৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০৯২০১৭
 
 ০৯/০১/২০১৭  Posted by

কবির নৈ:সঙ্গ্য: নিষাদসন্ধ্যার পুঞ্জিভূত হাহাকার
– কামরুল ইসলাম

মানুষের নি:সঙ্গতা নিয়ে নানাভাবেই ভাবা যেতে পারে। মানুষ যখন সবকিছুকে নিজের মতো করে বুঝতে চায়,বিশেষ করে কোনো সংবেদনশীল মানুষ, সবকিছু ভাবতে চায়, ব্যাখ্যা করতে চায়, তখনই সে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যায়- সে নি:সঙ্গ হয়ে পড়ে, একা হয়ে যায়। কবি কিংবা কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে একথা বেশি সত্য একারণে যে, এরাই সমাজের সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল মানুষ। একাকীত্বের মধ্যে, নৈ:সঙ্গ্যের ভেতরে কবি কিংবা কোনো শিল্পীকে একটা আলাদা জগৎ গড়ে নিতে হয়, আর এই গড়ে নেওয়া জগৎ যার যত বিস্তৃত, সে তত বড় মাপের কবি কিংবা শিল্পী। ঝাঁপড়া তেঁতুল গাছের সঘন পাতা ও পল্লবে চলমান অজস্র রৌদ্র-ছায়ার খেলা প্রতিমুহূর্তে কোনো পথিককে টেনে নেয় নিভৃতের বারান্দায়, কবির ভেতরে সেই আলো-আঁধারীর খেলা ততটাই জমে ওঠে যতটা সে নি:সঙ্গ। নৈ:সঙ্গ্যের ঢাল বেয়ে হাঁটতে থাকা মানুষেরাই কবি, যাদের ছায়ার অতলে কাঁদতে থাকা পাহাড়ের সন্ধ্যাতাড়িত মুখ দেখা যায়, দেখা যায় কতসব বিবর্ণ রাতের ঘাস-পাতা-শিশিরের বিনিদ্র মিছিল। বৃষ্টি ও মেঘের অসম্ভব রক্তিম আঁধারে  ভেসে ওঠে কবিতার গ্রাম, যে গ্রামে কখনো চাঁদ ডোবে না, তুমুল ঘোষণার মধ্যে জেগে থাকে ভোর আর পাখির দ্বৈরথ।

এই যে এখানে এক নি:সঙ্গ বালক
পাখি হতে হয়ে যায় পড়শির স্মৃতি
ধরো, এই থরে থরে সাজানো সাধন
যদি যায় ডোবাজলে
অসমাপ্ত নবিশীর হাতে
তুমিও দাতব্য-ঘোড়া
শ্রাবণের ফুলের কোরকে-

নৈ:সঙ্গ্যের মধ্যে একেবাবে ডুবে না গেলে কবিতার-মুহূর্ত আসে না। চারপাশে কবিতারা ঘোরেফিরে তখনই, যখন নৈ:সঙ্গ্য কিংবা একাকীত্বের অরণ্যছায়ার জেনেরিক ঘোরে একটি অচেনা মানসবাড়ির গোড়াপত্তন হয়। নি:সঙ্গতা মানে যে একা থাকা,তাও কিন্তু নয়। আপনার চারপাশে অনেকেই আছেন,তার পরও আপনি নি:সঙ্গ।অনি:শেষ ভিড়ের মধ্যেও আপনার মন যেন অন্য কোনোখানে, অন্যকারে চায়।

