৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০১২০১৭
 
 ০১/১১/২০১৭  Posted by

কামরুল ইসলাম-এর একগুচ্ছ কবিতা


জলগাছ

অপূর্ণ স্নানদৃশ্যের মহুয়া প্রলাপ
রেখেছ আড়ালে,
হাত বাড়লেই দেখি গোধূলির স্মৃতি
স্নানঘাট পড়ে আছে দিঘির ছায়ায়–
গিরগিটির মস্তিষ্ক নিয়ে তোমার বিকেল
খেলা করে যবখেতে,আর
পুঁটিমাছের চোখ এড়িয়ে ওই যে জলগাছ
বেড়ে উঠছে নির্জন পরিখায়
তাকে আমরা গন্তব্যের সিঁড়ি ভেবে
স্নানের রূপকথার গল্প শোনাতে শোনাতে
পরিণত ঘুমের দিকেও ঠেলে দিতে পারি…


মৃত্যু ও মাংসের লড়াই

ক’টি হাত বেরিয়ে আসে সন্ধ্যায়
উড়ন্ত একটি শিক-কাবাবের দিকে-
চখাচখির ডানায় মৃত্যু ও মাংসের লড়াই,
আবির্ভাব বলে যে কিছু হয় না
তা ওই পাখিটির ওড়ার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়

কবিতার শেষ পাঠকের
মন থেকে ঝরে পড়া বিষ থেকে
আরেকটি লড়াইয়ের দিকে যাকিছু ফেলে যাচ্ছি
তা-ই আমার দুপুর পেরিয়ে যাওয়া আরশি


অসুখের ছায়াগুলো

সোমলতায় আচ্ছন্ন তার দেহ, নেশার আদলে
ধীরে ধীরে পার হয় কয়েক পাখি জমি, যখন
দেহবাস ছেড়ে একটি সলিলকির প্রাণভোমরা
আলো থেকে সরে যেতে যেতে
লাউফুলের উপমিত হবার সম্ভাবনার
জলসাঘরে ফাঁদ পেতে
একটি রোলিং স্টোনের কাহিনির থিমটুকু নিয়ে
সেমিটিক আয়নার মুকস্থবিদ্যায় আনন্দ শিখে–
দূরের পথে নেশা নেশা ঘাস, দেহে তার
ঢেউ ঢেউ ক্ষুধার নকশা
চরৈবেতি…হাসপাতালের ছাদ বেয়ে অসুখের ছায়াগুলো
নেমে আসে নিচে, মাতালের দিন যায় সোমরসে সুখে ও অসুখে…


নিজেরই মাংসের মৃদু আলোয়

একটি গাছ কেবলই হাসে আর সেই হাসির ভেতর
এক কিশোর খরগোশ
দৌড়াতে দৌড়াতে দুপুর পেরিয়ে যাওয়া
কষ্টের চারপাশে উনুন জ্বালিয়ে
নিজেরই মাংসের মৃদু আলোয়
দেখছে- কীভাবে এ পৃথিবীর উৎসের কিনারে
ঘুমিয়ে থাকা নদীর মাছেরা অহিংস উৎসবে
মুখস্থ করছে বৃক্ষরোপণের সুদীর্ঘ রচনা…


কল্পজাল

নদী তার খোয়াড় থেকে তুলে নিল সান্ধ্য প্রার্থনা
যেন কোনো বয়স্ক গজাড়ের ট্রাপিজিয়াম ঘিরে
একটি পুরনো হারিকেন জেগে উঠছে ধীরে-
জামগাছে লেগে থাকা রাতের বেহালা বেয়ে
শস্য ও গবাদি-পশুর টিম টিম জ্বলে ওঠা থেকে
অন্ধকার একতারার দিকে ভাসমান কল্পজাল
তোমার হাসির ন্যানোটেক ধরে মায়া ও ভূগোল…

রক্তের নিয়মে এই উদ্ধার- এই জলের মোজেজা
সীমানায় অঙ্কুরিত সীমিত প্রণয়…


কার্পেন্ট্রি

তোমার অন্ধকারই আমার আলো
আরেকটু অন্ধকার জ্বালো–
যেন আকাশ অবধি আমি দেখতে পাই আর
আলো ও অন্ধকারের আরোহ কিংবা অবরোহ
নিয়ে পাখিরা ফুলের বিরহ চোখে গান বাঁধে

যেন প্রতিটা মহল্লায় ভেসে ওঠে
সরল যুগের কার্পেন্ট্রি– যেন ছন্দপতনের শোক
পথিকের প্যানোরমা ধরে নেচে ওঠে
আর বৃক্ষতলায় পরিণত সুন্দর এসে
ডেকে যায কচ্ছপের জলে নামার তূরীয় ছন্দে–

তবু আমি প্রেতলিপি লিখে যায়

উদ্ভিদ-কবলিত বারান্দা।
গোরখোদকের ন্যাংটো পিদিম-
ভিখেরীর হাড়-হাড্ডির দিকে হেলানো চাঁদ।
অত:পর চাঁদির অক্ষরে লেখা — আজ রাতে
রেইনকোট পরে শকুনেরা ভাগাড়ের দিকে
ছায়া ফেলে যাবে…; মৃত্যুর ওপারে ঘর বাঁধে
যে সব ঘরামি, তারাও নাকি মৃত সব শুনি–
আমাদের এই মরে-যাওয়াগুলো
বড়ই হাস্যকর, ক্লান্তিকরও বটে…
তবু আমি প্রেতলিপি লিখে যায় সোনার হরফে–


