৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ২৪২০১৭
 
 ২৪/০৩/২০১৭  Posted by

কবিতার শক্তি, কবিতায় সম্মোহন
– বীরেন মুখার্জী

যে ধরনের কবিতায় আমার সর্বাধিক আসক্তি, তেমন কবিতা যে সব সময় মেলে, তা নয়। এর পরও গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ায় ‘বার বার পাঠযোগ্য’, ‘মহৎ কবিতা’র কাছ থেকে জীবনের পাঠ নিচ্ছি। আবার অল্পবিস্তর কবিতা লেখার মাধ্যমে ‘লব্ধ অভিজ্ঞতা’ কবিতার শরীরে সঞ্চালনেরও চেষ্টা রয়েছে। কবিতাযাপনের ঘোরে কখনো মনে হয় ‘কবিতার রহস্য’ জীবন-রহস্যের ক্ষুদ্রতম অংশ ধারণে সক্ষম; আবার কখনো এর বিপরীত বোধও ভাবায়। প্রশ্ন করি, কে বেশি রহস্যময়-কবিতা না-কি জীবন? কোনটির শক্তি বেশি? হতে পারে, জীবনের বহুমাত্রিক কৌতূহলের মীমাংসা রয়েছে কবিতায়। কিংবা, জীবনই এক শক্তিশালী ‘রহস্যকবিতা’। কবিতা পাঠে সব কবিতা-ই যে আমাকে টেনেছে তেমন নয়। কেন টানেনি, সর্বজনগ্রাহ্য সে ব্যাখ্যায় আমি অপারগ। কেননা, উপলব্ধির পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ-প্রকাশ অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, অনুভবের অনুবাদ করতে যাওয়া বৃথা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পাঠক টেনে রাখার ‘শক্তি’ হয়তো ওই কবিতাগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত কিংবা এমনও হতে পারে, ওই কবিতার শক্তি উৎঘাটনে আমার অক্ষমতা সুপ্রচুর। আবার এ-ও মনে হওয়া অযৌক্তিক নয় যে, কবিতা পাঠে যদি বৃহত্তম অর্থে জীবনদর্শনের অনুভূতি না জাগে, বোধে উত্থাপিত জিজ্ঞাসার সূত্র দিতে অসমর্থ হয়, তাহলে সে রচনাটি কি আদৌ কবিতা? কিংবা এমন কবিতা বার বার পাঠের তালিকায় উঠে আসার যোগ্যতা ধরে কী! শব্দ দিয়ে কবিতা রচিত হলেও কবিতায় ব্যবহৃত শব্দসমবায় যদি নতুন চিন্তার জন্ম না দেয় কিংবা পাঠকের চেতনাকে শব্দাতীতে নিয়ে যেতে অক্ষম হয়, তাহলে সেরূপ রচনা ‘মহৎ কবিতা’ হতে পারে? তাই এতো দ্বিধা, এতো সংকোচ নিয়ে কবিতা পাঠ করতে হয় আমাকে।

‘সামনে কুয়াশা,
পেছনে কুয়াশা,
মাঝখানে স্পষ্ট এই আমি।
তবু
সামনে যে আছে
– তার কাছে
পেছনে যে আছে
– তার কাছে
আমিও কুয়াশা!’

কবিতাটির বাস্তবতা নিরেট, কোনও ভেজাল নেই। শব্দগুলোও পরিচিত, সাদামাটা। মানুষ কুয়াশার মধ্যে বিষয়টি উপলব্ধি করেন। কিন্তু কবির মতো করে এর আগে কেউ কি এমনটি ভেবেছেন? উত্তর নিশ্চয় ‘না’ হবে। উল্লিখিত কবিতায় ‘কুয়াশা’ আর ‘স্পষ্ট’ শব্দ দুটি পাঠকের মনোলোকে নিরন্তর অভিঘাত সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ‘কুয়াশা’ শব্দটির প্রয়োগগুণেই কবিতাটি জীবনদর্শনের আধার হয়ে উঠেছে। পাঠক কবিতাটির নানামাত্রিক অর্থও হয়তো খুঁজে পাবেন। সুজিত সরকারের এই কবিতাটি যে ‘মহৎ কবিতা’ সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। আসলে কবিতা ‘বোঝা না বোঝা’ কিংবা ‘টেনে রাখতে পারা না পারা’র ভাবনা ও জিজ্ঞাসার অভিঘাত থেকেই ‘কবিতার শক্তি, কবিতায় সম্মোহন’-এর ক্ষেত্রটি অন্বেষণের প্রয়াস।


