৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ১৮২০১৭
 
 ১৮/০৩/২০১৭  Posted by

কবিতার আলো ও আঁধার, বোঝা ও না-বোঝা

– কামরুল ইসলাম

‘Poetry must sing or speak from authentic experience. Of all the streams of civilized tradition with roots in the Paleolithic, poetry is one of the few that can realistically claim an unchanged function and a relevance which will outlast most of the activities that surround us today. Poets, as few others, must live close to the world that primitive men are in ; the world in its nakedness,which is fundamental for all of us _ birth, love, death; the sheer fact of being alive.’

(Gary Snyder  : Poetry and the Primitive )

চর্যাপদ থেকে আজ অবধি কত শত কবিতা লেখা হয়েছে, সে-হিসেব আমাদের কাছে গৌণ একারণে যে, কাল পরম্পরায় কবিতার ইতিহাস জাগরূক  সত্যের চর্চিত সমন্বয় মাত্র – যাকে আমরা অসংখ্য চিহ্ন ও সময়ব্যাপ্তির সূত্রগুলোয় খুঁজে পাই। ফলে একটি কাল-পরিচয়ের মধ্যে কবিতারও একধরনের পরিচয় আভাসিত হয় এবং বোধের জানালায় সেগুলোর চেহারা উদ্ভাসিত হলে আমরা কেবল কিছু মুখস্থ সূত্র কিংবা উপরিতলের ছায়াকে ঘিরে কাগজ ব্যয়  করে একটি আলোচনা কিংবা ডিসকোর্স তৈরি করি। এই নির্মাণ আবার বিনির্মিত হয়ে ফিরে আসে , এতে শিল্প কিংবা কবিতার কতটুকু পাওয়া সম্ভব সে বিষয়ে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তবু আমরা লিখি, লিখছি – কখনো অনুরুদ্ধ হয়ে কখনো স্ব-প্রণোদনায় এবং এইভাবে অজস্র লেখার মধ্যে ভেসে উঠছে কবিতার রহস্যাবলি নানা ধরনের বিশ্বাসের রঙ মেখে। সেই রঙগুলো কখনো চোখ ধাঁধানো, কখনো বিনম্র ভাবের উন্নাসিকতায় আচ্ছন্ন আবার কখনো কৌশলী বিচ্ছিন্ন চেতনায় অন্বিষ্ট। তবে একথা মানতেই হয় যে , হয়ে ওঠার পথে কবিতার জাত বিচার বড়ই কঠিন কাজ এবং প্রকৃত কবিতা চেনার বিষয়ও কোনো বিশেষ কালখন্ডের কোনো ব্যাপার নয়।

আমরা বিভ্রান্ত হই, কখনো বিচলিত হই, আবার কখনো নিজের রুচি ও বিশ্বাসের তলায় খুঁজে পেতে চেষ্টা করি মাটি – কখনো খেই হারিয়ে ঘুরতে থাকি শূন্যে, কারণ নিজেরও একটা শেষ আছে, আছে একটি পরিধি – এই শেষে এসে মনে হতে থাকে ‘কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো’। কবির হাতে তখনই সৃষ্টি হয় কবিতার যখন  অন্ধকার হাড়গিলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে কবির সামনে, মরুঝড় কিংবা অন্ধকার কবির চোখে ঢেলে দেয় চিরকালের স্তব্ধতা, তখন দূরের কোনো সিম্ফনি বকছানার মতো ঘুরতে থাকে কবির শবাধার ঘিরে, সেই গোলচক্রের ভেতর থেকে জন্ম হয় কবিতার – ঈশ্বর স্বয়ং নিজ হাতে লালন করেন সেই কবিতা। কবিতার সত্য সম্পাদিত হয় কবির মৃত্যুতে;  অজস্র মৃত্যুর মধ্যে কবিকে পথ হাঁটতে হয়, মৃত্যুময় পরানে বেজে ওঠে কবিতা – সেই কবিতার জন্য যারা প্রস্তুত মূলত তারাই কবি।

কবিকে সংগ্রাম করে যেতে হয়। আজীবন। সেই সংগ্রাম অবশ্যই বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরিক – জীবনের অনেকানেক না-পাওয়ার মধ্যে সেই সংগ্রাম যেমন গ্রথিত, তেমনি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রপঞ্চের মধ্যেও যার রয়েছে সাহসিক বিস্তৃতি। তবে কবির এই সংগ্রাম মূলত কবিতার জন্য সংগ্রাম। একটি ভালো কবিতা লেখার জন্য কবিকে যে সংগ্রাম করতে হয় তা কবি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কবির এই সংগ্রামকে জে আইজাকস এভাবে দেখেছেন: ‘অনেক সময় আমি ভেবেছি, যদিও কথাটা আপাতবিরোধী মনে হতে পারে যে, শেষত: সব কবিতাই কবিতা বিষয়ক এবং ‘কবিতার জন্য কবিতা’ কথাটি কিছুটা অর্থপূর্ণ। তবে আসন্ন বিপদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য নন্দনতাত্ত্বিক অর্থে কাব্যে আশ্রয় গ্রহণের কথা আমি বলছি না; বরং কাব্যকলায় দক্ষতা অর্জনের প্রচেষ্টাই যে পৃথিবীতে কবির অস্বিত্বের প্রধান যুক্তি আমি একথাই বুঝাতে চাচ্ছি। এই দক্ষতা অর্জন না করা অবধি এবং সমস্যাক্রান্ত জীবনের অসঙ্গতি ও প্রচাপ, অন্যের অর্জিত ছাঁচ ও শক্তি , প্রতিদ্বন্দ্বী ঈশ্বরের ছাঁচ ইত্যাদি তার নিজের অর্থ ও সুরসঙ্গতিতে পুনর্বিন্যস্ত না করা পর্যন্ত কবি সংগ্রাম করে যান।’ (আধুনিক কাব্যের পটভূমি)। এই সুরসঙ্গতি কিংবা দক্ষতা অর্জনের দীর্ঘ সংগ্রামে অপারগ কবিরাই মাইনর পোয়েটস, অবশ্য কবিতার সাম্রাজ্যে এই মাইনর কবিদেরও গুরুত্ব রয়েছে। মাইনর কবিরা থাকেন বলেই মেজর কবিদের সহজে চেনা যায়।

