৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ০৫২০১৭
 
 ০৫/০৬/২০১৭  Posted by

শংকর লাহিড়ী’র একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

শংকর লাহিড়ী :

শংকর লাহিড়ী

শংকর লাহিড়ী

কবিতার ছোট বড় নিয়ে প্রশ্নগুলো পড়লাম। প্রথমতঃ খুবই সহজ মনে হলেও, ক্রমে এখান থেকেই ভাবনার অনেক গভীর ও জটিল স্তরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে দেখছি। প্রথমে একটু গদ্য নিয়ে বলি। ছোট গল্প ও  উপন্যাসের মধ্যে যেমন তফাৎ, সে তো শুধু তাদের আয়তনে, আঙ্গিকে, বা উপস্থাপনাতে সীমাবদ্ধ নয়।  তাদের চলন, উদ্দেশ্য এবং মেজাজও অনেক আলাদা। এটা কিছুটা সহজবোধ্য। রবীন্দ্রনাথ বা মোপাসাঁর ছোট গল্পগুলো, অথবা বনফুলের পোস্টকার্ড সাইজের গল্পগুলোর সাথে যেমন সবদিক দিয়েই ভিন্নমাত্রার রচনা দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, বা মাণিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, বা বিভূতিভুষণের ‘পথের পাঁচালী’।

কিন্তু কবিতায় এসে ব্যাপারটা আরও জটিল। অবশ্য সেটা আখ্যানমূলক দীর্ঘ কবিতার প্রসঙ্গে নয়, – রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতাটা যেমন। একটা দীর্ঘ আখ্যানের মধ্যে দিয়ে মানুষেরই রচিত কুসংস্কারের সামনে, এবং কিছুটা নিয়তির কাছেও, মানুষের করুণ অসহায়তার ছবি আছে সেখানে। এমন আখ্যানমূলক কবিতা রবীন্দ্রনাথ অনেকগুলো লিখেছেন, যা লৌকিক জীবনের আচার, সংস্কৃতি, মিথ ও মূল্যবোধের ওপরে আলো ফেলেছে। আর মহাকাব্যের ভান্ডারে যুগ যুগ ধরে পঠিত রামায়ণ ও মহাভারত তো রয়েছেই। বিশাল সময়খন্ড জুড়ে বিস্তৃত পটভূমিতে বহুধাবিভক্ত জনগোষ্টীর ধর্ম অধর্ম বিচার বিশ্বাস সংস্কার প্রেম লোভ ও সংঘাত নিয়ে আবর্তীত যে মহাজীবন। সাহিত্যজগতে, দেশে দেশে, অনেক জাতি-ধর্ম-ভাষায়, এককালে লেখা হয়েছে এমন অনেক মহাকাব্য। আজ আর হয় না। পারস্য-গালিচার মতো, ঝলমলে জরির কাজ করা বেনারসী শাড়ির মতোই তাদের ঝংকার ও গ্র্যাঞ্জার। যুগ যুগ ধরে, বহুবার তাদের পাঠ ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমরা জীবনকে, আমাদের অবস্থানকে, জীবন ও সময়ের সত্যকে, বোঝার চেষ্টা করে যাই। এইসব মহাকাব্য তাই কালজয়ী। এর দর্শন, অবলোকন ও লেখন যথার্থই শ্রমসাধ্য।  

