৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ১২২০১৭
 
 ১২/০২/২০১৭  Posted by

জহর সেনমজুমদার-এর একগুচ্ছ কবিতা

জহর সেনমজুমদার

জহর সেনমজুমদার

শ্রাবণশ্রমিক

তুমি কে? চমকিত তারাপুঞ্জ
তুমি কে? চমকিত তারাপুঞ্জ; তুমি কে? ত্রিমাতৃকা চক্রতাং যাতা; দেখি তব ভবযন্ত্রবীণা
দেখি তব ওংকার ও তূরীয়, মেঘাতুর হৃদিমু-মালা
জড় থেকে উঠে আসি আমি, চক্ষুহীন, কর্ণহীন
বিন্দু বিন্দু চূয়ত, পৃথিবীর কুলকু-লিনীকূলে জড় থেকে ফিরে আসি আমি
তুমি কে? চমকিত তারাপুঞ্জ; তুমি কে? ত্রিমাতৃকা চক্রতাং যাতা; দেখি তব
দেখি তব ভবযন্ত্রবীণা; তুমি ছাড়া প্রাণ দিবে কে? বলো, তুমি ছাড়া আমাদের
প্রাণ দিবে কে?

কালসখা কালপ্যাঁচা

কালসখা, কালপ্যাঁচা; তোমার ইশারা আঁধার কূজন, তোমার কূল কালী কল্যাণী
বহুবার দেখেছি আমি; কালসখা কালপ্যাঁচা আমাকে তুমি সৌঃ দেবে না?
আমাকে তুমি ক্লীং দেবে না? নীরব নিঃশব্দে এই ঈশান; নীরব নিঃশব্দ
এই গৃহ; যতবার গৃহে ঢুকি, যোগিনীর মৃতদেহে প্রজাপতি উড়ে এসে
গুনগুন করে; যতবার গৃহে ঢুকি, যোগিনীর মৃতদেহে রহস্যময় জ্যোৎস্নার
উদগম হয়; এসব ছেড়ে আমি কি আর কোথাও কখনো যেতে পারি?
তবুও ভৈরবীর আঠারোটি হাতে আমাদের আঠারোটি মু- ঝুলে থাকে
মু-ভর্তি জল শুধু জল
মু-ভর্তি জল শুধু জল
ব্যথাতুর, মেঘাতুর, রাত্রিকালে চেয়ে দেখি গাছেরা ঘুঙুর বেঁধে নদীতে নেমেছে
এই গাছ তুমি পুঁতেছিলে? জানি না; এই গাছ আমি পুঁতেছিলাম? জানি না
কালসখা কালপ্যাঁচা, আমার এই গৃহকে তুমি, আমার এই গাছকে তুমি
তোমার ওই বিশুদ্ধ মহাশূন্যে ঠাঁই দাও ঠাঁই দাও, আমি তোমার ভাষায় শুধু
কথা কহিব, যুগে যুগে কথা কহিব, পাপ ও পঙ্কিলতায় কিছু চাহিব না

আদিগন্ত ভিখারি আমি

আদিগন্ত ভিখারি আমি; হ্যারিকেন হাতে নিয়ে সারারাত পৃথিবীর তারাপুঞ্জ দেখি;
তারাপুঞ্জ, তারাপুঞ্জ, রাত্রি ভেদ হয়; তারাপুঞ্জ, তারাপুঞ্জ, চক্ষু ভেদ হয়;
টাঁড় বাংলার ন্যাংটো মহিষ, চিরদিন, চিরকাল, কৃষিজলে বোকা রয়ে যায়
টাঁড় বাংলার জেদি গ-ার, জঙ্গলের ভেতর ঘুরে ঘুরে সন্তানের সৎকার করে
আদিগন্ত ভিখারি আমি, হ্যারিকেন হাতে নিয়ে সারারাত লাল লাল পিঁপড়েদের
স্বর্গে যাবার পথ করে দিই; কানকাটা আমি কিছু শুনি না; একা একা
তারাপুঞ্জ দেখি, একা একা তারাপুঞ্জ দেখি
তারাপুঞ্জ কে?
তারাপুঞ্জ কে?
অহো, আমিও জানি না

