৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ২৭২০১৭
 
 ২৭/০৬/২০১৭  Posted by

অশোক কর-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১: কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারন কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

অশোক কর : ‘ছোট কবিতা’ কবিতার একটি আঙ্গিক (ফর্ম)। কবিতা দিনদিন ছোট হবার পিছনে কাব্যচর্চা ও বাস্তবতা – দু’য়েরই যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ভুমিকা আছে। প্রথমেই মান ও মননের দিকটা যদি আলোচনা করি তবে বলবো- ছোট কবিতার মান আর গুনগত উত্তরণ হয়েছে কল্পনাতীত! ছোট কবিতা এখন শৈল্পীক মান, জীবনবীক্ষা আর আবেদনে শিল্পোত্তীর্ণ ও অসাধারণ! কবিরা ছোট কবিতাকে নিপুন আর বুদ্ধিদীপ্তভাবে উপস্থাপন করছেন, ছোট কবিতা এখন সৃজনশীল শিল্প, কবিতার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ নয়-, বরং কবিতার বিশালতা বা সম্পূর্ণতা ধারনে শৈল্পীক সক্ষম। এক চরণের ছোট্ট কবিতাও আজ শৈল্পীক মানসন্মত। সহজ কথায়- ‘পদ্য’ কবিতা’র পূর্ণতা পেয়েছে। আর বাস্তবতা হলো-, আধুনিক, উন্নততর প্রযুক্তির যুগে মানুষের সম্পৃক্ততা বেড়েছে বহুগুন, সেইসাথে ব্যাস্ততম জীবনযাপন লেখক ও পাঠককে ছোটকবিতা’র মুখাপেক্ষি করে তুলেছে। যেহেতু শিল্পগুন আর বাস্তবতা একে অন্যের সম্পূরক, তাই ছোট কবিতা আজ বহুলচর্চিত, প্রচলিত আর জনপ্রিয়।
দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা কমে গেছে এমন আমার মনে হয় না, তবে দীর্ঘ কবিতা ছোট কবিতা’র মত এত প্রচার-প্রসারতা পায়নি। কবিরা এখনও দীর্ঘ কবিতা লেখেন এবং পাঠকেরাও পড়েন। দীর্ঘ কবিতা পাঠের চেয়ে দীর্ঘ কবিতা রচনাই বরং আজ কিছুটা শ্লথ, কেননা- দীর্ঘ কবিতা লেখার জন্য কবি’র দীর্ঘ পরিশ্রম, নিষ্ঠা আর মননশীলতার প্রয়োজন হয়। পরিসংখ্যান বিচারে দীর্ঘ কবিতা সবসময়ই কম লেখা হয়ে থাকে ছোট কবিতার তুলনায়। এক্ষেত্রে ছোট কবিতা কিছুটা সুবিধা ভোগ করে সত্যি, তবে তা বিশেষ শক্তি বা অনিবার্যতার জন্য নয়, পরিমাপগত সুবিধার কারনে! শিল্পীত নান্দনিক মূল্যবোধ না থাকলে কোন কবিতা’ই কবিতা হয়ে ওঠে না। কবিতার আকার কোন কবিতার শিল্প-সাফল্যের পরিচায়ক নয়।

 

২: এক লাইনের কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কি?

