৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ২৬২০১৭
 
 ২৬/০৭/২০১৭  Posted by

একগুচ্ছ বৃষ্টির কবিতা
– কামরুল ইসলাম


আকাশের মেলোড্রামায় কান পাতি

বৃষ্টি ঝরলে মনে হয় আমি রঙধনু নিয়ে খেলছি আর রঙধনুর
রঙের মধ্যে সাঁজিয়ে যাচ্ছি লেমনজলের শূন্য বোতলগুলো আর্দ্রতা বুঝে

আকাশের অঝোর কান্নায় তুলোপাখির অধরা মুখ দেখি
কিংবা সেই কবেকার ফেলে আসা কিশোরীর টিয়েপাখি চোখ
এমন দিনে আমি পাঠ করি সাঁঝবেলা গোধূলির আলোয়
আর দেখি, ওপারে চুল্লি জ্বালিয়ে কীভাবে বালিকা-শ্রাবণ
রেঁধে যায় অপূর্ণ খোয়াব মেঘে ও মশলায়

জালনৃত্যের প্যাঁচে আজও মানকচুর পাতারা
অভিমানী সবুজের বুকে ধরে আছে টলমলে স্মৃতি
মরণের জটাজাল থেকে উঠে এসে আকাশের মেলোড্রামায় কান পাতি:
তখন আঁধার জড়ানো শৈশব, তখন নিমসন্ধ্যার হাওয়ায় মেঘবতী নদীর কোথাও
পালের নৌকো বেয়ে ছুটছে আমার সরল প্রতীকের কৈশোর
অত:পর মেঘে মেঘে জমে যায় সাকল্যে দুটো মাছ ভাসানের জলে
বৃষ্টি কি ভাসিয়ে নেবে পুরনো কাপড়গুলো সেলাইয়ের কলে?


শ্রাবণের পদাবলী

কখনো মনও ডুবে যায় শ্রাবণের সামন্ত জলে
তখন তালগাছের মাথা বেয়ে নেমে আসে সন্ধ্যা
নির্জন আঁধারে ডুবে যায় পাঠশালা আর
কাঁঠাল পাতারা রাতভর পড়তে থাকে জলের নামতা
এসময়ে কোনো সোনা ব্যাঙের জলকেলির দিকে
মুখস্ত ফুলেরা ফুটতেই পারে-

২)
জানালায় ঝুলে থাকা দুঃখগুলো লতিয়ে ওঠে মেঘের জাংলায়
ভোরের অদূরে শববাহী মানুষেরা যেন সব কুয়াশা পথিক
অনেকদিনের পুরনো কান্নাসহ ভিজে ওঠে বেহিসেবী বৃষ্টির তোড়ে
বৃষ্টিও পথিক, শুধু মেঘেরা তা জানে-

৩)
শ্রাবণের দিকে বিহঙ্গ-নৃত্যের অবিরাম কোলাহল
মোরগফুলের চোখে জমে থাকা অন্ধকারে
বৃষ্টির অমিতভাষিণীরা স্মৃতির টাকশালে জমে থাকা
রহস্য-টেক্সটের কোর বাক্যগুলো
ধুয়ে ধুয়ে জোঁকের মতো লেগে থাকে পাতালগামী সূর্যের নিচে-

৪)
সার্চ ইঞ্জিনের মতো সদাপ্রস্তুত এই কলাবাদী মন
সোনাপুর গ্রামের সব ভিজে ওঠা বাতাস ও পাতাদের দিকে
সমস্ত মৃত্যু ও শোকের দিকে, আকাশের অনাহুত কান্নার দিকে
বারে বারে ফিরে যেতে চায় আর দেখতে থাকে
পাঠশালার ওপারে চাঁদের নিরীহ আলো সব
নিভে যাচ্ছে একে একে বৃষ্টির বিরহ সংগীতে-

৫)
অলৌকিক বড়শিতে মাছ ধরে ফেরেস্তা-কন্যারা
হাওয়া-বিলে, কাকেরা ভিজে ভিজে দ্যাখে সব
শ্রাবণের আকাশ জানে কোথায় বিরহ নামে সন্ধ্যায়
যখন হাটের কোলাহল নেভা সুনসানে মৃত সব পালকেরা কাঁদে
আর মন ওড়ে আদ্র বাতাসে অজানা সাধনের মোহে-