শুরুতে ‘বার বার পাঠযোগ্য’ এবং ‘মহৎ কবিতা’ শব্দবন্ধ দুটি উল্লেখ করেছি। এবার বিষয়টির গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করা যায়। যে কবিতা প্রতিবার পাঠে নতুন জিজ্ঞাসার জন্ম দেয় কিংবা, বলা যায় নতুন নতুন অর্থের প্রকাশ ঘটে, তেমন কবিতাগুলো পাঠে বিস্ময়াভিভূত না হয়ে উপায় থাকে না। একজন তরুণ কবির কবিতা তুলে ধরে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক-  

চৈত্রের রূঢ়তা ছিঁড়ে ডেকেছে কোকিল
কোথায় আমার শব-জেগে উঠি ফের;

পাতার শিরায় আঁকা এই কার মুখ
ধূলি ও ঘূর্ণির তোড়ে তুলে আনো স্মৃতি?

গত বছরের নাকি নিহত দিনের
এই অস্থি, কঙ্কালের উপর দাঁড়ালে-

তুমি ডেকে ওঠো, ডাকো-আমাকে লুণ্ঠনে!
                               (কোকিল/জাহিদ সোহাগ)

কবিতাটির গূঢ়ার্থে জীবনের, যাপনের ‘স্বাভাবিক রোমন্থন’ মনে হওয়া অমূলক নয়। চৈত্রে কোকিল ডাকার ঘটনা প্রাকৃতিক। এতে কবির কী? কিন্তু কবির বোধ যখন কোকিলের স্বর এবং চৈত্রের মলিনতা ছুঁয়ে জীবনকে স্পর্শ করে, জীবনের ভেতর প্রবাহিত হতে থাকে বৃহত্তর জীবনের দিকে- তখন পাঠকের চিন্তার কোষ খুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। চৈত্রের নিদাঘ খরা-যন্ত্রণা তো জীবনেরই পরিপূরক। প্রকৃতির জীবনঘনিষ্ট এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে কবি যখন নিজের ‘শব’ অšে¦ষণ করেন, তখন কবি রূপকার্থে জানান দেন ‘গভীর রহস্যের’। পাঠক জীবনকে স্পর্শ করতে থাকেন। দৈনন্দিন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে পাঠক মেলাতে চেষ্টা করেন কবিভাষ্যের। কে ডাকে, কোন স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, কোন মুখ ভেসে ওঠে ‘পাতার শিরা’ রূপকে মনের ক্যানভাসে- একটু সচেতন হলেই তা বোধগম্য হতে পারে। কবি তার জীবনোপলব্ধির নির্যাস বোধের রসায়নে খেলিয়ে কোকিলের ডাক-কে যখন ‘চৈত্রের রূঢ়তা ছিঁড়ে’ ‘লুণ্ঠনের উদ্দেশ্য’ করে তোলেন তখন তা ইতিবাচক অর্থে পাঠকের মননে শুধু চৈত্র নয়, ফাগুনের বার্তাবহ হয়ে ওঠে। এই ইতিবাচকতা কবিতাটিকে সার্থক করে তোলে, কবিতা হয়ে ওঠে। প্রকৃত প্রস্তাবে কবিতার ‘হয়ে ওঠা’ সামগ্রিক একটি ব্যাপার। কবিতা হয়ে উঠতে ব্যর্থ হলে সে শব্দভাষ্য শব্দজঞ্জালে পরিণত হয়। জঞ্জাল যে শক্তিহীন- তা বলার অপেক্ষা রাখে না, যেখানে শিল্প কালের রুচি ধারণ করেই প্রবহমান। ‘কবির ধ্যান’ যেমন কবিতার হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে, তেমনি কবিতায় সম্মোহন সৃষ্টিতেও কবির ধ্যানলব্ধ অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকুর প্রয়োজন অস্বীকারের সুযোগ থাকে না।