আমাদের আজকের আলোচনা তাই কবিকে নিয়ে নয়, কবিতা নিয়ে, কবিতার জটিলতা কিংবা তা বোঝা না-বোঝা নিয়ে।

প্রকৃত কবিতা আড়াল চায় – কবিতার নৈঃশব্দ্যে লুকিয়ে থাকে অপার রহস্য আর এই রহস্যই কবিতার সৌন্দর্য; তাই হয়তো মালার্মে বলেছেন: Mystery and obscurity are the protection of poetry from the idle curiosity of the masses. তাহলে দেখা যাচ্ছে দুর্বোধ্যতা ও রহস্যই কবিতার ঢাল। সাধারণ মানুষ কবিতা বুঝতে চায় কবিতার অর্থ জানতে চায়; কিন্তু কবিতা কি সত্যি কোনো অর্থ করে কিংবা কবিতা কি বোঝার ব্যাপার – এসব নিয়ে অনেককাল আগে থেকেই শুদ্ধ শিল্পবাদী এবং জীবনবাদী কিংবা মার্কসবাদী নন্দনতাত্ত্বিকদের মধ্যে চলে আসছে বিতর্ক – আসলে শিল্প শিল্পের  জন্যে না জীবনের জন্যে, এসব নিয়ে অনেকেই অনেকভাবে বলেছেন; আজকে সে-বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকুই বলা যায় যে, কবিতা কিংবা শিল্প জীবনের অসীমতায় দাঁড়িয়েই হয়ে ওঠে অপার রহস্য কিংবা সৌন্দর্যের আধার। আমি বিশ্বাস করি কবিতায় সৌন্দর্য সৃষ্টির মধ্যেই বিষয় বা জীবনের খোঁজ পাওয়া সম্ভব এবং যে কবি শুধু সৌন্দর্য সৃষ্টির লক্ষ্যে লিখছেন, তিনিও নিরন্তর জীবনচর্চা করেই চলেছেন – এই বোধটা আমাদের তথাকথিত কাব্যসমালোচকদের মধ্যে জাগ্রত হওয়া দরকার এবং আমি মনে করি এটা মার্কর্সীয় চিন্তারই অনুগামী। প্রত্যেক চিন্তার পিছনে যেমন রয়েছে বস্তু, তেমনি প্রত্যেক সৌন্দর্য প্রেরণার উৎসও ঐ বস্তু। এখানে কল্পনা বিষয়টিকে গৌণভাবে দেখার কোনো অবকাশই নেই, কারণ কল্পনাও বস্তুকেন্দ্রিক; কল্পনার অবস্থান সত্যের সারাৎসারে।

কবিতা শব্দশিল্প; কবিতা গড়ে ওঠে শব্দের যাদুমন্ত্রে। সুতরাং কবিতা বোঝার আগে শব্দ প্রয়োগের ঐন্দ্রজালিকতা তথা শব্দের এই চলনের নানাভঙ্গি ও রহস্যটাই সর্বাগ্রে অনুধাবন করা দরকার এবং সেইসাথে দরকার চৈতন্যের সর্বপ্লাবী জাগরণ। পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং জীবনের মূল্যবোধ পাল্টানোর সাথে সাথে যেমন জীবনদর্শন ও মূল্যবোধের নতুন ধারণা সংযোজিত হয়, তেমনি শিল্পের আধার ও আধেয়ও পরিবর্তিত হয়। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিন্যাস এবং সংযোজন-উপযোজনের অভিযাত্রায় শব্দের প্রায়োগিক রূপ বদলে যায়, বদলে যায় তার প্রতীকী ব্যঞ্জনাও। নিরন্তর ভাঙন, রূপ পাল্টানোর মধ্য দিয়ে ক্রমাগত এক জটিল রহস্যের দিকে এই যে শিল্পযাত্রা, তা কিন্তু মনোসমীক্ষণেরই জটিল উৎসারণের অনিবার্য আস্বাদ।

