৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৮২০১৬
 
 ১৮/১২/২০১৬  Posted by

কবি পরিচিতি

কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন। জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

প্রকাশিতব্য বই :
কাক তার ভোরের কোকিল [কবি, প্লাটফর্ম প্রকাশনী, ২০১৭]

কাজী নাসির মামুন- এর একগুচ্ছ কবিতা


অনুপ্রবেশ: ১

সোনার খনির দেখা পাবো আর তড়পাবো মগডাল ভেঙে-পড়া বালকের মতো, না পেয়ে- ভাবনা ছিল এরকম। পাতার পদ্ধতি মেনে ছড়িয়ে পড়েছিলাম শহুরে রাস্তায়।

ভারপিণ্ড দেখা গেলো প্রথম রাতেই। একটা মাঝারি এম্বুলেন্স করাল মুত্যুর দিকে ছুটে গেল, যদিও অকাট্য জীবনের দিকে তার সম্ভ্রম অটুট। ওভার ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে সেই জীবনের রন্ধ্রে প্রচ্ছন্ন বাতাস হয়ে ঢুকে পড়ি। ভাবলাম, পল্লবিত পাকাবাড়ি আকাশ ধরবে বলে কাড়াকাড়ি করছে, কিছুটা নিঃশ্বাস পাবে। পাশেই মুত্যু-কলহের বারডেম- শান্তির বিকল্প কিছু সেবা দিয়ে মুহূর্তে অতীত, স্মৃতিসঙ্গ; যারা নিয়ে গেলো আর যারা নিতে আসবে তাদের মাঝখান দিয়ে হাঁটি। মানুষ হাঁটবে, এই তার রঙ্গবিধি ।

অনুপ্রবেশ: ২

চাঁদমামা দেখছিল। তার আলোময় খলখল হাসি অভিন্ন প্রতাপ নিয়ে আমার সঙ্গে হাঁটে। সহসা দেখলাম, সোডিয়াম বাতির কক্ষে কৃত্রিম গঙ্গায় চাঁদমামা বহু আগে মরে পড়েছিলো। মনের রোদ্দুরে বেড়া দিয়ে তার লাশ আমিই দিয়েছি কবর। ভৌতিক নির্বাণ আমি চাই না। প্রথম পুরুষ হয়ে নারীর দরজায় টোকা দিতে যেমন ভালো লাগে, সে রকম অনুভূতি। প্রশ্নবোধক টিপ পড়ে পাশ দিয়ে হেঁটে গেল যে-মেয়েটি, তার ঘ্রাণ ভোরের কলাপাতার মতো নয়, করাল। তাকেই অশেষ ভেবে ইচ্ছে করে ধ্বংস হই।

অনুপ্রবেশ: ৩

বিফল মস্তকে উড়ে গেছ নির্জন পাণ্ডলিপি?

এই প্রশ্নজট মানুষের জটলায় পিঙ্গল নাভির মতো মোচড় দিয়ে ওঠে। এই মোড়, তত্ত্বপথ তবু বাঘের সুড়ঙ্গ থেকে হরিণের বেঁচে উঠবার আনন্দ-বর্তুল। আমাকে ঘিরে রাখে শাহবাগ, আজিজ মার্কেট- শেষতক ছবির হাটের বিদ্যাপতিরা- যাদের সরগোলে গান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ জীবন।
গাঁজার ধূম্রকলে জল খায় তৃষ্ণার্ত সকল। আর নন্দনপার্কের শিশুদের মতো উচ্ছ্বল তরুণীরা শিল্পবানে ভেসে যাওয়া যুবকের ত্রাণবাক্স। একটি কি দুইটি, বহুমুদ্রা করুণা কীর্তনে কোনোদিন ভরে, কোনোদিন শূন্য ভাঁড়ার। হাহাকারের পূর্ণতা নিয়ে পুরুষমন্দিরে ঢুকে বলেঃ
মন্ত্র যেদিন নিজে পুরোহিত হবে, সেদিন আমাকে নিও। আজ খোয়া যাও।

নোতরদামের কুঁজো লোকটির মতো এইসব বেদনাকে বহন করে আমি কতদিন গিটারের তারে তারে বিভক্ত হয়ে গেছি। ভেবেছিঃ যাতনাই জন্মের পূর্বস্বর। খোসার ভিতরে বীজ হয়ে ঢুকে যাই। তখন ফলবে।

