৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ১৮২০১৭
 
 ১৮/০৬/২০১৭  Posted by

টানাগদ্যে লেখা ১০ টি কবিতা
– কামরুল ইসলাম


ফিরে এসো জলের হাত ধরে প্রত্ন-গভীরে

ভুল ও ফুলের দিকে হেলে পড়ছে হাইব্রিড কই; অদৃশ্য পাথরগুলো হাত-পা নেড়ে উঠে আসছে ঘরে,সখিনা খাতুন ভুল ভুল পাথরগুলো কাঁচা আম ভেবে কুড়োচ্ছে দুহাতে, আঁচল ভরে উঠছে রসে ও রঙে- তখন আমিন কবিরাজের দোকানের পাশের নৈ:শব্দ্য এসে জানিয়ে দিচ্ছে- সবগুলো ভুল নিয়ে ফুল হবার দিন তোমাকে ডাকছে,ফিরে এসো জলের হাত ধরে প্রত্ন-গভীরে… তখন গানের ভেতরে ধীবর ও বণিক, মাঝি ও মাল্লা, স্বপ্নের অদূরে ভূমিহীন ছায়া, তখন আধো আলো আধো অন্ধকারে সখিনা খাতুন, আমিন কবিরাজ কিংবা ভুল ভুল পাথর ভুলে যায় অতীতের চেনা-জানা সমস্ত গল্প, দিন ও রাত্রির জ্যামিতিক রীতি; এভাবে ফুটে-ওঠা আলোর মধ্যে ভাঙা চাঁদের গান- আমরা হেভি রকের চারণিক পাথরগুলোতে অনুপদ্যের গন্ধ পাই- জলদশ্যুর মৃত ইচ্ছের দিকে জেগে ওঠে বনফুল কিছুটা পড়ন্ত বর্ষার ক্রিয়েটিভিটি; বাতিঘরের মেঝেতে একটি পথিক-মাকড়সা নিজস্ব মৃত্যুর রকমারি নিদ্রার ফ্রিকুয়েন্সি থেকে শিখে নিচ্ছে জালবুননের কায়দা-কানুন, সেখানে কতিপয় গোয়েন্দা পাতার ওড়াউড়ি রান্নাবান্নাব আয়োজন; দেয়ালে ময়ূরপঙ্খী নাও ঝুলিয়ে যুবতীর আত্মহত্যার মহাপ্রস্তুতি- বটের ঝুরিনামা সন্ধ্যায় নিভে আসে নদী ও নারীর ঢেউ-মাখা চন্দ্রিলা গীতি, আর আমি অঘ্রানের রাতের শেষ প্রহরে বন্ধু মহীনের ক্ষুধার্ত ঘোড়াগুলো সাথে নিয়ে চলে যাই নিজেদের আস্তাবলে, খেতে দিই কচি কচি শ্যামাঘাস – ওরা খায় আর কুয়াশার দিকে চোখ তুলে তাকায়, রাত কিংবা প্রত্যুষের দোটানায় আমরাও ছুটে চলি কখনো সময়ের দিকে আবার কখনো সময়হীনতার মসলা বনে যেখানে পড়ে আছে কতিপয় ঘরের নকশা, নবুয়তের ফুল, মাতাল সময়ের আহাজারি; দূরে দেখি পান্থজনের ডাক- ফিরে এসো জলের হাত ধরে প্রত্ন-গভীরে…আমি ফিরি না, ফিরে গেছে মহীনের ঘোড়াগুলো কুয়াশার ফালি ফালি স্রোতে-