দীর্ঘ কবিতার সংখ্যা কমে আসার কারণ ছোট কবিতার সাথে তার আকার ও চরিত্রের পার্থক্য।  পিকাসোর বিশাল ক্যানভাসে আঁকা ‘গ্যের্ণিকা’ চিত্রটি ও ভ্যান গঘের ছোট্ট ‘সানফ্লাওয়ার’ ছবির মধ্যে যে ভিন্নতা। সিস্টিন চ্যাপেলের মতো বিশাল পরিসরে কাজ করতে গেলে, ছবি অথবা কবিতায়, বিপুল শ্রম ও সময়কাল লেগে যায়। শুধু এই কারণেও দীর্ঘকবিতা, বা বিরাট ক্যানভাসে আঁকা ছবি, সংখ্যায় অনেক কম। আরও একটা বাস্তব লিমিটেশান হোল, বড় ক্যানভাসকে বা বড় কবিতাকে প্রকাশের জন্য অনেকখানি জায়গা লেগে যায় আর্ট-গ্যালারী বা সাহিত্যপত্রিকার পাতায়। এছাড়াও, আজকের প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুতগামী স্বার্থসর্বস্ব জীবনে, পাঠক নয়, লেখকেরই যেন বেশি দায় আছে স্বল্পমেধায় স্বল্পশ্রমে অনেক জায়গায় লিখে চটজলদি কিছু খ্যাতি পাওয়ার, -তাই কবিতার হ্রস্বতা, তাই তাৎক্ষণিক অনুভবের খুচরো কয়েক লাইন। এমনও হয়।      

গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর মধ্যে এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’-কে রাখা হয়। এটা দীর্ঘকবিতা, যদিও কোনও বিশেষ আখ্যানমূলক নয়, তবে অনেকটা ন্যারেটিভ আছে। আছে অনেক ছিন্নভিন্ন ছবি। আছে অনেকগুলো অধ্যায়, নানা রূপকের ব্যবহার, ইতিহাসচেতনা, সমকালীনতা ও জীবনদর্শন। কিন্তু এর মধ্য থেকে আমার বিশেষভাবে প্রিয় সবচেয়ে ছোট, দশ লাইনের চতুর্থ অধ্যায়টি, -যার নাম ‘ডেথ বাই ওয়াটার’। একটা দীর্ঘ কবিতার স্থানে স্থানে এইরকম দারুণ কিছু স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোট কবিতাকেও খুঁজে পাওয়া যায়।   

জীবনানন্দের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ বইতে আছে একটি দীর্ঘ কবিতা ‘অবসরের গান’, যার মধ্যে আছে সেই বিখ্যাত লাইন “পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়”। কবিতায় তিনি একটা বিস্তৃত জীবনপ্রবাহকে প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেখেছেন এক অনিবার্য বিষাদে। কিন্তু এর পাশাপাশি আমি তাঁর ‘সাতটি তারার তিমির’ বইয়ের ‘ঘোড়া’ কবিতাকেও মনে করছি, -বারো লাইনের সেই ছোট্ট কবিতাটি, যার শুরুতে আছে “আমরা যাইনি ম’রে আজো—তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়”। আর শেষ লাইনটি “এই সব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে”। এই কবিতায় যে অবলোকন, যে রহস্যময়তার সৌন্দর্য, -সেই সৌন্দর্যের প্রশান্তি ও অনিবার্য বিষাদ আমাকে দীর্ঘ সময় আবিষ্ট করে রাখে। ছোট কবিতা তো এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, এইখানেই তার বিশেষ শক্তি।  

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী ?

শংকর লাহিড়ী :
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একবার আমাদের কৌরব পত্রিকায় তাঁর ‘কাউন্টিং দা ব্লিসেস’ গদ্যে লিখেছিলেন, “ছোটগল্প ও কবিতা কাছাকাছি চলে আসছে নাকি ? আমি খবর রাখি না। …ছেলেবেলা থেকে রূপনারাণের কূলে আমি প্রোজ হিসেবে পড়ে আসছি, জীবনানন্দের সুদীর্ঘ কবিতাগুলো আমাদের সকলেরই মনে হয় উপন্যাস–”।     

