ্ট করে। এতে অনেক গ্রাম ছোট শহর ও বড় নগরে রূপান্তরিত হয়। এই অবস্থা শ্রমের বিশেষায়িতকরণ এবং বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটায়। এভাবে নগরায়নের প্রবণতা অব্যাহত থাকে, যদিও, তা সবসময় শিল্পায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েই ঘটে না। লক্ষণীয়, ধর্ম কিংবা লোকসংস্কৃতিআশ্রিত গ্রাম নয়, গ্রামীণ নিসর্গ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাই ওবায়েদ আকাশের অন্বিষ্ট:

“ধনেশের মেয়ের সম্বন্ধটি ভালই ঘটেছে/পলকে রটেছে বাবা/ মোটা ভাত মোটা কাপড় ক’জনার জোটে আর! […] একটি মাত্র ইলিশের বিনিময় হলে/মিটে যাবে সমস্ত পারাপারের দেনা” (বৃষ্টি পড়ছে; ঐ)

এ পর্যায়ে উদ্ধৃতির লোভ সংবরণযোগ্য থাকে না:

(ক) আমার এই শহরের চিলেকোঠার ছোট্ট বাসাটি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাবার কথা ভাবতেই- সজনে আর তেঁতুলগাছের ফাঁক গলে পুকুরপারে জোছনা এসে হামলে পড়েছিল। (কাল্পনিক এক বুদ্ধিজীবীর স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাহেতু; ঐ)

(খ) আমার মহাত্মা ধানজমিগুলো/ ক্রমাগত/ জলের দামে বিকিয়ে দিয়েছিলাম… […] তুমি সিংহ-শাবক কোলে তুলে নিয়ে, দ্বিধান্বিত পৃথিবীর পটে/ ভেঙে ফেলেছিলে তাজমহলের কাচ (সাম্প্রতিকগুলো; ঐ)
(গ) গাণিতিক সম্বন্ধগুলো/পৃথিবীতে সুপ্রাচীন সভ্যতার ভেতর/চুরি হয়ে যায় (জারুল, গোপনে গোপনে; ঐ)

(ঘ) আমার তো কথা ছিল তালপাতায় লিখে দেবো/লাঙলের রেখা… […] আমার তো কথা ছিল নরম ডাঁটার মতো নুয়ে যাবো/রাইশস্য, চিনিচাঁপা, মেহগনি ফলের ঘ্রাণে… (জাতীয়তা; ঐ)

(ঙ) প্রত্যেকে হাত ধরে/পবিত্র সভ্যতার দিকে লেলিয়ে দিয়েছি/আমাদের ক্ষুধার্ত যৌনতা […] আমরা ভিক্ষে করে যা কিছু পাই/ঐসব রক্তাক্ত যোনি, আরব্য রজনীর শোক…/নিজেদের থলের ভেতর লুকিয়ে দেখেছি/তারা কথা বলে আদিম অর্চনা ভেঙে (বদলে যাওয়া; ঐ)

(চ) এক আছে পড়শিবাড়ির মেয়ে। আর বড় উত্তাপ কিছু নেই। গভীর বৈরাগ্য আমাকে চেনে। আমি জেনে গেছি, এইসব মায়াবাস্তবতা মার্কসের চেয়ে ঢের বেশি বোঝেনি তো কেউ। (কেউ কি প্রসিদ্ধ হলো; ঐ)

(ছ) আমি নাকি স্নিগ্ধ এক জলাশয় আর মধ্যরাতের গহীন অরণ্যের ভেতর অন্ধকার পেঁচার চোখের সমস্ত তীক্ষèতা পেতে বেঁচে আছি পৃথিবীর এক ধাতব সমুদ্রে। আমি নাকি আমার ছোট্ট বোন আর ছোট্ট ভাইটির জন্যে প্রকা- এক হারমোনিয়মে এই সমুদ্রের তাবত গর্জন তুলে নিতে চেয়েছিলাম একদিন (আমি নাকি; ঐ)

(জ) আমার চিরুনি হতে তোমার দীর্ঘ দুটি চুল/মেঝের ওপর গড়িয়ে পড়ে গেল-/তুমি দীর্ঘকাল পর গড়ানো অশ্রুর ভেতর/কেমন করে ভেসে যাচ্ছ মা! (অভিবাস; ঐ)

ওপরের কবিতাংশ বা কবিতাগুলো ছাড়াও আলোচ্যমান গ্রন্থান্তর্গত জনপদ কবিতায় বাক্সময় কর্মজীবী নরনারীর দূরত্ব পাঠককে ছুঁয়ে যায়। ওবায়েদ অনবরত কবিতা রচেন মর্ম নিংড়ে, বড় কবির ধরনে। নদীভাঙনে বিপন্ন জনপদের উল্লেখও তাই বাদ পড়ে না তাঁর স্যাঁতসেঁতে জীবনের মানে কবিতায়। ভাল রচনার বই কবিতাটি শুরু হয় ‘পাঠ করছি গদ্যশিল্পীর ভাল রচনার বই’ ব’লে। কখনো সাবলীল, কখনো ওজস্বী বাক্যবন্ধনে তাঁর কাব্যভাষা এমন স্বতন্ত্র যে উল্লিখিত কবিতাটির এমন অভাবিতপূর্ব সূচনা তাঁর ব্যতিক্রমী কৃৎকৌশলের প্রতিষ্ঠাও নিশ্চিত করে। ভাল রচনার বই কবিতাটি শেষ হয় এই ব’লে, অসামান্য সাহিত্যিক-শৈল্পিক উপলব্ধিযোগে:

‘রচনার তৃতীয় কলায় যে কৃষ্ণ বিবরের ভাষা লিপিবদ্ধ আছে, হঠাৎ এই অন্ধকারে আমি তার আদি অন্ত কিছুই দেখি না বলে পর্বতময় পড়ে আছে ভাল রচনার বই।’
উত্তরবঙ্গে প্রচণ্ড শীতে প্রাণ হারানো কয়েকজন মানুষের মৃত মুখ দেখে লেখা এপিসৌড : একটি জামা কবিতায় ওবায়েদ বলেন:

‘অনন্য তার নীল-কালো মুখে মাছিগুলো চুমু খেতে এসে খুইয়েছিল নিজ নিজ ডানা।’

এর চেয়ে সংবেদী, দরদী উচ্চারণ আর কী হতে পারে?
একদিকে সংখ্যালঘু ও আরেকদিকে প্রগতিশীল কিছু মানুষের সংকটাপন্ন অস্তিত্ব আমাদের কবি শনাক্ত করেন এভাবে:

‘আমাদের ভাষা কেউ কেড়ে নিয়ে গেছে/তবে চলো, অন্যত্র যাও চলে-/বংশের মেয়েরা যেমন/সিঁদুর মেখে চলে গেছে […] ভাষার বন্ধনের মতো পৃথিবীতে/ধর্মেও নাকি অথৈ সম্বন্ধ থাকে না/এই কথা বলেছিলেন প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদ…’ (ভাষাহারা; ঐ)

ওবায়েদের প্রেমানুভূতির প্রকাশও বিশিষ্টতার দাবিদার। যাকে বসিয়ে রেখেছ বারান্দায় (ঐ) কবিতায় ‘যাকে বিশ্বাস করো/তাকে বসিয়ে রেখেছ বারান্দায়’ বললেও, কবিতান্তরে তাঁর এ-উচ্চারণগুলো পাঠককে চমকে দেয়:

অ. আমি যে তোমার শিয়রে বসে/হাজার বছরের এক প্রাচীন মানুষ/ক্রমশই ছোট হয়ে আসছি বয়সে (আজকাল ওষুধের গুণে; ঐ)