অনুপ্রবেশ: ৪

অঙ্কবেদনার বিয়োগফলে একটি বিরাট শূন্যের মতো লালন করতে হবে পরাজয়। তবে তুমি নাগরিক- গণিতস্বর্গের এইটুকু ব্যভিচার আর কত মেনে চলি? নৈকট্যমুকুট পেলে পদব্রজ থামে। বিদেশী ফ্লেবার নিয়ে রাতুলের বউ পোল্যান্ড থেকে এসেছে। তার দেশ অতীত যুদ্ধের বিধ্বস্তপ্রত্নের সাক্ষী। লোলুপ ধ্বংসের ক্ষত মানুষের নিদ্রায় স্বপ্ন-জঞ্জালের মতো স্তুপ হয়ে আছে। সেইটুকু তাম্র-ত্রাস কোন্ গন্ধ বিগলনে তাকেও দিয়েছে প্রেম, কুহেলি চন্দ্রের চিকিৎসা? রাতুল কি পারবে ফুলমন্থনের দিনে পাপড়ির মতো ঝরে যেতে?

আমরাতো জানি, বারান্দার উচ্ছ্বলতা ঘরের নিভৃতে শেষ হয়। উড্ডীনপর্বের যত যন্ত্রণা, বিচ্ছেদ প্রবাহগুলো, আর পর্বত লজ্জার ভার নিয়ে তারপর আবাসন বহির্দেশে। তবু ধূম্রল দারিদ্র্যে এসে সুখ হয়, কিছুটা সম্মান, মৌল দাপাদাপি। কবিতার চেয়ে আক্রান্ত কোনো মুখর বাস্তব ছিলো না তো? চর্চিত পুস্তকে আমরা তো বারবার পাঠ করি মুখস্ত বিলাপ।

অনুপ্রবেশ: ৫

পুরনো বন্ধুদের নতুন আড্ডায় খুঁটে খুঁটে দেখি পেছন পৃষ্ঠার সূর্যরস। তখন কুড়িয়ে নিই সুবর্ণ কাকতাল। একদিন সাঈফ আসে। হাতে রাতুলপুষ্পের ডানা। রঙ-অন্ধ চোখে মিডিয়ার পিচ্ছিল সময়। তবু থুবড়ে পড়েনি। আঙুলে সকল কী-বোর্ড এক  কথা কয়। তার কথা ভিন্নতর। ভিন্ন এক তারস্বর নম্র ব্লেড হয়ে কাঁটা দিয়ে যায়। এইটুকু প্রয়োজনে যেতে হয় মিডিয়া অফিস। জীবনের বাড়াভাতে কতটা বিভ্রম নিয়ে কাব্যালোক খোয়া যায় প্রফুল্ল বন্ধুর?
সুঠাম ক্যাবের পেটে নিজেকে সম্পূর্ণ পুরে দিয়ে প্রতিদিন জন্ম হয় ভোর চারটায়। কবিতার জন্ম তাই নিছক বিষয়। কুয়াশায় চুইয়ে-পড়া লাল তুর্যে উদয়স্বর্গের দেখা তখনো কি পায়?

প্রশ্নসমতলে আমরা তো অনুচ্চ পাহাড়ের মতো;
না মাটিবর্তী, না আকাশঘন।

[ প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ  ‘কাক তার ভোরের কোকিল’  থেকে নেয়া ]


মেলা
 
১)
মেলা দেখে মনে হলো গরিবের চাকচিক্য।
     দরিদ্র নেমেছে বিলাসিতায়। সঙ্গত অপচয়ে কিনে নিচ্ছে সুখ যে যার মতন। কারোর সঙ্গেই নেই লাল কাকাতুয়া। তবু টিয়ার ঠোঁটের মতো গাঢ় সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। জাগরণ আর নিষুপ্তি এখানে এত কাছে, মনে হয় অভিন্ন বর্ণের এক খেলাঘর জাদুর কাঠিতে কেউ নেড়ে দিল, চকিতে সরব হলো আসক্ত মানুষ। তারপর শুরু হলো অনন্য রঙের এই দিন। জীবনের পাশাপাশি প্রাণ তাহলে শুশ্রুষা চায় পুতুল নাচের। ওরে মন, নিহিত বিনয় তার বাইরে কেবল। মানুষ ভিতরে নাচে।