এই নি:সঙ্গতাকে এভারেজ মানুষের সাধারণ নি:সঙ্গতা থেকে একটু আলাদা করেই ভাবতে চাই আমি।কবির নৈ:সঙ্গ্য তার সর্বজাগতিক স্ট্রেস ও স্ট্রেইন- কখনো কসমিক বোধের অনঙ্গ বেদনাহত হতাশ্বাসও বটে।আর সবকিছুই তার শিল্পীসত্তার সোপানগুলোতে আহত পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো প্রকম্পিত-প্রাণের দোলা- মৃত্যুর ভয়াল স্রোতের অসমাপ্ত টান- যার কেন্দ্রে কেবলই নির্মম নিষাদসন্ধ্যার পুঞ্জিভূত হাহাকার, সেই হাহাকারের মধ্যে- আ পোয়েট ইজ বর্ন উইথ আ ম্যাগনিফিসেন্ট ডেথ…। কবি হওয়া যে সাতজনমের পাপ- এই কথা ব্যাখ্যা করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বলা দরকার যে, সব মানুষের কবি হবার দরকার নেই। কারণ ‘নিষাদসন্ধ্যার পুঞ্জিভূত আহাজারি’ কাঁধে নিয়ে হে মানবসন্তান, আপনি কেন অযথাই অতটা পথ হাঁটতে যাবেন আর মানুষের নিন্দা সইবেন, ভালোবাসার মানুষদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন! অবশ্য কবিদেরও রকমফের আছে। আপনি যদি সেই ধরনের কবি হতে চান, মিডিওকার হয়ে তৃপ্তি পান, তাহলে আপনাকে নিয়ে আর কোনো কথাই বলা চলে না।

প্রকৃত লেখক আসলে নি:সঙ্গ দুপুরের যাত্রী, যিনি ঝরা পাতার স্তুপের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বুনে নিজেকে ভাসিয়ে দেন উত্তাল ঝড়ো-হাওয়ায়। তিনি দেখতে পান শিল্পের বাড়ি দূরবর্তী কুয়াশায়, কিন্তু তা কতদূর তা জানেন না। নৈ:সঙ্গ্য একজন কবি বা শিল্পীর নিয়তি-ই বলা যায়। নৈ:সঙ্গ্যের সড়কে উঠে তিনি হাঁটতে থাকেন বৃষ্টি কিংবা রোদের ভেতর একাকীত্বের দাঁড় টেনে টেনে। পথের দু’ধারের বৃক্ষরাজি, অরণ্য কিংবা পশুপাখি তার আত্মীয় হয়ে যায়। তিনি শুনতে পান গভীর অরণ্য থেকে ভেসে আসা ভেষজ সংগীত, সেই সংগীত, সেই বেদনার নোটেশনগুলো কবির ভেতরে যে শক্তির সঞ্চার করে সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কবি সৃষ্টি-নেশায় মেতে ওঠেন। এখানে আমার ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর সেই নি:সঙ্গ কর্তকীর কথা মনে পড়ছে। মেয়েটি একটি পাহাড়ি এলাকায় একাকী ফসল কাটছে আর একমনে গান গেয়ে যাচ্ছে। কবি দূর থেকে এই নি:সঙ্গ মেয়েটির গান শুনছেন আর মুগ্ধ হচ্ছেন। এই গানের সুরে এমন এক মাদকতা রয়েছে, এমন এক সুরে বাঁধা এই গান যা কবি বহন করে এনেছিলেন সেই গানের মেলোডি এবং অনেকদূর চলে আসার পর যখন সেই গান আর শোনা গেল না, তখনও কবি সেই গানের ঐন্দ্রজালিক সুরে আচ্ছন্ন থাকলেন। নৈ:সঙ্গ্যও একধরনের শক্তি- এই শক্তির প্রাবল্যেই একজন সৃজনশীল মানুষ সৃষ্টির মায়াবী জগতের দিকে হেঁটে যেতে পারেন।

পেয়ে যান ভাসমান যন্ত্রণার মুগ্ধ ব্যাকরণ
সেই আমতলা, সেই পুরনো প্রাচীর ঘেরা বিষণ্ণ দুপুর
সেই ফ্যাকাশে ধিড়িঙ্গি ঘাস, ঘাসের যৌবনে আঁকা সুখ
সেই ঝড়ের বিকেল কিংবা সেই পুরনো সন্ধ্যার ঘোর
আকন্দ ঝোপের আড়ালের অশান্ত পরাগায়ন…
যেখানে ঘুঘুদের ঘুমের ছন্দ দোল খায় ,আর  
উটকো বাতাসেরা  ছুঁয়ে যায় শ্মশানের মুখ-

