৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ০১২০১৬
 
 ০১/১২/২০১৬  Posted by

ট্রোগনের গান ও কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত
– কামরুল ইসলাম

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবিতা শেষমেশ ভাষারই খেলা। আধার ও আধেয়কে আকীর্ণ করে এই ভাষাই গড়ে তোলে কবিতা। ‘শব্দের চমৎকারিত্বই কবিতা’ মালার্মের এই উক্তির সাথে কোলরিজ কথিত ‘Best words in the best order’ বিষয়েও আমরা জ্ঞাত। এসব নিয়ে অনেক বিতর্কও হতে পারে, এবং হয়েছেও। তবে শেষ পর্যন্ত এটুকু বলা যেতে পারে যে, ভাষা ও ভাবের সাযুজ্যই কোনো কবিতাকে সার্থকতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কবিতা হলো ‘highest form of art’ এবং কবিতার চূড়া স্পর্শ না করে কোনো কিছুই মহৎ শিল্প হতে পারে না। কবিতার ক্ষেত্রে শব্দই ব্রহ্ম – একথা মেনে নিয়েই বলা যায় যে, কবিতা শুধু শব্দ নিয়ে খেলা নয়, তারও ঊর্ধ্বে অন্যকিছু। কবিতা কবির নিজস্ব জগতের আলো-আঁধারির খেলা যেমন, তেমনি তার নিভৃত ভূগোলের রক্তক্ষরণের ইতিহাসও বটে। তবে নিজস্ব ভাষিক আয়োজনে নিজেকে প্রকাশের তাগিদে জীবনদর্শনের, অনুভূতির পাঁপড়িগুলো এই যে মেলে ধরা – এ কাজ অতোটা সহজ নয় বলেই অনেক সম্ভাবনাময় কবিকেও আমরা মাঝপথে থেমে যেতে দেখেছি। জীবনের চারপাশের বস্তু নিয়ে, কিংবা আত্মসমীক্ষার আশালতায় আচ্ছন্ন মননশীলতার প্রসববেলার যে আরশিতে একদিন ভেসে ওঠে চেনা ও অচেনা প্রতিচ্ছায়াগুলো -নসেই খণ্ড খণ্ড মেঘের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কবিতা। তাই কবিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখতে হয় জল-মাটি-শস্য-পুরাণ কিংবা ঈশ্বর ও তার প্রচ্ছন্ন জ্যামিতি।

কয়েক দশক ধরে বাংলা কবিতায় এক ধরনের কাহিনী কিংবা বিবরণধর্মী কবিতারই চর্চা হয়েছে বেশি। উচ্চকণ্ঠ কিংবা স্লোগানধর্মিতাই ছিল কবিতার দেহজুড়ে। রাজনীতি, সামাজিক অনাচার, যৌনতাও এসেছে একেবারে খোলা তলোয়ার হাতে। এইসব ন্যারেটিভ অকাব্যিকতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে আশির দশকের কিছু কবির মধ্যে এক ধরনের প্রত্যয় লক্ষ করা যায়। পরবর্তী সময়ের কবিদের মধ্যে এই প্রত্যয় আরও শাণিত হয়, কবিতায় ফিরে আসে বহুমাত্রিকতা এবং চিন্তা ও দর্শনের নানামুখী গুঞ্জরণ। দেখা যায় আত্মসমীক্ষার প্রবণতা এবং নতুন ভাষা নির্মাণের জন্য কবিদের ইতিহাস ও উপকথা, প্রাচীন লোককথা লোক-ইতিহাস কিংবা বাউলতত্ত্ব, সুফিবাদসহ নানা ক্ষেত্রে পরিভ্রমণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকেও শুরু হলো প্রবল শোষণ। কবিতা হলো ‘open ended’ ভাষা-সংকেতগুলো হয়ে উঠলো ব্যক্তিগত মানসিক অবকাঠামোর কেন্দ্র থেকে উৎসারিত; বিরাম-চিহ্নের ব্যবহার গেল কমে, আর কবিতা ধারণ করলো ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টিকে। কবিতায় আসতে থাকলো নানা জাতের মাইনর উপেক্ষিত জিনিস, নানা রঙের ও ধরনের কীট-পতঙ্গ কিংবা পশুপাখি। ইমেজের নানামাত্রিক ব্যবহারও এই সময়ের কবিতার আরেকটি লক্ষণ।