আ. আমরা তো মেঘের গর্জন শুনে/ডাল ভেঙে পড়ে গেছি স্রোতশীলা হ্রদে/এরপর দেখা হলে কোনো চাঁদে- /আমিই কলঙ্ক আর তুমি তার আলো/অথবা তুমিই কলঙ্ক যদি/আমার তো সব কিছু কালো (সম্পর্ক; ঐ)

আরেকটি বিষয় লক্ষযোগ্য, আলোচ্যমান কবির কবিতা অধিকাংশেই গদ্যে ও মুক্তছন্দে রচিত। এ কাব্য ছন্দে রচিত হলে পর্ব-উপপর্বের হিসাব বিজ্ঞানের প্রভাবে কবির কবিত্ব ও সৌন্দর্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ব্যাহত হতো, এ কথা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাঁর সৃজন ও মননশীলতার অপ্রতিরোধ্য অভিব্যক্তি, নান্দনিকতা ও শিল্পের মান অক্ষুণ্ণ রেখেও, ব্যাকরণ-অনুশাসিত হবার নয়। তবে যেহেতু ছন্দে লেখা তাঁর অল্প কয়েকটি কবিতা অনুশাসিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত এবং চমৎকার, সেহেতু, এ কথা বলাই যায় যে, তাঁর ফ্রি ভার্সের অন্তত কিছু কবিতা ছন্দে লেখা যেত। অবশ্য তাঁরই কবিত্বশক্তি অধিকাংশ কবিতায় ছন্দের চাহিদাকে অতিক্রম করে। উপর্যুক্ত (জ), (অ) ও (আ)ভুক্ত কাব্যোচ্চারণ, বলতে পারি, বাংলা কবিতায় নিবিড় সংযোজন। কবির আরো কাব্যাংশ সিরিয়াস পাঠকেরও মুখে মুখে ফেরার মতো যা তাঁর স্থায়িত্বের হেতু এবং এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।

গদ্যাঙ্গিক তো বটেই, বিষয়ের বিচারেও সম্পূর্ণ নতুন, এমন একটি কাজ, কাব্যগ্রন্থ প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (২০১১), তিনি আমাদের উপহার দেন। তাঁর প্রিয় বত্রিশজন কবিকে নিয়ে রচিত বত্রিশটি গদ্য কবিতার সংকলন এটি। তন্মধ্যে দুজন, কবির ভাষায়, ‘রাজনীতির কবি’, কার্ল মার্কস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাকি ত্রিশজন উভয় বাংলার, বাঙালি কবি। কবিতাগুলো, প্রাকরণিক দিক থেকে, অনেকটা গদ্যধর্মীও। প্রত্যেকটির শিরোনাম (দীর্ঘ বিধায়ও) এবং মূল ধরন প্রবন্ধ ও কিছুটা প্রতিবেদনের মতোই ঠেকে প্রথম পাঠে। পাঠকের আরেকটু অভিনিবেশ সঞ্চারণ সম্ভব হলে ওবায়েদ আকাশের, কবিতাভুক্ত কবিদের বিষয়ে, দুর্দান্ত মননশীলতার পরিচয় মেলে। যে-কবিগণ একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকারও, ওবায়েদ তাঁদের পাঠ করেন সামগ্রিকভাবেই। এ তাঁর মনীষারও প্রকাশ বটে। কাব্যে ধৃত কবিদের কাজ ও কবিত্বযোগেই তিনি নিজ কাব্যিক ব্যঞ্জনা প্রবাহিত করেন পাঠকের মনে ও মননে। কয়েকটি উদাহরণ না দিলেই নয়:

(অ) সেই থেকে- আজো শিশুদের ফুলের গন্ধে ঘুম না এলে- লালনীল দীপাবলী ঘিরে আব্বুকে মনে পড়ে শুধু (কবি হুমায়ুন আজাদ ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাসেই ছড়িয়ে পড়তে দেখেন; প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়)

(আ) এবং আজই সন্ধ্যায় প্রথম কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় মিছিল থেকে ফিরে এসে ভাঙা কণ্ঠে কাঠ চেরাইয়ের শব্দের মতো চিৎকার করে বলেন- এই দেখো দিনের প্রথম সূর্যের রঙ কতোটা রক্তাক্ত হয় (একটি কবিতার জন্য কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সমস্ত মৃত্যুভয় ফাঁসিতে লটকে দিয়ে মিছিলে এগিয়ে যান; ঐ)

(ই) একবার আড্ডাচ্ছলে তিনি বিউটি বোর্ডিংয়ের সুউচ্চ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে দেখতে চেয়েছিলেন- সদ্যমুক্ত বাঙালির পায়ের নিচের দাঁড়াবার জায়গাটুকু কতটুকু শক্ত হতে পেরেছে; আর ধুঁকে ধুঁকে মরে যাওয়া এক পতিতার লাশ দীর্ঘক্ষণই শহীদ মিনারের খোলা চত্বরে রেখে বুঝতে চেয়েছেন আমাদের চেতনার বিধ্বস্ত নীলিমা আজ কতটা সুসংহত। (কবি শামসুর রাহমান তাঁর সমস্ত কবিতা একজন মুক্তিযোদ্ধাকেই নিবেদন করে যেতে পারতেন; ঐ)

(ঈ) বাঙালির প্রসন্ন ললাটে উঁকি দেয়া এমন সব্যসাচী স্রষ্টা আমাদের প্রিয় কবি সৈয়দ শামসুল হক সেদিন হয়তো বলবেন হেসে- না হয় আমি জন্মগ্রহণ করিনি হে উত্তরাধিকার (পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলে কবি সৈয়দ শামসুল হক অতন্দ্র প্রহরীর মতো কান খাড়া করে কাটিয়ে দেন সারারাত; ঐ)

(উ) তবু আদ্যন্ত অভিসারপ্রিয় কবি যে কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে অমরাবতীর খোঁজ পেয়েছিলেন মর্তে- তারই প্রচ্ছায়াজুড়ে গড়ানো নিমেষের ভেতর থেমে গেল নাকি চিরচঞ্চল গতি? যদিও অর্কেষ্ট্রার ভাষায় অস্ফুট গুঞ্জনের ভেতর শোনা যায়- আঁধার যতই প্রগাঢ় হোক- ফুলের ঐশ্বর্য তবু বিমুগ্ধ করে পথিকের চিরচঞ্চল মন (প্রশান্ত শিল্পের স্রষ্টা কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মৌনে কানাকানি শুনে কখনো প্রত্যাবর্তনের কথা ভেবে দেখেননি; ঐ)

উপর্যুক্ত কাব্যগ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো বত্রিশ কবির জন্যে রচিত স্তোত্রই। তবে সচরাচরিক ট্রিবিউটের ভাষায় এগুলো লিখিত হয়নি ব’লে অনমনীয় কাব্যবোদ্ধাদের কাছে কবিতানুগ নাও ঠেকতে পারে। কিন্তু কবিতা তো নানা প্রকারের হয়। এ ওবায়েদ আকাশের নতুন প্রকরণ, বলা যায়। লক্ষ্যযোগ্য, মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল যেমন এই গ্রন্থভুক্ত হন, তেমনি বাইরে রয়ে যান তিরিশের দুই কবি, বুদ্ধদেব বসু ও অমিয় চক্রবর্তী। এদিকে ওবায়েদের ঐতিহাসিক-রাজনীতিক-কাব্যিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে, স্বাভাবিকভাবেই, অনুত্তীর্ণ থেকে যান প্রতিক্রিয়াশীল আল মাহমুদ। এ সময়ের সূক্ষ্ম স্বদেশবিরোধী তরুণ কবিযশোপ্রার্থীদের জন্যে, যারা রবীন্দ্রনাথকেও বর্জনের অপসাহস দেখান, প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে ভবিষ্যতেও। আরেকটা কথা, মার্কসকে নিয়ে রচিত কবিতাটি প্রত্যক্ষ ও শাণিত। বঙ্গবন্ধুর জন্যে স্তোত্রে শোকের বদলে তাঁর চিরঘৃণ্য হন্তারকদের চিহ্নিতকরণই মুখ্য হয়ে ওঠে। কবি এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর জন্যে রচিত হয়ে-চলা এলিজির ধারায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত সংযোজন করেন।