     বেগুনবাড়ির মেলা দেখে পাকদণ্ডী বেয়ে যে-আকাশ উঠলো নতুন, বুকের ভিতরে তার সমুদ্রসুঠাম এক আলোড়ন গুম গুম করে। বর্ণচোরা বিভেদের দিনে কে শোনে এমন মহারোল, তুমি ছাড়া? যারা ছিল আমার সরল সহপাঠী, ভাজা কলাইয়ের মতো ফুটন্ত শৈশব তীর্থে এসেছে তাদের। অঝোর ব্যস্ততা নিরুপায় ফেলে গেল তাদের প্রপাত। আমি সেই সিক্ত পথে তাকিয়ে রয়েছি। ভেজা বার্তা পৌঁছে দেবো সবার নিকট। আজ কেন ইচ্ছে হয় মানুষের প্রাণের প্রসার রঙিন ঘুড়ির মতো সুতো দিয়ে বেঁধে নিয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরি সফল হাওয়ায়? এখানে বাঁশের কেল্লা। শতত দুলছে নাচ নর্তকীর। অনন্তে সংসার পাতা বেদেনীর মতো তার চিকন কোমর। কেন সেই মত্ত জাদু-টোনা- স্বর্ণজ্বলা ঘুঙুুরের অশান্ত সঞ্চার লুফে নিই গহিনে আমার?

২)
একাকী সন্তরণের পরিভাষা কেউ কেউ ভুল বোঝে। ভাবে কেন্দ্রীভূত স্বার্থ তার নিজস্ব হরফে কিছু একটা লিখেছে। এই মৌন আঁকিবুঁকি  রহস্যমলিন। ভূত ভেবে এড়িয়ে চলেন। আমি সেই সামাজিক আগাছায় দিগন্তবিস্তার জেগে উঠি। আমাকে মাড়িয়ে যায় সমাজ, কলহ আর চিন্তিত মানব বিগলন। মেলায় মেলায় আমি অমলিন নিজস্ব রঙিন কারাগারে। তাই ভাবি, ছকের বাইরে যারা দেখে না কিছুই, তারাই আমার প্রতিপক্ষ। বরং তাদের চিন্তাগুলো বড়ো বেশি আত্মজৈবনিক। তবু মেনে চলি। নিষ্ফলা বটের ছায়া মানুষ এখনো পায়। তাই বলে একটা সবুজ হারাধন পাখি যদি কেউ চায়, কখনো দেবো না আমি আমূল কৃতজ্ঞ বলে। কেড়ে নেবো লঙ্ঘিত আকরে পুঁতে রাখা সব গান রঙধনু আর বিলম্ব ট্রেনের হুইসেল। অপেক্ষার দাবানলে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে এসেছি মেলায়। আমাকে উড়িয়ে দিলে সোনা হয়ে যাবো। সজল নদীর পাশে আজ সেই অপার্থিব সঙ্গম। বিষণ্ণ রেললাইন দুই ঠোঁট বাঁকিয়ে গুমরো মুখে চলে যেতে চায়। তাকে বলি, সামান্য দাঁড়াও। দেখ না শিশুর চোখে জটলা করছে সাতরঙ?  আঁচলের গিঁটে গিঁটে প্রভাতি যৌবন ভেসে যায় মেয়েদের। চোখের ক্ষুধায় ওরা দারুণ প্রসাদ। চেখে নাও। নইলে শুকনো মুড়ি আর সুমিষ্ট খুরমা খেয়ে মনের অজীর্ণ বাড়ে। সংগুপ্ত শরীর বড়ো বেহায়া মানুষ। মন কি বারণ মানে? ভালো না আত্মহনন। ঢেউয়ের উদ্ভব আজ জনতার চোখে মুখে। আনন্দ সঙ্কেতে বুঝে নাও কখন সাঁতার দিলে প্রেম হয় মিলনের। দেখবে অকাট্য সুন্দরের দিকে ঝাঁক ঝাঁক পায়রা লাবণ্যসহ উড়ে যাচ্ছে। সেই পথে একটি নিবিষ্ট তালগাছ সাহসের উচ্চরণসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।