ছোট গল্প ও উপন্যাস, ছোট কবিতা, দীর্ঘ কবিতা ও মহাকাব্যের মধ্যে বিভাজন তাই দৈর্ঘ্যের বিচারে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের চরিত্রে, নির্মাণে ও আবেদনে। অর্থাৎ আকার ও আয়তনই একমাত্র বিচার্য নয়। শিল্পজগতে, সঙ্গীতে ও চিত্রকলাতেও, এমন হয়ে থাকে। দীর্ঘ কবিতা তার দীর্ঘ ভাষ্য ও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে পাঠকের ভাবনায় তরঙ্গ তোলে ; এভাবে যে রস সঞ্চারিত হয়, তার আবেদন প্রধানতঃ পাঠকের মননে। পক্ষান্তরে, ছোট কবিতা তার স্ফটিকতুল্য উদ্ভাসে চেতনায় এক অনুরণন তুলে পাঠককে আপ্লুত করতে পারে । এই অনুরণন হতে পারে আনন্দ বিষাদের তন্ত্রীতে, অথবা চেতনার গভীরে কোনও রহস্য-বিস্ময় স্তরে, নির্বাক সঙ্গীতের মতো।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

শংকর লাহিড়ী :
ছোট কবিতার গঠন-কাঠামো কোনও বিশেষ ছকে বাঁধা নয় ; কবি তাঁর ইচ্ছামত কবিতার ছন্দ, মাত্রা, পংক্তি ও অনুচ্ছেদকে নানাভাবে ভাঙ্গাচোরা করতে পারেন। আমার চারটে কবিতার বইয়ে প্রতিবারই আমি পরিবর্তন এনেছি নানাভাবে, ভেতরে ও বাইরে। আকারে তারা সাধারণতঃ তিরিশ লাইন, অর্থাৎ এক পাতার মধ্যেই সীমিত। তবে ভেতরের পরিবর্তনটাই তো কবিতাকে স্বতন্ত্র করে। অনেকে মনে করেন, একজন কবির সমস্ত কবিতা মিলে একটিই দীর্ঘ কবিতা। আমি তা মনে করি না। জীবন ও সময়ের শব্দহীন আলো-অন্ধকারকে, বিভিন্ন অবস্থান থেকে দেখতে চেয়েছি কবিতায়, শব্দের নিজস্ব শরীরে।

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি ?

শংকর লাহিড়ী :
যে কবিতায় আমাদের অন্তর্লোকে রসসৃষ্টি হয়, যাকে জীবনানন্দ ‘উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিজ্ঞতা ও চেতনার জিনিষ’ বলেছেন, যার পরতে পরতে থাকে শিল্পীত রহস্যময়তা, সেখানেই কবিতার মূল শক্তি, সেই কবিতাই আমাদের আলোচ্য। উচ্চমানের কবিতাপাঠের পূর্ণ তৃপ্তি অনেকাংশে নির্ভর করে পাঠকের পরিবেশ অবস্থান শিক্ষা অভিজ্ঞতা চেতনা বোধ ও মননের ওপরে।  

 
গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব ?

শংকর লাহিড়ী :
ছোট কবিতায় মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া হয়তো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নয়। পঁয়ষট্টি রকমের মশলা ও উপকরণে তৈরী মহাকাব্যিক বিরিয়ানি বা পলান্ন, -তার সাথে ছোটকবিতার মতো ফরাসি রেড ওয়াইনের স্বাদ গন্ধ মদিরতার কোনও তুলনা চলে না। -শাহি বিরিয়ানি সর্বদার জন্য নয়, কিন্তু ছোট একপাত্র মদিরার স্বাদ-গন্ধের আবেদন সবসময়ে, সকল কাজের মধ্যে ও বিরামে, সময়ের যেকোনও ঘড়িতে। এখানেই ছোট কবিতার ‘বিশেষ শক্তি’। আমাদের তা বহুমাত্রিক এমন এক রসাস্বাদন করায়, -রেড ওয়াইনের মতোই লিঙ্গারিং তার অনুভব ও দ্যোতনা। ভালো পারফিউমেরও যেমন আছে ‘হেড নোট্‌স’, ‘হার্ট নোট্‌স’ এবং ‘বেস নোট্‌স’, তেমনই ছোটকবিতারও আছে বহুস্তরীয় বিন্যাস, সামান্য পরিসরেই যা অনুরণন তোলে আমাদের বোধে, চেতনার গভীরতর স্তরে। -এই নিয়ে পরে কখনো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে।  

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে ?