অশোক কর : “আমার সর্বাঙ্গে পাপ, দৃষ্টিতে অধিক” – আসাদ চৌধুরীর লেখা নান্দনিক এ ছোট্ট (ক্ষুদ্র) কবিতাটির সর্বগ্রাসী আবেদনের মুগ্ধতা থেকেই ছোট কবিতার নৈর্ব্যক্তিক উপলব্ধির উদাহরণ বেছে নিলাম। আমার জানা সবচে ক্ষুদ্র শৈলী-সফল এ কবিতাটি কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপি একটা বড় কবিতার সম্পূরক। আবুল হাসানের ‘ঝিনুক নীরবে সহ…’ রকমের এক অথবা দুই পঙ্‌ক্তির কবিতাকে আমি ‘ক্ষুদ্র-কবিতা’ বলেই অভিহিত করবো। এর চেয়ে কয়েক লাইনের বড় এবং মুদ্রিত এক পৃষ্ঠায় সঙ্কুলানাক্ষম কবিতাকে ‘ছোট-কবিতা’ আর একের অধিক কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপি কবিতাকে ‘দীর্ঘ-কবিতা’ বলতে চাই! কবিতার এই সংজ্ঞা শুধু আকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখাই ভালো, বিতর্কের জন্য নয়। আর কবিতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে আমি মনে করি আকার কোন কবিতার ব্যাপ্তিকে ধারণ করে না, কবিতা বোধ আর উপলব্ধির বিষয়! আমার এ সিদ্ধান্ত দু’টো কারনে; প্রথমত: ‘পাঠক-দৃষ্টিকোন’ থেকে-, আমি আসাদ চৌধুরি’র উপমা দিয়ে বলতে চেয়েছি একটা ক্ষুদ্র-কবিতার ব্যাপ্তি কখনও একটা বড়-কবিতার ব্যাপ্তিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেমনি ছোট/দীর্ঘ-কবিতা’র একটি/দু’টি লাইন কখনো একটি পুরো কবিতার ব্যাপ্তিকে ধারণ করতে পারে-; কবিতার বাকি অংশ ঋদ্ধ, মন্ত্রমুগ্ধ পাঠকের কাছে কিছুটা গৌণ হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত: ‘কবিতা-সৃষ্টির (কবি’র)’ দৃষ্টিকোন থেকে-, কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণই হলো কবিতা, তা সে নামি বা বেনামি যে কোন কবির সফল বা অসফল কবিতাই হোক, রক্তক্ষরণ বিনা কবিতার সৃষ্টি হয় না! সেজন্যই সব কবি’র শ্রমকেই আমি শ্রদ্ধা করি, সকল কবির মননশীলতার প্রতি আমি সহমর্মিতা অনুভব করি! বাকিটুকু কবির মেধা আর সৃজনশীলতার বিষয়।
কবিতার আকার দিয়ে কবিতার শৈলী পরিমাপ করা আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়। আমার বিবেচনায়-; দীর্ঘ কবিতা আর ছোট কবিতার আকারগত পার্থক্য বিনা মৌলিক কোন বিশেষত্ব নেই! তবে দীর্ঘ কবিতা তার বিস্তৃত পরিসরের কারনে কিছু বাড়তি সুবিধা ভোগ করে, অনেকটা বড় ক্যানভাসের মত, বিস্তৃত পরিসরে সৃজনশীল পরীক্ষা-নিড়িক্ষার অবকাশ তো থেকেই যায়!

 

৩:ক) ছোট কবিতার গঠন কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

অশোক কর : ছোট কবিতার আকার ও গঠন কাঠামো আগের প্রশ্নেই আলোচনা করেছি, এর বাইরে আমার আর তেমন কিছু বলার নেই!

 

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

অশোক কর : কবিতাপাঠে তৃপ্তি একটি আপেক্ষিক বিষয়, প্রতিটি পাঠকই মেধা-মননে অনুপম আর নান্দনিকতার বিচারে স্বতন্ত্র, তাই কবিতা পাঠের উপলব্ধিও ভিন্নতর। ‘পূর্ণ তৃপ্তি’ কিনা জানিনা তবে পাঠক কবিতাপাঠে তৃপ্তি উপলব্ধি করেন তাঁর নিজস্ব মননশীলতার বিচারে। আর কবিরা নিজের সৃষ্টির মধ্যে সার্বিক পরিপূর্ণতা খুঁজে পান বলে আমার মনে হয় না! কবির অতৃপ্তি সার্বজনীন, এই অতৃপ্তিই কবিকে নান্দনিক উৎকর্ষতা অর্জনের অনুপ্রেরণা যোগায়।

 

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

অশোক কর : মহাকাব্য বিশাল আঙ্গিকে কাহিনী নির্ভর শিল্পকর্ম, মহাকাব্যের ব্যাপ্তি অবারিত, ছোট কবিতায় মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব নয়।

 

৪: ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

অশোক কর : এখন পর্যন্ত আমার লেখালেখি ছোট কবিতাকে ঘিরেই, পাঠের ক্ষেত্রে আমি সর্বগ্রাসী।

 

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫/১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

‘ছোট কবিতা’কে ধন্যবাদ আর অভিনন্দন!