কবি এক নি:সঙ্গ পাতক; তার পাপ স্বয়ং ঈশ্বর-চ্যালেঞ্জের পাপ। কবি তার সৃজনমুহূর্তে নিজেকে ঈশ্বরের মতোই পরাক্রমশালী ভাবেন- তিনি তখন পরিবার-পরিজন,সমাজ-রাষ্ট্র সবকিছুর বাইরে চলে যান। তিনি একা হয়ে যান, কারণ নিজেকে তিনি অন্যের চেয়ে আলাদা করে ভাবতে পারেন কিংবা ভাবেন। তিনি নি:সঙ্গ হয়ে পড়েন, কারণ এভারেজ পাবলিক থেকে অনেক দূরের পথে তিনি মানসিকভাবে পরিভ্রমণে থাকেন। তার জীবন-দর্শন, বোধ, চিন্তা-প্রণালি,প্রকৃতি নিয়ে তার ভাবনা, তার মৃত্যুচিন্তা সবকিছুই অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যায়। কারণ, তিনি কবি, তিনি তাঁর দৃষ্টি-ভঙ্গির মৌলিকত্বে নিজের জন্য আলাদা একটি পথ তৈরি করেছেন। কবি অন্যের পথে হাঁটতে পারেন না। কবির পথ চিরকালই আলাদা। আমরা অবশ্য এখানে সেই কবির কথা বলছি যিনি সত্তার সালোক গতিতে উড়াল দিতে পারেন আকাশে আকাশে। যিনি হাজার বছর ধরে পথ হাঁটেন পৃথিবীর পথে,যার জন্মই কবিতার অনিন্দ্য মোড়কে, যিনি প্রকৃতই কবি- যার জীবনের চারধারে শব্দ কিংবা উপমারা দলবেঁধে ঘোরে আর তার হাড়-মাংস ভেদ করে প্রবেশ করে অস্তিত্বের বারান্দায়। কবিরও লড়াই আছে, সে লড়াই সান্তিয়াগো এবং হাঙ্গরের লড়াইয়ের চেয়ে অনেক তীব্র। হেমিংওয়ে শেষে বলেছিলেন- ম্যান মাস্ট বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড। কবি ধবংস হয়ে যান বেঁচে থাকে তার কবিতা। এই লড়াইয়ের জন্য যে কবির প্রস্তুতি নেই, সে নিতান্তই মিডিওকার, প্রকৃত কবিতা তার কাছে ধরা দেবে না কখনো।

কবি হওয়া কি কোনো নিয়তি নির্ধারিত ব্যাপার কিনা আমি জানি না, তবে একথা মানি যে, পৃথিবীতে জন্মানোর পর সে যখন প্রথম চোখ মেলে তাকায় তখনই  প্রকৃতি-নিসর্গ, মানুষের বহুবর্ণিল কর্মকা- অন্যের থেকে আলাদা করে সে দেখে। তাই কবি হিসেবেই সে জন্মে, হয়ে ওঠার পথে শিক্ষা-সভ্যতার ছোঁয়ায় সে একধরনের কবি হয় আর শিক্ষা-দীক্ষার কোনো সুযোগ না পেলে সে আরেক ধরনের কবি হয়। আমরা যাদেরকে লোককবি বলি তারা এই গ্রুপের কবি। লালন ফকির,শাহ আব্দুল করিমসহ আমাদের অনেক বড় বড় লোককবির কবিতায় ফুটে উঠেছে অসম্ভব শিল্প-সৌকর্য। যন্ত্রণার গহিনে ডুব দিয়ে কোনো কবি শিল্পের মুণিমুক্তো খুঁজে পান। সেই যন্ত্রণা একাকীত্বের যন্ত্রণা। এই একাকীত্বের যন্ত্রণা কবি খুব বেশিদিন বয়ে বেড়াতে পারেন না হেতু এক-একটি কবিতা ডেলিভারিরর মধ্য দিয়ে তিনি একাকীত্বের আপাত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চান। আমার মনে আছে খুব ছোটবেলায় এক আকালের সময় মানুষ যখন আটাঘাঁটি কিংবা উপোস করে বেঁচে থাকছে কোনোরকম, ঠিক সেসময়ে আমার বাবা বেশ কিছুদিন নিখোঁজ হয়ে থাকলে আমরা ভাই-বোনেরা দারুণ কষ্টের মধ্যে দিনাদিপাত করতে থাকি। সেসময়ে আমি একটি গান লিখে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করেছিলাম। সেই লিরিকের মুখটা ছিল এরকম- একদিন ফরসা হবে আকালের আঁধার/ একদিন বৈতরণী হবো মোরা পার। আমার খুব ছোটবেলায় লেখা এই গান আমি আজো, এতোদিন পরেও যখন একা হয়ে যায় কিংবা সংসারের নানা টানাপড়েনের মধ্যে খেই হারিয়ে ফেলি, তখন গানটি গায়। মানুষের জীবন থেকে আকালের আঁধার কখনো মুছে যায় বলে আজও আমি  মনে করি না।