কবির গ্রন্থ উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল-এর বছরেই প্রকাশিত হয় দীর্ঘ কবিতার বই বিবিধ জন্মের মাছরাঙা ও তৃতীয় লিঙ্গ। পরের বছর ২০১৪ সালে তাঁরই ব্যতিক্রমী কাব্যের সঙ্গে আরো ব্যতিক্রম হিসেবে সংযোজিত হয় কবিতাপুস্তক বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল। আর সেই সাথে ৯৯ নতুন কবিতাবিবিধ জন্মের মাছরাঙা থেকেই তিনি নিজ কাব্যে, কি ভাষায়, কি বিষয়ে বা প্রসঙ্গে, পরিবর্তন আনয়নে সচেষ্ট হন। প্রথমত আমরা এ-পর্যায়ের শেষোক্ত কাব্যের সংক্ষিপ্ত পাঠ গ্রহণের প্রয়াস পেতে পারি:
(ক) মধ্যরাতে কে যেন এসে আমাদের বাড়ির ঘরগুলো/হাত-পা মুড়ে বেঁধে রেখে গেছে এবং/বারান্দাগুলো লুকিয়ে রেখেছে অদৃশ্য ছায়ায় (গৃহবন্দী; ৯৯ নতুন কবিতা)

(খ) এমন জনাকীর্ণ আলোকায়নে এক-পা-ওয়ালা অপরূপ মেয়েটির নাচ/দেখতে এসে দেখি, প্রায় প্রত্যেকে তাদের/একটি করে পা ছুঁড়ে দিচ্ছে মেয়েটির দিকে-/ফলে মেয়েটির নাচের মুদ্রা তখন দর্শক সমুদ্রে সাঁতার কাটছে/চালচিত্রে মূর্তিমান হয়ে ঝুলে রয়েছে- নিথর ক্লান্ত দেহ (সমুদ্র ও একপা-ওয়ালা মেয়েটি; ঐ)

(গ) অবিশ্বাস্য হলেও তুমি বাঘের খাঁচার ভেতর/হাত ঢুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে- এবং বিস্মিত হয়েছিলে যে/বাঘের ছানারাও মানবশিশুর চেয়ে/এতটুকু কম আবেদনময়ী নয়/তারা তোমার হাত নোখ লোমে/কোমল নরম ত্বক ঘষে দিয়েছিল/কুট কুট করে কামড়ে দিয়ে খুনসুটি করে প্রমাণ করেছিল- এ যদি শুধুই মানবকুলের দক্ষতা হতো/ততক্ষণে প্রতিটি হাত রক্তাক্ত হয়ে যেত (আমি ও হোমার; ঐ)

(ঘ) চিকিৎসা বিজ্ঞানের অস্থিরতা নিয়ে/শুয়ে আছে পররাষ্ট্রের ফপর-দালালি (পররাষ্ট্রের হলদে ময়লা দাঁত; ঐ)

(ঙ) মাইকে তুমুল নৃত্য হচ্ছে/অঞ্জু ঘোষের বাজুবন্ধ খুলে রাস্তায় পড়ে গেল/বুড়ি বলল, ঝড় উঠছে/তোমরা প্রত্যেকে এবার ঘোমটা টেনে/ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলা করো-/অঞ্জু ঘোষের ঠোঁটের লালিমা/জানালার পর্দায় ভরে গেল (পাড়াগাঁয়ে মাইক এলে; ঐ)

লক্ষণীয়, আলোচ্য পর্যায়ে এসে কবির পর্যবেক্ষণ ও মনন প্রকাশের ভাষায় পূর্বাপেক্ষা খানিক পরিবর্তন ঘটে। প্রায়-অদৃষ্টপূর্ব (তাঁর কবিতায়) রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্পের সমাবেশের মধ্যে পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব এবং অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য বাস্তব একাকার হয়ে যায়। শ্লেষ এবং ত্রাসও পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে একই বই থেকে আরো উদ্ধৃতি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে:

(১) কোঁচড়ে আগুন লেগে পুড়ে গেল পাকা ধানের জমি/মধ্যরাতে বোঝা গেল আজকে চাঁদ একটুও ঘুমায়নি (আজ চাঁদ; ঐ)

(২) অথচ আমরা যে একরাত্রির স্পর্শের অভিযোগে/মুহূর্তেই জ্বলেপুড়ে ভস্ম হয়ে গেছি/তখন চারদিক থেকে বাতাস কি বলেছে বৃষ্টি কি বলেছে/ধরো ধরো, বাঁচাও বাঁচাও, ওদের শরীরে জল ঢেলে দাও? (একরাত্রির স্পর্শ; ঐ)

(৩) আজ তাই জীবনের অর্থ হতে পারে সর্বজনীন- এমন কথা ভাবতেই/কিছু ভুখানাঙা মানুষের মুখে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলাম/আমি ছাড়া আমার পারিবারিক সহচর যারা কেউ কিছু টেরই পেল না (জীবনভুক; ঐ)

(৪) নদীর ভেতর গ্রামগঞ্জের শালিস-বৈঠক-ফতোয়াবাজি চলছে-/এদিকে ক্লান্ত দেহে বটগাছের ছায়ায়/মৃত নাকি ঘুমিয়ে পড়েছি- কেউ কোন ভ্রƒক্ষেপ করছে না (গোরস্থানের প্রতিটি সমাধিগাত্রে; ঐ)

(৫) বাদুড় যেমন যে মুখে খায়, সেই মুখে হাগে/যার কাছে ভাই যে পদ্ধতি অধিক ভাল লাগে (ছাদ; ঐ)

শুরু হয় কথ্য বাক্রীতির আংশিক ব্যবহার (ওপরে নিম্নরেখাঙ্কিত)। তাছাড়া প্রেম-কামের আক্রান্ত স্বাধীনতা, মৌলবাদী হামলার শ্লেষাত্মক প্রতিবাদ (ছাদ কবিতায়) ইত্যাদি প্রকাশে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর অনুভূমিক অভিজ্ঞতার আশ্রয়গ্রহণও লক্ষযোগ্য হয়ে ওঠে। এ বইয়ের অন্য কিছু কবিতায় পোশাক শিল্পে অগ্নিকা-, বৌদ্ধমন্দিরে হামলা এবং বিশ্বজিৎ দাসের ওপর অকল্পনীয় নৃশংসতার প্রতি প্রতিক্রিয়া যেমন অভিব্যক্ত, তেমনি কবির হরাইজন্টালি সচেতন থাকার দৃষ্টান্তস্বরূপ সিগারেট বিক্রেতা, সুইপার কলোনিও গুরুত্বযোগে চিত্রিত। এ অব্যবহিত প্রতিবেশ-সংলগ্নতা অবশ্য বাংলা কবিতায় নতুন নয়। ওবায়েদের এই কাব্যে তাঁরই পূর্ববর্তী কাব্যের তুলনায় এর নির্দিষ্টকরণ ঘটে মাত্র। তবে নিজের কবিতাকে ক্রমশ এগিয়ে নেয়ার এই সৃজনশীল উদ্যোগ প্রণিধানযোগ্য। এ-কাব্যের ট্রেন ও হাসপাতাল কবিতায় কিছু লোক চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর বিদ্যুতের তারে ঝুলে পড়তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। পোস্টমডার্ন বিড়াল কবিতায় ‘তুমি চর্যাপদের হাসি, লালনের গৃহব্যথা/আজ রবি ঠাকুরের রোদে, শুকিয়ে নিচ্ছ কাঁথা’ ব’লে পশ্চিমা তত্ত্বটিকে কি ব্যঙ্গে বিদ্ধ করেন কবি? তবে জীবনকে দেখার প্রতীতিকে আত্মপ্রতিনিধিত্বশীল করে তোলেন এই আশ্চর্য সুন্দর উচ্চারণে:

“সরপুঁটির কানকোর ভেতর থেকে উঁকি মেরে দেখে নেবো- দুই পারের যৌথ জীবন” (এলিজি : প্রিয় কুমার নদ; ঐ)

বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল (২০১৪) কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় ওবায়েদ আকাশের নিজস্ব বাগভঙ্গি, ভাষা যা আগের চেয়ে সহজতর ও অংশত কথ্যরীতির, আধেয়র অধিকতর স্পষ্টীকরণ ও নির্দিষ্টকরণ, প্রচণ্ড কবিত্ব এবং কবিসত্তার শক্তিমত্তার একাধিক প্রমাণ এমনভাবে বিধৃত হয়ে আছে যে, কবিতাংশ একে একে স্মরণ করতে গেলে সাড়ে ছয় ফর্মার বইয়ের প্রায় অর্ধেকই চয়নের ব্যাপার ঘটবে। মানবতার নানা পতনে-শোষণে-হননে কবি মর্মাহত। সর্বপ্রকার অমানবিকতার বিরোধিতায় তিনি তীব্র শ্লেষাত্মক ও সজাগ। নিজ জন্মগ্রাম কেবল নয়, প্রাগুক্ত গ্রন্থে রুসো-বর্ণিত আদিম বিশুদ্ধতা, আদিম সমবেদনা ও প্রকৃতি-প্রদত্ত ওসব সদ্গুণসম্পন্ন মানুষের সেই সাম্যবাদী সমাজেরও বিরল আধুনিকতম প্রতিনিধিরূপ কবি হিসেবে তিনি নিরন্তর বেদনার্ত এবং সৃজনশীল। তাই তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব হয়:

(ক) মনে পড়ে একবার শালিকজন্মে একটি সুড়ঙ্গ থেকে আরেকটি সুড়ঙ্গে/যাতায়াতের সময় একবার মানুষের হাতে ধরা পড়েছিলাম (শালিকজন্ম; বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল)

(খ) কতকাল হলো গাছের বাকল, পাতার পোশাক/পরে রাত্রি যাপনের কথা ভুলেই গিয়েছি/প্রকাশ্য সঙ্গমের কথায় লজ্জাবনত পাতার মতো/কুঁকড়ে যেতে শিখেছি (এক বিকেলের ভাবনা; ঐ)

(গ) আমাদের একদিকে ক্ষুধা অন্যদিকে অগাধ মমতা/মধ্যপ্রাচ্যের রাখাল কিংবা নির্মাণ-শ্রমিকের মতো/সম্মুখে সদা দোদুল্যমানতা (দোদুল্যমানতা; ঐ)

(ঘ) হেই হেই করে ধেয়ে আসছে কিছু শব্দ/যেন বস্ত্রহীন কোন নারী- বেত্রাঘাত শরীরে সয়ে/ হেলেদুলে নিথর পাঁজরে হাঁটছে (বহুমাত্রিক ঘুম; ঐ)

(ঙ) তবু প্রতিরাতে কলঙ্কের পাশে গিয়ে শুই/ভারতবর্ষ বিভাজিত করে পদ্মা যমুনা তিস্তার বুকে/পড়ে থাকি পরস্পর সম্পর্কের মায়া (অবিকল মানুষের মতো; ঐ)

(চ) কার যেন হাত-পায়ের উপোস ভঙ্গিমা/উঠতে বসতে কী ব্যথিত করে দিচ্ছে/যেন আলস্য কিংবা জড়ত্বের মাঝামাঝি থেকে/কিছু মোমবাতির আলোয় তাকে সেঁকে নেয় (প্রশ্ন; ঐ)

(ছ) পৃথিবীর চেহারাটা দেখবো বলে যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি/তখন নিজের অবয়ব থেকেই শুরু করেছি […] নিজের চেহারার পাশে পৃথিবীর প্রাচীন হাত-পা, মুখমণ্ডল/ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য বসনায় আবৃত তার গোপনাঙ্গগুলো/কেমন ভীরু ভীরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে (আজও আটকে আছি; ঐ)

(জ) তাদের একমাত্র সহযাত্রী আমি- যে কিনা/তার বনেজঙ্গলে হারিয়ে ফেলা শৈশব আর/হারানো স্বজনদের খোঁজে- নিজের শরীর ছেঁটে/পাখির পাখা, পাখির ঠোঁট ও লেজ-পা লাগিয়ে বনের ভেতর/নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়/পরিচিত কাউকে দেখলেই নিজের পরিচয় দিয়ে/কত না বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করে যে, আমি ‘অমুক’/ধরা পড়ার ভয়ে প্রকৃত বেশবাস এমন পাল্টে ফেলেছি (স্বর্গ ও নরক সংক্রান্ত; ঐ)

(ঝ) আমি তো হরিৎ বিবর্ণ প্রকৃতির হয়ে এই পৃথিবীর/একমাত্র উপদ্রবহীন ঘাটে জংধরা পুরনো বড়শি হাতে বসে আছি (কেউ একজন ভালবেসে চলেছে; ঐ)

(ঞ) দীর্ঘ সাঁকোর মাঝখান থেকে কে কোথায়/পালিয়ে গিয়েছিল- তা ভেবে কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টি পড়ে/বহুবার বহু পথিকের কোমর ভেঙেছে (তোমার আমার মৃত্যুর কথা; ঐ)

(ট) সুখ সুখ করে যে পাখিটি/ভোরের বাতাসে নেমে সমুদ্রে মিলিয়ে গেল/এই পৃথিবীতে যথা দুঃসময়ে একমাত্র/প্রযত্ন অভিভাবক ছিল সে (অপরিণত শুভেচ্ছা; ঐ)