বৃষ্টিভেজা মহাকালের ভেতর

বৃষ্টিভেজা মহাকালের ভেতর আমাদের টগরগাছের পিঁপড়েরা ক্রমাগত ঝরে পড়ছে;
তুমি কি এইসব পিঁপড়েদের নিয়ে আমার শবদেহের উপর একটু বসবে?
তুমি কি এইসব পিঁপড়েদের নিয়ে জ্যোৎস্নাযন্ত্রণার ঘূর্ণিতে একবার ছিন্নমস্তা হবে?
অগ্নিশিখা, ইদং ইদং; অগ্নিজিহ্বা, ইদং ইদং; আমার অনর্থক মৃত্যুর পর
তোমার যোগিনীহৃদয়ের ভেতর আজও নীল অপরাজিতা ফুটে ওঠে, আমি
সেই কু-লিনী দেখতে পাচ্ছি; আমার অনর্থক মৃত্যুর পর তোমার যোগিনীহৃদয়ের ভেতর
আজও একের পর এক পদ্ম পঞ্চদশ কলায় জেগে ওঠে, আমি সেই কু-লিনীও
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি; অগ্নিশিখা ইদং ইদং অগ্নিজিহ্বা ইদং ইদং
মৃত আমি পৃথিবীর পথে পথে ঘুরি; মৃত আমি পৃথিবীর সকল পিঁপড়েদেরও ক্রমশ
বন্ধু করে তুলি; ওই দেখ, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ভেতর ময়ূরের পথ খুলে গেছে
তুমি আসবে না? একবার তুমি আসবে না? টগরগাছের পিঁপড়েরাও আজ
তোমায় ডাকছে; শবদেহের ওপর এসে বসলে চমকিত তোমারও রূপ খুলে যাবে

মাতাপিতাধাই

তুমি সখা, বৃষ্টি আঁকা শাড়ির নীচে, তোমার বৃষ্টি আঁকা শাড়ির নিচে
আমাদের অতিপ্রিয় গোধূলি শুয়ে আছে, তুমি সখা, আমাদের সকলের
মাতাপিতাধাই, পৃথিবীতে বহুবার বিপজ্জনক বাঁক বদলের পর, মনে হয়
আমাদের হাত থেকে ভূমাজলে চাঁদ ও বাড়ি খসে গেছে, যতদূর যাই
ডুমুরগাছের নীচে ব্যর্থ সব ভ্রুণেরা অপূর্ব শাঁখ ও সাঁকো নির্মাণ করেছে
আমি কি নির্মাণ করবো সখা? বলে দাও, তুমি বলে দাও

তোমার দিগন্তপ্লাবিত শবদেহ

তোমার দিগন্তপ্লাবিত শবদেহ ছুঁলেই মনে হয় চাঁদের ভেতরও আমি ঘুরে ঘুরে
কুঁড়েঘর গড়ে তুলতে পারি, মনে হয় প্রেমিকের প্রতিটি চুমুর মধ্যেই রয়ে গেছে
মেঘলা জাগর; কালরাতে স্বরবর্ণ পড়েছে; তোমার স্বর্গ থেকে স্বরবর্ণ পড়েছে
আমি শুধু পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে, একদিন বুঝে যাই
শ্রীশ্রী চণ্ডীর কালতত্ত্বে তোমার স্ত্রীরূপং জিহ্বা ছাড়া আর কিছুই নাই
হলুদ আলপথের দুপাশে হেলে ও শঙ্খচূড় বসে আছে
রাত্রিকালে জঙ্গলের ভেতর বারবার নুপূরের শব্দ পাওয়া যায়
কুঁড়েঘরের পেছনে, হিজলগাছে, চাঁদ এসে আঘাত করে
আঁচলভরা শিউলিগুলো ওড়াতে ওড়াতে বাতাসও মহাশূন্যে ক্রমাগত ওঠা-নামা করে
মনখারাপ, মনখারাপ, আমার শুধু তোমার জন্য আবছা আবছা মনখারাপ হয়

