৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ০৯২০১৭
 
 ০৯/০৪/২০১৭  Posted by

কবিতা, আরোগ্য হাসপাতাল
– মামুন মুস্তাফা

কবিতা কী প্রার্থনার সঙ্গীত? এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার থেকে বরং এটাই মেনে নেয়া শ্রেয় যে, মানুষের মনের ভেতরে আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের না বলা গুমরে ওঠা কথার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হলো কবিতা। মূলত সমাজ, রাষ্ট্র এবং এর চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ আর মনোজাগতিক ক্রিয়া থেকেই কবিতার উদ্ভব। বলা যায়, কবি তাঁর অন্তর্গত তাগিদ থেকে কবিতা লেখেন। আর কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে কবিতাই যথেষ্ট। এতে কবির কোনো দায়বোধ থাকে না। কেননা পূর্বেই বলেছি কবিতা গড়ে ওঠে চারপাশের আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পরিম-লের সাযুজ্যে।

কোন্ অজানার পানে কবি তাকিয়ে থাকেন? সৃষ্টির কোন্ দিকে? সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের ভেতরেও যে কবিতা লেখা হয়- তার রং খুব নিঃসঙ্গ! ওই বোধের দেয়ালে বার বার হোঁচট খায়- ‘কবিতার অধিবাস’। তবু প্রায়শই তাকে তর্কবিতর্কের মীমাংসায় উপস্থাপনের চেষ্টা থাকে একজন কবির। হ্যাঁ, পরাজিতও হতে হয় কখনো বা। তখন রোদের ঝাঁঝ আর মায়ার মুখ- দুই-ই যেন দেখেছি কবিতার মধ্যে। তবু কবিতা কবিকে ছেড়ে যায় না। বেদনায় ঝরে যাওয়া রক্তফোঁটা, হাড়-অস্থিমজ্জার অসাড়তায়ও কবি অতিক্রম করে কবিতাযাপন- ওই চেতনার বেদনায় উৎকীর্ণ কবিতা তখন কবিকে স্বস্তি দেয়, সংসারের সকল গ্লানি থেকে মুক্তি।

কবিতা কখনো কখনো ঘোরের মধ্যে রাখে। প্রকৃত অর্থে আসলে কবিতা কি? তবে কী অদৃশ্য কোনো শক্তির ইশারা কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়? তাই তো কবিতা কারো কারো কাছে প্রার্থনার সঙ্গীত। শ্লোগান সর্বস্ব উচ্চকিত কবিতা তার নিজস্বতা হারায় বলে মনে হয়। তবে সময়-সচেতন কবি তাঁর স্বকাল-সংকটকে ধারণ করবেন ঠিকই কিন্তু তা ইঙ্গিতাশ্রয়ী কবিতার মাধ্যমে। কেননা কবি কখনো সমাজসংস্কারক হতে পারেন না, তাঁর লেখা কেবল অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে মাত্র।

একজন কবির প্রতিনিয়ত নতুন কবিতা লেখার আকাক্সক্ষা থাকে, কিন্তু কবিতার  পালাবদল ঘটবে অহরহ, ভাঙচূর করতে হবে, এমন কোনো প্রতিজ্ঞা নিয়ে একজন কবির কখনো কবিতা লেখা উচিত হবে না। কবিতা সহজাত। মনের খেয়ালে কবিতার শব্দ, বাক্য নিয়ে খেলা করেন কবি। এই সৃষ্টির ভেতরে ভাষা, গঠনশৈলীর ক্ষেত্রে যেটুকু পরিবর্তন লক্ষণীয় তা কেবল আধুনিকতা ও বর্তমান সময়কে ধরার প্রয়াসমাত্র। তবে একথা সত্য যে, সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় কবিতার বিষয়, ভাষাভঙ্গি ও চিন্তাচেতনার সমস্ত কিছুই। আর এসবের ভেতর দিয়েই একজন কবি নিজস্ব কণ্ঠস্বর নির্মাণে ব্রতী হন। এটা নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট জীবনাভিজ্ঞতা থেকে লেখা ওই কবির কবিত্বশক্তির উপর। ফলে একজন কবির কবিতা সেটি অর্জনে কতটুকু সক্ষম হয়েছে তা আগামী-ই নির্বাচন করবে, এটাই সত্য।