আমার নি:সঙ্গতাই আমাকে কবিতার দিকে নিয়ে যায়। আমার কবিতাসংগ্রাম আমার চৈতন্য ও অস্থি-মজ্জার পরিপূরক। সংসারের ঘাত-প্রতিঘাত কিংবা যখন স্ত্রী-পরিজন আমার আপন হতে পারেছ না, আমার বন্ধুদের কাছে আমাকে অপরিচিত লাগছে কিংবা পত্রিকার সম্পাদক আমার কবিতা না ছাপিয়ে এমন কারো কবিতা ছাপছে যা আমি আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝি যে সেটি অন্যায়, তখন, এবং কখনো কখনো আমার কাছের মানুষগুলো বুঝে কিংবা না-বুঝে যখন একে একে দূরে সরে যেতে থাকে – এরকমই কোনো এক সন্ধ্যায় আমার নি:সঙ্গতা চুঁইয়ে যে কবিতাটি নেমে পড়ে, তার দিকে আমি  বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। আমার মিউজ-ফিগার এসে আমার সম্মুখে দাঁড়ায়। তাকে আমি চিনি কিংবা চিনি না,তবু সে আসে, আমার মন ভরে যায় কবিতার সুগন্ধে। তখন-

গাছে গাছে উড়ে বেড়ায় সম্ভোগের তুলো পাখি, গাহিবার শক্তি-রহিত;
তাহাদের উড়িবার কালে তুমি অশোক মিত্রের ছায়ায় এসে দাঁড়াও
তোমার শরীর থেকে সলজ্জ গহনারা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়ে বিলের কাদায়, ওরা
আরক্ত কণ্ঠে তুলে নেয় ঝিনুকের মরবিড গান-
এইসব গানের কিনারে ভেসে ভেসে বানাও কিছু জলীয় পোশাক
যার ভেতরে বেড়ে ওঠার সিঁড়িতে ঝোলাও একটি শ্যামপাখি চোখ
যেন তোমার আপন সোলারিয়াম ধুয়ে যায় চাঁদভাঙা জলে-
আমাদের ভুলিবার কালে আরো কিছু শোক, আরো কিছু বিমূর্ত অশোক
তাহাদের উড়িবার কালে গেয়ে যাক ভুল-ভ্রান্তির অগণন গাথা-

এই কবিতা আমার নৈ:সঙ্গ্য-তাড়িত শবযাত্রার মতো, যার পরানে-পিঞ্জরে কেবলই কিছু বিমূর্ত অশোকের ডাক আমার বাস্তুহারা মনকে কখনো অমানিশার অন্ধকারে কখনো আলোর উৎসাহে উদ্বোধিত করে।

হতে পারে কবি অনেকদিন ধরেই কিছু লিখছেন না। এ সময়কে কবির কাব্যপ্রস্তুতির সময়ও বলা যেতে পারে। কবি সব সময়ই কবিতা লিখবেন- এরকম ভাবা ঠিক নয়। খুব বেশি বেশি লেখার বিপদটা মনে রেখে এগোতে না পারলে কবি তার আরাধ্য লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থও হতে পারেন। অবশ্য এখানে আমি সেইসব কবির কথা বলছি যারা মূলত কবিতাই লিখতে চান। কবিতার চেয়ে কবি হওয়া জরুরি বলে যারা মনে করেন, তাদের কথা অবশ্য আলাদা। প্রকৃত কবিকে আমার এরকমই মনে হয়: এক নিস:ঙ্গ মানুষ যে নির্জন নদীপাড়ে বসে ভায়োলিন বাজায় আর নদীর ওপারের কালো মেঘের কিনার ঘেঁসে হেঁটে যায় তার ফেলে আসা অতীত,তার নিজস্ব নারী যে তাকে ছেড়ে গেছে অনেক কাল আগে। সন্ধ্যা শেষ হয়, রাত আসে, লোকটি তবু বসে থাকে। অত:পর শেষরাতের মরা জোছনায় যখন সে ঘরে ফেরে, তখন বাড়ির উঠোনে একটি কালো বেড়াল ছাড়া আর কিছু দেখে না সে, কিংবা সে ঘুম ঘুম চোখে আবার ফিরে আসে নদীপাড়ে, নির্জনতার হাত ধরে বসে থাকে জলের মুখোমুখি আর দেখতে থাকে- ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে…।’

