৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ২৪২০১৭
 
 ২৪/০৬/২০১৭  Posted by

কাজী নাসির মামুন- এর দীর্ঘ কবিতা

ঝড় ও মরা কটালের দিন

 

ঝড় ও মরা কটালের দিন। নদীর কপালে মেঘ। ঘরে ঘরে ভয়োচ্ছ্বাস। জল। হাওয়াই বনের

মিষ্টিকথা খড়ের গাদায়। মাঝিরা এলেই ডোবে। অন্ত্যজ সমাজে অলৌকিক বেশি নেই। মাঝি

পারাপার জানে না। ভাসতে জানে। জেলের জীবনে সত্য শুধু জাল।

আতঙ্কে আকাশ

আড়ালে আড়ালে গুপ্ত মাছ

শিকার।

মাটির পয়দা বলে ভুল হয়। পুতুল ভাবতে পারি। নিজেকে এরচে’

মৌন রাখেন বিধাতা কলা ও প্রসাদে। লু হাওয়ার দেবদারু,

প্রাচীন মন্ত্রণা শুনতে কি পাও?

চিচিং…চিচিং…ফাঁক…

সময়ের কলাপাতা ছিঁড়ে যেতে থাকে

আগুনে আগুনে

সুরেলা অসুর-

রংরাং পাখির বাসায় মৃত্যু এনেছে সময় :

লুণ্ঠিত শহর। হালাকুর রক্তগাঙে নতুন বিকার। মিথ্যার কুচকাওয়াজ।  বোমারুবিমান যেন পাখির আকর। কেউ নয় সুসভ্য মার্কিন। কেউ নয় মহান ব্রিটিশ। প্রেরিত মহৎকিছু অবশিষ্ট নেই। ভণিতায় লুব্ধ চোর। আকাশেও পুঁজির সাঁতার। মেরিনসেনার পদচ্ছাপে যেন করুণ মৎস্য-প্রেম। অনিষ্টসাগর এই হাসপাতাল? বিদ্যুৎবিহীন? তড়পানো মাছেরা ধরা পড়েছে।  সাঁজেয়া ট্যাঙ্কের বড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে শিশুরাও। সভ্যতা ও গণকবরের ভেদাভেদ নেই।

স্বপ্ন পাড়ি দিয়ে

যেখানে পৌঁছুতে হয় সে-ও ঝড়।

আরব্যরজনীব্যাপী কেতাবি দানব সব নেমে এসেছিল। রূপকথা

একদা সাব্যস্ত ছিল মহীয়ান। অন্ত্রের গুদামে সে-ও শবপোড়া গন্ধের বাতাস।

                                        সামরিক প্রেতের শিকার।

সত্যের রুমাল চেপে ক্রীতদাস

শেয়ালের বরাভয়ে নাক ঢাকা। ক্ষরণের লাউডগা যেন সব প্রত্নখুঁটিগুলো

পুড়ে গেল সহসাই। স্তম্ভিত পৃথিবী ছাই হলো নাকি?

            প্রতিমার যজ্ঞ যেন ধূপ পুড়ে দেয়?

পতনে উদয় হলো যার সে কি মেসোপটেমিয়া?

ক্ষতির আবর্তে শিলালিপি

নাম নিল মানুষের?

প্রতিবাদে

বস্তুত মিথ্যার সরলতা পাই। আত্মবিয়োজনে

এর নাম স্বার্থপর। হত্যা ও স্বর্গনিধন সার্বভৌম ম্যাগনাকার্টায়।

         ভূখণ্ড দখল বড়ো স্বাভাবিক।

আমার তমসা তবু যায়

আলোর কামাক্ষীপুর। প্রচারিত সুমিষ্ট ফলের লোভ ছিল বলে।

মায়ের সন্তরণের পিছু পিছু সবুজ ডাইনী ছিল খেজুরপাতায়।

শিশুরা বোঝেনি।

মনের কারুকাজে রাজাদের প্রতারণা আছে।

এনথ্রাক্স রোগের চেয়ে বড় এই মনের বৈরিতা।

       প্রযুক্ত শাসন এই হায়েনার।

মরুর পতাকাজুড়ে ঘাতকের বীভৎস কলম

মুক্তির সনদে লিখে একা অধিকার সঞ্চিত তৈলকূপের।

জীবন অপুষ্ট নয়।

প্রসূতির মাতৃরোল পরিখায় ঢাকা পড়ে না। প্রসব জাগে প্রতিবাদে।

মৌনতায় ঢাকা পড়ে জাতিসংঘ। সমর্থিত বুলেটে সময়

এভাবে নিহত হয়। ঝাঁঝরা কলিজা নিয়ে কেউ কেউ

মাথা তোলে। মানি না, মানি না বলে অজস্র হাত ওপরে উঠে যায়।

কাগজে মন্দ্রিত মিছিলের শোক। সংবাদ :