সাঁঝবাতি

ভোরের বাতাসে নিমতলী গ্রামের সরল নৌকোটি
একদিন তোমার ফাংগাসে ভরা জানালার কাঠে
রেখে গেছে মাস্তুলের ছন্দবিভ্রাট

তোমার তৃতীয় নয়ন মেঘের বরফ-কুচিদৃষ্টিতে মেখে
জটিল অঙ্কের ঘোলাজলে শ্যামপাখি ওড়ায়Ñ

একটি হাত কুশলাদিসহ ধানচাষের মন্ত্র আওড়াতে
জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া মাছেদের দিকভুল দ্যাখে

তুমি ঘুম থেকে জানালার দিকে পাশ ফিরলে
পানাপুকুরের টলমলে জল উঠে আসে তোমার অপ্রস্তুত যোনিতে
শব্দশিকারীর টেন্ডনে ঘাঁই মারে জঙ্গী বাতাসের টোটেম-

তখন তোমার নার্ভাস বনে আগুনে আগুনে পুড়ে যায়
লতা-পাতার বিস্তারিত শৈলী কিংবা পখপখালির ছায়া,
বৃষ্টিঘুমের কু-লিনী মেখে তুমি স্বপ্নটিলার চুড়োয় উঠে
নিজেকে ভাঙ্গিয়ে খুচরো করে ফেল, আর সেই
খুচরো দেহ-মাংস নারদ নদে ভাসিয়ে দিয়ে
ঢুকে পড় আবহমান ধূলির ভেতর, যেখানে আলো নেই
শুধুরুমাল উড়িয়ে একদল ডাকিনী শ্রাবণের অন্ধকারে
বাগান বাড়ির চারপাশে সাঁঝবাতি জ্বালেÑ


তুমি শুধু অচেনা পালক

তুমি শুধু শূন্য দুপুর, শূন্যে উড়াও চুল যেন
বাতাসবিহীন উড়ছে ঘুড়ি
শূন্য নদীর বাঁকে;
একলা পথের গান হয়ে ভেসে বেড়াও বর্ণিল ইথারে
চলে যাচ্ছে অসম শ্রাবণ
বিষয়ী গান্ধারে-
পথ হারানো চিঠি;

তুমি শুধু অচেনা পালক
রাতভর ভিজে যাও
ভিজতে ভিজতে জানিয়ে যাও
লিবিডোর তীরে পাল তুলে ভিজিতেছে বাউল পথিক


বিনির্মিত মিউজের মুখ

শিলাবৃষ্টির পর কিছুটা অন্ধকার এসে চৌকাঠে দাঁড়াল
একজন কবি তার অসুস্থ আত্মার পাশে শুয়ে শুয়ে
দেখলেন জলেরও অধিক নবুয়তসহ একজন সাহসী ধীবর
উড়াচ্ছেন কিছু প্রজন্ম-তুলো মুক্তো আকাশে-
কবি তার বুকের যন্ত্রণা দিয়ে বানালেন কিছু রূপোলি পায়রা
আর সেই পায়রাগুলো বানপোকার অবাধ ভাসানে
স্নানদৃশ্যের তীর ঘেঁসে উড়তে উড়তে
চলে গেল ক্লান্তি ও বেদনার ভার্চুয়াল দেশে
যেখানে হাওয়াও ঈশ্বরভেদে মানুষেরই পথে-
দৈবাৎ সেখবর জানাজানি হয;
শিলাবৃষ্টির পর মুখর হলো বিনষ্টি ও অন্ধকার
নদী তার ভাঙনের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ভাটিতে ছেড়ে দিল জন্মান্তর
তখন মমতার শৈবালে রচিত হলো রিমঝিম রোদ
জ্বলে উঠল মিউজের বিনির্মিত মুখ-

কিছু কিছু অসুখ নাড়িয়ে যায় ইচ্ছের পাতা, হৃদয়ের ভূমি
চারণিক পড়শির মতো শুধু হাওয়াটুকু
শুধু এই মৃৎপাত্র বাওয়াটুকু দাঁড়িয়ে যায় ততোধিক জীবনের দিকে-