কবি আধুনিক না অধুনান্তিক, সেবিষয়ের চেয়ে বড় বিষয় হলো, কবি তার সময় ও সম্ভাবনাগুলো ধরতে সক্ষম কিনা কবিতায়, কবির বোধের জগতে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির আলোড়ন আছে কিনা কিংবা কবি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতখানি রক্তাক্ত হন। এসব সূচকের বাইরেও আরো অনেক সূচক রযেছে যা একজন সচেতন কবি বুঝে ওঠার চেষ্টা করে যান সারাজীবন ধরে। একজন সত্যিকারের কবির কাছে কবিতা লেখা এক সার্বক্ষণিক প্রক্রিয়াই বটে। কবি তার সংসারের মধ্যে বাস করেও সংসার বিবাগী, তিনি যেখানেই যান,তার চলায়, হাঁটায় এবং সার্বিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কবিতার কোনো-না-কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে তার দেখা হয়। কখনো কখনো এরকম হয় যে কবিতার মতো কোনোকিছু হয়ে উঠছে না, সেসময়ে কবিতা না লেখাই ভালো। জোর করে কবিতা বানাতে গেলে যা হয় তা নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না। সেজন্য কবিকে অপেক্ষা করতে হবে সেই সময়ের জন্য, যখন ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানির’ মতো কোনোকিছু এসে কবির মাথায় ভর করবে আর কবিও তখন তার সৃজনজালে আটকে ফেলবে নতুন  কবিতার সোনাপাখি- যে তখনো উড়তে শিখেনি,যার ডানায় তখনো কোনো শক্তির সঞ্চার হয়নি, যে অনেকটাই অসহায় এবং উড়তে অপারগ। কবি তাকে নার্চার করে বড় করে তুলবে এবং সে যখন সোনালি পাখা মেলে উড়ার ক্ষমতা অর্জন করবে, তখন কবি তাকে কোন এক সন্ধ্যার মোহিনী বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে প্লেজার অব পেইন নিয়ে ঘরে ফিরবে।

সৃষ্টির এই আলাদা আনন্দ যা বেদনায় আকীর্ণ, তাকে হৃদয়ের রক্তক্ষরণের মধ্যে লালন করা-ই কবি কিংবা স্রষ্টার মৌলিক কর্ম। নৈ:সঙ্গ্যের আড়ালে কবি নিয়ত এক সৃজনশীলতার নৌকো বেয়ে ধীরে ধীরে বৈঠা দিয়ে পানি টেনে কোন পাহাড়ের নদী দিয়ে কোন দূর দেশে যান, তা তিনি নিজেও বোঝেন না। তিনি শুধু বোঝেন যে, তিনি এক মহাযাত্রিক অনন্তের পথে।

সে পথে কেউ যেন আচারের বয়েম খুলে দাঁড়িয়ে আছেন
সেপথের মগডালে ভূমিহীন পাখিরা এসে পূর্ণিমা খোঁজে
আবার মরণঘন  পুরনো বিষাদ ঘোমটার তলে ঘাস খায়
প্লাবিত শস্যের ভারে অগ্রন্থিত হরিজন বেহালা  বাজায়-

এভাবেই নৈ:সঙ্গ্যের ফুটপথ ধরে কবিতারা এগোতে থাকলে জীবনের কিনারে জেগে ওঠে আরেক জীবনের পলিভূম- কবি হতে পারার মধ্যে সেই পলিভূমের মাঠমূল্যটুকু বুঝে নিতে গেলে আমাদের ‘মরণঘন পুরনো বিষাদ’ সাথে এগোতে হবে হাওয়াময় শূন্যতায়- দেখতে পারার আনন্দের মধ্যে নত হয়ে খুঁজতে হবে শিল্পের বারান্দা, যা কবির নৈ:সঙ্গ্যের শালগর্ভ পুরাণ।

