৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১৪২০১৭
 
 ১৪/০৫/২০১৭  Posted by

কামরুল ইসলাম-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে- এই সত্য মেনে নিয়েও বলা যায় যে এই সময়েও কেউ কেউ দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন বা লিখছেন। দীর্ঘ কবিতা পড়ার মজাই আলাদা, যদি তা বহুস্তরিক, বহুমাত্রিক রূপ-কাঠামোই অন্বিষ্ট হয়। দীর্ঘ কবিতা লেখার জন্য দীর্ঘ শ্রম দরকার, সেই দীর্ঘ শ্রম দেওয়ার সময় হয়তো কবির হাতে নেই- মোটাদাগে এরকম বললেই চলে। কিন্তু এরকম বলায় কেউ খুশি হতে চাইবে না। কবিতা লেখা তো একধরনের প্রার্থনার মধ্যে ডুবে থাকা-ই। দীর্ঘ কবিতা লেখার জন্য দীর্ঘ প্রার্থনায় ডুবে থাকতে হয়। সেই সময় কি আছে কবির? সৃষ্টির দম-দূর্বলতা  নয় বরং বলা যায় সময় ও বাস্তবতাই বেশি বেশি ছোট কবিতা লেখার কারণ। ছোট কবিতার ঘর-সংসারেই কবি তার সমূহ চেতনার স্ফূরণ ঘটাতে পারেন সহজেই। কবিতার স্বচ্ছ স্ফটিকায়নের মধ্যে যদি আনন্দময় উষ্ণতা ঢেউ খেলে যায়, তাহলে ওই দীঘল পথের দিকে পা বাড়ানোরই বা কী দরকার।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

এক লাইনের কবিতা একধরনের তৃপ্তি দেয় আর সহস্র চরণের কবিতার থাকে অ্ন্য ধরনের তৃপ্তি দেওয়ার ক্ষমতা, যদি তা নিছক অকাব্যিক ন্যারেটিভ না হয়ে থাকে। প্রথমত আকার-অবয়বের মাপকাঠিতেই আমরা কোনো কবিতাকে দীর্ঘ কিংবা ছোট বলে থাকি। তারপর কবিতা হয়ে ওঠার শর্তগুলোর দিকে নজর দিই। সাধারণত দীর্ঘ কবিতা বহুস্তরিক ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকে,ছোট কবিতার সে সুযোগ থাকে কম। কবিতা দীর্ঘ-ই হোক আর ছোট-ই হোক, যদি তা কবিতা হয়ে না ওঠে, তাহলে সব প্রয়াস-ই ব্যর্থ।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন? খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি? গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

কবিতার ছোট-বড়’র মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় না গিয়ে এব্যাপারে শুধু  এটুকু বলা যায় যে, ছোট কবিতা দীর্ঘ হবে না- ঐ যে গোষ্পদের জলে আকাশ দেখার মতোই অনেকটা। যতই ছোট হোক না কেন, যদি তা অনন্ত রৌদ্রের ঝিকিমিকি নিয়ে ব্যঞ্জিত হয়,কবিতার দ্যুতিময় হিরকখণ্ডের দেখা পাওয়া যায় তাতে, তাহলে সেখানে পূর্ণ তৃপ্তি পেতে অসুবিধা নেই। মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা ছোট কবিতায়ও পাওয়া সম্ভব, যদিও মহাকাব্যের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।   

 ৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে? খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

আমার নিজের সামান্য লেখালেখির জগতে ছোট কবিতারই চর্চা হয়েছে বেশি। ছোট কবিতা পড়েই আমি বেশি আনন্দ পাই, যদিও কখনো কখনো দীর্ঘ কবিতার দিকেও হাত বাড়িয়েছি।

আমার একগুচ্ছ কবিতা


মৃত্যু

মৃত্যু কি মাছের মতো ঘনিষ্ঠ প্রোটিন, মাটিময়, নিরীহ-তুমুল ?
হাল্কা নীল শাড়ি পরে শুয়ে আছে মৃত্যু তোমার নিরীহ বারান্দায়
শ্রোণি ও গ্রীবায়;
তোমার সখের বীজতলে মরণের ঝাঁপ খসে পড়ে-


গায়েবী সাঁতার

শেষমেশ আমরা গলির ভেতর গিয়ে দাঁড়ালাম
সেখানে দেখি, শব্দেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে রত ;
অতঃপর শব্দেরা নিঃশব্দে ডুবে যেতে থাকে
একটি উঁচু দালানে লেগে থাকা সন্ধ্যার ভেতরে-
আমাদের পায়ের তলায় মৃত গল্পের শিকড়,
আমরা দেখতে থাকি একটি নতুন বাক্যের শব্দাতীত কান্না
যেন রক্তের সবুজ ঘিরে জমে উঠছে গায়েবী সাঁতার
যেন আমরা পূর্ণিমার কোমল সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছি রাতের মিনারে
সেখানে শব্দ ও নৈঃশব্দ্য মিলে ধরে আছে পতনের স্বর-


তরঙ্গবিদ্যার মনোলগ

গাদাগাদি খড়ের মধ্যে কীটপতঙ্গের সঙ্গম ও শীৎকার
সাধু পাখির দেহনিদ্রায় ধেয়ে আসে তরঙ্গবিদ্যার মনোলগ-
এদিকে নদীও শেমিজ খুলে ঝুলে পড়ছে  পিছনের পাড়ে
বাতাসে জড়ানো জন্মবীজ পাড় থেকে উঠে আসছে দলে দলে
আরেকটি চাঁদের জন্ম হবে বলে বিকেলের জরায়ু ঘুমিয়ে নিচ্ছে
বাঁশঝাড়ের তলে-