প্রতিভাবান, সৃষ্টিশীল প্রতিনিধিত্বকারী সব কবিব্যক্তিত্বই স্বকালে দুর্বোধ্য ও দুরূহ থেকেছেন। কবি স্রষ্টা এবং দ্রষ্টা, তাঁর দৃষ্টি কোনো বিশেষ দেশকালের নয়; তিনি একটি বিশেষ ভৌগলিক পরিবেশে জন্ম নিয়েও বৈশ্বিকতায় ঋদ্ধ, অখন্ড ইতিহাস ও অতীতচেতনায় অন্বিষ্ট। তিনি ঈশ্বরের মতোই পরাক্রমশালী এবং ঈশ্বরের মতোই তার সৃষ্টিকে আকীর্ণ রাখেন ‘ বিচিত্র ছলনার জালে’। একজন শিল্পী জয়েসের ভাষায়: Like the God of creation and remained within or behind or beyond or above his art.’ কবি বা শিল্পী স্বকালের গড় মানুষ থেকে উন্নত আচরণে, দৃষ্টির গভীরতায়, দার্শনিক প্রত্যয়ে এবং সুক্ষ্ণ মননশীলতায় আলাদা এবং ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। সৃষ্টির উন্মাদনায়, বিচ্ছিন্নতার উপঘাতে তিনি যা সৃষ্টি করেন তা প্রাথমিকভাবে দুর্বোধ্য মনে হয় গোষ্ঠীবদ্ধ, প্রথানির্ভর সাধারণ মানুষের কাছে। কারণ, সেই নতুন সৃষ্টিসৌন্দর্য উপভোগের মানসিক প্রস্তুতি এবং প্রত্যয় সাথেই সাথেই সব মানুষের মধ্যে জন্মে  না। অন্যকথায় চিন্তার সীমাবদ্ধতাও কখনো কখনো শিল্পের রসাস্বাদনের অন্তরায় হয়ে ওঠে। একথা অনস্বীকার্য যে, প্রকৃত শিল্প বলতে যা বোঝায়, তা কখনোই কোনোকালেই সাধারণ্যে জনপ্রিয় ছিল না, এখনো নেই।

আমরা আগেই বলেছি যে, কবিতা শব্দশিল্প এবং শব্দের বিচিত্র আবহেই কবিতার সৌন্দর্য-রস অনুবিম্বিত। বাংলা কবিতায় একধরনের বিপ্লব এনেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং তিনি আধুনিকতারও সূত্রপাত করেছেন, সেই কবিও তার কালে দুর্বোধ্য ছিলেন, এখনো তিনি সাধারণ পাঠকের কাছে অনেকটাই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। দুর্বোধ্যতার অভিযোগ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে উঠেছে, উঠেছে তিরিশের কবিদের বিরুদ্ধেও। তিরিশের কবিদের মধ্যে বিষ্ণু দে এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বেশি প্রকটিত হয়েছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত নিজেই তার কবিতার দুর্বোধ্যতার কথা স্বীকার করেছেন। অবশ্য বুদ্ধদেব বসু একে দুর্বোধ্য না বলে দুরূহ বলতে ছেয়েছেন। কারণ, তার কাব্যভাষার শব্দাবলী অভিধান দেখে জেনে নিলে তা সহজ হয়ে যায়।

আধুনিক কবিতার অন্যতম রূপকার টি.এস. এলিয়টের কবিতাও কম দুর্বোধ্যতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়নি। তিনি নিজেও বলেছেন যে, তার জীবনে তিনি অনেক ভালো কবিতাই শেষ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেননি। আবার এজরা পাউন্ডের ‘কান্টোজ’ এতটাই উল্লেখ-উদ্ধৃতিতে ঠাসা যে কবিতার সাধারণ পাঠককে অনেকটা বিপদেই পড়তে হয়। আমরা জানি ‘ভালো কবিতা বোধগম্য হওয়ার আগে তা সঞ্চারিত হতে পারে।’ যে কারণে কবিতার অর্থের ব্যাপারে নির্লোভ মানসিকতা সৃষ্টি না হলে তার রসাস্বাদনের ব্যাপারটি দুরূহ হতে বাধ্য। মালার্মে বলেছেন, কবিতা হবে প্রহেলিকার মতো। তিনি অবশ্য একেবারে সার্ত্রের মতো বলেননি যে, কাব্যের অর্থ মাত্রই নিরর্থকারী, বরং তিনি অর্থের ইঙ্গিতময়তার কথা ব্যক্ত করেছেন। ভ্যালেরিও কবিতার স্পষ্ট বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছেন।

আধুনিক কবিতার জটিলতার মূলে রয়েছে নানারকম উল্লেখ-উদ্ধৃতি এবং নানান ধরনের উৎস থেকে শব্দ আহরণ এবং নানা জাতির উৎকৃষ্ট শিল্প-সংস্কৃতিকে আত্মীকরণ, জটিল মনোবীক্ষণিক অনুসন্ধান। আর সেজন্যেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমসাময়িক উৎকৃষ্ট কবিতা বুঝতে হলে বা তার রস আস্বাদন করতে হলে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে অন্বিষ্ট হওয়া দরকার। ফ্রেজারের ‘দ্য গোল্ডেন বাউ’ কিংবা মিস ওয়েস্টনের ‘ফ্রম রিচুয়াল টু রোমান্স’ পড়া ছাড়া এলিয়টের কবিতা বোঝা মুশকিল। তিনি বৌদ্ধ ও ভারতীয় দর্শন থেকে যেমন উপাদান নিয়েছেন, তেমনি নিয়েছেন সমগ্র ইউরোপের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য-উপকথা-দর্শন থেকে। সুতরাং তার এই সুবিশাল পান্ডিত্যের বহিঃপ্রকাশ তার সৃষ্টিকর্মকে বুঝতে হলে কীরকম মানসিক প্রস্তুতি থাকা দরকার , তা সহজেই অনুমেয়।