৩)
বীরত্ব নতুন করে আভাময় হলে আমিও দাঁড়িয়ে থাকলাম এক পায়ে। ‘পদব্রজ’ কথাটি জানার জন্য অতীত ঘাঁটতে গিয়ে জানলাম, প্রয়োজন নিজের ওপর ভর করে চলা। যেমন আমার দাদা সোমেশ্বরীর দিকে হেঁটে গিয়েছেন। আর জলের কুঞ্চিত রেখা সঙ্গে নিয়ে ফিরেছেন অকুণ্ঠ সাধনা তার পূর্ণ হবে বলে। সেই থেকে চোখের জলের মতো ঝরঝরে অথচ অন্তরতম সাধনা যাদের জীবনের পরিভাষা, তাদের দেখলে ভালো লাগে। আর ইচ্ছে করে বিনয়ের সন্ত হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকি ধুলোর ওপর। তারপর জনরোলে নিজের আত্মাকে ছুঁড়ে দিয়ে ভাষা হয়ে যাই। একহাতে প্রশস্ত অন্তিম অন্য হাতে বিরল আরম্ভটুকু লাঙ্গল জোয়াল করে একদিন আবার ফুটবো আমি কর্মপরায়ন। পৌষের মেলার জন্য অপেক্ষা এখন। আজ অসংখ্য দোকানি রাত্রি যাপনের পাঁয়তারা করে। তাদের কপাল জুড়ে একবিন্দু সাধনার জলের তিলক কেউ বুঝি গেঁথে দিয়েছে। হয়তো ক্ষণস্থায়ী, তবু তার হিম বার্তা পৌঁছে গেছে মেলার ভিতর।  কদম ফুলের ভেজা গন্ধে আবার জাগবে তারা আসন্ন বর্ষায়। তার আগে তাদের স্বপ্নের মধ্যে নিরুদ্বেগ নিমপাতা হয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছি আমি। জীবনীশক্তির এক নির্জলা বিশ্বাস গেঁথে দেবো বলে সেই যে দাঁড়িয়ে আছি তেমাথার মোড়ে, এই মাত্র একটা বাবুই এসে শেখালো বুনন। সেইখানে ঝুলন্ত সময় যেন আকুল উন্মাদ। বুননের ফাঁকে ফাঁকে হাসছে এখন। আমি তার জটা ধরে ‘নাটাই’ ‘নাটাই’ বলে কাঁদবো। বলবো, কে আমার সুতো কেটে দেয় পাতলা ঘুড়ির? তার কব্জিতে অঙ্কুশ ধরে টান দেবো আমি। কতটা রক্তাক্ত হবে করাল আঙুল? কে তুমি বিশীর্ণ ঠোঁটে আমার আত্মায় বসে বাজাও ক্ষরণ? শোনো, হে কাঠঠুকরা, তোমাকেই দেবো আমি অমূল্য রক্তের পরিসর। তবু প্রলম্ব দিনের শেষে রাত্রি নেমে এলে মেলা ছেড়ে যাবো না কোথাও। অনেক অপেক্ষা শেষে আকাঙ্খার প্রাপ্তি বড়ো স্বাদু হয়ে যায়। মেলা সেই বিপুলাঙ্ক আস্বাদের জোনাকি হয়েছে আজ। ইচ্ছে করে সাদা পলিথিন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পুরে রাখি আলোর নিয়তি ওই অজস্র নির্ভার জোনাকিদের। তারপর চেয়ে চেয়ে দেখি সেই উপভোগ্য মিট মিট। মনে হবে তারাভরা নিজস্ব আকাশ আমি মুঠোয় নিয়েছি।

৪)
কেউ কেউ ভাবে কীর্তিমান আগুনের সৎ ভাই আমি। কেবলি ঈর্ষায় জ্বলি। নিজের মুঠোয় নিয়ে নিরূপিত সমস্ত উল্লাস, গোপন বিবরে এক জলসা পেতেছি। সেখানে নাচের তলদেশে ফড়িঙের ডানা দিয়ে ঝালর সাজানো। উন্মত্ত শিখরে বসে গান গায় সেইসব পঙ্গু ফড়িঙেরা। মৃত পলাশের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখে অন্ধ ও বধির। আর নির্জলা হৃদয় পুড়ে পুড়ে নীরন্ধ্র মেলার কথা ভাবে। কচুপাতার জলের মতো ঝড়ে যায় সেই সব কথার ফোড়ন জনতার। তখন নির্বিঘ্ন সবুজের দেখা পাই আর অপলক চেয়ে থাকি। ভাবি, নিরাময়ের কদমতলা কতদূর?