 

[১]

মুগ্ধদৃষ্টিভ্রম
********
দূর্বাদল,
তোমার বুকে মুক্তাবিন্দু
শিশিরকণা কতটা প্রপঞ্চক?
মিথ্যে স্ফটিক-সন্মোহণে
কবির সরল চোখে
মুগ্ধদৃষ্টিভ্রম!

 

[২]

জন্মরহস্য
********

হঠাৎই বর্তমানের দোরগোড়ায়
দৈবের মত দাঁড়িয়ে, কি অদ্ভুত
নিমেষেই দিকচিহ্নহীন শূন্যতা সামনে আর পিছনে
অতীতের মতই ভবিষ্যতেরও চিহ্নমাত্র নেই আর
বর্তমানই একমাত্র রহস্যময় ঐশ্বরিক সৌরকণা
বাকী সবকিছু মুহূর্তেই কৃষ্ণ-গহ্বরে বিলীন-

তাহলে বর্তমানই আমার জীবন-মরন
হাতের মুঠোয় সঞ্চয়ের মত কিছু,
একমাত্র স্পর্শমান বাস্তবতা –
বাকি সবটুকুই কল্পণা, স্বপ্ন-বিভ্রম
উপলব্ধির বাইরে অসাড় মুছে যাওয়া স্মৃতি, দু:খবিলাস,
ভবিষ্যদ্বানী, জন্মসাল, বিবাহবার্ষিকী,
এমনকি অযুত কোটি আলোকবর্ষব্যাপী রহস্যময় বিশ্বলোক-
সদ্যজাত নক্ষত্রদেরও জন্ম, বিস্মিত-আমারই সাথে
এক্ষণে?
এইমাত্র?

 

[৩]

স্যুরিয়ালিজম
************

দীর্ঘশ্বাস কেন এত দীর্ঘতর
এই অবেলায়, নি:শ্চুপ কথকতা
বিপন্ন দু:খবিলাস!
আর রাত যখন ক্রমে আরো ঘন নিবিড়-
সিড়িতে পদশব্দ,
চাবির ঝঙ্কার,
ক্রম:অপসৃয়মাণ ছায়াদের পিছু পিছু
সবকিছুর অদ্ভুত নীরব প্রস্থান…
তখন আমি
আর আমার দীর্ঘশ্বাস
দু’জনেই অপ্রস্তুত, আমরা কি
আসলেই খুবই অপরিচিত একে-অন্যের?

 

[৪]

পদব্রজে
*******

ঘরছাড়া লোকটার প্রশ্নাতুর সংশয়;
সামনে যে অবারিত ধূলোপথ, হাতছানি, পদচিহ্ন-,
সে পথে গন্তব্য কতদূর?

প্রশ্নটা’কি সত্যি নির্রথক?
ঘরছাড়া যে পথিক রাস্তায়-, সামনে যার শুষ্ক যাযাবর জীবন
তার আর কিসে দ্বিধা-, কিসের সুলুক সন্ধান?

ঘরছাড়া পথিকের নিয়তি – বাইরে পৃথিবী অপার!
তথাস্তু;
বিস্তীর্ণ পৃথিবীই তবে পদভূমি আমার;

শুধু-, পিছনে এক বন্ধ দরজা,
কিছু মায়া, কষ্ট-সুখ, অস্ফুষ্ট আকুতি,
থাক-, দরজার পিছনে যাকিছু-, সে আর আমার নয়!