একালের কবিতায় বিমূর্তায়নের বিষয়টিও লক্ষণীয়। মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধির বিস্তৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্মোচনের ঘাত-প্রতিঘাতে কবিতায় আসছে এক নয়া উপলব্ধিজাত বিন্যাাস, যা আধুনিক-উত্তর সময়েরই চাহিদা। নতুন নতুন চিত্রকল্পের যে উদ্ভাসনা আজকের কবিতায় দেখা যাচ্ছে তা বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রাই শুধু যোগ করেনি, কবিতাকে করেছে বহুস্তরিক। পরাবাস্তবের জগৎ কিছুটা পুরনো হয়ে গেলেও তার ব্যবহার যেমন আজকের কবিতায়ও দেখা যাচ্ছে, তেমনি দেখা যাচ্ছে ম্যাজিক বিয়ালিজম-এর বিষয়টিও। এটি শুধু ফিকশনের ক্ষেত্রেই নয়, কবিতায়ও আসছে এর প্রয়োগ। এভাবেই আজকের কবিদের হাতে লেখা হচ্ছে নতুন বাংলা কবিতা আধুনিক-উত্তর সময়ের বাস্তবতায়।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত একজন আধুনিক-উত্তর সময়ের সৎ কবি। সৎ কবি হলো সেই কবি, যিনি কবিতার জন্যে শহীদ হতে পারেন, যাঁর মন ও মননের সবটুকু জুড়েই থাকে কবিতা, যিনি কবিতার নতুন নিশান উড়ানোর চেষ্টায় নিজেকে সঁপে দেন কবিতাদেবীর পদমূলে। তাঁর ‘ট্রোগনের গান’ পড়ার সময়ে আমার একথাও মনে হযেছে যে, কবিতা তাঁর কাছে এক পবিত্র ভোকেশন। আধুনিক-উত্তর সময়ের কবিতায় মাইনর পশুপাখির দেখা মেলে যেমন, তেমনি সময়কে নতুন করে ব্যাখ্যার বিষয়টিও রয়েছে। ‘পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি ; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট।’ (‘পানকৌড়িবোধ)। ‘ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে’ কিংবা ‘আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি।’ পানকৌড়ি, মাছ, মাছের নীরব আনন্দ তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। অনেকখানি হাহাকারবোধে আকীর্ণ তার কবিতার ঘর-সংসার, এইসব হাহাকার ‘কালের অন্তস্থ সঙ্গীতে নিমগ্ন’ এবং কাল-মগ্নতায় অস্থির।

আমরা এই কবিতাগ্রন্থের বাম ফ্ল্যাপ-এর লেখা থেকে জেনে যায়- কবিতাগুলো হয়ে উঠতে চেয়েছে হাহাকারের ছায়াশরীর। কবি যখন বলেন- ‘তবুও শূন্যতার ভেতর মেঘের করুণাই বিস্ময়কর’ তখন সমস্ত শূন্যতা ছাপিয়ে আমাদের শিল্পতৃষ্ণার অদূরে আমরা রূপালি ডানার মেঘ দেখি, দেখতে থাকি বিশ্বসংসারের বাইরের নির্ভার অলি-গলি। ‘প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে’ যার হাতে তাঁকে আমরা কবিতার জগতে আলাদাভাবেই স্বাগত জানাতে চাই।

কসমোপলিটনবোধে অন্বিষ্ট এই কবির কবিতায় পৃথিবীর তাবৎ প্রান্তের নিসর্গ কিংবা প্রকৃতির অন্তরঙ্গ ডাক আমরা শুনতে পাই। ‘সারাদিন কোরীয় পাহাড়ের রক্তপল্লব আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে’ (অন্ধকার ও দাহস্মৃতি), একটি মাছরাঙাকে খুব কাছে থেকে ডেকে নিচ্ছিল টোকিও বে।’ (রেইনবো ব্রিজ)।

‘কিছু শব্দ শোনার পর আমি বার বার নির্জনতা প্রার্থনা করি’ (নার্ভসেলে অন্ত:ক্ষেপণ)। কিংবা নির্জনতা অনুরণনকে দীর্ঘতর করে’ (ঐ) । তাই বোধ হয় কবিকে বলতেই হয়- ‘কবির কোনো বন্ধু নেই। তাকে কার্পাস বুনতে হয়, তুলো ফোটাতে হয়; তুলো থেকে ব্যক্তিগত সুতো।’ কবির এই ব্যক্তিগত সুতোর আবরণে দেখা যায়- ‘নির্জন ঝোড়া থেকে নেমে আসে রক্ততরঙ্গ।’