শ্রী ও শ্রাবণ

জয় হোক সখা, তোমার জয় হোক, তোমার ব্যর্থ বীণার জল ও জন্মের
স্বপ্ন রেখে যাই, অগ্নি ও ছাইয়ের কান্না রেখে যাই, শ্রী ও শ্রাবণের
স্মৃতি রেখে যাই; আমিও তো গানওলা; ছেঁড়া মেঘে বহুবার একা একা
ভাটিয়ালি রেখে বাউলের ঝোলার ভেতর মানুষেরই মু-ু দেখিয়াছি
সেসব মু-ের অনেক ছাইচাপা ইতিহাস আছে; সেসব মু-ের অনেক
যুগসন্ধি আছে; অতিদূর নদীপথে কুয়াশার নৌকা এসে ডাকে
মা-মরা মুরগির ছানা পৃথিবী কামড়াতে কামড়াতে একদিন দূরে চলে যায়
জয় হোক সখা, তোমার জয় হোক, আমার শৃঙ্গার কোনো পাপ জানে না

নিরালোক, মেঘতামস

নিরালোক, মেঘতামস, মায়েদের সেলাইকলের পাশে আমাদেরও জীবনস্মৃতি পড়ে রয়েছে
তুমি কি একদিন রাতজাগা এই মেঘতামস নিতে আসবে?
তুমি কি একদিন মায়েদের এই সেলাইকল নিতে আসবে?
তুমি কি একদিন আমাদের এই জীবনস্মৃতির ভেতর মৃদু মৃদু পদচারণা করবে?
নিরালোক নিরালোক, মেঘতামস মেঘতামস, মন তুমি ভালো হয়ে যাও
মন তুমি সঙ্গমে ও স্বধর্মে কৃষিকুঞ্জ উদ্ভাবন করো, পূর্বাপর
কৃষিকুঞ্জ উদযাপন করো, মেয়েদের শবদেহ ঢেকে দেবে পুনরায় মেঘলা মহাকাল
মন তুমি ভালো হও আজ, তোমার জন্যেই বেঁচে আছে আমাদের চুমুসংকলন
নিরালোক অতিরিক্ত নয়; নিরালোকও কিছুমাত্র অতিরিক্ত নয়
মন তুমি ভালো হয়ে যাও, মন তুমি ভালো হও আজ

শ্মশানের পাদদেশে

ভিখারির পদপ্রান্তে পড়ে আছে লাল রক্তজবা; আমি আমার হৃৎপিণ্ড
আর সামলাতে পারি না, ওগো সখা ওগো মাতাপিতা, শোনো এই
খঞ্জনীগাঁয়ে একটি কুষ্ঠরোগী সারারাত তোমার একতারা বাজানোর পর
এইমাত্র স্ত্রী-গর্ভের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছে, পদ্মফুল আর ফুটবে না, পদ্মফুল
আর ফুটবে না; শ্মশানের পাদদেশে একটানা ঘুঘু ডাকিতেছে, শ্মশানের পাদদেশে
একটানা চাঁদ কাঁদিতেছে; একটি পয়ার এসে বাংলার ভূমাজলে পুনরায় প্রবেশ করে
সখা তুমি বাংলার পয়ার বাঁচাও, সখা তুমি আমাদের সকলের পয়ার বাঁচাও

দাঁড় ও শিয়াল

তুমি সখা, এই দাঁড় কৃষিমুকুলিত, তোমার শাশ্বত এই মহাজগতের ধ্বনি ও বাণী
সন্ধ্যাকালে পরিব্যাপ্ত হয়, আবছা অন্ধকারে একটি শান্ত শিয়াল শুধু বারবার
ক্ষুধা পূর্ণ করে, অতীন্দ্রিয় তুমি, বোবা সন্ন্যাসিনীর বুকের ভিতর তাঁত বুনে বুনে
এক্ষণে কোথায় যাবে, কতদূর যাবে, আমি তোমার সূর্যাস্তসমগ্রের ভিতর
ঘুম ও জাগরণ সহিত দাঁড়িয়ে আছি, তবুও জিহ্বায় জল উঠে আসে, তবুও
পৃথিবীর চলন্তিকায় বারবার উইলাগা আমাদের হারমোনিয়াম বাজে
তুমি সখা, জীবিত ও মৃতের মাঝে যৌন এক জবাগাছ প্রতিরাত্রে স্থাপন করেছো
আমি এক বিমূঢ় বিস্ময়, চাঁদের ছিদ্রপথে স্বপ্ন নিয়ে চিরকাল প্রবেশ করি