জীবনে সামান্যই অর্জন, বিসর্জন পুরোটাই-, এই মানবজীবন!
সঞ্চয়ে গুপ্তধনের মত কিছু স্মৃতির ঝোলা কাঁধে
পদব্রজেই বাকিটা জীবন।

 

[৫]

আত্মপ্রতিকৃতি
************

দীর্ঘকালের অবসন্নতা কাটিয়ে আজ সপ্রতিভ
তোমার চোখের তারা একবার ঝলকে উঠেছিল-
রাত ফুরিয়ে যাবার আগেই
সহসাই মনে হয়েছিল- অকৃত্রিম কিছু একটা তুমি
সাথে করে এনেছ, যা কোনদিনও আমরা খুঁজে পাইনি…

রাতের অন্ধকার ঘন হবার সাথে নিজস্ব ক্ষতগুলো
মিশে যায় কালো’তে, কষ্ট তবু জেগে থাকে-
অন্ধকারে জ্বলজ্বলে শিকারী চোখেদের
অদ্ভুত আত্মীয়তা
স্হবির অসহায় মুহূর্ত
সমিকরণহীন পরম্পরা …
তবু এই ফিরে আসার অপ্রতিহত জাগরণ
পাথরে প্রাণ জাগানো ইচ্ছেদের সে কি ক্ষয়হীন উন্মাদণা!

 

[৬]

মহিমান্বিতা, তুমি
[যে তুমি গরবিনী, নিজ পরিচয়ে …]
****************************

গ্লাণি আত্মপরিচয়হীনতায়; মৃৎপাত্রে জমানো মহুয়ার ঘ্রাণ
কিমবা বাতাসে ছেঁড়া পলিথিনের নামপরিচয়হীন ওড়াওড়ি
সর্বাঙ্গে ব্যার্থতার ক্ষত, অঙ্গারে পোড়া গোটা যাপিত জীবন
মৃত বাসনাগুলো ফেলে রেখে গেলাম পথে যেতে যেতে
অনেক পথ হেঁটেছি…, অনাড়ম্বরে!

গ্লাণি ভগ্ন স্বপ্ন-আকাঙ্খার; কাঙাল ভিখেরি হয়ে হাত পেতেছি
ছিনিয়ে নেব বলে ডাকাত সেজেছি, অধরা স্বপ্নেরা তবু পলাতকা
তোমাদের শোভাযাত্রার পথে ধুলোয় ধূষরিত আমার ভিক্ষাঝুলি
টিনের তলোয়ার, ভাঙা শীষ-কলম, বিবর্ণ নিউজ প্রিন্ট … সব,
পথপাশে পড়ে থাকা ক্ষীয়মাণ দেহ, তার নামধরে ডাকেনি কেউ,
বলেনি ওঠো, এসো…, নামগোত্রহীন!

 

[৭]

মহিমান্বিতা, তুমি
[যে তুমি গরবিনী, আলো অন্বেষণে…]
******************************

আদিম গুহাবাসি,আগ্রাসী অগ্নি, বল্লমের ফলায় ঝলসানো মাংস
দৃষ্টির সীমায় যাকিছু দেখি, জৈবিক ক্ষুধা আর শুধু ক্ষুধা চারপাশে
তার বাইরের যে জগৎ, সে তো হিংস্র বর্বর নেশা, আদিম বাঁচামরা
এভাবেই জন্ম হলো আমার,বাস্তুহীন আদিম যাযাবর জীবনযাপন

জন্মান্তরে তবু তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম, যে আমাকে দেখাবে আলো!

পরজন্মে শুধুই শ্রমের হাতিয়ার, হাতুরির নিচে দগ্ধ লাল লৌহপিন্ড
হালের ধারালো ফলায় কর্ষিত মাটিতে চাষাবাদ, জন্মেছি শষ্যকণা
কাস্তে হাতে অঘ্রহায়ণে কেটেছি ফসল,নবান্নে গৃহিনীর সুগন্ধি চাল,
আমার জন্ম-সোহাগীর মাঝরাতে শরমে বেজে ওঠা নারীর কাঁকন

এজন্মও কেটে গেল অন্বেষণে, অপেক্ষা যে আমাকে দেখাবে আলো!