ওইযে পাটের শোলা দিয়ে শুকপাখি বানিয়ে রাখছে এক ফেরিঅলা। মন্দ্রিত অক্ষরে তার সব কথা ছড়িয়ে পড়েছে। আমি সেই ভাষার রূপক এক মদনকুমার। কাগজের সবুজ নেউল হাতে নিয়ে মাটির ঘোড়ায় যার অভ্যুদয় সহিসের মতো। বিকীর্ণ ভয়ের দিনে কে নেবে লাগাম, তাকে চাই। আর বলি, ঢেউ-তোলা  কাগজের সাপ নেমে পড়েছে। ওঝার মতো পরাক্রমশীল তুমি। মাঠে নামো। ধরে ফেলো তাকে। নইলে দেখবে জঙ্গমের খাদ্য সুরভিকে ছড়িয়ে দিয়েছে সে-ই। তার বিষ নাই। স্বপ্নের কামড় আছে অলীক ফণায়। বাণিজ্য মধুর সেই চলাচলে বটের তলায় আজ মেলাভরা শোক। তবু দেখো, চুড়ির বর্তুলে হাত রেখে সুখ পায় নারী। পাটালিগুড়ের সাজ করা মিষ্টি হাতির মতন সেই সুখ অরূপ নিক্কনে ভেসে যায় এদিক সেদিক। কাচের চুড়ির সেই রিনিঝিনি আমি শুনি, আর তুলো দিয়ে বানানো পাখির মতো নরম প্রাণের সেই মেয়েটিকে দেখি, যার আলতার রঙ স্বপ্ন মুড়িয়ে রাখছে কলাপাতায়। হাসছে। খইফোটা দাঁত গুলো শোভন ঝিলিক দিচ্ছে সাদা সাদা। রঙিন দিগন্ত ওই মুখের দিকেই উড়ে যায় চিলঘুড়ি আমাদের সকল ঠোঁটের। ইচ্ছে করে অরূপ রতন ওই তারা ধরে ঝুলে পড়ি। তারপর মরণ! মরণ !

৫)
অনেক অনেক মৌন মৃত্যুকে পিছনে ফেলে হঠাৎ বৃষ্টির মতো জলজ চিন্তার দানা আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চিন্তা মানে কথাপরিণাম। নিমগ্ন অন্তরে যার বোঝাপড়া বিলুপ্ত প্রাণীর জেগে উঠবার মতো সত্যসুখ বয়ে আনে। তখন সকল প্রজ্ঞা এতটা সহজ হয়, তরল উদ্বেগসহ জেগে থাকে মেলার ভেতর। মনে হয়, মেলা মানে সবাই আমার। আমিও সবার। তবু কেউ কারো নয়। হলুদ পাতার দেশে ঢুকে গেলে বোঝা যায়, পাতার নিয়তি যদি ঝরেপড়া হয়, তবে তার সঙ্গী হয় অনেক মড়ক। তবু কারোর ভাগ্যকে ছুঁয়ে নেই কেউ। ক্রৌঞ্চ পর্বতের ব্যথা নিয়ে নিজের ডানায়, সেই গান পাখিরা গাইছে। পত্রল গাছের দিকে কান পেতে কে শোনে বন্দনা সেই যৌথ বেদনার? তাহলে নৈঃশব্দ্য মানে অনন্ত গোপন কোলাহল? যাকে বুকে নিয়ে মানুষ নিভৃতি খোঁজে অন্যের বুকেই?