শংকর লাহিড়ী :
আমার এযাবৎ যেটুকু লেখালিখি তার প্রায় সবটাই তো ছোট কবিতা, বা বলা যেতে পারে ছোট পরিসরে, পনেরো-ষোলো লাইনে। কখনো দু’তিন পাতায়, যেমন শেষদিকে ‘নীল কাগজ’ সিরিজের কিছু লেখা। তবে দীর্ঘ কবিতা একবারই লিখেছি, ‘জলের শব্দ ও ধাবমান টাট্টু’ ; আমার কবিতাসমগ্রে আছে। ১৯৮৩ সালে লেখা। তখন সেটাই ছিল কৌরব পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত কোনও দীর্ঘ কবিতা। এর কিছু টুকরো অংশ, চরিত্রে যা ছোট কবিতার মতোই, আমি পরবর্তীকালে ব্যবহার করেছি আমার গদ্যে এবং সম্প্রতি আমার ‘উত্তরমালা’ চলচ্চিত্রেও।  

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।
 
শংকর লাহিড়ী :


সময়-চাদর

সময়-চাদরের এক প্রান্ত থেকে গড়িয়ে যায় বল
সে বল আস্তে ধীরে বাঁক নেয়  বক্ররেখায়
                                  অর্জুন গাছের দিকে –
অর্জুন গাছের নিচে মহাকাশ অন্ধ-গহ্বর ।
ভাবি আমি, তবে কেন আমাদের বন্ধু সমীরণ
নীল জিন্‌সের প্যান্ট,       বাহুতে বান্ধবী
আর তার পানপাত্রে মদ –
দেখি আমি আমাদের বন্ধু সমীরণ
হাতে গল্‌ফের স্টিক,   কোর্সে নেমেছে
          প্রাচীন গাছের কাছে,        অন্ধ গহ্বরের কাছাকাছি।
সময়-চাদরের এক প্রান্ত থেকে দোলা এসে লাগে
শরীরী তরঙ্গ এক ;
                      এত সে মাংসল স্থূল জৈবগন্ধী
তীব্র এত টান,
এত তীব্র কম্পিত চাদর
                         আলোর সকল কণা শুষে নেয়,
সহসা আলোর কণা  সকল আঁধার হয়ে নামে ।
ডাকি আমি :  কোথায় বন্ধু তুমি  কোনদিকে বান্ধবী আমার ?
               কোথায় বন্ধু তুমি   কোনদিকে বান্ধবী আমার …
অর্জুন গাছের নিচে মহাকাশ,      স্রোত   ও   গহ্বর ।
——————————


দেওয়াল ও বিছানা

বরফের তৈরী দেওয়াল,
কাঁটায় আকীর্ণ বিছানা
আর গান : তোমারে ভালোবেসেছি।
শব্দগুলি শ্লথ, অক্ষর কাবু ও নড়বড়ে,
ফুলে উঠছে যদিও সুরগুলি তাঁবুর মতো,
বসবাসহীন ঘুমঘোর কয়েকটি চেয়ার।
একটি পা দীর্ঘ হয়ে বেরিয়ে আছে বিছানা থেকে।
ডাকছে ঐ তাঁবুর ভেতর কয়েকটি পাখি ;

ব্রোঞ্জের তৈরি ডানা,  পিপাসা,    ও চোখ বিস্ফারিত।
পরাজয়, অথবা অসহায় শিঙওয়ালা একটি হরিণ ;
দেওয়াল, অথবা ধ্বসে পড়ার এক চেতনা ;
বিবাহপ্রস্তাব, অথবা ক্রাচে ভর দিয়ে    এক পা    এক পা
চলে যাওয়া ;     ঐ বরফের দেওয়াল
ও কাঁটায় আকীর্ণ বিছানা ।
———————————


বিপন্ন মহিষগুলো ডাকছে

সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে বিপন্ন মহিষগুলো ডাকছে।
আরব সাগর থেকে জল এসে লাগছে তাদের বাঁটে
আর নুনে ভরে উঠছে দুধ ;
গায়ে আটকে যাচ্ছে ছোট ছোট ঝিনুক ও জেলিফিশ।

