৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ০৯২০১৭
 
 ০৯/০৯/২০১৭  Posted by

কাক তার ভোরের কোকিল
– কাজী শহীদ শওকত

কাক তার ভোরের কোকিল

কাক তার ভোরের কোকিল

ইলিশের দাম চড়া হলেও পাঙ্গাস কখনও জাতীয় মাছ হয়ে যাবে এমন আশঙ্কা নেই। কারখানার বর্জ্য আর কীটনাশক মিলে নদীতে দূষণ যথেষ্ট বাড়িয়ে দিলেও ইলিশের প্রজননে সর্বনাশ নেমে আসেনি ভাগ্যিস। তবে জল মাতানো এই মহান মাছটির প্রাচুর্য যেমন, তেমনটি কিন্তু পাখিদের সংখ্যায় দেখা যায় না। সবুজ কমছে। আর তার সাথে কমছে দোয়েল, শালিক, ময়না, টিয়া। কোকিল তো আজকাল দেখাই যায় না। নাগরিক জীবনে এখন এসবের ঠাঁই কই?

বহুতল ভবন আর মানুষের ভিড়ে তবু কাকের অভাব নেই। ময়লার ভাগাড় থেকে উচ্ছিষ্ট খুঁটে খুঁটে নাগরিক কাক তার যাপনের সুখ খুঁজে পেয়েছে সারে সারে ফোনের-বিদ্যুতের তারে তারে। কাকেদের আর সবুজ চাই না এখন।

“সোডিয়াম আলোর খঞ্জনা যদি গান গায়
নির্মোক সরাবো আমি; দেখবো কোকিল ঝরে যেতে
মোহিত শপিং মলে সারাদিন”

নগর জীবনের যৌগিক যাপন সবুজের নস্টালজিয়াকে আবশ্যিক করে তোলে। নির্বাসিত সবুজের স্মৃতিকে আপাত সান্ত্বনায় উদ্‌যাপনের উপায় খুঁজতেই বোধ করি “কাক তার ভোরের কোকিল” হলো। কবি কাজী নাসির মামুনের এটি তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। সমকালীন নগর জীবনের বিচিত্র সব বোধের উপাখ্যান উঠে এসেছে তাঁর এ বইয়ের কবিতাগুলোয়। কর্পোরেট দানবের প্রকাণ্ড থাবায় বিলুপ্ত ছায়ার-গন্ধের দিন কবির চেতনায় কখনও নিথর পড়ে থাকে। সবুজের মাঝে বেড়ে ওঠা শৈশবের অধিকার যার, যন্ত্রময় জীবনে বিবর্তনের পরেও তাঁর সেইসব শৈশব স্মৃতির হৈচৈ কষ্টের উৎসব হয়ে ফিরে এলে তাকে ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই বলেই হয়তো কবি বলেছেন,

“হৃদয় কেবলি জ্যান্ত প্রচারণা
পাতার বাঁশির জন্য কেঁদে কেঁদে
স্পন্দিত অক্ষর
……
মন্দ্রিত জারজ পৃথিবীতে আমাদের মৌন বিশ্বায়ন,
ফুলের গৌরবে শুধু ঝরে যেতে আসি।”

বিবিধ বিভেদের দিনরাতে নিয়ত বসবাসে আমাদের উপদ্রুত জীবন। কলের লাঙল, ডিজিটাল সকাল বিকাল আর আসক্তির অন্তর্জাল যথেষ্টই জড়িয়েছে আধুনিক আমাদেরকে। মগ্ন করেছে, গতি দিয়েছে, ঘোর দিয়েছে। আমাদের স্খলন বেড়েছে। পতন, বিস্মৃতিও। এসবের চুম্বক ছেড়ে সবুজ পাতার কথা, কদম কিংবা বৃষ্টির কথা যখন আসে তখন সে আর কথা থাকে না— যান্ত্রিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ নেয়। ‘পাতার বাঁশি’র মতো ‘সূর্যাস্তসময়’, ‘খেয়াঘাট’, ‘গোলাপ’, ‘ঝর্না’, ‘বটবৃক্ষ’, ‘কলাপাতা’, ‘গোল্লাছুট’-এর মতো সবুজ ঘনিষ্ঠ শব্দগুলো তখন স্লোগানের ভাষা হয়।

“সোডিয়াম বাতির নিশ্বাস
গলিত চাঁদের হাড়গোড় কর্পোরেট প্রেমিকার
বিলুপ্ত সংসারে চুরি করে নিলে
আমিও প্রবল প্রতারক
গোপন স্নানের মতো
তোমার জীবনে গুম হই।”

“বিপন্ন সবুজ মুছে গেলে
পাতার অদৃষ্টে একফোঁটা বৃষ্টি লিখে দিও।”

আমাদের সবুজ এভাবেই রোদ-বৃষ্টি-কদমের ঘ্রাণময় স্মৃতির মৈথুনে বেঁচে থাকে। কোনো কোনো ভোরে ইমারতের ফাঁক গলে আসা নরম রোদের উৎসের দিকে তাকিয়ে চিলতে আকাশের লাল দেখি, কোকিল দেখি। ক’য়ের আ-কার বিয়োগ করে ও-কার ইন্সটল করে সুর মিলিয়ে নিই। ভার্চুয়াল জগতের সাথে আমাদের প্রেম নতুন তো নয়! ‘কাক তার ভোরের কোকিল’-এ ‘প্রেম’ বহুমাত্রিক প্রকাশে বাঙময় হয়ে ওঠেছে। আর তাই কবিতাগুলোর ‘আমরা’ ‘তোমাকে’ আর ‘তুমি’কে বিভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন পাঠক। সবগুলো কবিতা পড়া হয়নি এখনও। উৎসুক কাব্যপ্রেমীদের কথা ভেবে কয়েকটির উদ্ধৃতি দিচ্ছি-