হাসিফুল, ব্যাকুল পরানে

তোমার প্রতিভার সুতো জড়িয়ে যায় মনে আর খটখট শব্দ ওঠে ব্যাকুল পরানে, তখন যাই- বাঁধ ভেঙে যাই, দুহাতে কুড়ায় বিরহ-ব্যথার আমলকি আর হরিণের নি:সঙ্গ চোখের সুদূরতা। দাঁত বসিয়ে দেখি সেখানে তুমি নেই, আছে এক নির্জন নদীতট, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যার কেটেছে অনেক বছর লাল নীল সুতোর দখলে। জিহ্বায় ওঠে আমলকি স্বাদ, ভিজে ওঠে প্রাণিত সময়,বারান্দায় তোমার প্রতিভার সুতো উড়ে উড়ে জগৎ মাতায় আর অবিরল কান্নার মতো বৃষ্টি নামে বনকচুর পাতায়,সেই বৃষ্টি যেন দ্বিতীয় জীবনের প্রবচন; আমি বলে উঠি- হে জল তুমি প্রার্থনা হও, তখন তুমি নত হতে হতে প্রজন্ম-শরীরে গেঁথে নাও নির্জন বনের ছায়া আর প্রার্থনা কান্নার জলে বিকশিত হয়- তখন গঙ্গারিডে, মনের আঙিনায়, কতশত পুরনো জাঙলায় ফুল ফোটে- হাসিফুল; তোমার প্রতিভার জৈবগুণে আজো দেখো উজাড় বনে বনে বিরহ নামে নমিত মস্তকে যেন কোনো অচিন সাধুর সুদীর্ঘ তন্দ্রায় জড়ানো পোস্টার দুধেল ফাল্গুনে খুঁজে ফিরে হারানো ভোর; একদিন শিশিরের স্রোতে ভেসে গেছে শিমূল ও পলাশ পয়মন্ত শূন্যের ভেতরে, কেউ কোনো শব্দ করেনি, কিংবা শব্দহীন অন্ধকারে একটি নগ্ন শহর দুবাহু বাড়িয়ে ধরতে চেয়েছে দুপুরের সবটুকু বিষাদ ও বিন্যাসে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসের পরিশ্রান্ত পথ-; মাকে দেখি মৃত নদীর হারানো ভাষায় ডেকে যাচ্ছেন অজস্র হারানো মাছের নাম- আসে না ছন্দের ছায়া দুকুলে গো সই, শুধু দেখি হাসিফুল ব্যাকুল পরানে নিখিলের দাঁড় টানে পুঁইমাচা তলে- ধুয়ে নিই দৃষ্টির ব্যামো অশেষ ফাল্গুনে-


মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া

ওরে জল অতল বুঝে চল বধূয়ার ঘরে…

ঘরের চেয়ে ঘাটের দিকে ফুটছে তোমার মুখ ; মাসিমার শাড়ির আঁচলে বর্গী এলো দেশে’র প্রবচন, যারা নিভে গেছে রাতভর, যারা জোয়ার আসরে পটকা মাছের রসায়ন নিয়ে ভেবে ভেবে সাবাড় করেছে রাতের সবটুকু অন্ধকার তাদের প্রতিবেশী মেঘেরাও জানে ধুতরো-মাকালের সানন্দ উপস্থিতি কোনো নিরাময় নয় ; ভোরের শুকনো নদী- কিছুটা উৎসবের মতো, একটি নরকঙ্কালের চোখের অতলে দর্শনের স্রোত, এমনই হেমন্তে উড়ে এলো একটি লোলচর্ম ফুটবল বিবিধ সুতোর জাল বেয়ে বেয়েÑসবাই বললো- চিয়ার্স! নগদই ভালো! তখন হয়তো বেড়ে উঠছে জল-হাওয়ার গতি…এমনতর লিগামেন্ট ছেঁড়া কান্নার মিছিল- বানমাছের যাওয়া-আসা এসবই মুখস্থ হোক ; বাজিয়ে যাও বাজারের ফর্দ,কমিউন ঢোল আর কোনো পূর্ব পুুরুষের ট্যাবু ও ট্র্যাডিশন ছুঁয়ে ভোর হয়ে ফুটে থাকা অসংখ্য তরঙ্গধ্বনি, নিভে-যাওয়া দ্রোহ, জলের গল্পের সব ঢাউস পূর্ণিমা ,জনশ্রুতির বোল; মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া- যেন কেউ চোখের পিঞ্জর থেকে তুলে নেয় বনেদী ঘুম আর লাজুক বণিকের পিয়ানো থেকে ঝরে পড়ে সময়হীনতার ধ্বনিপুঞ্জ যার খড়খড়ি নড়ে না আর বোধের হ্ওায়ায়- ঝিঁঝিটের বন্যতা সেকথাই বলে দেয় প্রত্যুষে; এই টেক্সট শনিচক্রের ওপারে বয়ে যায় – চাপাতির ঘায়ে অস্থির মানচিত্রের সেলাইয়ের দিকে কে যেন মানবতন্ত্রের আরশি ঝুলিয়ে কিশোরীর চোখে শরিষা বীজের তেল আছে ভেবে সবাক বিষে রান্না করে পুরনো পথগুলো দ্বান্দিক জ্বরে…আমাদের ঘর থেকে উড়ে গেছে বটপাতার সম্ভ্রান্ত চিঠিগুলো লাল নীল হাওয়ার সন্ন্যাসে- এই নিয়ে বাঁকাচোরা ঝড়ে কেঁপে ওঠে অসমাপ্ত মন-