আধুনিক কবিতা ইতিহাস-মিথ-উপকথা-লোককথা, প্রযুক্তি-বিজ্ঞান, সামাজিক-রাজনৈতিক বিবেচনাসহ সমাজ বিকাশের-পরিবর্তনের নানা অনুষঙ্গের সংমিশ্রণ, যা আবার আধুনিক শিল্পদর্শন, ভাব-ভাষার নিরবচ্ছিন্ন আচরণে সিদ্ধ। তাই আধুনিক কবিতাকে দেখতে হবে বিশ্বসংস্কৃতির দর্পণে, কসমোপলিটনবোধ ছাড়া আধুনিক শিল্পী বা পাঠক কোনোটাই হওয়া সম্ভব নয় আজকের এই খোলা দুনিয়ায়। সুতরাং, গড় মানুষের কাছে বিশেষ কোনো সময়ের সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব যে অনেকটাই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকবেন তা বলাই বাহুল্য। অন্যকথায় বলা যায়, কবি যে কল্পনা, ভাষা এবং ছন্দে মননশীলতার প্রসব ঘটিয়েছেন এবং যে উপলব্ধির জমিনে দাঁড়িয়ে দেখেছেন অরূপ ও স্বরূপের মিথস্ক্রিয়া, সেই উপাত্তসমূহ এড়িয়ে কোনো কাব্যকর্মের ভেতরে ঢোকা নিতান্তই দুষ্কর।

কবিতা মূলত কাব্য না হয়েও তা পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে। আবার কবিতা মূলত কাব্য হয়েও তা সাধারণ পাঠকের কাছে সমাদৃত নাও হতে পারে। ইংরেজ কবি বায়রন বই করলে তা অতিদ্রুতই নিঃশেষ হয়েছে, আবার ফরাসি কবি র‌্যাবোঁর কবিতার বই কয়েক কপির বেশি বিক্রি হতো না। অবশ্য একথা সর্বজনবিদিত যে ,উত্তীর্ণ শিল্পকর্ম কোনো সমকালই সহজে গ্রহণ করেনি বা সাধারণ মানুষের কাছে তা কোনোকালেই সমাদর লাভ করেনি। আবার অনেক উত্তীর্ণ শিল্পকর্ম সমকালেও নন্দিত হয়। অবশ্য সেক্ষেত্রে শিল্প-সংস্কৃতির একটি উপযুক্ত চর্চাক্ষেত্র থাকা দরকার, যেখানে মানুষ উন্মুক্ত বাতাসে নিজেদেরকে মননশীল শিল্পচর্চায় অন্বিষ্ট রাখার সুস্থ ও সাবলিল পরিবেশ পায়। আইরিশ কবি শেমাস হিনির কবিতা মানুষ ভিড় করে শুনতো। কোনো পাব কিংবা গোরস্থানের পাশে সন্ধ্যয় তিনি কবিতা শোনাতেন ভক্তদের। কবিতার জন্য এই যে ভালোবাসা, এ অবস্থার জন্য সুদীর্ঘ সময়ের কবিতাময় পরিবেশ দরকার। আমাদের বরং উল্টোটাই এখানে আমরা দেখি। কবিতা থেকে সরে যাচ্ছে পাঠক। কেবল কবি ছাড়া আর কেউ কবিতা তেমন পড়ছে না। কবিতা নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা সামাজিকভাবে কোনো জোরালো কথাবার্তা শোনা যায় না এখানে। অবশ্য সারা পৃথিবীতেই এখন কবিতার মন্দাকাল। খোদ ইউরোপেও কবিতার তেমন কদর নেই। কবিতার বই বেরুলে এখানে যেমন, ইউরোপ-আমেরিকায়ও তেমন (দু’ একজন কবি ছাড়া) পাঠকের খুব একটা সাড়া মেলে না। এ অবস্থার জন্য কে দায়ী – কবিতা না পাঠক, সে-বিষয়ে হয়তো বলা যায়, কবিতা ও পাঠক উভয়েই দায়ী। কবিতা দায়ী, কারণ, কবিতা হয়ে পড়েছে কবির একান্ত জটিল মনোজগতের ক্রিয়া-কলাপ যা পাঠকের দরজায় করাঘাত করেও সাড়া পাচ্ছে না। পাঠক দায়ী, কারণ, কবিতা পড়বার মতো মানসিক প্রস্তুতি তার নেই। কবিতার ভালো-মন্দের ব্যাপারটি এক্ষেত্রে আসতে পারে। অনেক কবিতা আমাদের ভালো লাগে, ছুঁয়ে যায়, কিন্তু কবিতার ব্যাকরণে সেটি হয়তো কোনো ভালো কবিতা নয়। আবার অনেক কবিতাই আমাদের ভালো লাগে না, অর্থ বুঝতেও কষ্ট হয়, কিন্তু আমরা তা পড়ে বুঝি, সৃষ্টিকৗশলে এটি একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। অবশ্য এই বোঝার ক্ষমতা সব পাঠকের থাকে না।