সমাজের একক মানুষ হিসেবে কবি প্রথমত তার আস্তিত্ত্বিক প্রয়োজনে উৎকর্ষ খোঁজেন। নিজেকে ‘কবি’ করে তোলার প্রয়াস চালান, যার সূক্ষ্ম একটি ‘স্ট্রিম’ কবিতায় ভাস্বর। ব্যাপকার্থে কবিতার একটা সনাতন অস্তিত্বও রয়েছে। আছে স্বয়ংক্রিয়তা। আবার স্বয়ংক্রিয়তার মধ্যে একটা ‘ডায়েনামিক্স’ আছে। যা রহস্য ধারণ করে। যে রহস্য মানুষকে ভাবায়, হাসায়, কাঁদায়, উন্মাদ করে, আত্মস্থ করতে সহায়তা করে। কবিতার ডায়েনামিক্স যখন মানুষকে ‘এমোটিভ’ স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তখনই তৈরি হয় প্রয়োজন বোধ। কিন্তু সবার কবিতা কি সেই এমোটিভ স্তরে উত্তরণ ঘটে? বোধ করি ঘটে না, এজন্য জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। এ বক্তব্যের সপক্ষে আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘উত্তরসাধক’ কবিতাটির শেষ পঙক্তি ‘অমিতসম্ভাব্য কবি ভালবাসে একার সন্ন্যাস’ বিবেচনায় নিলে ‘কবির ধ্যান’ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ থাকে না। কবিকে পেয়ে গেলে কবিতার ‘হয়ে ওঠা’ অনেকটাই সহজ হয়ে পড়ে। আর ‘জীবনের জন্য শিল্প’ কথাটি কবিজীবনে ওতপ্রোত হয়ে যে কবিতার জন্ম হয় সে কবিতা চিত্তাকর্ষক না হয়ে পারে না। আমার ক্ষুদ্র পাঠাভিজ্ঞতায় এ বিষয়টিই মুখ্য।


কবিতায় ‘কনফ্লিক্ট’ তৈরি একটি বিশেষ ধারণা। এ প্রক্রিয়া শুধু কবিতার রসাস্বাদনেই নয়, বরং কবির চিন্তার স্বচ্ছতা, বহুমাত্রিকতা, সৌন্দর্য চেতনা, মানবিকতা ইত্যাদি ইতিবাচক প্রপঞ্চের নিরিখে নিবিড়। এ প্রসঙ্গে ফরিদ কবিরের ‘ট্রেন’ কবিতাটি থেকে পাঠ নেয়া যেতে পারে-

ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল
মাঝপথে, অচেনা স্টেশনে

মানুষ যেখানে যেতে চায় সেটাই কি গন্তব্য?
নাকি, তারা যেখানে নামে?
নাকি, গন্তব্যই খুঁজে নেয় তার নিজস্ব মানুষ!

বিহ্বল স্টেশনে নেমে আমরাও ভাবি-
এখানেই কি নামতে চেয়েছি
নাকি, ট্রেনই নামিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের
এই ঘন কুয়াশারাত্রিতে!
              (অংশবিশেষ)

গন্তব্য, ট্রেন, মানুষ, স্টেশন-এই শব্দ চারটির মাধ্যমে কবি অদ্ভুত এক খেলায় মেতেছেন। কবিতাটির মধ্যে গন্তব্য সংক্রান্ত যে দুল্যমান দ্বিধা, কবিতাটি পাঠের ভেতর দিয়ে তা পাঠকের ভাবনায় অনায়াসে ঢুকে পড়ে। টিএস এলিয়ট হয়তো এ বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতেই মন্তব্য করেছিলেন- ‘প্রকৃত কবিতা পাঠ মাত্রই সঞ্চারিত হয়’। ফরিদ কবিরের কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক দোলাচলে পড়েন প্রকৃত গন্তব্য নিয়ে। আত্মঅভিমানিও হন ‘এখানেই কি নামতে চেয়েছি/নাকি, ট্রেনই নামিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের/এই ঘন কুয়াশারাত্রিতে’। কবি-অভিজ্ঞানের বহুবিধ মাত্রিকতা পেরিয়ে পাঠক হয়তো তার নিজস্ব গন্তব্যের সন্ধান পেয়ে যান, কিংবা পান না- তাতে কিছুই এসে যায় না। কবির সংশয়পূর্ণ অভিব্যক্তি কবিতাটিকে ব্যঞ্জনাঋদ্ধ করে। কেননা, সংশয়, দ্বিধা ও সন্দেহের মাঝ দিয়েই উৎপত্তি হতে পারে পরিপূর্ণ দর্শনের। এই দর্শন-গন্তব্য খোঁজার আশায় পাঠক যে কবিতার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন, এ ঘটনা কি কবিতার সম্মোহন-শক্তির পরিচায়ক নয়? কবিতার শক্তি সম্পর্কিত আরও একটি কবিতা-