একটা উল্কাপিন্ড এসে পড়ছে খড়ের গাদায়,
চাঁদের প্রান্তবর্তী টুকরোগুলো এসে পড়ছে মহিষের খাবারে
আর প্রধান রাস্তা দিয়ে দুধ বয়ে যাচ্ছে।
এই দৃশ্যে শহরের উদ্ভ্রান্ত সমস্ত রাখাল,

তারা বেহালা বাজাতে জানে না,
ভয়ে জড়িয়ে ধরছে আপন মেয়েমানুষদের ;
মেয়েমানুষের লাল আলোয়ানে মুখ লুকিয়ে কাঁপছে তারা
আর অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে সন্ধ্যায়।

মেয়েরা, -মকাইয়ের গন্ধ যাদের সমস্ত শরীরে,
হাতে নিয়ে দেখছে ঐ উল্কাপিন্ড ও ছোট ছোট ঝিনুক,
জল এসে লাগছে তাদের স্তনেও।

একটা কাঁপন এসে লাগছে জরায়ুতে ; হিম গুঞ্জনময় জলে
গর্ভ ভরিয়ে তুলবে এই সম্ভাবনায়
আবেগে শিহরণে তারা দুলে উঠছে।
বিদ্যুতের আলোয় চমকে উঠছে
                          মহিষ ও দূরগামী রাজপুরুষেরা।
—————–


ট্রাজেডি

একটি ট্রাজেডি দেখি প্লেট ভরে আছে
হিম, আয়তাকার, বিন্দু বিন্দু নীল
ও তার সোনালি রস উপচে পড়ছে টেবিলে।
প্রত্যেক টেবিল,
তাদের চারটে পা ও তিনটে চেয়ার
সাদা লিনেন ও সরু দাগটানা ধূসর গ্যাবার্ডিন
গরমজলের ব্যাগ ও রুমাল
ও তাজা মচমচে বাদামি জুতোগুলো
ক্রমশঃ ভিজে যাবে ঐ সোনালি রসে,
একটি প্লেট নীল হয়ে পড়ে থাকবে,
আজ প্রত্যেক টেবিলে
                     এই
                           সম্ভাবনা ।
———————


সমুদ্র  শিকার

জেলেরা মাছ ধরতে যায় দূর সমুদ্রে ;
সমুদ্র থেকে তুলে আনা প্রত্যেক মাছের বদলে
                            তারা সাগরে দিয়ে আসে
স্থলভূমির একটা মাছ —
এইভাবে প্রতিবার তারা জলে ভাসিয়ে দেয় তাদের অহংকার।
          যখন তারা রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে ঘরে ফেরে
                তিন চার পাঁচদিন সমুদ্রে কাটানোর পর
                               তাদের বুদ্ধ মূর্তির মতো দেখায় ।
– একবার গিরিগুহায় দেখেছিলাম এক বুদ্ধ মূর্তি ;
দীর্ঘকাল ঝঞ্ঝাবাতাসের সাথে যুদ্ধ করে
                           ঊর্মিমালায় ভাসতে ভাসতে
ফিরে এসে তিনি ধ্যানে বসেছিলেন ।
জেলেরা যখন সমুদ্র-শিকারে যায়
            মহাকাশ থেকে তাদের লক্ষ করে কয়েকটা উপগ্রহ,
যখন বন্দরে বন্দরে লাল আলো জ্বলে
আছড়ে পড়ে ঝড়
জেলেপাড়ায় কান্নার রোল ওঠে
আর সহসা নৌকোগুলো তলিয়ে যায় মহাসমুদ্রে ।
তখন ঐ বর্তুল নীল উপগ্রহরা
                  বহুদিন তারা অপেক্ষায় অপেক্ষায়
                 ঘোর জলের ওপরে স্পন্দিত হতে থাকে –
ক্রমে, একে একে তারা ছেড়ে চলে যায়
                                   সেই সলিল
                          চলে যায় অন্য দ্রাঘিমায়
যেখানে নক্ষত্রের আলোয় ঘন অন্ধকারে মাছ ধরে
                                  আরও পারঙ্গম জেলেরা ।
——————————–