কবিতা বা যেকোনো শিল্পকর্ম বোঝা, না-বোঝার ব্যাপারটিও যে এক কালেই শেষ হয়ে যায়, তেমনটি কখনোই বলা যাবে না। অনেক কবিতাই আমরা দেখেছি একটি বিশেষ যুগের মানুষ যেভাবে গ্রহণ করেছে, পরবর্তীতে তার পাঠ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এর কারণ প্রকৃত শিল্পমাত্রই বহুমাত্রিক। কবিতা শব্দশিল্প হিসেবে তা উচ্চমার্গের এবং সমস্ত শিল্পকর্মের মধ্যে কবিতাই একমাত্র মাধ্যম যা বিশ্ববীক্ষণের জন্য যে সবচে উপযোগী, একথা আজ অধিকতর স্পষ্ট হয়েছে। কবিতাই মহাকালের আরশি, যেখানে মানুষ তার ঠিাকানা খুঁজে পেতে পারে – একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

কবিতা যুগ ও জাতির শিল্পিত ইতিহাস, ঐতিহ্যের সরস সরোবর। মানুষের আন্তর-সংযোজনের এই যে অধিষ্ঠান কবিতা, এখানে তার মুখোমুখী হতে যে প্রাতিস্বিক নৈপুণ্য আর প্রস্তুতির অনুশীলিত আচরণ দরকার, তা অস্বীকার করলে কবিতা বোঝার ব্যাপারটি একেবারেই অবান্তর হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটাও ঠিক যে, কবিতার অনেক পাঠকই কবিতার অর্থ খুঁজে গলদঘর্ম হয়ে অবশেষে হতাশায় ভোগেন – এ ইতিহাস বিরল নয়। কবিতা বা যেকোনো শিল্পকর্মের অন্তরবিভাসকে ছেড়ে তার অর্থের জন্য অতিষ্ঠ হওয়া নিতান্তই নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক।

তাজমহল দেখে মানুষের ভাল লাগে, এই ভালোলাগার অর্থ কেউ খোঁজে না। খুঁজলেও তার সৌন্দর্যকে এড়িয়ে নয়। আসলে শিল্পের ক্ষেত্রে এই ভালোলাগার ব্যাপারটিই আসল যেখানে জড়িয়ে থাকে মানবিকীকরণের শর্তসমূহ নানা ভাবে ও ভঙ্গিতে।। আর যে কারণে সূর্যাস্তের অনন্ত বৈভব, সূর্যোদয়ের হিমেল পরশ কিংবা মধ্যরাতের জোছনামাখা অরণ্যের নৈঃশব্দ্য আমাদের কেবলই ভালো লাগে, কোনো অর্থ করে না। কবিতার অর্থ এবং তা বোঝা না-বোঝা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উক্তি: “হৃদয়ের অনুভূতিই কবিতার ভিতর দিয়া আকার ধারণ করিতে চেষ্টা করে। এই জন্য কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে, ‘ বুঝিলাম না’ তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে ‘কিছু বুঝিলাম না’ তাহাকে এই কথা বলিতে হয়, ইহা বুঝিবার কিছু নাই এযে কেবল গন্ধ।” (জীবন স্মৃতি)। পাবলো পিকাশোকে তাঁর আর্টের অর্থ জিজ্ঞেস করায় তিনি এরকমই বলেছিলেন যে, পাখির গানের অর্থ কী, অথবা ফুলের গন্ধেরই বা অর্থ কী। তিনি পরবর্তীতে বলেছিলেন, আমি সারাজীবন যা করেছি সব শিল্পকর্মই অর্থহীন। যাকিছু সুন্দর ও রহস্যময় তা অর্থহীন। আর উত্তীর্ণ শিল্পকর্ম অর্থহীন বলেই তা যুগে যুগে মানুষের কাছে নানান রকমের অর্থের প্রস্তাবনা রাখে, অর্থহীনতার ভাষায় উদ্দীপ্ত করে মানুষের সুদূরপেয়াসী নান্দিক চেতনা। আর্টের ক্ষেত্রে এ অর্থহীনতা অবশ্যই অর্থ বিমুখতা নয়। কোনো সুন্দরকে বিশেষ অর্থ দিয়ে বাঁধলে তার প্রাণপাখি নিঃশেষ হয়ে যায়, একথা আমাদের মনে রাখা দরকার। যাকিছু সহজেই অর্থ করে এবং একটির বেশি করে না, তা কোনো মহৎ শিল্পের অভিধায় পড়ে না। এ প্রসংগে মালার্মের উক্তি প্রণিধানযোগ্য: কবিতায় স্পষ্ট করে কোনো কিছু উল্লেখ করা মানেই কবিতাকে বেশির অংশ সংকীর্ণ করে ফেলা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কবিতা উচ্চমার্গের শিল্প হিসেবে তাকে অর্থের পাল্লায় মাপতে যাওয়া মানেই তার অনেকখানি সর্বনাশ করা।

যুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য সভ্যতায় মূল্যবোধের অবক্ষয়, স্পিরিচুয়াল ক্রাইসিস এবং যন্ত্রসভ্যতার চরম বিকাশ জীবনযাপনের সর্বৈব গতিকে জটিল ও অস্থির করে তোলে এবং ফলত সেই জটিলতা এবং যন্ত্রসভ্যতার ক্লেদগ্লানি, কৃত্রিম জীবনবোধের আবহ এবং পাশাপাশি মনোজগতের অন্ধকারে উদ্ভূত ঘূর্ণাবর্তই সাম্প্রতিক কবিতাকে জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে। তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় একটি বিপ্লব ঘটে যায়। রবীন্দ্রোত্তর এই কবিতায় সরাসরি পশ্চিমের দমকা বাতাস এসে লাগে। বিশ্বকবিতার সেই পালাবদলের কালে তিরিশের সেই পঞ্চপাণ্ডব বাংলা আধুনিক কবিতাকে নানাভাবে, নানা মাত্রিকতায় অনেকখানিই বিশ্বকবিতার পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই আধুনিকতাকে যেমন গালমন্দ করেছেন, তেমনি অন্তরে অন্তরে আশির্বাদও করেছেনে। যাহোক, সে-বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে, তিরিশি কবিতা তার উন্মেষকালে পাঠকের কাছে ছিল দুর্বোধ্য ও হোঁচট খাওয়ার মতো। কারণ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিশাল কাব্যসম্ভারে বাংলা কবিতার পাঠকদের একধরনের সম্মোহনের মধ্যে রেখেছিলেন। সেই সম্মোহনের বেড়াজাল ভেঙে নতুন কবিতাকে গ্রহণের ক্ষেত্রে পাঠকের সময় লেগেছে। নতুন কিছু গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ যে একধরনের মনোস্তাত্ত্বিক বাধার সম্মুখীন হয়, এই সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই বাধাটা এক সময় আপনা-আপনিই সরে যায় এবং বিপ্লবোত্তর সময়ের আস্বাদ মানুষ গ্রহণ করতে থাকে। এটি ঐতিহাসিক সত্য। তিরিশের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কবি হিসেবে আজকে যার সহজ পরিচিতি, সেই জীবনানন্দ দাশের সহজবোধ্য অনেক কবিতাই এত কঠিন যে তা ভাবনার জগতকে তছনছ করে

ফেলে। তিনি কবিতার আলোচনায় বলেছেন: ‘কবিতার অস্থি-র ভেতরে থাকবে ইতিহাস-চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ (কবিতার কথা)। আর এজন্যেই বোধ হয় কবিকে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতে হয়। কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে, কবিতার আঙ্গিক ও বিষয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে যে দুঃসাহসের দরকার হয় , সেই দুঃসাহস গড়ে উঠতে পারে মনে ও মেজাজে বিশ্বনাগরিক হওয়ার মধ্যে, মানসিকভাবে বিশ্ব-পরিব্রাজক হওয়ার মধ্যে। সুতরাং, কবিতার সৌন্দর্য ও রসকে ঘিরে যে শক্ত আবরণ তা কেবল আধুনিক শিল্পমানসসম্পন্ন পাঠকের পক্ষেই সরানো সম্ভব। আর সাধারণ পাঠকদের কাছে কবিতা দুনিয়াজোড়াই বিরক্তির কারণই বেশি। কারণ, কবিরা (প্রকৃত কবি) যতটা অগ্রসর মন ও মেজাজে, গড় পাঠক ততটাই পিছনে।

আসলে কবিতা হচ্ছে মানুষ ও জগতের আন্তরসম্পর্কের ছায়াছবি। এক একটি কবিতা এক একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যরে ছায়াছবি এবং সে ছায়াছবি মানবজীবনকে জগতের মধ্যে যে জটিল প্রক্রিয়ায় সংস্থাপন করে তা কি এত সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব? কখনোই নয়। কবিতার অর্থ বোঝা না-বোঝার এই চিরকালিন সমস্যার পাশাপাশি এ প্রশ্নও এসেছে যে কবিতা কী ; কারণ, শিল্পমাধ্যমের কোনো শাখাকেই যেমন উপযুক্ত সংজ্ঞার আওতায় কেউ কখনো আনতে সমর্থ হননি, তেমনি কবিতা কী, এ ব্যাপারটিকেও ভাসা ভাসা ছাড়া পরিপূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করতে কেউ সাহস দেখান নি। কবিতা সম্পর্কে অনেকেই, বোদলেয়ার, মালার্মে, র‌্যাবোঁ, পাউন্ড, এলিয়েটসহ রোম্যান্টিক যুগের ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কোলরিজও বিভিন্নভাবে তা চিনতে চেষ্টা করেছেন এবং আমাদেরকে তা জানিয়েছেনও বটে ; প্রশ্নটা হলো, তবু এই জানা কি আমাদের জন্য মূলত কোনো জানা, না আভাস পাওয়া মাত্র ? হ্যাঁ, দেড় হাজার বছর আগের সেন্ট অগাস্টিনের সেই উক্তিরই প্রতিধ্বনি করেছেন একালের অনেক কবিব্যক্তিত্ব যে, ‘ যদি জিজ্ঞাসা করা না হয় আমি জানি, আর জিজ্ঞাসা করা হলে আমি জানি না’ -এরকমই সত্য। তবে একথা ঠিক যে, কবিতা কী, তা পুরোপুরি না বলতে পারলেও আমরা এটুকু অন্তত বলতে পারি, কোনটা কবিতা এবং কবিতা কেমন। তবে এর এইখানেই শেষ নয়, নিরন্তর এগিয়ে যাচ্ছে এই কাব্যভাবনার সুকুমার নৌকোটি কাল থেকে কালের ঘাটে, বিভিন্ন সাজে ও সজ্জায় বিভিন্ন তাড়নায়, বিবর্তিত-পরিবর্তিত বাস্তবতার অভিনিবেশে।