ঘুণপোকাদের প্রোপেলারটুকু জেগে থাকে শুধু

যাওয়া কি হলো সিংহদুয়ারের কাছাকাছি, কিংবা কোনো রূপকথার স্বপ্নদোলা পাহাড়ে ? প্রতিদিনই যেন ট্র্যাজিডির ঝোলা কাঁধে সফোক্লিস বাৎস্যায়নের কুটিরে এসে কাটিয়ে যায় মন-খারাপের সময়টা সাদাসিদে পোশাকে আর গেয়ে যায় অনন্ত সাধনার কোরাস যেন কাঠঠোকরার ঠোঁট বেয়ে শিল্পআঁচড় অপরাহ্নের হাটে- মনে করো, এসবই তোমার অন্তর্দেশে রচিত কাব্য ,তোমারই জাংলায় ওঠা বিষাদ বনায়ন, ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়া শবছায়া- ; যার দিকে বাড়িয়েছ হাত, সে কি জানে মেঘতাড়িত মানুষ কেন স্মৃতিশালায় ঘুমিয়ে থাকে হাত-পাখার নিবিড় চিকিৎসায় ? সে কি জানে ভেতরে ভেতরে গোপন রাজারা প্রজাদের কাছে কী কী চায় ? চর্যাচোখের বৃষ্টির ভেতরে হেঁটে হেঁটে কতিপয় পাথর-কন্যাদের ঘুম ভাঙিয়ে ফেরার পথে দেখি – ভেতরে আর কিছুই থাকে না ,ঘুমের শহরে অ্যাবোরশনের হিড়িক, ঘুণপোকাদের প্রোপেলারটুকু জেগে থাকে শুধু…


ব্যাঘ্রক্রেসির চাঁদোয়ার নিচে

 

খুব সকাল সকালই রাজপথে ঘুরে বেড়ানো বাঘের চোখে তুলে দিয়ে সমস্ত ঘুম আমরা ব্যাঘ্রক্রেসির চাঁদোয়ার নিচে সম্মিলিত অনিদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়ি সহসাই। করাতের চকচকে দাঁতের ফাঁকে কৃষ্ণচূড়া ফোটার দৃশ্যে মাতোয়ারা হই, বায়োস্কোপ দেখি আঙুলের ডগায়- দেখি কাঁকড়াদের হসপিটালিটি- অ্যাক্রোব্যাটসও; এই সব দৃশ্যে আমাদের মাতাল বৈঠা জলের অতলে চন্দ্রাহত নাবিকের সাথে পিয়ানোয় ডুবে যায় হাওয়ারা সংগ্রামে নামে- জগতের ঘামে ভাতের সানকি চুপসে গেলে দাঁড় ভাঙে দরিদ্র ইকোলজি- জেগে ওঠে কসমো-লিরিক জন্ম-শিশিরে। সাবানের ফেনায় মন ধুয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়ায় পবিত্র পাবলিক, তখন গরু ও ঘাস কিংবা উগরাসি হয়ে ছিঁড়ে যায় পালকের মিড়, ব্যাঘ্রক্রেসির মূল তরিকায় ভেসে যেতে থাকে মানকচুর ঝাড়, বনেদি মৃত্তিকাসহ। উন্মাদ কবিয়াল ককরোচের স্নায়ুর নিচে ঘুমোতে থাকে পরমায়ুর আধুলি-সিকি হাতে, ভুঁইফোড় গণরোষের দিকে ঘরের পাড়ামো হুগো শ্যাভেজের মতো নুয়ে পড়ে কর্কটে, খড়কুটোর সান্দ্র ডায়েলেকটিক্স কিছুটা সকালের মৃত বাহন, ডেথজোনের সিঁদূরে মেঘের পড়শি-; এরকমই সংগ্রাম ও ত্রাসে এবারও মাসিমারা সাজঘরে বাজাবে সানাই-


আব্দুস সাত্তার মোহন্ত উড়ে উড়ে চলে যায়

 

মৃত্যু কি তাহলে অসহ্য ঘুমের সন্ত্রাস যা আমরা বহন করে চলেছি দিন ও রাত্রির সবগুলো প্রহর , জলে ও ডাঙায়…?