মিষ্টি কুমড়োর মায়ার ভেতরে

মিষ্টিকুমড়ো ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে
সূর্য ওঠা দেখলাম–পাশের বাবলা গাছে কারা
ফাঁদ পেতে বসে আছে- ফাঁদেপড়া ঘুঘুর চোখে নীল শাড়ি
পরে তুমি দাঁড়িয়ে আছো সমূদ্র দেখার নেশায়-
গভীর ঘুম নিয়ে কিশোর সূর্য মেঘের আড়ালে ঢুকে গেলে
তুমি মুমূর্ষু ঘুঘুর চোখ থেকে বেরিয়ে এসে যে ডোবার ধারে
এসে দাঁড়ালে তা সহসাই সমূদ্রের উচ্ছ্বাস নিয়ে জেগে ওঠলে
তোমার সমস্ত শরীরে নেমে আসে পুরনো শীতকাল-
ওই সরল পাখির মৃত্যুকাল নিয়ে তুমি ফিরে আসছো
মিষ্টি কুমড়োর মায়ার ভেতরে– তোমার গোপন সমূদ্র
তখন ডোবা-নালার শিরা-উপশিরায় বাহিত করে
সূর্য-ডোবা ক্ষেতের নিয়তি বহুরঙ রক্তের ছোপে…


হাওয়া

বারান্দায় পরিচিত হাওয়া-

নিষিদ্ধ ময়ূরের গানের পাশে
বৃষ্টি ছেড়ে যাওয়া দুপুর,
জাত সাপ ধান-কোলার নির্জনে-

হিরালির হাঁক-ডাক পড়ে আছে দূরে
গান শিখছে বিকেলের কড়ই গাছ,
হাওয়া জাগছে বাঁশতলায়
তোমার প্রশ্রয়ে আমি কেবলই পথিক হই
ক্লান্ত জগতের সামান্য জলঘরে ছেড়ে দিই
অহিংস সেমেনের ঝাঁক, তখনো পরিচিত হাওয়া
তখনো বারান্দায় বিষহরির পালার সন্ধ্যা…


প্রজাপতি

অধোগতির সেই বীজই একদিন প্রজাপতি হলো
কুয়াশার অসমাপ্ত সিঁড়িগুলো পার হলো
রাতের কবজি ধরে, অত: পর
বাতাসে উড়ালো ধুলোজল– বনভূমি প্লাবিত হলো
গতির চেরাগ নিয়ে ফিরে এলো উত্তরের মেঘ–
সমুদ্র ফেনায়িত হলো তার উড়াল সঙ্গমে
পূর্ণিমা এসে ছুঁয়ে গেল তার বিদগ্ধ স্তন, আর বিভক্ত
শরীরের জাল বেয়ে এক অন্ধ শিকারী, যাদুমন্ত্রে
খসিয়ে নিল বিক্ষত ডানার মলিন কারুকাজ
কোরালের চিৎকার নিয়ে অন্ধকার জমে উঠলে
প্রজাপতির ডানায় সিমেট্রির স্কুলগামী আত্মারা
নিজেদের বংশগতির দিকে মোমবাতি জ্বালিয়ে
চাঁদের নিচে মাছচাষ নিয়ে জমিয়ে তুললো আড্ডা
নাইলোটিকার সাঁতার কাটার মৃদু ছন্দে
রাত নেমে এলে চৌরাশিয়া ভোরের সম্ভ্রমে মিশে যায়
প্রজাপতি জলের ঘরে মালা গাঁথে অতীতের মায়ায়
হায়, এতটুকু প্রাণ তবু ছিঁড়ে নিল নিখিলের বাঁশি…

১০
রূপনগরের ধুলোপথ

কোকিলের গান নয়, গানের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা
অদৃশ্য রক্তকণারা বুক ছিঁড়ে হৃদপিণ্ডে এসে
মায়াময় ভোর এঁকে বলে– দেখ, এই আবীরমাখা
তীর ও বল্লম, মেঘের সচিত্র ডালপালা সব
ঈশ্বরকণাদের আরশি হয়ে বেঁচে আছে চিরকাল–
প্রাণকোকিলার বাড়িতে ছেঁড়াখোঁড়া দুপুর
মধ্যরাত আগুনের ছায়া নিয়ে হাজির হয়,আর
রূপনগরের ধুলোপথ বেয়ে যাবার সময় মনে হয়–
সেই গানের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অদৃশ্য রক্তকণারা
ধুলোকণাদের শিখিয়ে দিচ্ছে রামকিঙ্কর, রেমব্রাঁ…


কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম। জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবেকবিতার জগতে প্রবেশ।

পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনায়
ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে ( ১৯৯৯), ঘাসবেলাকার কথা ( ২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প ( ২০০৬ ), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮ ), চারদিকে শব্দের লীলা(২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল(২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া( ২০১৪ ) দীর্ঘশ্বাসের সারগাম(২০১৬)
বিহঙ্গখচিত লন্ঠন (২০১৭)

প্রবন্ধগ্রন্থ: কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯),
রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩)
কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)

Edited book:
Green Fogs: A Collection of Contemporary Bangla Poetry(2017)

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E