লীলাময় জ্বর

জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডের চারপাশে বর্ষা নেমেছে
প্রেমরঙা মাছের নেশায়

বাজারের কোলাহল-নুয়ে-পড়া রাতে
গাছ-পালানো পাখিদের জ্বরগ্রস্থ যৌবন
নেচে ওঠে পারদের নানারঙ ছন্দে
আর তিন-তাসের হাত ধরে বুক-সমান উঁচু দিয়ে
উড়ে যায় টইটুম্বর নৈঃশব্দ্যের লীলা-

আয়ুর ভেঙে পড়া ঘরে অদৃশ্য গোলাপায়ন
কিংবা ল্যাজারাস ফেনোমেনন
যেন সরল দোলকের রোদ-পোহানোর সুখ
মিশে গেছে ব্যাঙ-ডাকের অপরূপ কৌশলে

জ্বরের তান্ডবে নেচে ওঠে বৃষ্টি ও মেঘ
চৈতন্যের টিলায়
তখন জলের তোড়ে ছায়া ফেলে দূরে চলে যায়
গাছ ও জলের জ্যামিতি
আঁধারের যুগল বাহুতে ঢেকে যায় নদীপাড়
জয়তির দেউড়িতে ভোরের খোৎবা স্নান সেরে ওঠে-

লীলাময় জ্বর নেমে গেলে
রাতের বুক থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে অন্ধকার…


বিসর্জন

তুমুল বৃষ্টির দিনে আয়ুরেখায় মযূর-পেখমের ছায়া এঁকে
জলে ভেজা সন্ধ্যায় তুমি নারকেল গাছের এলোচুল বেয়ে
সরল ঘুমের দিকে যেতে থাকো নিরিবিলি অসুখের রাতে

শবর-শবরীর পুরনো হাঁটা-পথে অন্ধ আকুতির বেহালাটা
জাল-ভর্তি মাছের ছন্দে বয়ে যায় দিগন্তের ফাঁড়িতে
যেখানে ঘুমের কার্টলেজ বেয়ে নেমে আসে হাটসন্ধ্যার স্মৃতি

হয়ে-না-ওঠা গল্পগুলো খোলা বারান্দায় জমিয়েছে আড্ডা
ভুলগুলো কেঁদে ওঠে অচেনা মেঘের বেহালার টানে
খেতের আড়ালে পড়ে থাকা ক্ষুধার নিক্কনে জেগে ওঠে
জলপাতার মেয়েটি, জলের কুহকে গাঁথা হয় গল্পের মালা

আউশ ধানের পরিচর্চার সূত্র ধরে হাঁটতে হাঁটতে শেষে
সেই দুপুর মাড়ানো জলপাতার মেয়েটি, বর্ষার আড়ালে
লুকিয়ে রেখে বসন্তের গান, বর্ণময় প্রার্থনার ভঙ্গিতে
জানালায় ফুটে থাকা কষ্টগুলো শালপাতায় সাঁজিয়ে অত:পর
শোইশবের জল-সেচনের গল্পটা ভাসিয়ে দেয় তালপুকুরের জলে-

 


কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

জন্ম : ১ নভেম্বর ১৯৬৪ , কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামে
পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা, বর্তমানে রাজশাহী
সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : দ্বিধান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে ( ১৯৯৯ )
ঘাসবেলাকার কথা ( ২০০১)
যৌথ খামারের গালগল্প ( ২০০৬ )
সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮ )
চারদিকে শব্দের লীলা ( ২০১০ )
অবগাহণের নতুন কৌশল(২০১১)
মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া(২০১৪)
দীর্ঘশ্বাসের সারগাম(২০১৬)
বিহঙ্গখচিত লন্ঠন (২০১৭)

প্রবন্ধ:
কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য (২০০৯)
রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত(২০১৩)
কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব(২০১৫)
Edited Book :
Green Fogs: A Collection of Contemporary Bangla Poetry ( 2017 )

e-mail : kamrulislam1964@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E