যদি কবিতা প্রার্থনার সঙ্গীত হয়ে থাকে, তবে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ হচ্ছে আদিম সঙ্গীত। কেননা সুর সৃষ্টির মাধ্যমে কবিতাই হয়ে ওঠে গীতিকবিতা। সুতরাং কবি একে লালন করেন নিজস্ব অনুভূতির বলয়ে- যেখানে কেবল নিঃসঙ্গতা নয়, এমনকি প্রেম-সংঘাত, আনন্দ-দুঃখ-কষ্ট নয় বরং ব্যক্তির দর্শনসঞ্জাত দৃষ্টিভঙ্গি বলে দেবে এই বিশ্বব্রহ্মা-ে তার অবস্থান। যার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রিকতা। সেই সূত্র আবিষ্কারের পথ ধরেই ইংরেজি সাহিত্যের পালাবদলের মধ্য দিয়ে কালক্রমে বাংলা কবিতাও চর্যাপদ-উত্তর ‘অন্ধকার যুগ’, ‘মধ্য যুগ’ ‘রাবীন্দ্রিক যুগ’ পেরিয়ে ‘কল্লোল যুগ’-এ এসে আধুনিকতার নতুন মাত্রা পেল। তিরিশ-উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের কবিতাও পেল আগামীর পথনির্দেশিকা।

মানবজীবনের আশা-আকাক্সক্ষায় নির্ণিত জীবনবোধের উৎসারণ থেকে কবিতা মূলত পার্থিব সংসারযাত্রায় একজন ব্যক্তিমানুষের মনোজলোকে ঘটে যাওয়া আর্থ-সামাজিক বিবর্তনগুলোর সারনির্যাস। যেখানে সংকেত ও চিত্রকল্পের আড়ালে উঁকি দেয় পারিপার্শ্বিকতা, নিজস্ব বোধ ও অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে ওঠে সমাজনির্ণিত পরিবেশ ও প্রতিবেশের সামষ্টিক সংকট। আর তখনই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও অসহায় রক্তক্ষরণের দলিল হয়ে ওঠে একজন কবির কবিতা। দীর্ঘ সংসারযাত্রা, আশা-স্বপ্নভঙ্গের ছাইভস্ম, তার ভেতরের যে অনুরণন- এসব কিছু নিয়ে জীবনের জটিল বিন্যাসে জর্জরিত ব্যক্তিসত্তার ক্লেশ-নৈরাশ্য ও এক ধরনের দার্শনিক অন্তর্মুখীনতা ছাপিয়ে ওঠে একটি আদর্শ কবিতার শরীরে।

সেই বাল্য-কৈশোরে কবিতা পাঠ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে এইমাত্র লিখিত কবিতাও পাঠ করে চলেছি প্রতিনিয়ত। আর তাই যখন আধুনিক-অনাধুনিক বিষয়টি সামনে এসে দাঁড়াল। সেই তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে উঠলেন চিরআধুনিক। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিকতার আরেক চূড়ায় দাঁড় করালেন কবিতাকে তাঁর সাম্যবাদী চেতনার গভীরে। এরপর কবিতার বিষয়-বৈভবে নানা মাত্রায় ধরা দিলেন তিরিশের পঞ্চপা-ব- জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু এবং বিষ্ণু দে। মূলত তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় জনমানুষের জীবনাচারণের অনুষঙ্গগুলো তাঁদের কবিতার গঠন, প্রকরণ ও স্বাতন্ত্রিকতা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল। আর এই সকল প্রথিতযশা কবিগণের রচনার ভেতর থেকে আবিষ্কৃত হলো কবিতার নির্বাণ।

জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘এখনকার বাংলা কাব্যে যে কালের জিজ্ঞাসামুক্ত কবিতা নেই তা নয়’। কিন্তু তারপরও তিনি তাঁর সময়কালের বাংলা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। যেহেতু তাঁর মতে, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি’। আর তাই সৎ ও মহৎ কবিতার সৃষ্টির (ও আলোচনার) দিকে ঝোঁক ছিল তাঁর। আমাদের সাম্প্রতিক কবিতায় সেই সততা বা মহত্ব কতটুকু তা বিবেচনার বিষয়। কবিতার বাঁকফেরা চরিত্রের মাধ্যমে আধুনিকতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটলো তিরিশের প্রধান কবিদের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে বিশেষত ’৪৭-এর দেশভাগের পর বাংলাদেশের কবিতা কতখানি এগুতে পেরেছে তাও ভাববার বিষয়।