‘হরিৎ বিবর্ণ প্রকৃতির হয়ে এই পৃথিবীর একমাত্র উপদ্রবহীন ঘাটে জংধরা পুরনো বড়শি হাতে বসে’ থাকার মধ্যে, নির্দ্বিধায় বলা যায়, একজন বড় কবির প্রতিকৃতি ভেসে ওঠে পাঠকের চিত্তে। দেশের কবিতা বিষয়ে বর্তমান গদ্যকারের এক দশক আগে প্রকাশিত হতাশাও এতে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়। তবে আলোচ্যমান গ্রন্থভুক্ত অবাক পরিহাস কবিতার সরল ভাষ্য, পৃথিবীর বিন্দুবিসর্গ কবিতায় আসলে পৃথিবীর বিন্দুবিসর্গ জানবার কিছু নেই ব’লে চরম নৈরাশ্যের প্রকাশ কিংবা তখন চারদিকে নীরবতার ভিড়ে আমার তো/‘এই পথ চলাতেই আনন্দ’…(এই পথচলা)-এর মতো খুব সহজ বা আটপৌরে উচ্চারণ, প্রাগুক্ত পরিবর্তন সাধনের জন্যে কবির ইচ্ছাকৃত হলেও, তাঁর পরিচিত-প্রতিষ্ঠিত কাব্যগুণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঠেকে না। এই বইয়ে এরকম আরো কিছু নমুনা বিদ্যমান। অদ্ভুত কিছু চিত্রকল্পের কোনো কোনোটি আবার আতঙ্কও ছড়ায়। যেমন: নির্বিঘ্নে উড়ে উড়ে আকাশ থেকে জ্যোতি ঢালছে/অগণিত শঙ্খ-সাদা সাপ (একটি হত্যা ও গ্রেফতারের রাত্রি) কিংবা আমার কফিন জুড়ে বর্ষিত হয় পাখিদের মলমূত্র, থুথু (শোধ)। যদিও, বাস্তব অভিজ্ঞতা মূলত এর চেয়েও ভয়ংকর বিধায় এমন চিত্ররূপ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আক্ষরিক অর্থে অসম্ভব ঘটনাও ঘটে ওবায়েদের কবিতায়: পালকবিলাসী বলে বিলঝিল শাখাপ্রশাখায় উড়ে যাওয়া পাখিদের/পালক কুড়িয়ে আনো, তাতে রঙ দাও/নিজের শরীর ফুটো করে এলোমেলো গেঁথে/একদিন সত্যি সত্যি অকাতরে উড়ে যাবে বলে ঘোষণা পাঠাও (পালক)। আরো লক্ষযোগ্য, বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল কাব্যে মৃত্যু, আরোগ্য ও রুগ্নের অতীতচারিতার বা নস্টালজিয়ার প্রসঙ্গগুলো, গ্রন্থনামের তুলনায়, সেভাবে স্থান পায়নি। শুধু তোমার আমার মৃত্যুর কথা কবিতাটি পাঠকের মর্ম ছুঁয়ে যায়: প্রতিদিন ঘাসফুল থেকে তিসিফুল/মৌমাছি থেকে ভীমরুল- ছেড়ে দেয়া ষাঁড়/মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে-/ভোরবেলার বাজারে আমিষের তাজা রক্তের ঘ্রাণ/অথচ নিরামিষাশী মানুষের বাজার বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে/সখা, এমন কিছু কি থেমে যেতে পারে/তোমার আমার মৃত্যুর কথা জানাজানি হলে? আরো উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশক থেকে তরুণদের কবিতায়, প্রাগুক্ত প্রেরণায়, ভারতীয় ও আরবীয় পৌরাণিক অনুষঙ্গের ঢল নামে। পৌরাণিক অনেক চরিত্রের নাম অবিকৃত রেখেও অবিনির্মাণের প্রয়াস পান কেউ কেউ। ওবায়েদ আকাশ সেই পথেও, ওপরে আলোচিত কাব্যনিচয়ে, পা রাখেননি। কেননা তিনি জানেন, প্রাচীন মিথ সামন্তীয় শাসকদেরই শুধু অনড়তা দেয় না, অধুনাতন ধনতন্ত্র-সৃষ্ট মিথ জনবিরোধী (সেইসঙ্গে প্রকৃত অর্থে জনবিমুখ) চরিত্র ও বিষয়গুলোকেও, নানান মিডিয়ার মাধ্যমে, অমর করে তোলার প্রয়াস পায়। আর, পৌরাণিক চরিত্রগুলোর ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণও শেষ অব্দি আসলে হয় না। কেননা, দৃষ্টান্তস্বরূপ, স্বদেশকে দ্রৌপদী বললে আপাত রূপকের ব্যঞ্জনা মেলে বটে, কিন্তু দ্রৌপদীর মহাভারতীয় ইমেজ বদলায় না। কেননা হৃতাবস্থা থেকে স্বদেশকে রক্ষা করবে কি দ্রৌপদীরই সম্ভ্রমরক্ষক শ্রীকৃষ্ণ (নিজেকে অদৃশ্য রেখে) প্রতিম অলৌকিক কোনো ক্ষমতা? মোটেও নয়। দেশকে স্থানীয় ও বিদেশি লুটেরাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে দলিত জনম-লির জাগরণসম্ভব সম্মিলিত শক্তি, অন্য কিছু নয়।