একদিন সে নিভে যায়- আব্দুস সাত্তার মোহন্ত, সমস্ত অস্থিরতা ভেঙে উড়ে যায় ভেদবুদ্ধি দিশা ,একদিন রূপের কলস ভেঙে ঘাসে ঘাসে ভরে যায় অঙ্গের নদী…;
আব্দুস সাত্তার মোহন্ত উড়ে উড়ে চলে যায় নিমতলী শ্মশান পেরিয়ে, স্নানের ঘাটের হৈচৈ ছেড়ে জন্মের অসমাপ্ত জাল ছিঁড়ে বৈদেহী ডানায়। পাখির পোশাকে তার লেগে আছে মেঘ-ভাঙা জল, অসামান্য কুয়াশার ধ্বনি-
আব্দুস সাত্তার মোহন্ত, আপনি বুঝলেন- মৃত্যু কী দীর্ঘ ছুটি যার চৌকাঠে জমে আছে একটি না লেখা গল্প, যেখানে একটি নদী তার ভাঙনের ভেতর খোলস ছেড়ে ছেড়ে লতাপাতায় ভরিয়ে তুলছে বায়োনিক ঘুমের শহর আর একটি পথ মাথা উঁচু করে দেখছে সেই দৃশ্য-; মোষ-বাথানের ময়াল সন্ধ্যায় তিনি আব্দুস সাত্তার মোহন্ত
একদিন গাভীদের দুধেল উৎসবে মেতে উঠেছিলেন, গেয়েছিলেন মৃত্যু ও সেই বিষয়ক কোনো শবকাহিনি কিংবা কোনো মাছরাঙার বিবাহবার্ষিকীর পরিশুদ্ধ গীত;
দুধেল মন্ত্রে তিনি নদীর নাভীতে চড়ে নেচেছিলেনও শোনা যায়। আব্দুস সাত্তার মোহন্ত উড়ে যাচ্ছেন দূর আসমানের পুলিশ ফাঁড়ির দিকে যেখানে একটি বাবলা কাঠের চকিতে শুয়ে আমেনা বেগম পাকা নিমফল চুষে চুষে খাচ্ছেন আর তাড়াচ্ছেন কিছু স্বর্গক্লান্ত মাছি ও মশা; অসহ্য ঘুমের সন্ত্রাস ছন্দহীন সংকেতের টানেল বেয়ে অন্ধকারে শেষে..


কাঁঠাল কাঠের খাট

 

কাঁঠাল কাঠের খাটে শুয়ে থেকে সারারাত আমি থোকা থোকা কাঠালের ঝুলে থাকার মধ্যে ধর্মপুরের পথ-ঘাটগুলো দেখেছি। একদিন আমাদের ধর্মপুরে গাভীন গরুদের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছিল, মনে আছে সেইদিন স্কুল-পালানো দুপুরগুলোও কাজী পেয়ারার পাতাদের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সটান দাঁড়িয়েছিল আমারই পাশে। আমাদের মক্তবের মৌলভী যিনি ‘দুররু মুক্তা’-র আওয়াজ শুনতে শুনতে লুঙ্গি উঁচিয়ে নদী পার হতেন ,তিনি সেই দৌড় প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করে বলেছিলেন- গাবতলায়ও যেতে হয় অন্য কোনো জন্মের খোঁজে। এই কথা শোনার পর আমাদের কাঁথাগুলো সুতোর কৈশোরে ফিরে গেলে কাঁঠাল মুচির শুকিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও গোচরীভূত হয়, কাঁঠাল কাঠের খাটটি তখন মগডালে দেখি- মগডাল মানেই তো পূর্ণদাস বাউল, গোলেমালে পিরিতের দিনে মনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাশি রাশি অপূর্ণ ঘুম; গাভীন গরুদের দৌড় পড়ে থাকে ধর্মান্ধ ধুলোয়, মক্তবের খড়ের চাল থেকে উড়ে গেছে কয়েকটি চড়ুই , সুগন্ধি কাঠালের দিকে মহৎ কার্পেন্ট্রি…


কাঁচপাত্র ভেঙে পড়ার মতো এই সুখ

 

হরহামেশাই মৃত্যুর ভেতর ঢুকে পড়ি- এ-ই আমার খেলা। মৃত্যুর অদূরে ঘোমটা দিয়ে দাঁড়ায় আমার একটুখানি আকাশের ছায়া, আমি সব সবজিমাখা মাঠের অবিচুয়ারির প্রচ্ছদগুলো ছিঁড়ে-ফেড়ে ঢুকে পড়ি মৃত্যুর খাঁচায়, আমার ছায়াসঙ্গিনী ঢোকে না,সে বসে থাকে এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন হাতে আমারই উদ্বাস্তু করোটির ভাঁজে ,মরণের নেশা তারে ধরে না। আমার ছায়াসঙ্গিনী মৃৎপাত্র হাতে ভিক্ষুকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে আমার চোখ চুঁইয়ে ঝরে পড়া একফেঁটিা মরণজলের আশায়- যখন উড়াল গাঙের মাঝিরা ঘরে তোলে ছেঁড়া পালের হাওয়া, ঘুমের অতল পাটাতন চিরে যায়, ভিজে ওঠে সমস্ত বিকেল- এমনই এক শরতের সন্ধ্যায় এই মরণ, কাঁচপাত্র ভেঙে পড়ার মতো এই সুখ আমি কাঁধে নিয়ে সারা পাড়া ঘুরি আর পড়শিদের জানিয়ে দিই:‘ মৃত্যুও তোমারই চরণ কখনো কখনো…’