তুমিও আমারই মতো

তুমিও আমারই মতো নিশ্চয়ই দেখেছ পৃথিবীর শান্ত জ্যোৎস্নায় তুমিও মৃত আমিও মৃত
মাঝখানে একটি জীবন্ত নদী গৌড়গোধূলির প্রেমে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আছে, মাঝখানে
একটি অলৌকিক পথ হৃদি চিরে টাঁড় বাংলার চাঁদ ধরিয়াছে, তুমিও আমারই মতো
জিহ্বা বার করো, জিহ্বার উপরে রাখো পদ্মা ও গঙ্গার গ্রামীণ জনপদ
জিহ্বার উপরে রাখো জলঢোঁড়া ও হেলেসাপের মৃদু বিষক্রিয়া
কালচক্র অবধান করো, কালচক্র অবধান করো
কালচক্র এক্ষণে অবধান করো

মরা মথ

উড়ন্ত প্যাঁচা এসে প্রথম তোমার ইন্দ্রিয়ের ভেতর প্রবেশ করেছিল; তুমি সখা
তাহাকে আশ্রয় দিয়াছ; মৃতপ্রায় গাধা এসে প্রথম তোমার অতীন্দ্রিয়ের ভেতর
প্রবেশ করেছিল; তুমি সখা তাহাকেও আশ্রয় দিয়াছ; অদ্য আমি আসিয়াছি
পৃথিবীর আদিম এক কুষ্ঠরোগী, দুই হাতে মরা মথ, দুই হাতে মরা ব্যাঙ
আমাদের ছয়টি সন্তান মেঘের ভেলায় উঠে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে
জন্মান্ধ শ্রীরাধার বন্দনা করিতেছে; কী আর বলিব আমি? তুমি সখা
আমার এই ছোট্ট কুঁড়েঘরের সম্মুখে অদ্য একটি জলপথ উপহার দাও

টাঁড় ও টিলা

তুমি সখা, টাঁড় ও টিলা, এইমাত্র তোমার কাছে আসমুদ্র চারুস্মৃতির দৈব পেয়েছি
নশ্বর কুষ্ঠরোগী শূন্য এই ধানক্ষেতে একা একা ভাষা তৈরি করে, ভাষা
শুধুমাত্র আমাদের ভাষা, বঙ্গসুন্দরীর কোল থেকে আজ আমি প্যাঁচা তুলে নেবো
বঙ্গসুন্দরীর পা থেকে আজ আমি কৃষিমুকুলিত বীজ ও ভ্রুণ পেয়ে যাবো
ছায়াক্লান্ত এই মহাজগৎ, জ্যোৎস্নার ভিতর পড়ে আছে তাহাদের অতীন্দ্রিয় মু-মালা
আমি এই মু-মালা থেকে প্রতিদিন উড়ে যাই, প্রতিদিন উড়ে যাই শৃগালসহিত
কাম ও কর্দমের ভিতর শুয়ে থাকে বন্ধ্যা গাভী, আমি তারে এইবার চাঁদের
চম্পায় নিয়ে যাবো, তুমি সখা, শতাব্দীর শ্রী ও শৃঙ্গার শুধু তোমারেই চায়