আমাদের কবির বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (২০১৩) একটি এবং এখনো অব্দি একটিমাত্র দীর্ঘ কবিতারই বই। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, নজরুলের বিদ্রোহী (ওঅল্ট হুইটম্যানের সং অফ মাইসেলফ্-এর প্রভাবে-প্রেরণায় রচিত) শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটির পরে জীবনানন্দ দাশের আট বছর আগের একদিন পূর্বজ কোনো কবির বা কবিবৃন্দের সরাসরি প্রভাবমুক্ত এক আশ্চর্য সংবেদী মৌলিক দিঘল কবিতা, যাতে মধ্য-নিম্নমধ্যবিত্ত একজন বিবাহিত পুরুষের ওপর সার্বিক বিষম ব্যবস্থার চাপ নিজের রক্ত দিয়ে পূর্ণাঙ্গরূপে উপলব্ধি করেন কবি। জসীম উদ্দীনের, যাঁকে টান দিলে বাংলার শেকড়সুদ্ধ উঠে আসে, কবর আয়তনের বিচারে দীর্ঘ কবিতা হিসেবে অসফল নয়। কিন্তু এটি কবিতা হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এতে ন্যারেটিভ আছে বটে, কিন্তু ঠিক ভার্স নেই। ছন্দ ও আবেগ আছে, চিন্তা ও রাজনীতি নেই। শামসুর রাহমানের দীর্ঘ কবিতাগুলো আত্মবৃত। একটি মোনাজাতের খসড়াকে দিঘল কবিতা ধরে নিলে একে ব্যঙ্গাত্মক, রাজনীতিক কাব্য বলা যায়। সৈয়দ শামসুল হকের বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা উদার পুঁজিবাদী মধ্যবিত্ত অবস্থান থেকে লেখা সাবলীল কাব্যতরঙ্গমালার সমন্বিত প্রকাশ। এতে ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রতি উন্মুখিতাসহ নানান জীবনানুষঙ্গ বাক্সময়তা লাভ করে। তাঁর অন্তর্গতও একটি প্রণিধানযোগ্য দিঘল কবিতা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আমি কিংবদন্তির কথা বলছি দীর্ঘ কবিতাটি হুইটম্যানীয়-নজরুলীয় প্রবহমান ভঙ্গিকে মনে করিয়ে দেয়। উপনিবেশিত পূর্বপুরুষের দাসত্বের যন্ত্রণা এবং তা থেকে সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভের আকাক্সক্ষা এতে অনূদিত হয়। উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলো ছাড়াও বাংলাদেশে আরো দীর্ঘ কবিতা রচিত হয়। মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি অমর একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা এবং দীর্ঘ কবিতাই। ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আবেগ ও প্রতিবাদের এ এক অনবদ্য কাব্যিক দলিল। এর অনেক পরে, মধ্য আশির দশকে হাফিজ রশিদ খান লেখেন, এই ভাষা-সংগ্রাম বিষয়ে, খুব সম্ভব, দ্বিতীয় দীর্ঘ কবিতা শোণিত প্রপাত। ওবায়েদের দিঘল কবিতাটি তাহলে কেমন? প্রথাবদ্ধ রীতিতে কবিতাটির ব্যাখ্যা উপস্থাপন এখানে লক্ষ্য নয়। কবির পূর্ববর্তী কবিতারাশির তুলনায় এই কাব্যে দুটি প্রধান পরিবর্তন বা ভিন্নতা জাজ্বল্যমান: (১) কয়েক চরণ ব্যেপে পরপর অনেক অসমাপিকা ক্রিয়া সংবলিত দীর্ঘ দিঘল সব বাক্য, কিঞ্চিৎ খিস্তিখেউড়সহ আংশিক কথ্য বাক্রীতি; আর (২) আগের চেয়ে প্রায় শতভাগ, শতাধিক ভাগ প্রত্যক্ষতা ও সমসাময়িক সামাজিক-শাহরিক-রাজনীতিক-রাষ্ট্রিক ঘটনা পরম্পরার স্পষ্ট, খানিকটা প্রতীক-রূপকাশ্রিত উল্লেখ। সাম্রাজ্যবাদ তথা ভারতবর্ষ ও পৃথিবীর ইতিহাসও ঘন তরঙ্গ তোলে এই কবিতায়। শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ ও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যার প্রসঙ্গ বাক্সময়তা লাভ করায় আমাদের কবিতায় তা নতুন ঠেকে। অবশ্য আলফ্রেড খোকনই তাঁর একাধিক কবিতায় পুঁজিবাজার কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ প্রথম উল্লেখ করেন। ওবায়েদের এই দীর্ঘ কবিতায় ‘কয়েক নিরীহ বাংলাদেশীর প্রকাশ্য শিরোশ্ছেদের’ স্মরণ ভিন্নতর সংবেদনশীলতা তৈরি করে। পাশাপাশি সর্বশেষ বিস্ময়কর প্রযুক্তির কথা বাদ পড়ে না যখন তিনি, এই কাব্যে, ‘ফেসবুক থেকে সমস্ত স্ট্যাটাস সংকলিত’ করার কথা বলেন। এভাবে অনর্গল শক্তিমান কাব্যোচ্চারণের এক পর্যায়ে, ব্রেশটীয় নাট্য পদ্ধতিতে বুঝি পাঠকের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করেন এই ব’লে: ‘ঢের হয়ে যাচ্ছে-/ আমি বুঝি, তুমি একটু ঘুমুতে যাবে শীতল স্বচ্ছ শ্রাবণের/জলে।’ ওপার বাংলার কবিবন্ধুদের সঙ্গে তাঁর অসামান্য সম্পর্কের বর্ণনা অভিন্নভাষী উভয় বাংলাকে এক করে দেয়। উত্তম পুরুষে সখা ও প্রেয়সী কিংবা দ্বিতীয় কাউকে নিজের দৈশিক-বৈশ্বিক-নৈসর্গিক অভিজ্ঞতা উজাড় করে দেয়ার ধরনে তিনি মূলত স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় মুহ্যমান এবং একই সঙ্গে স্বপ্নশীল স্বদেশকেই বাক্সময় করে তোলেন এই দীর্ঘ কবিতায়। খিস্তির মধ্যে ‘বোকাচোদা’ গুণ/দোষবাচক বিশেষ্যটি তাঁরই সমকালীন ব্রাত্য রাইসুর প্রেরণায় ব্যবহৃত (?)। এটি প্রথম লিখিত হয় রাইসুরই কবিতায়। যদিও, উভয়ের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির কোনোই মিল নেই। হুইটম্যান ও নজরুলের দীর্ঘ কবিতায় মেলে মানুষের আত্মশক্তির উদ্বোধন ও বিজয়। অন্য কয়েকজন আধুনিক কবির মতো দীর্ঘ কবিতায় আত্মপরিবৃত না থেকে ওবায়েদ আলোচ্যমান কাব্যে স্বদেশ থেকে বিশ্ব কেবল নয়, মহাসাগর ও মহাকাশও পরিভ্রমণ করে আসেন। বাংলার লোকবিশ্বাস ও পুরাণের প্রতি, তাঁর কাব্যচর্চার এই পর্যায়ে, কোনো গ্রামবাসীর ‘জুম্মার দিনে শিরনি ও মহররমের দিনে তিনটি খাসির মানত’ স্মরণের মাধ্যমে, অশ্রদ্ধাশীল থাকেন না তিনি। স্মরণ করেন গ্রামে ‘অনাগত কোনো পীর সাহেবের পবিত্র উরস শরীফের দিনে’র কথা। তবে কোনো পৌরাণিক চরিত্র নয়, মহাকাব্য রচয়িতাদের নামোল্লখ মাত্র করেন অন্য ব্যঞ্জনায়। সেই সঙ্গে জনমণ্ডলির পশ্চাৎপদতা শনাক্তকরণেও অকপট থাকেন তিনি ‘আমাদের প্রেম, সংসার, পলিটিক্স ও/ভাষা বিজ্ঞান… সবকিছুর বিপরীতে একজনও/চিকিৎসক আমি দেখিনি- ফলে, ফি বছর গ্রামের ছেলে/গ্রামে ফিরে এলে- মসজিদ মন্দির গির্জা প্যাগোডার জন্য/এখনো অর্থ সংগ্রহের রেওয়াজ প্রচলিত আছে’ ব’লে। সেই সাথে অনুল্লেখ্য নয়, এ-কাব্যের কয়েকটি অংশ প্রতিবেদনধর্মিতায় পর্যবসিত। তাছাড়া তাঁর সমবয়সী কয়েকজন কবিবন্ধু ও নিজের পরিবারের দুই সদস্যের বিশেষ্যের উল্লেখ ভিন্ন রীতি মনে হলেও কিছুটা পত্রতুল্য ঠেকে। আরেকটা কথা, কাম, যৌন ত্রাস ইত্যাদির উল্লেখও পূর্বাপেক্ষা বেশি অঙ্গীকৃত হয় বিবিধ জন্মের মাছরাঙায়:

(ক) তোমাকেও/নগ্ন হয়ে ব্লু ফিল্মের পোজ দিতে বাধ্য হতে হয়/একবার নিজের গায়ে চিমটি কেটে আর একবার/গরুর নগ্ন দেহে হাত দিতেই পৃথিবীর সকল/কামোত্তেজিত গরু তোমার ওপর হামলে পড়ে বলে- ‘কত দিন পর!”