চৈতন্যের নির্জনতা ধরে  অনাগত কালের ক্রন্দণের সাথে দেখা হয়।তার বিষাদবেণীতে ঝুলে আছে কালপুরাণের কথিকা। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি বুঝে ফেলি ভেতরের দিকে লু-হাওয়ার ভর্টেক্সে নৈ:সঙ্গ্য ধরে এগোচ্ছে আমার ভোরবেলাকার রোদ-বৃষ্টি-আলো। আমি কি চিনতে পারি সেসব, সেই অবগুন্ঠণ, সেই বহমান তৃষ্ণার অলি-গলি,সেই বিচিত্র পত্রালি? তবু যাই:

নিমগাছের ডালে বসে একদিন আমি পাকা নিমফল খেতে খেতে নদীতে গুনটেনে নিয়ে যাওয়া একটি নৌকোর পুরনো তালিমারা ধূসর বাদামের দিকে তাকাতে তাকাতে দেখতে পাই ছোট মাস্তুলে লেখা আছে- এই লায়ের মালিক কেরু পরামাণিক। দুপুর ও বিকেলের মাঝামাঝি এই সময়টা নিমপাতা ও বাতাসের দখলে ছিল। মাঝে ছিল ক্ষুধাভর্তি একজন কিশোরের পৃথিবী দর্শনের কিংবা নিসর্গ দর্শনের কিংবা মৃত্তিকা দর্শনের ব্যর্থ প্রয়াস। তবু রোদের দিকে চলমান ‘এই লায়ের মালিক কেরু পরামাণিক’ যেতে থাকে তরতর করে। একজন মানুষের কিংবা সে মানুষই না হয়তো – সে কোনো দ্ব্যর্থকতার মধ্যে তার গন্তব্য ঠিক রেখে নিমবৃক্ষকে অনেক পিছনে ফেলে সরে সরে যায়…একজন কিশোর তার অনুভবের পোস্টারে একটি চুমোর দৃশ্য লাগিয়ে ভুলে থাকে ক্ষুধা ও তা থেকে উদ্গত যন্ত্রণাসকল,দহনে আসন পেতে সে দ্যাখে আসমানে যতটুকু আলো তার সবটুকুই দখল করে আছে এই নিমপাতারা…দু-একটি পাখি এবং তাদের পালকময় সম্ভাবনা। সেই  সম্ভাবনা ছুঁয়ে ছুঁয়ে কবি আসে, একটি প্রাচীন ঘাসের কঙ্কালে নৈ:সঙ্গ্য বেঁধে কবি ভোরের অদূরে ভেসে যেতে যেতে শুনতে পায় তার মিউজ-ফিগারের কণ্ঠ- তখন ভাঙা বাঁশির মাংসের ভেতরে কবিতারা ডাকে…তখন ভোর ও উষার মাঝখানে উদিত অরণ্যের দিকে বয়ে যায় সুগন্ধী হাওয়া…

আমার কবিতা-যাপনের কাল অন্ধকারের কোল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকা নি:সঙ্গ বৃক্ষছায়ার কান্নার দিকে হেলানো। আমি জানি কত নিঝুম আকাশের বারান্দায় আমার ডিঙিখানি জলের পুণ্যে ভেসে যেতে যেতে কীভাবে ঘরহীন হয়ে পড়ে, আবার পাল তোলে মাথায়, আবার কব্জিতে তাবিজ বেঁধে পাড়ের দুঃখটুকু সাথে নিয়ে ফিরে চলে অশেষ ভাসানে…