মাঝে মাঝে দূর সুদূর

মাঝে মাঝে দূর সুদূর অস্পষ্টতায় চোখ খুলে দেখি : ধু-ধু হলুদ এই ধানক্ষেতে
বৃষ্টি আঁকা শাড়ির ওপর ভ্রুণ হয়ে শুয়ে আমিও পৃথিবীকে কামড়ে ধরেছি
ক্রমশ অন্ধকার, ক্রমশ অন্ধকার, ভূমি ও ভূমার ইঁদুর পৃথিবীর আলোছায়া চিরে
বিপজ্জনক অভিসারে যায়, অগ্নি ও ছাইয়ের মাঝে আমাদের মাতাপিতাধাই
কুঁড়েঘরে ক্রন্দন করে; ছয়টি সুপারিগাছে, ছয়টি গন্ধরাজগাছে ছড়িয়ে যায়
নির্জন প্রেমিকের ঐশী আর্তনাদ; ভিখারির পদপ্রান্তে দূর থেকে উড়ে আসে
লাল রক্তজবা; মনখারাপ মনখারাপ, ওগো মেঘ ওগো সখা, এই নাও
ভ্রুণ এনেছি, এই নাওভ্রুণ আনিয়াছি, আমাদের ইহা ছাড়া আর কিছু নাই

তুমি বলবো না তুই

তুমি বলবো না তুই—বুঝতে না বুঝতেই গোধূলিসন্ধির স্বর্গে পাখি উড়ে যায়
আমারও এক অনিবার্ণ আস্তিক্যভূমি প্রয়োজন, আমারও এক সমারূঢ় ফড়িঙের
শুশ্রূষা প্রয়োজন, এই নীড় কিঞ্চিৎ লাল, এই নীড় কিঞ্চিৎ হলুদ
ষড়রিপু হাতে নিয়ে বাউল আসে, শতাব্দীর নৌকায় আমাদের গোধূলি ভেসে যায়
তুমি বলবো না তুই? মনখারাপ মনখারাপ, ভাসমান মনখারাপ
চরাচর নিবেদিত হলো

বোকা স্ত্রী

সারারাত কৃষ্ণচূড়া গাছ কামড়াই, লাল পড়ে, লালা পড়ে সখা, একা লাগে
বড়ো একা লাগে; দূর থেকে দেখি একটি মৃত হাঁসের পিঠে বসে আছে
একটি মৃত জোঁক; দূর থেকে দেখি ইস্কুলবালিকার বেণীতে ব্যর্থ এক চাঁদ
ঝুলে আছে; দ্ইু হাতে বসন্ত ও ফাল্গুনের পা-ুলিপি নিয়ে একজন বিষণ্ণ
মাস্টারমশায় নদী পার হয়ে শহরে চলেছে, পেছনে তাঁর বোকা স্ত্রী,
পেছনে তাঁর গরুগাভিগোয়াল; মনে হয় স্বপ্নগুলো চিৎ হয়ে আছে
সখা তুমি এসবের ভিতর একবার দাঁড়াও, আমি তোমার পদপ্রান্তে জিহ্বা রাখিব

তোমার সহিত

অণুক্ষণ ষড়চক্র; শিহরিত এই সন্ধ্যাকালে সকল ব্যর্থ প্যাঁচাদের বন্ধু করেছো তুমি
শ্রাবণশ্রমিক; ওগো শ্রাবণশ্রমিক; বন্ধ্যা ধানক্ষেতে স্বরচিত অস্তাচল রচনা করিলাম
শ্রাবণশ্রমিক; ওগো শ্রাবণশ্রমিক; নিষিদ্ধ আম্ররকানন থেকে ভেসে আসে
বংশীধ্বনি; মহাজাগতিক; প্রজ্ঞাশমিত; তোমার সহিত বিবাহ ও প্রণয়
তোমার সহিত ক্রমশ নিবিড় এক আত্মীয়তা, শ্যাওলা ও চুম্বন রহিল;
অনুক্ষণ ষড়চক্র; তোমা বিনা আমি অর্ধমৃত