 

[৮]

অভিজ্ঞান
********

চক্ষু’র জলের নোনা নেশা হাজার বছর পুরোনো, লুকানো তাতে কষ্টের মত সুখ, সন্তান জন্ম দেয়া মায়ের গর্ব, শস্যদানা হাতে কৃষকের মনন্তরকে হারাবার ঔদার্য্য। কিছু হারায় না বলেই তো তুমি চিঠি লেখো, ডাকে উত্তর’ও আসে, ইচ্ছেরা ভাসে বাতাসে বাতাসে, গান গায় সুবিনয় অসম্ভব মন ভেজা সুরে, আমি কবিয়াল গান লেখি, ফিরিঙ্গি সুর বাঁধে তাতে, হৃদয় কাঁপায় মাতায়। অন্ধকারের টানেল চিরে পাতাল রেল বিদ্যুৎচমকে ছোটে, খুঁজি সহমরণ-যাত্রী তোমাকে, চিতাগ্নির সোনালী আভায় তোমার শেষ ইচ্ছার প্রতিবিম্বরা কাঁপছিলো চোখের তারায়! আমাদের প্রথম দেখা চিতাপাশে, সেই দেখায় বাঁচার সর্বনাশা আশা ছিলো তোমার চক্ষুর জলে!

 

[৯]

ক্রান্তিকাল
*********

স্মৃতিময় ছেলেবেলা জমে আছে হেলানো বাঁশঝাড়ের ছায়ায়, মলাটছেঁড়া পাঠ্য-বই’য়ে, ব্লাকবোর্ডের স্বপ্নাতুর বানানে! অবাধ্য চঞ্চলতা গরাদহীন জানালা গলে ঝাঁপিয়ে পড়ে খেলার ঘাসে-, আহ্! ঠোঁট, গাল সেঁকে দেয় শতাব্দী-পুরানো রোদ, দেয়ালঘড়ির কাঁটা স্থির জমে গেলেও স্মৃতিরা লেগে থাকে কিবোর্ডের আঙুলে, অন্তর্জালে! ঝাউবনের বাতাস বুকে টেনে ফের ইচেছ জাগে সমুদ্রযাত্রার, গন্ধকের দেশে হিমবাহের হাজার বছর পুরানো লোনা আস্বাদে মনে পড়ে-, তোমার চোখের মুক্তাবিন্দু ধারণ করেছি করতলে, সমস্ত স্বপ্নসম্ভার বুকে নিয়ে ক্রমে তলিয়ে গেছি অতলান্তিক হীম-অতলের আহ্বানে! তুমি খুঁজে পাবার আগে নিরুদ্দেশ আমি অন্ধকার অতল জলে কাটিয়ে দেব অযুত ক্রান্তিকাল।

 

[১০]

পরাঙ্মুখ
*******

জলে ভিজে এতদুর, রোদে পুড়ে-, তবু কত দূর্বোধ্য বোধের সীমানা, এক টুকরো কাগজের চেয়ে ভারী, অবান্তর কথকতার জাল বুনে কেমন মিশে যায় দূরান্তে, অবশেষ বলে পরাঙ্মুখ-, বাকী কথা বলার থাকে না! তারপরও আলোকণা এইসব অসম্পূর্ণ ইচ্ছেদের খুঁজে খুঁজে একেকটা দুপুর-বিকেল গ্রাস করা নির্জনতা অকারনে ডাকে অনুপম। একেকটা দীর্ঘশ্বাস তারাপুন্জের গভীরতাকেও ম্লাণ করে দেয়, বোধ কি এতটাই তীব্র, শাণিত ছুরির চেয়ে মসৃণ কাটে অপূর্ণ ইচেছদের, বাঙ্ময় ঘরে ফেরা, জ্যোৎস্নাজলে নিজের অচেনা মুখ, এভাবেই নিজেকে ভেঙে ভেঙে কাকে খুঁজি আমি-? সবকিছু এতই অচেনা, আলোরাও এত অকৃপণ, সর্বস্ব হরণ শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী, চলে অবিনাশী খেলার আয়োজন! ঈর্ষা জমে থাকে নেশার কাঁচপাত্রের গায়ে, সর্বনাশ বিশাল কালো মাকড়শার মত আটপায়ে নেমে আসে-, সবই যেন সৌরজাগতিক সূত্রে বাঁধা!

 


অশোক কর

অশোক কর

[অশোক কর, জন্ম ১৯৫৯, রাজবাড়ী শহরে। লেখাপড়া রাজবাড়ী ও ঢাকাতে। কৈশরকাল থেকেই লেখালেখি ও সাংস্কৃতিচর্চার সাথে যুক্ত। ১৯৯৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী]

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E