একদিন এক শ্রাবণ সন্ধ্যায একটি ডানা-ভাঙা প্রজাপতি আমার পড়ার টেবিলের এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল- নৈ:সঙ্গ্যের লোপাট কাকে বলে সেদিন আমি প্রথমবার জেনেছি এবং এ-ও জেনেছি যে, দেহ-মন যখন নৈঃসঙ্গ্যে ভিজে ওঠে কেবল তখনই জীবনের চিরন্তন ডালপালার মধ্যে রাতপাখির গান শোনা যায় কিংবা অরণ্য থেকে অরণ্যেযেতে যেতে বিদূষী কবিতার চোখ থেকে ঝরে পড়া আলোর ঝিলিক আমাদের চৌকাঠে এসে রোপণ করে যায় দু-চারটি সৌখিন অনুপ্রাস।  তার চোখের গভীরে  কারো জন্য কোনো কান্না জমে ছিল কিনা তা ভাবা কঠিন ছিল হেতু আমি ধরে নিয়েছিলাম মাঝে মাঝে মেঘের ডাকের সাথে সাথে সে একটু একটু করে ফিরে যাবে সংসারের তীরে। দাদিমা বলতেন, মানুষ মারা গেলে প্রজাপতি হয়ে ফিরে আসে। আমার দাদার মৃত্যুর পর একদিন এক বয়স্ক প্রজাপতি এসে আমাদের খড়ের বেড়ায় বসলে দাদিমা প্রাণভরে ওটাকে দেখতে দেখতে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলেন। আমার মনে হলো, একদিন আমাদের বাড়ির পিছনের ক্যানালের জলে জোছনা রাতে একজন কিশোরীর মৃত দেহ ভাসতে দেখেছিলাম। তার মুখের ওপর চাঁদের আলো পড়ে যে বিষণ্ণ মায়াবী বাতাবরন তৈরি করেছিল, তা আজো আমার মন থেকে মুছে যায়নি। আমার টেবিলের কোণে পড়ে থাকা আহত ডানার প্রজাপতিটি কি সেই ক্যানালের জলে ভাসমান মৃত কিশোরী, যে নি:সঙ্গতার বেড়া ডিঙিয়ে মৃত্যুর অবাধ ডেরায় প্রবেশ করে ভেসে যাচ্ছে কিনারাহীন দিগন্তের দিকে?

তবু আমার কিছুটা ভয় থেকে যায়;
লন্ড্রিবাড়ির উঠোনে অন্ধকার নিয়ে কাঠবিড়ালীর
মন চুঁইয়ে রক্তঝরার খেলায়
কার কতটা হাত ছিল, সেইসব ভাবনার দিনে
শুকিয়ে যাওয়া নদীর তটরেখায় গজিয়ে ওঠা শালগাছের
মন-খারাপের সবটুকু গিলে নিয়ে দেখো সে নদী কীভাবে
নিজের পাড়ের গর্তে ঢুকে যাচ্ছে নীরবে আর  নিভিয়ে দিচ্ছে
শ্বাসকলের অনাথ বাতিটি-

অনন্ত নৈ:সঙ্গ্যের ভার আর কতদূর বহে নিবে কবি! নিষাদের হাতে ধৃত আজ কবির তৃষ্ণা- এরকম  বাণীর আগডালে বসে কাঁঠাল পাতা ভেজার দৃশ্য দেখতে দেখতে একদিন ভোর হয়ে যাবে… ভোর মানে প্রান্তিক আড়ালের ডাক, আমি সেই ডাকের অপেক্ষায় আজো দেখো এই সন্ধ্যার কাছে, এই টুং টাং শব্দের কিনারে একটু একটু করে যার দিকে সরে যাই কিংবা যার শরীরে-শিকড়ে আড়ি পেতে বাঁচতে চেয়ে নিজেকে তুলে ধরি গাছ-গাছালির পোশাকে, সেখানের নির্জন সীমান্তে কবি ছাড়া আর কারো অধিকার নেই প্রবেশের। সেই প্রবেশদ্বারে দেখি, সেই আহত ডানার প্রজাপতি নির্মম নিষাদসন্ধ্যার পুঞ্জিভূত হাহাকার বুকে লড়ে যাচ্ছে কিম্ভূত সময়ের সাথে। সারা শরীরে তার রক্তের অধরা কম্পন, সেই কম্পনের মরচুয়ারির পাতায় পাতায় যে নৈঃসঙ্গ্যের ফুল তোলা রুমাল উড়ে যাচ্ছে বিষাদের পাখায় ভর দিয়ে, সেখানে একদিন তুমি ধানের মঞ্জরিমাখা খোলা দরজার একটি বাড়ি দেখতে পাবে, যে বাড়ির কোনো ঘরেই কোনো জানালা দেখবে না, শুধু শুনতে পাবে দূর-মানবের যৌথ ক্রন্দন।

লেখক পরিচিতিঃ

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম। জন্ম  ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবে কবিতার জগতে প্রবেশ। পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :  দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯),  ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প (২০০৬), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল (২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া (২০১৪), দীর্ঘশ্বাসের সারগাম (২০১৬)।

প্রবন্ধগ্রন্থ:  কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯), রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩), কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E