পথের মন্দিরা বেজে যায়

বাবুই-এর শিল্পসাধনা ঠোঁটে নিয়ে
নদীও একদিন অধরা হলো
দরিদ্র ভূগোলের জল-পতনের দৃশ্য আমাদের কাঁদাল-
দূরে, ঐ যে পাপমোচনের পাঠশালা
সেখানে তুমি পেতে পার দু-একটি চারুতার সিঁড়ি।

পথের মন্দিরা বেজে যায়
শূন্য বারান্দায় খেলা করে অদৃশ্য নৌ-সেনারা
সীমাহীন রাতের ওপারে দূরের লালিমা
এপারে ক্রন্দন, শৈশবের বাতাসার ঘ্রাণ-


বেহুলার একাকী ভাসান

ভেবে রাখি-
একদিন মযূরী ও মেঘের কথা লিখে যাবো
তোমার শূন্য ভিটের খাঁ খাঁ বাতাসে, আর
নিঃসঙ্গ ঘুমের নিচে যে  আলপথ নিরিবিলি
বাজিয়ে যায় বেহুলার একাকী ভাসান, সেইখানে
বুনে যাবো আকাশ ও পাখির মূখর কলতান-


ভুল আগুনে জ্বালিয়েছি উনুন

ভোরের আত্মার কাছে আমার বাড়ি আর
ওখানে তুমি ছিলে করুণ আলোর রাঁধুনি-

উৎরানো সন্ধ্যায়
আমি ভুল আগুনে জ্বালিয়েছি উনুন
তুমি পরিণত ক্ষুধার কথা লিখে গেছ ধুলোয়

একখ- ছেঁড়া তেনায় মাংসলিপি ঢেকে
নগরে বেশ্যা নেমেছে আগুনের খোঁজে…


ব্যক্তিগত জমানো মন্ত্রপুস্তিকার পাতাগুলো

ব্যক্তিগত ওড়াউড়ি নিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি শহরের শেষ মাথার উড়ন্ত পানশালায়
সেখানে এক অন্ধ কসাই আর এক বেহালাবাদক ওয়াইন ও অন্ধকার গিলছে সমানে
আর চারদিকে মাংস-হারানো গরু-মহিষের দল গোল্লাছুটের মহড়ায় যে যার মতো
শান-দেওয়া ছুরির দিকে প্রণত-
পানশালার দেয়ালে টাঙানো বিখ্যাত মাতালদের ছবির ভেতর আমাদের ব্যক্তিগত
জমানো মন্ত্রপুস্তিকার পাতাগুলো বেলফুলের গন্ধসহ ঢুকে যায়, আমরা তখন
বেহালাবাদকের শেষরাতের ঘুমের ছায়ায় বেলগাছের নিজস্ব সংগীতবিছিয়ে
মনে করতে থাকি তুমুল বৃষ্টির ভেতর হেঁটে যাওয়া মন-বালিকার জল-ধোয়া মুখ…


যাও পাখি বলো তারে

আহা সেই নলিনীর ঘর যেন কলাপাতায জাগ্রত ঈশ্বর
শাকান্নের নিথর উজানে। এঁকে যায় কারবালা হৃদয়
কে এক মৎস্যশিকারী মেঘের ফাতনায়, দুধভোরে ;
যেখানে গাছের ছায়ায় আমারই কফিন ছাইরঙে হাসে-
তবু, এই রক্তেভেজা বিপন্ন জগতের কিনার ঘেঁসে
সান্ধ্য বাতাসে ভেসে যায় – যাও পাখি বলো তারে…


সামান্য প্রতিভার গল্প

এর পর আর কোনো প্রতিভার নিচে আমি ঘুমুতে যাবো না- শোন হে! এর পর জঙ্গলের গহীনে ঢুকে এই দরিদ্র প্রতিভা আমি সেগুন পাতায় ঢেকে রেখে শুনে যাবো হারানো সাইকেলের বেল বাজার ধ্বনি; আর অদৃশ্য প্রতিধ্বনির গহনা-শরীরে যেসব গাছপালা লতা-পাতার দেহের আড়ালে লুকিয়ে রাখে ভাসানের গান, সেখানে আমি ভেষজ বয়ানে দাঁড়াবো একদিন, দেখো হে!

১০
সিডিউল চেঞ্জ হওয়ার পর

ধর্মকলের খুব কাছাকাছি তোমাদের গ্রাম
তোমাদের গ্রাম্য খামারে রচিত হয়- মায়াযোগ
পালক মেশানো গদ্যের বুননে; পিঁপড়াদের ভাতঘুম  
বেয়ে পাহাড়ে উঠছে লড়াকু কষ্টের ঠাটগুলো
প্রজন্মের বোদ্ধা লাঠিয়ালরা কুড়োতে থাকে
ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী  জলের ভাসমান সাহস-

সিডিউল চেঞ্জ হলে আমাদের সৌভাগ্যের চাঁদ-তারা
বুঝে উঠতে পারে না জল-হাওয়ার গোপন সিঁড়িটি
আর এভাবে স্থির হয়ে যায় হাটের কোলাহল
কোনো সকালই আর দুপুরের দিকে হাঁটে না
হাতঘড়ির অন্ধকারে বাসা বাঁধে চতুর ভাইরাস-

আমাদের এই ধর্মরাজ্যে তখন ধূর্ত চিলেরাই
কাব্যকলায় হাত পাকাতে অদৃশ্য স্নানঘরে ঢোকে


কবি পরিচিতি

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম। জন্ম  ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবে কবিতার জগতে প্রবেশ। পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :  দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯),  ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প (২০০৬), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল (২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া (২০১৪), দীর্ঘশ্বাসের সারগাম (২০১৬), বিহঙ্গখচিত লন্ঠন (২০১৭)।

প্রবন্ধগ্রন্থ:  কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯), রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩), কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E