অন্ধকার
সত্য শুধু, আলোর জিজ্ঞাসা
বাকি সব-
অন্ধকার।

কবিতাটির প্রথম লাইনে একটি মাত্র শব্দ ‘অন্ধকার’। অন্ধকার অর্থবহ এবং ব্যঞ্জনাধর্মী একটি শব্দ। তবে জীবনানন্দ দাশ যেভাবে তার কবিতায় এ শব্দটির নানামাত্রিক ব্যবহার করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘অন্ধকার’-কে ‘মৃত শব্দ’ আখ্যা দেয়া যেতে পারে। আবার শব্দটির যথাযথ প্রয়োগেই কেবল এর ব্যাপকতা নিশ্চিত হতে পারে। এটা মনে রেখে যে, ‘প্রকৃত কবির হাতে মৃত শব্দ প্রাণ ফিরে পায়’। তখন পাঠক যে যার মতো অন্ধকারের সঙ্গে যাবতীয় অশুভ’র সাদৃশ্য খুঁজে নিতে পারেন। অন্ধকারে আলোর আকাক্সক্ষা একমাত্র সত্য বলেই প্রতীয়মান। যেখানে শুভ-অশুভ’র সাংঘর্ষিক দিক নিয়ে ভাবনা জন্মে। অন্যদিকে আলো-অন্ধকারের ভেদরেখায় স্পষ্ট হয় বিরোধাভাস, যা গভীর এক চিত্রকল্পেরও জন্ম দেয়। পরবর্তী লাইন ‘বাকি সব-’। লাইনটির শেষে দীর্ঘ হাইফেন পৃথিবীর সব কিছুর সঙ্গে এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রাখে আলো-অন্ধকার বা শুভ-অশুভকে। শেষ লাইনে শুধু ‘অন্ধকার’, এর পর পূর্ণচ্ছেদ টানা হয়েছে। অর্থাৎ, সব কিছুই অন্ধকারময়। কবিতাটিতে যতি চিহ্নের ব্যবহারসহ শুধু নিরেট সত্যভাষণই নয়, এর অন্তর্গত দর্শনও জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত। বার বার পাঠে এ কবিতা থেকে নানামাত্রিক অর্থ পেতে পারেন পাঠক। আবার-

Take my dream
sew it, wear it,
a dress.

You made yesterday
sleep in my hands,
leading me around,
spinning me like a moan
in the sun’s carts,
a seagull soaring,
launched from my eyes.

সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সটোমার (Tomas Transtromer) এর A Mirror for a dream (স্বপ্ন-আয়না) কবিতার প্রথম স্তবকটির পাঠ আগে নেয়া যেতে পারে। অতি সাধারণ কিছু শব্দ দিয়ে কবিতার স্তবকটি রচিত। এটার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়-আমার স্বপ্ন নিয়ে সেলাই করে পোশাকের মতো পরো। আবার একজন প্রকৃত অনুবাদক (কবি-অনুবাদক) এ স্তবকটিকে ভিন্ন ভাবেও উপস্থাপন করতে পারেন। আমার চেষ্টা এরকম-স্বপ্ন নাও আমার/সেলাই করো, পরো/পোশাকের মতো। প্রকৃত প্রস্তাবে কবিতার শক্তি এবং কবিতায় সম্মোহন খুঁজতে নতুন যুগের জিজ্ঞাসার উৎস খোঁজাও প্রাসঙ্গিক। কেননা, কবিতায় এ বিষয়টি গভীর রেখাপাত করে। যে কারণে কাল থেকে কালান্তরে বিবর্তিত হয়ে মানুষ কবিতার কাছেই আশ্রয় চায়। আর কবিতাকে শেষ পর্যন্ত কবির বিশুদ্ধ কল্পনা এবং মৌলিক চিন্তার যুগ্ম স্বাক্ষর হয়েই উঠতে হয়।


‘কবিতা অনন্ত শক্তির উৎসধারা’-বোদ্ধাদের অভিমত এমন। বাংলা সাহিত্যে এমনকি বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটেও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় কবিতা সম্পর্কিত আলোচনাও সর্বাধিক। কবিতার সংজ্ঞা দাঁড় করানোর চেষ্টাও কম হয়নি। এর পরও কবিতার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা মেলে না। যে কারণে নিবন্ধে উল্লিখিত ‘বার বার পাঠযোগ্য’ কবিতা এবং ‘মহৎ কবিতা’ কীভাবে শনাক্ত হতে পারে, তা একটি প্রশ্ন হতে পারে বৈকি। কবিতার নানামাত্রিক আলোচনায় পাওয়া যায় ‘কবিতা উপলব্ধির জন্য পাঠ প্রস্তুতির’ বিষয়টিও অঙ্গীভূত। অনেক আলোচক উল্লেখ করেছেন, নানাবিধ শিল্প-প্রপঞ্চ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা ছাড়া কবিতার শতভাগ মর্মোদ্ধার অসম্ভব। কেননা, শিল্প বোঝার জন্যই শিল্পের নানা আঙ্গিক, ইতিহাস, প্রকাশভঙ্গি এবং প্রকরণ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। কেবল হাজার হাজার কবিতা-পাঠই কবিতা বোঝার জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আলী আহসানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি ‘শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘একটি শিল্পকর্মের জন্য শিল্পীর জীবন এবং বিশ্বাসকে আমাদের জানা প্রয়োজন, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত জানা প্রয়োজন, শিল্প-সৃষ্টির সময়কালে দার্শনিক এবং নন্দনতাত্ত্বিক উপলব্ধি প্রয়োজন, সঙ্গে সঙ্গে শিল্পরীতি এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞানের প্রয়োজন।’ মোহাম্মদ নূরুল হকের ‘কবিতার নানাদিক’ প্রবন্ধেও সৈয়দ আলী আহসানের উপর্যুক্ত যুক্তির প্রতিধ্বনি মেলে। ‘মিথ-পুরাণ-রূপকথা-উপকথা-প্রবাদ-প্রবচনের উৎপত্তি ও প্রায়োগিক কৌশল; ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞানের সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য-ভূগোলের সম্পর্ক; রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ও সমাজনীতির পারস্পরিক সংঘাত ও সমন্বয় এবং ছন্দ-অলঙ্কার’ ইত্যাদিকে তিনি কবিতা অনুভব-উপলব্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক অনুষঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মোহাম্মদ নূরুল হকের যুক্তির প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ থেকে উদ্ধৃতি টানছি-

হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার
এবার গুটাও ফণা কালো লেখা লিখো না হৃদয়ে;
প্রবল ছোবলে তুমি যতটুকু ঢালো অন্ধকার
তারও চেয়ে নীল আমি অহরহ দংশনের ভয়ে।

মুছে দেবো আদ্যাক্ষর, রক্তবর্ণ অনার্য প্রাচীন।
বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত কর কলাবতী
জানতো না যা বাৎসায়ন, আর যত আর্যের যুবতী।

অপ্রস্তুত মন নিয়ে কিংবা শিল্পের অন্যান্য শাখা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না নিয়ে ‘সোনালি কাবিন’-এর মর্মোদ্ধার সম্ভব কি? আল মাহমুদের কবিতার বোধ প্রাচীন অনার্য সভ্যতার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আধুনিকতায় উত্তরণ ঘটেছে। কবিতার প্রাথমিক পাঠে হৃদয়ঘটিত অনুভূতি পাখা বিস্তার করলেও তা শেষ হয় মানবসমাজের বিবর্তনের ইঙ্গিত জারি রেখে। মিথ-পুরাণ, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, পরিবেশ, সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি জীবনানুগ ও প্রাকৃতিক বিষয় আত্মস্থ করে তিনি তার নির্যাস তুলে ধরেছেন কবিতায়। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, মর্মমূলে ‘ঐতিহ্যচেতনা এবং কালজ্ঞান’ পুষ্ট বলেই আল মাহমুদের কবিতা হয়ে উঠেছে যেমন জীবনঘনিষ্ট, তেমনভাবে রসোত্তীর্ণ এবং কালোত্তীর্ণও। জীবনানন্দ দাশও প্রকৃত কবির ‘ঐতিহ্যচেতনা এবং কালজ্ঞান’-এর গুরুত্বারোপ করেছেন। আল মাহমুদ কবিতাটি রচনা করেছেন অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চালে। কবিতায় ছন্দও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কবিতাটি সে কথাও সগৌরবে জানান দেয়। ফলে আমার মনে হয়েছে, শুধু কবিকেই অভিজ্ঞ হলে চলে না, বার বার পাঠযোগ্য এবং মহৎ কবিতা শনাক্ত করতে হলে পাঠকের পাঠ প্রস্তুতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।


অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, ‘কবিতা’ হলো কবি ও পাঠকের ভাবনা-বিনিময়ের মাধ্যম। এই বিনিময় যেমন চৈতন্যের সঙ্গে বিষয়ের, তেমন ঘটনাপুঞ্জের সঙ্গে সময়ের এবং কল্পনার সঙ্গে মনীষার। এই বিনিময় শিল্পের সঙ্গে শিল্পমননের। ফলে কবির সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক দূরবর্তী হলেও ‘শুদ্ধতম কবি’ শিল্পিত ঐক্য রক্ষা করেই পাঠকের অন্তরে প্রবেশ করেন। একজন কবি বহুল ব্যবহৃত শব্দের নবায়ন করতে সচেষ্ট থাকেন। প্রকৃত কবির হাতেই শব্দের পরিবর্তন সাধন এবং নতুন শব্দের প্রবর্তন ঘটে। শব্দের বহুমাত্রিক প্রয়োগগুণে পাঠক-মনে অভিঘাত সৃষ্টি করে। সে অভিঘাত কবিতাকে করে তোলে পাঠকের আগ্রহের বিষয়। তখন পাঠকের সামনে মুখ্য হয়ে ওঠে উপলব্ধি। একজন প্রকৃত কবি শিল্পের মৌল দায় অস্বীকার করতে পারেন না।