(খ) আমরা দিঘি-নালার জলে প্রত্যেকের/উন্মুক্ত যৌনাঙ্গে ভর দিয়ে দিয়ে একদিন ঠিক/বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাবো বলে দৌড়াতে থাকি।

(গ) কুমারী ঝর্নার মতো লালনের/যৌনতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল।

এ-বইয়ে এমন আরো নজির বিদ্যমান। তবে শেষোক্ত (গ) কথাটি হঠাৎ অদ্ভুত ঠেকে। কিন্তু নারীর বন্দিদশা আর পুরুষের চলিষ্ণু দাসত্বের উল্লেখ এই কবিতার আরো একটি ঔজ্জ্বল্য: ‘তুমি ঘুমিয়ে পড়ো/শোকে, আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি নদে। […] আর আমি আমার/পায়ে বাঁধা শেকল ও সাম্পানের বৈঠা হাতে তোমাকে/একদিন সমুদ্র ভ্রমণের স্বাদ এনে দেব বলে প্রতিশ্রুত থাকি।’
এতোকিছুর পরও ওবায়েদ আকাশীয় ভাষা আর তাঁর সত্তায় গ্রথিত গ্রাম ফিরে ফিরে আসে। প্রাক্-আলোচিত বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল-এর তুলনায় কবির মৃত্যুবোধ, ঢের সৌন্দর্য, মাধুর্য ও মহত্ত্বযোগে এই দীর্ঘ কবিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়: “আমার/মরণ যেন কলাপাতা রূপ পায়, এই কথা বলে যাই আমি/যেমন কার্ল মার্ক্স নিজের মৃত্যুকে তিনি লাল আর লালে/রাঙিয়ে গেলেন মেজেন্ডা আর নেভি ব্লু পতাকার দেশে।”

তৃতীয় লিঙ্গ, বিবিধ জন্মের মাছরাঙার সঙ্গে একই বছরে প্রকাশিত ওবায়েদের ছ’টি দীর্ঘ তথা নাতিদীর্ঘ কবিতা সংবলিত বই। যেন ভাবা যায় না বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল-এর মতো তৃতীয় লিঙ্গও (মনে পড়ে, সিমন দ্য বোভোয়ারের প্রবন্ধগ্রন্থ সেকেন্ড সেক্স) কোনো কাব্যগ্রন্থের নাম হতে পারে। কিন্তু বিশেষভাবে ওবায়েদ আকাশীয় বাক্য ও বাকপ্রতিমার কারণে শুধু নয়, পূর্বাপেক্ষা মসৃণতর কাব্যিকতার দরুনও এটি যেন পাঠকের আরো কাছের হয়ে ওঠে। বিশ্বপুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের কবলে তৃতীয় বিশ্বের নিরুপায় নপুংশকতাই শনাক্ত হয় এই কাব্যের নাম কবিতায় : ‘আমাদের হালাভোলা ছবি পৃথিবীর পথে/প্রান্তরে, চ্যানেলে, বায়োস্কোপে মডেল হিসেবে/প্রচারিত হলে সাম্প্রতিক সাম্রাজ্যবাদের/পুরুষাঙ্গগুলো কেবলই উত্থিত হতে থাকে।’ এ-গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতার শিরোনাম ‘থেঁতলানো হাসি’ও অভাবিতপূর্ব। এই কবিতা কেবল নয়, বইয়ের বাকি পাঁচটি কবিতাও রুসো ও মার্কস-এঙ্গেলস্ কথিত সেই আদিম সমাজকে মনে পড়িয়ে দেয়। ‘নদীতে তোমার জ্বলে-যাওয়া/পুড়ে-যাওয়া পায়ের ক্ষতরক্ত সব অবিকল আছে/অথচ সন্ধেবেলায় এই নদী থেকে তোমার/পা বিহীন নিথর শরীর আমাকেই কাঁখে করে/ঘরে এনে বুঝে দিতে হয়।’ এমন উচ্চারণে বিধৃত কিছুটা স্যামুয়েল বেকেটীয় অ্যাবসার্ডিটি অন্যান্য কবিতায়ও কম-বেশি সুলভ। এই কাব্যে অংশত তিনি মুখের ভাষায়ও কথা বলেন পাঠকের সঙ্গে। প্রাচীন অর্বাচীন কবিতায় প্রথমবারের মতো পৌরাণিক চরিত্র দ্রৌপদীকে স্মরণ করেন কবি। না, কোনো অবিনির্মাণের ছলে নয়, তাঁকে বাজি রেখে পাশা খেলার কথাই আসে শুধু। ভূমিজ জীবন ও সমুদ্রের সম্পর্ক এ-কবিতায় আবর্তিত-বিবর্তিত হয়। প্রত্যাগমন কবিতাটির কোনো কোনো অংশের পেলবতায় সৈয়দ শামসুল হকের অনবদ্য কাব্য পরানের গহীন ভিতর-এর প্রেক্ষাপট কিঞ্চিৎ বুঝি ভেসে ওঠে, যদিও আমাদের আলোচ্যমান কবির পরিব্রাজন শুধু গ্রামে নয় অরণ্য, আকাশ, নদী ও সমুদ্রের সমগ্রতায় বিস্তৃত। জীবন-মৃত্যুর অসম্ভব নিবিড় অনুভবের এই কবিতায় লোকবিশ্বাসের এক অনুষঙ্গের ভিন্নতর ব্যবহারে হঠাৎ চমকে উঠতে হয়: ‘আমরা তো/অনাহূত ছিঁড়ে ফেলি বায়েজিদ বোস্তামী হতে/সুফিবাদ, ঘনচাঁদ- রৌদ্র হতে চারিদিকে উজ্জ্বল/মশাল।’ ও করুণা ও মমতা কবিতাটি সার্কাসে বা জাদুকরের মুখে উচ্চারিত ‘চিচিং ফাঁক’ শব্দযুগলযোগে শুরু হয়, যা ওবায়েদ আকাশীয় কাব্যভাষার সঙ্গে যায় না। কথাটা দু’বার ব্যবহৃত হয়। তবে বেগম রোকেয়াকে প্রথম স্মরণ করেন কবি এই রচনায়। রাবেয়া বসরী এবং মাদার তেরেসাও বাদ পড়েন না, যদিও তাঁরা একই ঘরানার নন। সমাজে যৌনতার রুচিহীন ব্যবহার এখানে শ্লেষবিদ্ধ হয়: ‘মেয়েগুলো/যার যার ওড়নার নিম্নাংশ ধরে টান মেরে গলায়/ঝুলিয়ে দিয়ে বিনি পয়সায় পাবলিক টয়লেটে যায়।’ কবিতায় যা-কিছুর উল্লেখ অভাবিতপূর্ব তেমন কিছুও একই কবিতার অন্য অংশে পরিলক্ষিত : (ক) ‘যারা/টয়লেটে যায়, কেউ দাঁড়িয়ে হিসু করে, কেউবা/বসে।’ (খ) ‘কেউ গ্লাসের/ওপর ঘুসি মেরে তুলে আনে নিজের চেহারা।’ গ্রন্থের শেষ কবিতা ঘুমিয়ে পড়া পাঁয়তারায় কবি ও প্রেয়সীর মৃত্যু ও বেঁচে ওঠার অবিরলতা ছাড়াও, ওপরে আলোচিত সাতটি দীর্ঘ কবিতায় ওবায়েদের কাব্যোচ্চারণের গতি, কখনো স্ট্রিম অফ কনশাসনেস, আর, সর্বদা ওয়র্ডস্ওয়ার্থ-কথিত স্বতঃস্ফূর্ত প্রাকৃতিক প্রবাহ হিসেবেই অনুভূত হয়। সেই সঙ্গে, উপর্যুক্ত কবিতাগুলো কোলাজ ও মন্তাজভুক্ত (দীর্ঘ কবিতার দুটি ধরন) না হলেও, অনেক ভগ্ন বা অসম্পূর্ণ এবং এমনকি স্বতন্ত্র অবলোকনেরও সন্নিবেশের ফলে কাব্যের মেসেজ বা সূচিতে ঠিক কি যুক্ত হয় তা অংশত নির্দিষ্ট করা যায় না। এ-প্রসঙ্গে সরাসরি তুলনীয় না হলেও মনে পড়ে, ল্যাংগস্টন হিউজেস-এর মন্টেজ অফ অ্যা ড্রিম ডেফারড্ বা বিলম্বিত স্বপ্নের মন্তাজ কবিতা এই বিতর্ককে অনিবার্য করে। কেননা এতে প্রশ্ন জাগে : প্রাথমিক কণ্ঠস্বরটি কার? বিভিন্ন লোকের মধ্য দিয়ে হারলেম প্রদর্শনের মাধ্যমে কবিতায় কি যুক্ত হয় যেখানে হিউজেস এই হারলেম বিষয়ে নিজের অনুধাবন থেকেই কথা বলেন? তবে ই. ই. কামিংস্-এর কবিতায় সুলভ নাটকীয়তার ওবায়েদ আকাশীয় কিঞ্চিৎ প্রয়োগ ভিন্ন তৃপ্তি সঞ্চারিত করে পাঠকের চেতনায়।