আকাশের মেলোড্রামায় কান পাতি

 

বৃষ্টি ঝরলে মনে হয় আমি রঙধনু নিয়ে খেলছি আর রঙধনুর রঙের মধ্যে সাঁজিয়ে যাচ্ছি লেমনজলের শূন্য বোতলগুলো আদ্রতা বুঝে। আকাশের অঝোর কান্নায় তুলোপাখির অধরা মুখ দেখি কিংবা সেই কবেকার ফেলে আসা কিশোরীর টিয়েপাখি চোখ; এমন দিনে আমি পাঠ করি সাঁঝবেলা গোধূলির আলোয় আর দেখি – ওপারে উনুন¬ জ্বালিয়ে কীভাবে বালিকা-শ্রাবণ রেঁধে যায় অপূর্ণ খোয়াব মেঘে ও মসলায় জালনৃত্যের প্যাঁচে। আজও মানকচুর পাতারা অভিমানী সবুজের বুকে ধরে আছে টলমলে স্মৃতি, মরণের জটাজাল থেকে উঠে এসে আকাশের মেলোড্রামায় কান পাতি: তখন আঁধার জড়ানো শৈশব, তখন নিমসন্ধ্যার হাওয়ায় মেঘবতী নদীর কোথাও পালের নৌকো বেয়ে ছুটছে আমার সরল প্রতীকের কৈশোর, অতঃপর মেঘে মেঘে জমে যায় সাকল্যে দুটো মাছ ভাসানের জলে, বৃষ্টি কি ভাসিয়ে নেবে পুরনো কাপড়গুলো সেলাইয়ের কলে?

১০
বিশুদ্ধ রঙের পাখি

 

পাখি আমার দেহ রাঙায় মনও রাঙায় আকাশ-রঙা ডানায়…

নর্তকীর পোশাকে নূপুর পাযে ধীরে ধীরে নেমে আসা সন্ধা যখন ডানা মেলে ঢেকে দেয় গোলাবাড়ি গ্রামের নিরীহ পথ-ঘাট, বাড়ি-ঘর, মিস্ত্রিবাড়ির পুরনো কড়ইগাছ ,ঘাটে পড়ে থাকা নবীর জেলের ভাঙা-চোরা ডিঙি নাও এবং সুতোনলী সাপের মত সেই প্রিয় পথ যা শেষ হয়েছে রানুদের পুকুর ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিমগাছের গোড়ায়- সব সবই ঢেকে যায় সন্ধ্য-নাচের অজস্র মুদ্রায়। ‘বিশুদ্ধ রঙের পাখি’ নামের কবিতাটি সেদিন সেই মৃদুমন্দ বাতাসের মতো বয়ে চলা নাচের স্রোতে হাত-ফসকে পড়ে যায় আর সেই সাথে এই গ্রামের সমস্ত গাছথেকে বাসাসহ পাখিরা, সেই সন্ধ্যায়, একটি করে পালক তাদের ডানা থেকে খসিয়ে আমার চারদিকে ওড়ায় এবং পালক-স্নানের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য ধারণ করে সেই পাকুড়গাছ, যার তল দিয়ে হেঁটে গেছে কত সব কষ্টমাখা সময় ও সমাজ…


কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

জন্ম : ১ নভেম্বর ১৯৬৪ , কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামে
পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা, বর্তমানে রাজশাহী
সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : দ্বিধান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে ( ১৯৯৯ )
ঘাসবেলাকার কথা ( ২০০১)
যৌথ খামারের গালগল্প ( ২০০৬ )
সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮ )
চারদিকে শব্দের লীলা ( ২০১০ )
অবগাহণের নতুন কৌশল(২০১১)
মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া(২০১৪)
দীর্ঘশ্বাসের সারগাম(২০১৬)
বিহঙ্গখচিত লন্ঠন (২০১৭)

প্রবন্ধ:
কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য (২০০৯)
রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত(২০১৩)
কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব(২০১৫)
Edited Book :
Green Fogs: A Collection of Contemporary Bangla Poetry ( 2017 )

e-mail : kamrulislam1964@gmail.com

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E