রোদ উঠেছে

আজ আবার রোদ উঠেছে
           আবার একলা একা হয়ে হাঁটা,
নদীতীরে      শিশিরে       চিবুকে
                                     ঘুমের হাই
‘হাই সজল’,  –মেয়েটা ভোরবেলা ডাকবে ।
জল… শব্দ…  অক্ষর…  কাগজ…
                 — আজ এইভাবে সজল হাঁটবে ;
গন্ধ ও আক্রমণ,
চিৎকার ও কোমল,
                   দুদিকে এমন দুলবে
মনে হবে এসবই গন্তব্য —
একটা সকাল ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে
                                      মনে হবে
একটা গোটা জীবন অতিবাহিত হল ।

এখন প্রত্যেক সকালেই আমার ভয় করে,
মনে হয় কেউ পরিয়ে দেবে তার নির্বাচিত পোশাকগুলো
অথবা বলবে,
        এখন থেকে ক্রাচে ভর দিয়েই হাঁটবে তুমি ।

হাওয়ায় যখন সাইরেনের শব্দ
বাজবে জানালার ওপারে এক উদাসীর নূপুর
মনে হবে শহরের গভীরে কোথাও হিংসা শুরু হয়েছে,
বারো তলার নির্জন বাথরুমে ঝুলে থাকবে একটা ফাঁস
সকালের ঝলমলে প্রচুর রোদ
                     লাশ দোলায়িত,       দুলবে ।
—————————–


উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ

কতরকমের খেলায় ভুলে থাকা যায় ঐ ঘন্টাধ্বনি। অশ্লীল ও
কর্কশ শব্দ, যা বেজে যাচ্ছে  আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও।
বাজুক, শব্দহীন,  আর এগিয়ে নিতে দিক আমাদের
চরাচর ও পর্যটন।   হাইতোলা, আড়ামোড়া, খুনসুটি ।   
আমরা  আমাদের ইচ্ছেমতো খেলব,     চুমু খাব,    
টেলিফোন করবো  ভুল নম্বরে।  
একটা দীর্ঘ সরলরেখাকে স্প্রিং-এর মতো গুটিয়ে এনে,
একপ্রান্ত ছেড়ে দিয়ে দেখব কী প্রচন্ড বেগে লাফিয়ে ওঠে
তেজপূর্ণ রেখাসকল। আমরা নকল করব থান্ডার মেঘের
গম্ভীর ডাক,  আর যেরকম শব্দে শালের জঙ্গল থেকে
লাল পিঁপড়েরা ছড়িয়ে পড়ে গভীর শিকড়ে। -সেই শব্দ
শোনাব আমরা ফাঁকা খনিগর্ভে নির্বাচিত বন্ধুদের।
একটা ইস্পাতের দাগের গভীরেও ঝাঁপিয়ে নামতে পারি আমরা,
কেননা আমরা সর্বত্র যেতে চেয়েছি।   যেখানে যত প্রশ্ন রয়েছে,
-প্রশ্নই আমাদের প্রাইম মুভার ।  
আমরা দিন-মাস-বছর ধরে খুঁজতে পারি শিরায়-নাভিতে-শীৎকারে
জন্মে ও হত্যায়,   নতুন সম্পর্ক সৃষ্টিতে, -কোথায় রয়েছে সেই
সমূহ উত্তরমালা ।
বেরিয়ে এসো উত্তরমালা  মাতৃগর্ভ থেকে,  ছাপাখানা থেকে,
অশ্বত্থ বৃক্ষ থেকে ;
কাম আউট আনসার শিট্‌স্‌, -সোয়াইন, ঘাগু, যুদ্ধবাজ,
হিমায়িত ফসিল থেকে উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ ।
————————–

শংকর লাহিড়ী
কলকাতা, ২৭ মার্চ, ২০১৭

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E