কবির শব্দচয়ন ও বস্তুজগতের নানাদিকে নিবিড় অবলোকন তাঁর কবিতার শরীরে এনেছে প্রত্যয়দীপ্ত আলো, সেই আলোর গভীরে আরো আরো আলোর যে মেঘময় সুদূরতা আমাদের চুম্বকের মতো টেনে নেয়  – সেইখানে আমাদের থেমে যেতে হয়। তার পরেও হয়তো আমাদের জানতে হয়- ‘আকাশের মনস্তাত্বিক ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায় নি।’ তবু যখন কবি বলেন- হিমচাঁপাকোমল উজ্জ্বলতায় জেগে থাকবে আমার জল-মৃত্তিকা-বাতাসহীন ব্যক্তিগত পথ।’ তখন বোঝা যায় এই কবির স্বতন্ত্রসত্তার বিনম্র নির্বাসন কিংবা তাঁর নিজের কাব্যলীলার নিবিড় বনভূমির বর্ণবিভা, আলো ও অন্ধকার।

আমরা এই কবির একটি পুরো কবিতা (পাখিসত্তার ক্রন্দন) পড়ে নিতে পারি-
পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকি। ওয়েস্টবেরির গৃহদৃশ্য থরথরিয়ে ওঠে, অনতিদূর পার্ক থেকে ভেসে আসে নিশ্বাসের উত্তাপ। বাস্তবতা দৃশ্যকে প্রসারিত করে; কিছু দৃশ্য অধিবিদ্যক অর্বিট রচনা করে- সেখানে পাখিসত্তা ঘুরে চলে, ডানাকেন্দ্রে কম্পন জাগিয়ে রাখে, গভীর চুমুকে তুলে নেয় অনি:শেষ স্মৃতি। তার চোখের ভেতর অর্থময় হতে থাকে রাত্রির কথকতা, আকস্মিকভাবে সে হয়ে পড়ে চেতনাহীন। রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।

পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকা এই কবি প্রকৃতির নিবিড় মমতায় বেড়ে উঠছেন কবিতাগাছের নির্জন ছায়ায়। আমরা তাঁর কবিতার বিনম্র জলভূমে যে বৈচিত্র্যের সন্ধান পাই, তাতে আমরা, পাঠকরা, এই কবির জাগ্রত কবিসত্তার প্রতি বিশ্বস্ত হতে পারি।

‘আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত – এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারংবার। চঞ্চল বাতাসের রংধনুগতি কে চিরকাল দেখে থাকে ? কৃষ্ণচূড়ার হলুদ পাতার বিষণ্ণ বৃষ্টি যখন অতিথিভবনের প্রাঙ্গনে নেমে আসে, ট্রোগন গেয়ে ওঠে মেঘরং শূন্যতার গান।’

এই মেঘরং শূন্যতার গানের মধ্যেই কবি খোঁজেন জীবনমন্থিত শিল্পরহস্যের আকর। কবিতার প্রতি এই কবির গভীর মায়াবী টান আমরা লক্ষ করি তাঁর এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে। শূন্যতা ও হাহাকারের মতো নেতিবাচক ধারণাও কীভাবে কবিতায় ইতিবাচকতার শিল্পসৌকর্য নিইয়ে দাঁড়িয়ে যায় কালের চৌকাঠে, সেটি সচেতন পাঠকমাত্রই অনুধাবন করবেন। আর কবির এই শূন্যতা-দর্শনের খোঁজ পাই আমরা তাঁরই একটি পঙক্তি থেকে ‘অন্ধকার শূন্যতার ভেতর জেগে থাকে নিয়ন্ত্রিত গতির কম্পন।’ আর এই ‘নিয়ন্ত্রিত গতির কম্পন’ আছে বলেই কবি-শিল্পীরা প্রকৃতিসত্তার গোপন গানের দুয়ার খুলে নিয়ে আসেন ‘ শতজলঝরনার ধ্বনি’।

‘…দীপ্ত সুতো থেকে ঝরে পড়ছে তরল গান্ধার। সাঙ্গীতিক তরলতা হাতের রঙ বিষয়ক অনুচিন্তনকে পৃথিবীর সমস্ত উপাদান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। মেঘ আমাকে নির্জন করে রাখে।’ এই মেঘলা নির্জনতার ভেতর হেঁটে হেঁটে ট্রোগনের গান শুনতে শুনতে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত অনেক দূর যেতে পারবেন- তাঁর এই গ্রন্থের কবিতাগুলোয় সেই ইঙ্গিত রয়েছে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E