আমাদের নুন

অনবগুণ্ঠিত; তবু দিকচক্রবালের স্বপ্ন আর স্বাধীন হংসমূর্তির পিছন পিছন
আজ আমাদের শ্রাবণ এলো; সেই শ্রাবণ, সেই, সেই সখা ও শিক্ষক;
মেঘতামসের চাপা গোঙানির ভিতর দশমাস দশদিন তাহার সহিত যেন
অতৃপ্ত তিন শালিক রহিয়াছে; জলের মূল ভাষা কী? নুনের মূল
স্বরূপ কী? অনির্বাচিত কৃষক, প্রিয়তম পথ খুলে দাও; পা তৃষিত
দুই পা বড়ো তৃষিত; বোবা উদ্ভিদের মতো আমরাও অঙ্কুরিত হলাম
সেই শ্রাবণ সেই শ্রাবণ; হৃৎপি- রক্ষিত এই উর্বর মঞ্জুনাশিনী; হয়তোবা
রিক্ত তার মাতৃতান্ত্রিক চৈত্রমঙ্গলে একখ- অনিমেষ ভৈরবী তুমি; আমাদের
দশ আঙুল তবুও সুপুরুষ বেজে উঠেছিল; তোমার জন্য; শুধু তোমার জন্য;
বাঁশবন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়; সখা ও শিক্ষক ক্রমে ঘুম নিয়ে আসে;
ঘুম ঘুম, মাথাভর্তি ঘুম; দশমাস দশদিন ধরিত্রীর বক্ষদেশে পুনরায়
চমকে চমকে ওঠে আমাদের অন্ন আমাদের নুন; মাটিতে ক্রমাগত
চন্দ্রদাগ পড়ে; ফোঁটা ফোঁটা অপরূপ চন্দ্রদাগ পড়ে, তোমার জন্য, শুধু
তোমার তোমার, ওগো শ্রাবণ, ওগো শ্রাবণ, আজ চলিলাম

ভূমি ও ভূমার মাঝে

একদিন তোমাকে দেবো বাঁকুড়ার ধানক্ষেত, সাপ ও শাড়ি, তুমি সখা
ইহাদের গ্রহণ করিও; অতিদূর বনপথে মূর্ছাতুর মেঘ এসে চিরকাল কাঁদে
আমিও কাঁদি, ঈরা ও পিঙ্গলার মাঝে আমার বাড়ি, দুলে দুলে ওঠে
আমি ক্ষুধাতুর, আমি মেঘাতুর, ভূমি ও ভূমার মাঝে বারবার মৃত গাভি
দর্শন করি; পৃথিবীর স্তব্ধ নৌকায় শুধু এক মথ কিঞ্চিৎ উৎপাদন করে
তুমি সখা, তোমার সকল অতীন্দ্রিয়ের ভেতর আমার এই অস্পষ্ট হাতের লেখা
রেখে যাই আমি, পারিবারিক এই খাতা তুমিও গ্রহণ করিও

তুমি দেবীচক্ষু

তুমি দেবীচক্ষু; আমাদের এই নির্জন মেঘতামসে পুনরায় জাগ্রত হয়েছ; যেন
অনুভব নীল প্রবঞ্চনা, এইখানে ময়লা ও ময়ালের ভেতর তোমার ইহলোক
চুমাচতুর্দশী রচনা করেছে, সংসারে শিহরিত সন্ধ্যা নামিতেছে, দেখি তব
অশ্রুরুদ্ধ আঁধারগম্ভীরা, জনপদ শব্দহীন; এলোমেলো পক্ষীশাবক লালা নিয়ে
লাল হয়ে আছে; ধূলাও এই মুহূর্তে চমৎকার অলৌকিক হয়েছে; তুমি দেবীচক্ষু
তোমার চোখের সামনেই, দুই প্যাঁচা, জগজ্জীবন ও জগজ্জননী, আমাদের ছাতিমগাছে
একবার ঝগড়া করে একবার মিলন, একবার ঝগড়া করে একবার মিলন
এই মেঘতামসে, এই আঁধারগম্ভীরায় আমাদেরও শিহরণ হয়, অতিরিক্ত শিহরণ হয়
তুমি দেবীচক্ষু; আমরাও শ্রাবণশ্রমিক, চিরকাল তোমারই গুচ্ছ গুচ্ছ শ্রাবণশ্রমিক

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E