যাওয়া বলে কিছু নেই, সবই ঘুরে ফিরে আসা
শূন্যতায় মাথা কুটে ফিরে আসে সমস্ত সংলাপ
সব শীৎকার চিৎকার
বিশাল রণপা-য় চেপে
প্রাচীন গোধূলি ফিরে আসে,
নীলিমা-ভ্রমণ শেষে ফেরে পাখি,
নদী, তারও গতি নয় শুধুই সাগরে
সেও মেঘে মেঘে ঝরনার নিকটে ফিরে যায়।
তবু
একবার চলে গেলে
নারীরা ফেরে না।
                              (নারীরা ফেরে না/অরুণাভ সরকার)

অরুণাভ সরকারের কবিতাটি স্বাগত সংলাপ বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পাঠকের সামনে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে তিনি যে ‘বাণীভঙ্গি’ সৃষ্টি করেছেন, তা তার বক্তব্যের গভীরতার কারণেই রহস্যময়তার জন্ম দেয়। ‘যাওয়া বলে কিছু নেই, সবই ঘুরে ফিরে আসা’- এই সাধারণ পঙ্ক্তিতে তিনি তার বক্তব্যের স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকত্ব তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ‘নদী’র সঙ্গে ‘নারী’র প্রবহমানতাকে উপজীব্য করে এমন ক্ষতদীর্ণ হৃদয়ঘোর সৃষ্টি করেছেন, যা কবিতার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুলাংশে। মহৎ কবিতার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘নাটকীয়তা’। নাটকীয় গুণ এই অর্থে যে, সব শ্রেষ্ঠ কবিতাই নিজস্ব জীবনসম্পদে সমৃদ্ধ, যা পাঠে পাঠক নিজের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে সাময়িকভাবে হলেও পরিহার করে পঠিত কবিতার জীবনপ্রবাহে আত্মসমর্পণ করেন। এই বিবেচনায় সঞ্চরণশীল জীবনসম্পদেরও প্রাচুর্য রয়েছে কবিতাটিতে; যা পাঠককে টেনে নেয়ার, চালিত করার ক্ষমতা রাখে বলেই প্রতীয়মান হয়। এ বক্তব্যের সপক্ষে জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতা উল্লেখ করা যেতে পারে-

আলো-অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে!
স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!
                           (অংশবিশেষ)

জীবনানন্দ দাশ কী বলতে চেয়েছেন, পাঠকের চিন্তাকে কোন তুরীয়লোকে উঠিয়ে দিয়েছেন তা সাধারণ পাঠকের অনেক সময় অনুভববোধ্য নাও হতে পারে। তবে দীক্ষিত পাঠক নিশ্চয় উপলব্ধি করেন, কবিতাটি বার বার পাঠে নতুন নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে সক্ষম এ কবিতাটি। কবিতাটি হয়তো আপাত বিবেচনায় সরল কিন্তু বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অভিব্যক্তি উচ্চমার্গীয় চিন্তাবেষ্টিত; যার সঙ্গে প্রোথিত রয়েছে কবির নিঃসঙ্গতা, দর্শন এবং মনস্তত্ত্ব। কবিতায় চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি নির্জনতা এবং মনস্তত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চিত্রকল্প চিত্রের অধিক বাস্তবতা কিংবা নান্দনিকতাকে ফুটিয়ে তোলে। কোলরিজ বলেছেন, একজন কবির ক্ষমতা, প্রতিভা ও শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের মাপকাঠি হলো, তিনি কতদূর অভিঘাত সৃষ্টিকারী চিত্রকল্প নির্মাণে সক্ষম; যা কবির শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর করে। পাশাপাশি কবিতার চিত্রকল্প শুধু পাঠককে নির্মল আনন্দেই সিক্ত করে না, পাঠক মানসচক্ষে এক অনন্ত জগৎকে অবলোকনের সুযোগ পান। তিনি শনাক্ত করতে সক্ষম হন তার কাক্সিক্ষত কবিতাটির। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসের শেষে’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে-

… চোখের বিশ্বাসে নারী, স্বেদে চুলে, নোখের ধুলোয়
প্রত্যেক অণুতে নারী, নারীর ভিতরে নারী, শূন্যতায় সহাস্য সুন্দরী,
তুমিই গায়ত্রী ভাঙা মনীষার উপহাস, তুমি যৌবনের
প্রত্যেক কবির নীরা, দুনিয়ার সব দাপাদাপি ক্রুদ্ধ লোভ
ভুল ও ঘুমের মধ্যে তোমার মাধুরী ছুঁয়ে নদীর তরঙ্গ