এ যাবৎ প্রকাশিত কবির সতেরোটি কাব্যগ্রন্থই এ-গদ্যে আলোচিত না হলেও ওপরের আলোচনায় আমরা তাঁর মূল প্রবণতা হিসেবে প্রথমত, গ্রাম-বাংলার আশ্রয়েই তাঁর দৈশিক ও বৈশ্বিক মননশীলতার সৃজনশীল প্রকাশ; দ্বিতীয়ত, ছন্দের অনুশাসনহীন স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বের প্রতিষ্ঠা এবং তৃতীয়ত সাহিত্যিক-রাজনীতিক-অর্থনৈতিক অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎকে সম্ভাব্য করে তোলার সচেতন প্রচেষ্টা শনাক্ত করি। তাঁর পৃথকতা এখানেও যে, তাঁরই সমসাময়িক অনেক তরুণ কবির নিছক লোকসাহিত্যিক-পৌরাণিক অনুষঙ্গনির্ভরতার বিপরীতে তিনি রাজনীতিক সচেতনতা প্রতিষ্ঠিত করেন অনেক কবিতারই ছত্রে ছত্রে।

আরেকটা কথা, বিষয় ও আঙ্গিকের বিচারে ভিন্নতা কিংবা নতুনত্ব আনয়নে উপর্যুক্ত প্রকারে প্রয়াসী হয়েও এবং তাঁর এই প্রচেষ্টা প্রায় অসফল না হলেও তিনি তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার আস্বাদ গ্রহণ থেকে পাঠককে কখনোই বঞ্চিত করেন না। পাতাগুলি আলো (২০১৬) কাব্যের নাম কবিতাটিতে পাঠক প্রথমত প্রাগুক্ত অ্যাবসার্ডিটির মুখোমুখি হন: ‘পাতাগুলি আলো। ধুলোর পল্বল ছেড়ে/মোহগ্রস্ত জলে সূর্য নেমে এলো/সূর্যের পাতাগুলি আলো।’ এভাবে শুরু হওয়ার পর কবিতার তৃতীয় স্তবকে কবি বলেন: ‘পাতাগুলি আলো আজ/ঢেউগুলি অন্ধকারে পাতা/বাগানে সমুদ্র ভেসে গেল/এলোমেলো জন্মাল/কত কী সৌন্দর্যের মাথা।’ কবিতার মোট ছয় স্তবকের শেষটিতে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: ‘একক সূর্যের কেন/চারদিকে গজিয়েছে/রাশি রাশি অর্বাচীন পাতা?’ কবি এখানে মূলত পূর্বাপেক্ষা ঢের বেশি গূঢ়তর জীবনচেতনার প্রতি উন্মুখ। ‘সৌন্দর্যের মাথা’ আর ‘অর্বাচীন পাতা’র বৈপরীত্যের মধ্যে দ্ব্যর্থবোধক জিজ্ঞাসা ও বিস্ময় উৎকীর্ণ হয়ে আছে। এর পাশাপাশি এ-কাব্যে লিপিবদ্ধ তাঁর বরাবরের চমৎকার চুম্বক চরণগুচ্ছ এমনকি মুখস্থ করতেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন পাঠক:

(ক) আমি বলি, এই তো পৃথিবী/মা বলে ডাক দিলেই যেমন মানচিত্ররা কথা বলে ওঠে/তেমনি তরমুজকে নারকেল বানানোয় কোনোই কৃতিত্ব থাকে না/কেউ বিষপিঁপড়ের ঘায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তড়পায়/কেউ আবার পিঁপড়ের জীবন পেয়ে/মানুষের গ্রীবায়-মাথায় এঁটে বসে রাজত্ব করে যায় (তরমুজ সম্পর্কে)

(খ) অথচ বৃষ্টির মধ্যে থোকা থোকা সমকাম/অনর্গল তুষার হয়ে ঝরছে (লোরকার চিঠিও ব্লাড ওয়েডিং)

কিংবা

(গ) একা একা/বাঁচতাম বহুকাল/যদি বাকি দম/বলে দিত মহাকাল (দম)।
***

১৬-৩১ অগাস্ট ২০১৭
সংযোজন ও পরিমার্জন: ০৫সেপ্টেম্বর ২০১৭
চট্টগ্রাম
***

 —

খালেদ হামিদী

খালেদ হামিদী

খালেদ হামিদী

জন্ম : ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৩

জন্মস্থান : আব্দুস সাত্তার কাস্টমস্ কালেক্টর বাড়ি, বাদামতলী, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : ব্যবস্থাপনায় স্নাতক (সম্মান) : ১৯৮৫; স্নাতকোত্তর : ১৯৮৬; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : প্রকাশনা বিভাগের প্রধান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।

পরিবার : স্ত্রী : মোশরেখা সুলতানা শাহী, কন্যা: অšে¦ষা তানহা হামিদী ও পুত্র : অন্বয় আশিক হামিদী

প্রকাশিত গ্রন্থ :
কাব্য: আমি অন্তঃসত্ত্বা হবো (ডিসেম্বর ১৯৯৯)
হে সোনার এশীয় (ফেব্রুয়ারি ২০০৪)
মুখপরম্পরা (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)
ধান থেকে শিশু হয় (ফেব্রুয়ারি ২০১০)
স্লামডগ, মিলিয়নার নই (ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

গল্প : আকব্জিআঙুল নদীকূল (ফেব্রুয়ারি ২০১২)

উপন্যাস : সব্যসাচী (ফেব্রুয়ারি ২০১৬)

প্রবন্ধ : কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)*
না কবিতা, হাঁ কবিতা (ফেব্রুয়ারি ২০১৬)**

অনুবাদ : ওঅল্ট হুইটম্যানের কবিতা (ফেব্রুয়ারি ২০১৬)

*আশির দশকের দশ কবির কবিতা বিষয়ে ১২ পরিচ্ছেদে লেখা এই গদ্যগ্রন্থ দেশে-বিদেশে অনেক বেশি আলোচিত-সমালোচিত হয়। ২০১৫ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে, কোলকাতার পাণীহাটি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক কল্যাণ মজুমদার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘দুই বাংলার কবিতার গতিপ্রকৃতি (১৯৭০-২০০০)’ বিষয়ে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। এর আগের বছর শ্রী মজুমদার কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে বইটি বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করেন এবং এরও আগে এর লেখককে ফেসবুকে খুঁজে নেন। আর, ফেসবুকেই এই গ্রন্থপ্রণেতার যে সাক্ষাৎকার তিনি গ্রহণ করেন তা তাঁর পিএইচ.ডি. থিসিসে অন্তর্ভুক্ত করেন।
** এই গ্রন্থর্ভূত দুটি দীর্ঘ গদ্য বাংলাদেশে সমকালে লিখিত কবিতা বিষয়ক একমাত্র তাত্ত্বিক আলোচনা হিসেবে মুখে মুখে স্বীকৃত। এ-দুটি রচনা যথাক্রমে কাগজ ও নতুনধারায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশকালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তরুণ কবিমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়।

 

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E