কিন্তু আমরা বিশ এবং একুশ শতকের সন্ধিক্ষণে এসে দেখতে পাই বিশ্বব্যাপী সাহিত্য-সংস্কৃতির সকল স্তরেই যুগ-পরিবর্তনের বেপরোয়া হাওয়া লেগেছে। সেই পরিবর্তনশীল অস্থির পরিবেশে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের কবি বা কবিতাও হয়ে উঠেছে সৃজনচঞ্চল এবং নতুন কাব্যরূপ সন্ধানে এ-পর্বের কবিরা সক্রিয়। তাই এ সময়ের কারো কারো কবিতায় বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। কেননা এই সময়ের কবিদের মধ্যে আমরা লক্ষ করি শুরু থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার আকাক্সক্ষা। ফলে এ-সময়ের কবিতায় দেখা যায় কাব্যভাষা, শৈলী, প্রতীক ও চিত্রকল্পের প্রচলিত পরিকল্পের প্রতি অনাস্থা। নতুন কাব্যচারিত্র সন্ধানের লক্ষ্যে অনুষঙ্গের রূপবদল এবং বর্তমান সচেতনতা, দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশ্নে পূর্বানুগামিতা আর অতিমাত্রায় আত্মমুখী ও আত্মকেন্দ্রিকতা।

তবে জীবনানন্দ দাশ যে মহৎ কবিতা সৃষ্টির প্রতি জোর দিয়েছিলেন, তা লিখতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক অভিজ্ঞতা ও পড়াশোনা। সাম্প্রতিক কবিতার প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে এই সময়ের কবিদের অধিক পাঠাভ্যাসের কোন বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ের কবিগণ তাঁদের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টির দ্বারাই একদিন বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দরজা খুলে ফেলতে পারবেন।

তবে এ কথা সত্য যে, কবিতা আমাকে শুশ্রুষা দেয়। সকল প্রকার অবসাদ, হতাশা আর বেদনা থেকে সে কবিকে মুক্তি দেয়। আসলে কবিতা বিমূর্ত, তাকে মূর্ত করতেই কবির যত প্রচেষ্টা। একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিতার অধিবাস। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের না বলা অংশটুকুই কাব্যভাষায় প্রতিফলিত হয় সনতারিখের নির্দিষ্ট সীমারেখায়। সৃষ্টিশীল মানুষ তার মৌলিকত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কবিও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং সকল কবির ক্ষেত্রেই তাঁর কবিতার পশ্চাতে কাজ করে মৌলিকত্ব, এটাই স্বাভাবিক। আর তাই প্রচলিত রীতিনীতি, আচার-প্রথা, বিশ্বাসকে অস্বীকার করে নয় বরং এগুলোর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সাক্ষী করেই গড়ে ওঠে একজন কবির কবিতা। সর্বোপরি ব্যক্তি আবেগ, উত্তাপ, অনুভূতি-বোধ থেকে কবিতা জন্ম নিলেও সৃষ্টিশীল কবিতা চিরকাল মুক্ত মানবতার সপক্ষে, এ এক আরোগ্য হাসপাতাল।

…………………………………………………………………………….

কবি পরিচিতি

মামুন মুস্তাফা

মামুন মুস্তাফা

মামুন মুস্তাফা। জন্মঃ ৩ জুলাই, ১৯৭১। জন্মস্থান: বাগেরহাট। যোগাযোগঃ বিসিসিপি, বাড়ি: ৮, সড়ক: ৩, ব্লক: এ, সেকশন: ১১, মিরপুর, ঢাকা ১২১৬। পেশাঃ একটি গবেষণামূলক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কাব্যগ্রন্থঃ

সাবিত্রীর জানালা খোলা (১৯৯৮); কুহকের প্রত্নলিপি (২০০১; দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৯); আদর্শলিপি : পুনর্লিখন (২০০৭); এ আলোআঁধার আমার    (২০০৮, কলকাতা সংস্করণ ২০১৪); এ বদ্বীপের কবিতাকৃতি (২০০৯); পিপাসার জলসত্র    (২০১০); শিখাসীমন্তিনী     (২০১২); একাত্তরের এলিজি (২০১৩); শনিবার ও হাওয়াঘুড়ি (২০১৫)।

প্রবন্ধগ্রন্থঃ মননের লেখমালা (২০১২); অন্য আলোর রেখা (২০১৬)।

সম্পাদনা: লেখমালা একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্যকাগজ ২০১৫ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।

ইমেল: mmustafa72@gmail.com

মোবাইল: ০১৭২৬৭০২৮৪৬

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E