কবিতার সংজ্ঞা এবং তা কী, এই প্রশ্নে Donal A. Stauffer -এর বক্তব্যই প্রণিধানযোগ্য: Not many among those few felt happy with their definition. Yet most of us have experienced poetry, and many of us believe that we can recognize it when we see it, just we can recognize life when we see it, although we can not satisfactorily define it. Like life, poetry exists in so many forms and on so many levels that it triumphantly defies definition.” (The Nature of Poetry)। সুতরাং কবিতা দেখে আমরা বুঝি যে এটা কবিতা , তবে তার স্বরূপ ব্যাখ্যার ব্যাপারটি অত সহজ নয়। কারণ, তার অধিষ্ঠান নানাভাবে, নানা রূপে-রঙে, নানা অনুষঙ্গে।  কবিতাজগতের ব্যাপকতা, বৈচিত্র্যময়তা এবং রহস্য আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানায় যে, এই জগতে প্রবেশের অধিকার সব মানুষের থাকে না। কবিতারাজ্যের অনেক অজানা তথ্য, আচার, ব্যাকরণ আবিষ্কার করে, জয় করে তার মূল সিংহতোরণ পর্যন্ত যত সহজে যাওয়া যায় তারপর যে যুদ্ধের প্রয়োজন হয় নগরে প্রবেশ করতে, সেই যুদ্ধে সবচে আধুনিক সমরাস্ত্র এবং সমরকৌশল নিয়েই অবতীর্ণ হওয়া দরকার। এ প্রসংগে একটি ব্যাপার জানিয়ে রাখি যে, পদ্য এবং কবিতা কখনো এ জিনিস নয়, অনেক সময় দৃষ্টির সংকীর্ণতায় আমরা এ দুটোকে আলাদা করে ভাববার অবকাশ পায় না। আমাদের আজকের আলোচনা পদ্য নিয়ে নয়, মূলত কবিতা নিয়ে।

কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশ লীনা’ নামের একটি কবিতা আছে যার ভাষিক আয়োজন অত্যন্ত পরিচিত এবং স্বচ্ছতায় উন্মুখর হওয়া সত্ত্বেও কবিতাটির মধ্যে অনেকখানিই না-বোঝার ব্যাপার রয়ে যায়, কিন্তু তা আমাদের কবিতার রসাস্বাদনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না। এ প্রসংগে বুদ্ধদেব বসুর বক্তব্য: “ষোল লাইনের এই কবিতাটি পড়ে আমরা ঠিক বুঝতে পারি না, এর নায়িকা মৃতা না বিশ্বাসঘাতিনী না কি কবিরই অপগত যৌবনের বেদনা এতে ধ্বনিত হচ্ছে- তা বোঝার প্রয়োজনও করেও না; কেননা ঐ ফিরে এসো আহ্বানের মধ্যেই অভাবের শুদ্ধ বেদনা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।” (বুদ্ধদেব বসু অনুদিত কালিদাসের ‘মেঘদূত’ -এর ভূমিকা, সংস্করণ ১৯, কলিকাতা পৃ. ৫১ )।

উক্ত ভূমিকায় তিনি আরো বলেছেন: “কবিতার কাছে আমাদের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এই যে তার একটি অংশ হবে অন্ধকার- obscure -যাকে আমরা কখনো বুঝে উঠতে পারবো না বলেই যাতে আমাদের আনন্দ কখনো নিঃশেষ হবে না।” (ঐ পৃ: ৬৮)। প্রকৃত কবিতার ডাইনামিজম-এর কথাটি যেমন আমাদের মনে রাখা দরকার, তেমনি একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, শ্রেণীকক্ষগুলোতে ছাত্রদের কবিতা বোঝানোর জন্য যে বক্তৃতা দেওয়া হয় অথবা যে নোট বই পড়ে ছাত্ররা কবিতা বোঝে, তা কেবল পরীক্ষা পাশ করার সহায়ক, এতে বরং কবিতার ব্যাপকতাকে খাটো করে দেওয়া হয়। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছাত্রদের কবিতাটিকে আলাদা করে ভাববার কোনো অবকাশই থাকে না। ফলে কবিতাকে টেক্সট হিসেবে পাঠের বিষয়টি ব্যাহত হয়। কবিতার অর্থকে বুদ্ধদেব বসু একটি বেগ বা গতির বেগ বলতে চেয়েছেন। তার মতে: “কবিতার অর্থ কৌটোর মধ্যে মুক্তোর মতো একটি নিশ্চল ও নির্দিষ্ট পদার্থ নয়, তা একটা বেগ, গতির বেগ, যা শব্দগুলোকে দূরে কাছে নিশেনের মতো উড়িয়ে দেয়, যাদের ইশারায় মন তার শক্তি ও শিক্ষা অনুসারে দূর থেকে দূরতরের দিকে চলতে থাকে।” (ঐ পৃ. ৬৯)।