নিষ্ঠুর ! নিষ্ঠুর!…

টুকরো টুকরো

জীবন রোপিত হলে সভ্যতা বৃক্ষের মতো বাড়ে।

যদি ছায়া চাও

ইতিবৃত্তে নামতা শোনো আবর্তনের : 

   এক দুই রাজাবাহাদুর

 শত শত শিশুদের রুখতে পারে না।

    বিদীর্ণ গোলাপ

   কামড়ে ধরার ছাপ রয়েছে ওদের।

হাতে হাতে রাইফেল কালাশনিকভ।

ঘৃণায় বিম্বিত

  আত্মার মিসাইল

 মুঠোয় ধরেছে। ইউটোপিয়ান যুদ্ধের মিঠাই

   লম্বচ্ছেদে,

 রুক্তে থোরা থোরা।

 কেউ খাবে না… খাবে না কেউ…

গল্পের ক্যালিওগ্রাফি ছড়ানো-ছিটানো। সাজানো মলাটে আঁকা মৃতের কঙ্কাল। বালুকাদেয়াল কেন ঝাঁঝরা হয়েছে, বুলেট খণ্ডিত দেহ পারাপার, এখন বুঝতে পারে কেউ। জীবনের সৎকারে শান্তির শ্মশান কেউ এনে দিতে পারে রত্নের আশায়। মগজে আদিম এই লালসার কথা খোলা হয়ে গেছে। পুণ্যের বাচন যত সাদাসিধে হোক। যুগে যুগে এমনি খেলাপ। শিকারি শিরোপা চায় নৈতিক মানবতার। ধনাঢ্য মেধার কিছু অভিশাপ থাকে। মরুর চেরাগ তাকে বাণিজ্য শেখায়। এ-ও এক স্বৈর বিভীষিকা- যখন ধ্বংস নামে প্রজ্ঞাপনে, বিকল জনতা কোনো তরবারি নয়। ঝলকসর্বস্ব এই খাপছাড়া ধার কাজে আসে না। স্বদেশে পরাবাসী বলে, স্বাধীনতা দাও। জীবনীশক্তির জল অঞ্জলিতে। জন্মেও ভূমিষ্ঠ নয় অধিকার ভিক্ষে ছাড়া। যার জোর আছে, সমস্ত মুলুকে তারও সাহসের আলীবাবা কোথায় নিখোঁজ বলতে পারো কেউ?

সভ্যতা দারুণ রম্যকার,

      মানব-অঙ্গার দেখে চেয়ে চেয়ে।

প্রহসনে ফুল আর ফলনের দাবদাহ।

  যেখানে যতই থাকুক না কেন জাগরণ

                    পাগলাঘণ্টির,

মানুষের হাত ছাড়া আগুন নেভে না।

যে আশার কেশদামে তেলেভাজা সুমেরীয় পাপ, রাষ্ট্রীয় মাংসে

উদ্যানের ছিটেফোঁটা ভাগ হয়ে যায়- আমি তার প্রবোধ নেবো না।

চল্লিশ চোরের ঘেরে

নকল বোধির হেই জাদুঘর,

          কালের মুঠোয় কোনো যোগসূত্র লিখো না আমার।

ক্ষয়িষ্ণু প্রজ্ঞার বানে কেবলি দর্শক আমি। জন্মান্তরে পুরুষময়ূর।

     বণ্টনের কালো মেঘে গুপ্ত জলের নেশায় নারী হয়েছি, ময়ূরী-

          কালিমার পুরাণকথায় যদি এ-ও সত্য হয়

     তবু ব্যাবিলন

                                        মরা কটালের অনন্ত চিতায়

সোনারা তোরণ পেয়ে স্বপ্নের মর্গে ঢোকার

পরাজয়ে নেমে যাবে

দজলা-ফুরাত

এ কাহিনী মিথ্যে হবার কথা।

 

 


কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন। জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]
কাক তার ভোরের কোকিল [কবি, প্লাটফর্ম প্রকাশনী, ২০১৭]

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E