“আমরা দারুণ বখে যাচ্ছি খলপৃথিবীর কদমতলায়
হারানো গন্ধের ভেজা দিন খুঁজে পাবো বলে।”

“কথার কুঞ্জনে ডাল ভেঙে ভেঙে
এইভাবে গাছের মৃত্যুর মতো
আমাদের প্রেম।”

“উড্ডীন স্বপ্নের পাশে
তোমার শরীর যেন স্পর্শসমতল;
ইট বালি সুরকির সুমন্তর ঢেলে
আঙুলে আঙুলে গড়ি ইমারত।”

“রান্নার উদ্যোগে কিছু মুগ্ধ কড়িকাঠ
মসলার গন্ধ নিয়ে মরে-
সেই হাসিমুখ লোভ করে
তোমাকে বানাই বন।”

কার্বনাক্রান্ত পৃথিবীর আরবান জঙ্গলে থাকা মানুষের অভ্যস্ত অস্থিরতা, চাপ, সুখ, যন্ত্রণা, প্রত্যাশা আর ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলতে প্রায়শ গ্রামীণ জীবনের দৃশ্যাবলী পটিভূমি ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি নগরকেন্দ্রিক জীবনের বহু উপাদানকেও দারুণ শিল্পমাধুর্যে ছন্দময় করে তুলেছেন। ‘আবর্জনার ভৌতিক পিরামিডে ন্যাপকিনে মুখরিত জরায়ুরঙিন সব ডাস্টবিন’, ‘মৃত্যু-কলহের বারডেম’, ‘শাহবাগ’, ‘আজিজ মার্কেট’, ‘সোডিয়াম আলো’, ‘ফরমালিন’, ‘কীটনাশক’, ‘মোহিত শপিংমল’ ইত্যাদির ব্যবহার এই কাব্যে ভীষণ ফলপ্রসূ বলে মনে হয়েছে।

‘মায়াউনুনের পাশে
গ্রামীণ পিঠার ব্যর্থ ভাবালুতা
যেভাবে নিঃশেষ হয় প্রতিদিন শীতার্ত সন্ধ্যায়
বিলীন স্বপ্নের তীর হয়ে সেরকম
আমি কি পথের কালো? পিচঢালা তোমার আত্মায়
মর্মযন্ত্রণার ইট গাঁথি?”

“এই বাদাম কুটকুটি কথা রেখে
একটা গল্প বলা যাকঃ
এক ছিল পাহাড় আর এক ঝর্না
পাহাড়ের বুকে সাঁড়াশি দাঁত চেপে চেপে
ঝর্না চলে মোহনায় (কোন লাঙের খোঁজে?)
পাহাড় নীরবে সয়।
কারণ সে বুঝেনি ঝর্নাটা বেলগাছ
বটবৃক্ষ নয়।

আমার মাথা ফাটিয়ে তুমি
কার ঘরে বটবৃক্ষ সাজো?”

“ব্রোথেলের শেষ ট্রেন এসে থামেঃ
জলগঙ্গা ভাসে…
বোনেদের ফেরারি ইজ্জতে
জাহাজের খোঁজ করে নগর নাবিক।
দেশে দেশে সোনার গম্বুজে পত্র মিতালির মতো উঁচু হয়ে
আমাদের খারাপ যন্ত্রণা নগরীর অনন্য বিলাস।
তুমি কি অনন্তে সাদা দুধ মেখে
এই পাপ ক্ষমা হতে বলো?”

“পতাকার মতো তোমার যৌবন
আমার স্বদেশে ওড়ে।”
উদগ্র প্রশ্রয় যদি মালা নিয়ে ডাকে
কার দোষ, কার ক্ষয় বিপন্ন জিরাফ গলা পেতে দিলে?”

কাজী নাসির মামুনের কবিতার আরেকটি সুন্দর যা পাঠক মাত্রেরই নজর কাড়বে তা হলো তাঁর অসাধারণ ইমেজ নির্মাণ। বারবার মনে হয়, এই প্রথম কেউ এইভাবে ভাবালো, দেখালো। মদপল্লব, তরল-পাতা, প্লাবন-কিতাব, ক্ষরণশয্যা, অগ্নি-হাসি, রাত্রিবধিরতা, শরৎহৃদয়, স্ফুলিঙ্গুচ্ছ্বাস, বৃষ্টিপোড়া চাতকের ঘুমন্ত ইচ্ছা, স্বপ্নদানার সুখাদ্য, স্বপ্নফিতা, বিশ্বাসের জমাট বরফ, গোলাপশৃঙ্খল, বিষমাধুরি, অশিষ্ট রৌদ্রের ছায়া, রঙধনু-সত্য, মেঘের গণিত, পতনস্পর্ধা, প্রত্নবিল, জ্ঞানবিতান, পরাজিত ভাষার পেখম ইত্যাদি শব্দে যে দৃশ্যের ঢেউ— তা আর কোথাও এতো দেখিনি।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E