মেলাভরা নিরন্ন মানুষ। বিচিত্র সন্ন্যাসে তারা সব একাকার। অথচ গোপন চোরাবালি পার হয়ে আসে মেয়েরা সবাই। রয়েছে করাল চোখ অভিভাবকের । সেসব এড়িয়ে গেলে মানমন্দিরের কাছে একদিন সময় মুঠোয় পুরে বলা যায়, ভালোবাসি। কামনাপ্রসূন যার ভাগ্যের লিখন, তার কেন পীড়নের ভয়? তখন কুণ্ঠিত হৃদয়ের নামে একটি গৃধুল কাক সারাটি জীবন শুধু কা কা করে। গোপন ডাহুক আছে অন্তঃপুরে সকলের। সে যখন ডাক দেয় চর্কির ঘূর্ণির মতো বিপন্ন হৃদয়াবেগ ঘোরপাক খায়। নিভৃত অন্তরে প্রতিদিন যে ঢালে রহস্যভরা আমূল অর্থের কথামালা, সেকি মনের মানুষ? চরাচর বিধৃত সন্ধ্যায় জেগে থাক অন্য পরিণামে, লুকিয়ে রাখতে হবে তার নাম। সে কি বিরহমলিন এক জাম গাছ, কালো হয়ে আছে? গোলাপি আভায় তাকে ডেকে তুলবে মেয়েটি?

৬)
পথের অন্তিমে যে-ছেলেরা গান গায়, কথার ফুলকি ছোঁড়ে অযথাই, আর হাসে উঠতি মেয়ের দল হেঁটে গেলে, তাদের যৌবন শুরু হয় শিস দিয়ে। মনে হয় নশ্বর গোলাপ হয়ে ঠিক ওরা ঝরে যাবে ধুলোর ওপর। হৃদয়ের সামান্য সাশ্রয় ওরা চায় জীবনের অপচয়ে। কে বোঝে নিগূঢ় কোলাহল আজ এই সরব নির্জনে?

    আহা কি বাঁশের বাঁশি, প্যাঁ-পোঁ গাড়ি, পাতলা টিনের ব্যাঙ ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ ফেলে এসে সারি সারি দোকানের পাশে আপেল-বেলুন যেন আমরা সবাই। নীলের উদ্যম দেখি আকাশ আকাশ। দারুণ কল্লোল দেখি শিশুদের। এক ফালি নতুন চাঁদের মতো তরমুজ মুখে নিয়ে কেউ কেউ হেঁটে যায় লাল। হেঁটে যায় তখন সুস্পষ্ট আমাদের উদ্ধত যৌবনে দোল খাওয়া নারীরক্তজবাগণ। তবু রঙ নয়, রক্ত নয় ছোপ ছোপ। বেণীবাঁধা সময়ের চুলের কসম, কন্যেদেখা রোদের মতন লালাভ আলোর দেশে মাখামাখি বলে না একেও। শুধু মনে হয়, অনাগত প্রশ্নের শিমুল ফুটে আছে  থোকা থোকা। প্যাঁচানো ঘুমের দেশে ঊরগ প্রাণীর মতো হেঁটে গেলে সেই ফুল কথা বলে: আমাদের গলিত নি:শ্বাসে উদরের গান ছাড়া কি আছে অনন্য ফল চেখে নেবো? বেদনা পেখম তুলে ডাকে।  অবশিষ্ট সকল ময়ূর আমি এবং আমরা সংক্রান্তির মেলা দেখি। মুঠোয় মুঠোয় সেলফোন। প্রাণের পাখিটি আজ কথার শ্রাবণ হয়ে ঝরে যায়। ভেজে না হৃদয়, শুধু বাণিজ্য ঘনায়। যদি কারো ইচ্ছে হয় সুকান্ত প্রেমের নামে সজল বর্ষাকে ডেকে আনি চোখের ভেতর। ডাক দেই:
        হ্যালো, শুনছো, অধরা?
                 তোমার মেসেজ আজ যদি নৌকো পাঠায়, অক্ষরে পাল তুলে বলে
                              কোথায় নোঙর আছে শরীরে তোমার
                    তাহলে জানবে
আমার সকল কথা নদী হবে আজ। লিখবো ঢেউয়ের মতো অবারিত প্রাণের চন্দন মিলিয়ে যাবার। জীবনের একান্ত মেলায় সব কথা এক হয়ে মেশে। আজ শুধু অন্য কথা হোক।
[ ‘অশ্রুপার্বণ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া ]

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E