পাপীকে চুম্বন করো তুমি, তাই দ্বার খোলে স্বর্গের প্রহরী।

সুনীলের কবিতায় শব্দ ও চিত্রকল্পের ব্যবহার, সাবলীলতা, ছবি আঁকার মুনশিয়ানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে তার কবিতার সম্মোহনী শক্তি। মহৎ কবিতা ‘অনন্তশক্তির’ উৎস, এ ধারণা এবং বিবেচনার পাশাপাশি মহৎ কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ছন্দস্বাচ্ছন্দ্য। কবিতাকে রসঘন, শ্রুতিমধুর এবং সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্যও ছন্দ গুরুত্বপূর্ণ। কবিতায় ব্যবহৃত ধ্বনিসুষমা পাঠককে উপভোগ করতে ছন্দ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। শক্তিমান কবির কৃতিত্ব এখানে যে, কবির প্রায়োগিক কৌশলে কবিতার আলঙ্কারিক মাহাত্ম্য বাড়ে। শব্দের অর্থান্তর, পৌনঃপুনিক ব্যবহার এবং নতুন শব্দ গঠনের মাধ্যমে কবি সৃষ্টি করেন স্বতন্ত্র স্বর। পাঠকও মুক্তি পান গতানুগতিক কবিতাযাপন থেকে। বদরে মুনিরের ‘হেমাঙ্গিনী ব্রিজ’ কবিতা থেকে একটি পর্ব তুলে ধরছি-

বিনির্মাণের সাবলীল সন্ন্যাসে
আমাদের ছিল স্বপ্নখচিত ডানা
মাঝরাত্রির ক্রন্দনে ভরা ছিল
কৃষ্ণচূড়ার অভিলাষী সামিয়ানা,

বদরে মুনিরের ‘হেমাঙ্গিনী ব্রিজ’ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত; যার চলন রয়েছে ৬+৬+২ মাত্রার। তবে এ কথাও ঠিক যে, শক্তিমান কবি নিরূপিত ছন্দ অস্বীকারের ক্ষমতা রাখেন, প্রচল ছন্দ ভেঙে ছন্দশাসনসাপেক্ষে কবিতা রচনা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কবি আরোপিত ছন্দের দ্যোতনা থাকাও আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যথার্থই বলেছেন, ‘শব্দকে ব্যবহার করবার এক রকমের গুণপনা, ভাষার মধ্যে যা কিনা অন্যবিধ একটি দ্যোতনা এনে দেয়।’ ফলে কবিতাপাঠে ‘কাব্যিক দ্যোতনা’ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলে সে কবিতা পাঠকের বার বার পাঠযোগ্য কবিতার তালিকায় উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়।
প্রকৃত প্রস্তাবে, ‘কবিতা একটি ইশারাভাষা, যা উদ্ভাবিত কল্পনা ও নান্দনিক মিথ্যার ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে, নবতর উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার উদ্ঘাটনের মাধ্যমে পৌঁছে যেতে চায়/ পৌঁছে যায়: সত্যের সবচে নিকটতম বিন্দুতে।’ কবিতা নিয়ে কবি রহমান হেনরীর এ বক্তব্যের আলোকে তারই ‘আগাম রূপকথা’ কবিতাটির পাঠ নেয়া যেতে পারে-

তখন, এক মরুভূমির মধ্যে,
ওরা লাগিয়ে দিলো প্লাস্টিকের গাছপালা;
জর্ডান নদীর মত একটা সমুদ্রজলে ছাড়লো- খেলনা মৎস্যাদি,
ঝাঁকঝাঁক কাগজের পাখি ভাসিয়ে দিলো হাওয়ায়, আসমানে-
ওরা সাফল্যের দিকে লাফিয়ে উঠলো স্বপ্নজঙ্ঘায়;
সে কী উল্লাস! সুরেলা গীত ও নাচ,
থামতেই চায় না: ‘সুজলা-সুফলা-সবলা-অবলা… আহা হা, হাহাহা, বাজিমাত…’

তারপর- এলো এক প্রলয়ংকরী ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ঢল-

বলার অপেক্ষা রাখে না, কবিতাটি ইশারাবাহী। একজন দীক্ষিত পাঠক একটু গভীরে গেলেই আগামীর বিবর্তিত দিনগুলোর সন্ধান পেয়ে যাবেন। কবি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বর্তমানে দাঁড়িয়ে তিনি পাঠকের সামনে ভবিষ্যতের দৃশ্যকল্প তুলে ধরেন। কবি রহমান হেনরী বলেছেন- ‘কবিমাত্রেই ইশারাভাষি গল্পকথক (storyteller), যিনি শুধু সূত্র ও ইঙ্গিত তুলে ধরেন, গল্পটা বানিয়ে নিতে হয় রসগ্রাহি পাঠককেই।’ পাঠক এবার ‘আগামীর রূপকথা’ থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ গল্পটা বানিয়ে নিন আর বলুন, কবিতাটি কেন মহৎ কবিতা কিংবা বার বার পাঠযোগ্য কবিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে না।  