কবিতায় যাকিছু ব্যক্ত হয়, তার চেয়ে অব্যক্তই থাকে বেশি ; এই লুকোচুরি এবং আলো-আঁধারীর ঘনিষ্ঠতম প্রত্যয়ই আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য। আধুনিক কবিতার আপাত-সরল বক্ষে লুকিয়ে থাকে যুগচেতনার নানামুখী অভিঘাত, যা কবিতার চেনামুখও করে তোলে অচেনা। তবে কবিতার কোথাও যেন রয়ে যায় একটি সূত্র বা কিছু কী-ওয়ার্ডস যা দিয়ে কবিতার সেই রহস্য ছোঁয়া যায়, তারপরেও তার অনেকখানিই থাকে অচেনা কিংবা অন্ধকার – সেইখানেই ভালো কবিতার পরিচয়। কবিতাকে বোঝার জন্য বিচিত্র অভিজ্ঞতার সাঁকো পেরুনো দরকার। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন: “কোন একটি অনশ্বর কবিতা প্রচুর অভিজ্ঞতা দাবী করে পাঠকের কাছ থেকে ; ভাসা ভাসা অর্থ পেরিয়ে উপলব্ধির আলোয় অর্থের অনমনীয় শিবত্বে পৌঁছনো দরকার।” (কবিতার কথা)। বুদ্ধদেব বসু কবিতা বোঝার ব্যাপারটিই অনেকখানি নাকোচ করে দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়েছেন কবিতার রস গ্রহণের ওপর এবং এই রস গ্রহণের ক্ষেত্রে কবিতা বোঝার বিষয়টি মোটেও জরুরি নয়। তিনি’ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ক্রন্দসী’ প্রবন্ধে সুধীন্দ্রনাথ ও বিষ্ণু দের কাব্যের ব্যাপারে বলেছেন:“ এঁদের রচনার কঠিন উজ্জ্বলতা আমার ভালো লাগে- যদিও স্বীকার করবো এঁদের কোনো কোনো কবিতা আমি ভালো বুঝতে পারি না। শক্ত হয়ে চেয়ারে বসে নানা পুথিপত্র ও অভিধান ঘাঁটলে তবে হয়তো এই জাতের কবিতা সম্পূর্ণ বোঝ যায়, কিন্তু সেই ধরনের ‘বোঝা’র উপরই আমার খুব বেশী আস্থা নেই, এমনকি কবিতার রস গ্রহণে সেটাকে অপরিহার্য বলে আমি মনে করি না। সত্যি বলতে, কবিতা, ‘বোঝা’টাই যে সমস্ত কথা, এমনকি মস্ত কথা, তা আমি মানতে ইচ্ছুক নই।” (কালের পুতুল: ২য় সংস্করণ ১৯৮৪ পৃ. ৬৭)।

দেরিদা থেকে আমরা জানি ভাষা সেই সীমাহীন বেলাভূমি যেখানে বারবার সমুদ্রের ঢেউ এসে পড়ে আর রেখে যায় অনেক চিহ্ন, শঙ্খ-শামুক ও অনেক কিছু। ঐতিহ্য ও প্রাচীনপ্রত্নের রেখাচিহ্ন ভাষায় সংস্থিতি পায় কবিতার মাধ্যমে এবং কবিতা-ই সেই বেলাভূমে রেখে যায় অনেক চিহ্ন ও মণি-মুক্তো,যা ভাষার দিগন্তকে আরো বিস্তৃত করে, এগিয়ে যায় তার অনন্ত যাত্রায়। তাই শেমাস হিনি যখন বলেন, ‘Poetry as divination; poetry as the revelation of the self to the self, as restoration of the culture to itself; poems as elements of continuity of aura and authenticity of archaeological finds, where the buried shard has an importance that is not obliterated by the buried city; poetry as a dig, a dig for finds that end up being plants.’ আমরা বুঝে ফেলি কবিতা শুধু শব্দ নয়, শব্দের সংসার নয় – এক বিস্তৃত বিস্তৃর্ণ প্রান্তরের আবিষ্কার, অতীতের হাড়-গোড়ের সন্ধানে খুঁড়তে থাকা অনেক অজানা প্রান্তর।

 ম্যাকনিসের ‘আ পোয়েম শুড নট মিন বাট বি’ অথবা আরো অনেক শুদ্ধবাদী কবি-সমালোচকদের বক্তব্যকে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলা যায় কবিতা অর্থ করে, এবং একটি বা দুটি করে না, অনেক রকমই করে এবং একই কবিতার পাঠ-অর্থ-ব্যাখ্যা সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় এবং কোনো কোনো কবিতার অর্থ আমরা সারা জীবনেও বুঝে উঠবো না – এ সবই সত্য। তবে এই অর্থ করা না-করার ঊর্ধ্বে আমাদের যা ভাবতে হবে তা হলো – সেটা আমাদের নান্দনিক চেতনায়, উপলব্ধির গভীর ভূমিকে নাড়া দেয় কিনা, প্রথাগত ছন্দ-লয়ের ঊর্ধ্বে আলাদাভাবে ব্যঞ্জিত কিনা, তাতে ভাষিক আয়োজনের অভিনবত্ব আছে কিনা।

***

কবি পরিচিতি

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম। জন্ম  ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবে কবিতার জগতে প্রবেশ। পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :  দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯),  ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প (২০০৬), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল (২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া (২০১৪), দীর্ঘশ্বাসের সারগাম (২০১৬)।

প্রবন্ধগ্রন্থ:  কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯), রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩), কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E