সর্বোপরি বলতে চাই, কবিতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিবেচনা আমার ব্যক্তিগত, অভিজ্ঞতাজারিত। আমি ‘বার বার পাঠযোগ্য’ কবিতার তালিকায় সেই কবিতা রাখতে চেষ্টা করি, যা আমাকে প্রতিবারের পাঠে নতুনভাবে রসসিক্ত করতে, নতুন ইশারা দিতে সক্ষম। মহৎ কবিতার বৈশিষ্ট্যও এমনটি হওয়া সঙ্গত। কবিতায় যদি জীবনঘনিষ্ঠতা শিল্পঘনিষ্ঠতা উদ্ভাবনঘনিষ্ঠতা এবং উপস্থাপনঘনিষ্ঠতা না থাকে তাহলে কবিতা রচনায় যে ইজম-ই কবি ব্যবহার করুন না কেন, অনন্ত শক্তি বহনে তা অক্ষম; এমন কবিতা একবার পাঠেই পুরনো হয়ে পড়ার সম্ভাবনা শতভাগ। এ জাতীয় কবিতা কিছুতেই মহৎ কবিতার মর্যাদা পেতে পারে বলে মনে হয় না। কবিতা শব্দনির্ভর তবু তার ইঙ্গিত ও আভাস অফুরন্ত না হলে, শব্দের জাদুতে অন্তঃস্থলের সুপ্ত বোধ ও অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হলে সে কবিতা আমার পাঠের তালিকায় উঠে আসার যোগ্যতা রাখে না। আমি সেই কবিতার পাঠক, যার কাব্যিক সম্মোহন স্পর্শ করবে, যার ঘ্রাণে উজ্জীবিত-উজ্জ্বল হবো, ইশারায় বিচলিত হবো এবং যার শক্তিতে প্রাণবন্ত হয়ে নতুন চিন্তার স্রোতে ভেসে যাওয়ার সাহস পাব। আমার কবিতাযাপন ও কবিতায় আশ্রয়, জীবনের অন্তরালের অসহ্য বেদনা সঙ্গী করে অন্তহীন স্রোতে ভেসে যাওয়ার লোভকে গতিশীল করতে।

তথ্য সহায়তা

১. কবিতা কেন কবিতা : সুজিৎ সরকার
২. শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য : সৈয়দ আলী আহসান
৩. কবিতার কী ও কেন : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
৪. কবিতার নানাদিক : মোহাম্মদ নূরুল হক
৫. কবির অন্তর্লোক : বীরেন মুখার্জী
৬. উদ্ধৃতি সংশ্লিষ্ট কবিদের কবিতা

* “কবিতার শক্তি” গ্রন্থ থেকে গৃহীত।

কবিতার শক্তি

কবিতার শক্তি

প্রাবন্ধিক পরিচিতি

বীরেন মুখার্জী

বীরেন মুখার্জী

বীরেন মুখার্জী। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৯, মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার দরিশলই গ্রামে। কবিতায় নিবেদিত বীরেন মুখার্জীর পেশা সাংবাদিকতা। বর্তমানে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

কবিতাগ্রন্থ: উদ্ভ্রান্ত সময় (১৯৯৮, কলকাতা), প্রণয়ের চিহ্নপর্ব (২০০৯), প্লানচেট ভোর কিংবা মাতাল বাতাস (২০১১), নৈঃশব্দ্যের ঘ্রাণ (২০১২), পালকের ঐশ্বর্য (২০১৩), মৌনতা (দীর্ঘকবিতা ২০১৩), জলের কারুকাজ (২০১৪), হেমন্তের অর্কেস্ট্রা (২০১৬)।
গল্পগ্রন্থ: পাগলী ও বুড়ো বটগাছ (২০১৬)।
প্রবন্ধগ্রন্থ: কবির অন্তর্লোক ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১২); সাহিত্যের প্রতিপাঠ (২০১৪); কবিতার শক্তি (ছোট কবিতা, ঢাকা, ২০১৭)।
সম্পাদিত প্রবন্ধগ্রন্থ: বাংলা কবিতায় ঐতিহ্য (সম্পাদনা ২০১৪)।
সম্পাদিত ছোটকাগজ: ‘দৃষ্টি’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪। ১৬টি সংখ্যা প্রকাশিত)

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E